অজিতকৃষ্ণ বসু
অবয়ব
অজিত কৃষ্ণ বসু (জন্ম: ৩ জুলাই, ১৯১২ - মৃত্যু: ৭ মে, ১৯৯৩), অ কৃ ব নামেই তিনি সর্বত্র পরিচিত। তিনি মূলতঃ ব্যঙ্গ ও কৌতুক রস সাহিত্যিক হলেও জাদুবিদ্যা ও সঙ্গীতে তার বিশেষ পারদর্শিতা ছিল।
উক্তি
[সম্পাদনা]যাদু-কাহিনী
[সম্পাদনা]যাদু-কাহিনী, ঋদ্ধি-ইন্ডিয়া
- যাদুর কাহিনীই দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো কাহিনী, আর ঈশ্বরই হচ্ছেন দুনিয়ার সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ যাদুকর। তারই যাদুতে অনন্ত শূণ্যের বুকে সৃষ্টি হয়েছিল বিস্ময়ে ভরা এই বিশ্ব। ঈশ্বর-সৃষ্ট বিস্ময়গুলো যুগের পর যুগ দেখতে দেখতে ক্রমে বিস্ময়ের ঘোর কেটে গেল মানুষের চোখ থেকে আর মন থেকে। ঈশ্বরের যাদু ভুলে মানুষ তখন মানুষের যাদুতে মুগ্ধ হতে শুরু করল।
- প্রস্তাবনা, পৃষ্ঠা ১
- চোখের পলকে ভেবে শিহরিত হলাম বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্রের নাম যথাক্রমে বিশ্বম্ভর, বাঞ্চারাম আর ভজহরি হলে কী কেলেঙ্কারিই না হতো!
- একজন যাদুকরের কথা, পৃষ্ঠা ১৯
- আমাদের প্রত্যেকের প্রতিটি রক্তকণায় মিশে রয়েছে গভীর বন্ধন-বিতৃষ্ণা এবং মুক্তি-পিপাসা। বন্ধন-দশায় আমাদের প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে, আমরা চাই স্বাধীনতার মুক্ত হাওয়া। আমাদের বুকের রক্তে তাই দোল লাগে যখন রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেন :
“শিকল দেবীর ঐ যে পুজা বেদী
চিরকাল কি রইবে খাড়া?”
যখন কাজী নজরুল হাঁকেন :
“কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফ্যাল, কর রে লোপাট।”
যখন প্যাট্রিক হেনরি বলেন “গিভ মি লিবার্টি অর গিভ মি ডেথ”, দাও আমাকে মুক্ত স্বাধীনতা, অথবা মৃত্যু। তাই পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মাতৃভূমির মুক্তি-সাধনায় জীবন পণ করে যারা শহীদ হন, মুক্তির পূজারী রূপে আমরা তাদের চিরদিন শ্রদ্ধা করি। এমন-কি আমাদের গভীরতম আধ্যাত্মিক সাধনার মূলেও ঐ একই লক্ষ্য- বন্ধন থেকে মুক্তি, মোহ থেকে মুক্তি।- অদ্বিতীয় হ্যারি হুডিনি, পৃষ্ঠা ২৭
- “পলায়নী" যাদুর অদ্বিতীয় যাদুকর হুডিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী মুক্ত আত্মার প্রতীক, কোনো বন্ধন যাকে বাঁধতে পারে না।
- অদ্বিতীয় হ্যারি হুডিনি, পৃষ্ঠা ৩২
- গণপতির দেব-দেবীতে ভক্তি ছিল অসাধারণ, তিনি পুজো-আর্চা করতেন নিয়মমতো, খুব ছোটো করে চুল ছাঁটতেন এবং টিকি রাখতেন। ব্যাক্তিগত জীবনে তার আচার-বাবহার থেকে লোকের মনে এ বিশ্বাস সহজেই হতো যে, তিনি তন্ত্রের সাধনা করেন এবং তার ফলে নানা রকমের অলৌকিক শক্তি তার করায়ত্ত। সাধারণের মনে তার অলৌকিক শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা-ভীতিমিশ্রিত বিশ্বাস যাতে বজায় থাকে সেদিকে তিনি যত্নবান ছিলেন, পেশাদার এনটারটেনার অর্থাৎ জনগণমনোরঞ্জক রূপে এর মূল্য তিনি বুঝতেন।
- যাদুকর গণপতি, পৃষ্ঠা ৪৬
- যাদুকর গণপতি শেষ জীবনটা সাধন-ভজনেই কাটিয়ে গেছেন। অর্থ-উপার্জন করে কলকাতার উপকণ্ঠে বরানগরে যে সম্পত্তি করেছিলেন তা দেবোত্তরিত। দুহাতে তিনি যেমন টাকা রোজগার করেছেন, তেমনি পরের উপকারে দানও করে গেছেন অকাতরে। অনেক শোনা গল্পের একটি গল্প বলি। এক জায়গায় যাদুর খেলা দেখানো শেষ হয়ে গেছে। গণপতির সঙ্গে দেখা করলেন এক দরিদ্র, কন্যাদায়গ্রস্ত ব্রাহ্মণ। গণপতির কাছে তাঁর একটি আর্জি আছে, সে আর্জি মঞ্জুর করতেই হবে। হাওয়া থেকে টাকার পর টাকা ধরার বিদ্যেটা শিখিয়ে দিতে হবে তাকে, নিদারুণ অর্থাভাব আর সহ্য হয় না, পারানির কড়ির অভাব মেয়েটার ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া হয়ে যেতে বসেছে।
অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল যাদুকর গণপতির দুটি চোখ। গরিব ব্রাহ্মণকে বললেন “ভাই, সত্যি সত্যি হাওয়া থেকে টাকা ধরার বিদ্যে জানলে কি আর এত লোকজন, লটবহর নিয়ে ঘুরে ঘুরে যাদুর খেলা দেখিয়ে টাকা রোজগার করতে হত আমাকে?”
যুক্তিটা হৃদয়ঙ্গম করে তখন হতাশ হলেন কন্যাদায়গ্রস্ত গরিব ব্রাহ্মণ। কিন্ত শেষ পর্যন্ত তাকে হতাশ হতে হয়নি। সম্পূর্ণ ব্যয়ভার গ্রহণ করে ব্রাহ্মণের মেয়েটির ভালো বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন গণপতি।- যাদুকর গণপতি, পৃষ্ঠা ৫৪-৫৫
- হাওয়া থেকে খুশিমতো টাকা ধরবার যাদু যার জানা আছে তিনি হাওয়াই টাকায় কোটিপতি না হয়ে দীনহীনের মতো এই সামান্য টাকার জন্য ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ান কেন? এ প্রশ্নের ভারি সুন্দর জবাব দিয়েছিলেন যাদুকর চাদ মিয়া । বলেছিলেন “হাওয়াই যাদুর টাকা ভোগে লাগাতে নেই। লাগালেই যাদু আর লাগে না। হাওয়ার টাকা তাই আবার হাওয়াতেই ফিরিয়ে দিতে হয়।”
- ডেভিড ডেভান্ট,পৃষ্ঠা ১০৬
প্রজ্ঞাপারমিতা
[সম্পাদনা]প্রজ্ঞাপারমিতা, ইন্ডিয়ান আয়াসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোং প্রাইভেট লিঃ
- আমার পাশে যে ভাবালু ছোকরা ব'সে ছিল, সে এইবারে বললে, “গাধাটি কি আশ্চর্য কায়দায় ঘাস খাচ্ছেন দেখেছেন? ঠিক মানুষ বলে মনে হয় না কি?” আমি বললাম, “অনেক মানুষকেও তো গাধা ব'লে মনে হয়। এতে আর আশ্চর্য হবার কি আছে ?” ছোকরা বললে, “কিন্তু কি বিষন্ন দুটি চোখ, লক্ষ্য করেছেন?” অবাক হয়ে উঠলাম, ধূমকেতুর ল্যাজের ঝাপটা-খাওয়া পৃথিবীর আবহাওয়ার মত। সার্কাসের এই ভিড়ে আমি ছাড়া অন্তত আর-একটি প্রাণী লক্ষ্য করেছে গাধাটির বিষণ্ণ চোখ!
- পৃষ্ঠা ১৪
- হঠাৎ দেখি গাধাটা রেবেকার ছেড়ে-আসা টেবিলটার ওপর উঠে দাড়িয়েছে, ওর চেহারা হয়ে গেছে সক্রেটিসের মত। টেবিলের ওপর ঘুরে ঘুরে চারিদিকে সে দেখছে অসংখ্য মূর্খ মানুষের অগুনতি মাথা, আর তাদের দুঃখ ভেবে 'হায়' 'হায়' করছে। গাধার সক্রেটিসী চোখের আলোয় দেখতে পেলাম সবগুলো মানুষের মুখে গাধাটে ভাব আর তাদের প্রত্যেকের মুখের সামনে ঝুলানো এক গুচ্ছ ঘাস, মুখ বাড়ালেও সেটা নাগালের বাইরেই এগিয়ে থাকছে। তাই দেখে গাধার সক্রেটিসী ছলছল চোখ আরও ছলছল হয়ে উঠছে! সে যেন সবাইকে বলছে, “নিজেকে জান।” চারিদিকে মানুষেরা হাততালি দিচ্ছে গাধার তামাসা দেখে। আর হতভাগ্য অজ্ঞান মূঢ় মানুষের কথা ভেবে গাধার চোখ বেদনায় বিষন্ন।
- পৃষ্ঠা ১৫
- এমন সময় এলেন বিশ্বম্ভর বাবু, মাথায় গান্ধীটুপি। এ টুপির তলায় নেই গান্ধীভক্তি, আছে টাক। টাক ঢাকতে গান্ধীটুপি চমৎকার।
- পৃষ্ঠা ২১
- যাঁরা বলেন কুকুর কিছু মনে ধরে রাখতে পারে না, জানবেন তাঁরা নিজের ভুলো মন কুকুরের ওপর চাপাচ্ছেন।
- পৃষ্ঠা ৭২
- তবে এইটে জানবেন কুকুর বড় প্রভুভক্ত প্রাণী বলে যে ইস্কুলে প্রবন্ধ পড়ানো হয় আর লেখানো হয় ওর এক তরফা দৃষ্টিভঙ্গিটা আমি পছন্দ করি নে। প্রভু যদি কুকুরভক্ত প্রাণী না হয়, তো কুকুরই বা প্রভুভক্ত প্রাণী হতে যাবে কেন?
- পৃষ্ঠা ৭৩
- আমি ক্যাপিট্যালিস্ট, আপনিও ক্যাপিট্যালিস্ট ধনপতিবাবু। তফাত শুধু আমার ক্যাপিট্যাল আছে, আপনার নেই।
- পৃষ্ঠা ৮০
- তাকালাম দূরের চৌধুরী ম্যানশ্যানটির দিকে। বস্তি কি সত্যই গেছে? দিশি মাটির বস্তি গিয়ে বস্তি হয়েছে বিলিতী মাটির আর কংক্রিটের; একতলা বিদায় নিয়ে এসেছে আটতলা। ছিলো সেকেলে,মিটমিটে-হয়েছে মডার্ণ, খটখটে, ঝকঝকে । ছিলো অমার্জিত, অভব্য- হয়েছে মার্জিত, সভ্যভব্য। যেখানে ছিল টিমটিমে কেরোসিন কুপি, হারিকেন লণ্ঠন, রেড়ীর প্রদীপ, সেখানে এসেছে চোখ-ধাঁধানো বিজলী বাতি। বাতাস নেই তালপাতার পাখায়, ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে বিজলী পাখা গরম তাড়ায়, কোনো কোনো ফ্ল্যাট আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক কায়দায় শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত।
কিন্তু কোথায় সেই নরম মাটির ছোঁয়া, কোথায় সেই ঘাসের সবুজ? সেই প্রাণের দরদী পরশ কোথায় গেল? হৃদয়ের যে সংযোগ ছিলো বস্তির মেটে-ঘরে মেটে-ঘরে, নেই সে যোগ সিমেন্ট কংক্রিটের ম্যানশ্যানের ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে। এই ফ্ল্যাটে যখন মৃত্যুর পদক্ষেপ, পাশের ফ্ল্যাটে তখন পদক্ষেপ সঙ্গীত-মুখর ফক্স্ ট্রট নৃত্যের।- পৃষ্ঠা ২৭৮
- “বন্দী সাজাহান তাজমহলের দিকে তাকিয়ে কি ভাবতেন জানো ধনপতি?" বল্লেন অনঙ্গ চৌধুরী। “মমতাজের কথা নয়। তিনি ভাবতেন সেই নাম-না-জানা হাজার হাজার হতভাগ্য গরীবের কথা, সম্রাটের এই শখের তাজমহল গড়ে তুলতে তিলে তিলে যারা বুকের রক্ত দিয়েছিল। তাজমহলের দিকে তাকিয়ে তিনি শুনতেন তাদের অশরীরী আত্মার আর্তনাদ। আমিও তেমনি এ ম্যানশ্যানের দিকে তাকিয়ে বিতাড়িত হতভাগ্য বস্তিবাসীদের হাহাকার শুনতে পাই ধনপতি। বুকের ভেতর ঝড় ওঠে, তবু আমার এই তাজমহল ছেড়ে আমি পালাতে পারি নে। কি জানি কেন আমার মনে হয় প্রজ্ঞাপারমিতা আসবে, এসে আদেশ করবে ভুজঙ্গকে, ভেঙে ফেল এ ম্যানশ্যান। সেই বস্তিকে আবার আনো ফিরিয়ে। আমি জানি প্রজ্ঞার সে আদেশ অমান্য করবার সাধ্য হবে না ভুজঙ্গের। আমি সে দিনের আশায় এই ঘরের মাটি কামড়ে বসে থেকে দিন গুনছি ধনপতি।”
- পৃষ্ঠা ২৭৯
- মরণ মানেই তো অনন্ত না-থাকার সুরু। সারাজীবন থাকতে থাকতে থাকাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় বলেই ঐ না-থাকার কল্পনাটা অস্বস্তিকর বোধ হয়
- পৃষ্ঠা ২৮৭
- দুনিয়ার একটা বড়ো ট্রাজেডি এই যে, কল্যাণ করবার ক্ষমতা যাদের আছে, কল্যাণ করবার কামনা তাদের নেই; কামনা যাদের আছে, তাদের ক্ষমতা নেই।
- পৃষ্ঠা ৩৩৭
- সন্ন্যাস-আশ্রম একমুখো রাস্তা নয়। তাই এ আশ্রম থেকে সংসার-আশ্রমে ফিরে যেতে বাধা নেই। যে সেবাব্রতে নেই প্রাণের আনন্দের যোগ, আছে শুধু আত্মনিগ্রহ আর আত্মবঞ্চনার গ্লানি, সে তো মিথ্যে, সে তো অকল্যাণময়। বৃহৎ ব্যথা পেয়ে মানুষ যখন পরের কল্যাণে আপন বিলিয়ে দেয়, তাতে থাকে আপন ব্যথা ভোলার আনন্দ, সেই আনন্দই তার কল্যাণ সাধনার মূল। এই আনন্দের যোগ যেদিন থাকবে না, এমন দিন যদি কখনো আসে, যেদিন সংসারেই বৃহত্তর আনন্দের সন্ধান পেয়ে সংসার-আশ্রমে ফিরে যেতে একান্তিক আকুলতা জাগবে ওঁকারের মনে, সেদিন মুক্তপ্রাণে তাকে মুক্তি দেবো; বলবো ফিরে যাও ওঁকার।
- পৃষ্ঠা ৩৪১
ওস্তাদ কাহিনী
[সম্পাদনা]ওস্তাদ কাহিনী, অসীমা প্রকাশনী
- ঢাকা শহর ছিল পূর্ববাংলার সঙ্গীত-তীর্থভূমি, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে ছিল ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়।
- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ২১
- শ্রীমতী কেসর বাঈ তখন ভারতের সর্বপ্রধানা এবং পরম সম্মানিতা খেয়াল গায়িকা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত যে এমন মধুর এবং মনোমুগ্ধকর হতে পারে কেসর বাঈ সাহেবার গান শুনবার আগে তা ভাবিনি কখনো। তিনি খেয়াল গাইলেন কাফী কানাড়া রাগে। তার অপূর্ব সঙ্গীতে হল শুদ্ধ সমস্ত শ্রোতা মন্তরমুগ্ধ। গানের শেষে আমাদের বিনম্র অভিবাদন জানিয়ে তিনি যখন মঞ্চের নেপথ্যে চলে গেলেন, তখন আমাদের সবারই মনে হতে লাগল তার গান বড় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল, আরো কিছুক্ষণ চললে ভালো হতো যদিও ঘড়ির হিসেবে তিনি খুব কমক্ষণ গাননি।
- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ২২
- অধিকাংশ ওস্তাদই ছিলেন অত্যন্ত সংকীর্ণ চিত্ত, কৃপণ, নিজেদের ঘরানার ভালো ভালো 'চিজ' তারা নিজেদের ঘরানার মধ্যেই সীমিত রাখতেন । বাইরে যেতে দিতেন না, ঘরানার বাইরের কাউকে শেখাতেন না। আমাদের হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় রাগসঙ্গীত সম্বন্ধে গবেষক পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে--ব্যাপকভাবে রাগসঙ্গীতের প্রচার, প্রসার এবং জনপ্রিয়করণে যার অবদান অমুল্য- এজন্য দুঃখ করেছিলেন।
- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ২৫
- গান গাইতে গাইতে সুরের মায়ায় বিভোর, আত্মহারা হয়ে গেলেন সুরের মায়াবী ফৈয়াজ। আমার মনে হতে লাগলো যান্ত্রিক মাধ্যমের কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে ফৈয়াজের গান যারা শোনেন নি, তারা এক দুর্লভ অভিজ্ঞতার সৌভাগ্য থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত।
- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ৩০
- আবদুল করিম খাঁ সাহেব শ্রীঅরবিন্দকে গান শোনাবার জন্য শিষ্যবৃন্দসহ ট্রেনে পন্ডিচেরি অভিমুখে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু পণ্ডিচেরি যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হলো না। মাঝপথে অসুস্থ বোধ করে নেমে পড়লেন একটি স্টেশনে। বললেন, “ও অখত আ গিয়া” অর্থাৎ 'সময় এসে গেছে”। সময় মানে মর্তভূমি থেকে শেষ বিদায় নেবার সময়৷ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের ওপর বিছানো হলো চাদর। শেষ নামাজ পড়লেন আবদুল করিম। তানপুরার তারের ঝংকারে মিলিয়ে সঙ্গীতে শেষ প্রার্থনা জানালেন পরমেশ্বরকে, তারপর অন্তর্ধামে চলে গেলেন মরদেহ ছেড়ে, তারিখ ২৭শে অক্টোবর, ১৯৩৭। হিন্দুস্থানী রাগ সঙ্গীতের ইতিহাসে বিষণ্ণতম তারিখ।
- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ৩৫
- ...অমর কথা শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে যখন একজন নামজাদা গায়কের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, “শরৎবাবু চলুন ওঁর গান শুনে আসি। উনি বড় ভাল গান” তখন শরৎবাবু প্রশ্ন করেছিলেন “ভাল গান তা-তো বুঝলাম ৷ কিন্ত থামতে জানেন তো?”
- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ৭৭
- মহাকবি-মহানাট্যকার শেক্সপীয়ার লিখেছিলেন সুর সঙ্গীত যার মধ্যে নেই, সঙ্গীতের মাধুর্য যার মনে সাড়া জাগায় না, তার দ্বারা যেকোন রকম অপকর্ম সাধিত হতে পারে। আর ওস্তাদজি বললেন সুর যার মধ্যে আছে, তার দ্বারা কোন গর্হিত অপরাধ সংঘটিত হতে পারে না।
- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ৮৫
- গুলাম আলী এসেছিলেন, গুলাম আলী চলে গেছেন, তাকে আর কখনো ফিরে পাব না।
বিরাটের যুগ বিগত, এখন চলছে মাঝারির যুগ, গানের জগতে আমরা বড় গুণী হয়ত পাব, কিন্তু খাঁ সাহেবের মত বিরাট পুরুষকে পাব বলে মনে হয় না। যদিও বা পাই, তার মধ্যে গুলাম আলীকে পাব না। প্রত্যেক সার্থক গুণীই অনন্য ইংরাজীতে যাকে বলে 'ইউনিক' (unique) তাঁর কোন বিকল্প নেই। এক গুণীর অভাব অন্যগুণীকে দিয়ে মেটে না।- ওস্তাদ কাহিনী, পৃষ্ঠা ১১২
- ভারতে হিন্দুস্থানী রাগ-সঙ্গীতের জগতে বিশিষ্ট মুসলিম শিল্পী এবং গুরুরাই 'ওস্তাদ' নামে অভিহিত হন; হিন্দু সঙ্গীতাচার্যেরা ওস্তাদ নামে অভিহিত হন না, শিষ্যরা তাদের বলেন 'গুরুজি'।
- ওস্তাদ ভীষ্মদেব রহস্য, পৃষ্ঠা ১১৩
- এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ভীম্মদেবের 'তব লাগি ব্যথা' ও 'নবারুণ রাগে' এই ছুটি বাংলা এবং “মতি মালনিয়া” ও “দুখবা ম্যায় কাসে” এই দুটি হিন্দী গানের রেকর্ড জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিভাগের সংগ্রহে (UNESCO) আছে।
- ওস্তাদ ভীষ্মদেব রহস্য, পৃষ্ঠা ১২১
- দেহের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণের ফলে অসুস্থ ভীম্মদেবকে ২রা অগাস্ট, ১৯১৭ রাত্রে শেঠ সুখলাল কারনানি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলো। ৮ই অগাস্ট, ১৯১৭ তারিখে হিংসা, দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতায় ভরা এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন ভারতের সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তীর মহান নায়ক ওস্তাদ ভীম্মদেব চট্রোপাধ্যায়।
- ওস্তাদ ভীম্মদেব রহস্য, পৃষ্ঠা ১৩১
- ১৯১৫ পালে তিনি দিল্লীর সঙ্গীত নাটক আকাদেমির ফেলে। নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯১৫ সালে 'পদ্মশ্রী' উপাধি প্রাপ্তির জন্য তিনি মনোনীত হয়েছিলেন, কিন্ত জীবন-সায়াহ্নে এই বহু-বিলম্বিত সরকারী সম্মান অসম্মানেরই নামান্তর মনে করে তিনি উপাধিটি প্রতাখ্যান করেছিলেন। প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নেবার আগে তিনি একমাত্র পুত্র মানসকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি এই সরকারী সম্মান প্রত্যাখ্যান করলে তা ভবিষ্যতে তার সন্তান বলে মানসের অনুরূপ সরকারী সম্মান প্রাপ্তির পথে বাধা হতে পারে, সেই সম্ভাবনার কথা ভেবে এক্ষেত্রে তার কি করা উচিত?
মানস বলেছিল, “পিতার সম্মান সন্তানের কাছে তার নিজের ভবিষ্যতের চাইতে অনেক বড়ো। তোমার সম্মান যাতে একটুও ক্ষুণ্ন না হয় তুমি তাই করো।”
পুত্রের সম্মতি পেয়ে সঙ্গীতাচার্য পদ্মশ্রী উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।- সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী, পৃষ্ঠা ১৮০
শকুন্তলা স্যানাটোরিয়াম
[সম্পাদনা]শকুন্তলা স্যানাটোরিয়াম, কল্লোল প্রকাশনী
- "আপনি অকারণ দুঃখ পাবেন না প্রফেসর। সরকারী বেসরকারী দপ্তরে অনেক গদী অনেক চেয়ার দেখেছি, অনেক সভায় সম্মেলনে সমিতিতে অনেক বজ্র-বচন শুনেছি, গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আপনার গাধা-ই একমাত্র গাধা নয় যে পালিয়ে ভোল ফিরিয়েছে। 'চক্রবৎ পরিবর্তন্তে' জানেন তো? এখন গাধাদের দিন পড়েছে, অস্বীকার করলে চলবে কেন?”
- পৃষ্ঠা ৮
- “ঐসা খেল কোই গাধাকো শিখানা কোইকো পিতাকা সাধ্যমে নেই কুলায়গা। আপ ভাবতা হ্যায় হাম আপন ঢাক আপনা হাতমে পিটাতা? হা, পিটাতা হ্যায়, অম্লান বদনমে হাম স্বীকার করেগা। এ যুগমে আপনা ঢাক আপনি নেহি পিটানেসে কোই নেহি পিটায়গা শেঠজী।”
- পৃষ্ঠা ৯
- ভবিতব্যের কলম কেউ রোধ করতে পারে না, এই তত্ত্ব উর্দুঝংকৃত হিন্দী ভাষায় পরিবেশন করলেন শেঠজী। মনে হল এই তত্বের সত্যতা তিনি উপলব্ধি করেছেন নিজেরই জীবনে।
- পৃষ্ঠা ১০
- অবাক হয়ে তাকালাম প্রফেসর ট্যালপেট্রোর মুখের দিকে। একটি কথায় তিনি যেন বিংশ শতাব্দীর অন্তরের একটি জানালা ভেতরের দিকে খুলে দিলেন। ঢাক পিটানা খতম তো গৌরব ভী খতম! হায়রে ঢাক পিটিয়ে অর্জন করা, ঢাক পিটিয়ে বাঁচিয়ে রাখা গৌরব!
- পৃষ্ঠা ১৪
- “দুনিয়ার অনেক সত্য কথাই সোজা করে বললে এমনি বিস্ময় জাগায় ধনপতি। পাছে ভুল ভেঙে যায় এই ভয়ে সত্যকে তাই অনেকে প্রাণপণে এড়িয়ে থাকে। কিন্তু ঐ যে বললে যা ভোলা যায় তা প্রথম প্রেম নয়, ওতে তোমার একটা বড় রকমের সন্দেহ প্রকাশ পেয়েছে। তুমি ভাবছো, আমি তিলোত্তমার প্রেমে পড়িনি । ভুল, ভুল, সে তোমার ভুল, ধনপতি। তার প্রেমে পড়েছিলাম, আকণ্ঠ ডুবেছিলাম তার প্রেমে, এও যেমন সত্য, তারপর তাকে একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম, এও ঠিক তেমনি সত্য। এতে এতটুকু সন্দেহ কোরো না। মাসের পর মাস গেছে, বছরের পর বছর, একবারও মনে হয়নি তিলোত্তমার কথা । এতদিন পর আজ মনে পড়ল আজকের এই কাগজে শ্রীরামপুরের উকীল মহেশ্বর চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদ দেখে।”
- পৃষ্ঠা ৩৮
- “তুমি ঠিকই বলেছ ধনপতি। বিধাতা মাঝে মাঝে বড় যাচ্ছেতাই কাণ্ড করে বসেন। সেন্টিমেন্টের বালাই একদম নেই বিধাতার।”
- পৃষ্ঠা ৪৩
- বলে পাছে ওর কাহিনী শুনে অশ্রু সংবরণ করতে পারলে উনি মনে দুঃখ পান, সেই ভয়ে আমিও পরম উচ্ছ্বাসের ভান করে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে শুরু করলাম।
- পৃষ্ঠা ৫০
- জনাইর সরাইখানায় 'ভিতরে মা-জননীদের বসিয়া খাইবার ব্যবস্থা আছে', কিন্তু মা-জননীদের এ সুযোগ নিতে দেখা যায় না, সরাইখানায় বাবা জনকদেরই একচেটিয়া আড্ডা।
- পৃষ্ঠা ৫২
- সোনার চাবুকের মার কিছু সোনালী নয়।
- পৃষ্ঠা ৮৫
- আমার ইহলোকের একচল্লিশজন পাওনাদার হাল ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে, তারা আর এখান পর্যস্ত ধাওয়া করবে না। কিন্ত আমার পরলোকের পূর্বপুরুষদের হামলা বেড়েই চলেছে দাদা। তারা যেখানে যখন খুশি অনায়াসে যেতে পারেন, একটি আধলা খরচ নেই। ফি শনিরারে এক পুরুষ আগেকার পূর্বপুরুষ এসে তাঁর ঋণের বোঝা চাপিয়ে খাচ্ছেন আমার ওপর। গেল শনিবারে যিনি এসেছিলেন, তান নাম মকরধ্বজ ভো্গালী। আমি হচ্ছি তার নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাতির নাভির নাতি। পঁয়তাল্লিশ পুরুষের চক্রবৃদ্ধি ঋণের বোঝা চেপেছে আমার ঘাড়ে--সে যে হিসেব করলে কত লাখ টাকায় দাঁড়াবে তা বলা শক্ত।
- পৃষ্ঠা ৯২
- “জানিনে আছে কিনা। জানিনে কি উপায় আছে। এই শুধু জানি যে যাদের আসল ঠাঁই স্যানাটোরিয়ামে, তাদের অনেককেই স্যানাটোরিয়ামে না পাঠিয়ে বিধাতা বসান বহু-জনভাগ্যবিধাতা কর্ণধারের গদিতে। বিধাতার সেই উন্মাদ খামখেয়ালের মাশুল জুগিয়ে মরে অগুনতি হতভাগ্য শিশু-বৃদ্ধ-নর-নারী। আহা যদি এই কর্ণধারদের কোনোরকমে ভুলিয়ে ভালিয়ে স্যানাটোরিয়ামে পাঠানো যেত!”
- পৃষ্ঠা ১৪১
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় অজিতকৃষ্ণ বসু সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।