আল খোয়ারিজমি
অবয়ব

আল-খোয়ারিজমির ১২০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এই ডাকটিকিটটিতে তাঁর নাম এবং ১২০০ বছর উদযাপনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাঁর জন্মকাল ও বিশ্বব্যাপী তাঁর গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি (محمد بن موسی خوارزمی) বা আল-খোয়ারিজমি (আনু. ৭৮০ - ৮৫০) ছিলেন একজন পারসিক গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী এবং ভূগোলবিদ। তার নাম থেকেই মূলত অ্যালগরিদম ও তার কালজয়ী গ্রন্থ আল-জাবর থেকে 'আলজেবরা' শব্দ দুটির উৎপত্তি। আনুমানিক ৮২০ সালে তিনি বাগদাদ ও আব্বাসীয় খিলাফতের সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার বলে বিবেচিত বাইতুল হিকমাহর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। বীজগণিতের ওপর তার রচিত গ্রন্থ রৈখিক এবং দ্বিঘাত সমীকরণের প্রথম পদ্ধতিগত সমাধান উপস্থাপন করেছিল। গণিতে তার এই অবদানের জন্য তাকে 'বীজগণিতের জনক' বলে অভিহিত করা হয়।
উক্তি
[সম্পাদনা]- বিজ্ঞানের প্রতি সেই অনুরাগ, সেই সৌজন্য এবং কৃপা যা আল্লাহ বিদ্বানদের প্রতি প্রদর্শন করেন, যে ক্ষিপ্রতার সাথে তিনি অস্পষ্ট বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায করেন এবং প্রতিকূলতা দূরীকরণে তাঁদের সুরক্ষা ও সমর্থন দান করেন—তা-ই আমাকে ‘আল-জবর’ এবং ‘আল-মুকাবিলা’ পদ্ধতির হিসাব সংবলিত একটি সংক্ষিপ্ত রচনা সংকলন করতে উৎসাহিত করেছে. যেখানে আমি কেবল পাটিগণিতের সবচাইতে সহজ এবং উপযোগী বিষয়গুলোই অন্তর্ভুক্ত করেছি।
- উদ্ধৃতি উৎস: ভিক্টর জে. কাটজ (২০০৯) এ হিস্ট্রি অফ ম্যাথমেটিক্স: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন। পৃষ্ঠা ২৭১ (উক্তিটি যে উৎস থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে)।
- আমি যখন গভীরভাবে খেয়াল করলাম মানুষ আসলে গণিতের কাছে কী চায়, তখন বুঝলাম সবকিছুই শেষপর্যন্ত একটি সংখ্যায় গিয়ে ঠেকে। আমি আরও দেখলাম, প্রতিটি বড় সংখ্যা আসলে অনেকগুলো ১ বা ছোট এককের সমষ্টি। অর্থাৎ যেকোনো সংখ্যাকে ভেঙে একদম ছোট এককে নিয়ে আসা সম্ভব।
- আল-খোয়ারিজমি, আল-কিতাব আল-মুখতাসার ফি হিসাব আল-জবর ওয় আল-মুকাবালা, ভূমিকাংশ, ফ্রেডরিক রোজেন কর্তৃক ১৮৩১ সালের ইংরেজি অনুবাদ। উইলবার হল লাইব্রেরি (http://www.wilbourhall.org/index.html#algebra)
- ‘পৃথিবীর সমস্ত অঞ্চল বর্ণনা করা এবং সমস্ত স্থানীয় সময় নির্ধারণ করা অত্যন্ত ক্লান্তিকর এবং দুঃসাধ্য কাজ হবে। যেহেতু অগণিত সময় এবং সীমাহীন অঞ্চলের জন্য দ্রাঘিমাংশগুলো আরিনের (পৃথিবীর একটি কল্পিত কেন্দ্রবিন্দু) সাপেক্ষে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, তাই জ্যামিতিক এবং গাণিতিক নিয়মের মাধ্যমে সেই মূলবিন্দু থেকে অন্যান্য স্থান ও সময় নির্ধারণ করা জটিল হবে না। যদি আমরা এই স্থান (অর্থাৎ আরিন) থেকে দ্রাঘিমাংশে সরে যাই, তবে গ্রহগুলোর গড় অবস্থান গণনার জন্য আমাদের অবস্থান এবং আরিনের লোকালয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।’
- উজ্জয়িনী শহরকে (ভারতকে) ‘আরিন’ হিসেবে উল্লেখ।
- আল-খোয়ারিজমির অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিল বা জিক আল-সিন্দহিন্দ থেকে, যা প্রথমে আথেলার্ড অফ বাথ কর্তৃক আরবি থেকে ল্যাটিনে এবং পরবর্তীতে ও. নিউজেবাউয়ার কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত।
- উদ্ধৃতি উৎস: ভাস্কর কাম্বলে, দ্য ইমপ্যারিশেবল সিড: হাউ হিন্দু ম্যাথমেটিক্স চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড হোয়াই দিস হিস্ট্রি ওয়াজ ইরেজড, গরুড় প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, ২০২২।
আল-খোয়ারিজমিকে নিয়ে অন্যদের উক্তি
[সম্পাদনা]- আমি ঠিক করেছি যারা এ পর্যন্ত বীজগণিত নিয়ে লিখেছেন, তাদের কাজগুলো আগে খতিয়ে দেখব। যাতে তারা যা যা এড়িয়ে গেছেন আমি সেগুলো পূরণ করতে পারি। লেখকের সংখ্যা তো অগণিত, আর তাদের মধ্যে আরব বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি-কেই এই পথের পথিকৃৎ মনে করা হয়। আমার তো বিশ্বাস 'আলজেবরা' শব্দটির জন্মও তাঁর হাত ধরেই। কারণ কয়েক বছর আগে ব্রাদার লুকা পাচিওলি যখন লাতিন আর ইতালীয় ভাষায় এই শাস্ত্র নিয়ে লিখতে বসলেন, তিনি বলেছিলেন যে 'আলজেবরা' শব্দটি আরবি এবং এই বিজ্ঞানের উদ্ভাবকও আরবরাই। তাঁর পরের অনেক লেখকই চোখ বন্ধ করে এই কথা বিশ্বাস করেছেন। কিন্তু ইদানীং ভ্যাটিকান লাইব্রেরিতে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিক লেখক দিওফান্তোসের একটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে [...] সেখানে দেখলাম তিনি বারবার ভারতীয় লেখকদের কথা উল্লেখ করছেন। আর তখনই আমি উপলব্ধি করলাম—আরবদের অনেক আগেই ভারতীয়রা এই শাস্ত্রে দড় ছিল!
- ১৬শ শতাব্দীর ইতালীয় গণিতবিদ রাফায়েল বোমবেল্লি, 'ল’আলজেবরা' , প্রকাশকাল: ১৫৭২।
- ফোভেল, জে. এবং জে. গ্রে-এর 'দ্য হিস্ট্রি অফ ম্যাথমেটিক্স: এ রিডার' (ম্যাকমিলান, ১৯৮৭)-এ উদ্ধৃত। এছাড়া উদ্ধৃত হয়েছে: ভাস্কর কাম্বলে, 'দ্য ইম্পেরিশেবল সিড: হাউ হিন্দু ম্যাথমেটিক্স চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড হোয়াই দিস হিস্ট্রি ওয়াজ ইরেজড', গরুড় প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, ২০২২ ISBN 9798885750189 ।
- বীজগণিতের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, শুরুর দিকের আরবরা দিওফান্তোস কিংবা হিন্দবাসীদের গাণিতিক চিহ্ন বা সংকেতগুলো গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আল-খোয়ারিজমির বীজগণিত পরীক্ষা করলে দেখা যায়, তাঁর উপস্থাপনা ছিল পুরোপুরি অলঙ্কারিক। অর্থাৎ সেখানে কোনো গাণিতিক প্রতীকের বালাই ছিল না, কেবল কথার ছলে সব হিসাব করা হতো।
- ফ্লোরিয়ান কাজোরি, কাজোরি, এ হিস্ট্রি অফ ম্যাথমেটিক্যাল নোটেশন, ভলিউম. ১, ১৯৯৩, উদ্ধৃত: ভাস্কর কাম্বলে, দ্য ইম্পেরিশেবল সিড: হাউ হিন্দু ম্যাথমেটিক্স চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড হোয়াই দিস হিস্ট্রি ওয়াজ ইরেজড, গরুড় প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, ২০২২ ISBN 9798885750189
- আল-খোয়ারিজমি “গ্রিকদের কাছ থেকে বীজগণিত গ্রহণ করেননি। তাকে হয় এটি নিজে উদ্ভাবন করতে হয়েছে, নতুবা তিনি এটি ভারতীয়দের কাছ থেকে নিয়েছেন। এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে দ্বিতীয়টিই আমার কাছে সবচাইতে বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়।”
- পিয়েত্রো কোসালি, যিনি বীজগণিতের ইতিহাসের ওপর একটি বিস্তারিত মনোগ্রাফ লিখেছেন; হেফার, আলব্রেখট-এর ‘দ্য রিসেপশন অফ অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্স বাই ওয়েস্টার্ন হিস্টোরিয়ানস’-এ উদ্ধৃত। ইন: অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান লিপস ইনটু ম্যাথমেটিক্স, সম্পাদিত: বি. এস. যাদব এবং মান মোহন, পৃষ্ঠা ১৩৫-১৫২। বিরখাউজার, ২০১১। উদ্ধৃত: ভাস্কর কাম্বলে, দ্য ইম্পেরিশেবল সিড: হাউ হিন্দু ম্যাথমেটিক্স চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড হোয়াই দিস হিস্ট্রি ওয়াজ ইরেজড, গরুড় প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, ২০২২ ISBN 9798885750189
- আল-খোয়ারিজমি যে ডায়োফ্যান্টাস থেকে ধার করেছেন তা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। এটি অনেক বেশি সম্ভাব্য যে আরবরা তাদের বীজগণিতের প্রাথমিক জ্ঞান হিন্দুদের কাছ থেকে পেয়েছিল, যারা তাদের দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি এবং গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছিল।
- রোজেন ফ্রেডরিক। দ্য আলজেবরা অফ মোহাম্মদ বিন মুসা। লন্ডন: ১৮৩১। উদ্ধৃত: ভাস্কর কাম্বলে, দ্য ইম্পেরিশেবল সিড: হাউ হিন্দু ম্যাথমেটিক্স চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড হোয়াই দিস হিস্ট্রি ওয়াজ ইরেজড, গরুড় প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, ২০২২ ISBN 9798885750189

- বহুসংস্কৃতিক শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি শিশুদের পূর্বনির্ধারিত ধর্মীয় বিদ্যালয়ে বন্দি করার মতো হওয়া উচিত নয়। বিশ্ব সভ্যতা এবং ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলো এই সত্যে খুব কমই আগ্রহী হতে পারে যে, যখন একজন আধুনিক গণিতবিদ একটি কঠিন গাণিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অ্যালগরিদম ব্যবহার করেন, তখন তিনি মূলত নবম শতাব্দীর মহান মুসলিম গণিতবিদ আল-খোওয়ারিজমির ধর্মনিরপেক্ষ অবদানকেই স্মরণ করেন, যাঁর নাম থেকে অ্যালগরিদম শব্দটি এসেছে ("আলজেবরা" শব্দটি এসেছে তাঁর গ্রন্থ 'আল-জবর ওয়া আল-মুকাবিলা' থেকে)। সেকেলে ঘরানার ব্রিটিশদের পাশাপাশি নবীন ব্রিটিশদেরও এই চমৎকার সংযোগগুলো উদযাপন না করার কোনো কারণ নেই। পৃথিবী কোনো একক ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর ফেডারেশন নয়। আশা করা যায়, ব্রিটেনও তা নয়।
- অমর্ত্য সেন, সলিউশন টু কালচারাল কনফিউশন ইজ ফ্রিডম অ্যান্ড রিজন, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস(২৯ নভেম্বর, ২০০৫)
- অবশ্যই আরবরা নিজেরা কখনোই এই উদ্ভাবনের দাবি করেনি, তারা সংখ্যার রূপ এবং স্থানীয় মানের বৈশিষ্ট্যের জন্য সর্বদা হিন্দুদের কাছ থেকে তাদের ঋণের কথা স্বীকার করেছে। এই লেখকদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন বাগদাদের স্বর্ণযুগের মহান শিক্ষক, যিনি প্রথমদিকের আরব লেখকদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের গণিতশাস্ত্রের ধ্রুপদী কাজগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন এবং অবশেষে জাগ্রত ইউরোপের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই মানুষটি ছিলেন খোয়ারিজম থেকে আসা মোসেসের পুত্র মোহাম্মদ, বা আরবীয় রীতিতে মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি, একজন প্রগাঢ় পণ্ডিত ব্যক্তি যার কাছে বর্তমান বিশ্বের বীজগণিত এবং পাটিগণিতের জ্ঞান অনেক ঋণী। তাঁর সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ প্রায়ই আসবে এবং তিনি যে পাটিগণিত লিখেছিলেন (যা সম্ভবত অ্যাডে লার্ড অফ বাথ ১১৩০ সালের দিকে অনুবাদ বা ব্যাখ্যা করেছিলেন), সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে সংখ্যাগুলো হিন্দুদের অবদান। পরবর্তী আরব লেখকরাও বর্তমান সময় পর্যন্ত এটি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, তারা পাটিগণিতের জন্য ইলম হিন্দি বা "ভারতীয় বিজ্ঞান" শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে, এমনকি কখনো কখনো শুধু 'হিন্দি' বিশেষণটিও ব্যবহার করা হয়।
- ডেভিড ইউজিন স্মিথ এবং লুই চার্লস কার্পিনস্কি, দ্য হিন্দু-অ্যারাবিক নিউমারেলস (১৯১১) অধ্যায় ১. আর্লি আইডিয়াস অফ দেয়ার অরিজিন , পৃষ্ঠা ৪-৫।
- "এটির একটি সম্ভাবনা রয়েছে যে, সিন্দ ইবনে আলীর নামে চালিয়ে দেওয়া কিছু কাজ আসলে আল-খাওয়ারিজমির। যাঁর নাম ঠিক তাঁর নামের আগেই আসে।"
- ডেভিড ইউজিন স্মিথ এবং লুই চার্লস কার্পিনস্কি, দ্য হিন্দু-অ্যারাবিক নিউমারেলস (১৯১১) অধ্যায় ১. আর্লি আইডিয়াস অফ দেয়ার অরিজিন, পৃষ্ঠা ১০।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় আল খোয়ারিজমি সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।