কলসী
অবয়ব
কলসী বা কলসি বা কলস হলো তরল পদার্থ ধারণের একটি গৃহস্থালী পাত্র। এটি সাধারণত গোলাকার পাত্র, যার সরু গ্রীবা রয়েছে এবং গ্রীবার শেষে রয়েছে একটি গোলকার মুখ। গোলাকার মুখের অংশ বাইরের দিকে কিছুটা প্রসারিত থাকে। কখনো কখনো মাটিতে সুস্থিত থাকার স্বার্থে ফাঁপা গোলকের নিম্নভাগ সমতল করা হয়। আড়াই হাজার বছর আগেও কলসী ব্যবহারের প্রচলন ছিল। সাধারণত কলসী মৃৎপাএ হলেও অন্য ধাতু যেমন অ্যালুমিনিয়াম, পিতল, কাঁসা প্রভৃতি দিয়েও তৈরিও হতে পারে। জল বা তরল পদার্থ ধরে রাখতে জন্য কলসী ব্যবহৃত হয়।
উক্তি
[সম্পাদনা]- এক টুকরো রাই রুটি আর এক কলসি জল যে কারও ক্ষুধা মেটাতে পারে; কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিই সৃষ্টি করেছে ভোজনরসিকতা।
- অনোরে দে বালজাক, দ্য ফিজিওলজি অফ ম্যারেজ
- কুমোর-পাড়ার গোরুর গাড়ি—
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।
গাড়ি চালায় বংশীবদন,
সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হাট, চিত্রবিচিত্র- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, প্রকাশসাল- ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৯৮ বঙ্গাব্দ), কলকাতা, পৃষ্ঠা ২৮
- করুণাময়ীর করুণ-সিন্ধু উথলিয়া উঠিল। ব্যস্ত হইয়া কলসী করিয়া জল আনিয়া পীড়িতের মুখে দিলেন। সঙ্গিনীরা নিতান্ত বিরক্ত হইয়া বলিল, “সাধ করে মরণের ইচ্ছা! ওলাউঠা রোগীকে কি কখন ছুঁইতে হয়!” হৈমবতী বলিলেন, “মানুষ যদি এমন অবস্থায় মানুষকে পরিত্যাগ করে, তবে তাহার মনুষ্যত্ব কি?—আহা বেচারার কি কষ্টই না হচ্ছে!”
- বিধুভূষণ বসু, লক্ষ্মী-মা - বিধুভূষণ বসু, নবম পরিচ্ছেদ, তৃতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৮
- “শুনরে পিতলের কলসী কইয়া বুঝাই তরে।
ডাক দিয়া জাগাও তুমি ভিন্ পুরুষেরে॥”
এত বলি কলসী কন্যা জলেতে ভরিল।
জলভরণের শব্দে বিনোদ জাগিয়া উঠিল॥- মলুয়া, পুর্ব্ববঙ্গ গীতিকা (দ্বিতীয় খণ্ড দ্বিতীয় সংখ্যা), সম্পাদনা- দীনেশচন্দ্র সেন, প্রকাশক- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫৩
- আকাশচারী দেবল একটি কলস নিয়ে মহাসমুদ্রে গেলেন এবং দেখলেন, জৈগীষব্য পূর্বেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। দেবল বিস্মিত হলেন এবং স্নানাদির পর জলপূর্ণ কলস নিয়ে আশ্রমে ফিরে এসে দেখলেন, জৈগীষব্য নীরবে কাষ্ঠের ন্যায় ব’সে আছেন।
- কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস, শল্যপর্ব, অনুবাদক- রাজশেখর বসু, মহাভারত - রাজশেখর বসু, প্রকাশক- এম. সি. সরকার এন্ড সন্স লিমিটেড, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫২৫
- ঝাঁঝরি কড়া বেড়ি হাতা,
শহর থেকে শস্তা ছাতা।
কল্সি-ভরা এখো গুড়ে
মাছি যত বেড়ায় উড়ে।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হাট, চিত্রবিচিত্র- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, প্রকাশসাল- ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৯৮ বঙ্গাব্দ), কলকাতা, পৃষ্ঠা ২৮
- একটি মোটা লোহার শিক্লিতে একটি বৃহৎ তাঁবার কলসী বাঁধা রহিয়াছে, এক-একবার জলের স্রোত প্রবল হয় এবং শিকলি কলসীর উপর পড়িয়া শব্দ করিতে থাকে।
বৈদ্যনাথ জলের উপর ছপছপ, শব্দ করিতে করিতে তাড়াতাড়ি সেই কলসীর কাছে উপস্থিত হইলেন। গিয়া দেখিলেন কলসী শূন্য।
তথাপি নিজের চক্ষুকে বিশ্বাস করিতে পারিলেন না— দুই হস্তে কলসী তুলিয়া খুব করিয়া ঝাঁকানি দিলেন। ভিতরে কিছুই নাই। উপুড় করিয়া ধরিলেন। কিছুই পড়িল না। দেখিলেন, কলসীর গলা ভাঙা। যেন এক কালে এই কলসীর মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল, কে ভাঙিয়া ফেলিয়াছে।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বর্ণমৃগ, গল্পগুচ্ছ (প্রথম খণ্ড)-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৬৫
- কলসীটা বড় ভারী ঠেকিল, ব্রজেশ্বর সহজে তুলিতে পারিলেন না। বলিলেন, “এ কি এ? কলসীটা নিরেট কি?”
দেবী। টানিবার সময়ে উহার ভিতর শব্দ হইয়াছিল—নিরেট সম্ভবে না।
ব্র। তাই ত? এতে কি আছে?
কলসীতে ব্রজেশ্বর হাত পূরিয়া তুলিল—মোহর। কলসী মোহরে পরিপূর্ণ।- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেবী চৌধুরাণী - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দ্বিতীয় খণ্ড — অষ্টম পরিচ্ছেদ, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮৫
- চলে গেলাম সেই অন্ধকারের মধ্যে রাইপুর। কুমোর বাড়ি থেকে একটা কলসী কিনে পাঁচু তরফদারের টিউব-কল থেকে জল পুরে আবার নিয়ে আসি রেল রাস্তার ধারে। ওর কাছে কলসী এনে দেখি সে ক্ষীণ সুরে কাতরাচ্চে। জল খাবার জন্যে কিছু আনা হয়নি, ভুল হয়ে গিয়েছে। কলসীটা ওর পাশেই বসিয়ে বললাম—কলসীর কাণায় হাত দিয়ে জল খাও।
থলে থেকে আরও গোটাকতক বিড়ি বার করে একটা দেশালাই সমেত কলসীর পাশে রেখে আমি যখন যেতে উদ্যত হয়েছি, লোকটা বলচে—যাচ্চ নাকি?- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহায্য, নীলগঞ্জের ফালমন সাহেব - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- বিভূতি প্রকাশন, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪০
- এক তৃষ্ণার্ত কাক, দুর হইতে, জলের কলসী দেখিতে পাইয়া, আহলাদিত হইয়া, ঐ কলসীর নিকটে উপস্থিত হইল, এবং, জলপান করিবার নিমিত্ত, নিতান্ত ব্যগ্র হইয়া, কলসীর ভিতর ঠোঁট প্রবেশ করাইয়া দিল; কিন্তু, কলসীতে জল অনেক নীচে ছিল, এজন্য, কোনও মতে, পান করিতে পারিল না। তখন সে, প্রথমে, কলসী ভাঙ্গিয়া ফেলিবার চেষ্টা পাইল; পরে কলসী উলটাইয়া দিয়া, জলপান করিবার চেষ্টা করিল; কিন্তু, বলের অল্পতা প্রযুক্ত, তাহার কোনও চেষ্টাই সফল হইল না। অবশেষে কতকগুলি লুড়ি সেই খানে পড়িয়া আছে দেখিয়া, এক একটি করিয়া, সমুদয় লুড়ি গুলি কলসীর ভিতরে ফেলিল। তলায় লুড়ি পড়াতে, জল কলসীর মুখের গোড়ায় উঠিল; তখন কাক, ইচ্ছামত জলপান করিয়া, তৃষ্ণা নিবারণ করিল।
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কাক ও জলের কলসী, কথামালা- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, চতুশ্চত্বারিংশ সংস্করণ, প্রকাশক- সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ (১২৯২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩১-৩২
- সাঁতার দিয়া কপিলা কলসি ধরিয়া আনে। কাপড় ঠিক করিয়া ভরা কলসি কাঁখে তুলিয়া পিছল ঢালু পাড় বাহিয়া উপরে উঠিয়া যায়। হ, ফিরিয়া একবার তাকায় কপিলা। ভরা কলসির জল খানিকটা উছলাইয়া পড়ে।
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পদ্মানদীর মাঝি - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সংস্করণ- ৩৫, প্রকাশক- বেঙ্গল পাবলিশার্স , প্রকাশস্থান- কলকাতা, পৃষ্ঠা ১০৩
- বুড়া বলিল, “অনেক উপকার এ সময়ে করিতে পার। জয় নন্দদুলাল! এ সময়ে মনুষ্যের মুখ দেখিতে পাইলাম। পিপাসায় প্রাণ যায়—একটু জল দাও।”
প্রফুল্ল দেখিল, বুড়ার ঘরে জল-কলসী আছে, কলসীতে জল আছে; জলপাত্র আছে। কেবল দিবার লোক নাই। প্রফুল্ল জল আনিয়া বুড়াকে খাওয়াইল।- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেবী চৌধুরাণী - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রথম খণ্ড — অষ্টম পরিচ্ছেদ, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩১
- গলা জলে লাম্যা কন্যা চারি ভিতে চায়।
ঘরুয়া পিতলের কলসী সুতে ভাস্যা যায়॥
কে দিবে আনিয়া কলসী কারে বা শুধাই।
সুজন দরদী বন্ধু কেউ কাছে নাই
ঢেউয়ের তালে ভাস্যা কলসী যায় অনেক দূর।
কে দিব আনিয়া কলসী না জানি সাতুর॥
আসিয়া ছানের ঘাটে পড়িলাম বিপাকে।
কাঁকের কলসী মোর ভাস্যা গেল পাকে॥- মইষাল বন্ধু, পুর্ব্ববঙ্গ গীতিকা (দ্বিতীয় খণ্ড দ্বিতীয় সংখ্যা), সম্পাদনা- দীনেশচন্দ্র সেন, প্রকাশক- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৮
- সাগর। আমি ঠিক কথা জানি। পুরুষমানুষ তৈজসের মধ্যে কলসী। সদাই অন্তঃশূন্য—আমরা যাই গুণবতী, তাই জল পূরিয়া পূর্ণকুম্ভ করিয়া রাখি।
নিশি বলিল, “ঠিক বলিয়াছিস্—তাই মেয়েমানুষে এ জিনিষ গলায় বাঁধিয়া সংসার সমুদ্রে ডুবিয়া মরে।—নে ভাই, তোর কলসী, কলসী-পীড়ির উপর তুলিয়া রাখ্।”
ব্র। কলসী মানে মানে আপনি পীড়ির উপর উঠিতেছে।
এই কথা বলিয়া ব্রজেশ্বর আপনি মসনদের উপর উঠিয়া বসিল।- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেবী চৌধুরাণী - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দ্বিতীয় খণ্ড — সপ্তম পরিচ্ছেদ, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮২
- ইন্দুকে কলসী-কক্ষে, ঘর্ম্মাক্ত-কলেবরে বড় পরিশ্রান্ত দেখিয়া উক্ত বর্ষীয়সী করুণস্বরে কহিলেন, “আহা! ইন্দু, মা তুই এত বড় কলসী নিয়ে এত দূর থেকে জল নিতে এসেছিস্ কেন? তুই নিতান্ত ছেলেমানুষ, কালকের মেয়ে, এত বড় একটা কলসী তুই নিতে পার্বি কেন মা? আঃ! সোণার যাদু যেন উনু’য়ে প’ড়েছে।
- বিধুভূষণ বসু, লক্ষ্মী-মা - বিধুভূষণ বসু, চতুর্থ পরিচ্ছেদ, তৃতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৫
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় কলসী সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।
উইকিমিডিয়া কমন্সে কলসী সংক্রান্ত মিডিয়া রয়েছে।
উইকিঅভিধানে কলসী শব্দটি খুঁজুন।