বিষয়বস্তুতে চলুন

কলকাতা দাঙ্গা

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

১৬ আগস্ট ১৯৪৬-এর ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে (প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস) ছিল সেই দিন, যখন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার পর মুসলমানদের জন্য পৃথক একটি দেশ প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মাধ্যমে "সরাসরি আন্দোলন" করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা বা গ্রেট কলকাতা কিলিংস নামেও পরিচিত। খুব শিগগিরই এই দিনটি কলকাতায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার রূপ নেয়। এই ঘটনার ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের কলকাতা শহরে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এই দিনটিকে দ্য উইক অব দ্য লং নাইভস-এর সূচনা হিসেবেও ধরা হয়। ঘটনার ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও স্বল্পমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে অনেকটাই ঐকমত্য থাকলেও (যদিও সঠিক হতাহতের সংখ্যা জানা যায় না), পুরো ঘটনাক্রম, বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্ব এবং এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে।

উক্তি

[সম্পাদনা]
  • জিন্নাহ সাহেব ১৬ আগস্ট তারিখে 'ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে' ঘোষণা করলেন।...আমাদের আবার ডাক পড়ল এই দিনটা সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য। হাশিম সাহেব আমাদের নিয়ে সভা করলেন। আমাদের বললেন, "তোমাদের মহল্লায় মহল্লায় যেতে হবে, হিন্দু মহল্লায়ও তোমরা যাবে। তোমরা বলবে, আমাদের এই সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, আসুন আমরা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এই দিনটা পালন করি।" আমরা গাড়িতে মাইক লাগিয়ে বের হয়ে পড়লাম। হিন্দু মহল্লায় ও মুসলমান মহল্লায় সমানে প্রপাগান্ডা শুরু করলাম। অন্য কোন কথা নাই, 'পাকিস্তান' আমাদের দাবি। এই দাবি হিন্দুর বিরুদ্ধে নয়, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। ফরোয়ার্ড ব্লকের কিছু নেতা আমাদের বক্তৃতা ও বিবৃতি শুনে মুসলিম লীগ অফিসে এলেন এবং এই দিনটা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে হিন্দু মুসলমান এক হয়ে পালন করা যায় তার প্রস্তাব দিলেন। আমরা রাজি হলাম। কিন্তু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রপাগান্ডার কাছে তারা টিকতে পারল না। হিন্দু সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দিল এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে।
    • শেখ মুজিবুর রহমান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা: ৬৩
  • আমাদের কাছে খবর এল, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে। কয়েকজন ছাত্রকে ছাত্রীদের কাছে রেখে, আমরা চল্লিশ পঞ্চাশজন ছাত্র প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত গেলাম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভাল ছিল না। দেখি শত শত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মসজিদ আক্রমণ করছে। মৌলভী সাহেব পালিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। তাঁর পিছে ছুটে আসছে একদল লোক লাঠি ও তলোয়ার হাতে। পাশেই মুসলমানদের কয়েকটা দোকান ছিল। কয়েকজন লোক কিছু লাঠি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াল। আমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' দিতে শুরু করল। দেখতে দেখতে অনেক লোক জমা হয়ে গেল। হিন্দুরা আমাদের সামনা সামনি এসে পড়েছে। বাধা দেওয়া ছাড়া উপায় নাই। ইঁট পাটকেল যে যা পেল তাই নিয়ে আক্রমণের মোকাবেলা করে গেল। আমরা সব মিলে দেড় শত লোকের বেশি হব না। কে যেন পিছন থেকে এসে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের কয়েকখানা লাঠি দিল। এর পূর্বে শুধু ইঁট দিয়ে মারামারি চলছিল। এর মধ্যে একটা বিরাট শোভাযাত্রা এসে পৌঁছাল। এদের কয়েক জায়গায় বাধা দিয়েছে, রুখতে পারে নাই। তাদের সকলের হাতেই লাঠি। এরা এসে আমাদের সঙ্গে যোগদান করল। কয়েক মিনিটের জন্য হিন্দুরা ফিরে গেল, আমরাও ফিরে এলাম। পুলিশ কয়েকবার এসে এর মধ্যে কাঁদানে গ্যাস ছেড়ে চলে গেছে। পুলিশ টহল দিচ্ছে। এখন সমস্ত কলকাতায় হাতাহাতি মারামারি চলছে। মুসলমানরা মোটেই দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত ছিল না, একথা আমি বলতে পারি।
    • শেখ মুজিবুর রহমান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা: ৬৪-৬৫
  • কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য! মানুষ মানুষকে এইভাবে হত্যা করতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়! এক এক করে খবর নিতে চেষ্টা করলাম।...মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু'এক জায়গায় উদ্ধার করতে যেয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদেরও উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি। মনে হয়েছে, মানুষ তার মানবতা হারিয়ে পশুতে পরিণত হয়েছে। প্রথম দিন ১৬ই আগস্ট মুসলমানরা ভীষণভাবে মার খেয়েছে। পরের দুই দিন মুসলমানরা হিন্দুদের ভীষণভাবে মেরেছে। পরে হাসপাতালের হিসাবে সেটা দেখা গিয়েছে।
    • শেখ মুজিবুর রহমান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা: ৬৬
  • একটা কথা সত্য, অনেক হিন্দু মুসলমানদের রক্ষা করতে যেয়ে বিপদে পড়েছে। জীবনও হারিয়েছে। আবার অনেক মুসলমান হিন্দু পাড়াপড়শীকে রক্ষা করতে যেয়ে জীবন দিয়েছে। আমি নিজেই এর প্রমাণ পেয়েছি। মুসলিম লীগ অফিসে যেসব টেলিফোন আসত, তার মধ্যে বহু টেলিফোন হিন্দুরাই করেছে। তাদের বাড়িতে মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছে, শীঘ্রই এদের নিয়ে যেতে বলেছে, নতুবা এরাও মরবে, আশ্রিত মুসলমানরাও মরবে।
    • শেখ মুজিবুর রহমান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা: ৬৭
  • কায়েদে-আযম ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম-দিবস ঘোষণা করিয়া দিলেন। কিন্তু কোনও কার্যক্রম ঘোষণা করিলেন না। তবে একথা তিনি বলিয়াছিলেন: আজ হইতে মুসলিম লীগ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ ত্যাগ করিল। আমরা ধরিয়া নিলাম সভা-সমিতিতে হুমকি দিয়া উত্তেজনাপূর্ণ প্রস্তাবাদি পাস হইবে। আমার অনেক হিন্দু বন্ধুর সাথে আলাপ করিয়া বুঝিয়াছিলাম হিন্দুরাও তাই ধরিয়া নিয়াছিল। কিন্তু দুইটা ঘটনা হিন্দু-মনে স্বভাবতঃই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করিল। এক, খাজা নাযিমুদ্দিন সাহেব ঘোষণা করিলেন: 'আমাদের সংগ্রাম ভারত সরকারের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুদের বিরুদ্ধে।' দুই, প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেবের নির্দেশে বাংলা সরকার ১৬ই আগস্ট সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করিলেন। প্রথমটি সুস্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণা। দ্বিতিয়টির ব্যাখ্যা আছে। প্রধানমন্ত্রী হয়ত অশুভ আশংকা করিয়াই সরকারী কর্মচারীদের নিরাপত্তার জন্য আফিস-আদালত ছুটি দিয়াছিলেন। পরবর্তী ঘটনায় বোঝাও গিয়াছিল যে ঐ দিন ছুটি না থাকিলে উভয় সম্প্রদায়ের অনেক সরকারী কর্মচারির জীবনহানি ঘটিত। কিন্তু আগে এটা বুঝার উপায় ছিল না। সরকারী ঘোষণায় তা'বলাও হয় নাই। হইলেও হিন্দুরা বিশ্বাস করিত না।
    • আবুল মনসুর আহমদ। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, প্রকাশক: খোশরোজ কিতাব মহল, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা: ১৯৭-১৯৮
  • অনেক অতি-সাম্প্রদায়িক মুসলমান আজও সগর্বে বলিয়া থাকে কলিকাতা দাংগাই পাকিস্তান আনিয়াছিল। এ কথা নিতান্ত মিথ্যা নয়। এই দাংগার পরে ইংরাজ-হিন্দু-মুসলিম তিনপক্ষই বুঝিতে পারেন, দেশ বিভাগ ছাড়া উপায়ান্তর নাই।
    • আবুল মনসুর আহমদ। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, প্রকাশক: খোশরোজ কিতাব মহল, প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা: ১৯৯

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]