এরিক হবসবাউম
অবয়ব

এরিক জন আর্নেস্ট হবসবম, সিএইচ, এফআরএসএল, এফবিএ (৯ জুন,১৯১৭ - ১ অক্টোবর,২০১২) ছিলেন একজন ব্রিটিশ মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ ও লেখক। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট ব্রিটেনের (১৯২০–১৯৯১) একজন প্রধান তাত্ত্বিক এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত বার্কবেক কলেজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
উদ্ধৃতি
[সম্পাদনা]- আমাদের যুগের বুদ্ধিজীবী এবং মার্ক্সবাদের মধ্যে যে প্রেমের সম্পর্ক দেখা যায়, তা পশ্চিম ইউরোপে তুলনামূলকভাবে দেরিতে শুরু হয়েছিল। যদিও রাশিয়ায় এটি মার্ক্সের জীবদ্দশাতেই শুরু হয়।
- "বুদ্ধিজীবী এবং কমিউনিজম" (১৯৬৪), 'রেভোলিউশনারিস: কনটেম্পোরারি এসেস' (১৯৭৩) প্রকাশিত।
- প্রথমত, সম্ভবত কোনো বড় ধরনের বিপ্লব সফল করার জন্য যে অতিমানবীয় প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়, তা তৈরির জন্য ইউটোপিয়াবাদ একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক কৌশল।
- 'প্রিমিটিভ রেবেলস: স্টাডিজ ইন আর্কাইক ফর্মস অফ সোশ্যাল মুভমেন্ট ইন দ্য নাইনটিনথ অ্যান্ড টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরিস' (১৯৭১), পৃষ্ঠা ৬০।
- ইতিহাসবিদরা জাতীয়তাবাদের কাছে ঠিক তেমনই, যেমন পাকিস্তানের পোস্ত চাষীরা হেরোইন আসক্তদের কাছে। আমরা বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ করি। অতীতহীন জাতি একটি স্ববিরোধী ধারণা। অতীতই একটি জাতি গঠন করে এবং অন্য জাতির বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্বের ন্যায্যতা দেয়। ইতিহাসবিদরাই সেই অতীত তৈরি করেন। তাই আমার পেশাটি রাজনীতির সাথে মিশে গিয়ে জাতীয়তাবাদের একটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে।
- "এথনিসিটি অ্যান্ড ন্যাশনালিজম ইন ইউরোপ টুডে" (ফেব্রুয়ারি ১৯৯২), 'অ্যানথ্রোপোলজি টুডে'।
- উদারতাবাদ ব্যর্থ হচ্ছিল। আমি যদি ইহুদি না হয়ে জার্মান হতাম, তবে সম্ভবত আমি একজন নাৎসি বা জার্মান জাতীয়তাবাদী হতাম। আমি বুঝতে পারতাম তারা জাতি রক্ষার বিষয়ে কতটা আবেগপ্রবণ ছিল। সেটি এমন এক সময় ছিল যখন বিশ্বকে আমূল পরিবর্তন না করলে কোনো ভবিষ্যৎ আছে বলে কেউ বিশ্বাস করত না।
- এরিক হবসবমের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, মায়া জাগি কর্তৃক 'দ্য গার্ডিয়ানে' প্রকাশিত “আ কোয়েশ্চেন অফ ফেইথ” (১৪ সেপ্টেম্বর ২০০২)।
- মনে হচ্ছে জেনোফোবিয়া বা বিদেশাতঙ্ক বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের একটি গণ-আদর্শে পরিণত হতে যাচ্ছে।
- 'ডিভাইডেড ইউরোপীয়ানস: আন্ডারস্ট্যান্ডিং এথনিসিটিস ইন কনফ্লিক্ট' (১৯৯৯), পৃষ্ঠা ৪১।
- লন্ডনের দিকে তাকান। আমাদের সবার কাছেই লন্ডনের অর্থনীতির সমৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় উৎপন্ন বিশাল সম্পদের পরীক্ষা এই নয় যে এটি ব্রিটেনের মোট জিডিপিতে ২০-৩০% অবদান রাখছে। বরং পরীক্ষাটি হলো এটি সেখানে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে। তারা সেখানে থাকার সামর্থ্য রাখে কি না? যদি না রাখে, তবে লন্ডন অতি-ধনীদের স্বর্গরাজ্য হওয়া তাদের জন্য কোনো সান্ত্বনা নয়। তারা কি উপযুক্ত বেতনের চাকরি পায়? যদি না পায়, তবে মিশেলিন-স্টার রেস্তোরাঁ বা নামী শেফদের নিয়ে বড়াই করবেন না। কিংবা শিশুদের শিক্ষার কথা ধরুন৷ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক দল নোবেল বিজয়ী থাকলেই অপর্যাপ্ত স্কুলগুলোর অভাব পূরণ হয় না।
- 'দ্য গার্ডিয়ান' (২০০৯)।
- বিশ্বজুড়ে যেভাবে ভারতীয় ও চীনা রেস্তোরাঁর বিস্তার ঘটছে, তা থেকে বোঝা যায় যে জেনোফোবিয়া বিদেশি মানুষের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়, বিদেশি সাংস্কৃতিক আমদানির বিরুদ্ধে নয়।
- 'ম্যাপিং দ্য নেশন' (১৩ নভেম্বর ২০১২), পৃষ্ঠা ২৬৩।
'দ্য এজ অফ রেভল্যুশন' (১৯৬২)
[সম্পাদনা]- ইতিহাসের জালকে ছিঁড়ে না ফেলে একে আলাদা আলাদা সুতোয় ভাগ করা সম্ভব নয়। তবে বাস্তব কাজের সুবিধার্থে বিষয়টিকে নির্দিষ্ট উপবিভাগে ভাগ করা অপরিহার্য।
- প্রস্তাবনা
- নথিপত্রের চেয়ে শব্দ অনেক সময় বেশি জোরালোভাবে কথা বলে। ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত যে ষাট বছর নিয়ে এই বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে, সেই সময়ে উদ্ভাবিত বা আধুনিক অর্থ লাভ করা কিছু ইংরেজি শব্দের কথা ভাবুন। যেমন,'ইন্ডাস্ট্রি' (শিল্প), 'ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট' (শিল্পপতি), 'ফ্যাক্টরি' (কারখানা), 'মিডল ক্লাস' (মধ্যবিত্ত), 'ওয়ার্কিং ক্লাস' (শ্রমজীবী শ্রেণি) এবং 'সোশ্যালিজম' (সমাজতন্ত্র)। এছাড়া রয়েছে 'অ্যারিস্টোক্রাসি' (অভিজাততন্ত্র), 'রেলওয়ে' (রেলপথ), 'লিবারেল' (উদারপন্থী) ও 'কনজারভেটিভ' (রক্ষণশীল) রাজনৈতিক শব্দাবলি, 'ন্যাশনালিটি' (জাতীয়তা), 'সায়েন্টিস্ট' (বিজ্ঞানী) এবং 'ইঞ্জিনিয়ার' (প্রকৌশলী), 'প্রলেতারিয়েত' (সর্বহারা) এবং অর্থনৈতিক 'ক্রাইসিস' (সংকট)।
- ভূমিকা
- 'আলোকায়ন' বা এনলাইটেনমেন্টকে কঠোরভাবে মধ্যবিত্তের মতাদর্শ বলা সঠিক নয়, যদিও অনেক আলোকায়নবাদী,যারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন। এটি ধরে নিয়েছিলেন যে, একটি মুক্ত সমাজ মানেই হবে একটি পুঁজিবাদী সমাজ। তাত্ত্বিকভাবে এর লক্ষ্য ছিল সকল মানুষকে মুক্ত করা। সমস্ত প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী এবং মানবতাবাদী মতাদর্শ এর মধ্যেই নিহিত ছিল। তবে বাস্তবে এই মুক্তির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল সমাজের মধ্যস্তর। জন্মগত পরিচয়ের চেয়ে মেধা ও যোগ্যতাসম্পন্ন যুক্তিবাদী মানুষ। ফলে তাদের হাত ধরে যে সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তা ছিল মূলত 'বুর্জোয়া' এবং পুঁজিবাদী।
- অধ্যায় ১: ১৭৮০ দশকের বিশ্ব
- শিল্প বিপ্লবের প্রথম দুই প্রজন্মে ব্রিটেনের মৌলিক সত্যটি ছিল এই যে, অভিজাত এবং ধনী শ্রেণি এত দ্রুত এবং এত বিশাল পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করেছিল যা ব্যয় বা বিনিয়োগ করার সব সুযোগকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
- অধ্যায় ২: শিল্প বিপ্লব
- ফ্রান্স অধিকাংশ দেশের জন্য আইনের কোড বা বিধিমালা, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সংগঠনের মডেল এবং পরিমাপের মেট্রিক পদ্ধতি উপহার দিয়েছিল। ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমেই আধুনিক বিশ্বের মতাদর্শগুলো প্রথম প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করে।
- অধ্যায় ৩: ফরাসি বিপ্লব
- নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছিলেন সেই 'লিটল কর্পোরাল' (ছোট কর্পোরাল) যিনি নিছক ব্যক্তিগত প্রতিভার জোরে একটি মহাদেশ শাসন করেছিলেন। নেপোলিয়ন উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একটি ব্যক্তিগত নাম দিয়েছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে যখন 'দ্বৈত বিপ্লব' (শিল্প ও ফরাসি বিপ্লব) উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের জন্য পৃথিবী উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন আঠারো শতকের যুক্তিবাদী ও আলোকিত মানুষ, আবার রুশোর শিষ্য হিসেবে ১৯ শতকের রোমান্টিক মানুষও বটে। ফরাসিদের জন্য তিনি ছিলেন তাদের দীর্ঘ ইতিহাসের সফলতম শাসক। তিনি কেবল একটি জিনিস ধ্বংস করেছিলেন। তা হলো জ্যাকোবিন বিপ্লব, অর্থাৎ সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার সেই স্বপ্ন।
- অধ্যায় ৩: ফরাসি বিপ্লব
- রাজনৈতিক ভূগোলের বিচারে ফরাসি বিপ্লব ইউরোপের মধ্যযুগের অবসান ঘটিয়েছিল।
- অধ্যায় ৪: যুদ্ধ
- যুদ্ধের সত্যিকারের ভীতিজনক ঝুঁকি ছিল অবহেলা, নোংরা পরিবেশ, দুর্বল সংগঠন, ত্রুটিপূর্ণ চিকিৎসা সেবা এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অজ্ঞতা,যা সেনাদের প্রায় সবাইকেই আক্রান্ত করত।
- অধ্যায় ৪: যুদ্ধ
- আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তির একটি বিধান আলাদাভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হলো আন্তর্জাতিক দাস-ব্যবসা বিলুপ্তি। এর পেছনে মানবিক ও অর্থনৈতিক উভয় কারণই ছিল। দাসপ্রথা যেমন ছিল ভয়ংকর, তেমনই ছিল অত্যন্ত অদক্ষ। তাছাড়া ১৮১৫-৪৮ সালের অর্থনীতি আর আগের মতো মানুষ বা চিনি বিক্রির ওপর নির্ভরশীল ছিল না, বরং তা সুতি বস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
- অধ্যায় ৫: শান্তি
- ১৮১৫ পরবর্তী প্রজন্মে ইতিহাসের গতিপথ আটকে রাখার ক্ষেত্রে সরকারগুলোর অক্ষমতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। দ্বিতীয় কোনো ফরাসি বিপ্লব ঠেকানোই ছিল তৎকালীন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রধান লক্ষ্য। তবুও ইউরোপের ইতিহাসে আর কখনও বৈপ্লবিক চেতনা এত বেশি সংক্রামক হয়ে ওঠেনি।
- অধ্যায় ৬: বিপ্লবসমূহ
- অন্য কোথাও জাতীয়তাবাদের মতো কিছু খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না, কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক শর্তগুলো তখন বিদ্যমান ছিল না।
- অধ্যায় ৭: জাতীয়তাবাদ
- ১৮০৭ থেকে ১৮১৬ সালের মধ্যে প্রুশিয়ার কৃষকদের মুক্তির ক্ষেত্রে তিনটি কারণ কাজ করেছিল। ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব, আমলাদের যৌক্তিক অর্থনৈতিক যুক্তি এবং অভিজাতদের লোভ।
- অধ্যায় ৮: ভূমি
- দ্বৈত বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গভীর ও স্থায়ী প্রভাবটি হলো ‘উন্নত’ এবং ‘অনুন্নত’ দেশের মধ্যে বিভাজন।
- অধ্যায় ৯: একটি শিল্পোন্নত বিশ্বের দিকে
- যাদের বংশপরিচয় বা জাতিগত কারণে এতদিন বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে, সেই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোই 'যোগ্যতার ভিত্তিতে ক্যারিয়ার' গড়ার সুযোগকে সবচেয়ে বেশি স্বাগত জানিয়েছিল।
- অধ্যায় ১০: মেধার মূল্যায়ন
- পালানো বা পরাজয়ের বিকল্প ছিল বিদ্রোহ। শ্রমজীবী দরিদ্র এবং বিশেষ করে শিল্প প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রেণির অবস্থা এমন ছিল যে, বিদ্রোহ করা তাদের জন্য কেবল সম্ভবই ছিল না বরং অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শ্রম ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্থান ছিল অনিবার্য।
- অধ্যায় ১১: শ্রমজীবী দরিদ্র
- ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় এবং বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে (চীন সম্ভবত এর প্রধান ব্যতিক্রম) শিক্ষিত গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া বাকি সবাই জগতকে ঐতিহ্যবাহী ধর্মের আলোকে দেখত। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, অনেক দেশে 'খ্রিস্টান' শব্দটি ছিল 'কৃষক' বা এমনকি 'মানুষ' শব্দের সমার্থক।
- অধ্যায় ১২: মতাদর্শ: ধর্ম
- ধর্ম, যা একসময় আকাশের মতো ছিল যা থেকে কেউ পালাতে পারত না, তা ধীরে ধীরে মেঘের স্তূপের মতো হয়ে উঠল। যা মানবমন্ডলের একটি বিশাল কিন্তু সীমিত ও পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য।
- অধ্যায় ১২: মতাদর্শ: ধর্ম
- বুর্জোয়াদের বিজয় ফরাসি বিপ্লবকে এনলাইটেনমেন্টের ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক মতাদর্শে দীক্ষিত করেছিল এবং যেহেতু এই বিপ্লবের ভাষা পরবর্তী সকল বৈপ্লবিক আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠেছিল, তাই এটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে ছড়িয়ে দিয়েছিল।
- অধ্যায় ১২: মতাদর্শ: ধর্ম
- ক্লাসিক্যাল লিবারেলিজম বা উদারতাবাদের কাছে 'মানুষ' ছিল মূলত একটি সামাজিক প্রাণী যে কেবল বৃহৎ সংখ্যার মাঝে সহাবস্থান করে। তাই সামাজিক লক্ষ্যগুলো ছিল প্রতিটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত লক্ষ্যের গাণিতিক সমষ্টি। ‘সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক সুখ’ ছিল সমাজের প্রধান লক্ষ্য।
- অধ্যায় ১৩: মতাদর্শ: ধর্মনিরপেক্ষতা
- সমাজের সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর শিল্পকর্মও অনেক সময় পুরো মানবজাতিকে কাঁপিয়ে দেওয়া ভূকম্পনের প্রতিধ্বনি তুলতে পারে। আমাদের সময়কালের সাহিত্য ও শিল্পকলা তা-ই করেছিল এবং এর ফলাফল ছিল ‘রোমান্টিসিজম’ বা রোমান্টিকতাবাদ।
- অধ্যায় ১৪: শিল্পকলা
- বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মধ্যে সাদৃশ্য টানা সবসময়ই বিপজ্জনক। তবুও বিজ্ঞানও দ্বৈত বিপ্লবের প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। কারণ এটি বিজ্ঞানের কাছে নতুন দাবি তুলেছিল এবং চিন্তার নতুন ধরণ তৈরি করেছিল।
- অধ্যায় ১৫: বিজ্ঞান
- বিজ্ঞানের উন্নতি কোনো সাধারণ সরলরৈখিক অগ্রগতি নয়।
- অধ্যায় ১৫: বিজ্ঞান
- ১৮৩১ সালে ভিক্টর হুগো লিখেছিলেন যে, তিনি মাটির গভীর থেকে বিপ্লবের পূর্ণ শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, যা ইউরোপের রাজতন্ত্রের নিচ দিয়ে প্যারিসের কেন্দ্রীয় খনি থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে এগিয়ে চলেছে। ১৮৪৭ সালে সেই শব্দ অনেক কাছে এবং জোরালো হয়ে আসে। ১৮৪৮ সালে সেই বিস্ফোরণটি ঘটে।
- অধ্যায় ১৬: উপসংহার: ১৮৪৮-এর দিকে
'ব্যান্ডিটস' (১৯৬৯; ১৯৭২; ১৯৮১)
[সম্পাদনা]- মানুষ হয়তো দস্যুদের সাথে দেখা করতে পছন্দ করবে না, বিশেষ করে কোনো অন্ধকার রাতে। তবে তাদের সম্পর্কে পড়ার আগ্রহ যেন বিশ্বজনীন।
- প্যানথিয়ন সংস্করণের প্রস্তাবনা
- 'সামাজিক দস্যু' বা সোশ্যাল ব্যান্ডিটদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তারা এমন একদল কৃষক বহির্ভূত মানুষ যাদেরকে জমিদার এবং রাষ্ট্র অপরাধী হিসেবে গণ্য করে, কিন্তু তারা কৃষক সমাজের ভেতরেই অবস্থান করে। তাদের আপনজন বা সাধারণ মানুষ তাদের নায়ক, রক্ষক, প্রতিশোধ গ্রহণকারী, ন্যায়ের জন্য লড়াকু যোদ্ধা, এমনকি হয়তো মুক্তির নেতা হিসেবে বিবেচনা করে। যেকোনো পরিস্থিতিতেই তারা এমন মানুষ যাদেরকে শ্রদ্ধা করা হয়, সাহায্য করা হয় এবং সমর্থন দেওয়া হয়। সাধারণ কৃষক এবং এই বিদ্রোহী বা ডাকাতদের মধ্যকার এই নিবিড় সম্পর্কই সামাজিক দস্যুবৃত্তিকে আকর্ষণীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
- অধ্যায় ১: সামাজিক দস্যুবৃত্তি কী?
- 'কারমিন ক্রোকো' (কারমিন ডোনাটেলি), যিনি ছিলেন একজন কৃষি শ্রমিক ও রাখাল। তিনি বোর্বন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এক ঝগড়ার সময় সহকর্মীকে হত্যা করে পালিয়ে যান এবং দশ বছর ফেরারি হিসেবে জীবন কাটান। অতীতে করা অপরাধের ক্ষমা পাওয়ার আশায় তিনি ১৮৬০ সালে উদারপন্থী বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে বোর্বন পক্ষের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ গেরিলা প্রধান ও জননেতায় পরিণত হন।
- অধ্যায় ১: সামাজিক দস্যুবৃত্তি কী?
- দস্যুবৃত্তি হলো এক ধরণের মুক্তি। কিন্তু কৃষক সমাজে খুব কম মানুষই মুক্ত হতে পারে। অধিকাংশ মানুষই প্রভুত্ব এবং শ্রমের দ্বৈত শিকলে বন্দি, যেখানে একটি অন্যটিকে আরও শক্তিশালী করে। কৃষকদের কর্তৃপক্ষের শিকারে পরিণত করার পেছনে তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা যতটা না দায়ী—কারণ তারা প্রায়ই আত্মনির্ভরশীল হয়। তার চেয়ে বেশি দায়ী তাদের চলনশক্তির সীমাবদ্ধতা বা স্থবিরতা।
- অধ্যায় ২: কে দস্যু হয়?
'দ্য এজ অফ ক্যাপিটাল' (১৯৭৫)
[সম্পাদনা]- ১৭৮৯ থেকে ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের দ্বৈতবাদ সেই সময়ের ইতিহাসকে একটি ঐক্য এবং সামঞ্জস্য দান করেছে। এক অর্থে এটি সম্পর্কে লেখা এবং পড়া বেশ সহজ। কারণ এর একটি স্পষ্ট থিম এবং কাঠামো রয়েছে এবং এর কালানুক্রমিক সীমাও মানুষের অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় বেশ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত।
- ভূমিকা
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনীতি বিপ্লবী অঞ্চলকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছিল, যাদের চরমপন্থার মধ্যে খুব সামান্যই মিল ছিল। তাদের সামাজিক কাঠামো মৌলিকভাবে ভিন্ন ছিল, তবে গ্রামীন মানুষের সংখ্যা যে শহরের তুলনায় বেশি ছিল। তা সবখানেই প্রযোজ্য ছিল। এই বিষয়টি প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় কারণ শহরের জনসংখ্যা এবং বিশেষ করে বড় শহরগুলো রাজনীতিতে অসমভাবে প্রভাবশালী ছিল।
- অধ্যায় ১: 'জনগণের বসন্তকাল'
- সামাজিক ব্যবস্থার রক্ষকদের সাধারণ মানুষের রাজনীতি শিখতে হয়েছিল। এটি ছিল ১৮৪৮ সালের বিপ্লবগুলোর মাধ্যমে আসা প্রধান উদ্ভাবন। এমনকি অতি-রক্ষণশীল প্রুশীয় জুনকাররাও (জমিদার শ্রেণি) সেই বছর আবিষ্কার করেছিলেন যে, 'জনমত' প্রভাবিত করার জন্য তাদের একটি সংবাদপত্র প্রয়োজন। যা আসলে একটি উদারপন্থী ধারণা এবং ঐতিহ্যগত উচ্চ-নীচ কাঠামোর সাথে সংঘাতপূর্ণ।
- অধ্যায় ১: 'জনগণের বসন্তকাল'
- আমরা যখন পূর্ববর্তী সময়ের 'বিশ্ব ইতিহাস' লিখি, তখন আমরা আসলে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের ইতিহাসের একটি সমষ্টি তৈরি করি। কিন্তু সেই সময়ের অঞ্চলগুলোর একে অপরের সম্পর্কে খুব সামান্য এবং ভাসাভাসা ধারণা ছিল, যতক্ষণ না কোনো অঞ্চলের অধিবাসীরা অন্য কোনো অঞ্চল জয় বা দখল করত (যেমনটি পশ্চিম ইউরোপীয়রা আমেরিকা মহাদেশে করেছিল)।
- অধ্যায় ৩: বিশ্ব যখন একীভূত
- উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের মানুষের তুলনায় আমরা এখন বিশ্বের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ার সাথে অনেক বেশি পরিচিত। তবে বর্তমান সময়ের (২০ শতকের শেষের দিক) বিশ্বায়ন এবং সেই সময়ের প্রক্রিয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে যা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তা হলো একটি আন্তর্জাতিক প্রমিতকরণ, যা নিছক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। এই দিক থেকে আমাদের বর্তমান বিশ্ব ফিলিয়াস ফগের বিশ্বের চেয়ে অনেক বেশি যান্ত্রিকভাবে প্রমিত।
- অধ্যায় ৩: বিশ্ব যখন একীভূত
- ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কাঠামোটি বাস্তব কাঠামো থেকে আলাদা হতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বৈশ্বিক রাজনীতিতে পরিণত হয়, যেখানে অন্তত দুটি অ-ইউরোপীয় শক্তি কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে (যদিও ২০ শতকের আগে এটি স্পষ্ট হয়নি)। তদুপরি, এটি পুঁজিবাদী-শিল্পোন্নত শক্তিগুলোর একটি গোষ্ঠীগত আধিপত্যে পরিণত হয়, যারা যৌথভাবে বিশ্বের ওপর একচেটিয়া প্রভাব খাটাত কিন্তু নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকত।
- অধ্যায় ৪: দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ
- সরকারগুলো যদি জাতীয়তাবাদকে একটি ঐতিহাসিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে, তবে ‘গণতন্ত্র’ বা রাষ্ট্রীয় কাজে সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা ছিল অন্য একটি শক্তি। এই দুটি শক্তি একই ছিল, কারণ এই সময়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলো গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। তবে বাস্তবে কৃষকদের মতো বড় একটি অংশ তখনও জাতীয়তাবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়নি, আবার নতুন শ্রমিক শ্রেণিকে এমন আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল যা জাতীয় পরিচয়ের চেয়ে আন্তর্জাতিক শ্রেণি স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিত।
- অধ্যায় ৬: গণতন্ত্রের শক্তিসমূহ
- পুঁজিবাদ এবং বুর্জোয়া সমাজের বিজয়ের সাথে সাথে এর বিকল্প ব্যবস্থার সম্ভাবনাগুলো ক্ষীণ হয়ে আসছিল। ১৮৭২-৭৩ সালের দিকে পরিস্থিতি এমন ছিল যে পুঁজিবাদের কোনো বিকল্প আছে বলে মনেই হচ্ছিল না। অথচ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিজয়ী সমাজের ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং একে প্রতিস্থাপন বা উৎখাত করার আন্দোলনগুলোকে আবারও গুরুত্বের সাথে নিতে হয়।
- অধ্যায় ৯: পরিবর্তনশীল সমাজ
- উদারপন্থার জয়ের এই যুগটি শুরু হয়েছিল একটি ব্যর্থ বিপ্লব দিয়ে এবং শেষ হয়েছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দার মাধ্যমে। একটি ঐতিহাসিক সময়কালের শুরু বা শেষ চিহ্নিত করার জন্য প্রথমটি (বিপ্লব) যতটা সুবিধাজনক, দ্বিতীয়টি (মন্দা) ততটা নয়। কিন্তু ইতিহাস সবসময় ইতিহাসবিদদের সুবিধা অনুযায়ী চলে না।
- অধ্যায় ১৬: উপসংহার
'দ্য এজ অফ এম্পায়ার' (১৯৮৭)
[সম্পাদনা]- যখন ইতিহাসবিদরা এমন একটি সময়কাল বোঝার চেষ্টা করেন যার প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনও জীবিত, তখন ইতিহাসের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা একে অপরের মুখোমুখি হয়, অথবা সেরা ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে: তা হলো পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং অস্তিত্বগত ধারণা, অর্থাৎ আর্কাইভ বনাম ব্যক্তিগত স্মৃতি। প্রতিটি মানুষই তার সচেতনভাবে বেঁচে থাকা সময়ের একজন ইতিহাসবিদ, কারণ সে মনে মনে সেই সময়ের সাথে একটি বোঝাপড়া তৈরি করে। 'মৌখিক ইতিহাস' বা ওরাল হিস্ট্রি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তারা জানেন যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একজন অনির্ভরযোগ্য ইতিহাসবিদের কাজ, তবুও এর অবদান অপরিহার্য। একজন পণ্ডিত যিনি কোনো প্রবীণ সৈনিক বা রাজনীতিবিদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তিনি হয়তো ছাপানো কাগজ বা নথিপত্র থেকে সেই ব্যক্তির স্মৃতির চেয়েও অনেক বেশি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য ইতোমধ্যে সংগ্রহ করে ফেলেছেন, কিন্তু তবুও তিনি বিষয়টি ভুল বুঝতে পারেন। ক্রুসেডের ইতিহাসবিদের মতো না হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসবিদকে সেই প্রত্যক্ষদর্শীরা সংশোধন করে দিতে পারেন যারা মাথা নেড়ে বলবেন: ‘আসলে বিষয়টি একদম এমন ছিল না।’ তবুও ইতিহাসের এই দুটি সংস্করণই অতীতের এক একটি সুসংগত নির্মাণ।
- ভূমিকা।
- ১৮৭০ দশকের অধিকাংশ পর্যবেক্ষক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় অনেক বেশি মুগ্ধ ছিলেন। জ্ঞান এবং প্রকৃতিকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতার বিচারে পরিবর্তন মানেই যে উন্নতি বা অগ্রগতি, তা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে ইতিহাস মানেই প্রগতি বলে মনে হতো। এই প্রগতি পরিমাপ করা হতো যা কিছু পরিমাপযোগ্য তার ক্রমবর্ধমান রেখাচিত্র বা কার্ভ দিয়ে। ক্রমাগত উন্নতি যে ঘটবেই, তা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দিয়ে নিশ্চিত বলে মনে করা হতো। এটি বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল যে, মাত্র তিন শতাব্দী আগেও বুদ্ধিমান ইউরোপীয়রা প্রাচীন রোমানদের কৃষি, সামরিক কৌশল এবং এমনকি চিকিৎসাবিদ্যাকে নিজেদের মডেল হিসেবে গণ্য করত। মাত্র দুই শতাব্দী আগেও আধুনিকরা প্রাচীনদের ছাড়িয়ে যেতে পারবে কি না তা নিয়ে গম্ভীর বিতর্ক ছিল এবং আঠারো শতকের শেষেও বিশেষজ্ঞরা ব্রিটেনের জনসংখ্যা বাড়ছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতেন।
- অধ্যায় ১: দ্য সেন্টেনারিয়ান রেভল্যুশন
- একটি বিশ্ব অর্থনীতি যার গতি নির্ধারিত হতো উন্নত বা উন্নয়নশীল পুঁজিবাদী কেন্দ্র দ্বারা, সেখানে ‘উন্নত’ দেশগুলো ‘অনগ্রসর’ দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। এটাই ছিল স্বাভাবিক; সংক্ষেপে যা সাম্রাজ্যের বিশ্বে পরিণত হয়। তবে কৌতূহলোদ্দীপকভাবে, ১৮৭৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালকে কেবল নতুন ধরণের সাম্রাজ্যবাদের বিকাশের জন্যই 'সাম্রাজ্যের যুগ' বলা হয় না, বরং আরও একটি পুরনো কারণেও তা বলা হয়। আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসে সম্ভবত এটিই ছিল সেই সময় যখন ‘সম্রাট’ উপাধিধারী বা পশ্চিমা কূটনীতিকদের দৃষ্টিতে সম্রাট হওয়ার যোগ্য শাসকের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক।
- অধ্যায় ৩: দ্য এজ অফ এম্পায়ার
'নেশনস অ্যান্ড ন্যাশনালিজম সিন্স ১৭৮০: প্রোগ্রাম, মিথ, রিয়ালিটি' (১৯৯২)
[সম্পাদনা]- জাতি এবং জাতীয়তাবাদের কোনো গম্ভীর ইতিহাসবিদই কট্টর রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী হতে পারেন না। কারণ জাতীয়তাবাদ এমন অনেক কিছুর ওপর বিশ্বাস দাবি করে যা স্পষ্টতই সত্য নয়।
- 'নেশনস অ্যান্ড ন্যাশনালিজম সিন্স ১৭৮০' (ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২য় সংস্করণ ২০১২), পৃষ্ঠা ১২।
- তা সত্ত্বেও এটি স্পষ্ট যেমনটি গ্রিক উদাহরণ থেকে দেখা যায়।যেখানে 'প্রাক-জাতীয়তাবাদ' বিদ্যমান ছিল, সেটি জাতীয়তাবাদের কাজকে সহজ করে দিয়েছিল। প্রাক-জাতীয়তাবাদী সম্প্রদায়ের বিদ্যমান প্রতীক এবং আবেগগুলোকে একটি আধুনিক লক্ষ্য বা আধুনিক রাষ্ট্রের পেছনে একত্রিত করা সম্ভব হয়েছিল। তবে এর মানে এই নয় যে এই দুটি বিষয় একই কিংবা একটি থাকলেই যৌক্তিকভাবে অন্যটি আসবে। কারণ এটি স্পষ্ট যে জাতীয়তা, জাতি বা রাষ্ট্র গঠনের জন্য কেবল প্রাক-জাতীয়তাবাদই যথেষ্ট নয়।
- পৃষ্ঠা ৭৬–৭৭।
- তবে গণ-বহিষ্কার এবং এমনকি গণহত্যার মতো ঘটনাগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং পরে ইউরোপের দক্ষিণ প্রান্তে দেখা দিতে শুরু করে। ১৯১৫ সালে তুর্কিরা যখন আর্মেনীয়দের ব্যাপক নির্মূল শুরু করে এবং ১৯১১ সালের গ্রিক-তুর্কি যুদ্ধের পর এশিয়া মাইনর (যেখানে তারা হোমারের আমল থেকে বসবাস করছিল) থেকে ১৩ থেকে ১৫ লক্ষ গ্রিক মানুষকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে অ্যাডলফ হিটলার, যিনি এই দিক থেকে একজন যৌক্তিক উইলসোনীয় জাতীয়তাবাদী ছিলেন, তিনি পিতৃভূমির বাইরে বসবাসকারী জার্মানদের (যেমন ইতালীয় দক্ষিণ টাইরোলের বাসিন্দা) জার্মানিতে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেন এবং পাশাপাশি ইহুদিদের স্থায়ীভাবে নির্মূল করার পরিকল্পনা করেন।
- পৃষ্ঠা ১৩৩।
'দ্য এজ অফ এক্সট্রিমস' (১৯৯২)
[সম্পাদনা]- আমার লক্ষ্য হলো এটি বোঝা এবং ব্যাখ্যা করা যে কেন ঘটনাগুলো এভাবে ঘটল এবং তারা একে অপরের সাথে কীভাবে যুক্ত। আমার সমবয়সী যারা এই ‘সংক্ষিপ্ত বিংশ শতাব্দীর’ প্রায় পুরোটা সময় বেঁচে ছিলেন, তাদের জন্য এটি অনিবার্যভাবে একটি আত্মজীবনীমূলক প্রচেষ্টাও বটে। আমরা এখানে নিজেদের স্মৃতিগুলোকেই আরও জোরালো করছি এবং প্রয়োজনে সংশোধন করছি।
- ভূমিকা
- বর্তমান অভিজ্ঞতার সাথে পূর্ববর্তী প্রজন্মের যে সামাজিক বন্ধন বা যোগসূত্র, তা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের অন্যতম অদ্ভুত এবং ভীতিজনক ঘটনা।
- ভূমিকা, 'দ্য সেঞ্চুরি: আ বার্ডস আই ভিউ'
- ১৯৮০-এর দশকের শেষে যে বিশ্বটি ভেঙে পড়েছিল, সেটি ছিল মূলত ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রভাবে গড়ে ওঠা একটি বিশ্ব।
- অত্যন্ত সহজভাবে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কে বা কিসের কারণে হয়েছিল। এই প্রশ্নের উত্তর দুটি শব্দে দেওয়া সম্ভব: অ্যাডলফ হিটলার।
- পৃষ্ঠা ৩৬
- পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য মানুষ খুব একটা দক্ষভাবে তৈরি হয়নি।
- পৃষ্ঠা ৪১৪
- ক্ষমতায় থাকা কমিউনিজমের কূটাভাস বা প্যারাডক্স ছিল এই যে, এটি ছিল রক্ষণশীল।
- পৃষ্ঠা ৪২২
- কেন প্রতিভাবান ফ্যাশন ডিজাইনাররা (যারা বিশ্লেষণাত্মক হিসেবে পরিচিত নন) মাঝেমধ্যে পেশাদার ভবিষ্যদ্বাণীকারীদের চেয়েও আগাম পরিস্থিতি ভালোভাবে আঁচ করতে পারেন। তা ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় প্রশ্ন এবং সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় বিষয়।
- অধ্যায় ৬: শিল্পকলা ১৯১৪-১৯৪৫
- বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে সমাজ বা সমষ্টির ওপর ব্যক্তির জয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। অন্যভাবে বললে, এটি হলো সেই সামাজিক বন্ধনগুলো ছিঁড়ে ফেলা যা অতীতে মানুষকে একসূত্রে গেঁথে রাখত। অতীতে অধিকার, কর্তব্য, পাপ-পুণ্য এবং বিবেকের যে নৈতিক ভাষা ছিল, তা এখন কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। মনে হচ্ছে যেন কম্পাসের কাঁটা তার উত্তর দিক হারিয়েছে এবং মানচিত্রগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে।
- অধ্যায় ১১: সাংস্কৃতিক বিপ্লব, পৃষ্ঠা ৩২০-৩৩৯
- অক্টোবর বিপ্লবের ট্র্যাজেডি ছিল এটাই যে, এটি কেবল নির্মম, নিষ্ঠুর এবং আদেশভিত্তিক সমাজতন্ত্রই তৈরি করতে পেরেছিল।
- অধ্যায় ১৬: সমাজতন্ত্রের সমাপ্তি
- আমি যখন পেছনের কথা ভাবি, তখন বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করি: পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সেই নির্বিচার এবং নির্মমভাবে এগিয়ে যাওয়ার কি কোনো বিকল্প ছিল? আমি যদি বলতে পারতাম যে বিকল্প ছিল, তবে খুশি হতাম। কিন্তু আমি তা পারছি না। আমি এর কোনো উত্তর খুঁজে পাই না।
- অধ্যায় ১৬: সমাজতন্ত্রের সমাপ্তি
- আদর্শ হিসেবে কমিউনিজম নারীর মুক্তি ও সমঅধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। যদিও লেনিন নিজে অবাধ যৌনতাকে অপছন্দ করতেন। এমনকি লেনিন ও ক্রুপস্কায়া সেই বিরল বিপ্লবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা ঘরের কাজে নারী-পুরুষের অংশীদারিত্বের পক্ষে ছিলেন। তা সত্ত্বেও, নতুন কমিউনিস্ট শাসিত রাষ্ট্রগুলোতে উচ্চ রাজনৈতিক পদে নারীদের উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন চিকিৎসার মতো কোনো পেশা নারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হলো, তখন সেই পেশার মর্যাদা এবং আয় দুই-ই কমে গেল। পশ্চিমা নারীবাদীদের তুলনায় অধিকাংশ বিবাহিত সোভিয়েত নারী ঘরে থাকাকেই বিলাসিতা মনে করতেন।
- অধ্যায় ১৬: সমাজতন্ত্রের সমাপ্তি
- আমাদের শতাব্দীর সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতাগুলো ছিল দূর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তের নির্মমতা, যা 'পদ্ধতি' বা 'রুটিনের' নামে চলত। বিশেষ করে যখন সেগুলোকে 'কৌশলগত প্রয়োজন' বলে চালিয়ে দেওয়া হতো।
- সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ ছিল আধুনিক শিল্পকলার জগতে এক প্রকৃত সংযোজন। এর অভিনবত্ব ছিল মানুষকে ধাক্কা দেওয়ার বা হতবাক করার ক্ষমতার মধ্যে। এমনকি পুরনো শিল্পীদের মাঝেও এটি বিভ্রান্তি বা অস্বস্তিকর হাসির জন্ম দিত।
- শিল্পকলা ১৯১৪-১৯৪৫
- রেডিওর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিল সংগীত, কারণ এটি শব্দের যান্ত্রিক বা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে দিয়েছিল। ১৯১৪ সালের আগেই গ্রামোফোনের মাধ্যমে সংগীত যান্ত্রিক উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করেছিল, যদিও তখন এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল।
- শিল্পকলা ১৯১৪-১৯৪৫
- এটি আধুনিকতাবাদী শিল্পীদের জন্য একটি ট্র্যাজেডি ছিল যে, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক দল বা নেতারা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছিল। ডানপন্থী হোক বা বামপন্থী। নতুন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী স্থাপত্যের ক্ষেত্রে বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ, পেইন্টিং ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণাদায়ী উপস্থাপনা এবং নাটকের ক্ষেত্রে ধ্রুপদী প্রদর্শনীকেই বেশি পছন্দ করত।
- শিল্পকলা ১৯১৪-১৯৪৫
'অন হিস্ট্রি' (১৯৯৭)
[সম্পাদনা]- ইতিহাসকে মিথ বা অলীক কল্পনা দিয়ে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টাগুলো কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতুক নয়। এগুলো এমনকি স্কুলের পাঠ্যবই কেমন হবে তাও নির্ধারণ করে দেয়। জাপানি কর্তৃপক্ষ যেমনটি করেছিল। তারা জাপানি ক্লাসরুমের জন্য চীনে জাপানি যুদ্ধের একটি পরিমার্জিত বা সেন্সরড সংস্করণ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিল। পরিচয় ভিত্তিক রাজনীতির জন্য মিথ এবং উদ্ভাবন অপরিহার্য। বর্তমানের অনিশ্চিত বিশ্বে বিভিন্ন গোষ্ঠী ধর্ম, জাতি বা সীমানা দিয়ে নিজেদের সংজ্ঞায়িত করে এবং 'আমরা অন্যদের চেয়ে আলাদা এবং শ্রেষ্ঠ'। এটি বলার মাধ্যমে এক ধরনের নিশ্চয়তা খোঁজার চেষ্টা করে।
- অধ্যায় ১: ইতিহাসের বাইরে ও ভেতরে
- অতীত হলো মানুষের চেতনার একটি স্থায়ী মাত্রা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ ও অন্যান্য কাঠামোর এক অনিবার্য উপাদান। ইতিহাসবিদদের কাজ হলো সমাজে এই 'অতীত সচেতনতার' প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা এবং এর পরিবর্তন ও রূপান্তরগুলো চিহ্নিত করা।
- অধ্যায় ২: অতীতের ধারণা
- উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন তৈরি করা অনেক সহজ। তবুও যেসব অভিজ্ঞতাকে আমরা খুব সাধারণ বলে ধরে নিই, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা একেবারেই মূল্যহীন কাজ নয়। আমরা মাছের মতো অতীতের মধ্যেই সাঁতার কাটি এবং এটি থেকে বের হতে পারি না। কিন্তু এই মাধ্যমে আমাদের বেঁচে থাকা এবং চলাচলের ধরণগুলো বিশ্লেষণ ও আলোচনা করা প্রয়োজন। আমার লক্ষ্য ছিল এই উভয় বিষয়কেই উদ্দীপিত করা।
- অধ্যায় ২: অতীতের ধারণা
- অতীতের সাপেক্ষে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন,তা কেবল আগ্রহের বিষয় নয়। বরং অপরিহার্য। আমরা নিজেদের জীবন, পরিবার বা গোষ্ঠীর ধারাবাহিকতার বাইরে নিজেদের কল্পনা করতে পারি না। আমরা অতীত ও বর্তমানের তুলনা না করে পারি না। পারিবারিক ফটোর অ্যালবাম বা ভিডিওগুলো তো এজন্যই থাকে। অভিজ্ঞতা মানেই হলো অতীত থেকে শেখা। আমরা হয়তো ভুল কিছু শিখতে পারি এবং প্রায়ই তা করি। কিন্তু আমরা যদি প্রাসঙ্গিক অতীত থেকে শিখতে না পারি বা শিখতে অস্বীকার করি, তবে চরম ক্ষেত্রে আমরা মানসিকভাবে অস্বাভাবিক হিসেবে গণ্য হবো।
- অধ্যায় ৩: সমকালীন সমাজ সম্পর্কে ইতিহাস আমাদের কী বলতে পারে?
- অনুপ্রেরণা বা আদর্শ হিসেবে ইতিহাসের মাঝে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য ‘মিথ’ তৈরির একটি সহজাত প্রবণতা থাকে। আধুনিক জাতি ও জাতীয়তাবাদের ইতিহাস যেমনটি দেখিয়েছে, এর চেয়ে ভয়ংকর অন্ধত্ব আর কিছুই হতে পারে না।
- অধ্যায় ৩: সমকালীন সমাজ সম্পর্কে ইতিহাস আমাদের কী বলতে পারে?
- আমি বিষয়টি একটি কূটাভাস বা প্যারাডক্সের মাধ্যমে বলি। পুঁজিবাদ এবং বুর্জোয়া সমাজ যে একটি অস্থায়ী ঐতিহাসিক ঘটনা,মার্ক্সের এই প্রমাণটি পছন্দ করি না বলে তাকে প্রত্যাখ্যান করা যেমন ঠিক নয়, তেমনই আমরা সমাজতন্ত্র চাই বলেই তাকে অন্ধভাবে গ্রহণ করাও অনুচিত। আমি বিশ্বাস করি মার্ক্স গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কিছু মৌলিক প্রবণতা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেগুলো আসলে কী বয়ে আনবে তা আমরা জানি না। ভবিষ্যৎ অনেক সময় অচেনা হয়ে দেখা দেয়। তা ভবিষ্যৎবাণী ভুল হওয়ার জন্য নয় বরং আমরা হয়তো আগন্তুককে ভুল পোশাকে কল্পনা করেছিলাম বলে।
- অধ্যায় ৪: সামনের দিকে তাকানো: ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ
- উপসংহারে বলা যায়, এই শতাব্দীতে ইতিহাস তার পথে হোঁচট খেতে খেতে হলেও প্রকৃত উন্নতি করেছে। এটি এমন একটি বিষয় যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যাচাইযোগ্য এবং এর মাধ্যমে মানব সমাজের জটিল ও বিবর্তনশীল বিকাশকে আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব। আমি জানি অনেকে এটি অস্বীকার করেন।
- অধ্যায় ৫: ইতিহাস কি উন্নতি করেছে?
- ইতিহাসের বিষয়বস্তু অতীত হওয়ায় এটি কোনো ‘ফলিত বিদ্যা’ বা অ্যাপ্লাইড ডিসিপ্লিন হওয়ার অবস্থানে নেই। কারণ যা ঘটে গেছে তা পরিবর্তন করার কোনো উপায় এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। বড়জোর আমরা কাল্পনিক বিকল্প পরিস্থিতির কথা ভাবতে পারি। অবশ্যই অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ একই অবিচ্ছিন্ন ধারার অংশ। তাই ইতিহাসবিদদের বক্তব্য ভবিষ্যতের জন্য পূর্বাভাস বা সুপারিশ হিসেবে কাজ করতে পারে।
- অধ্যায় ৭: ইতিহাসবিদ এবং অর্থনীতিবিদ: ১
- আমার যুক্তি হলো, ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হলে অর্থনীতি একটি হালবিহীন জাহাজের মতো হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতিবিদরা বুঝতে পারেন না তারা কোন দিকে যাচ্ছেন। আমি বলছি না যে কেবল কিছু চার্ট বা বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে তাকালেই সব সমস্যার সমাধান হবে। সমস্যা হলো, মূলধারার অর্থনীতিবিদদের তত্ত্ব এবং পদ্ধতি তাদের এটা বুঝতে সাহায্য করে না যে আসলে কোন দিকে তাকাতে হবে এবং কী খুঁজতে হবে।
- অধ্যায় ৭: ইতিহাসবিদ এবং অর্থনীতিবিদ: ১
- অর্থনীতিকে যদি ইতিহাসের শিকার হয়ে থাকতে না হয়, তবে তাকে অবশ্যই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে হবে। গতকালের ঘটনাগুলো আজ দৃশ্যমান হওয়ার পর তা নিয়ে কাজ করার পুরনো অভ্যেস ত্যাগ করতে হবে। এটি কেবল আগামীকালের সমস্যা নিয়ে ভাবতেই সাহায্য করবে না, বরং আগামীকালের অর্থনৈতিক তত্ত্ব গঠন করতেও ভূমিকা রাখবে।
- অধ্যায় ৭: ইতিহাসবিদ এবং অর্থনীতিবিদ: ১
- কৃষি পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়ের সাথে অ-অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে (যেমন সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ) আলাদা করা সম্ভব নয়। অন্তত স্বল্প মেয়াদে তো নয়ই। এগুলোকে আলাদা করা মানে অর্থনীতির গতিশীল বিশ্লেষণকে বিসর্জন দেওয়া।
- অধ্যায় ৮: ইতিহাসবিদ এবং অর্থনীতিবিদ: ২
- সংক্ষিপ্তভাবে, বৈজ্ঞানিক আলোচনার ক্ষেত্রে প্রতিটি বক্তব্য অবশ্যই এমন পদ্ধতি ও মানদণ্ড দ্বারা যাচাইযোগ্য হতে হবে যা কোনো দলীয় বা আদর্শগত পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত নয়। যেসব বক্তব্য এভাবে যাচাই করা যায় না, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে কিন্তু তা অন্য কোনো আলোচনার বিষয়।
- অধ্যায় ৯: পক্ষপাতিত্ব
- ইতিহাসের মৌলিক প্রশ্নটি হলো বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীর মধ্যকার পার্থক্য এবং এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি খুঁজে বের করা। প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ অর্জনের মতো কিছু বিষয়ে এটি অবশ্যই একটি একমুখী অগ্রগতি বা প্রগতিকে নির্দেশ করে। যতক্ষণ আমরা সামাজিক বিকাশকে জৈবিক বিবর্তনের সাথে গুলিয়ে না ফেলছি, ততক্ষণ একে 'বিবর্তন' বা এভোলিউশন বলতে কোনো বাধা নেই।
- অধ্যায় ১০: ইতিহাসবিদরা কার্ল মার্ক্সের কাছে কী ঋণী?
- উৎপাদন পদ্ধতির বিশ্লেষণ অবশ্যই প্রযুক্তির সংগঠন এবং অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। মার্ক্স বলেছিলেন যে রাজনৈতিক অর্থনীতি হলো নাগরিক সমাজের ব্যবচ্ছেদ বা এনাটমি। একটি উৎপাদন পদ্ধতি থেকে অন্য পদ্ধতিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিকে অনেক সময় সরলরৈখিকভাবে দেখা হয়, যা অনেক সময় জটিলতা এবং বিতর্কের সৃষ্টি করে।
- অধ্যায় ১১: মার্ক্স এবং ইতিহাস
- আমি মনে করি না যে ইতিহাসবিদদের ফ্রয়েডের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু শেখার আছে। ফ্রয়েড যখনই ইতিহাস নিয়ে কিছু লিখেছেন, তিনি একজন খারাপ ইতিহাসবিদের পরিচয় দিয়েছেন। মানসিকতার সমস্যা কেবল মানুষ কতটা আলাদা তা খুঁজে বের করা নয় বরং তাদের আচরণ, চিন্তা এবং অনুভূতির মধ্যে একটি যৌক্তিক সংযোগ খুঁজে বের করা। আমাদের দেখতে হবে কেন মানুষ বিখ্যাত ডাকাতদের অদৃশ্য বা অপরাজেয় মনে করে, যদিও বাস্তবে তা সত্য নয়। এই বিশ্বাসগুলোকে কেবল আবেগ হিসেবে না দেখে সমাজ সম্পর্কে তাদের একটি সুসংগত বিশ্বাস হিসেবে দেখা উচিত।
- অধ্যায় ১৩: ব্রিটিশ ইতিহাস এবং 'অ্যানালস': একটি টীকা
- তৃণমূল পর্যায়ের বা 'নিচ থেকে ইতিহাস' চর্চাকারীরা সাধারণ মানুষকে নিয়ে কাজ করেন। তারা জানেন যে তাদের অনেক কিছু জানা নেই এবং এই বিনয়ই তাদের বড় শক্তি। তারা জানেন যে সাধারণ মানুষ যা চেয়েছিল বা তাদের যা প্রয়োজন ছিল, তা সবসময় প্রভাবশালী বা শিক্ষিত সমাজ যা ভেবেছিল তার সাথে মেলে না। যারা এখন সমাজ পরিচালনা করছেন বা যারা সমাজ বদলাতে চান, তাদের সবারই উচিত ইতিহাসবিদদের কথা শোনা।
- অধ্যায় ১৬: নিচ থেকে ইতিহাস
- এক সহস্রাব্দ ধরে 'ইউরোপ' ছিল রক্ষণাত্মক। পরবর্তী অর্ধ সহস্রাব্দে এটি বিশ্ব জয় করেছে। এই উভয় পর্যবেক্ষণই বিশ্ব ইতিহাস থেকে ইউরোপের ইতিহাসকে আলাদা করা অসম্ভব করে তুলেছে। বৈচিত্র্য এবং উপাদানগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াই ইউরোপের অস্তিত্বের মূলে।
- অধ্যায় ১৭: ইউরোপের অদ্ভুত ইতিহাস
- আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় এমন একটি আশার পেছনে ব্যয় হয়েছে যা শেষ পর্যন্ত হতাশ করেছে এবং এমন একটি আদর্শের পেছনে যা ব্যর্থ হয়েছে: তা হলো অক্টোবর বিপ্লব থেকে শুরু হওয়া কমিউনিজম। কিন্তু পরাজয়ের মতো ইতিহাসবিদের মনকে আর কিছুই তীক্ষ্ণ করতে পারে না।
- অধ্যায় ১৮: ইতিহাস হিসেবে বর্তমান
- রুশ বিপ্লবের দুটি একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস আছে। রাশিয়ার ওপর এর প্রভাব এবং বিশ্বের ওপর এর প্রভাব। দ্বিতীয়টি না থাকলে খুব কম মানুষই এটি নিয়ে আগ্রহী হতো। যেমন আমেরিকার বাইরে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ নিয়ে খুব কম মানুষই জানে। রুশ বিপ্লব রাশিয়াকে তার আন্তর্জাতিক শক্তি ও সম্মানের শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল। যা জারদের আমলেও সম্ভব হয়নি। স্টালিন রুশ ইতিহাসে পিটার দ্য গ্রেটের মতোই স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। এটি একটি অনগ্রসর দেশকে আধুনিক করেছে, কিন্তু এর মানবিক মূল্য ছিল অনেক বেশি। এর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় অনেক রুশ নাগরিকের কাছে পুরনো সোভিয়েত আমল এখনও অনেক ভালো মনে হয়। এর ঐতিহাসিক ফলাফল এখনই চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা সম্ভব নয়।
- অধ্যায় ১৯: আমরা কি রুশ বিপ্লবের ইতিহাস লিখতে পারি?
- আমরা অমানবিকতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা অসহনীয় বিষয়কেও সহ্য করতে শিখেছি। বিশ্বযুদ্ধ এবং শীতল যুদ্ধ আমাদের বর্বরতাকে মেনে নিতে বাধ্য করেছে। এমনকি আমরা বর্বরতাকে অর্থ উপার্জনের মতো বিষয়গুলোর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেছি।
- অধ্যায় ২০: বর্বরতা: একটি ব্যবহারকারী নির্দেশিকা
- পরিচয় ভিত্তিক ইতিহাস বা আইডেন্টিটি হিস্ট্রিই যথেষ্ট নয়। আবেগ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ আমাদের ভুল পথে চালিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি ইহুদি প্রাকৃতিকভাবেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে,'এটি কি ইহুদিদের জন্য ভালো নাকি খারাপ?' নিপীড়নের সময়ে এটি ব্যক্তিগত আচরণের জন্য সহায়ক হতে পারে। কিন্তু একজন ইহুদি ইতিহাসবিদকে এটি পথ দেখাতে পারে না। ইতিহাসবিদকে অবশ্যই সার্বজনীন হতে হবে। কেবল ইহুদিদের জন্য (বা আফ্রিকান-আমেরিকান, গ্রিক, নারী বা সমকামী) লেখা ইতিহাস কখনও ভালো ইতিহাস হতে পারে না, যদিও তা সংশ্লিষ্টদের কাছে স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
- অধ্যায় ২১: আইডেন্টিটি হিস্ট্রিই যথেষ্ট নয়
'হাউ টু চেঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড: রিফ্লেকশনস অন মার্ক্স অ্যান্ড মার্ক্সিজম' (২০১১)
[সম্পাদনা]- 'মাউন্ট অফ সারমন' বর্ণিত যিশু খ্রিস্টকে ‘প্রথম সমাজতান্ত্রিক’ বা কমিউনিস্ট হিসেবে দেখা খুবই সহজ। যদিও প্রথমদিকের সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিকদের অধিকাংশ খ্রিস্টান ছিলেন না। তবুও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পরবর্তীকালের অনেক সদস্য এই ভাবনাটিকে বেশ কার্যকর মনে করেছেন।
- 'কমিউনিস্ট' শব্দটি সবসময় একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচিকে নির্দেশ করলেও, 'সমাজতান্ত্রিক' শব্দটি ছিল মূলত বিশ্লেষণাত্মক এবং সমালোচনামূলক।
- মার্ক্সের ধারণাগুলো ইউরোপের বেশিরভাগ শ্রমিক ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণাদায়ী তত্ত্বে পরিণত হয়েছিল। মূলত লেনিন এবং রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে এই আদর্শ বিংশ শতাব্দীর সামাজিক বিপ্লবের একটি বিশ্বজনীন তত্ত্বে রূপ নেয়, যা চীন থেকে শুরু করে পেরু পর্যন্ত সর্বত্র সমাদৃত হয়। এই তত্ত্বগুলোতে বিশ্বাসী দলগুলোর জয়ের মাধ্যমে এর বিভিন্ন সংস্করণ এমন সব রাষ্ট্রের দাপ্তরিক আদর্শে পরিণত হয়, যেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বসবাস করত। এছাড়া বিশ্বের বাকি অংশেও বিভিন্ন আকারের রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। অতীতের মহান ধর্মগুলোর প্রবর্তক ছাড়া আর কোনো একক চিন্তাবিদ এমন মর্যাদা পাননি। সম্ভবত মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া অন্য কেউ এত দ্রুত এবং এত বড় পরিসরে সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। এই বিচারে কোনো ইহজাগতিক চিন্তাবিদের নাম তাঁর (মার্ক্স) পাশে রাখা সম্ভব নয়।
- অধ্যায় ১৪, 'ইনফ্লুয়েন্স অফ মার্ক্সিজম ১৯৪৫-৮৩'
হবসবম সম্পর্কে উদ্ধৃতি
[সম্পাদনা]- 'এজ অফ এক্সট্রিমসের'পরিপূরক হিসেবে উপস্থাপিত এই ব্যক্তিগত প্রতিকৃতিটি (ইন্টারেস্টিং টাইমস) হবসবমের বিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিকতার সামগ্রিক বর্ণনায় নতুন কী আলোকপাত করে? সামগ্রিক বিচারে, 'দ্য এজ অফ রেভোলিউশন', 'দ্য এজ অফ ক্যাপিটাল', 'দ্য এজ অফ এম্পায়ার' এবং 'এজ অফ এক্সট্রিমস'কে একটি একক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এমন এক চতুষ্টয় যার সমসাময়িক বিশ্ব গঠনের সুশৃঙ্খল বিবরণ হিসেবে অন্য কোনো তুলনা নেই। এই সবকটি গ্রন্থেই কিছু বিরল গুণের সংমিশ্রণ ঘটেছে। সংক্ষেপণের পরিমিতিবোধ, খুঁটিনাটি বর্ণনার সজীবতা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও আঞ্চলিক পার্থক্যের তীব্র চেতনা। ফসল, শেয়ার বাজার, জাতি-শ্রেণি, রাষ্ট্রনায়ক-কৃষক এবং বিজ্ঞান-কলা। সব বিষয়েই অগাধ পাণ্ডিত্য ও সাবলীলতা। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতি গভীর সহানুভূতি। বিশ্লেষণাত্মক বর্ণনার শক্তি এবং সর্বোপরি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও তেজোদীপ্ত একটি লিখনশৈলী।
- পেরি অ্যান্ডারসন, "দ্য ভ্যানকুইশড লেফট: এরিক হবসবম", 'স্পেকট্রাম: ফ্রম রাইট টু লেফট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড অফ আইডিয়াস' (২০০৫)-এ প্রকাশিত।
- ইউরোপীয় তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে, জাতীয় পতাকা বহনকারী এই শ্রমিকদের অদ্ভুত মনে হয় এবং তাদের গুরুত্ব খুব কমই বোঝা যায়। এমনকি মধ্য ইউরোপের প্রখ্যাত লেখক। যেমন আর্নেস্ট গেলনার বা এরিক হবসবম। এই অঞ্চলের জাতীয়তাবাদের স্বাতন্ত্র্যকে একটি বৈশ্বিক সংজ্ঞায় খাপ খাওয়াতে গিয়ে এর আসল বৈশিষ্ট্যগুলোই ছেঁটে ফেলেছেন। হবসবমের ধারণা ছিল যে এটি পৃথিবীর প্রতিটি কোণেই প্রযোজ্য হবে কিন্তু আমরা এই বইয়ে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের কাছে এই শব্দের অর্থ কী ছিল তা বোঝার চেষ্টা করেছি। সেই অঞ্চলে গেলনারের 'নেশনস অ্যান্ড ন্যাশনালিজম' বইয়ের বৈশ্বিক মাপকাঠিগুলো হয় অপ্রাসঙ্গিক নয়তো গৌণ।যেমন জন স্টুয়ার্ট মিলের ধারণা যে একটি জাতীয় রাষ্ট্রকে "সাশ্রয়ী" হতে হবে, বা জাতীয়তাবাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট আয়তন প্রয়োজন। চেক বা স্লোভেনীয়রা এই সব মাপকাঠি সম্পর্কে কিছুই জানত না এবং তারা এগুলো ছাড়াই তাদের ইতিহাস তৈরি করেছে। হবসবমের এই ধারণা যে ভাষা এবং ইতিহাস কোনো নির্ণায়ক মানদণ্ড নয়, তা পূর্ব-মধ্য ইউরোপের যে কারোর কাছে অর্থহীন মনে হতো। যদিও এটি মহাকাশ থেকে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।
- জন কনেলি, 'ফ্রম পিপলস টু নেশনস: আ হিস্ট্রি অফ ইস্টার্ন ইউরোপ' (২০২০), পৃষ্ঠা ৭৯৬-৭৯৭।
- এরিক হবসবম হয়তো অভিযোগ করতে পারেন যে আমি অন্যায় করছি এবং আমি আসলে অন্যরকম একটি বই আশা করেছিলাম। তিনি বলতে পারেন যে আমি এমন একটি বই চাই যা চিরস্থায়ী হবে এবং ভবিষ্যৎ শতাব্দীর ইতিহাসবিদদের আগ্রহের খোরাক হবে। আর তিনি ঠিকই বলেছেন, আমি আসলেই তা চাই। বিপরীতে, তিনি বলতে পারেন যে তাঁর বইটি "বিংশ শতাব্দীর একজন লেখকের দ্বারা বিংশ শতাব্দীর শেষের পাঠকদের জন্য লেখা", যাদের কাছে 'পুঁজিবাদ' এবং 'সমাজতন্ত্রের' সংঘাত, সামাজিক বিপ্লব, স্নায়ুযুদ্ধ এবং 'প্রকৃত সমাজতন্ত্রের' সীমাবদ্ধতা ও পতন নিয়ে আলোচনা করা সার্থক। তিনি মূলত সেই পাঠকদের জন্য লিখছেন যারা বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের মূল থিম হিসেবে বিশ্ব কমিউনিজমের ট্র্যাজিক ও বীরত্বগাথাকে বিবেচনা করেন। কিন্তু বিশ্ব কমিউনিজমের এই যাত্রা বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের একমাত্র বা মূল থিম নয়। হবসবম আসলে কাদের জন্য তাঁর বইটি লিখছেন? বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের কোন অংশটুকু পাঠকদের জানা প্রয়োজন, তার জন্য কি আমরা 'এজ অফ এক্সট্রিমস' বইটির সুপারিশ করতে পারি?
- জে. ব্র্যাডফোর্ড ডিলং, "লো মার্ক্স: আ রিভিউ অফ এরিক হবসবমস 'এজ অফ এক্সট্রিমস'" (১৯৯৫)।
- ১৯৬৮ সালে আমি সেই মনোযোগী ও শ্রদ্ধাশীল ছাত্র শ্রোতাদের একজন ছিলাম, যাদের সামনে এরিক হবসবম ছাত্র র্যাডিক্যালিজমের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলছিলেন। তাঁর উপসংহারটি আমার খুব মনে আছে। কারণ এটি তৎকালীন মেজাজের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, মাঝেমধ্যে পৃথিবী পরিবর্তন করা নয় বরং এটিকে ব্যাখ্যা করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু বিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে সে সম্পর্কেও একটি সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। তাঁর শেষ বইটি আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই বিশ্বের একটি চমত্কার, মেধাবী এবং সর্বদা বুদ্ধিদীপ্ত বিবরণ। এটি যদি তাঁর সেরা কাজগুলোর সমপর্যায়ের না-ও হয়, তবুও মনে রাখা উচিত যে তিনি নিজেই মেধার মানদণ্ড অনেক উঁচুতে সেট করেছেন। তবে বিশ্বে এক বা দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন কমিউনিজমের মৃত্যু বা ইতিহাসের ওপর আস্থা হারানো। যা লেখককে খুব একটা খুশি করতে পারেনি। এটি দুঃখজনক, কারণ তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি বইটির বিবরণকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যা হয়তো নতুন পাঠকদের শিখতে নিরুৎসাহিত করবে। আমি বিংশ শতাব্দীর বর্ণনায় তাঁর সেই তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ মিস করেছি যা তাঁকে উনবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের একজন অপরিহার্য পথপ্রদর্শক করে তুলেছিল। হবসবম আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ইতিহাসবিদরা হলেন "সেই পেশাদার স্মৃতিকার যারা সাধারণ মানুষ যা ভুলে যেতে চায় তা মনে করিয়ে দেন।" এটি একটি অত্যন্ত কঠিন ও আপসহীন দায়িত্ব।
- টনি জাট, "ডাউনহিল অল দ্য ওয়ে", 'দ্য নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকস' (২৫ মে, ১৯৯৫)।
- হবসবম তাঁর স্মৃতিকথা একটি উদ্দীপনামূলক বার্তার মাধ্যমে শেষ করেছেন। “এই সন্তোষজনক নয় এমন সময়েও আমাদের নিরস্ত্র হওয়া চলবে না। সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিবাদ ও লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। পৃথিবী নিজে নিজে ভালো হবে না।” তিনি সব দিক থেকেই ঠিক। কিন্তু নতুন শতাব্দীতে ভালো কিছু করতে হলে আমাদের পুরনো শতাব্দীর সত্যগুলো বলতে হবে। হবসবম শয়তান বা অশুভ শক্তির মুখোমুখি হতে এবং একে তার আসল নামে ডাকতে অস্বীকার করেছে। তিনি কখনও স্তালিন এবং তাঁর কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক ও নৈতিক উত্তরাধিকারকে গভীরভাবে বিচার করেননি। তিনি যদি গুরুত্বের সাথে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কোনো আমূল পরিবর্তনের মশাল হস্তান্তর করতে চান, তবে এটি সঠিক পথ নয়।
- টনি জাট, "দ্য লাস্ট রোমান্টিক", 'দ্য নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকস' (২০ নভেম্বর, ২০০৩)।
- হবসবম যেমনটি তাঁর 'দ্য এজ অফ এম্পায়ার' বইতে বলেছিলেন, তিনি মূলত একটি ‘যুক্তির উন্মোচন’ লিখছিলেন। সেই যুক্তির মূল কথা হলো,ঐতিহাসিক গুরুত্বের ক্ষেত্রে সংস্কৃতির চেয়ে অর্থনীতি, নারীর চেয়ে পুরুষ এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পশ্চিমের গুরুত্ব বেশি। তাঁর বর্ণনায় অনেক কিছু বাদ পড়াটা কোনো ভুল ছিল না বরং এটি ছিল তাঁর চিন্তাধারারই অংশ। অন্যভাবে বলতে গেলে, হবসবমকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর এই মূল ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।
- সুসান পেডারসেন, "আই ওয়ান্ট টু লাভ ইট", 'লন্ডন রিভিউ অফ বুকস' (১৮ এপ্রিল, ২০১৯)।
- হবসবমকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তিনি হ্যাম্পস্টেড ম্যানশনের মতো অত্যন্ত দামি বাড়িতে বাস করাকে কীভাবে সমর্থন করেন। উত্তরে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, যদি কেউ টাইটানিক জাহাজে ভ্রমণ করে, তবে তার প্রথম শ্রেণীতে চড়েই ডুবে যাওয়া ভালো। রসিকতা হিসেবে এটি চমত্কার। কিন্তু যদি ১৯৮৯ সালে সমস্ত বরফ গলে যায় (কমিউনিজমের পতন হয়), তবে কী হবে?
- জন সাদারল্যান্ড, 'দ্য টাইমস' (২৩ জানুয়ারি, ২০১৬)।
- ১৯৯৫ সালে যখন তিনি,ডেজার্ট আইল্যান্ড ডিস্কসে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন তিনি বিলি হলিডের একটি গান বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ইতিহাস নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছিলেন। উপস্থাপক সু ললি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যদি লক্ষ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে বিশ্ববিপ্লব আনা সম্ভব হতো, তবে কি তা সার্থক হতো? তিনি দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, হ্যাঁ। মাইকেল ইগনাটিয়েফ কর্তৃক টেলিভিশনে গৃহীত এক সাক্ষাৎকারে হবসবমকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ১৯৩৪ সালে স্তালিন কর্তৃক লক্ষ লক্ষ মানুষকে জোরপূর্বক অভুক্ত রাখার কথা জানলে কি তাঁর কমিউনিস্ট হওয়ার ইচ্ছা বদলে যেত? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, "সম্ভবত না"। তিনি শান্তভাবে আরও যোগ করেন যে, যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্ববিপ্লবের সূচনা করতে পারত, তবে ১৫-২০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু যুক্তিযুক্ত হতে পারত।
- এ. এন. উইলসন, 'অন দ্য রং সাইড অফ হিস্ট্রি', 'দ্য টাইমস স্যাটারডে রিভিউ' (২৬ জানুয়ারি, ২০১৯)।
- হবসবমের ইতিহাসের প্রধান সমস্যা ছিল যে তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বগুলোকে সত্য প্রমাণ করা। শোকসংবাদ লেখকরা দাবি করেছিলেন যে তিনি কখনও মার্ক্সবাদী মতাদর্শের দাস ছিলেন না বা তাঁর কাজ ছিল "সর্বদা সূক্ষ্ম ও মার্জিত", কিন্তু বাস্তবতা ছিল এর বিপরীত।
- কিথ উইন্ডশাটল, "দ্য নট-সো-গ্রেট এরিক হবসবম", 'কোয়াড্র্যান্ট' (১ নভেম্বর ২০১২)।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় এরিক হবসবাউম সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।