আগুনের পরশমণি (সিনেমা)
আগুনের পরশমণি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন চলচ্চিত্র, যা ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায়। এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। এই ছবির মাধ্যমে লেখক প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্র পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে নতুন ধারার সূচনা করেন।
চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনী একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের মাধ্যমে যুদ্ধের বিভীষিকা, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ এবং মানবিকতার গল্পকে তুলে ধরে। যুদ্ধের সময় এক গৃহে আশ্রয় নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পরিবারের আবেগ, দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের জটিল সম্পর্ক এই চলচ্চিত্রে বাস্তবধর্মীভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।
আসাদুজ্জামান নূর, অবন্তী ঘোষ, বিপাশা হায়াত, আহমেদ রুবেল প্রমুখের অনবদ্য অভিনয়ে চলচ্চিত্রটি বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। সঙ্গীত পরিচালনা করেন আযাদ রহমান, এবং এতে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসংগীত “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” পুরো চলচ্চিত্রের আবেগকে এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর ব্যাপক সমাদৃত হয় এবং একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। ‘‘আগুনের পরশমণি’’ শুধু একটি যুদ্ধের গল্প নয়; এটি মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা ও বাঙালির আত্মত্যাগের এক চিরন্তন প্রতিচ্ছবি।
এই ভুক্তি বা অনুচ্ছেদটি পরিবর্ধন বা বড় কোনো পুনর্গঠনের মধ্যে রয়েছে। এটির উন্নয়নের জন্য আপনার যে কোনো প্রকার সহায়তাকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। যদি এই ভুক্তি বা অনুচ্ছেদটি কয়েকদিনের জন্য সম্পাদনা করা না হয়, তাহলে অনুগ্রহপূর্বক এই টেমপ্লেটটি সরিয়ে ফেলুন। ২ মাস আগে Md Rashidul Hasan Biplob (আলাপ | অবদান) এই নিবন্ধটি সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন। (হালনাগাদ) |
পরিচালকের কথা
[সম্পাদনা]ছবি বানানোর গল্প বই থেকে নেওয়া
[সম্পাদনা]- সিনেমা করার জন্যে আগুনের পরশমণি বেছে নেয়ার প্রধান কারণ হল, এটি আমার অতি প্রিয় একটি গল্প। অপ্রধান কিছু কারণ আছে যেমন এটি মহান মুক্তিযুদ্ধের গল্প। পুরো গল্পটি একটা সেটে বলা হয়েছে—মধ্যবিত্ত পরিবারের একতলা একটি বাড়িতে কয়েকদিনের ঘটনা। অল্প পাত্র-পাত্রী, বিশাল আয়োজনের দরকার নেই।
- পৃষ্ঠা ১৯
- আগুনের পরশমণি আমার লেখা প্রথম চিত্রনাট্য নয়। শঙ্খনীল কারাগার ছবির কাহিনী ও চিত্রনাট্যও আমার। অনেকে বলেছেন, সেটি নাটক নাটক মনে হয়েছে—দুই ঘন্টার সিনেমায় এক ঘন্টার নাটক দেখেছেন; চলচ্চিত্রের ভাষা ব্যবহার হয়নি।
- পৃষ্ঠা ২০
- ভোর পাঁচটায় ঘুমিয়ে দশটায় উঠলাম। আগুনের পরশমণির চা না খেয়ে চিত্রনাট্য হাতে সেক্রেটারিয়েটে গেলাম। তথ্যমন্ত্রীকে বোঝাব বাংলাদেশের উচিত এই মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে সাহায্য করা।
- পৃষ্ঠা ২২
গুণীজনের মন্ত্যব্য
[সম্পাদনা]- ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিটি দেখে আমি অভিভূত। একাত্তরের অবরুদ্ধ নগরীর প্রতিহিংসা, আবেগ, আকুতি, ভালোবাসা আর ঘৃণার এ এক বিশ্বস্ত দলিল। আমাদের চেতনার শিখাকে প্রদীপ্ত রাখার জন্যে এমন শিল্পসার্থক নির্মাণেরই প্রয়োজন।
- অধ্যাপক মোঃ শমিসুল হক, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন
- ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এ ছবি দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেবে এবং সে আগুনের স্পর্শে আমরা সবাই সোনার মতো খাঁটি হবো। নতুন করে স্বাধীনতার মর্ম অনুধাবন করতে পারবো।’
- প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন উর-রশিদ, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমী
- মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের একটি পরিবারকে নিয়ে ‘আগুনের পরশমণি’ তৈরি হয়েছে। ছায়াছবির পরিভাষায় এটা কতটুকু ছবি হয়েছে সে আলোচনায় না গিয়েও নির্দ্বিধায় বলা যায়—এটি একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও হৃদয়স্পর্শী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি।
- সাপ্তাহিক যায়যায়দিন, ঢাকা
- অবলুপ্ত চৈতন্যের স্বাক্ষর—‘আগুনের পরশমণি’। হুমায়ূন আহমেদ দর্শকের মনে অহেতুক আতিশয্যের কোনো সুড়সুড়ি দিতে চাননি। ছবিটি অহেতুক রোমান্টিকধর্মী করে কিংবা যুদ্ধের ভয়াবহতার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে নয়—সর্বত্রই পরিমিতিবোধ দর্শককে আশ্বস্ত রেখেছে।
- দৈনিক সংবাদ, ঢাকা
- ‘আগুনের পরশমণি’ হৃদয়ে ঝড় তোলার মতো ছবি। মানুষ এখনো মুক্তিযুদ্ধের যে কোনো কিছুতেই সমান আলোড়িত হয়। তাঁদের মধ্যে সেই চেতনা এখনো বিদ্যমান। ‘আগুনের পরশমণি’ সেই প্রমাণ রেখেছে।
- দৈনিক খবর, ঢাকা
- হুমায়ূন আহমেদ ‘আগুনের পরশমণি’ করে একজন শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার এবং সেই সঙ্গে দেশপ্রেমিকের পরিচয় দিয়েছেন।
- ভোরের কাগজ, ঢাকা
- ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দলিল।
- দৈনিক পূর্বকোণ, চট্টগ্রাম
- দুই ঘণ্টার ছবি ‘আগুনের পরশমণি’। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও ছবির মধ্যে কোনো ছন্দপতন হয়নি। প্রতিটি সংলাপকে মনে হয়েছে ছবির জন্য যথাযথ। সব মিলিয়ে ‘আগুনের পরশমণি’ একটি বাস্তব চিত্র।
- সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, ঢাকা
- ‘আগুনের পরশমণি’ ছবির কাহিনীর মধ্যে দিয়ে পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের সেই বিক্ষুব্ধ, অসহনীয় অবস্থার মধ্যেও রোমান্টিকতা এনেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের ছবি হিসেবে ‘আগুনের পরশমণি’ একটি ইতিহাসকে তুলে ধরেছে—যা আমাদের গর্বের ইতিহাস।
- দৈনিক বাংলা, ঢাকা
- ‘আগুনের পরশমণি’ ছবি তৈরির জন্য হুমায়ূন আহমেদকে ধন্যবাদ। বাঙালি তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকবে চিরদিন। একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধকে চিত্রায়িত করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁদের বিশ্বাসকেও ধারণ করেছেন। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে অবহেলা বা কটাক্ষ করেননি।
- বাংলাবাজার পত্রিকা, ঢাকা
- এত বড় মাপের ছবি বাংলাদেশে আগে কখনো হয়নি। জানি না সামনে কেউ আসবেন কিনা এরকম ছবি বানানোর মেধা নিয়ে।
- কবীর আনোয়ার, চলচ্চিত্র পরিচালক
- মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘আগুনের পরশমণি’—এবং এই আগুনটাও প্রতীকী। দ্বিবিধ ব্যাখ্যা হতে পারে এর—যুদ্ধের আগুন এবং স্বাধীনতার প্রভাত সূর্যের উত্তাপ। বাংলা শো অপেরার সিনেম্যাটিক ভার্সান তৈরির এক প্রচেষ্টা এতে লক্ষণীয়। দৃশ্যান্তরের সিনেম্যাটিক স্বাভাবিক দূরত্বকে পরিহার করে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন পুরো কাহিনিতে। যুদ্ধের উন্মত্ততা ও জিঘাংসা তীব্র নয়, কিন্তু তীক্ষ্ম।
- দৈনিক জনকণ্ঠ, ঢাকা
- ‘বদি আলম ও আমি ২৮ নং রোডের একটি অফিসবাড়িতে থাকতাম ’৭১ সালে। আপনার ‘আগুনের পরশমণি’ ছবির বদি, আমাদের বদি? তার নামও ছিল বদিউল আলম। সেদিন এফডিসিতে ছবিটি দেখলাম—আলম, ফতে ও আমি। বদিকে বারবার মনে পড়ছিল। আমার মনে হলো, আলমই কি বদি অথবা ফতে? এমন হতে পারতো না—আমিই আপনার বদি? সবাই চোখের পানি ফেলছে আমার জন্যে? পাশে বসা আমার স্ত্রী দু’বার আমার হাত চেপে ধরেছিল, ডুকরে কেঁদেছিল—তাকি আমার জন্যে? ছবির শেষে অবাক হয়ে আমাদের দেখছে; দেখছে আমি বেঁচে আছি। আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি? বদি কিন্তু বেঁচে থাকবে আপনার ‘আগুনের পরশমণি’তে—আমাদের আগুনের স্পর্শ দিতে। বদি বেঁচে আছে।’
- শাহাদত চৌধুরী, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ঢাকা
- বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের পরিচালিত একমাত্র ছবি ‘আগুনের পরশমণি’। যদিও ছবি দেখে সে কথাটা একবারও মনে হয়নি। ছবির প্রথম দিকটা কিছুটা অসংলগ্ন মনে হলেও পরিণত দৃশ্য পরিকল্পনা ও ঘটনাপ্রবাহে সময়ের সঙ্গে মুগ্ধ হতে হয়েছে। বাইরের দৃশ্যের তুলনায় ঘরোয়া পরিবেশে অনেক বেশি সুপরিচালনার ছাপ রেখেছেন পরিচালক। অভিনয়শিল্পীরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র অভিব্যক্তির জন্য মনে দাগ রেখেছেন। গানের ব্যবহার বিশেষভাবে প্রশংসনীয়—বিশেষত পরিস্থিতি অনুযায়ী রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োগ।
- ত্রিদিব ঘোষ, কলকাতা
- প্রেম আর যুদ্ধের একাকার হয়ে ওঠা ছায়াছবি ‘আগুনের পরশমণি’। বাংলাদেশের ছবি। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—প্রকৃতি, মানুষ, প্রেম-বিরহ, স্বদেশপ্রেমের মিলিত বন্ধন। দৃশ্যপট পরিমিতিবোধের দাবীদার। যুদ্ধের বিভীষিকার বিস্তর উদাহরণ ছড়িয়ে আছে ছবিটিতে, যা দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। এক বিশেষ সময়কে ধারণ করলেও এটি মানবিক ঘাত-প্রতিঘাতে কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে।
- সমীরণ দত্ত গুপ্ত, কলকাতা
- হুমায়ূন আহমেদ একজন নামী লেখক, এবং তিনি ভালো মানের ছবি তৈরি করেন। বর্তমান উৎসবে প্রদর্শিত হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিটিকে সাহায্য করেছিল সরকার। সাফল্য এসেছে হাতে হাতে।
- দেবাশিস চৌধুরী, কলকাতা