অখিল নিয়োগী
অবয়ব
অখিল নিয়োগী (জন্ম: ২৫ অক্টোবর, ১৯০২ — মৃত্যু: ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩) একজন বাঙালি শিশুসাহিত্যিক। তিনি স্বপনবুড়ো ছদ্মনামেই অধিক পরিচিত। ব্রিটিশ ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গের অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের সাঁকরাইল-টাঙ্গাইলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
উক্তি
[সম্পাদনা]কিশোর উপন্যাস
[সম্পাদনা]- বৃটিশের চ্যালা-চামুণ্ডা-যারা তখন আমাদের দেশ শাসন করতো, তারা আমাদের দেশেরই মানুষ। কিন্তু তারা মনে করতো, এই যে বৃটিশ রাজত্বে সূর্য অস্ত যায় না-এর সমস্ত গর্ব আর গৌরব তাদের। পীড়ন করে হোক, শয়তানী করে হোক, নিজের দেশের মানুষদের কারাগারে পাঠিয়ে হোক- বৃটিশ রাজত্ব এই দেশে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। রাজার জাতের পায়ে যাতে কাঁটাটিও ফুটতে না পারে, তারই খবরদারী করবার জন্যই তাদের জন্ম হয়েছে। তারা সরকারী চাকরী পেয়েছে সেই মহৎ কাজকে সকল দিক দিয়ে সফল করে তোলবার জন্য।
এই কথা তখনকার দিনের আমলারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতো।- বাবুইবাসা বোর্ডিং, স্বপনবুড়ো রচনাবলী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা ৯৫
- অপরের ঐশ্বর্য দেখে খুশী হয়, এমন মানুষও ত' দুনিয়ায় আছে।
- আমার মায়ের মুখ, স্বপনবুড়ো রচনাবলী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা ১০৬
- খোকা একবার মায়ের মুখের দিকে আর একবার অন্ধকার দেয়ালের দিকে তাকালো। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। কোণের মাটির প্রদীপটি মিট্মিট্ করে জ্বলছে। মা খোকার হাতটা চেপে ধরে বললেন, খোকা, আমি চললাম--কিন্তু তোকে এবার মানুষ হতে হবে--
বাইরের জান্লা দিয়ে একটা দমকা হাওয়া এসে কোণের ক্ষীণ মাটির প্রদীপটিকে যেন ফুঁ নিভিয়ে দিয়ে গেল।- আমার মায়ের মুখ, স্বপনবুড়ো রচনাবলী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা ১৯০
ছোটগল্প
[সম্পাদনা]- হেডমাষ্টার মশাই বললেন, তোমরা এখনো আমার কথা ঠিক বুঝতে পারো নি। তবে শোনো। ভগবান আমাদের সকলের বুকে অমূল্য রতন দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। সে রতন হচ্ছে- দয়া, মায়া, পরোপকার--এই সব প্রবৃত্তি। কিন্তু আমরা নিজেদের দোষে এই সব অমূল্য রতন হারিয়ে বসে থাকি। আমার বোকা ছাত্রটি একটি গোরুর প্রাণ রক্ষা করে দয়ার পরিচয় দিয়েছে, আর মাঝির ছেলেকে নিজের চাদর বিলিয়ে দিয়ে পরোপকার প্রবৃত্তিকে খু'জে পেয়েছে। ও যদি আজ আমার আংটি ফিরে নাও পেতো তবু আমার ক্ষোভ ছিল না। কেননা ও আজ, সত্যিকারের হারানো রতন খুজে পেয়েছে। আমার স্কুলের সব ছাত্র যেদিন এমনি করে হারানো রতন পাবে সেই দিনই আমি হবো সার্থক শিক্ষক।
- হারানো রতন, স্বপনবুড়োর রকমারি গল্প, পৃষ্ঠা ১৩-১৪, অভ্যুদয় প্রকাশ-মন্দির
- পূব দিকে তাকিয়ে দেখে-লাল সূর্য উঠছে। জবাফুলের মতো রক্তিম । সেই দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, স্বাধীনতার উৎসবের আগে তাকে শেকল খোলার ব্রত গ্রহণ করতে হবে।
- শিকল খোলার খেলা, স্বপনবুড়োর রকমারি গল্প, পৃষ্ঠা ৬৬, অভ্যুদয় প্রকাশ-মন্দির
ভ্রমণ কাহিনী
[সম্পাদনা]- হলের মধ্যে দুটি তিন-চার বছরের শিশু দিব্যি কলহাস্যে আসর জমিয়ে তুলেছে। একটি শিশু একজন ইন্দোনেশিয়ার মায়ের ছেলে আর একটি কোন ইউরোপীয় শিশু। পরস্পরের জানা-শোনা নেই--দেখা-সাক্ষাৎ নেই। এই বিমানেই মিলন- আর বাগদাদের নিশুতি রাত্রে তাদের আনন্দ-আসর। হয়ত এর পর আর জীবনে দেখা হবে না। কিন্তু আবার যদি কোনো দিন সর্ব্বগ্রাসী যুদ্ধ বাধে- তবে কে বলতে পারে- এই দুটি শিশু একদিন যুবক হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে হাতিয়ার নিয়ে লড়বে না। কিন্তু নিশুতি রাত্রের এই শিশু দুটির কলহাস্য আর ছুটোছুটি কেবলি কি এই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে না- যে মানুষ আসলে মানুষ? সে যে জাতেরই হোক না কেন! সবাইকার সঙ্গে যেন একটা অদেখা আত্মীয়তার বন্ধন আছে।
- সাত-সমুদ্দুর তের নদীর পারে, স্বপনবুড়ো রচনাবলী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা ২১০
- সম্প্রতি আর দুটি ইংরেজ ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। এরা দুজনেই কলকাতার মোটা মাইনের চাকুরে। একজন বার্ড কোম্পানীতে চাকরী করেন বললেন। ছ'মাসের ছুটি নিয়ে হোম-মানে লন্ডনে চলেছেন। আগামী কাল সন্ধ্যেবেলা এঁরা দুজন লন্ডনে পৌছবেন। নিজেরাই যেচে এসে আমার সঙ্গে আলাপ জমালেন। আমারও বেশ ভাল লাগলো তাদের সঙ্গে নানা কথা বলে। কিন্তু যদি কলকাতা সহর হত তবে এঁরা বোধ করি আমার মতো নেটিভের সঙ্গে কথা বলতেই চাইতেন না। ভারত থেকে বাইরে এসে বিমানযাত্রার শ্রীক্ষেত্রে জাতিভেদ প্রথা একেবারে উঠে গেছে।-কেউ আর হরিজন নয়,-সব একাকার হয়ে গেছে
- সাত-সমুদ্দুর তের নদীর পারে, স্বপনবুড়ো রচনাবলী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা ২১১
- কোথায় লুকিয়ে আছে ওদের জীবনী-শক্তির মূলমন্ত্র? এত দ্রুতবেগে ওরা হাঁটে কি করে? ওদের দিকে তাকালে মনে হয়-সবাই যেন ছুটছে ট্রেন ধরবার জন্য! এক মুহূর্ত দেরী হলেই ট্রেন ফেল হবার সম্ভাবনা!
- সাত-সমুদ্দুর তের নদীর পারে, স্বপনবুড়ো রচনাবলী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা ২৪২
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় অখিল নিয়োগী সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।