কনরাড লরেঞ্জ
অবয়ব
কনরাড জাকারিয়াস লরেঞ্জ (৭ নভেম্বর ১৯০৩ – ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯) ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান প্রাণিবিজ্ঞানী, প্রাণী মনোবিজ্ঞানী এবং পাখিবিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৭৩ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের একজন। আধুনিক ইথোলজির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাকে প্রায়শই বিবেচনা করা হয়।
উক্তি
[সম্পাদনা]- এই একই গিজেরা, যাদের উপর আমরা পরীক্ষা চালিয়েছিলাম, আমাকে গৃহপালনের প্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তারা ছিল বন্য গ্রেল্যাগ এবং গৃহপালিত হাঁসের F1 সংকর, এবং তারা বন্য পাখিদের স্বাভাবিক সামাজিক ও যৌন আচরণ থেকে বিস্ময়কর বিচ্যুতি দেখিয়েছিল। আমি বুঝতে পারি যে খাওয়া ও প্রজননের তাগিদের অত্যধিক বৃদ্ধি এবং বেশি সূক্ষ্ম সামাজিক প্রবৃত্তির দুর্বলতা অনেক গৃহপালিত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য। আমি ভয় পেয়েছিলাম — এখনো পাই — এই ভেবে যে সভ্য মানবজাতির মধ্যেও একই ধরনের জেনেটিক অবক্ষয় চলতে পারে। এই ভয়ে আমি অস্ট্রিয়ায় জার্মানদের আগমনের পর একটি খুবই অবিবেচক কাজ করেছিলাম: আমি গৃহপালনের বিপদ নিয়ে লিখেছিলাম এবং বোঝাতে গিয়ে নাৎসি শব্দচয়নের সবচেয়ে বাজে ভাষা ব্যবহার করেছিলাম। আমি এই কাজকে হালকা করতে চাই না। আমি সত্যিই বিশ্বাস করতাম যে নতুন শাসকদের কাছ থেকে কিছু ভালো আসতে পারে। অস্ট্রিয়ার পূর্ববর্তী সংকীর্ণ ক্যাথলিক শাসন অনেক বুদ্ধিমান ও ভালো মানুষকে — এমনকি আমার বাবাকেও — এই সরল বিশ্বাসে পৌঁছতে বাধ্য করেছিল। আমাদের কারো মনেই আসেনি যে "নির্বাচন" শব্দটির অর্থ তাদের কাছে ছিল হত্যা। আমি সেই লেখার জন্য অনুশোচনা করি, শুধু ব্যক্তিগত কলঙ্কের জন্য নয়, বরং এর কারণে গৃহপালনের বিপদের স্বীকৃতি বিলম্বিত হওয়ার জন্য।
- কনরাড লরেঞ্জ জীবনী, চিকিৎসা ও প্রাণবিজ্ঞান নোবেল পুরস্কার ১৯৭৩।
আক্রমণ সম্পর্কে (On Aggression) (১৯৬৩)
[সম্পাদনা]- প্রতিদিন সকালে প্রাতঃরাশের আগে একজন গবেষক যদি তার প্রিয় কোনো অনুমান ফেলে দেয়, তাহলে এটি তার জন্য ভালো ব্যায়াম। এতে সে তরুণ থাকে।
- অনুবাদ: এম. লাটজকে (১৯৬৬), পৃষ্ঠা ৮
- মানুষ খুব সহজেই নিজেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে দেখে, প্রকৃতির অংশ নয় বরং তার থেকে আলাদা ও শ্রেষ্ঠ কিছু বলে ধরে নেয়। অনেকে এই ভুল বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে রাখে এবং ডেলফির মন্দিরে খোদাই করা প্রাচীন ঋষির সর্বশ্রেষ্ঠ উপদেশ — "নিজেকে জানো" — এর প্রতি বধির হয়ে থাকে।
- কেউ কি সত্যি বিশ্বাস করতে পারে যে "স্বাধীন ইচ্ছা" মানে ইচ্ছামতো যেকোনো কিছু করার অধিকার? আমাদের ইচ্ছাও একটি কঠোর নৈতিক নিয়মের অধীন, এবং আমরা চাই এই নিয়ম ছাড়া আর কোনো নিয়ম মানতে না হয়। আমাদের মধ্যে কেউই যখন বুঝে যায় যে আমাদের আচরণ নৈতিক নিয়মের মতোই বাধ্যতামূলক, তখন সে নিজেকে 'অবাধ্য' বলে অনুভব করে না। মানুষ যতই প্রকৃতির নিয়ম বুঝবে, ততই সে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে ব্যবহার করতে পারবে — তা কখনো কমবে না। যদি এমন হয় যে মানুষ সমস্ত কিছু বুঝে ফেলে, তার নিজের মন-দেহসহ — তাহলে তার ইচ্ছা হারিয়ে যাবে না, বরং তা মহাবিশ্বের অনিবার্য নিয়মের সঙ্গে মিল খুঁজে পাবে। এই ধারণা পাশ্চাত্য চিন্তায় অপরিচিত, কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় দর্শন এবং মধ্যযুগের মিস্টিকদের জন্য পরিচিত ছিল।
- আমি এখন মানব আত্মজ্ঞান লাভে তৃতীয় বাধার দিকে আসছি — এই বিশ্বাস যে যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, তার কোনো মূল্য নেই। এই বিশ্বাস কান্টের দর্শনের অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা থেকে এসেছে, যা জগতকে বাইরের জগত ও মানুষের অভ্যন্তরীণ যুক্তিবোধে ভাগ করে দেয়।
- একজন বড় জীববিজ্ঞানীর বলা কিছু কথা আমার জীবনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে — আলফ্রেড কুহন অস্ট্রিয়ান একাডেমিতে একটি বক্তৃতার শেষে গ্যেটের কথা বলেন, "চিন্তাশীল মানুষের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো যা জানা যায় তা জানা এবং তারপর যা জানা যায় না তা শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা।" কিন্তু তিনি হাত তুলেই বলেছিলেন, "না, ভদ্রমহোদয়গণ, শান্তভাবে নয়, *শান্তভাবে নয়*!"
- প্রকৃতির নিয়মের প্রতি একজন বিজ্ঞানীর শ্রদ্ধা ইমানুয়েল কান্ট-এর কথায় সবচেয়ে ভালো প্রকাশ পায়: "দুইটি বিষয় আমার মনে অনন্ত বিস্ময় সৃষ্টি করে: আমার মাথার ওপরে তারার ভরা আকাশ, এবং আমার ভিতরে নৈতিক আইন।"… তিনি যদি জীবজগতের বিবর্তনের ধারণা না জানতেন, তবে কি তিনি স্তম্ভিত হতেন যদি আমরা বলি, নৈতিক আইন আমাদের মধ্যে আগে থেকে দেয়া কিছু নয়, বরং এটি প্রকৃতির বিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত?
- ধরা যাক, মঙ্গলগ্রহের একজন নিরপেক্ষ গবেষক দূরবীক্ষণ দিয়ে পৃথিবীর মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন, কিন্তু তিনি ব্যক্তিকে আলাদা করতে পারেন না — শুধু বড় ঘটনা, যেমন যুদ্ধ বা অভিবাসন দেখতে পান। তার কাছে মানব আচরণ কখনোই বুদ্ধি বা নৈতিকতার দ্বারা চালিত মনে হবে না।
সভ্য মানুষের আটটি মারাত্মক পাপ (১৯৭৩)
[সম্পাদনা]- মানুষ প্রকৃতিকে যত ভালো বুঝেছে, তার প্রযুক্তি, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের যত অগ্রগতি হয়েছে — যা মানব কষ্ট কমানোর কথা ছিল — তার সবই উল্টো মানব ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করছে।
- মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা ঠাণ্ডা মাথায় এবং শয়তানি নিষ্ঠুরতায় ধ্বংস ডেকে আনে.... এই প্রতিযোগিতার চাপে আমরা শুধু মানুষের মঙ্গলের কথা ভুলে গেছি না, এমনকি ব্যক্তিগত মঙ্গলও ভুলে গেছি.... প্রশ্ন জাগে, কোনটা মানুষের জন্য বেশি ক্ষতিকর — অর্থলোলুপতা না অস্থির তাড়াহুড়ো... যে ক্ষেত্রেই হোক, ভয় একটা বড় ভূমিকা রাখে: প্রতিযোগীর কাছে হেরে যাওয়ার ভয়, দরিদ্র হয়ে পড়ার ভয়, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ভয়, অথবা যথেষ্ট ভালো না হওয়ার ভয়।
- পৃষ্ঠা ৪৫-৪৭
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় কনরাড লরেঞ্জ সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।