উমাকান্ত হাজারী
অবয়ব

—উমাকান্ত হাজারী
উমাকান্ত হাজারী (১৫ ডিসেম্বর ১৮৭৩ -৫ আগস্ট ১৯৫৫) ছিলেন ভারতীয় বাঙালি লেখক ও গবেষক। বৈদিক সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও সমালোচনা নিয়ে লেখা ‘বৈদিক গবেষণা’ বইটি তার এক অমূল্য কীর্তি। তিনি নদীয়ার পণ্ডিতমণ্ডলী থেকে ‘বিদ্যার্ণব’ উপাধি পান। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হলো, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস (১৯০৬), বৈদিক গবেষণা (প্রথম খণ্ড) (১৯৩৫), বঙ্গজাগরণ ও স্বদেশের নানা কথা (১৯০৬), আমাদের কথা প্রভৃতি।
উক্তি
[সম্পাদনা]- জাপানে প্রত্যেক গৃহস্থের বাটীতে তিনটী পবিত্র স্থান আছে। প্রথম, কামিদানা অর্থাৎ সৃষ্টিকর্ত্তা ভগবানের পূজাস্থান; দ্বিতীয়, বুদসুদান অর্থাৎ বুদ্ধবেদী; তৃতীয়, ইউজি-গেমি অর্থাৎ কুলদেবতা-গৃহ। এই সকল স্থানে প্রত্যহ যথারীতি পূজা হইয়া থাকে। সিনজুগণ দেবতার সম্মুখে দর্পন, শুভ্রবস্ত্র ও পানপাত্র স্থাপন করিয়া চাউল, সাকি ও বিবিধ মৎস্যসহযোগে উপাসনায় প্রবৃত্ত হইয়া থাকে। বৌদ্ধগণ দেবপূজায় মৎস্য ব্যবহার করে না। টৌরীশাখা, কদলীপত্র ও বিচালিনির্ম্মিত রজ্জু দেবকার্য্যে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। পূজাগৃহে প্রত্যহ দীপদান করা হয়।
- ধর্ম্মপ্রণালী, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস - উমাকান্ত হাজারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪০
- অতি পুরাতন সংস্কৃত ভাষার প্রাচীনতম গ্রন্থ বেদ। ইহা মনুষ্যজাতির প্রথম গ্রন্থ ও মানবীয় সভ্যতার আদি নিদর্শন, এই জন্য মনুষ্য মাত্রেরই আদরণীয়। মানব জাতির যে সময়ের ইতিহাস কোনস্থানে প্রাপ্ত হওয়া যায় না, যে সময়ের চিন্তা, ধর্ম্মবিশ্বাস, উপাসনা পদ্ধতি, সামাজিক রীতি ও আচার ব্যবহার মহাকালের ক্রোড়ে বিলীন হইয়া গিয়াছে, যে সময়ের ইতিহাস উদ্ধারের অন্য কোন উপায় বিদ্যমান নাই, সেই সুদূর, স্মরণাতীত কালের ইতিহাস বেদসংহিতায় লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।
- বৈদিক গবেষণা, প্রথম অধ্যায়, বৈদিক গবেষণা - উমাকান্ত হাজারী, প্রথম খণ্ড, প্রকাশসাল- ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪০
- টোকিও নগরে কাগজের প্রকাণ্ড কারখানা আছে। তথায় মিৎসুমাতো, কোজো ও গাম্পি নামক বৃক্ষ হইতে কাগজ প্রস্তুত হইয়া থাকে। কাঠে কাগজ হয়, কাগজে গৃহ নির্ম্মিত হয়, কড়ি, বরগা প্রস্তুত হয়, রেল প্রস্তুত হয়, জলের নৌকা হয় এবং চা তৈয়ারির কেটলি প্রস্তুত হয়।
- জাপানের বাণিজ্য, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস - উমাকান্ত হাজারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭০
- সুশিক্ষাই সর্ব্ববিধ উন্নতির মূল। কি সাম্রাজ্যের পরিপুষ্টি, কি বাণিজ্যের বিপুলবিস্তার, কি স্বদেশের শ্রীবৃদ্ধিসাধন, কি জ্ঞানের পরিধি প্রসারণ, ইহার কোন একটিও শিক্ষা নিরপেক্ষ নহে। জাপানবাসীরা গত ত্রিংশতি বৎসর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ে যে উন্নতিলাভ করিয়াছে, তাহা পৃথিবীর ইতিহাসে অতি অপূর্ব্ব ও সর্ব্বাপেক্ষা বিস্ময় জনক।
- জাপানের শিক্ষা-প্রণালী, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস - উমাকান্ত হাজারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫২
- বৌদ্ধ যুগের প্রারম্ভে দেবনদী সরস্বতীর বিলুপ্তি ও পুণ্য সলিলা গোমতীর স্থান পরিবর্তন নিবন্ধন, কুরুক্ষেত্র ও নৈমিষারণ্যের মহিমা কিয়ৎ পরিমাণে ক্ষুণ্ণ হইয়া দিবোদাসের যজ্ঞভূমি কাশী এবং গয় নৃপতির যজ্ঞক্ষেত্র গয়া বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। এই জন্যই ভগবান বৌদ্ধের শিষ্য প্রশিষ্যগণ বারাণসীর অদূরবর্তী সারনাথে এবং গয়ার সন্নিকট বুদ্ধ-গয়ায় তাঁহাদের ধর্ম্মপ্রচারের প্রধান কেন্দ্র নিদ্ধারণ করিয়াছিলেন।
- বৈদিক গবেষণা, দ্বিতীয় অধ্যায়, বৈদিক গবেষণা - উমাকান্ত হাজারী, প্রথম খণ্ড, প্রকাশসাল- ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১২৬
- জাপানীরা যে প্রণালী অবলম্বন করিয়া দৈহিক বলবীর্য্য বৃদ্ধি করে, তাহার নাম “জিউ জুৎসু”। জাপানিভাষায় ইহার অর্থ পেশী বিনষ্টকরা, কিন্তু ইহার দ্বারা পেশী সমূহের পুষ্টিসাধন হয়। অতি দুর্ব্বল ও ক্ষীণকায় ব্যক্তিও ইহার অনুশীলন করিয়া বিপুল বলশালী হইতে পারে। জাপানের সৈনিক ও নাবিকদিগকে এই বিদ্যা শিক্ষা করিতে হয়। ইহাতে সর্ব্বপ্রথমে আহারের প্রতি দৃষ্টি রাখিতে হয়, পরে ফুস্ফুস্ ও হৃৎপিণ্ডের উন্নতিসাধন করিতে হয়।
- জাপানের নানাকথা, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস - উমাকান্ত হাজারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮১
- জাপানীদিগের প্রধান নীতিশাস্ত্রের নাম ‘বুসিডাে’। হিন্দুর নিকটে বেদ, মুসলমান সমীপে কোরান ও খ্রীষ্টানের কাছে বাইবেল যদ্রুপ, প্রাচীন ‘বুসিডাে’ জাপানিগণের নিকটে তদ্রুপ। জাপানীরা এই গ্রন্থকে ভগবান ভাস্করের মুখ-নিঃসৃত বলিয়া বিশ্বাস করিয়া থাকে। ইহাতে পরমাত্মা, জীবাত্মা, পুনজন্ম, পরজন্ম, পাপপুণ্য, স্বাস্থ্য, পীড়া, রাজভক্তি, পিতৃমাতৃভক্তি, স্বদেশপ্রীতি প্রভৃতি বহু বিষয় ধারাবাহিকরূপে লিখিত আছে।
- জাপানের সাহিত্য ও সংবাদপত্র, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস - উমাকান্ত হাজারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫৮
- পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ প্রায় একবাক্যে বলিয়া থাকেন যে, গৌতমীয় ন্যায়দর্শনের ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন স্বীয় ভাষ্যে ঋক, যজু. সাম ও অথর্ব্ববেদের নামোল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু কুত্রাপি যাজ্ঞবল্ক্য, শুক্ল যজুর্ব্বেদ বা বাজসনেয় সংহিতার নাম প্রকাশ করেন নাই। ইহা হইতে তাঁহারা প্রমাণ করিতে চাহেন যে, ন্যায়ভাষ্য রচনা কালে বাৎস্যায়ন এই বেদের নাম অবগত ছিলেন না।
- বৈদিক গবেষণা, দ্বিতীয় অধ্যায়, বৈদিক গবেষণা - উমাকান্ত হাজারী, প্রথম খণ্ড, প্রকাশসাল- ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৪৯
- আকরিকের মধ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, টিন, পাথুরিয়া কয়লা প্রচুর পাওয়া যায়। লৌহ অধিক পাওয়া যায় না। লৌহের অনেক কার্য্য তাম্র দ্বারা সম্পন্ন হইয়া থাকে। এখানকার তাম্রের ন্যায় উৎকৃষ্ট তাম্র পৃথিবীর কুত্রাপি পাওয়া যায় না। জাপানীরা ইহা এক ইঞ্চ মােটা ও এক ফুট লম্বা পাত করিয়া বিক্রয় করে। অপকৃষ্ট তাম্র ইষ্টকাকারে বিক্রীত হয়। জাপানে তামার খনিতে সময়ে সময়ে স্বর্ণ পাওয়া যায়। সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত কেহই স্বর্ণখনির কার্য্য করিতে পারে না। এখানকার টিন রৌপ্যের ন্যায় শুভ্র ও উজ্জ্বল। জাপানের নানাস্থানে একরূপ মৃত্তিকা পাওয়া যায়, তাহা হইতে মনােহর বাসন প্রস্তুত হয়। চীনাবাসন বলিয়া ইহা পৃথিবীর নানাদেশে বিক্রয় হইয়া থাকে।
- ভৌগলিক বৃত্তান্ত,আকরিক, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস - উমাকান্ত হাজারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭
- ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস মহাভারতের ও পুরাণের সুদৃঢ় প্রস্তর ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। মনুসংহিতায় ও বিষ্ণুপুরাণে যখন জাতিরূপে উল্লিখিত হইয়াছে। মহাভারতে যবনের উৎপত্তির ইতিহাস ব্যাপকভাবে বর্ণিত হইয়াছে। মহর্ষি বশিষ্ঠের গাভী হইতে বিবিধ যোদ্ধৃজাতিসহ যবনের উৎপত্তির কাহিনী অবিশ্বাস্য হইলেও উহা যে বেদমূলক তাহাতে সন্দেহের অবসর নাই।
- বৈদিক গবেষণা, তৃতীয় অধ্যায়, বৈদিক গবেষণা - উমাকান্ত হাজারী, প্রথম খণ্ড, প্রকাশসাল- ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২১৯
- হােয়াইট দ্বীপে কয়লা, কেরাসিন, স্বর্ণ ও রৌপ্যের আকর আছে। জাপানের তাম্রখনি পৃথিবীমধ্যে বিখ্যাত। এক্ষণে সমগ্র জাপান সাম্রাজ্যে ৫৭টী রৌপ্য ১৩৬টী তাম্র-রৌপ্য এবং ৭২টী মিশ্রধাতুর খনি আছে। এই সমস্ত খনি হইতে গত পূর্ব্ব বর্ষে ৯ লক্ষ মণ তাম্র ৬২ হাজার মণ স্বর্ণ, দেড় লক্ষ মণ রৌপ্য, ২৫ কোটী মণ কয়লা উত্তোলিত হইয়াছিল। গতবর্ষে জাপানে যে সুবর্ণখনি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার মূল্য আনুমানিক হিসাবে ৪০০ কোটী স্থির হইয়াছে।
- জাপানের বাণিজ্য, নব্য জাপান ও রুষ জাপান যুদ্ধের ইতিহাস - উমাকান্ত হাজারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬৯
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিসংকলনে উমাকান্ত হাজারী রচিত অথবা সম্পর্কিত রচনা রয়েছে।