আবদুলরাজাক গুরনাহ

আবদুলরাজাক গুরনাহ (জন্ম: ২০ ডিসেম্বর ১৯৪৮) হলেন তানজানিয়ায় জন্মগ্রহণকারী একজন ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক এবং শিক্ষাবিদ। তিনি জাঞ্জিবার সালতানাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬০-এর দশকে জাঞ্জিবার বিপ্লবের সময় শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে চলে যান। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইস (Paradise, ১৯৯৪), যা বুকার এবং হুইটব্রেড উভয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল; বাই দ্য সি (By the Sea, ২০০১), যা বুকার পুরস্কারের দীর্ঘতালিকায় এবং 'লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস' বুক প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল; এবং ডেজারশন (Desertion, ২০০৫), যা কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়।
"ঔপনিবেশিকতার প্রভাব এবং সংস্কৃতি ও মহাদেশের মধ্যবর্তী ব্যবধানে শরণার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে তাঁর আপসহীন এবং সহানুভূতিশীল লেখনীর জন্য" তাঁকে ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তিনি কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও পোস্ট-কলোনিয়াল লিটারেচার বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক।
উক্তি
[সম্পাদনা]নোবেল বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার (২০২১)
[সম্পাদনা]- "আমাদের ইতিহাস ছিল খণ্ডিত, যা অনেক নিষ্ঠুরতার বিষয়ে নীরব ছিল।"
- "নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতা নিয়ে লেখা প্রয়োজন ছিল, যা আমাদের শাসকরা আত্মতুষ্টির আড়ালে আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।"
- "লিখালিখি কেবল লড়াই বা বিতর্কের বিষয় হতে পারে না, তা যতই উদ্দীপনাময় বা সান্ত্বনাদায়ক হোক না কেন। লেখা কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা সমস্যার ওপর সীমাবদ্ধ নয়; যেহেতু এর মূল বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে মানুষের জীবন, তাই আজ হোক বা কাল নিষ্ঠুরতা, ভালোবাসা এবং দুর্বলতা এর উপজীব্য হয়ে ওঠে। আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্যের কাজ এটিও দেখানো যে জীবন অন্যরকমও হতে পারে; যা দাপুটে আধিপত্যবাদী চোখ দেখতে পায় না, যা বাহ্যিকভাবে ক্ষুদ্র মানুষকে অন্যদের অবজ্ঞা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।"
- "পড়ার মাঝে আনন্দ পেতে শিখেছি কেবল গল্পের প্রতি ভালোবাসার কারণে।"
- "লেখালিখিকে আমি স্রেফ নিছক মজা হিসেবে দেখি না। আমি মনে করি এর পেছনে একটি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে... প্রতিদিন এমন কিছু বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয় যা নিয়ে কথা বলা বা অনুসন্ধান করা জরুরি। আমার জন্য এটাই চালিকাশক্তি—আমি যা দেখি তা নিয়ে কথা বলা।"
- "সাহিত্যে বৈচিত্র্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? আমি মনে করি, অন্য মানুষ কীভাবে বাঁচে এবং কী তাদের অনুপ্রাণিত বা সুখী-অসুখী করে তা বোঝার জন্য আপনাকে অন্য মানুষ সম্পর্কে জানতে হবে। বিষয়টি আসলে এতটাই সহজ।"
- "সাহিত্যের সেরা মুহূর্ত হলো যখন আপনি ভাবেন, হ্যাঁ, এটা শেষ হয়েছে... লেখা তখনই সবচেয়ে সার্থক যখন এটি সম্পূর্ণ হয়।"
- "আমাকে যা লিখতে অনুপ্রাণিত করে তা হলো—আমি যা দেখি এবং যে বিষয়গুলো আমাকে ভাবায় সে সম্পর্কে সত্য কথা বলতে পারা। আমি এতে খুব আগ্রহী যে মানুষ কীভাবে ট্রমা বা মানসিক আঘাত থেকে নিজেকে পুনরুদ্ধার করে; কেবল আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থীদের ক্ষেত্রে নয়, বরং জীবনের সবক্ষেত্রেই মানুষ কীভাবে দুর্ভাগ্য ও ট্র্যাজেডি থেকে বেরিয়ে আসে।"
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাথে সাক্ষাৎকার (২০২১)
[সম্পাদনা]- "এটি আমাদের সময়ের এক বিশাল আখ্যান—মানুষকে তাদের উৎপত্তিস্থল থেকে দূরে গিয়ে পুনরায় জীবন গঠন করতে হচ্ছে। এর অনেকগুলো দিক রয়েছে। তারা কী মনে রাখে? তারা তাদের স্মৃতির সাথে কীভাবে মানিয়ে নেয়? তারা যা পায় তার সাথে কীভাবে মানিয়ে নেয়? কিংবা, আসলে তাদের কীভাবে গ্রহণ করা হয়?"
- "আমি যখন এখানে (যুক্তরাজ্যে) খুব অল্প বয়সে এসেছিলাম, তখন মানুষ আমাদের মুখের ওপর এমন সব শব্দ বলতে দ্বিধাবোধ করত না যা এখন আমরা আপত্তিকর মনে করি। সেই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি তখন অনেক বেশি ব্যাপক ছিল। আপনি বাসে চড়লে এমন কিছুর মুখোমুখি হতেন যা আপনাকে সংকুচিত করে ফেলত।"
- "বিপন্ন অবস্থা থেকেই আমার লেখার শুরু; সেই দারিদ্র্য, ঘরহীনতা, অদক্ষতা আর অশিক্ষা থেকে। সেই দুরবস্থা থেকেই আপনি কিছু লিখতে শুরু করেন। বিষয়টি এমন ছিল না যে—আমি একটি উপন্যাস লিখছি। কিন্তু এই লেখাগুলো বাড়তে থাকল। তারপর একসময় এটি 'সাহিত্য' হয়ে উঠল কারণ আপনাকে চিন্তা করতে হয়, কাঠামো দিতে হয় এবং আকৃতি দিতে হয়।"
"ভয় এবং ঘৃণা" (২০০১)
[সম্পাদনা]- "আমি সেই ভয়াবহ ঝুঁকির কথা মনে রাখতে চাই যা মানুষ পালিয়ে বাঁচার জন্য গ্রহণ করে। আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি মানুষ মাছ ধরার নৌকায় গাদাগাদি করে আছে, ডিঙি নৌকার পাশে ঝুলে আছে কিংবা স্রেফ কাষ্ঠখণ্ডের ওপর ভেসে আছে। মানুষ এসব ঝুঁকি নেয় কারণ তারা তাদের প্রাণের ভয় পায়। এমন আতঙ্কে থাকা একটি তর্কাতীত ও ভয়াবহ বিষয়।"
- "আমি কী পরিমাণ ঘৃণার পাত্র ছিলাম তা আবিষ্কার করা ছিল এক বড় ধাক্কা: মানুষের চাহনি, উপহাস, কথা ও অঙ্গভঙ্গি, সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা টেলিভিশনের কমেডিতে তা ফুটে উঠত। সবাই নিজের অংশটুকু করত এবং নিজেদের সহনশীল মনে করত। যদি আমার ফিরে যাওয়ার কোনো জায়গা থাকত, তবে আমি চলে যেতাম।"
- "আশ্রয় বা রিফিউজি নিয়ে বিতর্কের সাথে বর্ণবাদের একটি প্যারানয়েড বয়ান যুক্ত থাকে, যা বিদেশি ভূমি বা সাংস্কৃতিক অখণ্ডতার দোহাই দিয়ে ছদ্মবেশে প্রচার করা হয়। এই বিতর্কটি পরিচালনা করার একটি যৌক্তিক ও মানবিক উপায় আছে... সেই সুন্দর পথের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান এবং মনুষ্যত্ব, স্রেফ সস্তা আর হীন ক্লিশে বা গতানুগতিক কথা নয়।"
আবদুলরাজাক গুরনাহ সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- "তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আফ্রিকান লেখক... তাঁর লেখা বিশেষভাবে সুন্দর, গম্ভীর এবং একইসাথে হাস্যরসাত্মক, দয়ালু ও সংবেদনশীল। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে লেখা একজন অসাধারণ লেখক।"
- আলেকজান্দ্রা প্রিংগল, ২০২১ সালে গুরনাহর নোবেল জয়ের পর।