কালীপ্রসন্ন সিংহ
অবয়ব
কালীপ্রসন্ন সিংহ (২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৪০ - ২৪ জুলাই ১৮৭০ মতান্তরে ১৮৭১ ) ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক ও সমাজসেবক। বাংলা সাহিত্যে তার দুই অমর অবদানসমূহের জন্য চিরস্মরনীয় হয়ে আছেন। সেগুলো হল, বৃহত্তম মহাকাব্য মহাভারতের বাংলা অনুবাদ এবং তার বই হুতোম প্যাঁচার নক্শা। ঊনবিংশ শতকের বাংলা-সাহিত্য আন্দোলনের তিনি অন্যতম একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মাত্র উনত্রিশ বছরের জীবনে তিনি সাহিত্য ও সমাজের উন্নয়নের জন্য অসংখ্য কাজ করেছেন। তিনি বিধবা বিবাহের একজন সমর্থক ছিলেন। বহু বিধবা দুখিনীর জীবন পরিবর্তনের জন্য তিনি অকাতরে দান করেছেন। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্র ছিলেন।

উক্তি
[সম্পাদনা]হুতোম প্যাঁচার নক্শা
[সম্পাদনা]হুতোম প্যাঁচার নক্শা, নতুন সাহিত্য ভবন
ভূমিকা উপলক্ষে একটা কথা
[সম্পাদনা]- আজকাল বাঙালী ভাষা আমাদের মত মূর্তিমান্ কবিদলের অনেকেরই উপজীব্য হয়েছে, বেওয়ারিস লুচির ময়দা বা তইরি কাদা পেলে যেমন নিষ্কর্মা ছেলেমাত্রেই একটা না একটা পুতুল তইরি করে খ্যালা করে, তেমনি বেওয়ারিস বাঙালী ভাষাতে অনেকে যা মনে যায় কচ্চেন; যদি এর কেও ওয়ারিসান্ থাক্তো, তা হলে ইস্কুলবয় ও আমাদের মত গাধাদের দ্বারা নাস্তা-নাবুদ হতে পেত না-তা হলে হয়ত এত দিন কত গ্রন্থকার ফাঁসি যেতেন, কেউ বা কয়েদ থাকতেন, সুতরাং এই নজিরেই আমাদের বাঙালী ভাষা দখল করা হয়।
- পৃষ্ঠা ৫
- কথায় বলে, একজন বড়মানুষ তাঁরে প্রত্যহ নতুন নতুন মস্করামো দ্যাখাবার জন্য একজন ভাঁড় চাকর রেখেছিলেন, সে প্রত্যহ নতুন নতুন ভাড়ামো করে বড়মানুষ মশায়ের মনোরঞ্জন কত্তো, কিছু দিন যায়, একদিন সে আর নতুন ভাড়ামো খুঁজে পায় না, শেষে ঠাউরে ঠাউরে এক ঝাঁকামুটে ভাড়া করে বড়মানুষ বাবুর কাছে উপস্থিত, বড়মানুষ বাবু তার ভাঁড়কে ঝাঁকামুটের ওপর বসে আসতে দেখে বললেন, 'ভাঁড় । এ কি হে?' ভাঁড় বললেন, 'ধর্মাবতার আজকের এই এক নতুন!' আমরাও এই নক্শাটি, পাঠকদের উপহার দিয়ে এই এক নতুন বলে দাঁড়ালেম--এখন আপনাদের স্বেচ্ছামত তিরস্কার বা পুরস্কার করুন।
- পৃষ্ঠা ৫
- কি অভিপ্রায়ে এই নক্শা প্রচারিত হল, নক্শাখানির দু-পাত দেখলেই সহৃদয় মাত্রেই তা অনুভব কত্তে সমর্থ হবেন, কারণ এই নক্শায় একটি কথা অলীক বা অমূলক ব্যবহার করা হয় নাই--সত্য বটে অনেকে নক্শাখানিতে আপনারে আপনি দেখ্তে গেলেও পেতে পারেন, কিন্তু বাস্তবিক সেটি যে তিনি নন তা বলা বাহুল্য, তবে কেবল এই মাত্র বল্তে পারি যে আমি কারেও লক্ষ্য করি নাই অথচ সকলেরেই লক্ষ করিচি, এমন কি স্বয়ংও নক্শার মধ্যে থাকতে ভুলি নাই।
- পৃষ্ঠা ৫
- নক্শাখানিকে আমি একদিন আরশি বলে পেশ কল্লেও কত্তে পাত্তেম; কারণ পূর্ব্বে জানা ছিল যে, দর্পণে আপনার মুখ কদর্য দেখে কোন বুদ্ধিমানই আরশিখানি ভেঙে ফেলেন না, বরং যাতে ক্রমে ভালো দেখায়, তারই তদ্বির করে থাকেন। কিন্তু নীলদর্পণের হ্যাঙ্গাম দেখে শুনে—ভয়ানক জানোয়ারদের মুখের কাছে ভরসা বেঁধে আরশি ধত্তে আর সাহস হয় না; সুতরাং বুড়ো বয়সে সং সেজে রং কত্তে হলো—পূজনীয় পাঠকগণ বেয়াদবি মাফ্ করবেন।
- পৃষ্ঠা ৬
দ্বিতীয় বারের গৌরচন্দ্রিকা
[সম্পাদনা]- পাঠক! কতকগুলি আনাড়ীতে রটান, হুতোমের নক্শা অতি কদর্য বই; কেবল পরনিন্দা পরচর্চ্চা খেউড় ও পচালে পোরা ও সুদ্ধ গায়ের জ্বালা নিবারণার্থে কতিপয় ভদ্রলোককে গাল দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবিক ঐ মহাপুরুষদের ভ্রম; একবার ক্যান, শতেক বার মুক্তকণ্ঠে বলবো–ভ্ৰম! হুতোমের তা উদ্দেশ্য নয়, তা অভিসন্ধি নয়, হুতোম ততদূর নীচে নন যে, দাদ তোলার কি গাল দেবার জন্য কলম ধরেন। জগদীশ্বরের প্রসাদে যে কলমে হুতোমের নক্শা প্রসব করেছে, সেই কলমই ভারতবর্ষের নীতিপ্রধান ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রের প্রধান উৎকৃষ্ট ইতিহাসের ও বিচিত্র চিত্তোৎকর্ষবিধায়ক মুমুক্ষু সংসারী, বিরাগী ও রাজার অনন্য-অবলম্বন-স্বরূপ গ্রন্থের অনুবাদক; সুতরাং এটা আপনি বিলক্ষণ জানবেন যে, অজগর ক্ষুধিত হলে আরসুলা খায় না, ও গায়ে পিপড়ে কামড়ালে ডঙ্ক ধরে না। হুতোমে বর্ণিত বদমাইস ও বাজে দলের সঙ্গে গ্রন্থকারেরও সেই সম্পর্ক।
- পৃষ্ঠা ৭
- ময়ুরভঞ্জের মহারাজার মোক্তার মহারাজের জন্যে মেছোবাজার হতে উৎকৃষ্ট জরির লপেটা জুতো পাঠান, মহারাজ চিরকাল উড়ে জুতো পায়ে দিয়ে এসেচেন, লপেটা পেয়ে মনে কল্লেন সেটি পাগড়ির কলগি ও জন্মতিথির দিন মহা সমারোহ করে ঐ লপেটা পাগড়ির ওপর বেঁধে মজলিসে বার দিলেন।
- পৃষ্ঠা ৮
কলিকাতার চড়কপার্বণ
[সম্পাদনা]- কলিকাতা শহরের চারদিকেই ঢাকের বাজ্না শোনা যাচ্ছে, চড়্কীর পিঠ সড়্ সড়্ কচ্চে, কামারেরা বাণ, দশলকি, কাঁটা ও বঁটি প্রস্তত কচ্চে; সর্বাঙ্গে গয়না, পায়ে নূপুর, মাতায় জরির টুপি, কোমরে চন্দ্রহার, সিপাই পেড়ে ঢাকাই শাড়ি মালকৌচা করে পরা, তারকেশ্বরে ছোবান গামছা হাতে, বিল্বপত্র বাঁদা সুতা গলায় যত ছুতোর, গয়লা, গন্ধবেনে ও কাঁসারীর আনন্দের সীমা নাই--'আমাদের বাবুদের বাড়ি গাজোন!'
- পৃষ্ঠা ১১
- গুপুস করে তোপ পড়ে গেল! কাকগুলো 'কা কা', করে বাসা ছেড়ে উড়বার উজ্জ্গ কল্লে। দোকানীরা দোকানের ঝাপতাড়া খুলে গন্ধেশ্বরীকে প্রণাম করে দোকানে গঙ্গাজলের ছড়া দিয়ে হুঁ'কোর জল ফিরিয়ে তামাক খাবার উজ্জুগ কচ্চে। ক্রমে ফর্সা হয়ে এল-মাচের ভারিরা দৌড়ে আসতে লেগেচে-মেচুনীরা ঝকড়া কত্তে কত্তে তার পেচু পেচু দৌড়েচে। বদ্ধিবাটির আলু, হাসনানের বেগুন, বাজরা বাজরা আসচে। দিশি বিলিতি যমেরা অবস্থা ও রেস্তমত গাড়ি পাল্কি চড়ে ভিজিটে বেরিয়েচেন -জ্বর বিকার ওলাউঠো'র প্রাদুর্ভাব না পড়লে এ'দের মুখে হাঁসি দেখা যায় না--উলো অঞ্চলে মড়ক হওয়াতে অনেক গো-দাগাও বিলক্ষণ সঙ্গতি করে নেছেন; কলিকাতা শহরেও দু-চার গো-দাগাকে প্রাক্টিস কত্তে দেখ যায়, এদের ওষুধ চমৎকার, কেউ বলদের মতন রোগীর নাক ফুঁড়ে আরাম করেন; কেউ সুদ্ধ জল খাইয়ে সারেন। শহুরে কবিরাজরা আবার এদের হতে এক কাটি সরেশ, সকল রকম রোগেই 'সদ্য মৃত্যু্শ্বর' ব্যাবস্থা করে থাকেন--অনেকে চাণক্য শ্লোক ও দাঁতাকর্ণের পু'থি পড়েই চিকিৎসা আরম্ভ করেচেন।
- পৃষ্ঠা ১৭
- টুলো পুজুরি ভট্চাজ্জিরে কাপড় বগলে করে স্নান কত্তে চলেচে, আজ তাদের বড় ত্বরা, যজমানের বাড়ি সকাল সকাল যেতে হবে। আদবুড়ো বেতোরা মর্নিং ওয়াকে বেরুচ্চেন। উড়ে বেহারারা দাঁতন হাতে করে স্নান কত্তে দৌড়েছে। ইংলিশম্যান, হরকরা, ফিনিক্স, এক্সচেঞ্জ গেজেট, গ্রাহকদের দরজায় উপস্থিত হয়েচে। হরিণমাংসের মত কোন কোন বাঙ্গালা খবরের কাগজ বাসী না হলে গ্রাহকরা পান না--ইংরাজি কাগজের সে রকম নয়, গরম গরম ব্রেক্ফাস্টের সময় গরম গরম কাগজ পড়াই আবশ্যক। ক্রমে সুর্য উদয় হলেন।
- পৃষ্ঠা ১৭
- দালালি কাজটা ভালো, 'নেপো মারে দইয়ের মতন' এতে বিলক্ষণ গুড় আছে। অনেক ভদ্রলোকের ছেলেকে গাড়িঘোড়ায় চড়ে দালালি কত্তে দেখা যায়, অনেক 'রেস্তহীন মুচ্ছদ্দী' 'চার বার ইন্সল্ভেন্ট' হয়ে এখন দালালি ধরেছেন। অনেক পদ্মলোচন দালালির দৌলতে 'কলাগেছে থাম' ফেঁদে ফেল্পেন--এ'রা বর্ণচোরা আম, এদের চেনা ভার, না পারেন হেন কর্মই নাই। পেশাদার চোটাখোর বেনে ও ব্যাভার বেনে বড় মানুষের ছলনারুপ নদীতে বেঁউতি জাল পাতা থাকে, দালাল বিশ্বাসের কলসী ধরে গা ভাসান দে জল তাড়া দেন, সুতরাং মনের মতন কোটাল হলে চুনোপুঁটিও এড়ায় না।
- পৃষ্ঠা ১৮
- অনেকে চড়ক, বাণফোঁড়া, তরোয়াল ফোঁড়া দেখতে ভালবাসেন; প্রতিমা বিসর্জনের দিন পৌত্তুর, ছোট ছেলে ও কোলের মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে ভাসান দেখতে বেরোন। অনেকে বুড়ো মিন্সে হয়েও হীরে বসানো টুপি, বুকে জরির কারচোপের কর্ম করা কাবা ও গলায় মুক্তোর মালা, হীরের কণ্ঠী, দু-হাতে দশটা আংটি পরে 'খোকা' সেজে বেরুতে লজ্জিত হন না; হয়তো তার প্রথম পক্ষের ছেলের বয়স বাট বৎসর--ভাগ্নের চুল পেকে গ্যাছে।
- পৃষ্ঠা ১৯
- জাহাজ থেকে নতুন সেলার নামলেই যেমন পাইকেরে ছেঁকে ধরে সেই রকম পাড়া্গেয়ে বড় মানুষ শহরে এলেই প্রথমে দালাল পেশ হন। দালাল, বাবুর সদর মোক্তারের অনুগ্রহে বাড়ি ভাড়া করা, গাড়ি যোগাড় করা, খ্যাম্টা নাচের বায়না করা প্রভৃতি রকমওয়ারি কাজের ভার পান ও পলিটিকেল এজেন্টের কাজ করেন। সাতপুকুরের বাগান, এসিয়াটিক সোসাইটির মিউজিয়ম-বালির ব্রিজ, -বাগবাজারের খালের কলের দরজা-রকমওয়ারি বাবুর সাজানো বৈঠকথানা, ও দুই এক নামজাদা বেশ্যার বাড়ি নিয়ে বেড়ান। ঝোপ বুঝে কোপ ফেল্তে পার্লে দালালের বাবুর কাছে বিলক্ষণ প্রতিপত্তি হয়ে পড়ে। কিছুকাল বড় আমোদে যায়, শেষে বাবু টাকার টানাটানিতে বা কর্মান্তরে দেশে গেলে দালাল এজেন্টি কর্মে মকরর হন।
- পৃষ্ঠা ২০
- আজকাল শহরের ইংরাজি কেতার বাবুরা দুটি দল হয়েছেন, প্রথম দল 'উঁচুকেতা সাহেবের গোবরের বস্ট্'। দ্বিতীয় 'ফিরিঙ্গীর জঘন্য প্রতিরুপ'।
- পৃষ্ঠা ২০
- ক্রমে রাস্তায় লোকারণ্য হয়েচে। চৌমাথার বেনের দোকান লোকে পুরে গ্যাছে। নানা রকম রকম বেশ-কারুর কফ্ ও কলারওয়ালা কামিজ, রুপোর বগলস আঁটা শাইনিং লেদর, কারো ইন্ডিয়া রবার আর চায়না কোট, হাতে ইষ্টিক, ক্রেপের চাদর, চুলের গার্ড চেন গলায়, আলবার্ট ফ্যাসানে চুল ফেরানো। কলিকাতা শহর রত্নাকরবিশেষ, না মেলে এমন জানোয়ারই নাই; রাস্তার দু-পাশে অনেক আমোদ গেঁড়ে মহাশয়ের দাঁড়িয়েচেন; ছোট আদালতের উকিল, সেক্সন রাইটর, টাকাওয়ালা গন্ধবেনে, তেলী, ঢাকাই কামার আর ফলারে যজ্মেনে বামুনই অধিক--কারু কোলে দুটি মেয়ে, কারু তিনটে ছেলে।
- পৃষ্ঠা ২১
- কলকেতা শহরের আমোদ শিগগির ফুরায় না, বারোইয়ারি পুজোর প্রতিমা পুজো শেষ হলেও বারো দিন ফ্যালা হয় না। চড়কও বাসী, পচা, গলা ও ধসা হয়ে থাকে-সে সব বল্তে গেলে পুঁথি বেড়ে যায় ও ক্রমে তেতো হয়ে পড়ে, সুতরাং টাটকা চড়ক টাটকাই শেষ করা গেল।
- পৃষ্ঠা ২৫
কলিকাতার বারোইয়ারি পূজা
[সম্পাদনা]- সৌখীন চড়কপার্বণ শেষ হল বলেই যেন দুঃখে সজনে খাড়া ফেটে গেলেন। রাস্তার ধুলো ও কাঁকরেরা অস্থির হয়ে বেড়াতে লাগলো। ঢাকীরা ঢাক ফেলে জুতো গড়তে আরম্ভ কল্লে। বাজারে দুধ সস্তা হল (এত দিন গয়লাদের জল মেশাবার অবকাশ ছিল না), গন্ধবেনে ভালুকের রোঁ বেচতে বসে গেলেন। ছুতোরেরা গুলদার ঢাকাই উড়ুনিতে কাঠের কুচো বাঁদ্তে আরম্ভ কল্লে। জন্মফলারে যজমেনে বামুনেরা আদ্যশ্রাদ্ধ, বাৎসরিক সপিন্ডীকরণ টাঁকতে লাগলেন-তাই দেখে গরমি আর থাক্তে পাল্লেন না, 'ঘরে আগুন' জলে ডোবা ও ওলাউঠো প্রভৃতি নানা রকম বেশ ধরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়্লেন।
- পৃষ্ঠা ২৬
- কলকেতার কেরাঞ্চি গাড়ি বেতো রোগীর পক্ষে বড় উপকারক, গ্যালব্যানিক শকের কাজ করে।
- পৃষ্ঠা ২৭
- দশটা বেজে গ্যাচে। ছেলেরা বই হাতে করে রাস্তায় হো হো কত্তে কত্তে স্কুলে চলেচে। মৌতাতী বুড়োরা তেল মেখে গামছা কাঁদে করে আফিমের দোকান ও গুলির আড্ডায় জম্চেন। হেটো ব্যাপারীরে বাজারে ব্যাচা কেনা শেষ করে খালি বাজরা নিয়ে ফিরে যাচ্চে। কলকেতা শহর বড়ই গুল্জার-গাড়ির হর্রা, সহিসের পয়িস পয়িস শব্দ, কেঁদো কেঁদো ওয়েলার ও নরম্যান্ডির টাপেতে রাস্তা কেঁপে উঠ্চে--বিনা ব্যাঘাতে রাস্তায় চলা বড় সোজা কথা নয়।
- পৃষ্ঠা ২৭
- হুজুর দেড় হাত উঁচু গদির উপরে তাকিয়ে ঠেস্ দিয়ে বসে আছেন, গা আদুড় ! সাম্নে মুন্শী মশায় চশমা চোকে দিয়ে পেশ্কারের সঙ্গে পরামর্শ কচ্ছেন- সামনে কতকগুলো খোলা খাতা ও একঝুড়ি চোতা কাগজ, আর এক দিকে চার-পাঁচজন ব্রাক্ষণ পণ্ডিত বাবুকে 'ক্ষণজন্মা' 'যোগভ্রষ্ট' বলে তুষ্ট করবার অবসর খুঁজছেন। গদির বিশ হাত অন্তরে দুজন বেকার 'উমেদার' ও একজন বৃদ্ধ 'কন্যাদায়' কাঁদ কাঁদ মুখ করে ঠিক 'বেকার' ও 'কন্যাদায়' হালতের পরিচয় দিচ্চেন। মোসাহেবরা খালি গায়ে ঘুরঘুর কচ্চেন, কেউ হুজুরের কানে কানে দু-চার কথা কচ্চেন--হুজুর ময়ূরহীন কার্তিকের মত আড়ষ্ট হয়ে বসে রয়েছেন।
- পৃষ্ঠা ৩১
- কানাইবাবু বারোইয়ারি বই নিয়ে না খেয়ে বেলা দুটো অবধি নানা স্থানে ঘুরলেন, কোথাও কিছু পেলেন, কোথাও মস্ত টাকা সই মাত্র হল। (আদায় হবে না, তার ভয় নাই), কোথাও গলা ধাক্কা, তামাসা ও ঠোনাটা ঠানাটাও সইতে হল।
- পৃষ্ঠা ৩২
- আর একবার একদল বারোইয়ারি পুজোর অধ্যক্ষ শহরের সিঙ্গি বাবুদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত, সিঙ্গিবাবু সে সময় আপিসে বেরুচ্ছিলেন, অধ্যক্ষরা চার পাঁচজনে তাকে ঘিরে ধরেচি ধরেছি বলে চেঁচাতে লাগলেন। রাস্তায় লোক জমে গেল। সিঙ্গিবাবু অবাক্-ব্যাপারখানা কি? তখন একজন অধ্যক্ষ বললেন, “মহাশয়! আমাদের অমুক জায়গার বারোইয়ারি পুজোয় মা ভগবতী সিঙ্িগর উপর চড়ে কৈলাস থেকে আস্ছিলেন, পথে সিঙ্গির পা ভেঙে গ্যাছে; সুতরাং তিনি আর আস্তে পাচ্ছেন না, সেইখানেই রয়েছেন; আমাদের স্বপ্ন দিয়েচেন যে, যদি আর কোন সিঙ্গির যোগাড় করতে পার, তা হলেই আমি যেতে পারি। কিন্তু মহাশয়! আমরা আজ এক মাস নানা স্থানে ঘুরে বেড়াচ্চি, কোথাও আর সিঙ্গির দেখা পেলাম না; আজ ভাগ্যক্রমে আপনার দেখা পেয়েচি, কোন মতে ছেড়ে দেবো না--চলুন! যাতে মার আসা হয়, তারই তদবির কর্বেন। সিঙ্গিবাবু অধ্যক্ষদের কথা শুনে সন্তুষ্ট হয়ে বারোইয়ারি চাঁদায় বিলক্ষণ দশ টাকা সাহায্য করেন।
- পৃষ্ঠা ৩৩
- একবার শান্তিপুরওয়ালারা পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে এক বারোইয়ারি পুজো করেন; সাত বৎসর ধরে তার উজ্জুগ হয়, প্রতিমেখানি যাট হাত উঁচু হয়েছিল, শেষে বিসর্জনের দিনে প্রত্যেক পুতুল কেটে কেটে বিসর্জন কত্তে হয়। তাতেই গুপ্তিপাড়াওয়ালারা 'মার' অপঘাত মৃত্যু উপলক্ষে গণেশের গলায় কাচা বেঁদে এক বারোইয়ারি পুজো ফরেন, তাতেও বিস্তর টাকা ব্যায় হয়।
- পৃষ্ঠা ৩৫
- সঙেদের মুখের ছাঁচ ও পোশাক সকলেরই একরকম, কেবল ভীম্ম দুদের মত সাদা, অর্জুন ডেমার্টিনের মত কালো ও দুর্যোধন গ্রীন!
- পৃষ্ঠা ৪০
- শহরের অনেক বাবু গাড়ি চড়ে সং দেখ্তে এসেচেন--সং ফেলে অনেকে তাঁদের দেখ্চে।
- পৃষ্ঠা ৪২
- মাতালের বড় ইতরবিশেষ নাই; মাতাল হলে কি রাজা বাহাদুর, কি প্যালার বাপ গোবরা প্রায় এক মূর্তিই ধরে থাকেন
- পৃষ্ঠা ৪৬
- একবার শহরের শ্যামবাজার অঞ্চলের এক বনেদী বড়মানুষের বাড়িতে বিদ্যাসুন্দর যাত্রা হচ্ছিল, বাড়ির মেজো বাবু পাঁচো ইয়ার নিয়ে যাত্রা শুনতে বসেচেন ; সামনে মালিনী ও বিদ্যে 'মদন আগুন জল্চে দ্বিগুণ কল্লে কিগুণ এ বিদেশী' গান করে মুটো মুটো প্যাল পাচ্চে--বছর ষোল বয়সের দুটো (স্টকব্রেড) ছোকরা সখী সেজে ঘুরে ঘুরে খ্যাম্টা নাচ্চে। মজলিসে কপোর গ্ল্যাসে ব্রাণ্ডি চল্চে--বাড়ির টিক্টিকি ও শালগ্রাম ঠাকুর পর্যন্ত নেশায় চুরচুরে ও ভোঁ! ক্রমে মিলনের মন্ত্রণা, বিদ্যার গর্ভ, রানীর তিরস্কার, চোর ধরা ও মালিনীর যন্ত্রণার পালা এসে পড়লো; কোটাল মালিনীকে বেঁধে মাত্তে আরম্ভ কল্লে--মালিনী বাবুদের 'দোহাই' দিয়ে কেঁদে বাড়ি সরগরম করে তুললে-বাবুর চটকা ভেঙে গেল-- দেখলেন কোটাল মালিনীকে মাচ্চে, মালিনী বাবুর দোহাই দিচ্চে অথচ পার পাচ্চে না। এতে বাবু বড় রাগত হলেন 'কোন্ বেটার সাধ্যি আমার কাছ থেকে মালিনীকে নিয়ে যায়' এই বলে সাম্নের রূপোর গেলাসটি কোটালের রগ ত্যেগে ছুঁড়ে মাল্লেন- গেলাসটি কোটালের রগে লাগবামাত্র কোটাল 'বাপ'! বলে অমনি ঘুরে পড়লো; চারিদিক থেকে লোকেরা হাঁ! হাঁ! করে এসে কোটালকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গেল--মুকে জলের ছিটে মারা হল ও অন্ত অন্ত নানা তদবির হল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না-কোটালের পো এক ঘাতেই পঞ্চত্ব পেলেন।
- পৃষ্ঠা ৪৬-৪৭
হুজুক
[সম্পাদনা]- সাধারণে কথায় বলেন, 'হুনরেচীন' ও 'হুজ্জতে বাঙ্গাল' কিন্তু হুতোম বলেন 'হুজুকে কল্কেতা'। হেতা নিত্য নতুন হুজুক, সকলগুলিই সৃষ্টিছাড়া ও আজগুব!
- পৃষ্ঠা ৬৬
ছেলেধরা
[সম্পাদনা]- আমরা ভূমিষ্ঠ হয়েই শুনলেম, শহরে ছেলেধরার বড় প্রাদুর্ভাব! কাবুলি মেওয়াওয়ালারা ঘুরে ঘুরে ছেলে ধরে কাবুলে নিয়ে যায়। সেথায় নানাবিধ মেওয়া ফলের বিস্তর বাগান আছে, ছেলেটাকে তারি একটা বাগানের ভিতর ছেড়ে দেয়, সে অনবরত পেটপুরে মেওয়া খেয়ে খেয়ে যখন একেবারে ফুলে উঠে--রং দুধে আল্তার মত হয়, এমন কি টুস্কি মাল্লে রক্ত বেরোয়, তখন এক কড়া ঘি চড়িয়ে ছেলেটাকে ঐ কড়ার উপর, উপরপানে পা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়; ক্রমে কড়ার ঘি টগবগিয়ে ফুটে উঠলে ছেলের মুখ দিয়ে রক্ত বেরুতে আরম্ভ হয় ও সেই রক্ত টোসা টোসা ঘিয়ের কড়ার উপর পড়ে; ক্রমে ছেলের সমুদায় রক্ত বেরিয়ে এলে নানাবিধ মেওয়া ও মিছরির ফোড়ন দিয়ে কড়াখানি নাবান হয়। নবাব ও বড় বড় মোসলমানরা তাই খান! আমরা এই ভয়ানক কথা শুনে অবধি এক্লা বাড়ির বাহিরে প্রাণান্তেও যেতাম না, ও সেই অবধি নেড়েরের উপর বিজাতীয় ঘৃণা জন্মে গেল।
- পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭
প্রতাপচাঁদ
[সম্পাদনা]- ... প্রভাপচাঁদ জাল সাব্যস্ত হয়ে বরানগরে বাস কল্লেন। সেথায় বুজরুক হন-খান্কী, ঘুস্কি ও গেরস্ত মেয়েদের ম্যালা লেগে গেল, প্রতাপচাঁদ না পারেন হ্যান কর্মই নাই। ক্রমে চল্তি বাজনার মত প্রতাপচাঁদের কথা আর শোনা যায় না; প্রতাপচাঁদ পুরানো হল, আমরাও পাঠশালে ভর্তি হলেম।
- পৃষ্ঠা ৬৮
মহাপুরুষ
[সম্পাদনা]- পাঠক! পাঠশালা যমালয় হতেও ভয়ানক--পন্ডিত ও মাস্টার যেন বাগ বিবেচনা হচ্চে!
- পৃষ্ঠা ৬৮
- হায়! বাল্যকালের সে সুসময় মরণকালেও স্মরণ থাক্বে--অপরিচিত সংসার হৃদয় কমলকুসুম হতেও কোমল বোধ হত, সকলেই বিশ্বাস ছিল; ভূত পেত্নী ও পরমেশ্বরের নামে শরীর রোমাঞ্চ হত-হৃদয় অনুতাপ ও শোকের নামও জান্ত না--অমর বর পেলেও সেই সুকুমার অবস্থা অতিক্রম কত্তে ইচ্ছা হয় না।
- পৃষ্ঠা ৬৯
লালা রাজাদের বাড়ী দাঙ্গা
[সম্পাদনা]- শেষে সঠিক শোনা গেল যে, একজন দরওয়ানকে একজন ফিরিঙ্গী শিকারী বাক্বিতণ্ডায় ঝকড়া করে গুলি করে।
- পৃষ্ঠা ৭২
ক্রিশ্চানি হুজুক
[সম্পাদনা]- পাক্পাড়ার রাজাদের হাঙ্গামা চুকতে চুকতে হুজুক উঠলো, 'রণজিৎসিংহের পুত্র দলিপ য়িসুমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েচেন; তাঁর সঙ্গে সমুদায় শিখেরা ক্রিশ্চান হয়েচেন ও ভাটপাড়ার জনকতক ঠাকুরও কৃশ্চান হবেন!' ভাটপাড়ার গুরুগুষ্টিরে প্রকৃত হিন্দু; তাঁরা কৃশ্চান হবেন শুনে, অনেকে চমকে উঠলেন, শেষে ভাটপাড়ার বদলে পাতুরেঘাটার শ্রীযুক্তবাবু প্রসন্নকুমার ঠাকুরের পুত্র বাবু জ্ঞানেন্দ্রমোহন বেরিয়ে পড়লেন। সমধৰ্ম্মা কৃষ্ণমোহন কন্যা উচ্ছুগ্গু করে দিলেন, এয়োরও অভাব রইলো না। সহরে যখন যে পড়ত পড়ে, শীগগির তার শেষ হয় না; সেই হিড়িকে একজন স্কুলমাষ্টার, কালীঘেটে হালদার, একজন বেণে ও কায়স্থ কৃশান দলে বাড়লো–দু-চার জন বড় বড় ঘরের মেয়েমানুষও অন্ধকার থেকে আলোয় এলেন। শেষে অনেকের চালফুঁড়ে আলো বেরতে লাগলো, কেউ বিষয়ে বঞ্চিত হলে, কেউ কেউ অনুতাপ ও দুরবস্থার সেবা কত্তে লাগলেন। কৃশ্চানি হুজুক রাস্তার চল্তি লণ্ঠনের মত প্রথমে আসপাশ আলো করে শেষে অন্ধকার করে চলে গেল। আমরাও ক্রমে বড় হয়ে উঠলেম–স্কুল আর ভাল লাগে না!
- পৃষ্ঠা ৭২
মিউটিনি
[সম্পাদনা]- বাঙালীরে ক্রমে বেগতিক দেখে গোপাল মল্লিকের বাড়িতে সভা করে সাহেবদের বুঝিয়ে দিলেন যে 'যদিও একশ বছর হয়ে গেল, তবু তারা আজও সেই হতভাগা ম্যাড়া বাঙালীই আচেন--বহুদিন ব্রিটিশ সহবাসে, ব্রিটিশ শিক্ষায় ও ব্রিটিশ ব্যবহারেও আমেরিকানদের মত হতে পারেননি। (পার্বেন কি না তারও বড় সন্দেহ!)
- পৃষ্ঠা ৭৪
- বাঙালীরা ঝোপ বুঝে কোপ ফেল্তে বড় পটু; খাঁটি হিন্দু (অনেকেই দিনের বেলায় খাঁটি হিন্দু) দলে রটিয়ে দিলে যে, “বিধবা-বিবাহের আইন পাশ ও বিধবা-বিবাহ হওয়াতেই সিপাইরা ক্ষেপেচে। গভর্নমেন্ট বিধবাবিবাহের আইন তুলে দিয়েচেন-বিদ্যেসাগরের কর্ম গিয়েচে-প্রথম বিধবাবিবাহ বর শিরীশের ফাঁসি হবে।
কোথাও হুজুক উঠলো, “দলিপ সিংকে ক্রিশ্চান করাতে, নাগপুরের রানীদের স্ত্রীধন কেড়ে নেওয়াতে ও লখনৌয়ের বাদশাই যাওয়াতেই মিউটিনি হল!”- পৃষ্ঠা ৭৫
মরাফেরা
[সম্পাদনা]- হায়! অল্প বয়সে এক একবার অবিবেচনার দাস হয়ে আমরা যে সকল পাগলামো করেচি, এখন সেইগুলি স্মরণ হলে কান্না ও হাসি পায়; আবার এখন যে পাগলামি প্রকাশ কচ্চি, এর জন্যে বুদ্ধ বয়সে অনুতাপ তোলা রইলো; মৃত্যু-শয্যার পাশে যবে এইগুলির ভয়ানক ছবি দ্যাখা যাবে, ভয়ে ও লজ্জায় শরীর দাহ কত্তে থাকবে, তখন সেই অনন্যআশ্রয় পরমেশ্বর ভিন্ন আর জুড়াবার স্থান পাওয়া যাবে না! বাপ-মার কাছে মার খেয়ে ছেলেরা যেমন তাদেরই নাম করে 'বাবা গো-মা গো' বলে কাঁদে, আমরাও তেমনি সেই ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন নিবদ্ধন বিপদে পড়ে তাঁর নাম ধরেই, পাঠক! তোমায় ভেংচুতে ভেংচুতে ও কলা দ্যাখাতে দ্যাখাতে তরে যাব!
- পৃষ্ঠা ৭৭
- ১৫ই কার্তিক মড়া ফিরবে কথা ছিল, আজ ১৫ই কার্তিক। অনেকে মড়ার অপেক্ষায় নিম্তলা ও কাশী মিত্রের ঘাটে বসে রইলেন। ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে গেল, রাত্তির দশটা বাজে, মড়া ফিরুলো না; অনেকে মড়ার অপেক্ষায় থেকে মড়ার মত হয়ে রাত্তিরে ফিরে এলেন; মড়া ফেরার হুজুক থেমে গেল!
- পৃষ্ঠা ৭৮
আমাদের জ্ঞাতি ও নিন্দুকেরা
[সম্পাদনা]- ... আমরা প্রার্থনা করি, নিন্দুকরা কিছুকাল বেঁচে থাকুন, তা হলেই অনেকে তাদের চিনে নেবেন ও বক্তারা যেমন বকে বকে শেষে ক্লান্ত হয়ে আপনিই থামেন, তেমনি এ'রা আপনা আপনি থাম্বেন; তবে অনেকের এই পেশা বলেই যা হোক্--পেশাদারের কথা নাই!
- পৃষ্ঠা ৭৯
নানা সাহেব
[সম্পাদনা]- মরা ফেরা হুজুক থামলে, কিছু দিন নানা সাহেব দশ বারো বার মরে গেলেন, ধরা পড়লেন, আবার রক্তবীজের মত বাঁচলেন। সাতপেয়ে গরু–দরিয়াই ঘোড়া–লক্ষ্ণৌয়ের বাদ্সা—শিবকেষ্টো বাঁড়ু্য্যে–ওয়েলস সাহেব–নীলবানুরে লঙ্কাকাণ্ডে-লং এর মেয়াদ–কুমীর, হাঙ্গর ও নেকড়ে বাঘের উৎপাতের মত ইংলিশম্যান ও হরকরা নামক দুখানি নীল কাগজের উৎপাত—ব্রাহ্মধর্ম্মপ্রচারক রামমোহন রায়ের স্ত্রীর শ্রাদ্ধে দলাদলির ঘোঁট ও শেষে হঠাৎ অবতারের হুজুক বেড়ে উঠলো।
- পৃষ্ঠা ৮০
সাতপেয়ে গোরু
[সম্পাদনা]- সাতপেয়ে গরু বাজারে ঘর ভাড়া কল্লেন, দর্শনী দু পয়সা রেট হলো; গরু রাখবার জন্য অনেক গরু একত্র হলেন। বাকি গরুদের ঘণ্টা বাজিয়ে ডাকা হতে লাগলো, কিছুদিনের মধ্যে সাতপেয়ে গরু বিলক্ষণ দশ টাকা রোজগার করে দেশে গেলেন!
- পৃষ্ঠা ৮০
দরিয়াই ঘোড়া
[সম্পাদনা]- দরিয়াই ঘোড়াও ঐ রকম রোজগার কত্তে লাগলেন; বেশীর মধ্যে বিক্রী হবার জন্যে দু-চার মাথালো মাখালো থামওলা সেপাইপাহারা ও গোরা কোচম্যান (যেখানে অন্দর মহলেও ঘোড়ার সর্ব্বদা সমাগম) ওয়ালা বাড়ীতে গমনাগমন কল্লেন। কে নেবে? লাখ টাকা দর! আমাদের সহরের কোন কোন বড়মানুষের যে ত্রিশ চল্লিশ লাখ টাকা দর, পিঁজরেয় পূরে চিড়িয়াখানায় রাখবারও তাঁরা বিলক্ষণ উপযুক্ত; কিন্তু কৈ? নেবার লোক নাই! এখন কি আর সৌখীন আছে? বাঙ্গালাদেশে চিড়িয়াখানার মধ্যে বর্দ্ধমানের তুল্য চিড়িয়াখানা আর কোথাও নাই—সেথায় তত্ত্ব, রত্ন, লস্কার, উল্লুক, ভাল্লুক, প্রভৃতি নানা রকম আজগুবি কেতার জানোয়ার আছে, এমন কি, এক আধ্টির জোড়া নাই।
- পৃষ্ঠা ৮০-৮১
লখ্নৌয়ের বাদ্শা
[সম্পাদনা]- দরিয়াই ঘোড়া কিছু দিন শহরে থেকে শেষে খেতে না পেয়ে দরিয়ায় পালিয়ে গেলেন। লখনৌয়ের বাদ্শা দরিয়াই ঘোড়ার জায়গায় বসলেন....
- পৃষ্ঠা ৮১
শিবকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়
[সম্পাদনা]- হুজুক রঙ্গে শিবকেষ্ট বাঁড়ুয্যে দেখা দিলেন। বাবু দিন কত বড় বেড়েছিলেন; আজ একে চাবুক মারেন, পাঠান ঠেকিয়ে জুতো মারেন, আজ মেডুয়াবাদী খোট্টা ঠকান, কাল টুপিওয়ালা সাহেব ঠকান-শেষ আপনি ঠকলেন! জালে জড়িয়ে পড়ে বাঙ্গালীর কুলে কালি দিয়ে, চোদ্দবছরের জন্য জিঞ্জির গেলেন। কোন কোন সায়েব পয়সার জন্য না করেন হেন কর্ম্মই নাই; সিটি শিবকেষ্টবাবুর কল্যাণে বেরিয়ে পড়লো–একজন 'এম, ডি, এফ, আর, সি, এস' প্রভৃতি বত্রিশ অক্ষরের খেতাবওয়ালা ডাক্তার ঐ দলে ছিলেন।
- পৃষ্ঠা ৮২
ছুঁচোর ছেলে বুঁচো
[সম্পাদনা]- ...আমাদের কল্কেতা শহরের অনেক বড়মানুষ যে ভাইয়ের স্ত্রীকে ডাক্তার দিয়ে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেও গায়ে ফুঁ দিয়ে গাড়ি ঘোড়া চড়ে ব্যাড়াচ্চেন, কৈ আইন তার কাছে কল্কে পায় না কেন? শিবকেষ্টো যেমন জাল করেছিলেন, বোধ হয় শহরের অনেক বড়মানুষের ঘরে ও রকম কত পার পেয়ে গ্যাচে ও নিত্যি কত হচ্চে-শহরের একটি কাশ্মীরী মুখখু বড়মানুষ আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, 'শহরে আমার মত অনেক ব্যাটাই আছে, কেবল আমিই ধরা পড়েচি।' শিবকেষ্টোর বিষয়েও ঠিক তাই।
- পৃষ্ঠা ৮২
জস্টিস ওয়েল্স্
[সম্পাদনা]- বাঙালীদের যে কথঞ্চিৎ সাহস জন্মেচে এই সভাতে তার কিছু প্রমাণ পাওয়া গেল।
- পৃষ্ঠা ৮৪
টেকচাঁদের পিসী
[সম্পাদনা]- টেকচাঁদ ঠাকুরের টেঁপী পিসী ওয়েল্সের মুখরোগের তরে মিটিং করা হয়েছে শুনে বল্লেন, 'ও মা, আজ কাল সবই ইংরিজি কেতা! আমরা হলে মুড়োমুড়ি নারকেলমুড়ি ও ঠন্ঠনের নিম্কীতে দোরস্ত কত্তেম!' নারকেলমুড়ি বড় উত্তম, ওষুধ, হলওয়ের বাবা! আমাদের সহরের অনেক বড়মানুষ ও দুই এক জেলার ধিরাজ মহারাজা বাহাদুর নিয়তই রোগভোগ করে থাকেন। দার্জিলিং, সিম্লে, সপাট্, ভাগলপুর ও রাণীগঞ্জে গিয়েও শোধরাতে পারেন না; আমরা তাঁদের অনুরোধ করি, নারিকেলমুড়ি ও ঠনঠনের নিম্কীটাও ট্রাই করুন! ইমিডিয়েট রিলিফ্!!!
- পৃষ্ঠা ৮৪
পাদ্রি লং ও নীলদর্পণ
[সম্পাদনা]- প্রজার দুরবস্থা শুনতে ইণ্ডিগো-কমিশন বসলো, ভারতবর্ষীয় খুড়ীর চমকা ভেঙ্গে গেল। (খুড়ী একটু আফিম খান।) বাঙ্গালীর হয়ে ভারতবর্ষীয় খুড়ীর একজন খুড়ো কমিশনর হলেন। কমিশনে কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়লো। সেই সাপের বিষে নীলদর্পণ জন্মালো; তার দারুণ নীলকর-দল হন্নে হয়ে উঠলেন—ছাইগাদা, কচুবন, ও ফ্যানগোঁজলা ছেড়ে দিয়ে ঠাকুরঘরে, গিরজেয়, প্যালেসে ও প্রেসে তাগ কল্লেন! শেষে ঐ দলের একটা বড় হাঙ্গেরিয়ান হাউণ্ড পাদ্রী লং সাহেবকে কামড়ে দিলে!
- পৃষ্ঠা ৮৫
রমাপ্রসাদ রায়
[সম্পাদনা]- যতদিন এই মহাপুরুষদের প্রাদুর্ভাব থাকবে, তত দিন বাঙালীর ভদ্রস্থতা নাই; গোঁসাইরা হাড়ী, মুচি ও মুদ্দফরাস নিয়ে বেচে আছেন, এই মহাপুরুষরা গোটা কত হতভাগা গোমুর্খ কায়স্থ ব্রাহ্মণ দলপতির জোরে আজও টিকে আছেন; এঁরা এক একজন হারামজাদকি ও বজ্জাতির প্রতিমূর্তি, এদিকে এমনি সজ্জাগজ্জা করে বেড়ান যে হঠাৎ কার সাধ্য অস্তরে প্রবেশ করে, হঠাৎ দেখলে বোধ হয় অতি নিরীহ ভদ্রলোক! বাস্তবিক, সে কেবল ভড়ং ও ভণ্ডামো।
- পৃষ্ঠা ৯৩
রসরাজ ও যেমন কর্ম তেমনি ফল
[সম্পাদনা]- আমরা যখন ইস্কুলে পড়তুম, তখন শহরের এক বড়মানুষ সোনার বেনেদের বাড়ির শম্ভুবাবু বলে একজন আমাদের ক্লাসফ্রেন্ড ছিলেন। এক দিন তিনি কথায় কথায় বললেন যে 'কাল ড়াত্রে আমি ভাই আমার স্ত্রীকে বর ঠাট্টা কড়েচি, সে আমায় বললে, তুমি হনুমান্। আমি অমনি ফস্ কডে বললুম তোড শ্বশুড় হনুমান্।'
- পৃষ্ঠা ৯৪
বুজরুকি
[সম্পাদনা]- যখন হিন্দুধর্ম প্রবল ছিল, লোকে দ্রব্যগুণ, কিমিয়া, ভূতত্ব জানতো না, তখনই এই সকলের মান্য ছিল! আজকাল ইংরেজি লেখা-পড়ার কল্যাণে সে গুড়ে বালি পড়েছে। কিন্তু কলকেতা সহরে না দেখা যায়, এমন জিনিষই নাই; সুতরাং কখন কখন 'সোনা করা' 'ছেলে করা' 'নিরাহার' 'ভূতনাবানো' 'চণ্ডসিদ্ধ' প্রভৃতি পেটের দায়ে এসে পড়েন, অনেক জায়গায় বুজরুক দ্যাখান, শেষ কোথাও না কোথাও ধরা পড়ে বিলক্ষণ শিক্ষা পেয়ে যান।
- পৃষ্ঠা ৯৬
হোসেন খাঁ
[সম্পাদনা]- জুচ্চুরি চিরকাল চলে না। 'দশ দিন চোরের, এক দিন সেখের' ক্রমে দুই এক জায়গায় হোসেন খা ধরা পড়তে লাগলেন- কোথাও ঠোনাটা ঠানাটা, কোথাও কানমলা, শেষে প্রহার পর্যন্ত বাকি রইল না। যারা তাকে পুর্বে দেবতানিধিশেষে আদর করেছিলেন, তারাও দু-এক ঘা দিতে বাকি রাখলেন না; কিছু দিনের মধ্যেই জিনি-সিদ্ধ হোসেন খাঁ পৌত্তলিকের শ্রাঙ্ধের দাগা ষাড়ের অবস্থায় পড়লেন; যারা আদর করে নিয়ে যান, তারাই দাগী করে বার করে দ্যান, শেষে সরকারী অতিথিশালা আশ্রয় কল্লেন--হোসেন খাঁ জেলে গেলেন! জিনি পাতাল আশ্রয় কল্লেন।
- পৃষ্ঠা ৯৭
ভূত নাবানো
[সম্পাদনা]- ভূতচালার ভূতের ডাক্তারি পর্যন্ত করা আছে। আজকাল দু-এক বাঙালী ডাক্তার মধ্যে মধ্যে পেশেন্টের বাড়ি ভূত সেজে দ্যাখা ছ্যান--চাদরের বদলে দড়ি ও পেরেক সহিত মশারি গায়ে কখনো বা উলঙ্গ হয়েও আসেন, কেবল মন্ত্রের বদলে চার-পাচজন রোজায় ধরাধরি করে আন্তে হয়। এ'রা কল্কেতা মেডিকেল কালেজের এজুকেটেড ভূত।
- পৃষ্ঠা ৯৮
নাককাটা বঙ্ক
[সম্পাদনা]- সংসারের গতিই এই, এক বার অনর্থের একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র বেরুলে ক্রমে বহুলী হয়ে পড়ে...
- পৃষ্ঠা ১০৫
বাবু পরমেশ্বর দত্ত ওরফে হঠাৎ অবতার
[সম্পাদনা]- হঠাৎ টাকা হলে মেজাজ যে রকম গরম হয় এক দম গাঁজাতেও তত হয় না...
- পৃষ্ঠা ১১২
- হায়! যাদের জন্মগ্রহণে বঙ্গভূমির দুরবস্থা দুর হবার প্রত্যাশা করা যায়, যারা প্রভূত ধনের অধিপতি হয়ে স্বজাতি, সমাজ ও বঙ্গভূমির মঙ্গলের জন্যে কায়মনে যত্ন নেবে, না সেই মহাপুরুষরাই সমস্ত ভয়ানক দোষ ও মহাপাপের আকর হয়ে বসে রইলেন, এর বাড়া আর আক্ষেপের বিষয় কি আছে!
- পৃষ্ঠা ১১৪
মাহেশের স্নানযাত্রা
[সম্পাদনা]- স্নানযাত্রাটি পরবের টেক্কা, তাতে আমোদের চুড়ান্ত হয়ে থাকে...
- পৃষ্ঠা ১২২
- পুর্বে স্নানযাত্রার বড় ধুম ছিল--বড় বড় বাবুরা পিনেস, কলের জাহাজ, বোট ও বজরা ভাড়া করে মাহেশে যেতেন, গঙ্গায় বাচখেলা হত, স্নানযাত্রার পর রাত্তির ধরে খ্যাম্টা ও বাইয়ের হাট লেগে যেতো! কিন্ত এখন আর সে আমোদ নাই--সে রামও নাই, সে অযোধ্যাও নাই--কেবল ছুতোর, কাসারি, কামার ও গন্ধবেনে মশাইরাই যা রেখেচেন, মধ্যে মধ্যে দু-চার ঢাকা অঞ্চলের জমিদারও স্নানযাত্রার মান রেখে থাকেন, কোন কোন ছোক্রা গোছের নতুন বাবুরাও স্নানযাত্রার আমোদ করেন বটে।
- পৃষ্ঠা ১২৩
রথ
[সম্পাদনা]- মাহেশে স্নানযাত্রায় যে প্রকার ধুম হয়, রথে তত হয় না বটে, তবু ফ্যালা যায় না!
- পৃষ্ঠা ১৪০
দুর্গোৎসব
[সম্পাদনা]- দুর্গোৎসব বাংলা দেশের পরব, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে এর নাম গন্ধও নাই, বোধ হয়, রাজা কৃষ্ণচন্দরের আমল হতেই বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। পুর্বে রাজারাজড়া ও বনেদী বড় মানুষদের বাড়িতেই কেবল দুর্গোৎসব হত, কিন্তু আজকাল পু'টে তেলীকেও প্রিতিমা আনতে দেখা যায়। পুর্বকার দুর্গোৎসব ও এখনকার দুর্গোৎসবে অনেক ভিন্ন।
- পৃষ্ঠা ১৪১
- পাঠকবর্গ! এ শহরে আজকাল দু-চার এডুকেটেড ইয়ংবেঙ্গলও পৌতলিকতার দাস হয়ে পুজো আচ্চা করে থাকেন--ব্রাহ্মণ ভোজনের বদলে কতকগুলি দিল্দোস্ত মদে ভাতে প্রসাদ পান, আলাপী ফিমেল ফ্রেণ্ডরাও নিমন্ত্রিত হয়ে থাকেন, পুজোরও কিছু রিফাইণ্ড কেতা। কারণ অপর হিন্দুদের বাড়ি নিমন্ত্রিত প্রদত্ত প্রণামী টাকা পুরোহিত ব্রাহ্মণেরই প্রাপ্য, কিন্ত এদের বাড়ি প্রণামীর টাকা বাবুর আ্যকৌউন্টে ব্যাঙ্কে জমা হয়; প্রতিমের সামনে বিলিতি চর্বির বাতি জ্বলে ও পুজোর দালানে জুতো নিয়ে ওঠবার আলাউয়েন্স থাকে। বিলেত থেকে অর্ডার দিয়ে সাজ আনিয়ে প্রতিমে সাজানো হয়--মা দুর্গা মুকুটের পরিবর্তে বনেট্ পরেন, স্যান্ডউইচের শেতল খান, আর কলাবউ গঙ্গাজলের পরিবর্তে কাতলীকরা গরম জলে স্নান করে থাকেন, শেষে সেই প্রসাদী গরম জলে কর্মকর্তার প্রাতরাশের টি ও কফি প্রস্তৃত হয়!
- পৃষ্ঠা ১৪৫-১৪৬
- এদিকে দেখতে দেখতে গুডুম করে নটার তোপ পড়ে গেল; ছেলেরা 'ব্যোমকালী কল্কেত্তাওয়ালী' বলে চেঁচিয়ে উঠলো। বাবুর বাড়ি নাচ, সুতরাং বাবু আর অধিকক্ষণ দালানে বসতে পাল্লেন না, বৈঠকখানায় কাপড় ছাড়তে গেলেন, এদিকে উঠানের সমস্ত গ্যাস জেলে দিয়ে মজলিসের উদ্যোগ হতে লাগলো, ভাগ্নেরা ট্যাস্ল্ দেওয়া টুপি ও পেটি পরে ফপরদালালি কত্তে লাগলেন। এদিকে দুই-একজন নাচের মজলিসি নেমন্তন্নে আসতে লাগলেন। মজলিসে তয়ফা নাবিয়ে দেওয়া হল। বাবু জরি ও কালাবৎ এবং নানাবিধ জড়োয়া গহনায় ভূষিত হয়ে ঠিক একটি 'ঈজিপশন্ মমী' সেজে মজলিসে বার দিলেন--বাই সারঙ্গের সঙ্গে গান করে সভাস্থ সমস্তকে মোহিত কত্তে লাগলেন!
- পৃষ্ঠা ১৪৯
- এই প্রকারে সপ্তমী, অষ্টমী ও সন্ধিপুজো কেটে গেল। আজ নবমী; আজ পুজোর শেষ দিন; এত দিন লোকের মনে যে আহ্লাদটি জোয়ারের জলের মত বাড়তেছিল, আজ সেইটির একেবারে সারভাটা।
- পৃষ্ঠা ১৫০
- ক-দিন মহাসমারোহের পর আজ শহরটা খাঁ খাঁ কত্তে লাগ্ল--পৌত্তলিকের মন বড়ই উদাস হল, কারণ লোকের যখন সুখের দিন থাকে তখন সেটি তত অনুভব করতে পারা যায় না, যত সেই সুখের মহিমা দুঃখের দিনে বোঝা যায়।
- পৃষ্ঠা ১৫২-১৫৩
রামলীলা
[সম্পাদনা]- যে দেশের লোকের যে প্রকার হেম্মৎ থাকে, সে দেশে সে সময় সেই প্রকার কর্মকাণ্ড, আমোদ প্রমোদ ও কার কারবার প্রচলিত হয়। দেশের লোকের মনই সমাজের লোকোমোটিবের মত, ব্যবহার কেবল ওয়েদরককের কাজ করে। দেখুন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা রঙ্গভূমি প্রস্তত করে মল্লযুদ্ধে আমোদ প্রকাশ কত্তেন, নাটক ত্রোটকের অভিনয় দেখতেন, পরিশুদ্ধ সঙ্গীত ও সাহিত্যের উৎসাহ দিতেন; কিন্তু আজকাল আমরা বারোইয়ারিতলায় নয় বাড়িতে, বেদেনীর নাচ ও 'মদন আগুনের' তানে পরিতুষ্ট হচ্চি, ছোট ছোট ছেলে ও মেয়েদের অনুরোধ উপলক্ষ করে পুতুল নাচ, পাঁচালি ও পচা খেঁউড়ে আনন্দ প্রকাশ কচ্চি, যাত্রাওয়ালাদের 'ছকুবাবু' ও 'সুন্দরের' সং নাবাতে হুকুম দিচ্ছি। মল্লযুদ্ধের তামাসা দেখা 'বুলবুল্ ফাইট' ও 'ম্যাড়ার লড়ায়ে' পর্যবসিত হয়েচে। আমাদের পুর্বপুরুষেরা পরস্পর লড়াই করেচেন, আজকাল আমরা সর্বদাই পরস্পরের অসাক্ষাতে নিন্দাবাদ করে থাকি, শেষে এক পক্ষের 'খেঁউড়ে' জিত ধরাই আছে।
- পৃষ্ঠা ১৫৩
- রামলীলা এদেশের পরব্ নয়--এটি প্রলয় খোট্টাই। কিছু কাল পূর্বে চার্নকের সেপাইদের দ্বারা এই রামলীলার সুত্রপাত হয়, পূর্বে তারাই আপনা আপনি চাঁদা করে চার্নকের মাঠে রামরাবণের যুদ্ধের অভিনয় কত্তো; কিছু দিন এ রকমে চলে, মধ্যে একেবারে রহিত হয়ে যায়। শেষে বড়বাজারের দু-চার ধনী খোট্টার উদ্যোগে ১৭৫৭ শকে পুনর্বার 'রামলীলা' আরম্ভ হয়। তদবধি এই বারো বৎসর, রামলীলার মেলা চলে আস্চে। কল্কেতায় আর অন্য কোন মেলা নাই বলেই অনেকে রামলীলায় উপস্থিত হন। এদের মধ্যে নিষ্কর্মা বাবু, মারোয়াড়ী খোট্টা, বেশ্যা ও বেনেই অধিক।
- পৃষ্ঠা ১৫৪
- কল্কেতা শহরের এই একটি আজব গুণ যে মজুর হতে লক্ষপতি পর্যস্ত সকলেরই মনে সমান শখ। বড়লোকরা দানসাগরে যা নির্বাহ করবেন, সামান্য লোককে ভিক্ষা বা চুরি পর্যস্ত স্বীকার করেও কায়ক্লেশে তিলকাঞ্চনে সেটির নকল কত্তে হবে।
- পৃষ্ঠা ১৫৭
- রঙ্গভূমির গেট হতে রামলীলার রণক্ষেত্র পর্যস্ত দু-সারি দোকান বসেচে, মধ্যে মধ্যে নাগরদোলা ঘুচ্চে-গোলাবী খিলি, খেলনা, চনেচুর ও চীনের বাদাম প্রভৃতি ফিরিওয়ালাদের চিৎকার উঠেচে। ইয়ারের দল খাতায় খাতায় প্যারেড করে বেড়াচ্ছে, রাঁড়, খোট্টা, বাজে লোক ও বেনের দলই বারো আনা। রণক্ষেত্রের চার দিকে বেড়ার ধারে চার-পাঁচ থাক্ গাড়ির সার, কোন গাড়ির উপর একজন সৌখীন ইয়ার দু-চার দোস্ত ও দুই একটি মেয়েমানুষ নিয়ে মজা কচ্চেন। কোনখানির ভেতরে চীনে কোট ও চুলের চেনওয়ালা চারজন ইয়ার্ ও একটি মেয়েমানুষ, কোনখানিতে গুটিকত পিল ইয়ার টেক্কা জ্যাঠা ছেলে ইস্কুলের বই বেচে পয়সা সংগ্রহ করে গোলাবী থিলি ও চরসে মজা লুটচে। কতগুলি গাড়ি নিছক খোট্টা মারোয়াড়ী ও মেড়য়াবাদী, কতকগুলি খোসপোশাকী বাবুতে পুর্ণ।
- পৃষ্ঠা ১৫৮-১৫৯
রেলওয়ে
[সম্পাদনা]- যে সকল মহাত্মারা ছেলেবেলা কলকেতার চীনে বাজারে 'কম স্যার! গুড শপ্ স্যার! টেক্ টেক্ নটেক্ নটেক্ একবার তো সি!' বলে সমস্ত দিন চিৎকার করে থাকেন, যে মহাত্মারা সেলর ও গোরাদের গাড়ি ভাড়া করে মদের দোকান, এম্টি হাউস, সাতপুকুর ও দমদমায় নিয়ে বেড়ান ও ক্লায়েণ্টের অবস্থা বুঝে বিনানুমতিতে পকেট হাতড়ান, আরসুলার কাঁচপোকার রূপান্তরের মত তাঁদের মধ্যে অনেকেই চেহারা বদলে “দি এস্টেশন মাস্টার" হয়ে পড়েচেন--যে সকল ভদ্রলোক একবার রেলওয়ে চড়েচেন, যাদের সঙ্গে একবার মাত্র এই মহাপুরুষরা কন্ট্যাক্টে এসেচেন, তারাই এই ভয়ানক কর্মচারীদের সর্বদাই কমপ্লেন করে থাকেন। ভদ্রতা এদের নিকট যেন 'পুলিসম্যানের' ভয়েই এগুতে ভয় করেন, শিষ্টাচার ও সরলতা'র এরা নামও শোনেন নাই, কেবল লাল সাদা গ্রীন সিগন্যাল--এস্টেশন, টিকিট ও অত্যাচারই এদের চিরারাধ্য বস্তু! ও আগেই স্বজাতির অপমান কত বিলক্ষণ অগ্রসর!
- পৃষ্ঠা ১৭৬
তার সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- সর্ব্বাপেক্ষা আমার ঋণ মৃত মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহের নিকট গুরুতর। যেখানে মহাভারত হইতে উদ্ধৃত করিবার প্রয়োজন হইয়াছে, আমি তাঁহার অনুবাদ উদ্ধৃত করিয়াছি।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,‘কৃষ্ণচরিত’ বইয়ের বিজ্ঞাপনে। উৎস: কালীপ্রসন্নর কথা অমৃতসমান
- হুতোম নিজে বজ্জাত হয়ে অন্যের খুঁত ধরছেন। হুতোম জীবনে যা করেছেন সবই খারাপ কাজ। ভালর মধ্যে শুধু ওই মহাভারত।
- চুনীলাল মিত্র, কলিকাতার নুকোচুরি। উৎস: কালীপ্রসন্নর কথা অমৃতসমান
- কালীপ্রসন্ন মাইকেলের প্রকৃত গুণগ্রাহী ছিলেন।
- শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, পৃষ্ঠা ১৫, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ
- কালীপ্রসন্ন বিদ্যাসাগরকে ভক্তি করিতেন; বিদ্যাসাগরও তাহাকে পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিতেন।
- শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, পৃষ্ঠা ১৮, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ
- বাঙ্গালা দেশে কালীপ্রসন্ন সিংহের নাম শুনেন নাই, এমন শিক্ষিত বাঙ্গালী, আশা করি নাই। থাকিলে তাহা বাঙ্গালার ও বাঙ্গালীর কলঙ্কের কথা।
- শ্রীহেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, ভূমিকা, মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ, ফাইন আর্ট প্রিন্টিং সিন্ডিকেট
- কালীপ্রসন্নের বাল্যকালাবধি অতিশয় চতুরতা ছিল। পরিহাস অতিশয় ভালবাসিতেন। যেখানে মারামারি ও তামাসা, সেইখানেই তিনি অগ্রে উপস্থিত হইতেন। তাহার এক জন শিক্ষক বলেন, এক দিবস তিনি অন্য অন্য ছাত্রের সহিত বহির্দৃশ্যমান প্রগাঢ় অভিনিবেশ সহকারে শিক্ষকের উপদেশ শ্রবণ করিতেছেন, এমত সময়ে হঠাৎ পার্শ্বস্থিত এক বালকের মস্তকে চপেটাঘাত করিলেন। শিক্ষকের নিকটে অভিযোগ হইলে কালীপ্রসন্ন কাল্পনিক গম্ভীর ভাবে বলিলেন, "মহাশয়! আমি জাতিতে সিংহ, জাতীয় স্বভাব ত্যাগ করিতে না পারিয়া একে আজ মারিয়াছি।”
- সোমপ্রকাশে প্রকাশিত। উৎস: মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ, পৃষ্ঠা ১০
- একটা জনশ্রুতি আছে যে, কালীপ্রসন্ন অনেক ব্রাঙ্গণ পণ্ডিতের টিকি কাটিয়া দিয়াছিলেন। লোকমুখে এখনও আমরা শুনিতে পাই, টাকা দিয়া কালীপ্রসন্ন ব্রাহ্মণ পন্ডিতদিগকে বশীভূত করিয়া তাহাদিগের টিকি ক্রয় করিতেন, পরে এগুলি কাটিয়া লইয়া আলমারিতে সাজাইয়া রাখিতেন; কাহার টিকি কত মূল্যে ক্রিত, তাহাও এক টুকরা কাগজে লিখিত হইয়া এ টিকির সঙ্গেই সংলগ্ন থাকিত। এই ঘটনা যে মিথ্যা, তাহা আমরা জানিতে পারিয়াছি। কিন্তু তাহা হইলে কি হয়, এই জনশ্রুতি এতই প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল যে, কলিকাতায় তিনি “টিকি কাটা জমিদার” আখ্যা লাভ করিয়াছিলেন। বাস্তবিক সে সময়ে “টিকি কাটা জমিদার” বলিলে লোকে উহাকেই বুঝিত। যাহা হউক, এই আখ্যার মূলে যে কতকটা সত্য না ছিল, এমন কথাও আমরা বলিতে পারি না। ব্যাপারটা এইরূপ ঘটিয়াছিল। একবার কালীপ্রসন্নের বাটীতে কোন ব্রতোপলক্ষে এক ব্রাহ্মণকে একটী গাভীদান করা হইয়াছিল। ব্রাহ্মণ গাভী লইয়া যাইতে যাইতে পথেই উহা কসাইকে বিক্রয় করে। ঘটনা কালীপ্রসন্নের গোচরীভূত হইলে তিনি সেই ব্রাহ্মণকে বাটীতে ডাকিয়া আনেন এবং স্বহস্তে তাহার টিকি কাটিয়া লয়েন। এই ঘটনাই ক্রমশঃ অতিরঞ্জিত হইয়া এইরূপ জনশ্রুতিতে পরিণত হয় যে, কালীপ্রসন্ন ব্রাহ্মণ পন্ডিতের টিকি কাটিয়া থাকেন। বস্ততঃ তিনি যে এইরূপ এক জন নীচাশয়, ব্রাহ্মণের শিখা কর্তন করিয়াছিলেন বলিয়াই, সকল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের উপর শ্রদ্ধাহীন ছিলেন, এইরূপ কখনই সম্ভবপর নহে। পক্ষান্তরে, প্রকৃত ব্রাহ্মণপণ্ডিতগণকে যে তিনি অতি ভক্তি করিতেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নাই।
- - অর্ঘ্য, অগ্রহায়ণ, ১৩১৮, সম্পাদক শ্রীযুক্ত অমূল্যচরণ সেন। উৎস: মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ, পৃষ্ঠা ১৪
- কালীপ্রসন্ন জাতীয়তার পুরোহিত ছিলেন, কিন্তু ইংরাজ-বিদ্বেষী ছিলেন না, এবং বিদেশীকেও সৎকার্য্যের জন্য শ্রদ্ধা করিতে কুণ্ঠিত ছিলেন না, ইহাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যে স্যার মর্ডণ্টকে তিনি একসময়ে প্রকাশ্যভাবে তিরস্কার করিয়াছিলেন, উত্তরকালে স্বভাবপরিবর্তনের নিমিত্ত তাহার প্রতি এই সম্মান-প্রদর্শন কালীপ্রসন্নের উদারতা ও মহত্ত্বের বিশিষ্ট পরিচায়ক।
- শ্রীমন্মথনাথ ঘোষ, মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ, ফাইন আর্ট প্রিন্টিং সিন্ডিকেট, পৃষ্ঠা ৫০
- বাঙ্গালা সাহিত্যক্ষেত্রে জোড়াসাঁকো নিবাসী প্রসিদ্ধ ৺কালীপ্রসন্ন সিংহ যে কাজ করিয়াছেন, তাহার যথোচিত প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। তাঁহারই যত্নে এবং তাঁহারই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সুপ্রসিদ্ধ মহাকাব্য 'মহাভারত' বাঙ্গালা গদ্দ্যে অনুদিত হয়। মহাভারতের আরও কয়েকখানি বাঙ্গালা অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে বটে, কিন্তু মূলের প্রকৃত ভাব রক্ষায় এবং ভাষার বিশুদ্ধতা ও উচ্চতায় তাহাদের একখানিও কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদের সহিত তুলনীয় নহে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অন্যান্য বহু খ্যাতনামা পণ্ডিত ইহার যথোচিত অনুবাদ ও বিশুদ্ধতার তত্বাবধান করিয়াছিলেন। উদারহৃদয় মহাত্মা বাঙ্গালা ভাষায় যে অপরিমেয় মহোপকার সংসাধন করিয়াছেন, তাহা কখনও বিস্মৃত হইবার নহে। দুর্ভাগ্যবশতঃ বাঙ্গালাভাষা পাশ্চাত্য পণ্ডিতদিগের নিকট অদ্যাপি অপরিজ্ঞাত, নচেৎ তিনি যে এতদিন তাহার পরিশ্রমের অনুরূপ পুরস্কার লাভ করিতেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। তদানীন্তন কালে বাঙ্গালাভাষার সেবায় যে পরিমাণ স্বদেশানুরাগ ও স্বার্থত্যাগের প্রয়োজন হইত, তাহা অতি অল্ললোকেই প্রদর্শন করিতে পারিতেন। এরূপস্থলে তিনি যে তাহার স্বদেশীয়গণের আন্তরিক কৃতজ্ঞতার পাত্র, তাহা কে অস্বীকার করিবে?”
- রাজা বিনয়কৃষ্ণ দেব বাহাদুর (৺সুবলচন্দ্র মিত্রের অনুবাদ)। উৎস: মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ, পৃষ্ঠা ৯১
- একবার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে খুব দুর্ভিক্ষ হয়। সেই দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে আদি ব্রাহ্মসমাজে একটা সভা হয়। সেই সভায় পিতৃদেব বেদী হইতে যেরূপ মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করেন তাহা আমি কখন ভুলিব না। তাহার বক্তৃতা শুনিয়া লোকেরা এমনি মুগ্ধ ও উত্তেজিত হইয়াছিল যে, যাহার কাছে যাহা কিছু ছিল, তৎক্ষণাৎ সে দুর্ভিক্ষের সাহায্যার্থ দান করিল। কেহ আঙ্গুল হইতে আংটা খুলিয়া দিল, কেহ ঘড়ি ও ঘড়ির চেন খুলিয়া দিল। আমার স্মরণ হয়, ৺কালীপ্রসন্ন সিংহ তাহার বহুমূল্য উত্তরীয় বস্ত্র (বোধ হয় শাল) তৎক্ষণাৎ খুলিয়া দান করিলেন।
- জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রবাসী ১৩১৮ মাঘ, 'পিতৃদেব সম্বন্ধে আমার জীবনস্মৃতি' নামক প্রবন্ধ।
উৎস:মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ, পৃষ্ঠা ৯৯
- জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রবাসী ১৩১৮ মাঘ, 'পিতৃদেব সম্বন্ধে আমার জীবনস্মৃতি' নামক প্রবন্ধ।
- কলিকাতা পুলিসের প্রধান মাজিস্ট্রেট ব্রান্সন সাহেব অশ্ব হইতে পতিত হইয়া বিচারালয়ে আসিতে অশক্ত হওয়ায় অবৈতনিক মাজিস্ট্রেট শ্রীযুক্ত বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহ তাহার কার্য্য করিতেছেন এবং ব্রান্সন সাহেবের নিয়োগের পূর্বে সিংহ মহাশয় ঐ পদে কিছু দিন কার্য্য করিয়া-ছিলেন।
- সংবাদ প্রভাকর, ৩ জুন ১৮৬৫। উৎস: কালীপ্রসন্ন সিংহ, পৃষ্ঠা ৬১
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় কালীপ্রসন্ন সিংহ সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।