করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়
অবয়ব
করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯ নভেম্বর ১৮৭৭ – ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫) ছিলেন বাঙালী রোমান্টিক রবীন্দ্রানুসারী জাতীয়তাবাদী কবি। ছাত্র জীবন থেকে কবিতা লিখতেন। তার প্রথম লেখা দেশাত্মবোধক কাব্য বঙ্গমঙ্গল প্রকাশিত হয় ১৯০১ সালে। এটি রাজরোষে পড়ার আশঙ্কায় বিনা নামে বের হয়। করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন ছাত্রাবস্থা থেকেই। অন্যান্য কাবগ্রন্থের মধ্যে প্রসাদী (১৩১১), ঝরাফুল (১৩১৮), শান্তিজল (১৩২০), ধানদুর্বা (১৩২৮), শতনারী (১৩৩৭), রবীন্দ্র-আরতি (১৩৪৪), গীতায়ন (১৩৫৬) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৫১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী’ পদকে ভূষিত হন। তার দ্বারা পরবর্তীতে মোহিতলাল মজুমদার প্রমুখ অনেক কবি প্রভাবিত হন।
উক্তি
[সম্পাদনা]- বিশাল পুরীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে,
কেহ নাহি দেয় ভিক্ষা;
নিবেদিল শেষে গুরুপদে এসে,—
“শিখাইলে শেষ শিক্ষা,
জীয়াতে চাহি না তনয়ে আমার,
ভবনে ভবনে ওঠে হাহাকার—
হর’ জগতের বিরহ-আঁধার
দাও গো অমৃত-দীক্ষা।”- জীবন-ভিক্ষা (বুদ্ধদেবের প্রতি কিসা গোতমী), শতনরী - করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- বাগচী এণ্ড সন্স, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৮৪
- নাচিছে দামিনী, মেঘে পাখোয়াজ বাজে,
সরমে কেতকী ফুটে আঙ্রাখা মাঝে;
কাজলের কোলে আলোকের লেখা ভাসে
ওগো ধারা-ঝর-ঝর এমন আষাঢ় মাসে,
আমি নাই শুধু আমার প্রিয়ার পাশে।- আষাঢ়ে, ঝরা ফুল - করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- শ্রীঅমূল্যচরণ ঘোষ বিদ্যাভূষণ, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৪
- মাটীর প্রদীপ জ্বলছে নীরব নায়ের ’পরে
কইছে কথা ঢেউ-এর ফেনা কলস্বরে;
চপল হাওয়ায় কালো ছায়ায় কূলে কূলে
চলেছি হায় কোন্ মোহানায় মনের ভুলে!
ভাসিয়ে নে যায় এক্টানাতে তারার দেশে—
শেষ দরিয়ার জোয়ার-ভাঁটার স্বপন-শেষে- ভুল, শতনরী - করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- বাগচী এণ্ড সন্স, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২১৯
- ভাসিল পুকুর আউশের ভূঁই,
পালায় কাতলা, কালবোস, রুই,
আঙিনায় জল করে ছল-ছল,
ব্যাঙ ডাকে, হাঁস চরে।
কাঁঠালি চাঁপার তীব্র সুবাস
মাতাল করেছে বাদল বাতাস।
গাছভরা জাম সুচিকন শ্যাম
ফেটে যায় রসভরে।- বর্ষায়, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা, সম্পাদনা- সুশান্ত বসু, প্রকাশক- ভারবি, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রথম প্রকাশ: আশ্বিন ১৪০৮, সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃষ্ঠা ২৯
- এই খানে সে কখন এসে
স্মৃতির লিপি গেছে ফেলে’—
অন্ধকারের আল্পনাতে
জ্বলজ্বলে তার নয়ন মেলে।
শেষ-মিনতি শেষ-তৃষাতে
পাইনি নাগাল আকুল হাতে;—
রূপ হারালো রূপের লীলা
বন-পলাশে আলোক ঢেলে।- বনের কোণে, শতনরী - করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- বাগচী এণ্ড সন্স, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫৮
- কর্ম না করিলে কেহই লভে না নৈষ্কর্ম্য জ্ঞান,
কর্মত্যাগীর সিদ্ধি নাই,—ত্রিগুণেরই বশে সবাই
বাধ্য হয়ে কর্ম করে, কর’ কর্ম-অনুষ্ঠান॥
কর্ম কর’ ঈশ্বরার্থে, হও সমত্ব-বুদ্ধিমান,
সুকৃত-দুষ্কৃতের ভোগী না হন কভু কর্মযোগী,
স্বর্গ-সুখ বা নরক-ভয়ে করেন না কর্মানুষ্ঠান॥- শ্রীকৃষ্ণের উক্তি, গীতারঞ্জন - করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- রঞ্জন পাবলিশিং হাউস, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫-৬
- এলিয়ে দেব নগ্ন বাহু
গাঙের রাঙা জলে,
ঝাঁপিয়ে পড়ে উজান যাব
ঢেউয়ের টলমলে;
তুচ্ছ করে জোয়ার-ভাঁটা,
এপার-ওপার সাঁতার কাটা,
নাচবে আলো জলের বুকে,
নীল আকাশের তলে।- বাসনা, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা, সম্পাদনা- সুশান্ত বসু, প্রকাশক- ভারবি, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রথম প্রকাশ: আশ্বিন ১৪০৮, সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃষ্ঠা ৩৫
- নেহারিলাম পাষাণ হ’য়ে যায় সে তনু,
নিক্ষেপিছে কটাক্ষশর ভুরুর ধনু।
ননী-কোমল বক্ষ গেছে মাণিক হ’য়ে
হীরার গুঁড়া পড়ছে ঝরি’ কপোল ব’য়ে!
চল্তে নারি অচিন পথে,— তরুর শাখে
জড়িয়ে বসন বাঁধ্নু মোরে শতেক পাকে।- ভুল, শতনরী - করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- বাগচী এণ্ড সন্স, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২২০
- ভুবনে-ভুবনে ছুটিয়া চলেছে মঙ্গল-রথ যাঁর,
হে বর্ষ তুমি সে রথেরই চাকা ঘুরিতেছ অনিবার;
ষড়ঋতু ছয় চূড়ায় তাহার উড়ায় পতাকা-মালা—
যাত্রীরা এসে পথের ধুলায় নামায় পূজার ডালা।- নব-বর্ষ, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা, সম্পাদনা- সুশান্ত বসু, প্রকাশক- ভারবি, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রথম প্রকাশ: আশ্বিন ১৪০৮, সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃষ্ঠা ৬৮
করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে উক্তি
[সম্পাদনা]- করুণানিধানের কাব্যে ভাষা ও ছন্দের সেই অমোঘ সৌষ্ঠব সর্ব্বাগ্রে পাঠকের হৃদয়গোচর হয়। কবি যেন মূর্ত্তিমতী বাগ্দেবতার আরাধনায় তন্ময় হইয়া, প্রকৃতির রূপভাণ্ডার হইতে বর্ণালোক আহরণ করিয়া, অতি ধীরে সংযত হস্তে সুনিপুণ তুলিকাক্ষেপে বাগ্দেবতার বেদী-পট্ট অলঙ্কৃত করিতেছেন। বাক্য ও ছন্দের এই সৌন্দর্য্য স্পৃহা তাঁহার কবিহৃদয়ের বিশিষ্ট সৌন্দর্য্যানুভূতির পক্ষে যতখানি সার্থক হইয়াছে, তাহাই তাঁহার কাব্যের রস-প্রমাণ।.... তাঁহার কবিতায়, ভাষার এই নির্মাণকৌশলে যেন তিনটি ভঙ্গি ফুটিয়া উঠিয়াছে—ফুলের ন্যায় কোমল নির্ম্মল, পরিপক্ক ফলের ন্যায় নিটোল ও রসোচ্ছল, এবং মণিগণের মত দৃঢ়সংহত দীপ্তিমান্।
- মোহিতলাল মজুমদার, কবি করুণানিধানের কবিতা, সাহিত্য-বিতান - মোহিতলাল মজুমদার, প্রকাশস্থান- গণেশপুর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৫৯
- করুণানিধানের কাব্যে যে নিসর্গ-শোভা ফুটে ওঠে, তার মধ্যে পাওয়া যায় কবির স্বাভাবিক রক্তের টান ও নাড়ীর স্পন্দন। তাঁকেই বলি সত্যিকার স্বভাবকবি। এবং ছোটখাটো খুঁটিনাটির ভিতর দিয়ে বৃহত্তর প্রকৃতির শব্দস্পর্শ গন্ধ ও রূপরসছন্দ প্রকাশ করবার জন্যে তিনি ভাবুকের মত বেছে বেছে যে সব শব্দ উদ্ভাবন করেন, তার মধ্যেও থাকে খাঁটি কলাবিদের হাতের ছাপ। বাংলার কাব্যজগতে তাঁর মত নিসর্গ-চিত্রকর সুলভ নয়।
- হেমেন্দ্রকুমার রায়, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁদের দেখেছি - হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক— নিউ এজ পাবলিশার্স লিমিটেড, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৮
- করুণানিধানের কাব্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের রূপ-রেখা শব্দ-বর্ণে চিত্রিত হইয়া উঠে, এবং সে চিত্র কবি-চিত্তের মাধুরীতে আলিম্পিত হয়। এই রূপ-মোহ একরূপ ইন্দ্রিয়োল্লাসের আনন্দে কবিকে বিভোর করিয়া তোলে; সেই তড়িৎস্পর্শবৎ রূপরেখাবলী কবি আবিষ্টের মত শব্দপটের উপরে মেলিয়া ধরিয়া ঐকান্তিক তৃপ্তি লাভ করেন; এ জন্য কবির অনুভূতি চিন্তা-গভীর হইতে পায় না। তাঁহার অনুভূতিক্ষেত্রে রুদ্র কঠিন বীভৎস বস্তুর স্থান নাই; তার কারণ, তাঁহার প্রাণ প্রকৃতির নিকটে মাধুরী-ভিক্ষাই করে,—তাহাকে কল্পনা-বলে জয় করিয়া আত্মচেতনার প্রসার কামনা করে না।
- মোহিতলাল মজুমদার, কবি করুণানিধানের কবিতা, সাহিত্য-বিতান - মোহিতলাল মজুমদার, প্রকাশস্থান- গণেশপুর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৪৭
- তিনি যে কত বড় কাব্যকলাবিদ, তাঁর কবিতাবলীর মধ্যেই আছে তার অজস্র প্রমাণ। “প্রসাদী”র পর যখন তাঁর নূতন কবিতার পুঁথি “ঝরাফুল” প্রকাশিত হ’ল, রসিকসমাজ তখনই পেলেন করুণানিধানের প্রতিভার প্রকৃত হদিস। তখনকার সাহিত্যিকদের মধ্যে রীতিমত সাড়া প’ড়ে গিয়েছিল। সেটা বোধ করি ১৩১৮ সাল।
- হেমেন্দ্রকুমার রায়, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁদের দেখেছি - হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক— নিউ এজ পাবলিশার্স লিমিটেড, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।
উইকিসংকলনে করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত অথবা সম্পর্কিত রচনা রয়েছে।