কমলকুমার মজুমদার
কমলকুমার মজুমদার (জন্ম :১৬ নভেম্বর ১৯১৪ - মৃত্যু : ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯) ছিলেন সাহিত্যিক ও শিল্পী। বিংশ শতাব্দীর একজন বাঙালি ঔপন্যাসিক যিনি আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিগণিত। তাকে বলা হয় 'লেখকদের লেখক'। তার উপন্যাস অন্তর্জলী যাত্রা এর অনন্যপূর্ব আখ্যানভাগ ও ভাষাশৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ। বাংলা কথাসাহিত্য বিশেষ করে উপন্যাস ইয়োরোপীয় উপন্যাসের আদলে গড়ে উঠেছে, কমলকুমার মজুমদার সেই অনুসরণতা পরিহার করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের দুরূহতম লেখকদের একজন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিলেন; যেমন সুহাসিনীর পমেটম উপন্যাসে ২৫০ পৃষ্ঠায় যতি-চিহ্ন বিহীন মাত্র একটি বাক্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের দুর্বোধ্যতম লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। দীক্ষিত পাঠকের কাছে কমলকুমার অবশ্যপাঠ্য লেখক হিসেবেই সমাদৃত হলেও অদ্যাবধি তিনি সাধারণ্যে পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন নি।
উক্তি
[সম্পাদনা]- সত্যজিতের সমালোচনা করার তুমি কে হে? করলে আমি করব, তুমি কে?
- কমলকুমারের এক ভক্ত সত্যজিতের কাজ নিয়ে বিরূপ কিছু বলাতে তার উত্তর। উৎস: [১]
- বিলাস অন্যত্রে, কেননা সম্মুখেই, নিম্নের আকাশে, তরুণসূর্য্যবর্ণ কখনও অচিরাৎ নীল, বুদ্বুদসকল, যদৃচ্ছাবশতঃ ভাসিয়া বেড়াইতেছে। একটি আর একটি এইরূপে অনেক অনেক–আসন্ন সন্ধ্যায়, ক্রমে নক্ষত্র পরম্পরা যেমন দেখা যায়–দূর কোন হরিত ক্ষেত্রের হেমন্তের অপরাহ্ন মন্থনকারী রাখালের বাঁশরীর শুদ্ধনিখাদে দেহ ধারণ করত সুডৌল দ্যুতিসম্পন্ন বুদ্বুদগুলি ইদানীং উঠানামা করে, এগুলি সুন্দর, উজ্জ্বল, বাবু, অভিমানী আশ্চর্য্য!
- বিলাসের নিশ্বাস দুৰ্ব্বল হইয়া আসিয়াছিল তথা আর কয়েকটি নিশ্বাস মাত্র সম্বল এ কারণে দীর্ঘ নিশ্বাস তাহার ছিল না। শুধু ইতিমধ্যে, সম্ভবত, মনে হইল মৃত্যুকে অমোঘ করিবার জন্য পুনরায় সে শিশু হইতেছে।
কিচির মিচির
[সম্পাদনা]কিচির মিচির, সুপ্রকাশনী, ১৯৬৫
- বড় ম্যানেজ করা গেল না বলে, কেটে ছেঁটে মাপে নিয়ে আসা হল। থিঙ্ক বিগ, বইয়ের উপদেশে মজুত থাক, যেমন আছে, যেমন থাকবে চিরকাল। মানবের বৃহৎভাবনা সমূহ। বাস্তবের কথা হল, থিঙ্ক ম্যানেজেবল স্মল। ছোট করে নাও। ভেতরে অন্তত বাইরে ডোবা সেই ডোবায় কোলা ব্যাঙ, গ্যাঙোর গ্যাং।
- ফালি ফালি তালি তালি, পৃষ্ঠা ৯
- এই টিভিতে রেপ ছিল না, খুন ছিল না, অঙ্গ দেখিয়ে নাচ ছিল না, স্যাডিজম ছিল না, পেডোফাইল ছিল না। ঘরভাঙা, সংসার ভাঙা, সমাজ ভাঙার নিয়ত দৃশ্য ছিল না। মানুষ মানুষের দিকে যে হাত বাড়াত সে হাত বন্ধুর হাত, খুনীর হাত নয়। প্রেমে ছিল পূর্ণতা, একালের বঞ্চনা নয়। চরিত্ররা সব আদর্শের পতাকা তুলে ঘুরে বেড়াত, একালের সুবিধেবাদীর ঝাণ্ডা নয়। ছোটরা বড় হবে। বড় হয়ে ছোটদের বড় করার জন্যে আদশ সংসার রচনা করবে। সানাই বাজিয়ে বিয়ে করে, আদালতে গিয়ে তাল ঠুকবে না। বাতাবির নিটোল পরিবার, ফাটা বেল নয়। ভাঙা পরিবারের মশলায় তৈরি হবে না হিট মেগা কমার্শিয়াল।
- ফালি ফালি তালি তালি, পৃষ্ঠা ১২
- বিশ্বাসযোগ্য মানুষ, বিশ্বাসযোগ্য পিতা মাতার বড়ই অভাব। একালে সবাই কমরেড। কণ্ঠে কণ্ঠে লড়াইয়ের রণদামামা।
- ফালি ফালি তালি তালি, পৃষ্ঠা ১২
- টাকা হল সালঙ্কারা, সুন্দরী রমণীর মতো। কার হাত ধরে গলায় মালা পরাবে কেউ বলতে পারবে না।
- কি জ্বালা, পৃষ্ঠা ১৬
- শিক্ষাটা হল। জুতো যেন জীবন। যখন যাবার তখন যাবেই। কারো বাপের ক্ষমতা নেই ধরে রাখে।
- কি জ্বালা, পৃষ্ঠা ১৭
- শিক্ষিত বাঙালি স্ত্রীকে ঘখন 'ওয়াইফ' বলে, বুঝতে হবে সরকারি চাকুরে৷ যখন 'গিন্নি' বলে বুঝতে হবে বেসরকারি অফিসের উচ্চপদে শাঁসে জল আছে, পরিবার পরিজন পরিত্যাগ করে পৃথক বসবাস, শ্বশুরবাড়ির ন্যাওটা৷ শালীপ্রেমে বিভার মাতোয়ারা। 'বেটার হাফ' বললে বুঝতে হবে মাস্টারি করে। 'বউ' বললে বুঝতে হবে গ্রামে বিষয়সম্পত্তি আছে, হাল চাষ করে। ডেফিনিটলি কাঁঠাল খায়। পুঁই-কুমড়োর লাবড়া প্রিয় খাদ্য-মালসা ভোগ, পুলিপিঠে, তালের বড়ার জগাতে ঘোরাফেরা আছে।
- যোগসূত্র পটাং, পৃষ্ঠা ৩০
- বইটাই হল রাজনীতির আধ্যাত্মিকতা। স্পিরিট অফ লিবার্টি। সেইটাকে হরণ করে নাও। মানুষ যত ছ্যাচড়া, অসৎ, করাপ্ট, সেল্ফ সিকিং, অনৈতিক, অধার্মিক হবে, যতই মেরুদণ্ডহীন হবে শাসকদের ততই পোয়াবারো। গণতন্ত্রের জনগণ যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। চোরে চোরে মাস্তুতো ভাই।
- বিন্দু থেকে চন্দ্রবিন্দু, পৃষ্ঠা ৩৬
অন্তর্জলী যাত্রা
[সম্পাদনা]- আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনৰ্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।
- ১. আলো ক্রমে আসিতেছে
- তথাপি কীৰ্ত্তনের ধ্বনিমধ্যে কোন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা নাই, তৎসহ গম্ভীর কণ্ঠে ‘গঙ্গা নারায়ণ ব্রহ্ম আবৃত্তি-উচ্চারণের ভীতিপ্রদ রেশ অদ্য সকালের স্বর্ণাভ তীক্ষ্ণ রৌদ্রে খেলনার মত নিরীহ। আর যে সমবেত জনমণ্ডলীর চোখেমুখে–যাঁহারা আসীন তাঁহাদের মুখমণ্ডলে–কেশে, ভস্মকণা যায়, অনিবাৰ্যতাকে লইয়া ইহারা প্রহর জাগিয়াছে, ভূতপূজকদের মত ঘঁহারা একনিষ্ঠ বিশ্বাসী; গ্রন্থি নির্মাণের মধুর, সুচতুর, মনোরমা, দিব্য, ছবিলা, চারুকলা-সুকুমার কৌশলখানি মহা ঘোরে বিমোহিত আচ্ছন্ন, ইহা সত্ত্বেও এই মরজগত হইতে অতীব প্রাচীন যে বীজময় শরীর তাহা নির্লজ্জ উন্মুখ, মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যুকে তাহা নিতান্ত অবহেলায় চপলমতি বালকের মত তুড়ি মারিতেছিল; প্রত্যেকের মনে ইদানীং বাস্তবতাকে শ্মশানের ক্ষিপ্রতাকে অগ্রাহ্য করত আপন আপন গৃহকোণের প্রতিচ্ছবি চিত্রিত হইয়াছিল।
- ১. আলো ক্রমে আসিতেছে
- এ হেন ডাক অধুনা হাওয়া সংখ্যার মত ভাস্বর, ক্রমে ক্রমে বৈজু শুনিয়াছিল এবং এই প্রথম, হয়ত বা, সে আপনকার পিছনে যাইতে সক্ষম হইয়াছিল। যেখানে সে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লাভ করিয়াও অপটু। যেখানে সে ক্রন্দনে সৰ্বরূপে দক্ষ, কেননা তাহাই উহার একমাত্র ভগবদ্দত্ত ক্ষমতা। আপনার নগ্নতা যেখানে সূর্যের আলঙ্কারিক বিচিত্রতা, আর একটা দিক।
- ২. তীব্র কলহের অসভ্য ভয়ঙ্কর শব্দ
- এই দেহের অথৈ সৌন্দৰ্য্য যেমন বা সন্ন্যাস লইয়াছে। স্তম্ভিত বৃদ্ধকে মুহূর্তের মধ্যেই চরিত্রবান করিল, সীতারাম আমিত্ব-অহঙ্কার বর্জিত, কিন্তু মানুষের দন্তপাতি অদৃশ্য হইলেও, জিহ্বা অক্ষয় হইয়া আপন স্থানে বসিয়া থাকে, রস উপলব্ধি করে। উদ্ভিন্নযৌবনার হেমদেহ স্পর্শে বৃদ্ধের গায়ে যেন মাংস। লাগিল। সীতারাম কি যেন বলিলেন। যশোবতী তাহা সঠিক বুঝিয়ে না পারিয়া নূতন করিয়া ঘোমটা রচনা করিবার জন্য দুই হাতে বসন প্রান্ত উত্তোলন করা মাত্রই প্রাচীন হাতখানি তাহার বক্ষে আসিয়া দারুভূত হয়, শতাব্দীক্লিষ্ট বল্কলসদৃশ অঙ্গটি দেখিয়া যশোবতী এককালে অন্ধকার-শঙ্কিত, উৎখাত হইলেন। তাঁহার দীর্ঘশ্বাসের আঘাতে বৃদ্ধের হাতখানি ক্রমে যেমন বা নামিয়া গেল।
- ৩. বরবেশে সীতারাম সত্যই আকর্ষণীয়
- যশোবতী যিনি স্বয়ং মোহিনী মায়া, তিনি অকাতর, এখন আর হায়া ছিল না, তাঁহার শূন্য দৃষ্টি চিতার প্রতি নিবদ্ধ; সহসা লক্ষ্য করিলেন যে সেই চিতার উপর দিয়া অর্থাৎ এক পার্শ্ব দিয়া একটি দৃপ্ত ভাবগম্ভীর মুখমণ্ডল উঠিতেছে, ফলে তিনি চকিত হইয়াছিলেন। কোথাও বা দগ্ধ অর্ধদগ্ধ দেহবিকারের পশ্চাতে এই মুখোনি, ঐশ্বৰ্যশালিনী নীলান্ধিবসনা এই ধরিত্রীর দাম্ভিক প্রতিভা যেমত বা। এই মুখমণ্ডলের বর্ণচ্ছটায় উদাত্ত ধীর গম্ভীর বেদগান ছিল; এ বেদগানের মধ্যে যেমন আনন্দ, আনন্দের মধ্যে যেমন প্রণাম, প্রণামের মধ্যে যেমন পুষ্পের রহস্য, পুষ্পের রহস্যের মধ্যে যেমন সরল রেখা– তাহা ওতপ্রোত হইয়া উদাত্ত, এতদ্ভিন্ন যুধিষ্ঠিরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উত্তরের রূপময় বাস্তবতা। পৃথিবীতে বার্ধক্য নাই, জরা নাই, একই ভাব স্থির। তদ্দর্শনে বালিকাবধূর শরীর যেমন বা আপনার মেরুদণ্ডে দৃঢ়ভাবে গাঁথিয়া যাইতে লাগিল।
- ৪. সীতারাম চক্ষু বুজিয়াছিলেন
- ইহার পর শুধুমাত্র রক্তিম জলোচ্ছ্বাস! কেননা চাঁদ এখন লাল। একটি মাত্র চোখ, হেমলকে প্রতিবিম্বিত চক্ষুসদৃশ, তাঁহার দিকেই, মিলন অভিলাষিণী নববধুর দিকে চাহিয়াছিল, যে চক্ষু কাঠের, কারণ নৌকাগাত্রে অঙ্কিত, তাহা সিন্দুর অঙ্কিত এবং ক্রমাগত জলোচ্ছাসে তাহা সিক্ত, অশ্রুপাতক্ষম, ফলে কোথাও এখনও মায়া রহিয়া গেল।
- ৭. জলের আয়নার প্রতিবিম্ব
গল্প-সংগ্রহ
[সম্পাদনা]গল্প-সংগ্রহ, সুবর্ণরেখা
- নিজের জিনিস নিজে কেনার মত স্বাধীনতা বোধ হয় আর কিছুতেই নেই, অথচ মুশকিলও আছে যথেষ্ট।
- লাল জুতো, পৃষ্ঠা ১
- প্রতি প্রাচীন জ্যামিতিক চিহ নীল আকাশের মধ্যে কি চাঁদের আলোয় অথবা হুণ সুর্যের দাপটে সমানই বিস্ময়কর এবং শান্ত। কঠিন জ্যামিতিক চিহ্নের মধ্যে এত বেদনা অটুট হয়ে থাকে তা কে জেনেছিল, যে বেদনার ভার প্রাণের মাধুর্য চিরকালই বইবে।
- মতিলাল পাদরি, পৃষ্ঠা ৬১
- করতার অন্ধকারে, একটি দীর্ঘ নিশ্বাসের শব্দ শুনলে, সহসা মনে হল সে নিশ্বাস-বর্ত্তমান পালঙ্কে আসীনা আনারের অন্তরীক্ষের বাস্তবতাপ্রসূত। কিন্ত শুনলেও, সে কোনক্রমেই অগ্রসর হতে পারেনি, কিছুক্ষণ পুর্বের দীনতাবোধ তাকে নির্জীব করে রেখেছিল; সে নিজের হাতখানি নাকের কাছ বরাবর আনলে হাতের লোমরাজি নিশ্বাসে বিভক্ত হয়। গলার ভিতরে এ সময় কে যেমন বা সদর্পে ঘোষণা করছিল, আমি বেঁচে আছি, আছি।
- ফৌজ-ই-বন্দুক, পৃষ্ঠা ১২৭
- এটা যেন বাড়ি নয়। বাণবিদ্ধ রাজহংস, অনড় প্রস্তর যেমত; তার অঢেল সৌখীন উড্ডীয়মান জীবনের পরমার্থ একভাবে এইখানে দেওয়ালেই খুঁজে পেয়েছে। ঘুরন্ত সিঁড়ির শেষ ধাপের অলৌকিকতা এখানে। তবু তথাপি কেন যেন মনে হয়, যেন বা কোথায় সমস্ত কিছুতে হাড়ের জঘন্যতা রুক্ষ হয়ে আছে। শুভ্রতার অন্তরীক্ষে সম্যকভাবে যা নেই; যা এখানে স্মৃতি-ভৌতিক, নিপীড়িত, গোঙানিতে পূর্ণ।
- কয়েদখানা, পৃষ্ঠা ১৭৭
তার সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- কমলকুমার অল্প সংখ্যক পাঠক পেয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন, সেই জন্যই তিনি একটার পর একটা উপন্যাস লিখে গেছেন ছোট পত্রিকায়। হয়তো তিনি সচেতন ছিলেন, তাঁর রচনারীতি বৃহত্তর পাঠক সমাজের জন্য নয়। রচনাগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশের ব্যাপারেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না, যতদূর জানি, তাঁর একটি মাত্র উপন্যাস ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ এবং একটি গল্প সংকলন ‘নিম অন্নপূর্ণা’ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর জীবিতৎকালে। আর একটি উপন্যাস ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছিল, মুদ্রণ সম্পূর্ণ হবার আগেই তাঁর অকালমৃত্যু ঘটে।
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,ভূমিকা,অন্তর্জলী যাত্রা। উৎস: [২]
- কমলকুমারের ভাষা একেবারেই অন্য রকম। কেন এরকম ভাষায় তিনি লেখেন, সে প্রশ্ন অনেকবার করেছি। এক এক সময় এক এক রকম উত্তর দিয়েছেন তিনি। যেমন, বাংলা গদ্যের বাক্য বিন্যাস তৈরি হয়েছে ইংরেজির অনুকরণে । কমলকুমারের মতে, যদি বিদেশী রীতি নিতেই হয়, তবে ফরাসী বাক-ভঙ্গী অনেক বেশী কাম্য। তিনি ইংরেজি-প্রভাব অস্বীকার করে ফরাসী-রীতিতে বাংলা গদ্য লেখেন। আবার কখনো বলেছেন, হাটে-বাজারে, বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে যে-ভাষায় আমরা কথা বলি, সে ভাষায় সাহিত্য রচনা উচিত নয়। সাহিত্য হচ্ছে সরস্বতীর সঙ্গে কথা বলা, তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন ভাষা তৈরি করে নিতে হয়।
তবে, এগুলোও বোধহয় সঠিক যুক্তি নয়। আধুনিক বাংলা গদ্য অনেকখানিই রবীন্দ্র-অনুসারী। গদ্যে এই রবীন্দ্র-প্রভাব তার তেমন মনঃপূত ছিল না, তিনি পছন্দ করতেন বঙ্কিমের গদ্যের দৃঢ়তা এবং মনে করতেন, বাংলা গদ্য বঙ্কিম-দৃষ্টান্তেই চলা উচিত ছিল। তবুও, সাধু ক্রিয়াপদ আঁকড়ে ধরে থাকলেও, কমলকুমারের গদ্য ঠিক বঙ্কিমী গদ্য নয়, এ তাঁর নিজস্ব তৈরি করা ভাষা। নিজের লেখার জন্য একজন লেখক আলাদা ভাষা তৈরি করে লিখেছেন, এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বেশী নেই।- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,গোলাপ সুন্দরীর পটভূমিকা,গোলাপ সুন্দরী। উৎস: [৩]
- কমলকুমার মজুমদার সেই সময় কমল মজুমদার নামেই লিখতেন। প্রথম দিকের সব লেখাই ‘কুমার’ বর্জিত। আর এই কমল মজুমদার সাধু ভাষায় লেখেননি। লিখেছেন কথ্য ভাষায়। অথচ কমলকুমার মজুমদারের লিখনশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য সাধু ভাষায় লেখা। এই বঙ্কিমী-ধাঁচে সাধু ভাষা তাঁর অনবদ্য লেখাগুলো অবশ্যই বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। সূচনাপর্বেই কথ্য ভাষায় লেখা যে তাঁর জন্য সুপ্রযুক্ত নয়, তা হয়তো তিনি বুঝেছিলেন।
- কমলকুমার মজুমদারের রচনা পাঠ করতে করতে সারাক্ষণ মনে হয় ওঁর জীবৎকালে আমরা বাঙালিরা ওঁর মূল্য দিতে পারিনি। যে কারণে অত বড় একজন সাহিত্যকার শেষ দিন অবধি থেকে গেলেন লিটল ম্যাগাজিনের লেখক। ‘খেলার প্রতিভা’ ‘জার্নাল সত্তর’ পত্রে বেরোবার পর তার এক কপি উপহার করে আমায় পাঠিয়ে তাতে লিখেছিলেন, “বুঝিবা আপনাকে কারে ফেলিলাম।”
- শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, কমলকুমার সরণি