বিষয়বস্তুতে চলুন

কাদম্বরী উপন্যাস

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

উক্তি

[সম্পাদনা]

নিচের উক্তিগুলো বাণভট্ট, ভূষণভট্ট রচিত এবং তারাশঙ্কর তর্করত্ন অনূদিত কাদম্বরী উপন্যাস থেকে নেওয়া

[সম্পাদনা]

এই ভূমণ্ডলে এমন লোক অতি বিরল, যাহার যৌবনকাল নির্ব্বিকার ও নির্দ্দোষে অতিক্রান্ত হয় । যৌবনকাল অতি বিষম কাল । এই কালে উত্তীর্ণ হইলে শৈশবের সহিত গুরুজনের প্রতি স্নেহ বিগলিত হয় । বক্ষঃস্থলের সহিত বাঞ্ছা বিস্তীর্ণ বাহুযুগলের সহিত বুদ্ধি স্থূল হয় । মধ্যভাগের সহিত বিনয় ক্ষীণ হয় । এবং অকারণেই বিকারের আবির্ভাব হয় ।

  • অধিক বয়স না হইলে অন্তঃকরণে স্নেহের সঞ্চার হয় না কিন্তু ভয়ের সঞ্চার জন্মাবধিই হইয়া থাকে ।
    • পৃষ্ঠা: ১৫
  • কি আশ্চর্য্য! যত দুর্দ্দশা ও যত কষ্ট সহ্য করিতে হউক না কেন, তথাপি কেহ জীবনতৃষ্ণা পরিত্যাগ করিতে পারে না ।
    • পৃষ্ঠা: ১৬
  • কোন প্রকারে মরিবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু সে সময়ে এরূপ কষ্ট ও যাতনা উপস্থিত হইল যে বিধাতার নিকট বারংবার মরণের প্রার্থনা করিতে হইল ।
    • পৃষ্ঠা: ১৭
  • সাধুদিগের চিত্ত স্বভাবতই দয়ার্দ্র ।
    • পৃষ্ঠা: ১৭
  • মহর্ষির কি প্রভাব! ইঁহার প্রভাবে তপোবনে হিংসা, দ্বেষ, বৈর, মাৎসর্য্য, কিছুই নাই ।
    • পৃষ্ঠা: ১৯
  • দৈবায়ত্ত বিষয়ে শোক ও অনুতাপ করা কোন ক্রমেই বিধেয় নহে । মনুষ্যেরা যত যত্ন ও যত চেষ্টা করুক না কেন, দৈব অনুকূল না হইলে কোন প্রকারে মনোরথ সফল হয় না ।
    • পৃষ্ঠা: ২৬
  • হায়! কত দিনে সেই শুভ দিনের উদয় হইবে, যে দিনে স্নেহময় ও প্রীতিময় সন্তানের সুধাময় মুখচন্দ্র অবলোকন করিয়া জীবন ও নয়ন চরিতার্থ করিব;
    • পৃষ্ঠা: ২৬
  • বিপদ্ বিপদের ও সম্পদ সম্পদের অনুসরণ করে।
    • পৃষ্ঠা: ৩১
  • যৌবন অতি বিষম কাল । যৌবনরূপ বনে প্রবেশিলে বন্য জন্তুর ন্যায় ব্যবহার হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৩
  • যুবা পুরুষেরা কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি পশুধর্ম্মকে সুখের হেতু ও স্বর্গের সেতু জ্ঞান করে । যৌবনপ্রভাবে মনে একপ্রকার তমঃ উপস্থিত হয়, উহা কিছুতেই নিরস্ত হয় না ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৩
  • যৌবনের আরম্ভে অতি নির্ম্মল বুদ্ধিও বর্ষাকালীন নদীর ন্যায় কলুষিতা হয় । বিষয়তৃষ্ণা ইন্দ্রিয়দিগকে আক্রমণ করে । তখন অতিগর্হিত অসৎ কর্ম্মকেও দুষ্কর্ম্ম বলিয়া বোধ হয় না । তখন লোকের প্রতি অত্যাচার করিয়া স্বার্থসম্পাদন করিতেও লজ্জা বোধ হয় না ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৩
  • অহঙ্কার ধনের অনুগামী । অহঙ্কৃত পুরুষেরা মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না । আপনাকেই সর্ব্বাপেক্ষা গুণবান্, বিদ্বান্, ও প্রধান বলিয়া ভাবে; অন্যের নিকটেও সেইরূপ প্রকাশ করে ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৩
  • প্রভুত্বরূপ হলাহলের ঔষধ নাই । প্রভুজনেরা অধীন লোকদিগকে দাসের ন্যায় জ্ঞান করে । আপন সুখে সন্তুষ্ট থাকিয়া পরের দুঃখ সন্তাপ কিছুই দেখিতে পায় না ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৪
  • সদ্বংশে জন্মিলেই যে, সৎ ও বিনীত হয় একথা অগ্রাহ্য । উর্ব্বরা ভূমিতে কি কণ্টকবৃক্ষ জন্মে না? চন্দনকাষ্ঠের ঘর্ষণে যে অগ্নি নির্গত হয় উহার কি দাহশক্তি থাকে না?
    • পৃষ্ঠা: ৪৪
  • ভবাদৃশ বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিরাই উপদেশের যথার্থ পাত্র । মূর্খকে উপদেশ দিলে কোন ফল হয় না । দিবাকরের কিরণ কি স্ফটিকমণির ন্যায় মৃৎপিণ্ডে প্রতিফলিত হইতে পারে?
    • পৃষ্ঠা: ৪৪

কলুষিত মনে বিবেকশক্তি স্পষ্ট রূপে প্রকাশিত হয় না । সে সময়ে অদূরদর্শীও দীর্ঘদর্শীকে অনায়াসে উপদেশ দিতে পারে ।

  • সদুপদেশ অমূল্য ও অসমুদ্রসম্ভূত রত্ন । উহা শরীরের বৈরূপ্য প্রভৃতি জরার কার্য্য প্রকাশ না করিয়াও বৃদ্ধত্ব সম্পাদন করে ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৪
  • ঐশ্বর্য্যশালীকে উপদেশ দেয় এমন লোক অতি বিরল । যেমন গিরিগুহার নিকটে শব্দ করিলে প্রতিশব্দ হয়, সেইরূপ পার্শ্ববর্ত্তী লোকের মুখে প্রভুবাক্যের প্রতিধ্বনি হইতে থাকে; অর্থাৎ প্রভু যাহা কহেন, পারিষদেরা তাহাই যুক্তিযুক্ত বলিয়া অঙ্গীকার করে । প্রভুর নিতান্ত অসঙ্গত ও অন্যায় কথাও পারিষদদিগের নিকট সুসঙ্গত ও ন্যায়ানুগত হয় এবং সেই কথার পুনঃপুনঃ উল্লেখ করিয়া তাহারা প্রভুর কতই প্রশংসা করিতে থাকে । তাঁহার কথার বিপরীত কথা বলিতে কাহারও সাহস হয় না । যদি কোন সাহসিক পুরুষ ভয় পরিত্যাগ করিয়া তাঁহার কথা অন্যায় ও অযুক্ত বলিয়া বুঝাইয়া দেন, তথাপি তাহা গ্রাহ্য হয় না ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৪
  • মিথ্যা অভিমান, অকিঞ্চিৎকর অহঙ্কার ও বৃথা ঔদ্ধত্য প্রায় অর্থ হইতে উৎপন্ন হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৪
  • দুরাচার লক্ষ্মী যাহাকে আশ্রয় করে, সে স্বার্থনিষ্পাদনপর ও লুব্ধপ্রকৃতি হইয়া দ্যূতক্রীড়াকে বিনোদ, পশুধর্ম্মকে রসিকতা, যথেষ্টাচারকে প্রভুত্ব ও মৃগয়াকে ব্যায়াম বলিয়া গণনা করে ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৫
  • মিথ্যা স্তুতিবাদ করিতে না পারিলে ধনিদিগের নিকট জীবিকালাভ করা কঠিন ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৫
  • যাহারা অন্যকার্য্যপরাঙ্মুখ ও কার্য্যাকার্য্যবিবেকশূন্য হয় এবং সর্ব্বদা বদ্ধাঞ্জলি হইয়া ধনেশ্বরকে জগদীশ্বর বলিয়া বর্ণনা করে, তাহারাই ধনিগণের সন্নিধানে বসিতে পায় ও প্রশংসাভাজন হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৫
  • রাজারা আপন চক্ষে কিছুই দেখিতে পান না এবং এরূপ হতভাগ্য লোক দ্বারা পরিবৃত থাকেন, প্রতারণা করাই যাহাদিগের সম্পূর্ণ মানস ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৫
  • অদৃষ্টপূর্ব্ব কিন্নরমিথুন দর্শনে অত্যন্ত কৌতুকাক্রান্ত হইয়া ধরিবার আশয়ে সেই দিকে অশ্ব চালনা করিলেন ।
    • পৃষ্ঠা: ৪৮
  • কিন্নরমিথুনের অনুসরণ নিষ্ফল হইলেও এই মনোহর সরোবর দেখিয়া আমার নেত্রযুগল সফল ও চিত্ত সফল হইল ।
    • পৃষ্ঠা: ৫০

যৌবনকাল কি বিষম কাল! এই কালে উত্তীর্ণ হইলে আর লজ্জা, ধৈর্য্য, কিছুই থাকে না ।

  • কি আশ্চর্য্য? কত অসম্ভাবিত ও অচিন্তিত বিষয় স্বপ্নকল্পিতের ন্যায় সহসা উপস্থিত হয়, তাহা নিরূপণ করা যায় না ।
    • পৃষ্ঠা: ৫১
  • তপস্যার অসাধ্য কি আছে! তপস্যাপ্রভাবে বশীভূত হইয়া অচেতনেরাও কামনা সফল করে, সন্দেহ নাই ।
    • পৃষ্ঠা: ৫৩
  • মানুষদিগের প্রকৃতি অতি চঞ্চল, প্রভুর কিঞ্চিৎ প্রসন্নতা দেখিলেই অমনি অধীর ও গর্ব্বিত হইয়া উঠে ।
    • পৃষ্ঠা: ৫৩
  • সামান্য শোক এতাদৃশ পবিত্র মূর্ত্তিকে কখন কলুষিত ও অভিভূত করিতে পারে না । বায়ুর আঘাতে কি বসুধা চালিত হয়?
    • পৃষ্ঠা: ৫৪
  • অঙ্গনাজনের অন্তঃকরণ কি বিমূঢ়! অনুরাগের পাত্রাপাত্র কিছুই বিবেচনা করিতে পারে না ।
    • পৃষ্ঠা: ৫৭
  • দুরাত্মা কন্দর্পের কি প্রভাব! ইহার প্রভাবে কত শত কন্যা লজ্জা ও কুলে জলাঞ্জলি দিয়া স্বয়ং প্রিয়তমের অনুগামিনী হয় । অনঙ্গ কেবল আমাকেই এইরূপ করিতেছে এমন নহে, কত শত কুলবালাকে এইরূপ অপথে পদার্পণ করায় ।
    • পৃষ্ঠা: ৫৭
  • মুনিজনের প্রকৃতি অতিশয় রোষপরবশ । সামান্য অপরাধেও তাঁহারা ক্রোধান্বিত হইয়া উঠেন ও অভিসম্পাত করেন ।
    • পৃষ্ঠা: ৫৭
  • ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র লোকেরাই অপথে পদার্পণ করে । নির্ব্বোধেরাই সদসদ্বিবেচনা করিতে পারে না । মূঢ় ব্যক্তিরাই চঞ্চল চিত্তকে স্থির করিতে অসমর্থ।
    • পৃষ্ঠা: ৫৯
  • ভবাদৃশ মহাত্মারা মদ্বিধ ক্ষুদ্র জনের প্রতি কটাক্ষপাত করিলেই তাহারা চরিতার্থ হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ৬২
  • প্রিয়জনসম্বদ্ধ এক কথাও বারংবার বলিতে ও শুনিতে ভাল লাগে ।
    • পৃষ্ঠা: ৬২

অঙ্গনাজনের অন্তঃকরণ কি বিমূঢ়! অনুরাগের পাত্রাপাত্র কিছুই বিবেচনা করিতে পারে না ।

  • কপিঞ্জল,কন্দমূলফলাশী বনবাসীর মনে অনঙ্গবিলাস সঞ্চারিত হইবে ইহা স্বপ্নের অগোচর । শান্তস্বভাব তাপসকে প্রণয়পরবশ করিয়া বিধি কি বিড়ম্বনা করিলেন! দগ্ধ মন্মথ অনায়াসেই লোকদিগকে উপহাসাস্পদ ও অবজ্ঞাস্পদ করিতে পারে ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৪
  • অন্তঃকরণে একবার অনঙ্গবিলাস সঞ্চারিত হইলে আর ভদ্রতা নাই । তখন প্রগাঢ় ধীশক্তিসম্পন্ন লোকেরাও নিতান্ত অসার ও অপদার্থ হইয়া যান । তখন আর লজ্জা, ধৈর্য্য, বিনয়, গাম্ভীর্য্য কিছুই থাকে না ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৪
  • স্বীয় প্রাণবিনাশেও যদি সুহৃদের প্রাণরক্ষা হয় তথাপি তাহা কর্ত্তব্য;
    • পৃষ্ঠা: ৬৫
  • মকরকেতুর কি প্রভাব! যে ব্যক্তি উহার শরসন্ধানের পথবর্ত্তী হয় নাই সেই ধন্য ও নিরুদ্বেগে সংসারযাত্রা সংবরণ করিয়া থাকে । এক বার উহার বাণপাতের সম্মুখবর্ত্তী হইলে আর কোন জ্ঞান থাকে না ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৬
  • অসন্মার্গপ্রবৃত্ত সুহৃদ্ কে কুপথ হইতে নিবৃত্ত করা সর্ব্বতোভাবে কর্ত্তব্য কর্ম্ম ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৬
  • নির্দ্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক রূপে যৌবনকাল অতিবাহিত করা অতি কঠিন কর্ম্ম
    • পৃষ্ঠা: ৬৭
  • মূঢ়েরাই অনঙ্গপীড়ায় অধীর হয় । নির্ব্বোধেরাই হিতাহিত বিবেচনা করিতে পারে না ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৭
  • সাধুবিগর্হিত পথ অবলম্বন করিয়া সুখাভিলাষ কি? পরিণামবিরস বিষয়ভোগে যাহারা সুখ প্রাপ্তির আশা করে, ধর্ম্মবুদ্ধিতে বিষলতাবনে তাহাদিগের জলসেক করা হয়, তাহারা কুবলয়মালা বলিয়া অসিলতা গলে দেয়, মহারত্ন বলিয়া জ্বলন্ত অঙ্গার স্পর্শ করে, মৃণাল বলিয়া মত্ত হস্তীর দন্ত উৎপাটন করিতে যায়, রজ্জু বলিয়া কালসর্প ধরে ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৭
  • সখে! অধিক কি বলিব, আশীবিষবিষের ন্যায় বিষম কুসুমশরের শরসন্ধানে পতিত হও নাই, সুখে উপদেশ দিতেছ! যাহার ইন্দ্রিয় আছে, মন আছে, দেখিতে পায়, শুনিতে পায়, হিতাহিত বিবেচনা করিতে পারে, সেই উপদেশের পাত্র । আমার তাহা কিছুই নাই । আমার নিকটে ধৈর্য্য, গাম্ভীর্য্য, বিবেচনা এ সকল কথাও অস্তগত হইয়াছে । এ সময় উপদেশের সময় নয়; যাবৎ জীবিত থাকি এই অচিকিৎসনীয় রোগের প্রতীকারের চেষ্টা পাও । আমার অঙ্গ দগ্ধ ও হৃদয় জর্জ্জরিত হইতেছে । এক্ষণে যাহা কর্ত্তব্য কর, এই বলিয়া নিস্তব্ধ হইলেন ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৮
  • শুষ্ক তরু মঞ্জরিত হইবে এবং মাধবীলতা তাহাকে অবলম্বন করিয়া উঠিবে ইহা কাহার মনে বিশ্বাস ছিল? চেতনের কথা কি, অচেতন তরু লতা প্রভৃতিও উহার আজ্ঞার অধীন । দেবতারাও উহার শাসন উল্লঙ্ঘন করিতে পারেন না । কি আশ্চর্য্য! দুরাত্মা এই অগাধ গাম্ভীর্য্যসাগরকেও ক্ষণ কালের মধ্যে তৃণের ন্যায় অসার ও অপদার্থ করিয়া ফেলিল ।
    • পৃষ্ঠা: ৬৮

দুরাত্মা কন্দর্পের কি প্রভাব! ইহার প্রভাবে কত শত কন্যা লজ্জা ও কুলে জলাঞ্জলি দিয়া স্বয়ং প্রিয়তমের অনুগামিনী হয় । অনঙ্গ কেবল আমাকেই এইরূপ করিতেছে এমন নহে, কত শত কুলবালাকে এইরূপ অপথে পদার্পণ করায় ।

  • চন্দ্রোদয়ে গাম্ভীর্য্যশালী সাগরও ক্ষুব্ধ হইয়া তরঙ্গরূপ বাহু প্রসারণ পূর্ব্বক বেলা আলিঙ্গন করে । সে সময়ে অবলার মন চঞ্চল হইবে আশ্চর্য্য কি?
    • পৃষ্ঠা: ৭১
  • অভিসারপথে প্রস্থিত ব্যক্তির দাস দাসী ও বাহ্য আড়ম্বরের প্রয়োজন থাকে না ।
    • পৃষ্ঠা: ৭২
  • আমা হইতেও আর এক জন প্রিয়তম হইল বলিয়া যেন, ঈর্ষ্যা প্রযুক্ত প্রাণ দেহকে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছে ।
    • পৃষ্ঠা: ৭৪
  • অতিক্রান্ত দুরবস্থাও কীর্ত্তনের সময় প্রত্যক্ষানুভূতের ন্যায় ক্লেশজনক হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ৭৬
  • প্রাণবায়ু একবার প্রয়াণ করিলে আর কি প্রত্যাগত হয়? দৈব প্রতিকূল হইলে আর কি শুভগ্রহ সঞ্চার হয়?
    • পৃষ্ঠা: ৭৭
  • যে হলাহল পান করে হলাহলের স্মরণে তাহার কি হইতে পারে?
    • পৃষ্ঠা: ৭৭
  • আশার কি অসীম প্রভাব! যাহার প্রভাবে লোকেরা তরঙ্গাকুল ভীষণ সাগর পার হইয়া অপরিচিত ও অজ্ঞাত দেশে প্রবেশ করে; যাহার প্রভাবে অতি দীন হীন জনেরও মুখমণ্ডল উজ্জ্বল থাকে; যাহার প্রভাবে পুত্ত্রকলত্রাদির বিরহদুঃখও অবলীলাক্রমে সহ্য করা যায়;
    • পৃষ্ঠা: ৭৯
  • যাহারা স্নেহের উপযুক্ত কর্ম্মের অনুষ্ঠানে অসমর্থ হইয়া কেবল অশ্রুপাত দ্বারা লঘুতা প্রকাশ করে তাহারাই অকৃতজ্ঞ ।
    • পৃষ্ঠা: ৮০
  • শাস্ত্রকারেরা অনুমরণকে যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রণালী বলিয়া নির্দ্দেশ করেন উহা ব্যামোহমাত্র । মূঢ় ব্যক্তিরাই মোহবশতঃ ঐ পথে পদার্পণ করে । ভর্ত্তা উপরত হইলে তাঁহার অনুগমন করা মূর্খতা প্রকাশ করা মাত্র উহাতে কিছুই উপকার নাই । না উহা মৃত ব্যক্তির পুনর্জীবনের উপায়, না তাঁহার শুভলোকপ্রাপ্তির হেতু, না পরস্পর দর্শন ও সমাগমের সাধন । জীবগণ নিজ নিজ ধর্ম্মানুসারে শুভাশুভ লোক প্রাপ্ত হয় । সুতরাং অনুমরণ দ্বারা যে পরস্পর সাক্ষাৎ হইবে তাহার নিশ্চয় কি? লাভ এই, অনুমৃত ব্যক্তিকে আত্মহত্যাজন্য মহাপাপে লিপ্ত হইয়া ঘোর নরকে চিরকাল বাস করিতে হয় । বরং জীবিত থাকিলে সৎকর্ম্ম দ্বারা স্বীয় উপকার ও শ্রাদ্ধতর্পণাদি দ্বারা উপরতের উপকার করিতে পারা যায়, মরিলে কাহার কিছুই উপকার নাই ।
    • পৃষ্ঠা: ৮০-৮১
  • অনুমরণ পতিব্রতার লক্ষণ নয় । দেখ, রতি, পতির মরণের পর ত্রিলোচনের নয়নানলে আত্মার আহুতি প্রদান করেন নাই । শূরসেন রাজার দুহিতা পৃথা, পাণ্ডুর মরণোত্তর অনুমৃতা হন নাই । বিরাটরাজের কন্যা উত্তরা, অভিমন্যুর মরণে আপন প্রাণ পরিত্যাগ করেন নাই । ধৃতরাষ্ট্রের কন্যা দুঃশলা, জয়দ্রথের মরণোত্তর অর্জ্জুনের শরানলে আপনারে আহুতি দেন নাই । কিন্তু উঁহারা সকলেই পতিব্রতা বলিয়া জগতে বিখ্যাত । এইরূপ শত শত পতিপ্রাণা যুবতী পতির মরণেও জীবিত ছিলেন শুনিতে পাওয়া যায় । তাঁহারাই যথার্থ বুদ্ধিমতী ও যথার্থ ধর্ম্মের গতি বুঝিতে পারিয়াছিলেন ।
    • পৃষ্ঠা: ৮১
  • বিবেচনা করিলে স্বার্থপর লোকেরাই দুঃসহ বিরহযন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া অনুমরণ অবলম্বন করে । কেহ বা অহঙ্কার প্রকাশের নিমিত্ত এই পথে প্রবৃত্ত হয় । ফলতঃ ধর্ম্মবুদ্ধিতে প্রায় কেহ অনুমৃত হয় না ।
    • পৃষ্ঠা: ৮১
  • জগদীশ্বর সানুগ্রহ ও অনুকূল হইলে কিছুই অসাধ্য থাকে না ।
    • পৃষ্ঠা: ৮২
  • সংসারে পদার্পণ করিলেই পদে পদে বিপদ আছে । কিছুই স্থায়ী নহে । বিশেষতঃ দগ্ধ বিধি অকৃত্রিম প্রণয় অধিক কাল দেখিতে পারেন না । দেখিলেই অমনি যেন ঈর্ষান্বিত হন ও তৎক্ষণাৎ ভঙ্গের চেষ্টা পান ।
    • পৃষ্ঠা: ৮২
  • প্রিয়সখীর দুঃখে দুঃখিত অন্তঃকরণে সুখের আশা কি? সম্ভোগেরই বা স্পৃহা কি? মানুষের ত কথাই নাই, পশুপক্ষীরাও সহচরের দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করিয়া থাকে । দিনকরের অস্তগমনে নলিনী মুকুলিত হইলে তৎসহবাসিনী চক্রবাকীও প্রিয়সমাগম পরিত্যাগ পূর্ব্বক সারা রাত্রি চীৎকার করিয়া দুঃখ প্রকাশ করে ।
    • পৃষ্ঠা: ৮৫
  • সাধুসমাগমে অতি দুঃখিত চিত্তও আহ্লাদিত হয়
    • পৃষ্ঠা: ৮৬
  • অন্তঃকরণে একবার অনুরাগ সঞ্চার হইলে তাহা ক্ষালিত করা দুঃসাধ্য ।
    • পৃষ্ঠা: ৯১
  • তেজস্বীর অনুচরও অনায়াসে শত্রুবিনাশে সমর্থ হয়, যে হেতু সূর্য্যসারথি অরুণ উদিত হইয়াই সমস্ত অন্ধকার নিরস্ত করিয়া দিলেন । শত্রুবিনাশে কৃতসংকল্প লোকেরা রমণীয় বস্তুকেও অরাতিপক্ষপাতী দেখিলে তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট করে, যে হেতু অরুণ তিমির বিনাশে উদ্যত হইয়া সুদৃশ্য তারাগণকেও অদৃশ্য করিয়া দিলেন;
    • পৃষ্ঠা: ৯৫
  • জগদীশ্বরের কি আশ্চর্য্য কৌশল! তিনি যেরূপ এক স্থানে সমুদায় সৌন্দর্য্যের সমাবেশ করিতে পারেন, সেইরূপ তাঁহার কৌশলের সমুদায় বৈরূপ্যও এক স্থানে সন্নিবিষ্ট হইয়া থাকে ।
    • পৃষ্ঠা: ১০৪
  • কুমারীজনের কুসুমসুকুমার অন্তঃকরণ যুবজনেরা বলপূর্ব্বক আক্রমণ করে, কিছুমাত্র দয়া করে না ।
    • পৃষ্ঠা: ১০৬
  • একজনের অপরাধে অন্যের প্রতি দোষারোপ করা উচিত নয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১০৭
  • এই সংসারে আশাই জীবনের মূল । আশা আশ্বাস প্রদান না করিলে কেহ জীবিত থাকিতে পারে না । লোকেরা আশালতা অবলম্বন করিয়া দুঃখসাগরে নিতান্ত নিমগ্ন হয় না ।
    • পৃষ্ঠা: ১১১
  • যৌবনকাল কি বিষম কাল! এই কালে উত্তীর্ণ হইলে আর লজ্জা, ধৈর্য্য, কিছুই থাকে না ।
    • পৃষ্ঠা: ১১৫

আশাকে কেহ অতিক্রম করিতে পারে না । আশা লোকদিগকে যে পথে লইয়া যায়, লোকেরা সেই পথে যায়।

  • বিকারের সামগ্রী শীঘ্র পরিহার করাই বিধেয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১১৫
  • গ্রীষ্মকালে দিবসের শেষভাগ অতি রমণীয় । সূর্য্যের উত্তাপ থাকে না । মন্দ মন্দ সন্ধ্যাসমীরণ অমৃতবৃষ্টির ন্যায় শরীরে সুখস্পর্শ বোধ হয় । এই সময় সকলে গৃহের বহির্গত হইয়া সুশীতল সমীরণ সেবন করে, প্রফুল্ল অন্তঃকরণে তরুগণের শ্যামল শোভা দেখিয়া এবং দিঙ্মণ্ডলের শোভা দেখিয়া সাতিশয় আনন্দিত হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১১৮
  • একের অপরাধে অন্যকে দোষী জ্ঞান করা অতি অন্যায় কর্ম্ম ।
    • পৃষ্ঠা: ১২০
  • কলুষিত মনে বিবেকশক্তি স্পষ্ট রূপে প্রকাশিত হয় না । সে সময়ে অদূরদর্শীও দীর্ঘদর্শীকে অনায়াসে উপদেশ দিতে পারে ।
    • পৃষ্ঠা: ১২০
  • এই ভূমণ্ডলে এমন লোক অতি বিরল, যাহার যৌবনকাল নির্ব্বিকার ও নির্দ্দোষে অতিক্রান্ত হয় । যৌবনকাল অতি বিষম কাল । এই কালে উত্তীর্ণ হইলে শৈশবের সহিত গুরুজনের প্রতি স্নেহ বিগলিত হয় । বক্ষঃস্থলের সহিত বাঞ্ছা বিস্তীর্ণ বাহুযুগলের সহিত বুদ্ধি স্থূল হয় । মধ্যভাগের সহিত বিনয় ক্ষীণ হয় । এবং অকারণেই বিকারের আবির্ভাব হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১২০
  • আশাকে কেহ অতিক্রম করিতে পারে না । আশা লোকদিগকে যে পথে লইয়া যায়, লোকেরা সেই পথে যায়।
    • পৃষ্ঠা: ১৩৬
  • শুভ ফল প্রাপ্তির আশয়ে লোকে অপ্রত্যক্ষ দেবতার কাষ্ঠময়, মৃন্ময়, প্রস্তরময় প্রতিমাও পূজা করিয়া থাকে ।
    • পৃষ্ঠা: ১৩৬
  • অলীক কথায় প্রভুকে প্রতারণা করাও পরিচিত ব্যক্তির উচিত নয়
    • পৃষ্ঠা: ১৪০
  • সেই ভৃত্যেই ভৃত্য, যে সম্পৎকালের ন্যায় বিপৎকালেও প্রভুর সহবাসী হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১৪০
  • বিচিত্র এই সংসারে প্রকৃতির পরিণাম, জগদীশ্বরের ইচ্ছা, শুভাশুভ কর্ম্মের পরিপাক অথবা স্বভাববশতঃ নানাপ্রকার কার্য্যের উৎপত্তি হয় ও নানাবিধ ঘটনা উপস্থিত হইয়া থাকে । শাস্ত্রকারেরা এরূপ অনেক ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা যুক্তি ও তর্কশক্তিতে আপাততঃ অলীক রূপে প্রতীয়মান হয়; কিন্তু বস্তুতঃ তাহা মিথ্যা নহে ।
    • পৃষ্ঠা: ১৪৩
  • যাহারা পুত্ত্র কিংবা ভ্রাতার প্রতি সংসারভার সমর্পণ করিয়া চরমে পরমেশ্বরের আরাধনা করিতে পারে তাহারাই ধন্য ও সার্থকজন্মা । এই অকিঞ্চিৎকর মাংসপিণ্ডময় শরীর দ্বারা যৎকিঞ্চিৎ ধর্ম্ম উপার্জ্জন হইলেও পরম লাভ বলিতে হইবেক । ধর্ম্মসঞ্চয় ব্যতিরেকে পরলোকে পরিত্রাণের উপায়ান্তর নাই ।
    • পৃষ্ঠা: ১৪৭

সদ্বংশে জন্মিলেই যে, সৎ ও বিনীত হয় একথা অগ্রাহ্য । উর্ব্বরা ভূমিতে কি কণ্টকবৃক্ষ জন্মে না? চন্দনকাষ্ঠের ঘর্ষণে যে অগ্নি নির্গত হয় উহার কি দাহশক্তি থাকে না?

  • অপত্যোৎপাদন কালে মাতার যেরূপ মনোবৃত্তি থাকে, সন্তানও সেইরূপ মনোবৃত্তি প্রাপ্ত হইয়া ভূমিষ্ঠ হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১৪৮

কাদম্বরী উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য

[সম্পাদনা]
  • পূর্ব্বে উহারা ঠিক্ মনুষ্যের মত সুস্পষ্ট রূপে কথা কহিতে পারিত; কিন্তু অগ্নির শাপে এক্ষণে উহাদিগের কথার জড়তা জন্মিয়াছে ।
    • পৃষ্ঠা: ১০
  • রাজকুমার অসংখ্য সুন্দরী-কুমারী-পরিবেষ্টিত অন্তঃপুরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন । কুমারীগণের শরীরপ্রভায় অন্তঃপুর সর্ব্বদা চিত্রিতময় বোধ হয় । তাহারাও বিনা অলঙ্কারেও সর্ব্বদা অলঙ্কৃত । তাহাদিগের আকর্ণবিশ্রান্ত লোচনই কর্ণোৎপল, হসিতচ্ছবিই অঙ্গরাগ, নিশ্বাসই সুগন্ধি বিলেপন, অধরদ্যুতিই কুঙ্কুমলেপন, ভুজলতাই চম্পকমালা, করতলই লীলাকমল এবং অঙ্গুলিরাগই অলক্তকরস ।
    • পৃষ্ঠা: ৮৬-৮৭
  • রাজকুমার কুমারীগণের মনোহর শরীরকান্তি দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন । তাহাদিগের তানলয়বিশুদ্ধ বেণুবীণাঝঙ্কারমিলিত মধুর সঙ্গীত শ্রবণে তাঁহার অন্তঃকরণ আনন্দে পুলকিত হইল ।
    • পৃষ্ঠা: ৮৭
  • শশিকলাদর্শনে জলনিধির জল যেরূপ উল্লাসিত হয়, কাদম্বরীদর্শনে চন্দ্রাপীড়ের হৃদয় সেইরূপ উল্লাসিত হইল । মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, আহা! আজি কি রমণীয় রত্ন দেখিলাম! এরূপ সুন্দরী কুমারী ত কখন নেত্রপথের অতিথি হয় নাই! আজি নয়নযুগল সফল ও চিত্ত চরিতার্থ হইল । জন্মান্তরে এই লোচনযুগল কত ধর্ম্ম ও পুণ্য কর্ম্ম করিয়াছিল, সেই ফলে কাদম্বরীর মনোহর মুখারবিন্দ দেখিতে পাইল । বিধাতা আমার সকল ইন্দ্রিয় লোচনময় করেন নাই কেন? তাহা হইলে, সকল ইন্দ্রিয় দ্বারা এক বার অবলোকন করিয়া আশা পূর্ণ করিতাম । কি আশ্চর্য্য! যত বার দেখি তত আরও দেখিতে ইচ্ছা হয় । বিধাতা এরূপ রূপাতিশয় নির্ম্মাণের পরমাণু কোথায় পাইলেন । বোধ হয়, যে সকল পরমাণু দ্বারা ইহার রূপ লাবণ্য সৃষ্টি করিয়াছেন তাহারই অবশিষ্ট অংশ দ্বারা কমল, কুমুদ, কুবলয় প্রভৃতি কোমল বস্তুর সৃষ্টি করিয়া থাকিবেন ।
    • পৃষ্ঠা: ৮৭
  • গমনের পর কাদম্বরী শয্যায় নিপতিত হইয়া জাগ্রদবস্থায় স্বপ্ন দেখিলেন, যেন লজ্জা আসিয়া কহিল, চপলে! তুমি কি কুকর্ম্ম করিয়াছ? আজি তোমার এরূপ চিত্তবিকার কেন হইল? কুলকুমারীদিগের এরূপ হওয়া কোন ক্রমেই উচিত নয় । লজ্জা কর্ত্তৃক তিরস্কৃত হইয়া মনে মনে কহিলেন, আমি মোহান্ধ হইয়া কি চপলতা প্রকাশ করিয়াছি! এক জন উদাসীন অপরিচিত ব্যক্তির সমক্ষে নিঃশঙ্ক চিত্তে কতভাব প্রকাশ করিলাম । তাঁহার চিত্তবৃত্তি, অভিপ্রায়, স্বভাব কিছুই পরীক্ষা করিলাম না, তিনি কিরূপ লোক কিছু জানিলাম না । অথচ তাঁহার হস্তে মন, প্রাণ, সমুদায় সমর্পণ করিলাম । লোকে এই ব্যাপার শুনিলে আমাকে কি বলিবে? আমি সখীদিগের সমক্ষে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম যাবৎ মহাশ্বেতা বৈধব্যদশায় ক্লেশভোগ করিবেন, তত দিন সাংসারিক সুখে বা অলীক আমোদে অনুরক্ত হইব না; আমার সেই প্রতিজ্ঞা আজি কোথায় রহিল ।
    • পৃষ্ঠা: ৯০-৯১
  • তোমার বিরহবেদনা সহ্য করিতে পারিব না বলিয়া কাদম্বরী যেন পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতেছেন দেখিতে পাইলেন । কোথায় যাও যাইতে পাইবে না বলিয়া যেন, সম্মুখে পথ রোধ করিয়া দণ্ডায়মান আছেন দেখিলেন । ফলতঃ যে দিকে দৃষ্টিপাত করেন সেই দিকেই কাদম্বরীর রূপ লাবণ্য দেখিতে পান ।
    • পৃষ্ঠা: ৯৭
  • “রাজকুমার! যাহারা আপনাকে নেত্রপথের অতিথি করে নাই তাহারাই ধন্য ও সুখে কালযাপন করিতেছে । যে গন্ধর্ব্বনগর আপনি উৎসবময় ও আনন্দময় দেখিয়া গিয়াছেন তাহা এক্ষণে আপনার বিরহে দীন বেশ ধারণ করিয়াছে! আমি সমুদায় পরিত্যাগ করিয়াছি, রাজকুমারকে বিস্মৃত হইবার চেষ্টা পাইতেছি, কিন্তু আমার মন বারণ না মানিয়া সেই মুখচন্দ্র দেখিতে সর্ব্বদা উৎসুক । কাদম্বরী দিবসবিভাবরী আপনার প্রফুল্ল মুখকমল স্মরণ করিয়া অতিশয় অসুস্থ হইয়াছেন । অতএব আর এক বার গন্ধর্ব্বনগরে পদার্পণ করিলে সকলে চরিতার্থ হই ।”
    • পৃষ্ঠা: ৯৭-৯৮
  • চন্দ্রোদয়ে চন্দ্রকান্তমণির ন্যায় তাঁহার দুই চক্ষু দিয়া জলধারা পড়িতে লাগিল । নেত্র মুকুলিত করিয়া কপোলে কর প্রদান পূর্ব্বক বিষণ্ণ বদনে কতপ্রকার চিন্তা করিতে লাগিলেন । ভাবিতে ভাবিতে অতিকষ্টে শয়নাগারে প্রবেশিলেন । প্রবেশমাত্রে শয়নাগার কারাগার বোধ হইল । সুশীতল কোমল শয্যাও উত্তপ্ত বালুকার ন্যায় গাত্র দাহ করিতে লাগিল । প্রভাত হইতে না হইতেই আমাকে ডাকাইয়া আপনার নিকট পাঠাইয়া দিলেন ।
    • পৃষ্ঠা: ৯৮-৯৯
  • মেঘাগমে চাতকীর যেরূপ আহ্লাদ হয়, চন্দ্রাপীড়ের আগমনে কাদম্বরী সেইরূপ আহ্লাদিত হইলেন ।
    • পৃষ্ঠা: ৯৯
  • মদলেখা তাহারই ভাবার্থ ব্যক্ত করিয়া কহিল, রাজকুমার! কি বলিব আমরা এরূপ অপরূপ ব্যাধি ও অদ্ভুত সন্তাপ কখন কাহারও দেখি নাই । সন্তাপিত ব্যক্তির নলিনীকিসলয় হুতাশনের ন্যায়, জ্যোৎস্না উত্তাপের ন্যায়, সমীরণ বিষের ন্যায় বোধ হয়, ইহা আমরা কখনও শ্রবণ করি নাই । জানি না এ রোগের কি ঔষধ আছে । প্রণয়োন্মুখ যুবজনের অন্তঃকরণ কি সন্দিগ্ধ! কাদম্বরীর সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া ও মদলেখার সেইরূপ উত্তর শুনিয়াও চন্দ্রাপীড়ের চিত্ত সন্দেহদোলা হইতে নিবৃত্ত হইল না ।
    • পৃষ্ঠা: ১০০
  • তাঁহার কথা স্ফূর্ত্তি হইল না; কেবল নয়নযুগল হইতে জলধারা পড়িতে লাগিল । এ কি! অকস্মাৎ এরূপ দুঃখের কারণ কি? এই কথা জিজ্ঞাসা করাতে বসনাঞ্চলে নেত্রজল মোচন করিয়া বলিলেন, পত্রলেখে! দর্শন অবধি তুমি আমার প্রিয়পাত্র হইয়াছ । আমার হৃদয় কাহাকেও বিশ্বাস করিতে সম্মত নহে; কিন্তু তোমাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করিয়াছে । তোমাকে মনের কথা না বলিয়া আর কাহাকে বলিব । প্রিয়সখীকে আত্মদুঃখে দুঃখিত না করিয়া আর কাহাকে আত্মদুঃখে দুঃখিত করিব? কুমার চন্দ্রাপীড় লোকের নিকটে আমাকে নিন্দনীয় করিলেন ও যৎপরোনাস্তি যন্ত্রণা দিলেন ।
    • পৃষ্ঠা: ১০৬
  • এক্ষণে কি করি, কি উপায়ে প্রিয়তমার প্রাণ রক্ষা হয়! বুঝি, দুরাত্মা বিধি বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটাইয়া আমাকে মহাপাপে লিপ্ত ও কলঙ্কিত করিবার মানস করিয়াছে । এ সকল দৈববিড়ম্বনা সন্দেহ নাই । নতুবা নিরর্থক কিন্নরমিথুনের অনুসরণে কেন প্রবৃত্তি হইবে? অচ্ছোদসরোবরেই বা কেন যাইব? মহাশ্বেতার সঙ্গেই বা কেন সাক্ষাৎ হইবে? গন্ধর্ব্বনগরেই বা কি জন্য গমন করিব? আমার প্রতি কাদম্বরীর অনুরাগসঞ্চারই বা কেন হইবে? এ সকল বিধাতার চাতুরী সন্দেহ নাই । নতুবা, অসম্ভাবিত ও স্বপ্নকল্পিত ব্যাপার সকল কি রূপে সংঘটিত হইল?
    • পৃষ্ঠা: ১১০
  • ভাবিলেন যদি পিতা মাতাকে না বলিয়া তাঁহাদিগের অজ্ঞাতসারে গমন করি, তাহা হইলে কোথায় সুখ কোথায় বা শ্রেয়ঃ? পিতা যে রাজ্য-ভার দিয়াছেন সে কেবল দুঃখভার, প্রতিদিন পর্য্যবেক্ষণ না করিলে বিষমসঙ্কটের হেতুভূত হয় । সুতরাং তাঁহাকে না বলিয়া কি রূপে যাওয়া যাইতে পারে? বলিয়া যাওয়া উচিত; কিন্তু কি বলিব? গন্ধর্ব্বরাজকুমারী আমাকে দেখিয়া প্রণয়পাশে বদ্ধ হইয়াছেন, আমি সেই প্রাণেশ্বরী ব্যতিরেকে প্রাণ ধারণ করিতে পারি না, কেয়ূরক আমাকে লইতে আসিয়াছে, আমি চলিলাম, নিতান্ত নির্লজ্জ ও অসারের ন্যায় এ কথাই বা কি রূপে বলিব? বহুকালের পর বাটী আসিয়াছি; কি ব্যপদেশেই বা আবার শীঘ্র বিদেশে যাইব?
    • পৃষ্ঠা: ১১১
  • যদি শশধরে উষ্ণতা, অমৃতে উগ্রতা ও হিমে দাহ্যশক্তি জন্মে, তথাপি নির্দ্দোষস্বভাব চন্দ্রাপীড়ের দোষশঙ্কা হইতে পারে না । একের অপরাধে অন্যকে দোষী জ্ঞান করা অতি অন্যায় কর্ম্ম । মাতৃদ্রোহী, পিতৃঘাতী, কৃতঘ্ন, দুরাচার, দুষ্কর্ম্মান্বিতের দোষে সুশীল চন্দ্রাপীড়ের দোষ সম্ভাবনা করা উচিত নয় । যে পিতা মাতার অপেক্ষা করিল না, রাজাকে গ্রাহ্য করিল না, মিত্রতার অনুরোধ রাখিল না, চন্দ্রাপীড় তাহার কি করিবেন? তাহার কি একবারও ইহা মনে হইল না যে, আমি পিতা মাতার একমাত্র জীবননিবন্ধন, আমাকে না দেখিয়া কি রূপে তাঁহারা জীবন ধারণ করিবেন । এক্ষণে বুঝিলাম কেবল আমাদিগকে দুঃখ দিবার নিমিত্তই সে ভূতলে জন্ম গ্রহণ করিয়ছিল ।
    • পৃষ্ঠা: ১১৯-১২০
  • অমাত্য! যেরূপ খদ্যোতের আলোক দ্বারা অনলপ্রকাশ, অনল দ্বারা রবির প্রকাশ, অস্মদ্বিধ ব্যক্তি কর্ত্তৃক তোমার পরিবোধনও সেইরূপ । কিন্তু বর্ষাকালীন জলাশয়ের ন্যায় তোমার মন কলুষিত হইয়াছে । কলুষিত মনে বিবেকশক্তি স্পষ্ট রূপে প্রকাশিত হয় না । সে সময়ে অদূরদর্শীও দীর্ঘদর্শীকে অনায়াসে উপদেশ দিতে পারে ।
    • পৃষ্ঠা: ১২০
  • সুন্দরি! এই ভূমণ্ডলে বয়স ও আকৃতির অবিসংবাদী কর্ম্ম করিয়া কেহ নিন্দাস্পদ হয় না । কিন্তু তুমি তাহার বিপরীত কর্ম্ম করিতেছ । তোমার নবীন বয়স, কোমল শরীর ও শিরীষকুসুমের ন্যায় সুকুমার অবয়ব । এ সময় তোমার তপস্যার সময় নয় । মৃণালিনীর তুহিনপাত যেরূপ সাংঘাতিক, তোমার পক্ষে তপস্যার আড়ম্বর সেইরূপ । তোমার মত নবযুবতীরা যদি ইন্দ্রিয়সুখে জলাঞ্জলি দিয়া তপস্যায় অনুরক্ত হয়, তাহা হইলে, মকরকেতুর মোহন শর কি কার্য্যকর হইল? শশধরের উদয়, কোকিলের কলরব, বসন্তকালের সমাগম ও বর্ষা ঋতুর আড়ম্বরের কি ফলোদয় হইল? বিকসিত কমল, কুসুমিত উপবন ও মলয়ানিল কি কর্ম্মে লাগিল?
    • পৃষ্ঠা: ১২৫
  • আর বিলম্ব কেন? জীবিত ব্যক্তিরাই পিতা, মাতা, বন্ধু, বান্ধব, পরিজন ও সখীগণের অপেক্ষা করে । এখন আর তাঁহাদিগের অনুরোধ কি? এত দিনে সকল ক্লেশ দূর হইল, সকল যাতনা শান্তি হইল, সকল সন্তাপ নির্ব্বাণ হইল । যাহার নিমিত্ত লজ্জা, ধৈর্য্য, কুলমর্য্যাদা পরিত্যাগ করিয়াছি; বিনয়ে জলাঞ্জলি দিয়াছি; গুরুজনের অপেক্ষা পরিহার করিয়াছি; সখীদিগকে যৎপরোনাস্তি যাতনা দিয়াছি; প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করিয়াছি; সে জীবন-সর্ব্বস্ব প্রাণেশ্বর প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন, আমি এখনও জীবিত আছি! সখি! তুমি আবার সেই ঘৃণাকর, লজ্জাকর প্রাণ রাখিতে অনুরোধ করিতেছ! এ সময় সুখে মরিবার সময়, তুমি বাধা দিও না ।
    • পৃষ্ঠা: ১৩০
  • অনন্তর অন্তরীক্ষে এই বাণী বিনির্গত হইল, “বৎসে মহাশ্বেতে! আমার কথার আশ্বাসে তুমি জীবন ধারণ করিতেছ । অবশ্য প্রিয়তমের সহিত সাক্ষাৎ হইবে, সন্দেহ করিও না । পুণ্ডরীকের শরীর আমার তেজঃস্পর্শে অবিনাশি ও অবিকৃত হইয়া মদীয় লোকে আছে । চন্দ্রাপীড়ের এই শরীরও মত্তেজোময় অবিনাশি । বিশেষতঃ কাদম্বরীর করস্পর্শ হওয়াতে ইহার আর ক্ষয় নাই । শাপদোষে এই দেহ জীবনশূন্য হইয়াছে, যোগিশরীরের ন্যায় পুনর্ব্বার জীবাত্মা সংযুক্ত হইবে । তোমাদের প্রত্যয়ের নিমিত্ত ইহা এই স্থানেই থাকিল, অগ্নিসংস্কার বা পরিত্যাগ করিও না । যত দিন পুনর্জীবিত না হয়, প্রযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করিও ।”
    • পৃষ্ঠা: ১৩১
  • জন্মান্তরেও তুমি আমার প্রণয়ানুরাগ বিস্মৃত হইতে পার নাই । আমারই অন্বেষণ করিতে করিতে এই স্থানে আগমন করিয়াছিলে; আমি নৃশংসা রাক্ষসী বারংবার তোমার বিনাশের হেতুভূত হইলাম । দগ্ধবিধি আমাকে আপন প্রয়োজন সম্পাদনের সাধন করিবে বলিয়াই কি এত দীর্ঘ পরমায়ু প্রদান পূর্ব্বক আমার নির্ম্মাণ করিয়াছিল!
    • পৃষ্ঠা: ১৩৫
  • জীবনবিরহে এই দেহ কেবল চেষ্টাশূন্য; নতুবা সেই রূপ, সেই লাবণ্য, কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য হয় নাই । কপিঞ্জল যে শাপবিবরণ বর্ণন করিয়া গেলেন এবং আকাশবাণী দ্বারা যাহা ব্যক্ত হইয়াছে, তাহা সত্য, সংশয় নাই । কাদম্বরী আনন্দিত মনে মহাশ্বেতাকে, তদনন্তর চন্দ্রাপীড়ের সঙ্গিগণকে সেই শরীর দেখাইলেন । সঙ্গিগণ বিস্ময়বিকসিত নয়নে যুবরাজের শরীরশোভা দেখিতে লাগিল । কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, দেবি! মৃত দেহ অবিকৃত থাকে, ইহা আমরা কখন দেখি নাই, শ্রবণও করি নাই । ইহা অতি আশ্চর্য্য ব্যাপার সন্দেহ নাই । এক্ষণে আপনার প্রভাববলে ও তপস্যার ফলে যুবরাজ পুনর্জীবিত হইলে সকলে চরিতার্থ হই ।
    • পৃষ্ঠা: ১৩৭
  • ত্বরিতক আর কি বলিবে? তোমাদিগের বিষণ্ণ বদন, কাতর বচন ও হর্ষশূন্য আগমনেই সকল ব্যক্ত হইয়াছে । হা বৎস! জগদেকচন্দ্র! চন্দ্রানন! তোমার কি ঘটিয়াছে? কেন তুমি বাটী আসিলে না? শীঘ্র আসিব বলিয়া গেলে কই তোমার সে কথা কোথায় রহিল? কখন আমার নিকট মিথ্যা বল নাই এবারে কেন প্রতারণা করিলে? তোমার যাত্রার সময় আমার অন্তঃকরণে শঙ্কা হইয়াছিল, বুঝি সেই শঙ্কা সত্য হইল । তোমার সেই প্রফুল্ল মুখ আর দেখিতে পাইব না! তুমি কি এক বারে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছ? বস এক বার আসিয়া আমার অঙ্কের ভূষণ হও এবং মধুর স্বরে মা বলিয়া ডাকিয়া কর্ণকুহরে অমৃত বর্ষণ কর । এই হতভাগিনীকে মা বলিয়া সম্বোধন করে, এমন আর নাই । তুমি কখন আমার কথা উল্লঙ্ঘন কর নাই, এক্ষণে আমার কথা শুনিতেছ না কেন? কি জন্য উত্তর দিতেছ না? তুমি এমন বিবেচনা করিও না যে, বিলাসবতী চন্দ্রাপীড়ের অস্তগমনেও জীবন ধারণ করিবে । ত্বরিতকের মুখে তোমার সংবাদ শুনিতে ভয় হইতেছে । উহা যেন শুনিতে না হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১৪১-১৪২
  • ক্ষান্ত হও — ক্ষান্ত হও! আর বলিতে হইবে না । যাহা শুনিবার শুনিলাম । হা বৎস! হৃদয়বিদারণের ক্লেশ তুমিই অনুভব করিলে । বন্ধুর প্রতি যেরূপ প্রণয় প্রকাশ করিতে হয়, তাহার দৃষ্টান্ত পথে দণ্ডায়মান হইয়া পৃথিবীর প্রশংসাপাত্র হইলে । স্নেহ প্রকাশের নবীন পথ উদ্ভাবিত করিলে । তুমিই সার্থকজন্মা মহাপুরুষ । আমরা পাপিষ্ঠ, নির্দ্দয়, নরাধম । যেন কৌতুকাবহ উপন্যাসের ন্যায় এই দুর্ব্বিষহ দারুণ বৃত্তান্ত অবলীলাক্রমে শুনিলাম, কই কিছুই হইল না । অরে ভীরু প্রাণ! ব্যাকুল হইতেছিস্ কেন? যদি স্বয়ং বহির্গত না হইস্ এবার বলপূর্ব্বক তোকে বহির্গত করিব । দেবি! প্রস্তুত হও, এ সময় কালক্ষেপের সময় নয় । চন্দ্রাপীড় একাকী যাইতেছেন, শীঘ্র তাঁহার সঙ্গী হইতে হইবে । আর বিলম্ব করা বিধেয় নয় । আঃ হতভাগ্য শুকনাস! এখনও বিলম্ব করিতেছ? প্রাণপরিত্যাগের এরূপ সময় আর কবে পাইবে? এই বেলা চিতা প্রস্তুত কর । প্রজ্জ্বলিত অনলশিখা আলিঙ্গন করিয়া তাপিত অঙ্গ শীতল করা যাউক ।
    • পৃষ্ঠা:
  • বিচিত্র এই সংসারে প্রকৃতির পরিণাম, জগদীশ্বরের ইচ্ছা, শুভাশুভ কর্ম্মের পরিপাক অথবা স্বভাববশতঃ নানাপ্রকার কার্য্যের উৎপত্তি হয় ও নানাবিধ ঘটনা উপস্থিত হইয়া থাকে । শাস্ত্রকারেরা এরূপ অনেক ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা যুক্তি ও তর্কশক্তিতে আপাততঃ অলীক রূপে প্রতীয়মান হয়; কিন্তু বস্তুতঃ তাহা মিথ্যা নহে । ভুজঙ্গদষ্ট ও বিষবেগে অভিভূত ব্যক্তি মন্ত্রপ্রভাবে জাগরিত ও বিষমুক্ত হয় । যোগপ্রভাবে যোগীরা সকল ভূমণ্ডল করতলস্থিত বস্তুর ন্যায় দেখিতে পান । ধ্যানপ্রভাবে লোক অনেক কাল জীবিত থাকে । ইহার প্রমাণ আগম, রামায়ণ মহাভারত প্রভৃতি সমুদায় পুরাণে অনেকপ্রকার শাপবৃত্তান্তও বর্ণিত আছে । নহুষ রাজর্ষি অগস্ত্য ঋষির শাপে অজগর হইয়াছিলেন । বশিষ্ঠমুনির পুত্রের শাপে সৌদাস রাক্ষস হয়েন । শুক্রাচার্য্যের শাপে যযাতির যৌবনাবস্থায় জরা উপস্থিত হয় । পিতৃশাপে ত্রিশঙ্কু চণ্ডালকুলে জন্মপরিগ্রহ করেন । অধিক কি, জন্মমরণরহিত ভগবান্ নারায়ণও কখন জমদগ্নির আত্মজ, কখন বা রঘুবংশে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন । কখন বা মানবের ঔরসে জন্মপরিগ্রহ করিয়া লীলা প্রচার করিয়া থাকেন । অতএব মনুষ্যলোকে দেবতাদিগের উৎপত্তি অলীক বা অসম্ভব নয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১৪৩-১৪৪
  • ভদ্র! তুমি কে, কি নিমিত্ত আমাকে জালবদ্ধ করিলে? যদি আমিষলোভে বদ্ধ করিয়া থাক নিদ্রাবস্থায় কেন প্রাণ বিনাশ কর নাই? যদি কৌতুকের নিমিত্ত ধরিয়া থাক, কৌতুক নিবৃত্ত হইল এক্ষণে জালমোচন করিয়া দেও । নিরপরাধে কেন আর যন্ত্রণা দিতেছ? আমার চিত্ত প্রিয়জন দর্শনে অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত, আর বিলম্ব সহেনা । তুমিও প্রাণী বট, বল্লভ জনের অদর্শনে মন কিরূপ চঞ্চল হয়, জানিতে পার ।
    • পৃষ্ঠা: ১৫৩
  • ভুবনভূষণ রোহিণীপতে, কাদম্বরীলোচনানন্দ, চন্দ্র! শুকের ও আপনার পূর্ব্বজন্মবৃত্তান্ত অবগত হইলেন, পক্ষী অনুরাগান্ধ হইয়া পিতার আদেশ উল্লঙ্ঘন পূর্ব্বক মহাশ্বেতার নিকট যাইতেছিল তাহাও শুনিলেন । আমি ঐ দুরাত্মার জননী লক্ষ্মী, মহর্ষি কালত্রয়দর্শী দিব্য চক্ষু দ্বারা উহাকে পুনর্ব্বার অপথে পদার্পণ করিতে দেখিয়া আমাকে কহিলেন, তুমি ভূতলে গমন কর এবং যাবৎ আরব্ধ কর্ম্ম সমাপ্ত না হয় তাবৎ তোমার পুত্ত্রকে তথায় বদ্ধ করিয়া রাখ এবং যাহাতে অনুতাপ হয় এরূপ শিক্ষা দিও! কি জানি, যদি কর্ম্মদোষে আবার তির্য্যগ্ জাতি অপেক্ষাও অন্য কোন নীচ জাতিতে পতিত হয় । দুষ্কর্ম্মের অসাধ্য কিছুই নাই । আমি মহর্ষির বচনানুসারে উহাকে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলাম । অদ্য কর্ম্ম সমাপ্ত হইয়াছে এই নিমিত্ত তোমাদিগের পরস্পর মিলন করিয়া দিলাম; এক্ষণে জরামরণাদিদুঃখসঙ্কুল এই দেহ পরিত্যাগ করিয়া আপন আপন অভীষ্ট বস্তু লাভ কর, এই বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন ।
    • পৃষ্ঠা: ১৫৬
  • কাদম্বরী উন্মত্ত ও বিকৃতচিত্ত হইয়া জীবিতভ্রমে যেমন চন্দ্রাপীড়ের মৃত দেহ গাঢ় আলিঙ্গন করিবার উপক্রম করিতেছেন, অমনি চন্দ্রাপীড় পুনর্জীবিত হইয়া উঠিলেন । কাদম্বরী ভয়ে কাঁপিতেছেন, চন্দ্রাপীড় সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভীরু! ভয় কি? এই দেখ, আমি পুনর্জীবিত হইয়াছি । আজি শাপাবসান হইয়াছে । এত দিন বিদিশা নগরীতে শূদ্রক নামে নরপতি ছিলাম, অদ্য সে শরীর পরিত্যাগ করিয়াছি । তোমার প্রিয়সখী মহাশ্বেতার মনোরথও আজি সফল হইবেক । আজি পুণ্ডরীকও বিগতশাপ হইয়াছেন । বলিতে বলিতে চন্দ্রলোক হইতে পুণ্ডরীক নভোমণ্ডলে অবতীর্ণ হইলেন । তাঁহার গলে সেই একাবলী মালা ও বামপার্শ্বে কপিঞ্জল ।
    • পৃষ্ঠা: ১৫৭
  • হেমকূটে কিছু কাল বাস করিয়া আপন রাজধানী উজ্জয়িনী নগরে গমন করিলেন । তথায় পুণ্ডরীকের প্রতি রাজ্যশাসনের ভার দিয়া কখন গন্ধর্ব্বলোকে, কখন চন্দ্রলোকে, কখন পিতার আশ্রমে, কখন বা পরমরমণীয় সেই সেই প্রদেশে বাস করিয়া সুখ সম্ভোগ করিতে লাগিলেন ।
    • পৃষ্ঠা: শেষপাতা

অন্যান্য

[সম্পাদনা]

ষড়ঋতু বিষয়ে

[সম্পাদনা]

এই কাল কি রমণীয়! লোকের গতায়াতের কোন ক্লেশ থাকে না । যে দিকে নেত্রপাত করা যায়, ধান্যমঞ্জরীর শোভা নয়ন ও মনকে পরিতৃপ্ত করে । জল দেখিলে আহ্লাদ জন্মে! চন্দ্রোদয়ে রজনীর সাতিশয় শোভা হয় । নভোমণ্ডল সর্ব্বদা নির্ম্মল থাকে ।
~ শরৎকাল সম্পর্কে বানভট্ট

  • গ্রীষ্মকালে দিবসের শেষভাগ অতি রমণীয় । সূর্য্যের উত্তাপ থাকে না । মন্দ মন্দ সন্ধ্যাসমীরণ অমৃতবৃষ্টির ন্যায় শরীরে সুখস্পর্শ বোধ হয় । এই সময় সকলে গৃহের বহির্গত হইয়া সুশীতল সমীরণ সেবন করে, প্রফুল্ল অন্তঃকরণে তরুগণের শ্যামল শোভা দেখিয়া এবং দিঙ্মণ্ডলের শোভা দেখিয়া সাতিশয় আনন্দিত হয় ।
    • পৃষ্ঠা: ১১৮
  • পথে বর্ষাকাল উপস্থিত । নীলবর্ণ মেঘমালায় গগনমণ্ডল আচ্ছাদিত হইল । দিনকর আর দৃষ্টিগোচর হয় না । চতুর্দ্দিকে মেঘ, দশ দিক্ অন্ধকার । দিবা রাত্রির কিছুই বিশেষ রহিল না । ঘনঘটার ঘোরতর গভীর গর্জ্জন ও ক্ষণপ্রভার দুঃসহ প্রভা ভয়ানক হইয়া উঠিল । মধ্যে মধ্যে বজ্রাঘাত ও শিলাবৃষ্টি । অনবরত মূষলধারে বৃষ্টি হওয়াতে, নদী সকল বর্দ্ধিত হইয়া উভয় কূল ভগ্ন করিয়া ভীষণ বেগে প্রবাহিত হইল । সরোবর, পুষ্করিণী, নদ, নদী পরিপূর্ণ হইয়া গেল । চতুর্দ্দিক জলময় ও পথ পঙ্কময় । ময়ূর ও ময়ূরীগণ আহ্লাদে পুলকিত হইয়া নৃত্য আরম্ভ করিল । কদম্ব, মালতী, কেতকী, কুটজ প্রভৃতি নানাবিধ তরু ও লতার বিকসিত কুসুম আন্দোলিত করিয়া নবসলিলসিক্ত বসুন্ধরার মৃদগন্ধ বিস্তার পূর্ব্বক ঝাঞ্ঝাবায়ু উৎকলাপ শিখিকুলের শিখাকলাপে আঘাত করিতে লাগিল । কোন দিকে কেকারব, কোন দিকে ভেকরব, গগনে চাতকের কলরব, চতুর্দ্দিকে ঝঞ্ঝাবায়ু ও বৃষ্টিধারার গভীর শব্দ এবং স্থানে স্থানে গিরিনির্ঝরের পতনশব্দ । গগনমণ্ডলে আর চন্দ্রমা দৃষ্টিগোচর হয় না । নক্ষত্রগণ আর দেখিতে পাওয়া যায় না ।
    • পৃষ্ঠা: ১২০-১২১
  • মধ্যে বিদ্যুতের দুঃসহ আলোক । খদ্যোতমালা অন্ধকারাচ্ছন্ন তরুমণ্ডলীকে আবৃত করিয়া আরও ভয়ঙ্কর করিল । গিরিনির্ঝরের পতনশব্দ, ভেকের কোলাহল ও ময়ূরের কেকারবে বন আকুল হইল । কিছুই দেখা যায় না । কিছুই কর্ণগোচর হয় না । কি ভয়ানক সময়! এ সময়ে জনপদবাসী সাহসী পুরুষের মনেও ভয়সঞ্চার হয়;
    • পৃষ্ঠা: ১৩৭
  • ক্রমে বর্ষাকাল গত ও শরৎকাল আগত হইল । মেঘের অপগমে দিঙ্মণ্ডল যেন প্রসারিত হইল । মার্তণ্ড প্রচণ্ড কিরণদ্বারা পঙ্কময় পথ শুষ্ক করিয়া দিলেন । নদ, নদী, সরোবর ও পুষ্করিণীর কলুষিত সলিল নির্ম্মল হইল । মরালকুল নদীর সিকতাময় পুলিনে সুমধুর কলরব করিয়া কেলি করিতে লাগিল । গ্রামসীমায় পিঙ্গল কলমঞ্জরী ফলভরে অবনত হইল । শুকসারিকা প্রভৃতি পক্ষিগণ ধান্যশীষ মুখে করিয়া শ্রেণীবদ্ধ হইয়া গগনের উপরিভাগে অপূর্ব্ব শোভা বিস্তার করিল । কাশকুসুম বিকসিত হইল । ইন্দীবর, কহ্লার শেফালিকা প্রভৃতি নানা কুসুমের গন্ধযুক্ত বিশদবারিশীকরসম্পৃক্ত সমীরণ মন্দ মন্দ সঞ্চারিত হইয়া জীবগণের মনে আহ্লাদ জন্মিয়া দিল । সকল অপেক্ষা শশধরের প্রভা ও কমলবনের শোভা উজ্জ্বল হইল ।
    • পৃষ্ঠা: ১৩৮
  • এই কাল কি রমণীয়! লোকের গতায়াতের কোন ক্লেশ থাকে না । যে দিকে নেত্রপাত করা যায়, ধান্যমঞ্জরীর শোভা নয়ন ও মনকে পরিতৃপ্ত করে । জল দেখিলে আহ্লাদ জন্মে! চন্দ্রোদয়ে রজনীর সাতিশয় শোভা হয় । নভোমণ্ডল সর্ব্বদা নির্ম্মল থাকে ।
    • পৃষ্ঠা: ১৩৯
  • এ দিকে বসন্তকাল উপস্থিত । সহকারের মুকুলমঞ্জরী সঞ্চালিত করিয়া মলয়ানিল মন্দ মন্দ বহিতে লাগিল কোকিলের কুহুরবে চতুর্দ্দিক্ ব্যাপ্ত হইল । অশোক, কিংশুক, কুরুবক, চম্পক প্রভৃতি তরুগণ বিকসিত কুসুম দ্বারা দিঙ্মণ্ডল আলোকময় করিল । অলিকুল বকুলপুষ্পের গন্ধে অন্ধ হইয়া ঝঙ্কার পূর্ব্বক তাহার চতুর্দ্দিকে ভ্রমণ করিতে লাগিল । তরুগণ পল্লবিত ও ফলভরে অবনত হইল । কমলবন বিকসিত হইয়া সরোবরের শোভা বৃদ্ধি করিল ।
    • পৃষ্ঠা: ১৫৭

জাতিভেদ বিষয়ক

[সম্পাদনা]
  • চণ্ডালের গৃহে এরূপ সুন্দরী কুমারীর সমুদ্ভব নিতান্ত অসম্ভব ও আশ্চর্য্যের বিষয় ।
    • পৃষ্ঠা: ০৯
  • অথবা মোচনের প্রভু । কিরাতের কথায় সাতিশয় বিষণ্ণ হইলাম । ভাবিলাম, আমি কি হতভাগ্য! প্রথমে ছিলাম দিব্যলোকবাসী ঋষি; তাহার পর সামান্য মানব হইলাম; অবশেষে শুকজাতিতে পতিত হইয়া জালবদ্ধ হইলাম ও চণ্ডালের গৃহে যাইতে হইল । তথায় চণ্ডাল-বালকের ক্রীড়াসামগ্রী হইব এবং ম্লেচ্ছ জাতির অপবিত্র অন্নে এই দেহ পোষিত হইবেক । হা মাতঃ! কেন আমি গর্ভেই বিলীন হই নাই! হা পিতঃ! আর ক্লেশ সহ্য করিতে পারি না । হা বিধাতঃ! তোমার মনে এই ছিল! এই বলিয়া বিলাপ করিতে লাগিলাম । পুনর্ব্বার বিনয়বচনে কিরাতকে কহিলাম, ভ্রাতঃ! আমি জাতিস্মর মুনিকুমার, কেন চণ্ডালের আলয়ে লইয়া গিয়া আমার দেহ অপবিত্র কর? ছাড়িয়া দাও, তোমার যথেষ্ট পুণ্যলাভ হইবেক ।
    • পৃষ্ঠা: ১৫৩-১৫৪
  • চণ্ডালকন্যা ফল মূল প্রভৃতি খাদ্য দ্রব্য আমার সম্মুখে দিল, আমি খাইলাম না । পর দিনও ঐরূপ আহার সামগ্রী আনিয়া দিল । আমি ভক্ষণ না করাতে কহিল, পক্ষীপশুজাতি ক্ষুধা লাগিলে খায় না, ইহা অতি অসম্ভব বোধ হয়, তুমি জাতিস্মর, ভক্ষ্যাভক্ষ্য বিবেচনা করিতেছ । অর্থাৎ চণ্ডালস্পর্শে খাদ্য দ্রব্য অপবিত্র হইয়াছে বলিয়া আহার করিতেছ না । তুমি পূর্ব্বজন্মে যে থাক, এক্ষণে পক্ষিজাতি হইয়াছ । চণ্ডালস্পৃষ্ট বস্তু ভক্ষণ করিলে পক্ষিজাতির দুরদৃষ্ট জন্মে না । বিশেষতঃ আমি বিশুদ্ধ ফল মূল আনয়ন করিয়াছি, উচ্ছিষ্ট সামগ্রী আনি নাই । নীচজাতিস্পৃষ্ট ফল মূল ভক্ষণ করা কাহারও পক্ষে নিষিদ্ধ নহে । শাস্ত্রকারেরা লিখিয়াছেন, পানীয় কিছুতেই অপবিত্র হয় না । অতএব তোমার পান ভোজনে বাধা কি?
    • পৃষ্ঠা: ১৫৪

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

বহিসংযোগ

[সম্পাদনা]