আর্নেস্ট বেকার
অবয়ব

আর্নেস্ট বেকার (২৭ সেপ্টেম্বর ১৯২৪ – ৬ মার্চ ১৯৭৪) ছিলেন একজন মার্কিন সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী এবং আন্তঃবিষয়ক চিন্তাবিদ। ১৯৭৪ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া দ্য ডিনায়াল অফ ডেথ বইটির জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
উক্তি
[সম্পাদনা]দ্য বার্থ অ্যান্ড ডেথ অফ মিনিং: অ্যান ইন্টারডিসিপ্লিনারি পার্সপেক্টিভ অন দ্য প্রবলেম অফ ম্যান (১৯৬২)
[সম্পাদনা]২য় সংস্করণ, নিউ ইয়র্ক: দ্য ফ্রি প্রেস। ১৯৭১। আইএসবিএন ৯৭৮-০০২৯০২১৯০৩ অকার্যকর অকার্যকর।
- আমরা আমাদের নিজেদের শিল্পেরই শিকারে পরিণত হয়েছি। আমরা মানুষের শরীরের বাইরের অংশ স্পর্শ করি, তারাও আমাদের করে। কিন্তু আমরা কারো মনের ভেতরে পৌঁছাতে পারি না এবং আমাদের ভেতরটাও কাউকে দেখাতে পারি না। আমাদের অন্তর্জগতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল এটাই—এটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত এবং কাউকে বোঝানো যায় না। প্রায়ই আমরা জীবনসঙ্গী, বাবা-মা কিংবা কোনো বন্ধুর কাছে খুব মনের গভীরের কথা বলতে চাই। সূর্যাস্ত দেখে আমাদের মনের অনুভূতি কেমন, অথবা আমরা আসলে কেমন মানুষ—তা বোঝাতে চাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বলাটা অদ্ভুতভাবে আর শোচনীয়ভাবে বিফলে যায়। মাঝেমধ্যে হয়তো আমরা সফল হই। কারো কাছে বেশি, কারো কাছে কম, আবার কারো কাছে হয়তো কখনোই সফল হই না। কিন্তু হঠাৎ ঘটা এই সাফল্য আসলে সাধারণ নিয়মটিকেই সত্যি বলে প্রমাণ করে। আপনি নিজের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে ব্যর্থ হন এবং একরাশ তিক্ততা নিয়ে আবার নিজের ভেতরেই গুটিয়ে যান।
- পৃষ্ঠা ২৭
দ্য ডিনায়াল অফ ডেথ (১৯৭৩)
[সম্পাদনা]নিউ ইয়র্ক: দ্য ফ্রি প্রেস। ১৯৭৫। আইএসবিএন ৯৭৮-০০২৯০২৩১০৫ অকার্যকর অকার্যকর।
- ডক্টর জনসন বলেছিলেন যে মৃত্যুর সম্ভাবনা মানুষের মনকে চমৎকারভাবে একাগ্র করে তোলে। এই বইয়ের মূল বক্তব্য হল এটি তার চেয়েও বেশি কিছু করে। মৃত্যুর চিন্তা আর এর ভয় মানুষকে এমনভাবে তাড়া করে ফেরে যা অন্য কিছু পারে না। এটি মানুষের কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি। মূলত মৃত্যুর অনিবার্য পরিণতিকে এড়ানোর জন্য এবং কোনোভাবে একে অস্বীকার করে জয় করার জন্যই মানুষ কাজ করে যায়। বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী এ. এম. হোকার্ট একবার দাবি করেছিলেন যে আদিম মানুষ মৃত্যুর ভয়ে বিচলিত ছিল না। নৃবৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মৃত্যু প্রায়ই আনন্দ আর উৎসবের অনুষঙ্গ ছিল। ভয় পাওয়ার বদলে মৃত্যুকে উদযাপনের একটি উপলক্ষ মনে করা হতো ঠিক যেমন ঐতিহ্যবাহী আইরিশ শোকানুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যায়। আধুনিক মানুষের তুলনায় আদিম মানুষরা শিশুসুলভ ছিল এবং তারা বাস্তবতাকে ভয় পেত হোকার্ট এই ধারণাটি দূর করতে চেয়েছিলেন। নৃবিজ্ঞানীরা এখন আদিম মানুষের সম্পর্কে এই ধারণাটি অনেকটাই বদলে দিতে পেরেছেন। কিন্তু এই যুক্তি সেই ধ্রুব সত্যটিকে স্পর্শ করে না যে মৃত্যুর ভয় আসলে মানবজীবনের একটি চিরন্তন সত্য। হোকার্ট এবং অন্য গবেষকরা যেমন দেখিয়েছেন, আদিম মানুষরা প্রায়ই মৃত্যুকে উদযাপন করত কারণ তারা বিশ্বাস করত যে মৃত্যু হল এক পরম উন্নতি। এটি জীবনের একটি উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর শেষ আনুষ্ঠানিক ধাপ, যেখানে কোনো না কোনোভাবে অনন্তকাল উপভোগ করা যায়। আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ এখন আর এটি বিশ্বাস করতে পারে না। আর এই কারণেই মৃত্যুর ভয় আমাদের মনস্তত্ত্বের একটি প্রধান অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- মুখবন্ধ
- আমাদের সময়ের জ্ঞানী মানুষ এমন এক বোঝার নিচে নুয়ে পড়েছেন যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি: সত্যের এমন এক অতি উৎপাদন যা আর গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
- মুখবন্ধ, পৃষ্ঠা ১০
- অমঙ্গল দূর করার জন্য আমাদের নেওয়া বীরত্বপূর্ণ কাজগুলো উল্টো ফল হিসেবে পৃথিবীতে আরও অমঙ্গল ডেকে আনে। মানুষের সংঘাতগুলো আসলে জীবন-মরণের লড়াই—আমার দেবতার বিরুদ্ধে আপনার দেবতা, আমার অমরত্বের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আপনার অমরত্বের পরিকল্পনা। মানুষের তৈরি এই অমঙ্গলের মূলে তার পশুর মতো স্বভাব, এলাকা দখলের চেষ্টা কিংবা সহজাত স্বার্থপরতা নেই। বরং এর কারণ হল আমাদের আত্মসম্মান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, নিজের মরণশীলতাকে অস্বীকার করা এবং এক বীরত্বের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা।
- ভূমিকা
ভূমিকা: মানব প্রকৃতি এবং বীরত্ব
[সম্পাদনা]- মানুষের বীরত্বপূর্ণ কাজের আকাঙ্ক্ষা বোঝার অন্যতম প্রধান ধারণা হল আত্মপ্রেম। এরিখ ফ্রম আমাদের যেমনটা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই ধারণাটি ফ্রয়েডের অন্যতম মহান এবং দীর্ঘস্থায়ী অবদান। ফ্রয়েড আবিষ্কার করেছিলেন যে আমরা প্রত্যেকেই গ্রিক পুরাণের নার্সিসাসের সেই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি করি: আমরা নিজেদের নিয়েই ভীষণভাবে মগ্ন থাকি। আমরা যদি কারো পরোয়া করি, তবে সাধারণত সবার আগে নিজেদের কথাই ভাবি। অ্যারিস্টটল কোথাও বলেছিলেন: ভাগ্য হল সেটাই, যখন আপনার পাশের লোকটির গায়ে তীর লাগে। ২৫০০ বছরের ইতিহাস মানুষের এই মৌলিক আত্মপ্রেমকে বদলাতে পারেনি। আমাদের বেশিরভাগের কাছে এখনো ভাগ্যের সংজ্ঞাটা এমনই। আত্মপ্রেমের একটি কুৎসিত দিক হল আমরা মনে করি যে নিজেকে ছাড়া বাকি সবাই আসলে ত্যাজ্য বা অপ্রয়োজনীয়। এমারসন একবার বলেছিলেন, আমাদের এমনভাবে প্রস্তুত থাকা উচিত যেন পৃথিবীতে আর কেউ না থাকলেও আমরা নিজেদের ভেতর থেকেই পুরো বিশ্বকে আবার তৈরি করে নিতে পারি। এই ভাবনাটা আমাদের ভয় দেখায়। আমরা জানি না অন্যদের ছাড়া কীভাবে এটা সম্ভব—তবুও গভীরে সেই মূল শক্তিটা রয়ে গেছে: প্রয়োজন পড়লে আমরা একাই যথেষ্ট হতে পারতাম, যদি আমরা এমারসনের কথামতো নিজেদের ওপর ভরসা করতে পারতাম। আর আবেগ দিয়ে আমরা যদি এই ভরসা অনুভব নাও করি, তবুও আমাদের চারপাশে যত মানুষই মারা যাক না কেন, আমাদের বেশিরভাগই টিকে থাকার জন্য নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে লড়াই করে যাব। আমাদের শরীর একাই এই পৃথিবী দখল করে নিতে প্রস্তুত, যদিও এই ভাবনায় আমাদের মন কুঁচকে যায়। এই আত্মপ্রেমই মানুষকে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি আগুনের গোলার সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়: মনের ভেতরে কেউ আসলে মনে করে না যে সে মারা যাবে, সে কেবল তার পাশের লোকটির জন্য দুঃখ অনুভব করে। এ বিষয়ে ফ্রয়েডের ব্যাখ্যা ছিল যে অবচেতন মন মৃত্যু বা সময় চেনে না: মানুষের শরীরের ভেতরে রাসায়নিক এবং জৈবিক স্তরে সে নিজেকে অমর মনে করে।
- মানুষ যেন তার এই স্বার্থপরতা কাটিয়ে উঠতে পারে না; মনে হয় এটি তার পশুর মতো স্বভাব থেকেই আসে। বিবর্তনের অগণিত সময় ধরে জীবকে তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়েছে। তার নিজস্ব শারীরিক ও রাসায়নিক সত্তা ছিল এবং সে তা টিকিয়ে রাখতেই নিবেদিত ছিল। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এটিই অন্যতম বড় সমস্যা: শরীর বাইরের যেকোনো কিছুর বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করে, এমনকি সেটি যদি একটি নতুন হৃৎপিণ্ডও হয় যা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। প্রোটোপ্লাজম নিজেই নিজের সত্তাকে আগলে রাখে এবং জগতের যেকোনো আঘাতের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করে। এটি যেন নিজের স্পন্দন উপভোগ করে, পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং জগতের অংশবিশেষ নিজের ভেতরে গ্রহণ করে। আপনি যদি একটি অন্ধ ও বোবা জীবকে আত্মসচেতনতা আর একটি নাম দেন, তাকে যদি প্রকৃতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন এবং সচেতনভাবে এটা জানান যে সে অনন্যতবে সেটাই হবে নার্সিসিজম। মানুষের মধ্যে এই শারীরিক সত্তা এবং শক্তি ও কর্মক্ষমতার বোধ সচেতন রূপ নিয়েছে।
- মানুষের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আত্মপ্রেম তার আত্মসম্মান এবং আত্মমর্যাদার মৌলিক বোধের সাথে অবিচ্ছেদ্য। আমরা মূলত অ্যালফ্রেড অ্যাডলারের কাছ থেকে জেনেছি যে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল তার আত্মসম্মানের বিষয়ে নিরাপদ বোধ করা। কিন্তু মানুষ কেবল প্রোটোপ্লাজমের একটি অন্ধ অলস পিণ্ড নয়, সে নামধারী এক জীব যে শুধু বস্তুর জগতে নয়, বরং প্রতীক আর স্বপ্নের জগতেও বাস করে। তার আত্মমর্যাদাবোধ প্রতীকীভাবে তৈরি হয়। তার লালিত আত্মপ্রেম বেঁচে থাকে প্রতীকের ওপর, নিজের যোগ্যতার এক বিমূর্ত ধারণার ওপর—যে ধারণা তৈরি হয় শব্দ, বাক্য আর ছবি দিয়ে, যা বাতাসে, মনে কিংবা কাগজে থাকে। এর অর্থ হল মানুষের শারীরিক কর্মকাণ্ডের সহজাত আকাঙ্ক্ষা এবং নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার আনন্দকে প্রতীকের জগতে সীমাহীনভাবে পূরণ করা যায় এবং এভাবেই অমরত্ব লাভ করা যায়। একটি একক জীব হাত-পা না নাড়িয়েই বিভিন্ন জগৎ আর সময়ের মাত্রায় নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারে। এমনকি মুমূর্ষু অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময়ও সে নিজের মধ্যে অনন্তকালকে ধারণ করতে পারে।
- শৈশবে আমরা আত্মসম্মানের জন্য লড়াইটিকে সবচেয়ে খোলামেলাভাবে দেখতে পাই। শিশু তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কোনো লজ্জা পায় না। তার পুরো শরীর তার সহজাত আত্মপ্রেমের দাবি জানাতে থাকে। আর এই দাবি সংশ্লিষ্ট বড়দের জন্য শৈশবকে নরকতুল্য করে তুলতে পারে, বিশেষ করে যখন বেশ কয়েকজন শিশু অসীম আত্ম-বিস্তারের বা যাকে আমরা "মহাজাগতিক তাৎপর্য" বলতে পারি, তার অধিকার পাওয়ার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামে। এই শব্দটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়, কারণ আমাদের আলোচনা সেদিকেই যাচ্ছে। আমরা খুব সাধারণভাবে "ভাইবোনের রেষারেষি" শব্দটা ব্যবহার করি, যেন এটি বড় হওয়ার পথে একটি গৌণ বিষয়, বখে যাওয়া শিশুদের একটু স্বার্থপরতা যারা এখনো উদার সামাজিক স্বভাব আয়ত্ত করতে পারেনি। কিন্তু এটি এতই মগ্ন আর বিরামহীন যে একে কেবল একটি বিচ্যুতি বলা যায় না; এটি জীবের হৃদয়ের কথা বলে: আলাদা হয়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা, সৃষ্টির সেরা হওয়ার ইচ্ছা। আপনি যখন সহজাত আত্মপ্রেমের সাথে আত্মসম্মানের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাকে মেলাবেন, তখন আপনি এমন এক জীব পাবেন যাকে নিজেকে একটি শ্রেষ্ঠ সত্তা হিসেবে অনুভব করতে হয়: মহাবিশ্বে প্রথম, যে নিজের মাঝে পুরো জীবনকে তুলে ধরে। ভাইবোনের সাথে প্রতিদিনের এই সাধারণত যন্ত্রণাদায়ক লড়াইয়ের কারণ এটাই: শিশু নিজেকে দ্বিতীয় সেরা গুরুত্বপূর্ণ হতে দিতে পারে না, বাদ পড়া তো দূরের কথা। "তুমি ওকে সবচেয়ে বড় লজেন্সটা দিয়েছ!" "ওকে বেশি শরবত দিয়েছ!" "ঠিক আছে, এই নাও তোমাকে আর একটু দিলাম।" "এখন তো ওর শরবত আমার চেয়ে বেশি হয়ে গেল!" "তুমি ওকে ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালাতে দিলে কিন্তু আমাকে দিলে না।" "ঠিক আছে, তুমি একটা কাগজ জ্বালাও।" "কিন্তু এই কাগজটা তো ওর জ্বালানো কাগজের চেয়ে ছোট।" এভাবেই চলতেই থাকে। যে প্রাণী প্রতীকের মাধ্যমে তার যোগ্যতার বোধ পায়, তাকে তার চারপাশের মানুষদের সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিজের তুলনা করতে হয়, যাতে সে নিজেকে দ্বিতীয় সেরা হিসেবে না দেখে। ভাইবোনের রেষারেষি একটি জটিল সমস্যা যা মানুষের মৌলিক অবস্থাকে ফুটিয়ে তোলে: বিষয়টি এমন নয় যে শিশুরা হিংসুটে, স্বার্থপর । বরং তারা মানুষের করুণ নিয়তিকে খুব খোলামেলাভাবে প্রকাশ করে: তাকে মরিয়া হয়ে নিজেকে মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ সত্তা হিসেবে প্রমাণ করতে হবে; তাকে সবার চেয়ে আলাদা হতে হবে, বীর হতে হবে, পৃথিবীর জীবনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে হবে এবং দেখাতে হবে যে অন্য যে কারো চেয়ে তার গুরুত্ব বেশি।
- মানুষের জন্য বীর হওয়ার চেষ্টা করা কতটা স্বাভাবিক, তার বিবর্তনীয় আর শারীরিক গঠনে এটি কত গভীরে প্রোথিত এবং শৈশবে সে এটি কত খোলামেলাভাবে দেখায়—তা যখন আমরা বুঝতে পারি, তখন আমাদের নিজেদের আসলে কী প্রয়োজন আর আমরা কী চাই সে সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা দেখে আরও বেশি অবাক হতে হয়। আমাদের সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে আধুনিক সময়ে, বীরত্ব বিষয়টি আমাদের জন্য খুব বড় মনে হয়, অথবা আমরা এর জন্য খুব ছোট। একজন তরুণকে যদি বলেন যে বীর হওয়ার অধিকার তার আছে, তবে সে লজ্জায় লাল হয়ে যাবে। আমরা আমাদের এই লড়াইকে লুকিয়ে রাখি ব্যাংক বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে, যাতে নিজেদের বীরত্বের ব্যক্তিগত মূল্য প্রতিফলিত হয়। অথবা প্রতিবেশীদের চেয়ে একটু ভালো বাড়ি, বড় গাড়ি বা মেধাবী সন্তানদের মাধ্যমে। কিন্তু এর নিচে মহাজাগতিক অনন্যতা পাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ধকধক করে, আমরা একে যতই ছোটখাটো বিষয়ের আড়ালে ঢেকে রাখি না কেন। মাঝেমধ্যে কেউ স্বীকার করে যে সে তার বীরত্বকে গুরুত্বের সাথে নেয়, যা আমাদের অনেকের মনে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। যেমন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মেন্ডেল রিভার্স দিয়েছিলেন, যিনি সামরিক খাতে প্রচুর বরাদ্দ দিতেন এবং বলেছিলেন যে তিনি জুলিয়াস সিজারের পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। আমরা জাগতিক বীরত্বের এই স্থূলতা দেখে শিউরে উঠতে পারি, তা সিজার হোক বা তার অনুসারী হোক; কিন্তু দোষ তাদের নয়, দোষ হল সমাজ যেভাবে তার বীরত্বের ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং যাদের সে এই ভূমিকা পালনের সুযোগ দেয় তাদের। বীর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রাকৃতিক, আর এটি স্বীকার করা সততার লক্ষণ। সবাই যদি এটি স্বীকার করে নিত, তবে সম্ভবত এমন এক অবদমিত শক্তি নির্গত হতো যা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিত।
- সাংস্কৃতিক বীরত্ব-ব্যবস্থাটি জাদুবিদ্যাভিত্তিক, ধর্মীয় আর আদিম কি না, নাকি এটি ধর্মনিরপেক্ষ, বৈজ্ঞানিক আর সভ্য তা আসলে বড় কথা নয়। এটি এখনো একটি পৌরাণিক বীরত্ব-ব্যবস্থা যেখানে মানুষ নিজেদের মৌলিক গুরুত্ব, মহাজাগতিক অনন্যতা, সৃষ্টির প্রতি পরম উপযোগিতা এবং এক অটল অর্থ খুঁজে পাওয়ার জন্য কাজ করে যায়। তারা প্রকৃতির মাঝে নিজেদের একটি জায়গা করে নিয়ে, মানুষের মূল্যবোধ প্রতিফলিত করে এমন কিছু নির্মাণের মাধ্যমে এই অনুভূতি অর্জন করে: তা কোনো মন্দির, গির্জা, টোটেম পোল, আকাশচুম্বী অট্টালিকা কিংবা তিন প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা একটি পরিবার হতে পারে। আশা আর বিশ্বাস এটাই যে সমাজে মানুষ যা কিছু সৃষ্টি করে তা স্থায়ী হবে এবং এর একটি অর্থ থাকবে। সেগুলো মৃত্যু আর ক্ষয়কে ছাপিয়ে বেঁচে থাকবে এবং মানুষ ও তার কাজের গুরুত্ব বজায় থাকবে। নরম্যান ও. ব্রাউন যখন বলেছিলেন যে নিউটনের সময় থেকে পশ্চিমা সমাজ ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করুক না কেন, তারা আসলে অন্য যেকোনো সমাজের মতোই "ধর্মীয়"—তখন তিনি ঠিক এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন: "সভ্য" সমাজ হল একটি আশাবাদী বিশ্বাস এবং এই প্রতিবাদ যে বিজ্ঞান, টাকা আর পণ্য মানুষকে অন্য যেকোনো প্রাণীর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এই অর্থে মানুষ যা কিছু করে তা ধর্মীয় এবং বীরত্বপূর্ণ, অথচ তা কাল্পনিক আর ভুল হওয়ার ঝুঁকিতেও থাকে।
- পৃষ্ঠা ৫
- আমরা যদি বীরত্ব অর্জনের জন্য মানুষের এই কৌশলের ওপর থাকা গোপনীয়তার প্রকাণ্ড আবরণটি সরিয়ে ফেলি, তবে আমরা সম্ভবত সবচেয়ে মুক্তিদায়ক প্রশ্নের মুখোমুখি হব যা মানবজীবনের মূল সমস্যা: মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা আর পরিচালিত করা এই সাংস্কৃতিক বীরত্ব-ব্যবস্থাটি বাস্তবিকভাবে কতটা সত্য? আমরা মহাজাগতিক বীরত্বের জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষার হীন দিকগুলো নিয়ে বলেছি, কিন্তু এর অবশ্যই একটি মহৎ দিকও আছে। মানুষ তার দেশ, সমাজ আর পরিবারের জন্য জীবন দিতে পারে। সে তার সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে গ্রেনেডের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে; সে সর্বোচ্চ উদারতা আর আত্মত্যাগের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু তাকে এটা অনুভব করতে হয় এবং বিশ্বাস করতে হয় যে সে যা করছে তা সত্যিই বীরত্বপূর্ণ, কালোত্তীর্ণ এবং অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। আধুনিক সমাজের সংকট ঠিক এখানেই যে তরুণরা তাদের সংস্কৃতির ঠিক করে দেওয়া কর্মপরিকল্পনায় নিজেদের আর বীর মনে করছে না। তারা বিশ্বাস করে না যে এটি তাদের জীবন আর সময়ের সমস্যার বাস্তব সমাধান। আমরা বীরত্বের এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যা আমাদের সামাজিক জীবনের প্রতিটা স্তরে পৌঁছে গেছে: বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া, ব্যবসা আর কর্মজীবনের বীরত্ব থেকে সরে আসা, রাজনৈতিক বীরত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। এর ফলে জন্ম নিচ্ছে প্রথাবিরোধী বীরদের, যারা প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে বীর হতে চায়। যেমন চার্লস ম্যানসন আর তার বিশেষ "পরিবার"—যাদের যন্ত্রণাদায়ক বীরত্ব সেই ব্যবস্থার ওপর চড়াও হয় যা নিজেই এখন আর সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বীরত্বের প্রতিনিধি হতে পারছে না। আমাদের সময়ের বড় বিভ্রান্তি আর আলোড়ন হল এই যে তরুণরা ভালো হোক বা খারাপ একটি বড় সামাজিক-ঐতিহাসিক সত্য টের পেয়েছে: অন্যায় যুদ্ধে যেমন অকারণে আত্মত্যাগ হয়, ঠিক তেমনি পুরো সমাজের বীরত্বও কখনো কখনো নিচ হতে পারে। তা হতে পারে হিটলারের জার্মানির মতো ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক বীরত্ব, অথবা ভোগপণ্য অর্জন আর প্রদর্শনের মতো সাধারণ ও হাস্যকর বীরত্ব। টাকা আর সুযোগ-সুবিধা জমিয়ে রাখাই এখন পুঁজিবাদী আর সোভিয়েত, উভয় জীবনযাত্রারই বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- কিন্তু বীরত্বের প্রয়োজনীয়তার এই সত্যটি স্বীকার করা কারো জন্য সহজ নয়, এমনকি তাদের জন্যও নয় যারা চায় তাদের বীরত্বকে সবাই স্বীকৃতি দিক। এখানেই মূল সমস্যা। আমাদের পরবর্তী আলোচনা থেকে আমরা যেমনটা দেখতে পাব, বীরত্বের অনুভূতি পাওয়ার জন্য একজন মানুষ ঠিক কী করছে সে সম্পর্কে সচেতন হওয়াটাই হল জীবনের প্রধান আত্মবিশ্লেষণমূলক সমস্যা। মনোবিশ্লেষণ আর ধর্মের জ্ঞানীরা মানুষ সম্পর্কে যা কিছু কষ্টদায়ক আর গভীর সত্য আবিষ্কার করেছেন, তার সবই আবর্তিত হয় একটি ভয়কে কেন্দ্র করে। আর তা হল নিজের আত্মসম্মান পাওয়ার জন্য একজন আসলে কী করছে তা স্বীকার করার ভয়। এই কারণেই মানুষের বীরত্ব হল এক অন্ধ তাড়না যা মানুষকে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়; আবেগপ্রবণ মানুষের মধ্যে যশের জন্য এই হাহাকার কুকুরের ডাকের মতোই বিচারবুদ্ধিহীন আর সহজাত। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বিশাল দল যারা খুব একটা সক্রিয় নয়, তাদের কাছে এটি ছদ্মবেশে থাকে। তারা বিনীতভাবে আর অভিযোগ করতে করতে সমাজ বীরত্বের জন্য যে ভূমিকাগুলো ঠিক করে দিয়েছে তা পালন করে যায় এবং এই ব্যবস্থার ভেতরেই পদোন্নতি পাওয়ার চেষ্টা করে: তারা সাধারণ পোশাক পরে, কিন্তু নিজেদের একটু আলাদা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবে তা খুব সামান্য আর নিরাপদভাবে, যেমন একটি লাল বোতাম দিয়ে, কিন্তু কখনোই পুরো মাথা আর কাঁধ উঁচিয়ে নয়।
- আমি এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় যা বলার চেষ্টা করেছি তা হল বীরত্বের সমস্যাটি মানবজীবনের মূল সমস্যা। এটি মানুষের স্বভাবের অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক গভীরে প্রোথিত কারণ এর ভিত্তি হল শারীরিক আত্মপ্রেম আর শিশুর বেঁচে থাকার জন্য আত্মসম্মানের প্রয়োজন। সমাজ নিজেই বীরত্বের একটি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা। এর অর্থ হল পৃথিবীর সব সমাজই মানুষের জীবনের গুরুত্ব নিয়ে একটি জীবন্ত উপকথা, যা বীরত্বের সাথে জীবনের অর্থ তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা। তাই প্রতিটি সমাজই একেকটি "ধর্ম", তারা নিজেরা তা মনে করুক আর না করুক: সোভিয়েত "ধর্ম" এবং মাওবাদী "ধর্ম" ঠিক তেমনই ধর্মীয় যেমনটি বৈজ্ঞানিক আর ভোগবাদী "ধর্ম"। তারা তাদের জীবন থেকে ধর্মীয় আর আধ্যাত্মিক ধারণাগুলোকে বাদ দিয়ে নিজেদেরকে আড়াল করার যত চেষ্টাই করুক না কেন, তারা আসলে একই পথের পথিক।
মৃত্যুর আতঙ্ক
[সম্পাদনা]- জীববিদ্যা আর বিবর্তনের এই যুক্তিটি খুব মৌলিক, তাই একে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেকোনো আলোচনা থেকে একে বাদ দেওয়া অসম্ভব বলেই আমি মনে করি। বেঁচে থাকার জন্য প্রাণীদের মধ্যে ভয়ের অনুভূতি থাকা জরুরি ছিল। শুধু অন্য প্রাণীদের থেকে নয়, প্রকৃতির নানা বিপদ থেকেও রক্ষা পাওয়ার জন্য এই ভয় তাদের সাহায্য করত। তাদের সীমিত শক্তির সাথে এই বিপজ্জনক জগতের বাস্তব সম্পর্কটি তাদের বুঝতে হতো। বাস্তবতা আর ভয় স্বাভাবিকভাবেই একসাথে চলে। মানুষের শিশুরা যেহেতু অনেক বেশি অসহায় আর অরক্ষিত অবস্থায় থাকে, তাই এটা ভাবা ঠিক হবে না যে পশুপাখিদের মধ্যে থাকা সেই ভয়ের সহজাত প্রবৃত্তি এই দুর্বল আর সংবেদনশীল প্রজাতির মধ্যে হারিয়ে যাবে। বরং এটা মনে করাই বেশি যুক্তিযুক্ত যে এটি আরও বেড়ে গেছে, যেমনটা শুরুর দিকের ডারউইনবাদীরা মনে করতেন। আদিম মানুষদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি ভয় পেত তারাই প্রকৃতির মাঝে নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি বাস্তববাদী ছিল। তারা তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে এমন এক বাস্তববাদ ছড়িয়ে দিয়েছিল যা টিকে থাকার জন্য খুব জরুরি ছিল। এর ফলে জন্ম হয়েছে সেই মানুষের যাকে আমরা চিনি: এক অতি-উদ্বিগ্ন প্রাণী যে কোনো কারণ ছাড়াই সারাক্ষণ উদ্বেগের কারণ খুঁজে বেড়ায়।
- মানুষ নিজের জন্য এক সামলানো যায় এমন জগৎ বেছে নেয়: সে কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সমাজ তাকে যেদিকে তাকাতে বলে, সে সেদিকেই তাকায়। সে কোনো দৈত্যের মতো একবারে পুরো বিশ্বকে গ্রাস করতে চায় না, বরং বিভারের মতো ছোট ছোট অংশে জগতকে সামলাতে চায়। সে এমন অনেক কৌশল ব্যবহার করে যেগুলোকে আমরা "চরিত্রগত আত্মরক্ষা" বলি: সে নিজেকে আড়ালে রাখতে এবং ভিড় থেকে আলাদা না হতে শেখে। সে নিজেকে অন্য কোনো বড় শক্তির ওপর সঁপে দিতে শেখে, তা হতে পারে কোনো ব্যক্তি, বস্তু কিংবা সমাজের আদেশ। এর ফলে তার মনে হয় তার চারপাশের জগতটি একদম নির্ভুল। যখন মানুষের পা মাটিতে শক্তভাবে গেঁথে থাকে এবং তার জীবন একটি সাজানো গোলকধাঁধায় বাধা থাকে, তখন তার মনে আর কোনো ভয় থাকে না। তাকে কেবল "দুনিয়ার নিয়ম" মেনে অন্ধের মতো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। শিশু বয়সে সে এই নিয়মগুলো শেখে এবং পরবর্তীতে এক ধরনের গম্ভীর মানসিক স্থিরতা নিয়ে সারাজীবন তা মেনে চলে।
- পৃষ্ঠা ২৩
কিছু মৌলিক মনোবিশ্লেষণমূলক ধারণার পুনর্গঠন
[সম্পাদনা]- তবুও, একই সাথে প্রাচ্যের জ্ঞানীরা যেমন জানতেন, মানুষ আসলে একটি পোকা এবং পোকার খাদ্য। এটিই হল কূটাভাস: সে প্রকৃতির বাইরে এবং একই সাথে হতাশাজনকভাবে এর ভেতরে; সে দ্বৈত সত্তা, তার বাস নক্ষত্রের মাঝে অথচ সে বন্দী এক হৃৎপিণ্ড চালিত এবং হাঁসফাঁস করা শরীরে যা একসময় কোনো মাছের ছিল এবং এখনও তার প্রমাণ হিসেবে এতে ফুলকার দাগ রয়ে গেছে। তার শরীর মাংসের এক আবরণ যা অনেকভাবেই তার কাছে অপরিচিত—সবচেয়ে অদ্ভুত আর বিরক্তিকর বিষয় হল এটি ব্যথা পায়, এর রক্তপাত হয় এবং এটি একসময় ক্ষয়ে গিয়ে মারা যাবে। মানুষ আক্ষরিক অর্থেই দুই ভাগে বিভক্ত: তার নিজের চমৎকার অনন্যতা সম্পর্কে তার সচেতনতা রয়েছে যার মাধ্যমে সে এক সুউচ্চ মহিমা নিয়ে প্রকৃতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, অথচ অন্ধ আর বোবা হয়ে চিরতরে পচে যাওয়ার আর বিলীন হয়ে যাওয়ার জন্য তাকে আবার মাটির কয়েক ফুট নিচে ফিরে যেতে হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে থাকা এবং এটি নিয়ে বেঁচে থাকা এক ভয়াবহ সংকট।
- পৃষ্ঠা ২৬
- ফ্রয়েড কখনোই তার মতবাদ ত্যাগ করেননি কারণ মানুষের অবস্থা সম্পর্কে তার মৌলিক ইঙ্গিতগুলো সঠিক ছিল—তবে তিনি যে কাঠামোটি দিয়েছিলেন তা ঠিক তেমন নয়। আজ আমরা বুঝতে পারি যে রক্ত ও মল, যৌনতা আর অপরাধবোধ নিয়ে সব কথা সত্যি। তবে এটি পিতৃহত্যা আকাঙ্ক্ষা কিংবা শারীরিকভাবে অঙ্গচ্ছেদের ভয়ের কারণে নয়। বরং এই সবকিছুর মাধ্যমে মানুষের নিজের পশুসুলভ অবস্থার প্রতি এক গভীর আতঙ্ক প্রকাশ পায়। শিশু অবস্থায় সে এই অবস্থাটি বুঝতে পারে না এবং বড় হয়ে এটি সে মেনে নিতে পারে না। শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া আর তাড়নার জন্য সে যে অপরাধবোধ অনুভব করে তা এক "বিশুদ্ধ" অপরাধবোধ: এক ধরনের বাধা, নিয়তি আর সীমাবদ্ধতার বোধ। এটি তৈরি হয় আমাদের পশুর মতো বেঁচে থাকার সীমাবদ্ধতা এবং শরীর ও জগতের এক বোধাতীত রহস্য থেকে।
- পৃষ্ঠা ২৯
- প্রথমে একটি শিশু তার মলদ্বার আর মল নিয়ে মজা পায় এবং আনন্দের সাথে সেখানে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়, গন্ধ শোঁকে, দেওয়ালে মল মাখায় বা মলদ্বার দিয়ে বিভিন্ন বস্তু স্পর্শ করার খেলা খেলে। এটি একটি চিরন্তন খেলা যা খেলার ছলেই এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে: এটি শরীরের প্রাকৃতিক কাজগুলো আবিষ্কার করার ও চর্চা করার প্রতিফলন। এটি এক অদ্ভুত অচেনা জায়গাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে; প্রাকৃতিক জগতের নিয়তিবাদী নিয়মের ওপর নিজের ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আর এই সব কিছুই সে করে প্রতীকের মাধ্যমে। মল নিয়ে খেলার মাধ্যমে শিশুটি ইতিমধ্যেই মানুষের অবস্থার এক দার্শনিকে পরিণত হয়। কিন্তু অন্য সব দার্শনিকের মতো সে নিজেও এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর তার জীবনের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় মলদ্বার যা প্রকাশ করে তাকে অস্বীকার করা: তা হল প্রকৃতির কাছে সে আসলে শরীর ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃতির মানদণ্ড হল শারীরিক, মানুষের মানদণ্ড হল মানসিক। মানুষ যতই উচ্চ শিখরে পৌঁছাক না কেন, তার ভিত্তি হল মল; একে ছাড়া কিছুই সম্ভব নয় এবং সবকিছু শেষ পর্যন্ত এখানেই ফিরে আসে। মঁতেন যেমনটা বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু সিংহাসনে বসেও মানুষ আসলে তার পাছার ওপরই ভর দিয়ে বসে থাকে। সাধারণত এই উক্তিটি মানুষকে হাসায় কারণ মনে হয় এটি কৃত্রিম অহংকার আর আভিজাত্য থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করে সব কিছুকে সাম্যের জায়গায় নিয়ে আসে। কিন্তু আমরা যদি এই পর্যবেক্ষণকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে বলি যে মানুষ শুধু তার পাছার ওপরই বসে থাকে না, বরং তার নিচে থাকে তার নিজেরই মলের এক উষ্ণ আর দুর্গন্ধযুক্ত স্তূপ তখন আর কৌতুকটি মজাদার মনে হয় না। মানুষের দ্বৈত সত্তার করুণ রূপ আর তার হাস্যকর অবস্থা তখন খুব বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে। মলদ্বার আর এর বোধাতীত, ঘৃণ্য বস্তু শুধু আমাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকেই বোঝায় না, বরং শারীরিক সবকিছুর যা পরিণতি, ক্ষয় আর মৃত্যু, তাকেও তুলে ধরে।
- মানবজীবনের এই দ্বৈততার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে যে শিশু আসলে এর কোনোটিই ঠিকমতো সামলাতে পারে না। তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল সে সময়ের আগেই অনেক কিছু বুঝে ফেলে; তার পৃথিবী তার ওপর চেপে বসে এবং সে নিজেও নিজের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। শুরু থেকেই তার এক সূক্ষ্ম সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্র থাকে যা জগতের সব অনুভূতি খুব নিপুণভাবে গ্রহণ করতে পারে। এর সাথে যুক্ত হয় ভাষা আর আত্মবোধের দ্রুত বিকাশ। আর এই সব কিছু চেপে বসে একটি অসহায় শিশুর শরীরের ওপর যা বৃথাই জগতকে সঠিকভাবে আর নিরাপদে আঁকড়ে ধরতে চায়। ফলাফলটি হয় হাস্যকর। শিশুটি তার মনের সত্তা আর শরীরের এই দ্বৈততার অভিজ্ঞতায় বিহ্বল হয়ে পড়ে, কারণ সে কোনোটিকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সে আত্মবিশ্বাসী কোনো সামাজিক মানুষ নয় যে শব্দ, চিন্তা, নাম বা জায়গার মতো বিষয়গুলো নিয়ে দক্ষভাবে কাজ করতে পারবে। বিশেষ করে সময় তার কাছে এক মস্ত রহস্য; সে এমনকি ঘড়ি কী তাও জানে না। আবার সে কোনো কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক পশুও নয় যে বংশবৃদ্ধি করবে, অথবা তার চারপাশে ঘটে চলা গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে পারবে; সে কোনোভাবেই "বাবার মতো কাজ" করতে পারে না। সে যেন অনিশ্চয়তার মাঝে আটকে থাকা এক বিস্ময় বালক। তার অভিজ্ঞতার দুই দিকেই সে ক্ষমতাহীন, তবুও নানা ধারণা আর অনুভূতি তার শরীরের ভেতরে আসতেই থাকে। তাকে এগুলোর একটা মানে খুঁজে বের করতে হয় এবং এগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়। চিন্তা কি শরীরের ওপর জয়ী হবে, নাকি শরীর চিন্তার ওপর? বিষয়টি এত সহজ নয়। সে যে অস্তিত্ব সংকটে আছে তার কোনো সহজ সমাধান নেই। এটি তার জীবনের প্রায় শুরু থেকেই একটি সমস্যা, অথচ এটি সামলানোর জন্য সে কেবল একটি শিশু। শিশুরা এমন সব প্রতীকের তাড়নায় অস্থির বোধ করে যেগুলোর প্রয়োজন তারা বোঝে না। তারা তুচ্ছ সব মৌখিক আদেশ আর নিয়মকানুনের চাপে থাকে যা তাদের স্বাভাবিক প্রাণশক্তির প্রকাশ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। আর যখন তারা শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, শরীর যে আছে তা অস্বীকার করতে চায়, বা "বড় মানুষের মতো" আচরণ করতে চায়, তখন হঠাৎ শরীর তাদের ওপর জয়ী হয়; বমি বা মলে সব ভেসে যায়। আর শিশুটি তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে কারণ একজন কেবল প্রতীকী প্রাণী হওয়ার তার সেই অভিনয়টি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। প্রায়ই শিশু ইচ্ছা করে বিছানায় প্রস্রাব করে এই কৃত্রিম প্রতীকী নিয়মের প্রতিবাদ জানায়। সে যেন বলতে চায় যে: শরীরই তার প্রধান বাস্তবতা এবং সে সেই সহজ শারীরিক স্বর্গে থাকতে চায়, "ভালো-মন্দের" পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হতে চায় না।
- ছেলে আর মেয়ে উভয়ই তাদের বড় হওয়া আর স্বাধীনতার প্রয়োজনে এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ার মতো মা থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু তাদের মধ্যে যে "ভয়, আতঙ্ক আর ঘৃণা" কাজ করে, তা হল তাদের নিজেদেরই এক অদ্ভুত উপলব্ধির অংশ যা তারা সহ্য করতে পারে না। এই পরিস্থিতি শুধু মায়ের ওপর শারীরিক বিষয় নয়, বরং এটি শিশুর নিজের শরীরের সমস্যার এক ভয়াবহ প্রকাশ। মায়ের শরীর শুধু এমন এক লিঙ্গ প্রকাশ করে না যা তাকে দুর্বল আর নির্ভরশীল করে তোলে এটি আরও অনেক কিছু প্রকাশ করে। এটি দুই লিঙ্গের সমস্যা সামনে নিয়ে আসে এবং শিশুকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি করে যে তার নিজের শরীর আসলে উদ্দেশ্যহীন। বিষয়টি এমন নয় যে শিশু দেখে কোনো লিঙ্গই নিজের মধ্যে "সম্পূর্ণ" নয় কিংবা সে বোঝে যে লিঙ্গের ভিন্নতা আসলে সম্ভাবনার এক পরিপূর্ণ জীবন পাওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রতারণা, সে এসব পুরোপুরি অনুভব করবে এমনটা সম্ভব নয়। আবারও বলছি, এটি কোনো যৌন সমস্যা নয়; এটি আরও ব্যাপক, শরীর যে এক ধরনের অভিশাপ বহন করে এটি তারই অভিজ্ঞতা। শিশু এমন এক জগতে আসে যেখানে সে ছেলে বা মেয়ে হওয়ার বদলে কুকুর, বিড়াল বা মাছ হিসেবেও জন্মাতে পারত—কারণ শক্তি, নিয়ন্ত্রণ কিংবা ব্যথা, ধ্বংস আর মৃত্যুকে সহ্য করার ক্ষমতার দিক থেকে এর কোনো পার্থক্য নেই। যৌন পার্থক্য নিয়ে আতঙ্ক আসলে ব্রাউনের ভাষায় "জৈবিক সত্যের" আতঙ্ক। এটি বিভ্রম থেকে জেগে উঠে কঠোর বাস্তবতায় আছড়ে পড়া। এটি একটি বিশাল নতুন বোঝা কাঁধে তুলে নেওয়ার আতঙ্ক—জীবনের অর্থ আর শরীরের বোঝা, নিজের অসম্পূর্ণতার করুণ নিয়তি, নিজের অসহায়ত্ব আর সীমাবদ্ধতার আতঙ্ক। আর শেষ পর্যন্ত এটাই হল সেই অঙ্গচ্ছেদ ভীতির অসহায় আতঙ্ক যা মানুষকে দুঃস্বপ্নে তাড়িয়ে বেড়ায়। এটি শিশুর এই উপলব্ধিকেই প্রকাশ করে যে তাকে এক অসম্ভব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; নিজেকে নিজে সৃষ্টি করার যে লক্ষ্য নিয়ে সে যাত্রা শুরু করেছিল তা এই শারীরিক-যৌন উপায়ে সফল হওয়া সম্ভব নয়, এমনকি মায়ের চেয়ে আলাদা শরীর দাবি করেও নয়। জগতের বিরুদ্ধে নিজের অসীম ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য শরীরের যে দুর্গকে সে আত্মপ্রেমের মূল ভিত্তি মনে করত, তা বালির মতো ভেঙে পড়ে। এটিই শিশুর বীরত্বের করুণ পতন, যা ক্যাস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের মাধ্যমে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হওয়াকে বোঝায়। একসময় সে তার নিজের পুনর্জন্মের ইডিপাল পরিকল্পনার জন্য শরীরের যেকোনো অঙ্গ ব্যবহার করত; এখন খোদ যৌনাঙ্গই যেন তার আত্মনির্ভরতাকে উপহাস করে।
- একজন মানুষ একাধারে একটি সত্তা এবং একটি শরীর। শুরু থেকেই এই বিভ্রান্তি থাকে যে "সে" আসলে কোথায়—প্রতীকী অন্তরে নাকি শারীরিক শরীরে? প্রতিটা জগতই আলাদা। অন্তরের সত্তা চিন্তা, কল্পনা আর প্রতীকের অসীম ব্যাপ্তির স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করে। শরীর প্রতিনিধিত্ব করে নিয়তি আর সীমাবদ্ধতার। শিশু ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে এক অনন্য সত্তা হিসেবে তার যে স্বাধীনতা ছিল, শরীর আর এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাকে টেনে হিঁচড়ে পেছনে নামিয়ে আনছে এবং ঠিক করে দিচ্ছে সে আসলে "কী"। এই কারণেই যৌনতা শিশুর মতো প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও একটি বড় সমস্যা: আমরা কে আর কেন এই গ্রহে আমাদের জন্ম হয়েছে—এই সমস্যার কোনো শারীরিক সমাধান আসলে কোনো কাজে আসে না; বরং এটি একটি ভয়াবহ হুমকি। এটি মানুষকে বলতে পারে না যে তার মনের গহীন ভেতরে সে আসলে কী এবং জগতকে দেওয়ার মতো তার বিশেষ উপহারটি কী। এই কারণেই অপরাধবোধ ছাড়া যৌন মিলন করা এত কঠিন: অপরাধবোধ কাজ করে কারণ শরীর মানুষের অন্তরের স্বাধীনতার ওপর ছায়া ফেলে। যৌন কাজের মাধ্যমে তার "আসল সত্তা" একটি মানসম্মত, যান্ত্রিক আর জৈবিক ভূমিকার মধ্যে বন্দী হতে বাধ্য হয়। আরও খারাপ বিষয় হল, এতে অন্তরের সত্তাকে মোটেও বিবেচনায় নেওয়া হয় না; শরীরই তখন পুরো মানুষের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখে। আর এই ধরনের অপরাধবোধ অন্তরের সত্তাকে সংকুচিত করে ফেলে এবং তা যেন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
জীবনের অপরিহার্য মিথ্যা হিসেবে মানুষের চরিত্র
[সম্পাদনা]- [আমরা হলাম] মলদ্বারবিশিষ্ট দেবতা।
- পৃষ্ঠা ৫১
- এটি কতই না দুর্ভাগ্যজনক আর বিদ্রূপের বিষয় যে, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের যে মিথ্যার প্রয়োজন হয়, তা আমাদের এমন এক জীবনের দিকে ঠেলে দেয় যা আসলে কখনোই আমাদের নিজের নয়।
- পৃষ্ঠা ৫৬
- মানুষের অবস্থার বিড়ম্বনা হল এই যে, তার সবচেয়ে গভীর প্রয়োজন হল মৃত্যু আর ধ্বংসের উদ্বেগ থেকে মুক্ত থাকা; কিন্তু জীবন নিজেই এই উদ্বেগ জাগিয়ে তোলে, আর তাই পূর্ণরূপে বেঁচে থাকা থেকে আমাদের পিছিয়ে আসতে হয়।
- পৃষ্ঠা ৬৬
- ফ্রয়েডের কাজের ঐতিহাসিক মূল্য হল এই যে, এটি মানুষের মতো এক অদ্ভুত প্রাণীর অবস্থাকে বুঝতে পেরেছিল। মানুষ এমন এক প্রাণী যার সহজাত প্রবৃত্তিগুলো তাকে বাইরের জগত থেকে বিচ্যুত করতে পারে না কিংবা তাকে স্বাভাবিক মানসিক স্থিরতা দিতে পারে না। মানুষকে তার নিজের ভেতর থেকেই জগতকে দেখার এক সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে হয়েছে যাতে সে এই গ্রহে টিকে থাকতে পারে। আর তাই মানুষের চরিত্র গঠনের এই মূল বিষয়টি হল মূলত মানুষের নিজের ওপর নিজের আরোপ করা সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক গবেষণা। অতীতে, বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে মনোবিশ্লেষণের প্রতি যে বিরোধিতা দেখা যায়, তা আসলে এই সত্যটি মেনে না নেওয়ারই একটি বহিঃপ্রকাশ। সত্যটি হল, মানুষ নিজের সম্পর্কে এবং তার জগত সম্পর্কে নিজের কাছে মিথ্যা বলে বেঁচে থাকে। আর ফেরেঞ্জি এবং ব্রাউনের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, মানুষের চরিত্র হল এক অপরিহার্য মিথ্যা। মাসলো ফ্রয়েডের এই অবদানকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা আমার বিশেষ পছন্দ: "ফ্রয়েডের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হল যে অনেক মানসিক অসুস্থতার মূলে রয়েছে নিজের সম্পর্কে জানার ভয়—নিজের আবেগ, স্মৃতি, ক্ষমতা আর সম্ভাবনা সম্পর্কে জানার ভয়। আমরা আবিষ্কার করেছি যে নিজের সম্পর্কে জানার এই ভয় অনেক সময় বাইরের জগতকে ভয় পাওয়ার মতোই।" আর এই ভয় আসলে কী? এটি হল আমাদের শক্তি আর সম্ভাবনার সাপেক্ষে সৃষ্টির চরম বাস্তবতাকে ভয় পাওয়া। সাধারণত এই ধরনের ভয় আত্মরক্ষামূলক হয়, যা আমাদের আত্মসম্মান আর আত্মমর্যাদাকে রক্ষা করে। আমরা এমন যেকোনো জ্ঞানকে ভয় পাই যা আমাদের নিজেদের চোখে আমাদের ছোট করতে পারে, দুর্বল আর অপদার্থ মনে করাতে পারে। আমরা এই ধরনের কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের এবং নিজেদের আদর্শ ভাবমূর্তিকে রক্ষা করি। এগুলো আসলে কিছু পদ্ধতি যার মাধ্যমে আমরা বিপজ্জনক সত্যগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া এড়িয়ে চলি। একজন মানুষকে তার অভিজ্ঞতার বড় একটি অংশ চেপে রাখতে হয়, যদি সে নিজের ভেতরে এক ধরনের নিরাপত্তা আর মূল্যবোধ অনুভব করতে চায়। প্রকৃতি অন্য সব প্রাণীকে তাদের সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমেই এই নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। কিন্তু মানুষকে এই নিরাপত্তা আর মূল্যবোধ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয় এবং অর্জন করতে হয়। বড়দের জগতে তাকে তার নিজের ক্ষুদ্রতা আর ব্যর্থতাগুলোকে চেপে রাখতে হয়। তাকে তার শারীরিক আর নৈতিক অক্ষমতাগুলোকে লুকিয়ে রাখতে হয়। শুধু তার ভালো ইচ্ছার অপূর্ণতাই নয়, বরং তার ভেতরে থাকা ঘৃণা আর অন্যের অমঙ্গল করার ইচ্ছাকেও চেপে রাখতে হয়। তাকে তার বাবা-মায়ের অক্ষমতা আর ভয়গুলোকেও ভুলে থাকতে হয়, কারণ এগুলো জানলে তার নিজের পক্ষে শক্তিশালী অনুভব করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাকে তার শরীরের মলত্যাগের মতো সাধারণ কাজগুলোকেও ভুলে থাকতে হয়, কারণ এগুলোই মনে করিয়ে দেয় যে সে মরণশীল আর তুচ্ছ। এই সবকিছুর সাথে তাকে বাইরের জগতের ভয়ংকর রূপটিকেও আড়ালে রাখতে হয়।
- প্রকৃতি নিম্নস্তরের প্রাণীদের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে রক্ষা করেছে। একটি সহজাত প্রবৃত্তি হল এক ধরনের প্রোগ্রাম যা তাকে একটি নির্দিষ্ট উপায়ে জগতকে দেখতে আর প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করে। এটি খুব সহজ। প্রাণীরা এমন কিছু নিয়ে মাথা ঘামায় না যা তারা বুঝতে পারে না। তারা খুব ছোট এক জগতের মধ্যে বাস করে যা আসলে বাস্তবের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ। কিন্তু মানুষের দিকে তাকান, কী এক অদ্ভুত জীব! এখানে প্রকৃতি সব সতর্কতা ভুলে যেন তাকে অবারিত করে দিয়েছে। সে এমন এক প্রাণী সৃষ্টি করেছে যার বাইরের জগতকে পুরোপুরি দেখার ক্ষমতার বিরুদ্ধে কোনো আত্মরক্ষা নেই। সে শুধু নিজের সামনের জগত নয়, বরং আরও অনেক জগতের সাথে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। সে শুধু তার খাদ্য নিয়ে নয়, বরং যা কিছু জন্মে তার সব কিছু নিয়েই চিন্তা করতে পারে। সে শুধু বর্তমানে বাস করে না, বরং তার অন্তরের সত্তাকে অতীতে আর ভবিষ্যতে পাঁচশ কোটি বছর পর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারে। সে শুধু একটি ছোট গ্রহে বাস করে না, বরং গ্যালাক্সি আর মহাবিশ্বের অসীম মাত্রায় বিচরণ করে। মানুষের এই অভিজ্ঞতার বোঝা বহন করা সত্যিই খুব কঠিন। আমরা আগের অধ্যায়ে দেখেছি যে মানুষ অন্য প্রাণীদের মতো তার নিজের শরীরকেও খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। মানুষের শরীর তার কাছে এক সমস্যা যা তাকে ব্যাখ্যা করতে হয়। শুধু তার শরীরই নয়, তার অন্তরের স্মৃতি আর স্বপ্নগুলোও তার কাছে অপরিচিত। মানুষ আসলে জানে না সে কে, কেন তার জন্ম হয়েছে। তার নিজের অস্তিত্বই তার কাছে এক পরম বিস্ময়। মাসলো যেমনটা বলেছেন, "আমাদের নিজেদের ভেতরেই সেই দৈব সত্তা আছে যা নিয়ে আমরা একই সাথে মুগ্ধ আর আতঙ্কিত। এটি মানুষের মৌলিক অবস্থার একটি দিক যে আমরা একই সাথে পোকা আর দেবতা।" আবারও সেই একই কথা: আমরা মলদ্বারবিশিষ্ট দেবতা।
- মানুষ তার জগতের এই ভয়ংকর রূপ আর বাস্তবের বিপদের মুখে পা বাড়াতে ইতস্তত করে। সে অন্যদের গ্রাসকারী আকাঙ্ক্ষার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ভয় পায়। একজন জীব হিসেবে মানুষ বুঝতে পারে সে কেমন এক গ্রহে আছে। এখানে প্রকৃতি কোটি কোটি জীবের ক্ষুধা আর উন্মাদনাকে মুক্ত করে দিয়েছে—যার মাঝে আছে ভূমিকম্প, উল্কাপাত আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রলয়ংকরী শক্তি। প্রতিটি জিনিস নিজেকে বড় করার জন্য অন্যকে গ্রাস করার নেশায় মত্ত। জীবন মানুষকে শুষে নিতে পারে, তার শক্তি কেড়ে নিতে পারে এবং তার আত্মনিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দিতে পারে। এত দ্রুত নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে যে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। জীবন মানুষকে এমন সব নতুন দায়িত্ব আর পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় যা বহন করার জন্য প্রচণ্ড শক্তির প্রয়োজন হয়। আর সবকিছুর উপরে আছে ভুল করার ভয়, দুর্ঘটনা, রোগবালাই এবং অবশ্যই মৃত্যু—যা শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে পুরোপুরি মুছে দেয়।
- আমরা বুঝতে পারি যে একটি শিশু যদি বাস্তবের এই ভয়াবহ রূপের কাছে হার মেনে নেয়, তবে সে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই একটি শিশুকে সবার আগে "পরমানন্দ ত্যাগ করতে" শিখতে হয়। তাকে বিস্ময় আর ভীতি পেছনে ফেলে আসতে হয়। তবেই সে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ করতে পারে। সে তার জগতকে "স্বাভাবিক" করে তোলে। তবে এই স্বাভাবিক করার অর্থ হল আসলে সত্যকে আড়াল করা আর মানুষের করুণ অবস্থাকে লুকিয়ে রাখা। এই হতাশা থেকে বাঁচার জন্য সে এক ধরনের প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করে; আর এই দেয়ালই তাকে নিজের গুরুত্ব আর শক্তি অনুভব করতে সাহায্য করে। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাকে অনুভব করতে দেয় যে সে তার জীবন আর মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সে একজন স্বাধীন ব্যক্তি। আমরা মানুষের জীবনযাত্রাকে একটি অপরিহার্য মিথ্যা বলেছি, কারণ এটি নিজের সম্পর্কে এবং নিজের অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রয়োজনীয় অসততা। ফ্রয়েডের এই চিন্তাধারাটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য হিসেবে আসে আর এই কারণেই আমরা এখনও ফ্রয়েডের বিরোধিতা করি। আমরা স্বীকার করতে চাই না যে আমরা আসলে বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলি এবং আমাদের নিজেদের জীবনের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা স্বীকার করতে চাই না যে আমরা সবসময় আমাদের বাইরের কোনো আদর্শের ওপর নির্ভর করে থাকি। এই শক্তি সবসময় কোনো ঈশ্বর বা শক্তিশালী মানুষ নাও হতে পারে; এটি হতে পারে কোনো নেশা, কাজের প্রতি প্রচণ্ড টান কিংবা কোনো বিশেষ জীবনধারা। সেন্ট অগাস্টিন, কিয়ের্কেগার্ড আর টিলিচ এই বিষয়টি খুব ভালো বুঝতেন। তারা দেখেছিলেন যে মানুষ যতই বড়াই করুক না কেন, তার বেঁচে থাকার সাহস সে পায় কোনো ঈশ্বর, যৌন বিজয়, কোনো আদর্শ, টাকা থেকে।
- মাসলোর মতো অনেকে যখন "পুরোপুরি মানুষ হওয়া" উপভোগ করার কথা বলেন, তখন তার মানে কী দাঁড়ায় যদি সেই "পুরোপুরি মানুষ হওয়া" মানেই জগতের সাথে এক চরম অসামঞ্জস্য হয়? আপনি যদি জীবনের মিথ্যার আবরণগুলো সরিয়ে ফেলেন, তবে সেই জয়ের আনন্দ আপনি কীভাবে উপভোগ করবেন? একজন মানুষ হয়তো কিছু সীমাবদ্ধতা আর বিভ্রম থেকে মুক্তি পায়, কিন্তু তাকে তখন আরও ভয়াবহ এক হতাশার মুখোমুখি হতে হয়। পুরোপুরি মানুষ হওয়া মানেই হল দিনের অনেকটা সময় চরম ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে কাটানো। যখন আপনি কাউকে তার নির্ভরশীলতা আর নিরাপত্তা থেকে বের করে আনেন, তখন তার একাকীত্বের বোঝায় সে কী আনন্দ খুঁজে পাবে? লুইস বুনুয়েল তার সিনেমায় প্রায়ই একটা পাগল কুকুর দেখান। এর মানে হল মানুষ যতই অভিনয় করুক না কেন, মাত্র একটি ছোট দুর্ঘটনা বা কুকুরের কামড়ই তার সব অভিনয় আর নিরাপত্তাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। শিল্পী এই অসামঞ্জস্য সম্পর্কে সচেতন থাকেন। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ এই চরম সত্য নিয়ে কী করবে? সে তার চরিত্র গঠনই করেছে যাতে সে জীবনের এই রূঢ় সত্যগুলো এড়িয়ে চলতে পারে এবং অন্ধ হয়ে সুখে থাকতে পারে। এভাবেই সে এক বিচিত্র বিজয় অর্জন করে: আতঙ্ককে সাথে নিয়েও সে আত্মতুষ্ট থাকতে পারে। সার্ত্র মানুষকে এক "নিরর্থক আবেগ" বলেছেন কারণ মানুষ তার নিজের অবস্থা নিয়ে নিজেই বিভ্রান্ত। সে পশুর শরীর নিয়ে দেবতা হতে চায় এবং কল্পনার জগতেই বাস করে। ওর্তেগা যেমনটা বলেছেন, মানুষ তার ধারণাগুলোকে ব্যবহার করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এবং বাস্তবতাকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য। এটি জীবনের এক কঠিন খেলা মানুষের কাছ থেকে এই আড়াল কেড়ে নিলে তারা আর সুখে থাকবে কী করে?
- জগতকে তার প্রকৃত রূপে দেখা অত্যন্ত বিধ্বংসী আর ভয়ংকর। এটি সেই ফলাফলই নিয়ে আসে যা একটি শিশু বছরের পর বছর ধরে তার চরিত্র গঠনের মাধ্যমে এড়াতে চেয়েছিল। এটি মানুষের প্রতিদিনের স্বাভাবিক আর আত্মবিশ্বাসী কাজগুলোকে অসম্ভব করে তোলে। এটি মানুষকে এই মহাবিশ্বের দয়ায় এক কম্পমান প্রাণীতে পরিণত করে এবং তাকে জীবনের অর্থ নিয়ে এক মহাসংকটে ফেলে দেয়।
মনোবিশ্লেষক কিয়ের্কেগার্ড
[সম্পাদনা]- একটি আত্মসচেতন প্রাণী হওয়ার মানে কী? এটি যদি বীভৎস কিছু না-ও হয়, তবে অন্তত অত্যন্ত হাস্যকর। এর মানে হল এটা জানা যে মানুষ আসলে পোকার খাদ্য। আতঙ্কটা এখানেই: শূন্য থেকে আসা, একটি নাম থাকা, আত্মসচেতনতা, মনের গভীর অনুভূতি, জীবন আর আত্মপ্রকাশের জন্য এক তীব্র ব্যাকুলতা থাকা আর এই সব থাকা সত্ত্বেও মারা যাওয়া। এটি একটি ধোঁকার মতো মনে হয়, আর এই কারণেই এক ধরনের সংস্কৃতিমনা মানুষ সরাসরি ঈশ্বরের ধারণার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কোন ধরনের দেবতা এমন জটিল আর শৌখিন পোকার খাদ্য তৈরি করবেন?
- পৃষ্ঠা ৮৭
- স্বচ্ছ চিন্তার মানুষ তিনিই, যিনি বাস্তবতাকে আড়াল করার সেই সব অদ্ভুত "ধারণা" থেকে নিজেকে মুক্ত করেন এবং জীবনের মুখোমুখি দাঁড়ান। তিনি বুঝতে পারেন যে জীবনের সবকিছুই আসলে সমস্যাসংকুল এবং তিনি নিজেকে দিশেহারা মনে করেন। আর এটাই হল সহজ সত্য—বেঁচে থাকা মানেই হল নিজেকে দিশেহারা মনে করা। যিনি এই সত্যটি মেনে নেন, তিনি নিজেকে খুঁজে পেতে শুরু করেন এবং এক শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়ান। একজন জাহাজডুবি হওয়া মানুষের মতো তিনি সহজাতভাবেই আঁকড়ে ধরার মতো কিছু খুঁজবেন। নিজের মুক্তির তাগিদে তার সেই করুণ আর কঠোর দৃষ্টি হবে একদম খাঁটি, যা তার জীবনের বিশৃঙ্খলার মাঝে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। এগুলোই হল একমাত্র অকৃত্রিম চিন্তা; জাহাজডুবি হওয়া মানুষের চিন্তা। বাকি সবকিছুই নিছক বাগাড়ম্বর, লোকদেখানো আর প্রহসন মাত্র। যিনি নিজেকে সত্যিই দিশেহারা মনে করেন না, তার কোনো মুক্তি নেই; অর্থাৎ তিনি কখনোই নিজেকে খুঁজে পান না এবং নিজের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারেন না।
মানুষের জাদু: পরাধীনতার বন্ধন
[সম্পাদনা]- দলগুলোকে কোন শক্তি একত্রিত করে রাখে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফ্রয়েড এটিও দেখিয়েছেন যে দলবদ্ধ মানুষ কেন বিপদকে ভয় পায় না। তারা নিজেদের অসহায় মনে করে না, কারণ তারা তাদের বীর-নেতার শক্তির সাথে নিজেদের একাত্ম করে ফেলে। প্রাকৃতিক আত্মপ্রেম—অর্থাৎ এই অনুভূতি যে আপনার পাশের লোকটি মারা যাবে কিন্তু আপনি নন—নেতার শক্তির ওপর বিশ্বাসের মাধ্যমে আরও প্রবল হয়। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লাখ লাখ মানুষ বিধ্বংসী গোলাগুলির মুখেও ট্রেঞ্চ থেকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তারা যেন একভাবে নিজেরাই নিজেদের সম্মোহিত করে ফেলেছিলেন। মানুষ যখন অসম্ভব পরিস্থিতিতেও বিজয়ের স্বপ্ন দেখে, তখন অবাক হওয়ার কিছু নেই; তাদের সাথে কি সেই পরম শক্তিশালী অভিভাবকতুল্য নেতার শক্তি নেই? মানুষেরা সবসময়ই প্রশ্ন করেছে—দলগুলো কেন এত অন্ধ আর নির্বোধ হয়? ফ্রয়েড উত্তর দিয়েছিলেন, কারণ তারা বিভ্রম চায়। তারা "সবসময় বাস্তবতার চেয়ে অবাস্তবকে বেশি গুরুত্ব দেয়।" আর আমরা জানি এর কারণ কী। বাস্তব জগত এতটাই ভয়ংকর যে তা মেনে নেওয়া কঠিন; এটি মানুষকে বলে যে সে একটি ছোট কম্পমান প্রাণী যে একদিন পচে যাবে আর মারা যাবে। বিভ্রম এই সবকিছু বদলে দেয়। এটি মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, মহাবিশ্বের জন্য প্রয়োজনীয় করে তোলে এবং কোনো না কোনোভাবে অমর করে দেয়। সংস্কৃতি যখন নিজেদের রক্ষা করার সেই বিশাল মিথ্যা প্রচার করে, তখন মা-বাবাই তো মূলত সেই বিভ্রম শিশুর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। সাধারণ মানুষ নেতাদের কাছে ঠিক সেই মিথ্যাটিই চায় যা তাদের প্রয়োজন। ক্যাস্ট্রেশন কমপ্লেক্সকে হারানো এবং তাকে এক বীরত্বপূর্ণ বিজয়ে রূপান্তর করার সেই বিভ্রমকে নেতারা বাঁচিয়ে রাখেন। তাছাড়া, নেতা এমন এক নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দেন যেখানে নিষিদ্ধ আবেগ, গোপন ইচ্ছা আর কল্পনাগুলো প্রকাশ করা যায়। দলগত আচরণের ক্ষেত্রে সবকিছুই জায়েজ, কারণ নেতা তাতে সায় দেন। এটি যেন সেই সর্বশক্তিমান শিশু হওয়ার মতো, যাকে মা-বাবা মনমতো সবকিছু করতে উৎসাহ দেন। এটি মনোবিশ্লেষণমূলক থেরাপির মতো, যেখানে বিশ্লেষক আপনার কোনো চিন্তার জন্য আপনাকে তিরস্কার করেন না। দলের মধ্যে প্রতিটি মানুষকে এক একজন সর্বশক্তিমান বীর মনে হয়, যারা নেতার অনুমোদন পেয়ে নিজেদের সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে। আর এভাবেই আমরা দলগত কর্মকাণ্ডের সেই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা বুঝতে পারি।
- এই নির্ভরতার বিষয়টি কেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তা এর সামগ্রিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। শিশুকে কোনো না কোনোভাবে তার মা-বাবার সেই অলৌকিক ক্ষমতার বিরুদ্ধেও লড়তে হয়। প্রকৃতির সেই রহস্যময় পটভূমি থেকে মা-বাবারা যেমন আবির্ভূত হন, ঠিক তেমনই তারা শিশুর ওপর প্রবল প্রভাব বিস্তার করেন। শিশু নানা কৌশলে আর খাপ খাইয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে। একই সাথে তাকে আতঙ্ক আর শক্তির পুরো বিষয়টি তাদের ওপর নিবদ্ধ করতে হয়, যাতে তাদের মাধ্যমে চারপাশের জগতকে সহজভাবে গ্রহণ করা যায়। এখন আমরা বুঝতে পারি কেন এই নির্ভরতার বিষয়টি এত সমস্যার সৃষ্টি করে। শিশু এর মাধ্যমে তার বড় ভাগ্যকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও, এটিই তার নতুন ভাগ্যে পরিণত হয়। সে একজনের সাথে নিজেকে এমনভাবে বেঁধে ফেলে যাতে সে নিজের ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, বিস্ময়কে সহজ করতে পারে এবং ওই ব্যক্তির শক্তির মাধ্যমে মৃত্যুকে হারানো যায়। কিন্তু তখন সে "নির্ভরতার আতঙ্কে" ভোগে। সেই আশ্রয়কে হারানো, তাকে ছাড়া বাঁচতে না পারার আতঙ্ক তাকে ঘিরে ধরে। নিজের সীমাবদ্ধতা আর অক্ষমতার ভয় তাকে তখনও তাড়া করে ফেরে, তবে তা এখন ওই ব্যক্তির বা নির্ভরতার আধারের রূপ নেয়। মানবজীবন কী অদ্ভুত রকমের বিদ্রূপাত্মক। এই নির্ভরতার আধারটি সবসময় জীবনের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় কারণ সে পুরো জীবন আর একজনের পুরো ভাগ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। এই আধারটিই তখন স্বাধীনতার সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়, কারণ মানুষ বাধ্যতামূলকভাবে এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটি অন্য সব প্রাকৃতিক নির্ভরতা আর আবেগকে একত্রিত করে। এটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক—উভয় ধরনের নির্ভরতার ক্ষেত্রেই সত্য। নেতিবাচক নির্ভরতার ক্ষেত্রে সেই আধারটি আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, যা তখন অমঙ্গল আর বাধা হিসেবে অনুভূত হয়। শৈশবের অনেক তিক্ত স্মৃতি আর মা-বাবার প্রতি আমাদের অভিযোগের মূলে এটিই থাকে। আমরা এই জগতকে মূলত একটি অশুভ জগত হিসেবে মানার বদলে আমাদের সব অসুখের জন্য মা-বাবাকেই একমাত্র দায়ী করার ভান করি। আমরা যেন এটা বোঝাতে চাই যে পৃথিবীতে কোনো অমঙ্গল নেই, বরং যা আছে তা কেবল আমাদের মা-বাবা। নেতিবাচক নির্ভরতার ক্ষেত্রেও আমরা আসলে আমাদের ভাগ্যকে একটি স্বয়ংক্রিয় উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি।
- আমি অন্য জায়গায় যেমনটা বলেছি—যতদূর বোঝা যায়—"সব জীবই নিজের সম্পর্কে ভালো অনুভব করতে পছন্দ করে।" তারা এই অনুভূতি বাড়াতে নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। দার্শনিকরা যেমনটা অনেক আগে থেকেই লক্ষ্য করেছেন, মনে হয় প্রকৃতির হৃদস্পন্দনই যেন এক আনন্দময় আত্ম-বিস্তারের মধ্য দিয়ে চলছে। মানুষের স্তরে যখন আমরা আসি, তখন এই প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ জাগায়। মানুষের মধ্যে এটি অত্যন্ত তীব্র এবং তুলনামূলকভাবে অনির্ধারিত—সে শারীরিক আর প্রতীকী উভয়ভাবেই নিজেকে বিস্তার করতে পারে। এই বিস্তার মানুষের নিজের সম্পর্কে এবং তার জগত সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ "সঠিকতার" অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এটিই মানুষকে বোঝাতে সাহায্য করে যে সে আসলে কী করার চেষ্টা করছে এবং কেন বিবেকই তার নিয়তি। মানুষই প্রকৃতির একমাত্র জীব যার কপালে লেখা আছে "সঠিক" অনুভব করার প্রকৃত অর্থ কী তা খুঁজে বের করা।
- জীবনের ভয় যদি নির্ভরতার একটি দিক হয়, তবে এর সাথে অন্য ভয়টিও যুক্ত থাকে। শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে যখন মৃত্যু সম্পর্কে সচেতন হয়, তখন ওই নির্ভরতার শক্তির ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার দ্বিগুণ কারণ তৈরি হয়। ক্যাস্ট্রেশন কমপ্লেক্স শরীরকে এক বিভীষিকার বস্তুতে পরিণত করে এবং ওই নির্ভরতার আধারটিই এখন নিজের পুনর্জন্মের সেই ‘কসা সুই’ প্রজেক্টের ভার বহন করে। শিশু তাকে অমরত্ব নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহার করে। এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কী হতে পারে? আমি গোর্কির তলস্তয় সম্পর্কে সেই বিখ্যাত উক্তিটি না দিয়ে পারছি না, কারণ এটি নির্ভরতার এই দিকটি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে: "যতদিন এই বুড়ো মানুষটি বেঁচে আছে, আমি এই পৃথিবীতে নিঃস্ব নই।" এটি গোর্কির অন্তরের আবেগ থেকে এসেছে; এটি কোনো সাধারণ ইচ্ছা নয়। এটি একটি চালিকা শক্তি যে ওই ব্যক্তির রহস্য আর দৃঢ়তা তাকে সারাজীবন আশ্রয় দেবে। অন্যের এই নির্ভরতা থেকেই মানুষকে দেবতা বানানোর তাড়না আসে। কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে সবসময় উচ্চাসনে বসানো এবং তাদের মধ্যে অতিপ্রাকৃত শক্তি কল্পনা করার কারণ এটাই: তাদের যত বেশি শক্তি থাকবে, আমরা তত বেশি তার ভাগ পাব। আমরা তাদের অমরত্বের অংশীদার হই এবং এভাবেই আমরা অমর সৃষ্টি করি। হ্যারিংটন যেমনটি সচিত্রভাবে বলেছিলেন: "আমি এই মহাবিশ্বের ওপর বড় ছাপ ফেলছি কারণ আমি এই বিখ্যাত মানুষটিকে চিনি। যখন উদ্ধারকারী জাহাজটি (আর্ক) ছাড়বে, আমি তাতে থাকব।" র্যাঙ্ক যেমনটি বলেছেন, মানুষ সবসময় নিজেকে অমর করার উপকরণের জন্য ক্ষুধার্ত থাকে। দলগুলোর ক্ষেত্রেও এটি সত্য, যা বীরদের জন্য ক্রমাগত ক্ষুধার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে: "প্রতিটি দল, তা ছোট হোক বা বড়, অমরত্বের এক ধরনের ‘ব্যক্তিগত’ তাগিদ অনুভব করে, যা জাতীয়, ধর্মীয় এবং শৈল্পিক বীর তৈরির মাধ্যমে প্রকাশ পায়... ব্যক্তি নিজেই এই সমষ্টিগত অমরত্বের তাগিদের পথ তৈরি করে দেয়..."।
- প্রকৃতি এমন এক ব্যবস্থা করেছে যে মানুষের পক্ষে সরাসরি "সঠিক" অনুভব করা অসম্ভব। এখানে আমাদের একটি কূটাভাস নিয়ে আসতে হবে যা জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এবং মানুষের মধ্যে তা আরও প্রখর। এই কূটাভাসটি দুটি ভিন্নমুখী উদ্দেশ্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একদিকে মানুষ মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার সাথে একাত্ম হতে চায় এবং নিজেকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে মিশিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে সে অনন্য হতে চায়, সবার চেয়ে আলাদা আর স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। প্রথম উদ্দেশ্যটি—অর্থাৎ বড় কিছুর সাথে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়া —তা আসে মানুষের একাকীত্বের ভয় থেকে। প্রকৃতির প্রকাণ্ড শক্তির সামনে নিজেকে তার খুব ক্ষুদ্র আর অসহায় মনে হয়। সে যদি এই মহাজাগতিক নির্ভরতার অনুভূতির কাছে নিজেকে সঁপে দেয় এবং বড় কিছুর অংশ হতে চায়, তবে তা তাকে এক ধরনের শান্তি আর ঐক্য দেয়। এটি তাকে নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার এবং এক উচ্চতর মর্যাদার অনুভূতি দেয়। এটিই হল খ্রিষ্টীয় আগাপে সৃষ্ট জীবনের সাথে "প্রেমময় সৃষ্টির" এক স্বাভাবিক মিলন। র্যাঙ্ক যেমনটি বলেছিলেন, মানুষ "মহাবিশ্বের সাথে একাত্ম হওয়ার এক অনুভূতি" খুঁজে ফেরে। সে চায় "একাকীত্ব থেকে মুক্তি" পেতে এবং "এক বৃহত্তর আর উচ্চতর সত্তার অংশ" হতে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের ঊর্ধ্বে থাকা এক সত্তাকে খুঁজে বেড়ায় যাতে সে বুঝতে পারে সে কে এবং এই মহাবিশ্বে তার একটি জায়গা আছে। কামু তার উক্তিটি লেখার অনেক আগে র্যাঙ্ক বলেছিলেন: "নিজের অহংকারের বাইরে স্থাপিত একটি আদর্শ ঈশ্বরের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েই কেবল মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।"
- র্যাঙ্কের কাজের শক্তি এটাই ছিল যে তিনি মনোবিশ্লেষণমূলক অন্তর্দৃষ্টির সাথে মানুষের মৌলিক অস্তিত্বের তাড়নাগুলোকে যুক্ত করেছিলেন। এভাবে তিনি মানুষের আচরণের গভীরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন এবং এমন এক দলগত মনোবিজ্ঞান তৈরি করেছিলেন যা আসলে মানুষের সামগ্রিক অবস্থার মনোবিজ্ঞান। একটি বিষয় আমরা দেখতে পারি যে মনোবিজ্ঞানীরা যাকে "একাত্মীকরণ" বলেন, তা আসলে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া সেই মহান শক্তির সাথে যুক্ত হওয়ার একটি স্বাভাবিক তাড়না। শৈশবকালীন একাত্মীকরণ হল এই তাড়নারই একটি বিশেষ দিক: শিশু মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিদের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দেয় যাকে আমরা আতঙ্ক, মহিমা আর শক্তির "নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দু" বলেছি। যখন কেউ নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া মা-বাবা বা সামাজিক দলের সাথে মিশে যায়, তখন সে আসলে এক বৃহত্তর অর্থে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। আমরা যদি এই বিষয়টি না বুঝি তবে বীরত্বের জটিলতা বুঝতে পারব না। অমরত্বের এই তাড়না কেবল মৃত্যুভয়ের প্রতিফলন নয়, বরং এটি জীবনের প্রতি মানুষের সমগ্র সত্তার এক আকুতি। সম্ভবত জীবের এই স্বাভাবিক আত্ম-বিস্তারই ব্যাখ্যা করতে পারে কেন এই নির্ভরতা এত সর্বজনীন একটি আবেগ।
- এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা ঈশ্বরের ধারণাকে মানুষের আগাপে স্বভাবের একটি যৌক্তিক পূর্ণতা হিসেবে বুঝতে পারি। ফ্রয়েড যেমন আগাপেকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন, তেমনি তিনি একে প্রচার করা ধর্মকেও অবজ্ঞা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন ঈশ্বরের প্রতি মানুষের এই তৃষ্ণা মানুষের অপরিণত আর স্বার্থপর মনের পরিচয় দেয়: তার অসহায়ত্ব, ভয় আর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টির জন্য তার লোভ। কিন্তু র্যাঙ্ক বুঝতে পেরেছিলেন যে ঈশ্বরের ধারণা কেবল কুসংস্কারের প্রতিফলন নয়, যেমনটা সমালোচক আর "বাস্তববাদীরা" দাবি করেন। বরং এটি জীবনের প্রতি এক অকৃত্রিম আকাঙ্ক্ষা এবং অর্থের প্রাচুর্য খুঁজে পাওয়ার একটি চেষ্টা যা জেমস আমাদের শিখিয়েছেন। মনে হয় বীরত্বপূর্ণ একাত্মতার মধ্যে যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আছে, তা জীবনের মূল শক্তির মধ্যেই নিহিত। মনে হয় এই প্রাণশক্তি স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবী ছাড়িয়ে ওপরে পৌঁছাতে চায়, আর এই কারণেই মানুষ সবসময় ঈশ্বরকে স্বর্গে স্থান দিয়েছে।
- আমরা বলেছিলাম মানুষের পক্ষে সরাসরি "সঠিক" অনুভব করা অসম্ভব এবং এখন আমরা বুঝতে পারি কেন। সে নিজেকে শুধু আগাপের মাধ্যমে বিলীন করেই নয়, বরং অন্য একটি অস্তিত্ববাদী তাড়না এরোসের মাধ্যমেও নিজেকে বিকশিত করতে চায়। এরোস হল আরও বেশি জীবন পাওয়ার ইচ্ছা, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আর নিজের শক্তির বিকাশ। এটি প্রকৃতির ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তোলার এক তাড়না। জীবন তো শেষ পর্যন্ত জীবের জন্য এক চ্যালেঞ্জ এবং নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার এক চমৎকার সুযোগ। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি হল স্বতন্ত্র হওয়ার তাড়না: আমি কীভাবে আমার অনন্য উপহারগুলোকে কাজে লাগাব এবং নিজের বিকাশের মাধ্যমে পৃথিবীতে অবদান রাখব? এখন আমরা সেই ট্র্যাজেডিটি দেখতে পাই যা কেবল মানুষের জন্যই নির্দিষ্ট: সে যদি আগাপের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, তবে সে নিজেকে বিকশিত করতে এবং জীবনের বাকি অংশে নিজের সক্রিয় অবদান রাখতে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। আবার সে যদি এরোসকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে সে প্রাকৃতিক নির্ভরতা আর বৃহত্তর সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। সে সেই কৃতজ্ঞতা আর নম্রতা থেকে দূরে সরে যায় যা সৃষ্টি হওয়ার জন্য এবং জীবনের অভিজ্ঞতা পাওয়ার জন্য তার মধ্যে থাকা উচিত ছিল। মানুষ তাই এই দ্বৈততার চরম উত্তেজনার মধ্যে থাকে। স্বতন্ত্র হওয়া মানেই হল মানুষকে প্রকৃতির বাকি অংশের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। এটি ঠিক সেই একাকীত্ব তৈরি করে যা একজন মানুষ সহ্য করতে পারে না—অথচ নিজেকে অনন্যভাবে গড়ে তোলার জন্য তার এটি প্রয়োজন। এটি এমন এক পার্থক্য তৈরি করে যা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়; এটি একই সাথে নিজের ক্ষুদ্রতা আর আলাদা হয়ে থাকাকে তুলে ধরে। এটিই হল প্রাকৃতিক অপরাধবোধ। মানুষ একে "অযোগ্যতা" হিসেবে অনুভব করে। আর এর কারণটি বাস্তবসম্মত। প্রকৃতির বাকি অংশের তুলনায় মানুষ খুব একটা সন্তোষজনক সৃষ্টি নয়। সে ভয় আর ক্ষমতাহীনতায় জর্জরিত।
- আমরা এখন পুরোপুরি বুঝতে পারছি যে নির্ভরতার বিষয়টিকে কেবল নেতিবাচকভাবে দেখা কতটা ভুল হবে, কারণ এটি মানুষের পূর্ণতা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের নিজের জীবনের একটি মূল্য দেওয়া প্রয়োজন যাতে সে একে "ভালো" বলতে পারে। নির্ভরতার আধারটি তখন মানুষের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা আর প্রচেষ্টার একটি স্বাভাবিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। আবারও আমরা দেখি ট্রান্সফারেন্স কত চমৎকার এক "প্রতিভা"। এটি হল সৃজনশীল ফেটিশবাদের একটি রূপ, এমন এক জায়গা তৈরি করা যেখান থেকে আমাদের জীবন প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করতে পারে। অমরত্ব পাওয়ার শক্তির চেয়ে কাঙ্ক্ষিত আর কী আছে? আমাদের অমর হওয়ার সব প্রচেষ্টাকে একজন মানুষের সাথে কথোপকথনের অংশ করে তোলা কতই না অদ্ভুত আর সহজ। এই গ্রহে আমরা জানি না মহাবিশ্ব আমাদের কাছ থেকে কী চায় বা আমাদের কী দিতে প্রস্তুত। কান্টকে যে প্রশ্নটি ভাবিয়েছিল আমাদের দায়িত্ব কী—তার কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই। আমরা কে আর কেন এখানে এসেছি তা নিয়ে আমরা ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাস করি, তবুও আমরা জানি এর কোনো মানে অবশ্যই আছে। তাই এই অবর্ণনীয় রহস্যকে দূর করার জন্য অন্য একজন মানুষের কাছে আমাদের বীরত্ব প্রদর্শন করার চেয়ে স্বাভাবিক আর কী হতে পারে? এর মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন জানতে পারি আমাদের কাজগুলো অনন্তকাল পাওয়ার যোগ্য কি না। যদি তা খারাপ হয়, তবে আমরা তার প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তা বুঝতে পারি এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা বদলে নিতে পারি।
- নির্ভরতার বীরত্ব যদি নিরাপদ বীরত্ব হতো, তবে আমরা একে তুচ্ছ মনে করতে পারতাম। বীরত্ব মানেই হল নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করা। কিন্তু আমরা যে বিষয়টি বলতে চাইছি তা হল—পরিপূর্ণতা পাওয়ার সব চেষ্টা, বা অন্যকে খুশি করার সব কৌশল সবসময় কাপুরুষোচিত। নির্ভরতার বীরত্বকে যা তুচ্ছ করে তোলে তা হল যখন এই প্রক্রিয়াটি অবচেতন আর স্বয়ংক্রিয় হয়ে পড়ে এবং মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। মনোবিশ্লেষণমূলক থেরাপি সরাসরি এই সমস্যাটি নিয়ে কাজ করে। এর বাইরে অন্য মানুষই হল মানুষের নিয়তি এবং তা খুব স্বাভাবিক। তাকে তার কাজের মাধ্যমে অন্য মানুষের কাছে ভালো হওয়ার প্রমাণ দিতে হয়, কারণ তারাই তার সবচেয়ে নিকটবর্তী পরিবেশ। এটি কেবল জৈবিক কারণে নয়, বরং আধ্যাত্মিক কারণে। মানুষেরাই একমাত্র সত্তা যারা অর্থের যোগসূত্র তৈরি করে, অর্থাৎ আমরা যে মানবিক অর্থের কথা জানি তা কেবল তাদের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।
- আবারও বলছি, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এই নির্ভরতা একটি সর্বজনীন আবেগ। এটি অন্যের মাধ্যমে বীরত্বপূর্ণ আত্ম-বিস্তারের দ্বারা নিজেকে সুস্থ আর পূর্ণ করার একটি স্বাভাবিক চেষ্টা। ট্রান্সফারেন্স হল সেই বৃহত্তর বাস্তবতা যা মানুষের প্রয়োজন। এই কারণেই ফ্রয়েড আর ফেরেঞ্জি বলেছিলেন যে ট্রান্সফারেন্স আসলে এক ধরনের সাইকোথেরাপি, অর্থাৎ "রোগীর নিজেকে সুস্থ করার একটি স্বশিক্ষিত চেষ্টা।" মানুষ নিজেদের খুঁজে পাওয়ার জন্য যে বাস্তবতা প্রয়োজন তা নিজেরাই তৈরি করে। এই কথাগুলোর তাৎপর্য হয়তো সরাসরি বোঝা যায় না, কিন্তু নির্ভরতার তত্ত্বের জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ট্রান্সফারেন্স মানে হয় নিজেকে প্রমাণ করার জন্য এক উচ্চতর সত্তার দিকে বীরত্বপূর্ণ এগিয়ে যাওয়া এবং বেঁচে থাকার জন্য যদি মানুষের এই প্রমাণের প্রয়োজন হয়, তবে ট্রান্সফারেন্সকে কেবল এক অবাস্তব কল্পনা হিসেবে দেখার মনোবিশ্লেষণমূলক ধারণাটি ভেঙে পড়ে। আত্ম-তৃপ্তির জন্য এই অভিক্ষেপ প্রয়োজনীয় এবং কাম্য। অন্যথায় মানুষ তার একাকীত্ব আর বিচ্ছিন্নতায় ভেঙে পড়বে এবং নিজের জীবনের বোঝা বইতে পারবে না। র্যাঙ্ক যেমনটি বিজ্ঞতার সাথে দেখেছিলেন, এই প্রক্ষেপণ হল মানুষের এক প্রয়োজনীয় ভারমুক্ত হওয়া; মানুষ কেবল নিজের মধ্যে বন্ধ হয়ে নিজের জন্য বাঁচতে পারে না। তাকে তার জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য এমনকি নিজের দোষগুলোও বাইরের দিকে প্রক্ষেপ করতে হয়। আমরা নিজেদের সৃষ্টি করিনি, কিন্তু আমরা নিজেদের নিয়ে আটকে আছি। তাত্ত্বিকভাবে আমরা বলি যে ট্রান্সফারেন্স হল বাস্তবতার এক বিকৃতি। কিন্তু এখন আমরা দেখি যে এই বিকৃতির দুটি দিক আছে: একটি হল জীবন আর মৃত্যুর ভয় থেকে জন্ম নেওয়া বিকৃতি, আর অন্যটি হল নিজেকে বিস্তার করার এবং নিজের অন্তরের সত্তাকে প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করার বীরত্বপূর্ণ চেষ্টা। অন্যভাবে বললে, ট্রান্সফারেন্স মানুষের সামগ্রিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটায় এবং সেই অবস্থা নিয়ে এক বিশাল দার্শনিক প্রশ্ন তুলে ধরে।
- পৃষ্ঠা ১৫৮
অটো র্যাঙ্ক এবং কিয়ের্কেগার্ডের ওপর মনোবিশ্লেষণের পরিসমাপ্তি
[সম্পাদনা]- ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা একটি বিষয় দেখতে পাই যে, প্রাণীর চেতনা সবসময় সংস্কৃতির মাঝে হারিয়ে যায়। সংস্কৃতি প্রকৃতির বিরোধিতা করে এবং তাকে ছাপিয়ে যায়। সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হল আমাদের প্রাণীসত্তাকে বীরত্বের সাথে অস্বীকার করা। কিন্তু এই অস্বীকার সব যুগে সমানভাবে কার্যকর হয় না। যখন মানুষ ইহুদি-খ্রিস্টান জগতের ছত্রছায়ায় নিরাপদে বাস করত, তখন সে এক বিশাল সত্তার অংশ ছিল। অর্থাৎ তার মহাজাগতিক বীরত্বের পথটি পুরোপুরি ঠিক করা ছিল। মানুষ ঈশ্বরের ইচ্ছায় অদৃশ্য জগত থেকে এই দৃশ্যমান জগতে আসত এবং মর্যাদা ও বিশ্বাসের সাথে জীবন কাটিয়ে ঈশ্বরের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করত। বিয়ে করা বা সন্তান জন্ম দেওয়া ছিল তার দায়িত্ব। যিশুর মতো সেও তার পুরো জীবন পরম পিতার চরণে উৎসর্গ করত। বিনিময়ে সে ঈশ্বরের সমর্থন পেত এবং পরকালে অনন্ত জীবনের পুরস্কার লাভ করত। পৃথিবীটা দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক আর অপমানের জায়গা হলেও তার কাছে কিছু যেত আসত না। কারণ সে জানত সে ঈশ্বরের সেবা করছে এবং ঈশ্বর তাকে প্রতিদান দেবেন। এক কথায়, মানুষের মহাজাগতিক বীরত্ব নিশ্চিত ছিল, যদিও সে নিজে ছিল অতি তুচ্ছ। খ্রিস্টীয় জীবনদর্শনের এটাই বড় সাফল্য: এটি দাস, পঙ্গু, নির্বোধ এবং সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যেই বীরত্বের এক নিরাপত্তা দিতে পেরেছিল। আর তা সম্ভব হয়েছিল পৃথিবী থেকে এক ধাপ পিছিয়ে গিয়ে স্বর্গ নামের অন্য এক মাত্রায় আশ্রয় নিয়ে। অন্যভাবে বলা যায়, খ্রিস্টধর্ম মানুষের প্রাণীসত্তাকেই—যাকে মানুষ সবচেয়ে বেশি অস্বীকার করতে চায়—তার বীরত্ব পাওয়ার শর্ত হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
- ধর্মীয় সমাধানের বিষয়টি বুঝলে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে আধুনিক মানুষ নিজেকে এক অসম্ভব পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার এখনও বীর হওয়ার প্রয়োজন হয় এবং সে জানতে চায় যে জগতের এই বিশাল ব্যবস্থায় তার জীবনের গুরুত্ব আছে। তাকে এখনও গভীর বিশ্বাস আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে কোনো উচ্চতর অর্থের সাথে মিশে যেতে হয়—যাকে আমরা একাত্ম হওয়ার চিরন্তন তাড়না বলেছি। কিন্তু তার যদি কোনো ঈশ্বর না থাকে, তবে সে এটি কীভাবে করবে? র্যাঙ্ক যেমনটি দেখেছিলেন, প্রথম যে পথটি মানুষের মাথায় এসেছিল তা হল "রোমান্টিক সমাধান": সে মহাজাগতিক বীরত্ব পাওয়ার এই তাড়নাকে প্রেমের মানুষের ওপর অর্পণ করল। নিজের অন্তরের যে মহিমা তার প্রয়োজন ছিল, তা সে এখন তার সঙ্গীর মাঝে খুঁজতে শুরু করল। প্রেমের সঙ্গীই তখন তার জীবনের লক্ষ্য পূরণের এক দৈব আদর্শ হয়ে দাঁড়াল। আধ্যাত্মিক আর নৈতিক সব প্রয়োজন এখন একজন ব্যক্তির ওপর নিবদ্ধ হল। আধ্যাত্মিকতা, যা একসময় অন্য কোনো জগতের বিষয় ছিল, তা এখন এই মর্ত্যে নেমে এলো এবং অন্য একজন মানুষের রূপ নিল। মুক্তি এখন আর ঈশ্বরের মতো কোনো বিমূর্ত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা খোঁজা হয় "অন্যকে দেবতা বানানোর" মাঝে। একে আমরা "নির্ভরতার মাধ্যমে দেবত্ব আরোপ" বলতে পারি। মানুষ এখন "দুজনের এক মহাবিশ্বে" বাস করে। ইতিহাসে সবসময়ই মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ছিল—যেমন এলুইস এবং আবেলর্ড, অ্যালসিবিয়াডেস এবং সক্রেটিস কিংবা সলোমনের গান-এর কথা বলা যায়। কিন্তু মূল পার্থক্য হল, ঐতিহ্যবাহী সমাজে মানুষের সঙ্গী ঈশ্বরের পুরো জায়গাটা দখল করে নিতে পারত না; আধুনিক সমাজে সে তা করে। প্রেমের মানুষকে আমরা কতটা দেবতার আসনে বসাই তা আধুনিক গানগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়। সেই গানগুলো বলে যে প্রিয় মানুষটি হল "বসন্তকাল" বা "স্বর্গীয় আলো", তার চোখ "তারার মতো উজ্জ্বল", ভালোবাসার অভিজ্ঞতা হবে "স্বর্গীয়" এভাবেই চলতেই থাকে। এই গানগুলো মানুষের অন্তরের অভিজ্ঞতার ক্ষুধা আর তার আবেগপূর্ণ হাহাকারকেই প্রকাশ করে। বিষয়টি হল, যদি প্রেমের মানুষটি দৈব পূর্ণতার অধিকারী হয়, তবে তার সাথে যুক্ত হয়ে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সে তার নিজের আদর্শ খুঁজে পাওয়ার এক সর্বোচ্চ মানদণ্ড পায়; তার সব অন্তরের দ্বন্দ্ব আর অপরাধবোধ এই সবকিছুই সে সেই পূর্ণতার সাথে মিশে গিয়ে দূর করার চেষ্টা করতে পারে। আধুনিক মানুষ প্রেমের মানুষের মাধ্যমে তার নিজেকে বিস্তার করার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে, ঠিক যেমন একসময় ঈশ্বরের মাধ্যমে করা হতো। এক কথায়, প্রেমের মানুষটিই তখন ঈশ্বর। একটি হিন্দু গানে যেমন বলা হয়েছে: "আমার প্রিয়তম ঈশ্বরের মতো... সে যদি আমাকে গ্রহণ করে তবেই আমার অস্তিত্ব ধন্য।" র্যাঙ্ক তাই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে আধুনিক মানুষের প্রেম একটি ধর্মীয় সমস্যা।
- ফ্রয়েড মনে করতেন আধুনিক মানুষের অন্যের ওপর এই নৈতিক নির্ভরতা হল ইডিপাস কমপ্লেক্সের ফল। কিন্তু র্যাঙ্ক বুঝতে পেরেছিলেন এটি আসলে প্রাণীসত্তাকে অস্বীকার করার সেই ‘কসা সুই’ প্রজেক্টেরই একটি অংশ। যেহেতু এখন আর এমন কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থা নেই যেখানে এই অস্বীকারকে জায়গা দেওয়া যায়, তাই মানুষ তার সঙ্গীকে আঁকড়ে ধরেছে। ঈশ্বরের ছত্রছায়ায় থাকা ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ল, তখন মানুষ এক "তুমি"-র আশ্রয় নিল। আধ্যাত্মিক আদর্শ হারিয়ে যাওয়ার ফলেই আধুনিক মানুষ তার সঙ্গী, মা-বাবা কিংবা থেরাপিস্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তার কাউকে প্রয়োজন, সম্মিলিত আদর্শের জায়গায় কোনো ব্যক্তিগত আদর্শ প্রয়োজন যা তাকে সঠিক বলে প্রমাণ করবে। যৌনতা, যাকে ফ্রয়েড ইডিপাস কমপ্লেক্সের মূল মনে করতেন, তা আসলে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার আরেকটি ভিন্ন প্রচেষ্টা। স্বর্গে যদি কোনো ঈশ্বর না থাকে যিনি এই দৃশ্যমান জগতকে অর্থপূর্ণ করবেন, তবে মানুষ হাতের কাছে যা পায় তা দিয়েই তার সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে।
- কিন্তু এখানে মানুষের জন্য একটি সমস্যা আছে। যৌনতা যদি তার প্রাণীকুলের সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন হয়, তবে এটি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে সে অস্তিত্বের এই শিকলের একটি কড়ি মাত্র, যা সহজেই অন্য কারো দিয়ে বদলে নেওয়া যায় এবং যার নিজের কোনো গুরুত্ব নেই। যৌনতা তাই প্রজাতির চেতনাকে তুলে ধরে এবং ব্যক্তির নিজস্বতাকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু মানুষ চায় তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে: মহাবিশ্বের জন্য বিশেষ উপহারসম্পন্ন এক বীর হিসেবে নিজেকে দেখতে। সে অন্য প্রাণীদের মতো কেবল একটি যৌনতা-চালিত প্রাণী হয়ে থাকতে চায় না, এর মাঝে কোনো মানবিক অর্থ নেই। তাই শুরু থেকেই যৌন মিলন একটি দ্বৈত নেতিবাচকতার প্রতিনিধিত্ব করে: এটি শারীরিক মৃত্যু এবং ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য লোপের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ব্যাখ্যা করে কেন মানব সমাজে শুরু থেকেই যৌনতা নিয়ে এত বিধিনিষেধ ছিল। এগুলো পশুর মতো একঘেয়েমি থেকে মানুষের ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে। যৌনতাকে অস্বীকার করার কঠিন নিয়মের মাধ্যমে মানুষ তার শরীরের ওপর আধ্যাত্মিক অমরত্বের একটি ছাপ ফেলে দেয়। সে যৌন বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল কারণ সে শরীরের ওপর জয়ী হতে চেয়েছিল এবং সে তার শরীরের আনন্দকে সর্বোচ্চ আনন্দের জন্য বিসর্জন দিয়েছিল: যা হল চিরকাল এক আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে বেঁচে থাকা।
- আমরা যখন প্রেমের সঙ্গীকে ঈশ্বরের আসনে বসাই, তখন আমরা আসলে কী চাই? আমরা মুক্তি চাই এর চেয়ে কম কিছু নয়। আমরা আমাদের সব ভুল আর তুচ্ছতা থেকে মুক্তি পেতে চাই। আমরা চাই আমাদের সৃষ্টি যেন বৃথা না হয়। আমরা বীরত্বের অভিজ্ঞতা আর পূর্ণ স্বীকৃতির জন্য সঙ্গীর দিকে তাকাই; আমরা আশা করি ভালোবাসার মাধ্যমে তারা আমাদের "ভালো মানুষ" করে তুলবে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, মানুষ এটা করতে পারে না। প্রেমের মানুষটি মহাজাগতিক বীরত্ব দিতে পারে না; সে নিজের নামে কাউকে ক্ষমা করতে পারে না। কারণ সীমাবদ্ধ এক জীব হিসেবে তার নিজেরও ধ্বংস অনিবার্য, আর সেই ধ্বংসের লক্ষণ আমরা তার ভুল আর বার্ধক্যের মাঝে দেখতে পাই। মুক্তি কেবল ব্যক্তির বাইরের কোনো জগত থেকে আসতে পারে, সৃষ্টির সেই পরম উৎস থেকে আসতে পারে। র্যাঙ্ক যেমনটি দেখেছিলেন, এটি তখনই সম্ভব যখন আমরা আমাদের নিজস্বতা ত্যাগ করি এবং নিজেদের অসহায় প্রাণীসত্তাকে স্বীকার করে নিই। কিন্তু কোন সঙ্গী আমাদের এটা করতে দেবে? সে তো চায় আমরা তার কাছে ঈশ্বর হয়ে থাকি। অন্যদিকে, কোনো পাগল ছাড়া অন্যকে মুক্তি দেওয়ার দায়িত্ব নিতে চাইবে? এমনকি সম্পর্কে যে ব্যক্তি ঈশ্বরের ভূমিকা পালন করে সেও এটি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারে না, কারণ সে জানে যে অন্যজন যা চায় তা দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। তার সেই অসীম বীরত্ব নেই। সে ঈশ্বর হওয়ার বোঝা বইতে পারে না এবং তাই একসময় সে তার সঙ্গীর প্রতি বিরক্ত হয়ে ওঠে। তাছাড়া, এই প্রশ্নটি সবসময় থেকেই যায়: নিজের সেবক যদি এত তুচ্ছ আর অযোগ্য হয়, তবে সে নিজে কীভাবে এক সত্যিকারের ঈশ্বর হতে পারে?
- একজন মানুষ কীভাবে অন্যজনের কাছে ঈশ্বরের মতো "সবকিছু" হতে পারে? কোনো মানবিক সম্পর্কই ঈশ্বর হওয়ার এই বোঝা বইতে পারে না এবং এর পরিণাম দুপক্ষকেই ভোগ করতে হয়। এর কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। ঈশ্বরকে একটি নিখুঁত আধ্যাত্মিক সত্তা মনে করার কারণ হল তিনি বিমূর্ত—হেগেল যেমনটি দেখেছিলেন। তিনি কোনো রক্ত-মাংসের ব্যক্তি নন, তাই তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা আমাদের বিকাশে বাধা দেয় না। আমরা যখন একজন "নিখুঁত" মানুষ খুঁজি, তখন আমরা আসলে এমন কাউকে খুঁজি যে আমাদের ইচ্ছাকে পুরোপুরি গুরুত্ব দেবে। কিন্তু কোনো মানুষই এটি করতে পারে না; মানুষের নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে যা আমাদের বিরক্তির কারণ হতে পারে। ঈশ্বরের মহিমা আর শক্তি থেকে আমরা নিজেদের পুষ্ট করতে পারি কারণ তা জগতের কোনো ঘটনা দিয়ে ক্ষুণ্ণ হয় না। কিন্তু কোনো রক্ত-মাংসের সঙ্গী এই নিশ্চয়তা দিতে পারে না কারণ সে বাস্তব। আমরা তাকে যতই দেবতা বানাই না কেন, শেষ পর্যন্ত তার মাঝে জাগতিক ক্ষয় আর অপূর্ণতা ফুটে ওঠে। আর সে যেহেতু আমাদের মূল্যায়নের মানদণ্ড, তাই তার সেই অপূর্ণতা আমাদের ওপর এসে পড়ে। আপনার সঙ্গী যদি আপনার জন্য "সবকিছু" হয়, তবে তার যেকোনো ছোট ত্রুটি আপনার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কোনো নারী যদি তার সৌন্দর্য হারায়, বা তার সেই শক্তি আর নির্ভরযোগ্যতা না থাকে যা আমরা ভেবেছিলাম, তবে তার ওপর আমাদের সব বিনিয়োগ বিফলে যায়। অপূর্ণতার ছায়া আমাদের জীবনে নেমে আসে এবং তার সাথে আসে মৃত্যু আর বীরত্বের পরাজয়। "সে কমে যাওয়া" = "আমার মরে যাওয়া"। আমাদের দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনে এত তিক্ততা আর একে অপরকে দোষারোপ করার কারণ এটাই। আমরা আমাদের প্রিয় মানুষের কাছ থেকে যে প্রতিফলন পাই তা আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিখুঁত হয় না। তাদের মানবিক ত্রুটি দেখে আমরা নিজেদের ছোট মনে করি। আমাদের ভেতরটা শূন্য হয়ে যায়। এই কারণেই আমরা প্রায়ই প্রিয়জনদের আক্রমণ করি এবং তাদের ছোট করার চেষ্টা করি। আমরা যখন দেখি আমাদের দেবতার পা মাটির তৈরি, তখন নিজেদের বাঁচাতে আমরা তাদের ওপর চড়াও হই। এই অর্থে সঙ্গীকে ছোট করা আসলে একটি সৃজনশীল কাজ যা আমাদের সেই মিথ্যার সংশোধন করে এবং আমাদের অন্তরের স্বাধীনতাকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু সবাই এটি করতে পারে না কারণ অনেকেরই বেঁচে থাকার জন্য এই মিথ্যার প্রয়োজন হয়। আমাদের হয়তো অন্য কোনো ঈশ্বর নেই এবং আমরা সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের ছোট করতেও রাজি থাকি, যদিও আমরা জানি এটি অসম্ভব এবং এটি আমাদের দাসত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটিই হল বিষণ্নতা একটি সরাসরি ব্যাখ্যা।
- সৃজনশীল মানুষের বৈশিষ্ট্য হল এই যে সে সাধারণ গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। তার জীবনের অভিজ্ঞতা জগতকে তার কাছে একটি সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে; ফলে তাকে নিজের মতো করে এর একটি অর্থ খুঁজে বের করতে হয়।
- পৃষ্ঠা ১৭১
- এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ঐতিহাসিকভাবে শিল্প আর মানসিক বিকৃতির মধ্যে এত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সৃজনশীলতার পথটি পাগলাগারদের খুব কাছ দিয়ে যায় এবং প্রায়ই সেখানে গিয়ে শেষ হয়।
- পৃষ্ঠা ১৭২
মনোবিশ্লেষণের বর্তমান পরিণতি
[সম্পাদনা]- যখন আমরা বলি স্নায়ুবিকৃতি জীবনের সত্যকে তুলে ধরে, তখন আমরা আসলে বোঝাতে চাই যে সহজাত প্রবৃত্তিহীন একটি প্রাণীর জন্য জীবন এক বিশাল সমস্যা। ব্যক্তিকে জগতের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয়, আর সে এটি অন্য যেকোনো প্রাণীর মতোই করে থাকে: জগতকে ছোট করে নিয়ে, অভিজ্ঞতার দুয়ার বন্ধ করে দিয়ে এবং জগতের আতঙ্ক ও নিজের উদ্বেগ উভয় সম্পর্কেই এক ধরনের উদাসীনতা তৈরি করে। তা না হলে সে কোনো কাজই করতে পারত না। ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের সেই মহান শিক্ষাটি আমরা বারবার বললেও ফুরাবে না: অবদমন হল এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মরক্ষা এবং সৃজনশীল আত্ম-সীমাবদ্ধতা—প্রকৃতপক্ষে এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির এক প্রাকৃতিক বিকল্প। র্যাঙ্ক মানুষের এই প্রাকৃতিক প্রতিভার জন্য একটি চমৎকার শব্দ ব্যবহার করেছেন: তিনি একে বলেন "পার্শিয়ালিশন" এবং তিনি একদম ঠিকই বুঝেছেন যে এটি ছাড়া জীবন অসম্ভব। আমরা যাকে সুসংগঠিত মানুষ বলি, তার জগতকে আংশিক করে দেখার ক্ষমতা আছে যাতে সে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে। আমি "ফেটিশিজিশন" শব্দটি ব্যবহার করেছি, যা আসলে একই ধারণা: একজন "স্বাভাবিক" মানুষ জীবন থেকে ততটুকুই গ্রহণ করে যতটুকু সে হজম করতে পারে, তার বেশি নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, মানুষ দেবতা হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি যে সে পুরো জগতকে গ্রহণ করবে; সে অন্য প্রাণীদের মতোই তৈরি হয়েছে যাতে সে শুধু তার নাকের ডগার সামনের জগতটুকু দেখতে পারে। দেবতারা পুরো সৃষ্টিকে গ্রহণ করতে পারেন কারণ একমাত্র তারাই এর অর্থ বোঝেন এবং জানেন কেন এটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু মানুষ যখনই মাটি থেকে তার নাক তোলে এবং জীবন-মৃত্যু, একটি গোলাপ বা নক্ষত্রপুঞ্জের অর্থের মতো শাশ্বত সমস্যাগুলোর খোঁজ করতে শুরু করে—তখনই সে বিপদে পড়ে। বেশিরভাগ মানুষ তাদের সমাজের ঠিক করে দেওয়া ছোটখাটো সমস্যার মধ্যেই নিজেদের আটকে রেখে এই বিপদ থেকে দূরে থাকে। এদেরকেই কিয়ের্কেগার্ড "অদূরদর্শী" এবং "স্থূলবুদ্ধি" মানুষ বলেছেন। তারা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে নিজেদের শান্ত রাখে—এবং এভাবেই তারা স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারে।
- আধুনিক মানুষ তার নিজের মোহভঙ্গের শিকার; তার নিজের বিশ্লেষণাত্মক শক্তির কারণেই সে তার উত্তরাধিকার হারিয়েছে। আধুনিক মনের বৈশিষ্ট্য হল রহস্য, সরল বিশ্বাস আর সহজ আশাকে নির্বাসিত করা। আমরা দৃশ্যমান, স্পষ্ট, কার্যকারণ সম্পর্ক এবং যুক্তির ওপর জোর দিই—সবসময়ই যুক্তি। আমরা স্বপ্ন আর বাস্তব, তথ্য আর কল্পনা, প্রতীক আর শরীরের মধ্যে পার্থক্য জানি। কিন্তু আমরা সহজেই দেখতে পাই যে আধুনিক মনের এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আসলে স্নায়ুবিকৃতির লক্ষণ। স্নায়ুরোগীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সে বাস্তবতার সাপেক্ষে নিজের অবস্থাটা "জানে"। তার কোনো সন্দেহ নেই; তাকে আশা ও বিশ্বাস দিতে পারে এমন কিছু আপনি বলতে পারবেন না। সে এক অসহায় প্রাণী যার শরীর পচে যায়, যে মারা যাবে, যে ধূলোয় মিশে যাবে এবং চিরতরে হারিয়ে যাবে। শুধু এই পৃথিবীতেই নয়, মহাবিশ্বের সব জায়গাতেই সে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তার জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, তার জন্ম না নিলেই হয়তো ভালো হতো—ইত্যাদি ইত্যাদি। সে পরম সত্য আর বাস্তবতাকে চেনে, পুরো মহাবিশ্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সে জানে।
- সত্য নিয়ে কেউ বাঁচতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য মানুষের বিভ্রমের প্রয়োজন। শুধু শিল্প, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান আর ভালোবাসার মতো বাইরের বিভ্রম নয়, বরং অন্তরের বিভ্রমও প্রয়োজন যা বাইরের বিভ্রমগুলোর শর্ত তৈরি করে [অর্থাৎ নিজের শক্তির ওপর এক ধরনের আস্থা এবং অন্যদের শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারার বোধ]।
- অটো র্যাঙ্ক থেকে, আর্নেস্ট বেকারের দ্য প্রেজেন্ট আউটকাম অফ সাইকোঅ্যানালাইসিস
- স্নায়ুরোগী জীবন থেকে দূরে সরে যায় কারণ সে জীবন সম্পর্কে নিজের বিভ্রমগুলো ধরে রাখতে পারছে না; এটি প্রমাণ করে যে বিভ্রম ছাড়া জীবন অসম্ভব।
- পৃষ্ঠা ১৮৯
- মানুষ তার নিজের ক্ষুদ্রতাকে সহ্য করতে পারে না, যদি না সে একে এক বিশাল স্তরে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে।
- পৃষ্ঠা ১৯৬
- সব ধর্মই তার নিজের আদর্শের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকে।
- পৃষ্ঠা ২০৪
- একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর পর আরও বেশি "জানা" মানুষকে সাহায্য করে না, বরং নিজেকে কিছুটা ভুলে গিয়ে জীবন কাটানো আর কাজ করাই তাকে সাহায্য করে।
- আধুনিক মন যেসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে গর্ব করে, সেগুলোই আসলে পাগলামির লক্ষণ। পাগলের চেয়ে বেশি যুক্তিবাদী আর কেউ নেই, কার্যকারণ সম্পর্কের খুঁটিনাটি নিয়ে সে-ই সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামায়। পাগলরাই আমাদের চেনা শ্রেষ্ঠ যুক্তিবিদ, আর এই বৈশিষ্ট্যই তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের জীবনের সবটুকু শক্তি মনের মধ্যে সংকুচিত হয়ে পড়ে। সুস্থ মানুষের এমন কোন জিনিস আছে যা পাগলদের নেই? তা হল অসাবধান হওয়ার ক্ষমতা, বাহ্যিক দিকগুলো এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, একটু বিশ্রাম নেওয়া আর জগতকে দেখে হাসার ক্ষমতা। তারা সহজ হতে পারে না, প্যাসকেলের মতো এক অদ্ভুত বাজিতে তারা তাদের পুরো অস্তিত্ব বাজি রাখতে পারে না। ধর্ম সবসময় যা করতে বলেছে নিজের জীবনের এক এমন ন্যায্যতা বিশ্বাস করা যা অসম্ভব মনে হয় পাগলরা তা করতে পারে না।
- খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ পাগল হওয়া থেকে বাঁচতে কাজের নেশায় ডুবে থাকতে চায়। আমি আগে ভাবতাম হোটেলের রান্নাঘরে আগুনের শিখার সামনে দানবীয় পরিশ্রম, একবারে এক ডজন টেবিলে খাবার পরিবেশনের তাড়াহুড়ো, পর্যটন মৌসুমে ট্রাভেল এজেন্টের অফিসের সেই পাগলামি কিংবা তপ্ত দুপুরের রাস্তায় সারাদিন ড্রিল মেশিন দিয়ে কাজ করার যন্ত্রণা মানুষ কীভাবে সহ্য করে। উত্তরটা এতই সহজ যে আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়: এই কাজের পাগলামি আসলে মানুষের সামগ্রিক অবস্থারই প্রতিচ্ছবি। এগুলো আমাদের জন্য "সঠিক", কারণ এর বিকল্প হল এক সহজাত চরম হতাশা। এই কাজগুলোর দৈনন্দিন পাগলামি আসলে পাগলাগারদে যাওয়া থেকে বাঁচার এক ধরনের টিকা। শ্রমিকরা ছুটি কাটিয়ে কত আনন্দ আর উৎসাহ নিয়ে তাদের সেই একঘেয়ে রুটিনে ফিরে আসে তা দেখুন। তারা এক ধরনের স্থিরতা আর হালকা মন নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে কারণ এটি আরও ভয়ংকর কোনো কিছুকে ভুলিয়ে দেয়। মানুষকে বাস্তবতার হাত থেকে রক্ষা করতে হয়।
মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা
[সম্পাদনা]- অ্যাডলারই প্রথম দেখেছিলেন যে নিম্ন আত্মসম্মান হল মানসিক অসুস্থতার প্রধান সমস্যা। একজন মানুষের আত্মসম্মান নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা কখন হয়? ঠিক তখনই, যখন নিজের ভাগ্যকে বীরত্বের সাথে জয় করার সামর্থ্য নিয়ে তার মনে সন্দেহ জাগে; যখন সে তার নিজের অমরত্ব এবং জীবনের স্থায়ী মূল্য নিয়ে দ্বিধায় ভোগে; যখন সে বিশ্বাস করতে পারে না যে তার বেঁচে থাকা আসলে এই মহাবিশ্বে কোনো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলতেই পারি যে, নিজের প্রাণীসত্তাকে অস্বীকার করতে গিয়ে এক জায়গায় আটকে পড়ার একটি ধরণই হল মানসিক অসুস্থতা।
- আসল কথা হল, ঋতুনিবৃত্তির সময় একজন মহিলার যে অঙ্গচ্ছেদের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হয়, তা অত্যন্ত বাস্তব। ফ্রয়েড বিষয়টিকে যেভাবে সংকীর্ণভাবে দেখেছিলেন সেভাবে নয়, বরং র্যাঙ্ক, অস্তিত্ববাদী এবং ব্রাউনের বিস্তৃত ধারণায় এটি সত্য। বস যেমনটি বলেছিলেন, অঙ্গচ্ছেদ ভীতি হল এমন এক পথ যার মাধ্যমে অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা আতঙ্ক মানুষের জগতে ঢুকে পড়ে। আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, ঋতুনিবৃত্তি আসলে শরীরের প্রতি সেই পুরোনো আতঙ্ককে আবার জাগিয়ে তোলে। এটি বুঝিয়ে দেয় যে, নিজের স্রষ্টা হওয়ার সেই কসা-সুই প্রজেক্ট হিসেবে শরীর আসলে পুরোপুরি ব্যর্থ ঠিক যে অভিজ্ঞতা শৈশবে ইডিপাস ক্যাস্ট্রেশন উদ্বেগের জন্ম দেয়। একজন মহিলা তখন খুব নির্মমভাবে বুঝতে পারেন যে তিনি কেবলই একটি জৈবিক প্রাণী। ঋতুনিবৃত্তি হল এক ধরনের "পশুর-জন্মদিন" যা বিশেষভাবে শারীরিক অবক্ষয়ের চিহ্ন বহন করে। এটি যেন প্রকৃতি মানুষের ওপর এক অমোঘ শারীরিক মাইলফলক বসিয়ে দিচ্ছে এবং একটি দেওয়াল তুলে দিয়ে বলছে, "তুমি এখন আর জীবনের পথে এগোচ্ছ না, তুমি এখন শেষের দিকে যাচ্ছ, মৃত্যুর সেই পরম অমোঘ নিয়তির দিকে।" পুরুষদের যেহেতু এমন কোনো "পশু-জন্মদিন" বা নির্দিষ্ট শারীরিক চিহ্ন নেই, তাই তাদের "কসা সুই" প্রজেক্ট হিসেবে শরীরের ব্যর্থতা নিয়ে সাধারণত এমন রূঢ় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় না। শৈশবের সেই একবারের অভিজ্ঞতাই তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল এবং তারা সাংস্কৃতিক বিশ্ববীক্ষার প্রতীকী শক্তির আড়ালে সেই সমস্যাটিকে কবর দিয়ে দেয়। কিন্তু মহিলারা এখানে কম ভাগ্যবান; তাকে জীবনের শারীরিক বাস্তবতার সাথে মনস্তাত্ত্বিকভাবে হঠাৎ করে তাল মেলাতে হয়। গ্যেটের প্রবাদটি একটু ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, মৃত্যু তখন শুধু তার দরজায় কড়া নেড়ে চলে যায় না (যা পুরুষরা তাদের বার্ধক্যকে এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে করে থাকে), বরং মৃত্যু দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলে সরাসরি সামনে এসে দাঁড়ায়।
- ফ্যালিক মায়ের চিত্রটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং একে সরাসরি ক্যাস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সাথে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ফ্রয়েড সঠিক ছিলেন। কিন্তু সমস্যার যৌন দিকটিকে এর মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা এবং যা আসলে গৌণ (যৌনতা) তাকে মুখ্য (অস্তিত্বের সংকট) হিসেবে ধরে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ভুল করেছিলেন। নারীর যৌনাঙ্গের প্রতি আতঙ্ক মানুষের এক সর্বজনীন অভিজ্ঞতা হতে পারে, তা মেয়েদের ক্ষেত্রে হোক বা ছেলেদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এর কারণ হল শিশু তার সর্বশক্তিমান মাকে দেখতে চায়, যিনি তার সব সুরক্ষা আর ভালোবাসার উৎস এবং যিনি লিঙ্গের বিভাজনের ঊর্ধ্বে এক সম্পূর্ণ দৈব সত্তা। তাই মায়ের "অঙ্গচ্ছেদ" হওয়ার ভয় আসলে শিশুর নিজের পুরো অস্তিত্বের ওপর এক হুমকি। কারণ এর মানে হল তার মা কোনো স্বর্গীয় ফেরেশতা নন, বরং কেবলই একটি জৈবিক প্রাণী। তখন সে যে ভাগ্যের ভয় পায় এবং মায়ের থেকে আতঙ্কে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তা হল এই যে—সে নিজেও কেবল একটি "পতিত" শারীরিক জীব। আর এই রূঢ় সত্যকেই সে তার শৈশবের অভ্যাসের মাধ্যমে জয় করার চেষ্টা করে। তাই নারীর যৌনাঙ্গের প্রতি আতঙ্ক আসলে একটি ছোট শিশুর জন্য এক মস্ত ধাক্কা। ছয় বছর বয়সের আগেই সে হঠাৎ একজন দার্শনিক আর ট্র্যাজেডি রচয়িতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাকে তার বয়সের অনেক আগেই একজন পূর্ণ মানুষ হতে হয় এবং এমন প্রজ্ঞা ও শক্তির আশ্রয় নিতে হয় যা তার নেই। আবারও বলছি, এটাই হল প্রাথমিক দৃশ্যের আসল বোঝা: এটি শিশুর মধ্যে অসহ্য যৌন ইচ্ছা বা বাবার প্রতি ঘৃণা আর ঈর্ষা জাগিয়ে তোলে না, বরং মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে তাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে দেয়।
- স্বাধীনতার ভয়ংকর বোঝা আর দায়িত্বের চেয়ে অপরাধবোধ থাকা অনেক ভালো; বিশেষ করে যখন এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আসে যখন জীবন নতুন করে শুরু করার আর সময় থাকে না।
- পৃষ্ঠা ২১৩
মনোবিজ্ঞান এবং ধর্ম: বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তি আসলে কে?
[সম্পাদনা]- অন্যভাবে বলতে গেলে, বিকৃতি হল প্রজাতির একঘেয়েমির বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ; শরীরের মাঝে নিজের স্বতন্ত্রতাকে হারিয়ে ফেলার বিরুদ্ধে এক রুখে দাঁড়ানো। এটি এমনকি পরিবারের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার এক কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সবাই যখন এক ধাঁচে চলতে বাধ্য হয়, তখন সে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের এক গোপন পথ খুঁজে নেয়। র্যাঙ্ক এমনকি এই চমকপ্রদ সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন যে, ফ্রয়েডের প্রথাগত ধারণার ইডিপাস কমপ্লেক্স আসলে পরিবারের শৃঙ্খল, ছেলে বা মেয়ের বাধ্যগত ভূমিকা এবং সমষ্টির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে নিজের অহং-কে প্রতিষ্ঠিত করার একটি চেষ্টা হতে পারে। এমনকি এর জৈবিক প্রকাশের মাঝেও ইডিপাস কমপ্লেক্স হতে পারে এক বাধ্যগত শিশুর ভূমিকা থেকে মুক্তি পাওয়ার এবং পরিবার ভেঙে যৌনতার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্রতা খুঁজে পাওয়ার একটি চেষ্টা। এটি বোঝার জন্য আমাদের মানুষের সেই মৌলিক তাড়নাটি আবারও মনে রাখতে হবে, যা ছাড়া কোনো প্রাণবন্ত বিষয়ই বোঝা সম্ভব নয়—আর তা হল নিজেকে টিকিয়ে রাখা। মানুষের অভিজ্ঞতা দুটি আলাদা ভাগে বিভক্ত শারীরিক আর মানসিক, অথবা জাগতিক আর প্রতীকী। নিজেকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টিও তাই দুটি আলাদা রূপে সামনে আসে। একটি হল শরীর, যা সবার জন্য নির্দিষ্ট এবং এক ছাঁচে ঢালা; অন্যটি হল স্বত্বা, যা একান্তই ব্যক্তিগত এবং নিজেকে অর্জন করে নিতে হয়। মানুষ কীভাবে নিজেকে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে রেখে যাবে, কীভাবে নিজের একটি অংশকে বাঁচিয়ে রাখবে? সে কি তার শরীরের প্রতিলিপি রেখে যাবে নাকি আত্মার? সে যদি কেবল সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে বংশরক্ষা করে, তবে তার উত্তরসূরির সমস্যা মিটে যায়, কিন্তু তা হয় প্রজাতির একটি গতানুগতিক রূপে। যদিও সে তার সন্তানের মাঝে নিজেকে টিকিয়ে রাখে, যার চেহারা তার মতো হতে পারে বা যার শরীরে তার "রক্ত" ও পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, তবুও সে হয়তো অনুভব করতে পারে না যে সে তার নিজের অন্তরের স্বত্বা, তার অনন্য ব্যক্তিত্ব সত্যিই টিকিয়ে রাখতে পারছে। সে কেবল পশুর মতো বংশরক্ষার চেয়েও বড় কিছু অর্জন করতে চায়। অনাদিকাল থেকেই মানুষের বিশেষ সমস্যা হল জীবনকে আধ্যাত্মিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা, একে এক বিশেষ অমরত্বের স্তরে নিয়ে যাওয়া, যা অন্য সব জীবের জন্ম-মৃত্যুর চক্রের ঊর্ধ্বে। এই কারণেই শুরু থেকেই যৌনতার ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ ছিল; একে কেবল শারীরিক প্রজননের স্তর থেকে এক আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।
- আমরা যখন তরুণ থাকি, তখন প্রায়ই অবাক হই যে আমাদের পছন্দের প্রতিটি মানুষের কাছে জীবন কেমন হওয়া উচিত, একজন ভালো মানুষ কেমন—তা নিয়ে আলাদা আলাদা ধারণা থাকে। আমরা যদি একটু বেশি সংবেদনশীল হই, তবে এটি কেবল অবাক হওয়ার মতো বিষয়ই নয়, বরং হতাশাজনকও মনে হতে পারে। বেশিরভাগ মানুষ সাধারণত একজনের ধারণাকে অনুসরণ করে এবং তারপর অন্যজনের, যা নির্ভর করে কার প্রভাব সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি। যার কণ্ঠস্বর সবচেয়ে গভীর, যার চেহারা সবচেয়ে শক্তিশালী, যার কর্তৃত্ব আর সাফল্য সবচেয়ে বেশি সাধারণত আমরা সেই মুহূর্তের জন্য তার প্রতিই আনুগত্য প্রকাশ করি এবং তার আদর্শ অনুযায়ী নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু জীবন যত এগিয়ে যায়, আমরা এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাই এবং সত্যের এই সব আলাদা রূপগুলো কিছুটা করুণ মনে হতে পারে। প্রত্যেকেই মনে করে যে জীবনের সীমাবদ্ধতার ওপর জয়ী হওয়ার সূত্রটি কেবল তার কাছেই আছে এবং সে খুব জোর দিয়ে বলে যে একজন প্রকৃত মানুষ হওয়ার মানে কী। সাধারণত সে তার এই নিজস্ব ধারণার পক্ষে অনুসারী জোগাড় করার চেষ্টা করে। আজ আমরা জানি যে মানুষ কেন অন্যকে নিজের মতে আনার জন্য এত চেষ্টা করে; কারণ এটি কেবল জীবনের প্রতি কোনো সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি নয় এটি হল অমরত্বের এক একটি সূত্র।
- পৃষ্ঠা ২৫৫
- আমরা দেখেছি যে অস্তিত্বের আসল সংকট কাটানোর কোনো উপায় নেই; আমরা একই সাথে এক মরণশীল প্রাণী আবার নিজের মরণশীলতা সম্পর্কে সচেতন। একজন মানুষ নিজেকে গড়ে তুলতে, নিজের মেধার বিকাশ ঘটাতে, তার অনন্য উপহারগুলো সাজাতে, জগত সম্পর্কে নিজের বিচারবুদ্ধি বাড়াতে, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে শাণিত করতে এবং জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে পরিণত হতে বছরের পর বছর সময় কাটিয়ে দেয়। অবশেষে সে প্রকৃতির এক অনন্য জীবে পরিণত হয়, যে মর্যাদা আর আভিজাত্য নিয়ে পশুর মতো অবস্থাকে ছাপিয়ে দাঁড়ায়; সে আর কোনো জৈবিক তাড়নায় চালিত নয়, কেবল একটি প্রতিবর্ত ক্রিয়া নয়, কোনো ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসা সাধারণ কেউ নয়। আর তখনই আসল ট্র্যাজেডি শুরু হয়, যেমনটা আন্দ্রে মালরো তাঁর দ্য হিউম্যান কন্ডিশন বইতে লিখেছিলেন: এমন একজন ব্যক্তিকে তৈরি করতে ষাট বছরের চরম ভোগান্তি আর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, আর যখন সে শেষ পর্যন্ত তৈরি হয়, তখন সে কেবল মারা যাওয়ার জন্যই উপযুক্ত। এই যন্ত্রণাদায়ক কূটাভাস ওই ব্যক্তির চোখ এড়ায় না বিশেষ করে তার নিজের। তিনি নিজেকে দারুণভাবে অনন্য মনে করেন, অথচ তিনি জানেন যে শেষ পরিণতির ক্ষেত্রে এই অনন্যতা কোনো পার্থক্য গড়ে দেয় না। ফড়িংয়ের আয়ু যেমন ফুরিয়ে যায়, তাকেও সেই পথেই যেতে হয়, যদিও তার সময় কিছুটা বেশি লাগে।
- এমন এক সৃষ্টিকে আমরা কীভাবে দেখব যেখানে নিয়মিত কাজই হল একটি জীবের অন্যটিকে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা বিভিন্ন ধরনের দাঁত দিয়ে কামড়ানো, মাংস পিষে ফেলা, উদ্ভিদের ডাঁটা দাঁত দিয়ে চূর্ণ করা এবং পরম তৃপ্তিতে সেই মণ্ড গলার নিচে চালান করে দিয়ে তার নির্যাসটুকু নিজের শরীরে শুষে নেওয়া, আর তারপর দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস ও মল হিসেবে অবশিষ্টাংশ ত্যাগ করা। প্রত্যেকেই অন্যকে গ্রাস করার জন্য হাত বাড়াচ্ছে যারা তার কাছে ভক্ষণযোগ্য। রক্ত খেয়ে ফুলে ওঠা মশা, পোকা, খুনি মৌমাছির সেই উন্মাদনা, হাঙ্গরের নিজের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যাওয়ার পরেও অন্যকে ছিঁড়ে খাওয়ার জেদ... এগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। এর সাথে আছে প্রতিদিনের নানা "প্রাকৃতিক" দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি আর মৃত্যু: পেরুতে এক ভূমিকম্পে সত্তর হাজার মানুষ জীবন্ত সমাহিত হয়, কেবল আমেরিকাতেই গাড়ির ধাক্কায় বছরে পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষের লাশের পাহাড় জমে, ভারত মহাসাগরের জলোচ্ছ্বাসে আড়াই লাখ মানুষ ভেসে যায়। সৃষ্টি হল এক দুঃস্বপ্নের লীলাভূমি যা কোটি কোটি বছর ধরে এর সব প্রাণীর রক্তে ভিজে আছে। এই গ্রহ নিয়ে গত তিনশ কোটি বছরের সবচেয়ে বাস্তব সিদ্ধান্ত এটাই হতে পারে যে, এটি সারের এক বিশাল গর্তে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু সূর্য আমাদের নজর ঘুরিয়ে দেয়, সে সবসময় রক্ত শুকিয়ে নেয়, এর ওপর নতুন গাছপালা জন্মায় এবং তার উষ্ণতা দিয়ে জীবের স্বাচ্ছন্দ্য আর বিকাশের আশা জাগিয়ে রাখে।
- পৃষ্ঠা ২৮২–২৮৩
- বিবর্তনের ধারায় এই গ্রহে জীবন আমাদের কাছে যেভাবে ধরা দেয়, তা সবসময় নিজেকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার দিকেই ধাবিত হয়। আমরা এটি বুঝতে পারি না কারণ আমরা সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানি না; আমরা কেবল নিজেদের মধ্যে বেঁচে থাকার এক টান অনুভব করি এবং অন্যদের দেখি একে অপরকে গ্রাস করার জন্য লড়াই করতে। জীবন এক অজানা কারণে এক অজানা দিকে নিজেকে প্রসারিত করতে চায়।
এস্কেপ ফ্রম ইভিল (১৯৭৫)
[সম্পাদনা]নিউ ইয়র্ক: দ্য ফ্রি প্রেস। ১৯৭৬। আইএসবিএন ৯৭৮-০০২৯০২৪৫০৮ অকার্যকর অকার্যকর।
- আমি আমার সক্ষমতার অনেক বাইরে পৌঁছে গেছি এবং সম্ভবত বড় বড় কথার জন্য পাকাপাকিভাবে একটি বদনাম কামিয়ে ফেলেছি। কিন্তু সময় আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে এবং শান্তি দেয় না, আর তাই এই উচ্চাভিলাষী সংশ্লেষণমূলক প্রচেষ্টা এড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়; হয় আমাদের অর্জিত চিন্তাভাবনাগুলোকে আয়ত্ত করতে হবে, না হয় প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও আমরা অসহায়ভাবে খাবি খাব আর অনাহারে থাকব। তাই আমি বিজ্ঞান নিয়ে বাজি ধরি এবং লিখি।
- মুখবন্ধ, পৃষ্ঠা ১৯
- সব ধরনের জীবের জন্য অস্তিত্ব মানেই হল খাবারের জন্য এক অবিরত লড়াই—অন্য কোনো জীবকে মুখে পুরে গলার নিচে চালান করে দিয়ে নিজের ভেতর শুষে নেওয়ার লড়াই। এই রূঢ় বাস্তবতায় দেখলে, এই গ্রহে জীবন হল এক বীভৎস দৃশ্য, বিজ্ঞান কল্পকাহিনির এক দুঃস্বপ্ন; যেখানে এক প্রান্তে দাঁতযুক্ত পরিপাক নালিগুলো হাতের কাছে পাওয়া মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে এবং অন্য প্রান্তে ধোঁয়াটে মল স্তূপ করে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে আরও মাংসের খোঁজে।
- দ্য হিউম্যান কন্ডিশন: বিটুইন অ্যাপিটাইট অ্যান্ড ইনজেনুইটি, পৃষ্ঠা ১
- সাংস্কৃতিক সবকিছুই আসলে তৈরি করা এবং আমাদের মনই একে অর্থ দান করে; এমন এক অর্থ যা প্রাকৃতিক জগত দেয়নি। এই অর্থে সংস্কৃতি হল "অতিপ্রাকৃত", আর সংস্কৃতির সব ব্যবস্থারই শেষ লক্ষ্য একটাই: মানুষকে প্রকৃতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরা যাতে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে কোনো না কোনোভাবে তাদের জীবনের গুরুত্ব কেবল বস্তুগত জিনিসের চেয়ে বেশি।
বেকার সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- অন্তত এটুকু বলা যায় যে, প্রকৃতির ওপর বেকারের বর্ণনার সাথে ওয়াল্ট ডিজনির কোনো মিল নেই। প্রকৃতি হল এক নিষ্ঠুর সত্তা, যার দাঁত আর নখ রক্তে রাঙানো এবং সে যা সৃষ্টি করে তা নিজেই ধ্বংস করে।
- স্যাম কিন, মুখবন্ধ, দ্য ডিনায়াল অফ ডেথ (১৯৯৭), পৃষ্ঠা ১২। আইএসবিএন ৯৭৮-১৪১৬৫৯০৩৪৭ অকার্যকর অকার্যকর
- বেশিরভাগ প্রাণী কেবল তখনই ভয় পায় যখন তারা কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে পড়ে। তবে মানুষ যেহেতু জন্মগতভাবেই অসহায় আর পরনির্ভরশীল এবং তার মধ্যে আত্মসচেতনতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার ক্ষমতা থাকে, তাই শৈশব থেকেই মানুষের মধ্যে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি না থাকলেও উদ্বেগ অনুভব করার এক অনন্য প্রবণতা থাকে। বেকার এই উদ্বেগকে মূলত অস্তিত্ববাদী হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে, এটি মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর এক শিশুর বাস্তব অবস্থার মধ্যকার দ্বন্দ্ব থেকে তৈরি হয়—যে শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক অভিভাবকের সুরক্ষা ছাড়া মুহূর্তেই পিষে যেতে পারে। স্টিফেন জে গুল্ড উল্লেখ করেছেন যে, নিজের দুর্বলতা আর মরণশীলতা সম্পর্কে এই জ্ঞান সম্ভবত মানুষের বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপজাত, যা মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবের অংশের বিবর্তনের ফলে অবচেতনভাবে তৈরি হয়েছে। এই উপজাতটি মানুষের মধ্যে সারাক্ষণ উদ্বেগের একটি সম্ভাবনা তৈরি করে রাখে। আর এই উদ্বেগ প্রায়ই মানুষের কার্যকর চিন্তা আর কাজে বাধা দেয়।
- জেফ শিমেল, হোয়াট ড্রাইভস পিপল টু বিহেভ দ্য ওয়ে দে ডু?
- বর্ণনা: আর্নেস্ট বেকারের ধারণা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক নির্দেশিকা।
- বেকারের মতে, আত্মসম্মানের মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য হল উদ্বেগের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করা। অন্যভাবে বললে, আত্মসম্মান আমাদের প্রতিদিনের উদ্বেগগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জীবন যাপন করতে সাহায্য করে। যেহেতু আত্মসম্মান তৈরি হয় ভালো থাকার এমন কিছু মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে যা শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতি থেকে শেখা হয়, তাই বেকার আত্মসম্মানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন: সংস্কৃতির মাধ্যমে অর্জিত এক অনুভূতি যে, অর্থপূর্ণ এই জগতে একজন মানুষ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্তা। উদাহরণস্বরূপ, একটি ছোট শিশুর কাছে যোগ্যতার মানদণ্ড হল তার বাবা-মাকে খুশি করা। শিশুটি যত বড় হয়, এই মানদণ্ডগুলো "স্মার্ট হওয়া", "খেলাধুলায় দক্ষ হওয়া", "মেধাবী হওয়া" ইত্যাদিতে বদলে যায়। আমরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হই, তখন আমাদের সংস্কৃতির মানদণ্ড অনুযায়ী সামাজিকভাবে মূল্যবান পেশাগত দায়িত্ব পালন করা এবং সম্পদ ও টাকা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। বেশ কিছু বিষয় এই মানদণ্ডগুলোর ওপর এবং আমরা সেগুলো কতটা পূরণ করতে পারছি তার ওপর প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে অন্য মানুষেরা বড় ভূমিকা পালন করে: আমাদের চারপাশে থাকা অন্যদের সাথে নিজেদের তুলনা করার মাধ্যমে আমাদের আত্মসম্মান প্রায়ই প্রভাবিত হয়। একে ‘সামাজিক তুলনা’ বলা হয়। সাধারণত আমরা আমাদের আশেপাশের এবং আমাদের সমপর্যায়ের মানুষদের সাথেই নিজেদের তুলনা করি। উদাহরণস্বরূপ, আমরা আমাদের সমবয়সী এবং সমলিঙ্গের ভাইবোনের সাথে বেশি তুলনা করি। আমরা যদি টেনিস খেলি, তবে আমরা আমাদের মতো অভিজ্ঞতা আর দক্ষতাসম্পন্ন অন্য খেলোয়াড়দের সাথে নিজেদের তুলনা করি। যখন এই তুলনায় আমরা ভালো অবস্থানে থাকি, তখন আমাদের নিজেদের সম্পর্কে ভালো লাগে; কিন্তু যখন আমরা পিছিয়ে পড়ি, তখন আমাদের আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আত্মসম্মান রক্ষা করার জন্য আমরা নিজেদের চেয়ে কিছুটা খারাপ অবস্থায় থাকা অন্যদের সাথে নিজেদের তুলনা করি—যাকে নিম্নমুখী সামাজিক তুলনা বলা হয়। আত্মসম্মানের সাথে সম্পর্কিত সামাজিক তুলনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল ভাইবোনের রেষারেষি। শৈশবে ভাইবোনেরা মিলিমিটার মেপে দেখে কার লজেন্সটি বড়। প্রতিটি শিশুই তার বাবা-মায়ের চোখে সেরা (বা অন্তত সমান) হতে চায়। আমরা বিভিন্ন ধরনের দলের সাথে যুক্ত থেকেও আত্মসম্মান পেতে পারি। যেমন, আমরা যখন এমন কোনো ব্যক্তি বা দলের সাথে একাত্মতা অনুভব করি যারা সফল হয় (যেমন: এডমন্টন অয়েলার্স হকি দল), তখন এটি আমাদের আত্মসম্মান বাড়িয়ে দেয়। আমরা প্রায়ই আমাদের একাত্মতা এমনভাবে পরিবর্তন করি যাতে আত্মসম্মান বাড়ে: আমরা সফল দলগুলোর সাথে সখ্যতা বাড়াই এবং ব্যর্থ দলগুলোর সাথে তা কমিয়ে দিই। যেহেতু আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ সামাজিকভাবে নির্ধারিত মানদণ্ড থেকে আসে, তাই আমাদের সবসময়ই আমাদের যোগ্যতার সামাজিক স্বীকৃতি প্রয়োজন হয়। ভাগ্যক্রমে বন্ধু, পরিবার আর সহকর্মীরা আমাদের প্রতিনিয়ত যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। তবে অন্যরা খুব সহজেই আমাদের আত্মসম্মানকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি ক্যাম্পাসে চেনা কাউকে দেখি এবং সেই ব্যক্তি যদি আমাদের সম্ভাষণ না জানিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে যায়, তবে এই অবজ্ঞা আমাদের কয়েক দিন ধরে কষ্ট দিতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান আমাদের এই সামাজিকভাবে প্রকাশিত আত্মসম্মানকে মুখ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে আমরা কীভাবে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করার চেষ্টা করি এবং অন্যের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিনয়ী হই। এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে, মানুষকে বুঝতে হলে আমাদের এটা উপলব্ধি করতে হবে যে প্রতিটি মানুষ আসলে জানতে চায়: বীর হিসেবে আমার অবস্থান কোথায়? আমরা সবাই বীরত্বপূর্ণ অনুভব করতে চাই (অবশ্যই ব্রুস উইলিসের মতো নয়), বরং সংস্কৃতির ঠিক করে দেওয়া মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে। আর সংস্কৃতি এটি করার জন্য বিভিন্ন পথ বাতলে দেয়। একজন মা যখন নিজেকে ‘শহীদ’ হিসেবে তুলে ধরেন, তখন তিনি আসলে নিজের বীরত্বের দাবি জানাচ্ছেন (অন্তত শৈশবে ভাইবোনের সাথে রাগের মাথায় আপনাকে শাসন না করার জন্য)। আমরা বীরত্বের এই অনুভূতি স্কুল, আদালত, খেলার মাঠ, নাচের আসর, গবেষণাগার কিংবা থিয়েটারের মঞ্চেও খুঁজতে পারি।
- জেফ শিমেল, হোয়াট ড্রাইভস পিপল টু বিহেভ দ্য ওয়ে দে ডু?
- বর্ণনা: আর্নেস্ট বেকারের ধারণা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক নির্দেশিকা।
- "মানুষের কেন আত্মসম্মান প্রয়োজন?"—আতঙ্ক ব্যবস্থাপনার মূল উত্তর হল, আত্মসম্মান মানুষকে তার অস্তিত্বের গভীরে থাকা আতঙ্ক থেকে রক্ষা করে। আত্মসম্মান হল একটি সুরক্ষা কবচ যা সেই ভয়ংকর আতঙ্ককে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে যা থেকে মানুষ বুঝতে পারে যে সে কেবলই একটি ক্ষণস্থায়ী প্রাণী যে এক অর্থহীন জগতে বেঁচে থাকার লড়াই করছে এবং যার পরিণতি কেবল মৃত্যু আর পচন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রতিটি মানুষের নাম, পরিচয়, পারিবারিক আর সামাজিক পরিচিতি, লক্ষ্য আর আকাঙ্ক্ষা, পেশা এবং পদমর্যাদা এসবই হল মানুষের তৈরি অলঙ্কার যা একটি প্রাণীর ওপর চাপানো হয়েছে। মহাজাগতিক হিসেবে দেখলে একটি আলু, আনারস বা শজারুর চেয়ে মানুষের গুরুত্ব বেশি কিছু নয়। কিন্তু এই সূক্ষ্ম আবরণের মাধ্যমেই আমরা আমাদের মরণশীল ভাগ্য সম্পর্কে জেনেও বেঁচে থাকার সাহস পাই।
- জেফ শিমেল এবং অন্যান্য, হোয়াই ডু পিপল নিড সেলফ-এস্টিম? এ থিওরিটিক্যাল অ্যান্ড এম্পিরিক্যাল রিভিউ
- টিএমটি [টেরর ম্যানেজমেন্ট থিওরিটি] শুরু হয় এই ধারণা থেকে যে, মানুষের বেঁচে থাকার জৈবিক আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুর অনিবার্যতার সচেতনতা (যা মানুষের উন্নত চিন্তাশক্তির ফলে তৈরি হয়েছে) এই দুইয়ের সহাবস্থান এক অচল করে দেওয়া আতঙ্কের জন্ম দেয়। আমাদের প্রজাতি অস্তিত্ববাদী আতঙ্কের এই সমস্যার সমাধান করেছে সেই একই উন্নত চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে যা মৃত্যুর সচেতনতা তৈরি করেছিল; আর তা হল সাংস্কৃতিক বিশ্ববীক্ষা তৈরি করা। এটি হল মানুষের তৈরি বাস্তবতার প্রতীকী ধারণা যা অস্তিত্বকে অর্থ, শৃঙ্খলা আর স্থায়ীত্ব দেয়; যোগ্যতার মানদণ্ড ঠিক করে দেয় এবং যারা সংস্কৃতির এই বিশ্ববীক্ষায় বিশ্বাস করে তাদের এক ধরনের প্রতীকী অমরত্বের প্রতিশ্রুতি দেয়। আক্ষরিক অমরত্ব আসে সংস্কৃতির ধর্মীয় দিকগুলো থেকে যা সরাসরি মৃত্যুর সমস্যা নিয়ে কাজ করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য স্বর্গ, মৃত্যুর পরের জীবনের প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে, প্রতীকী অমরত্ব আসে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যা মানুষকে নিজের পরিবারের, দেশের, আদর্শের সাথে যুক্ত করে নিজের জীবনের চেয়ে বড়, তাৎপর্যপূর্ণ এবং চিরন্তন কিছুর অংশ হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করে।
- জেফ শিমেল এবং অন্যান্য, হোয়াই ডু পিপল নিড সেলফ-এস্টিম? এ থিওরিটিক্যাল অ্যান্ড এম্পিরিক্যাল রিভিউ
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় আর্নেস্ট বেকার সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।