অজিত দত্ত
অবয়ব
অজিতকুমার দত্ত (২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯০৭ - ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৭৯) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং অধ্যাপক।
উক্তি
[সম্পাদনা]জনান্তিকে
[সম্পাদনা]জনান্তিকে, দিগন্ত পাব্লিশার্স
- বন্ধুবান্ধবরা আমাকে কুড়ে বলে' আত্মপ্রসাদ উপভোগ করে। তা করুক। অন্যকে গাল দেওয়া মানেই তুলনায় নিজেকে খানিকটা বড় করা কিনা! যেন কুড়ে হতে সকলেই পারে। বাইরের প্রকৃতি, এমনকি দালান-কোঠা, যন্ত্রপাতি-চোখ মেলে তাকালে যা কিছু চোখে পড়ে-তার সঙ্গে অন্তরের একটা অবিচ্ছেদ্য অনির্বচনীয় মিল না থাকলে কেউ কোনোদিন সত্যিকারের আলসেমি করতে পেরেছে?
- ভ্রমণ কাহিনীর ভূমিকা, পৃষ্ঠা ৩
- ক্যামেরা নিয়ে ফোটোগ্রাফার ওই মাঠের থেকে হাজারো ছবির টুকরো কুড়িয়ে আনতে পারে, কেননা ওই মাঠের যে রূপ সে তো ক্ষণে বদলায় মানুষের পদক্ষেপে। আমি হেঁটে গেলে গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে আমাকে সুদ্ধ যে-ছবিটা চোখে পড়বে, একটু পরেই হাসতে হাসতে তিনটি মেয়ে যখন ঐ পথ ধরেই যাবে তখন আর একটা গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলেই দেখতে পাবেন বিলকুল আলাদা ছবি, যেন আরেক দেশ।
- ভ্রমণ কাহিনীর ভূমিকা, পৃষ্ঠা ৫
- আত্ম-শ্রেষ্টত্বের গভীর প্রত্যয়ে সে এমনি মশগুল যে অন্য দেশ বা প্রদেশকে নিন্দে করার আগে সে-সব দেশ-প্রদেশের সম্বন্ধে সামান্য সাধারণ জ্ঞান আহরণ করাও সে প্রয়োজন মনে করে না।
- সঙ্গীত ও বিনয়, পৃষ্ঠা ৭
- সঙ্গীতের সঙ্গে বিনয়ের এ অবিচ্ছেদ্য যোগ কী করে কবে থেকে সৃষ্টি হয়েছে জানবার উপায় নেই, কিন্তু এখন এটা দাড়িয়ে গেছে একটা অলঙ্ঘ ব্যবহারিক রীতিতে। এমন কি সুকুমার রায় তার হযবরল-্তে যে অপরূপ ন্যাড়াকে একেছেন, সে যদিও সর্বদাই লোককে গান শোনাবার জন্যই ব্যগ্র, তবু প্রথমেই, অনুরুদ্ধ হবার আগে থেকেই সে বলে নেয়, 'না ভাই, এখন আমায় গাইতে বোলো না। সত্যি বলছি, আজকে আমার গলা তেমন খুলবে না।'
- সঙ্গীত ও বিনয়, পৃষ্ঠা ৯
- অমার অসংখ্য অক্ষমতার কথা ভেবে আমি নিজেই অনেক সময় অবাক হয়ে যাই। একটা লোকের পক্ষে যে কতগুলো বিষয়ে অনাড়ি হওয়া সম্ভব আমি তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্ত তবুও এনিয়ে মনে কোনোদিন গভীর কোনো আক্ষেপ অনুভব করেছি বলে' মনে পড়ে না। আমি কী পারি আর কী কী-পারিনা এমনিতরো কাজের একটা তুলনামূলক তালিকা পর্যস্ত মনে মনে কখনো তৈরি করিনি। জীবন-সংগ্রামে আমি মহারথী, রথী এমনকি গজারোহী-অশ্বারোহীও নই - এ-সত্য অনেকদিন আগেই এমন সহজভাবে মেনে নিয়েছিলাম যে অক্ষমতার কোনো দুঃখকেই কাছে ঘেঁসবার সুযোগ দিইনি। কিন্তু তবু, এমন বেপরোয়া যে আমি, সেই আমিও আমার একটিমাত্র অক্ষমতার কথা ভেবে অনেক সময় দুঃখ অনুভব করি। আমার সেই অতুলনীয় অক্ষমতা এই যে আমি একেবারেই তর্ক করতে পারি না।
- তর্ক ও তার্কিক, পৃষ্ঠা ১৮
- 'পাত্রাধার কি তৈল কিন্বা তৈলাধার কি পাত্র' এই হচ্ছে তর্কের খাঁটি আদর্শ। বীজ আগে না গাছ আগে - এই হচ্ছে আদি ও অকৃত্রিম তর্ক। কেননা এ-তর্কের আর শেষ নাই। এবং যতই শেষ হয় না, ততই কৃতী তার্কিকের গলা চড়ে। শেষ পর্যন্ত কণ্ঠের তীক্ষতায় ও ধৈর্যের উৎকর্ষে একজন জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসেন - নয়তো দু'পক্ষই এই আনন্দ নিয়ে ক্ষান্ত হন যে আমিই জিতলাম।
এরাই হচ্ছেন খাঁটি তার্কিক, এরাই নমস্য।- তর্ক ও তার্কিক, পৃষ্ঠা ২৫
- প্রকৃতই সময় দিয়ে জীবনের মুল্য যাচাই করবার মতো হাস্যকর আর কিছুই হতে পারে না।
- ঘড়ি, পৃষ্ঠা ৩৮
- একথা স্বীকার করতে আমি মোটেই লজ্জিত নই যে ভূতকে আমি যত ভয় করি, তার চেয়ে অসংখ্য গুণ বেশি ভয় করি কয়লা-ওয়ালা, কাপড়ওয়ালা ও তেলওয়ালাকে। কেন না এরা জীবনকে যেরূপ বিভীষিকাময় করে তুলতে পারে, কোনো ভূতেরই সাধ্য নেই সেরূপ করে। এদের সঙ্গে প্রতি পদে পদেই সংঘাত, কিন্তু ভূতের সঙ্গে আমার কোনো বিবাদ নেই। বরং আমার মনের মধ্যে ভূতদের জন্য বিস্তৃত জায়গা করা আছে। যেরূপ এবং যত ভয়াবহ ভূতই আপনি নিয়ে আসুন না কেন, অসংকোচে সেখানে আমি তাকে ঠাঁই দিতে সর্বদাই প্রস্তুত। কেননা আমার বিশ্বাস ভূতের গল্পের শ্রবণ ও পঠন জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ বিলাস।
- ভূতের বিলোপ, পৃষ্ঠা ৪৮
- আশ্বাসের কথা এই যে, ত্রৈলোক্যনাথের উক্তি সত্য হলে গোঁগা প্রভৃতি ভূতগণ একেবারে লোপ পায়নি, আমাদের মধ্যেই অন্যরূপে বিরাজ করছে। এটা কথঞ্চিৎ সান্ত্বনার কথা হলেও আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে ভূতের ভৌতিক কার্যকলাপই আমি পছন্দ করি, তাদের সাংবাদিক ও সাহিত্যিক তৎপরতা আমার পছন্দ নয়।
- ভূতের বিলোপ, পৃষ্ঠা ৫২
ছায়ার আলপনা
[সম্পাদনা]ছায়ার আলপনা, দিগন্ত পাব্লিশার্স
- যদি কোনোদিন কৌতুহলে
মনের ডুবুরি কোনো নামে এই হৃদয়ের জলে, খোঁজে যদি মনের গহীন,
হয়তো সেদিন-
হারানো সহস্র ক্ষণে, অসংখ্য নিমেষ
পাবে সে উদ্দেশ।
যে-আনন্দ বার বার এ-হৃদয়ে কেবলি হারাই
সে-সম্পদে হয়তো বা হবে তার তরণী বোঝাই॥- হারানো নিমেষ
- ধূসর সন্ধ্যার ছায়ে দু'নয়নে দৃষ্টি আজ ম্লান,
কভু ভাবি সবি আছে, কভু দেখি নিঃস্ব এ-পরাণ
তমসার জন্মান্তরে দিবসের উত্তরাধিকার
নিরুদ্দিষ্ট উচ্ছৃঙ্খল এই মনে পাবো কি আবার?- বৈকালী
- রামধনুরঙে মেশা এই নেশা অভিশাপ আনে,
ব্যর্থতায় মুছে যায় ধর্ম-অর্থ-সমাজ-সংসার।
ভুলের দ্বিতীয় স্বর্গ তবু গড়ে চলা বারবার,
স্রষ্টার যে প্রতিদ্বন্ধী মুক্তি তার আছে কোনখানে?
কৃতিত্ব কি কর্মে যার নাই দাম, নাই কোন মানে
নেশার সে নির্বাসনে খোঁজে চিরন্তন অধিকার॥
- নেশা
নাতিহ্রস্বদীর্ঘস্থুল, অনতিশীদোষ্ঞ, নাতিস্থির,
গুণে আর পরিসরে এবম্বিধ চৌকস মগজে
জনতা-নায়িকা সদা প্রাণমন সমপিয়া ভজে;
সর্বদা গলায় দড়ি পৃথিবীতে অতীব বুদ্ধির।
মধ্যম অধম এই ছুই পাটে গড়া যাঁতাটির
পেষণে উত্তম মাথা ডাল হয়ে সুধারসে মজে,
জনতা নামিনী বামা পেষে তারে জরুরি গরজে
নেতারূপী নায়কের অবিচ্ছিন্ন উদর পুর্তির।অতিসভ্য পৃথিবীতে সংক্ষেপে ইহারে কয় ভোট,
অত্যুচ্চ মস্তিক্ষগুলি চাটা খেয়ে ঢুকে যায় পেটে,
যত উগ্র কণ্ঠ আর যতই দুরন্ত বাহ্বাস্ফোট
জনতার স্বয়ম্বরে মালা পায় ততই নিরেটে।
গড্ডল প্রবাহ যবে মহোল্লাসে হয় এক জোট
গড্ডল-সর্দার সাথে কোন্ প্রতিদ্বন্দ্বী ওঠে এঁটে?- ভোট
- কেবল যখন
পৃথিবী ঘুমন্ত, স্তব্ধ শুন্য বাট, সৈকত নির্জন,
আকাশের ঢাকনার অন্তরাল থেকে কোনো রসিক নাগরে
তারার ঝাঝর! পথে রঙ নিয়ে হোলি খেলা করে,
তখন উদার মৌন গ্লানিহীন আকাশের তলে
মনীষা ও প্রতিভার প্রেতগুলি জোটে দলে দলে।
তখন ওরাও নাকি নিমন্ত্রণ পায়
মানুষের যৌবরাজ্য অভিষেকে জগৎ সভায়।
ভূয়োদর্শী বুদ্ধিমান ভাগ্যের বিধাতাগণ জানে
এ কথার সমর্থন নেই কোনো শাস্ত্রে ও পুরাণে ॥- প্রেতচরিত
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় অজিত দত্ত সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।