বিষয়বস্তুতে চলুন

ক্রুসেড

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে
অ্যাসক্যালনের যুদ্ধে জেরুসালেমের চতুর্থ ব্যালডউইন এবং সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মিশরীয় বাহিনীর মধ্যেকার সংঘাত (১৮ নভেম্বর, ১১৭৭)।
অ্যাসক্যালনের যুদ্ধে জেরুসালেমের চতুর্থ ব্যালডউইন এবং সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মিশরীয় বাহিনীর মধ্যেকার সংঘাত (১৮ নভেম্বর, ১১৭৭)।

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ছিল মধ্যযুগের সেই সুদূরপ্রসারী ও রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের এক সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতা, যা খ্রিস্টান ল্যাটিন চার্চ দ্বারা প্রবর্তিত, পুষ্ট এবং বিভিন্ন সময়ে সরাসরি পরিচালিত হয়েছিল। এই সুবিশাল সামরিক অভিযানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ও আলোচিত হলো ১০৯৫ থেকে ১২৯১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পবিত্র ভূমিতে পরিচালিত সেই রণকৌশলগত অভিযানসমূহ, যেগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মুসলিম শাসন থেকে জেরুজালেম এবং লেভান্ট বা এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ স্থায়ীভাবে অধিকার করা। প্রথম ক্রুসেডের মাধ্যমে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রক্তাক্ত সূচনা ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুলাই খ্রিস্টান বাহিনী কর্তৃক জেরুজালেম দখল সম্পন্ন হয়। ইতিহাসের কালক্রমে এর পরবর্তীতে, ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর মহান সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বীরত্বের সাথে পুনরায় জেরুজালেম জয় করেন এবং পবিত্র এই শহরটি আবারো মুসলমানদের শাসনাধীনে ও পূর্ণ অধিকারে ফিরে আসে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণকারী আরও কয়েক ডজন সামরিক অভিযান বা ক্যাম্পেইন সংগঠিত হয়েছিল। তবে ১৫শ শতাব্দীর পরবর্তী সময়ে এসে এই ক্রুসেড বা ধর্মীয় উন্মাদনাময় যুদ্ধের ধারাটি নাটকীয়ভাবে এবং দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে।

উক্তি

[সম্পাদনা]
দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সারাসিনদের বিরুদ্ধে জেরুসালেমের রাজা তৃতীয় ব্যালডউইনের সহায়তায় ফরাসি সম্রাট সপ্তম লুইয়ের দ্বিতীয় ক্রুসেডের (১১৪৮ সালের দামেস্ক যুদ্ধ) একটি মধ্যযুগীয় চিত্র। এটি চতুর্দশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ উইলিয়াম অফ টায়ারের 'হিস্টোয়ার ডি'আউটরেমার' পাণ্ডুলিপি থেকে সংগৃহীত।
  • তিনিই সেই বীর যিনি ‘কিসমত’ বা কপালের দোহাই দেন না। তিনিই সেই জন যিনি অমোঘ নিয়তিকে গ্রাহ্য করেন না;
    প্রবেশদ্বারে স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছেন প্রথম রিচার্ড, দাঁড়িয়ে আছেন রেমন্ড চতুর্থ (কাউন্ট অফ টুলুস), আর দাঁড়িয়ে আছেন সিংহহৃদয় গডফ্রে অফ বুইলন!
  • বীরত্বগাথা বা বীরধর্মের সেই স্বর্ণালী যুগের অধিকাংশ সময় জুড়ে, ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধকে বীরোচিত কার্যকলাপের এক আনুষ্ঠানিক সারসংক্ষেপ বা সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
    • মরিস কীন, শোভালরি (১৯৮৪), পৃ. ২৫২
ফ্রিজিয়ান ক্রুসেডাররা যখন ডেমিয়েটাতে আক্রমণ করে
  • বর্তমান সময়ে মুসলিম বিশ্বের মাঝে ক্রুসেডের ইতিহাসের প্রতি যে প্রবল আকর্ষণ, এই বিষয়ের ওপর বিদ্যমান একাডেমিক ও জনপ্রিয় সাহিত্যের সুবিশাল ভাণ্ডার এবং ক্রুসেডার রাজ্যগুলোর চূড়ান্ত পতন থেকে বারবার আহরিত সিদ্ধান্তসমূহ—এই সবই বিষয়টির প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর এক বিশেষ আলোকপাত করে। ইসলাম তার সূচনালগ্ন থেকেই এক প্রবল প্রভাবশালী ধর্ম হিসেবেই ছিল এবং মুসলিম বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে এটিই অত্যন্ত সংগত ও যথাযথ যে সার্বভৌম ক্ষমতা কেবল মুসলমানদের দ্বারাই পরিচালিত হবে। অন্যরা হয়তো মুসলিম রাষ্ট্রের সহনশীলতা, এমনকি উদারতাও লাভ করতে পারে। তবে শর্ত থাকে যে তারা মুসলিম আধিপত্যকে স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নেবে। অমুসলিমদের ওপর মুসলমানদের শাসন পরিচালনা করাটাই হলো স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু মুসলমানদের ওপর অমুসলিমদের শাসন কর্তৃত্ব স্থাপন করা হলো প্রাকৃতিক নিয়ম এবং ঐশ্বরিক আইনের চরম লঙ্ঘন। আর এই ধ্রুব সত্যটি কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, লেবানন কিংবা সাইপ্রাস সর্বত্রই সমানভাবে প্রযোজ্য। এখানে পুনরায় এটিও স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ইসলামকে কেবল পশ্চিমা সংকীর্ণ অর্থে কোনো ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সম্প্রদায়, একটি অবিচল আনুগত্য এবং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা। আর ইসলামি উম্মাহ বা সম্প্রদায় আজও সেই গভীর মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, যখন মুসলিম সরকার ও সাম্রাজ্যগুলো একের পর এক ভূপাতিত হয়েছিল এবং মুসলিম জনগণ বিজাতীয় ও বিধর্মীদের শাসনের অধীনে বলপূর্বক পর্যুদস্ত হয়েছিল।
  • এটি এমন এক মহান বিজয় যা মানব হৃদয়ের বদ্ধ জানালাটা একদম উন্মোচন করে দেয়!
    • আল-আদিল,
      আল-আদিলের নিকট প্রেরিত পত্র, যখন ক্রুসেডাররা হামার নিকটবর্তী তাদের অবস্থান ত্যাগ করে 'হিসন আল-আকরাদ' বা ক্রাক দে শ্যভালিয়ে দুর্গের দিকে পিছু হটেছিল (১১৭৪)। আবু শামা মাকদিসি, সম্পাদনা. আহমদ এবং জিয়াদা, খণ্ড ১ (১৯৫৮) পৃ. ৬১৪। লায়ন্স এবং জ্যাকসন (১৯৮২) অধ্যায় ৬, পৃ. ৮৯
জেরুজালেম বিজয় এবং গণহত্যার প্রতীকী চিত্রায়ন (১০৯৯)
  • ধর্ম যখন জাতীয়তাবাদের সাথে একীভূত হয়, ঠিক যেমনটা অর্থোডক্স চার্চের সাথে সার্ব এবং রুশদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল, তখন তা আত্ম বলিদান করার মতো এক মহান উদ্দেশ্য এবং সেইসাথে অনন্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। ক্রুসেডাররা কেবল লুণ্ঠন আর নতুন ভূখণ্ড দখল করার লিপ্সায় সমগ্র ইউরোপ জুড়ে তাঁদের আপন ঘরবাড়ি ছেড়ে পবিত্র ভূমির দীর্ঘ ও বিপজ্জনক যাত্রায় পাড়ি জমাননি। আসলে ঘরবাড়ির অনেক কাছাকাছি এর চেয়েও উত্তম ও মূল্যবান সম্পদ অর্জনের সুযোগ ছিল। তাঁরা মূলত এক ঐশ্বরিক মিশনের তাগিদে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল সেই পুণ্যভূমি! যেখানে একসময় যিশু খ্রিস্ট বিচরণ করেছিলেন, সেই ভূখণ্ডকে পুনরায় খ্রিস্টান জগতের অধিকারে ফিরিয়ে আনা। অনেক ক্রুসেডার—যাঁদের মধ্যে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম রিচার্ড এবং ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ দ্বিতীয়র মতো সম্রাটগণ এবং বিশালাকায় ভূ-সম্পত্তির মালিক অভিজাতবর্গ ছিলেন। তাঁরা নিজেদের সম্পত্তি, পদমর্যাদা ও পরিবার-পরিজন পেছনে ফেলে এসেছিলেন এবং তাঁদের অনেকেই আর কখনো ফিরে যাননি। পোপ গ্রেগরি সপ্ত্মের মতো ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, যিনি বিশ্বাসীদের বুক অফ জেরেমিয়াহর সেই বাণীটি স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, ‘অভিশপ্ত সেই জন, যে তার তলোয়ারকে রক্তপাত থেকে বিরত রাখে’! আসলে তাঁরা নির্বিচারে তাঁদের দৃষ্টিতে ‘বিধর্মী’ ব্যক্তিদের হত্যা করেছিলেন। ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেমের সেই ভয়াবহ গণহত্যায় রাস্তাঘাট রক্তে ভেসে গিয়েছিল বলে বর্ণিত আছে, কোনো কোনো স্থানে ক্রুসেডারদের ঘোড়ার হাঁটু পর্যন্ত রক্ত জমে গিয়েছিল। তৎকালীন এক বিবরণ অনুযায়ী, ‘তাঁদের কাউকেই জীবিত রাখা হয়নি; এমনকি নারী ও শিশুরাও সেই চরম নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি!’
    • মার্গারেট ম্যাকমিলান , ওয়ার: হাউ কনফ্লিক্ট শেপস আস, (২০২০)
  • বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের স্বর্ণালী যুগে এর শাসকরা কনস্টান্টিনোপল থেকে সকল বিষয় পরিচালনা করার চেষ্টা করতেন। হয় তাঁরা বিদেশি শাসকদের নিজেদের দরবারে নিয়ে আসতেন, অথবা পত্রালাপ ও প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আলোচনার কাজ সম্পন্ন করতেন। যারা নিজেদের ‘রাজকীয় কণ্ঠস্বর’ হিসেবে জাহির করত। ১০৯৬ এবং ১০৯৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আলেক্সিওস কোমনেনোস তাঁর নিজের প্রাসাদে প্রথম ক্রুসেডের নেতাদের সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন, ঠিক যেমনটি ম্যানুয়েল কোমনেনোস করেছিলেন ১১৪৭ সালে যখন দ্বিতীয় ক্রুসেড সেখানে পৌঁছেছিল। কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে যখন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন এর সম্রাটরা পরবর্তী রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাটদের মতোই অস্থির ছিল এবং অনেক বেশি শক্তিহীন হয়ে পড়েছিলেন। সম্রাট ম্যানুয়েল দ্বিতীয় উসমানীয় তুর্কিদের বিরুদ্ধে সাহায্যের আর্জি নিয়ে ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইংল্যান্ডের দরবারে দরবারে ঘুরতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং প্রলুব্ধ করার উপায় হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন মূল্যবান সব পাণ্ডুলিপি এবং যিশু খ্রিস্টের পরিহিত বলে কথিত আলখেল্লার ছিন্ন অংশ। এটি ছিল চূড়ান্ত হতাশাগ্রস্ত এক কূটনীতি! ম্যানুয়েলের মৃত্যুর ত্রিশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের তুর্কিদের কাছে পতন ঘটে।
    • ডেভিড রেনল্ডস , সামিটস: সিক্স মিটিংস দ্যাট চেঞ্জড দ্য টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি (২০০৭), পৃ. ১৩

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]