বিষয়বস্তুতে চলুন

কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন (১৮৪৯–১৯২৪) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন সংস্কৃত পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ এবং লেখক। তিনি ১৯০৮ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। সংস্কৃত ভাষার পুনরুজ্জীবনে বিদ্যারত্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কালীপ্রসন্ন ভারতীয় পুরাণ, বৈষ্ণববাদ, পুরাণ এবং হিন্দু সংস্কৃতির উপর অনেক বই লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন। তিনি জয়দেব রচিত গীতগোবিন্দম্—এর অনুবাদ করেন। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে বেল্লিক রামায়ণ (১৯০৯), শ্রীশ্রীকৃষ্ণ-চরিত (১৯০৮), সচিত্র বসন্ত-লতা (১৮৯৫) প্রভৃতি। এছাড়া কবিবর স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের গ্রন্থাবলীর (ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রচিত) সম্পাদনা করেন।

উক্তি

[সম্পাদনা]
  • রাজপুত্র হেসে হেসে কহেন তখন।
    “ভাল ভাল হাঁস আমি করি প্রত্যর্পণ॥
    একটা হাঁসের তরে এতটা লাঞ্ছনা।
    রক্তদানে বাঁচাইনু সে কথা ভাব না॥”
    এত বলি হাঁস আনি দিল সম্মুখেতে।
    দেখিয়ে আশ্চর্য্য অতি হয় সকলেতে॥
    তখন সে জমিদার কহে, “এ কি হল?
    কেমনেতে হাঁস তবে ফিরে পা(ও)য় গেল॥
    • অভাগিনী কর্ত্তৃক বনেদী ও গর্‌বনেদীর উপাখ্যান কথন, বেল্লিক রামায়ণ - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২১১-২১২
  • ঈশ্বর গুপ্তের রচনা-ভঙ্গিমায়, শব্দ-প্রয়োগে, অলঙ্কার-বিন্যাসে অনেকটা ভারতচন্দ্রের ভাব ও ভঙ্গী পাওয়া যায়। তেমনি পদলালিত্য, তেমনি রস প্রাচুর্য্য, তেমনি শব্দাড়ম্বর। ভারতচন্দ্র এবং ঈশ্বর গুপ্ত বাঙ্গলা পদ্য-সাহিত্যের আদিগুরু বলিলেও দোষ হয় না। কবিকঙ্কণে প্রাদেশিকতা আছে, কালিদাস ও কৃত্তিবাসের অপ্রচলিত ভাব ও ভাষার প্রয়োগ আছে, ভারতচন্দ্রে এবং ঈশ্বর গুপ্তে তাহা অতি বিরল। ভারতচন্দ্র ও ঈশ্বর গুপ্ত বাঙ্গলার সর্ব্ব প্রদেশের সর্ব্বসময়ের কবি।
    • ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের গ্রন্থাবলী বইয়ের মুখবন্ধে, কবিবর স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের গ্রন্থাবলী- ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, সম্পাদনা- কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩০৬ বঙ্গাব্দ)
  • আশা-মরীচিকা লােক চিরদিন কয়।
    আশাই বাঁচায় সবে আশাই মারয়॥
    অতি আশা কিছু না, কথা ঠিক ঠিক্।
    অতি-আশাকারী জনে ধিক্‌ শত ধিক্॥
    • অভারামের ব্যবসা, বেল্লিক রামায়ণ - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৯
  • কালের গতি বিচিত্র! কালবশে মানবের অদৃষ্টে কখন্ যে কি অবস্থা ঘটে, তাহা কে বলিতে পারে? কালবশেই মানবের মন বিচলিত হয়, আলোড়িত হয়, ভাবনায় আকুল হইয়া উঠে। কালবশেই মানবের মন অনন্ত-ক্ষোভসাগরে নিমগ্ন হইয়া হাবুডুবু খাইতেছে, আবার কালবশেই সে সমস্ত ভুলিয়া অতুলনীয় সুখহ্রদে সন্তরণ করিতেছে।
    • নবীনহৃদয়ে চিন্তাকীট, প্রথম পরিচ্ছেদ, সচিত্র বসন্ত-লতা - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩০২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪
  • যৌবন বিহনে গতি কিছু নাহি আর।
    বল বুদ্ধি সকলি সে যৌবন যাহার॥
    মহাবেগে কোপমতী নদী সে যেমন।
    সেইরূপ সে রমণী যাহার যৌবন॥
    যৌবনে আহার দেয় যৌবনে বিহার।
    যৌবনেই বহে তত সুখ-সমাচার॥
    • উপায় চিন্তা, বেল্লিক রামায়ণ - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩১
  • যখন তীর্থভ্রমণে বা কোন কারণে বিদেশে যাইবার বাসনা জন্মে, তখন মন অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়। কখন্ নির্দ্দিষ্ট সময় উপস্থিত হইবে, কখন্ শুভযাত্রা করিরা বহির্গত হওয়া যাইবে এই চিন্তাতেই মন আকুল হইয়া উঠে। কিন্তু সংসারের মায়াবন্ধন এত সুদৃঢ় যে, সহজে তাহা ছেদন করিয়া বহির্গত হওয়া দুরূহ।
    • তীর্থ-ভ্রমণ, দশম পরিচ্ছেদ, সচিত্র বসন্ত-লতা - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩০২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫০
  • স্বর্গ হতে গরীয়সী তুমি মা আমার।
    আমি কি দেখিতে পারি দুর্গতি তোমার॥
    প্রাণ যদি যায় মম তব দুঃখনাশে।
    অবশ্য করিব তাহা কহি তব পাশে॥
    • অথ দণ্ডবিধি কথন, বেল্লিক রামায়ণ - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯৯
  • কাহার পক্ষে সুপ্রভাত, কাহার পক্ষে কু-প্রভাত। প্রভাতবায়ু কাহাকে যে কি সংবাদ দিবে, তাহা সেই অন্তর্যামী নিয়ন্তাই অবগত আছেন। কাশীধামে শবদাহনার্থ চিত্তা করিতে হয় না। উৎকট পীড়া হইলে প্রত্যহই তাহার বাটীতে সাধারণে সংবাদ লইয়া থাকে। যে ব্যক্তি এই শিবক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জ্জন করে, তাহার মৃতদেহ বাহন করিলে শিববহনের ফল হয় এবং তাহাকে দাহন করিলে অনস্তস্বর্গের পথ পরিষ্কার হইয়া থাকে। সুতরাং সকলেই শবদাহনার্থ ঔৎসুক্য প্রকাশ করে।
    • সহমরণ, চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ, সচিত্র বসন্ত-লতা - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩০২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭৩
  • ঠিকানা আমার নাহি হইল লিখিত।
    সে কারণে কদাপি না হইবে চিন্তিত॥
    বিশেষ কারণে কোন না লিখি ঠিকানা।
    সে কারণ মনে অভিমান করিও না॥
    • মােহিনী কর্ত্তৃক গূঢ়রহস্য ভেদ, বেল্লিক রামায়ণ - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৪৫
  • যাঁহারা কামাদি ষড়রিপুকে পরাভব করিয়া মনকে নিগৃহীত করতঃ অখিল বাসনাকে বিসর্জ্জন দিয়াছেন, ঈশ্বরই যাঁহাদিগের একমাত্র ধ্যান—জ্ঞান, তাঁহারাই প্রকৃত সাধু। তাঁহাদিগের হৃদয় যে স্বতঃসিদ্ধ দয়া-স্নেহে পরিপূর্ণ, তাহা বলা বাহুল্যমাত্র।
    • নিবিড় বনে নীরদ, ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ, সচিত্র বসন্ত-লতা - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩০২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯৭
  • পিতা পতিত, বহুদোষে লিপ্ত এবং কুষ্ঠী বা ব্যাধিগ্রস্ত হইলেও যে পুত্র তাঁহাকে ত্যাগ না করিয়া সেবা করে, তাহার পরমলোকে ও বিষ্ণুর সেই পরমপদে অধিষ্ঠান হয়। এইরূপে ভৃত্য প্রভুর উপাসনা করিলে তদীয় প্রসাদে ইন্দ্রলোকে গমন করে। ব্রাহ্মণ অগ্নিত্যাগ না করিলে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন; কিন্তু অন্যথাচরণে প্রবৃত্ত হইলে বুষলীপতি বলিয়া অভিহিত হয়। ভৃত্যও স্বামী ত্যাগ করিলে স্বামীদ্রোহী হয়, তাহাতে সন্দেহ নাই। অতএব পিতা, অগ্নি ও স্বামী ত্যাগ করা বিধেয় নহে। যে ব্রাহ্মণ পুত্র বা ভৃত্য ও অগ্ন্যাদি ত্যাগ করে, তাহার নারকী গতি-প্রাপ্তি হয়।
    • শ্রীশ্রীকৃষ্ণ-চরিত, দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্রীশ্রীকৃষ্ণ-চরিত - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১১
  • সকলই ঈশ্বরের লীলা। কেহই তাঁহার মহিমার ইয়ত্তা করিতে সমর্থ হয় না। বালকেরা যেরূপ পুত্তলি প্রভৃতি লইয়া ক্রীড়া করে, জগৎপাতা সর্ব্বেশ্বরও সেইরূপ এই লোকজগৎ লইয়া ক্রীড়া করিতেছেন। তিনি কাহাকেও উত্তাল আনন্দতুরঙ্গে নাচাইয়া নাচাইয়া সুখময় সলিলে নিক্ষেপ করিতেছেন, আবার কাহাকেও বা অকূল শোকসাগরে ভাসাইয়া দিবানিশি কান্দাইতেছেন। কাহারও পরিচর্যার নিমিত্ত শত শত দাস-দাসী প্রতিনিয়ত নিযুক্ত রহিয়াছে, আবার কাহাকেও সমস্ত দিন নিদারুণ পরিশ্রম করিয়া অনাহারে জীবন যাপন করিতে হইতেছে।
    • নবীনহৃদয়ে চিন্তাকীট, প্রথম পরিচ্ছেদ, সচিত্র বসন্ত-লতা - কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশসাল- ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩০২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]