চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১১ অক্টোবর ১৮৭৭ ― ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৮) ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও ঔপন্যাসিক। চারুচন্দ্রের সাহিত্য জীবনের শুরু ‘মেঘদূত’,‘মাঘ’ প্রভৃতি পত্রিকায় সংস্কৃত সাহিত্যের সমালোচক হিসাবে। ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস-এ যোগ দিয়ে পুস্তক প্রকাশন ব্যপারে কৃতী সম্পাদক ও অনুবাদক হিসাবে বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কিছুকাল তিনি "ভারতী" পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি ‘প্রবাসী’র সহ-সম্পাদক হিসাবে সমধিক পরিচিতি পান। তিনি ২৫টি উপন্যাস রচনা করেছেন। এছাড়া রয়েছে নাটক, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ সংকলন। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ করেছেন ছোটদের উপযোগী করে। তবে তিনি সমধিক পরিচিত তার রবীন্দ্র-গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘রবি-রশ্মি’র জন্য। তার রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হলো, আলোক-লতা, চোরকাঁটা, ধোঁকার টাটি, পঙ্ক-তিলক, পরগাছা, বিয়ের ফুল, যমুনা-পুলিনের ভিখারিণী, সর্ব্বনাশের নেশা, হেরফের প্রভৃতি।
উক্তি
[সম্পাদনা]- যেহেতু স্কুলের নাম দুষ্টুশাসন ও সেখানকার পড়ুয়া মাত্রেই দুষ্ট, সুতরাং আমরা দুষ্টু, আমাদের শাসন করা অতি আবশ্যক। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই পাঁচ ঘা ক’রে বেত খেয়ে তবে আমরা অন্য কিছু খেতে পাই; রাত্রে শুতে যাবার আগেও বেত খেয়ে যাওয়া বরাদ্দ। লিখ্তে লিখ্তে শ্লেটের উপর পেন্সিলটা ক্যাঁ ক’রে যদি একটু ডাক্ল ত’ খাও বেত; পাশের ছেলের সঙ্গে একটা কথা কয়েছি কি হেসেছি, অমনি দুজনে দুজনের কান ধ’রে বেঞ্চির ওপর সমস্ত দিন খাড়া। টিফিনের সময় একটু ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে টিফিন বন্ধ, নিল-ডাউন।
- চোরকাঁটা - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃতীয় পরিচ্ছেদ, প্রকাশক- দীপনী, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৩
- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কাব্য আমার জীবন-যাত্রায় নিত্য সহচর। সুখে সহানুভূতি, দুঃখে সান্ত্বনা, সম্পদে উপদেশ, বিপদে আশ্বাস জোগাইয়া এই কাব্য আমার প্রাণে দিনে দিনে যে নব নব ইন্দ্রজাল রচনা করিয়াছে, সুখস্বপ্নের আবেশের মত যে মাদকরসে আমার অন্তরকে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছে, তাহারই কিঞ্চিৎ আজ আমি পরিবেশন করিব। কবির অফুরন্ত ভাবভাণ্ডার হইতে আমার ব্যক্তিগত রুচির প্ররোচনায় আমি যাহা সঞ্চয় করিয়াছি, তাহারই এক কণা বিতরণ করিয়া দেখাইব কবির ভাণ্ডার অনন্ত রসমাধুর্যে পরিপূর্ণ, ঐশ্বর্যে অদ্বিতীয়, অথচ ভোগে দানে সার্থক।
- কাব্যের স্বরূপ, রবীন্দ্রসাহিত্য-পরিচিতি - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- ৰোস মুখার্জ্জি এণ্ড কোং, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১
- ব্যর্থতা তো সার্থকতারই পূর্বাবস্থা। সমস্ত ব্যর্থতাই জীবনদেবতা সার্থক করিয়া তোলেন —তিনি সকল ভালো-মন্দ সুখ-দুঃখ ভাঙা-গড়া মিলাইয়া জীবনকে একটি অথণ্ড তাৎপর্যের মধ্যে উদ্ভিন্ন করিয়া তোলেন— তিনিই উপস্থিত বর্তমানকে চিরস্তনের সঙ্গে, ব্যক্তিগত সামগ্রীকে বিশ্বব্যাপারের সঙ্গে, খণ্ডকে সম্পূর্ণের সঙ্গে সম্মিলিত করিয়া সমস্ত কিছুকে তাহার ভাবী পরিণামের দিকে অগ্রসর করিয়া লইয়া চলেন।
- রবি-রশ্মি - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম খণ্ড, ষষ্ঠ সংস্করণ (পুনর্মুদ্রণ), প্রকাশক- এ. মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাইভেট লিঃ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৭৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪২১
- বৃদ্ধ নিশ্চিন্ত হইয়া প্রস্থান করিল। রামধন বৃক্ষচূড় হইতে যখন দেখিল যে বৃদ্ধ বহুদূরে চলিয়া গেল, তখন সে বৃক্ষাবরোহণ করিয়া দেবদারুর একটা শাখা ভগ্ন করিয়া তৎসাহায্যেই সেই গর্ত্তের উপরকার আলগা মাটি খুঁড়িয়া বৃদ্ধপ্রোথিত পুলিন্দাটি বাহির করিয়া লইল। এবং পকেট হইতে রজর্সের চকচকে একখানা ছুরি বাহির করিয়া সেই পুলিন্দা জড়ানো মোমজমা কাপড়ের সেলাই কাটিয়া ফেলিল। কাপড় ছাড়িয়া বাহির হইল একটা টিনের চোঙ। টিনের চোঙের ঢাকনি খুলিয়া বাহির হইল একটা লম্বা মোটা বাঁশের চোঙা। চোঙার ভিতরে দেখা গেল কতকগুলি করেন্সি নোট।
- রামধনের কীর্ত্তি, পুষ্পপাত্র - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮০-৮১
- চুরি করিতে এ বাড়ীতে আসিয়াছিলাম, চুরি করিয়াই এ বাড়ী ছাড়িলাম। চোরকাঁটা কাপড়ে লাগিয়া মাঠ হইতে বাড়ীতে আসে, আবার তাকে কাপড় হইতে ছাড়াইয়া লোকে বাহিরেই ফেলে। অল্প দিনের জন্য যে আশ্রয়টকু পাইয়াছিলাম তাই আমার যথেষ্ট—কথায় বলে চোরের রাত্রিবাসই লাভ! নামের মতন চরিত্রেও সাধু হইবার চেষ্টা সত্ত্বেও চোরই থাকিয়া গেলাম—বোধ হয় এই আমার বিধাতার হাতের অদৃষ্ট বিধান। যে দণ্ড এখন থেকে আমি অহরহ সহ্য করিব, সেই আমার চরম শাস্তি, পাপের প্রায়শ্চিত্ত।
- চোরকাঁটা - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ১১ পরিচ্ছেদ, প্রকাশক- দীপনী, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯১
- আমাদের মনে হয় উচ্চতম কবি তিনি,—যাহার কাব্য অতিমাত্র ব্যাপক, যাহা নিজে শাস্তং শিবম্ অদ্বৈতম্। যাহার শিক্ষা—নাল্পে সুখমস্তি, যো বৈ ভূমা তৎ সুখম্। যাহা বিশ্বপ্রকৃতি ও বিশ্বমানবের সহিত একাত্ম, যাহার মধ্যে জগতের স্পন্দন স্পষ্ট অনুভূত হয়, যাহা সামান্যতা পরিহার করিয়া ভূমানন্দের অন্তরঙ্গ আত্মীয়রূপে প্রকাশিত হইয়া উঠে, যাহা মানবের মনকে আমিত্ব পরিহার করিয়া বিশ্বের দিকে প্রসারিত করিয়া দেয়, যাহা বিশ্বের ভিতর দিয়া মানব-মনকে বিশ্বেশ্বরের চরণপদ্মের অভিমুখীন করে। ইহা ভারতবর্ষের একান্ত নিজস্ব সাধনা, এবং এই লক্ষণটি আমরা কেবলমাত্র রবীন্দ্রনাথের কাব্যেই অত্যন্ত পরিস্ফুট দেখিতে পাই।
- রবি-রশ্মি - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম খণ্ড, ষষ্ঠ সংস্করণ (পুনর্মুদ্রণ), প্রকাশক- এ. মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাইভেট লিঃ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৭৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫-৬
- কলিকাতার কোলাহল, ঠিকা ঝিয়ের শাসন, গোয়ালার সজল দুগ্ধ, ধোবার অত্যাচার, সকল সামগ্রীর মহার্ঘতা প্রভৃতি যাবতীয় উপদ্রবের মধ্যে বিশেষ একটি উপদ্রব জুটিয়াছিল, আমাদের প্রতিবেশী মহেন্দ্র বাবু তিনি একটি ষোড়শী কন্যার পিতা হইয়া আমার চিরকৌমার্য্য ক্ষুণ্ণ করিবার উপক্রম করিরাছিলেন।
- লেখকের বিপদ, পুষ্পপাত্র - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫
- সাধুর দুই চোখ দিয়া জল উপচিয়া পড়িতেছিল। এ জগৎটায় যেমন পুলিশও আছে তেমনি ক্ষমাও আছে; কেউ কুকুর যেমন লেলাইয়া দেয়, কেউ তেমনি মুখের অন্ন পরকে ধরিয়া দিতেও পারে; যার বাড়ীতে সে চুরি করিতে যায় তারাই তাকে দয়া করে!
- চোরকাঁটা - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ১১ পরিচ্ছেদ, প্রকাশক- দীপনী, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১০৮-১০৯
- রামধনের বিশেষত্ব সকল দিকে। হেয়ারকাটার চুল ছাঁটিত; লেড্ল কোম্পানি শার্ট জোগাইত, নৃত্য ধোপা তিন দিন অন্তর কাপড় কাচিত; এবং দন্তমঞ্জন হইতে সাবান এসেন্স পর্য্যন্ত রামধনের চেরিব্লশমের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখা যাইত।
- রামধনের কীর্ত্তি, পুষ্পপাত্র - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭৮
- বর্ষায় বিরহ জাগে—তখন প্রাণের আকুতি প্রণয়-প্রতিবেদনে পরিব্যক্ত হইতে চায়। এইজন্য মহাকবি কালিদাস হইতে আরম্ভ করিয়া বিদ্যাপতি পর্যন্ত সকল প্রাচীন কবির কাব্যে বর্ষার একটি বিরহিণী-রূপ বর্ণিত হইয়াছে।
- রবি-রশ্মি - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম খণ্ড, ষষ্ঠ সংস্করণ (পুনর্মুদ্রণ), প্রকাশক- এ. মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাইভেট লিঃ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৭৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২১৫
- সাধু নীরবে নিঃশব্দে মমতার পায়ের কাছে মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিল, তারপর আস্তে আস্তে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। সে যেদিন প্রথম এ বাড়ীতে পরের বিত্ত চুরি করিতে আসিয়াছিল তখনও যেমন একটা কাল-পেঁচা চ্যার্র্ চ্যার্র্ করিয়া ডাকিতেছিল; তেমনি আজও যখন সে পরের অপরাধ ও নিজের সুখ চুরি করিয়া এ বাড়ী ছাড়িয়া বাহির হইল তখনও সেই কাল-পেঁচাটা থাকিয়া থাকিয়া ডাকিয়া উঠিতেছিল।
- চোরকাঁটা - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দশম পরিচ্ছেদ, প্রকাশক- দীপনী, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮৭
- জীবনদেবতার অনুভূতিকে জীবনে বারংবার ফিরিয়া পাইবার কথা রবীন্দ্রকাব্যে বহুবার ধ্বনিত হইয়াছে। কবি ইহাকে কখনও ‘অন্তর্যামী’ বলিয়াছেন, কখনও ‘জীবনদেবতা’ বলিয়াছেন, কখনও ইনি ‘লীলাসঙ্গিনী’, কখনও ‘দোসর’, কখনও ‘খেলার সাথী’। এই জীবনদেবতাকে কবি বিভিন্ন নামে সম্বোধন করিয়াছেন এবং বিভিন্নরূপে উপলব্ধিও করিয়াছেন। কবির জীবনদেবতা কখনও কবির কাছে ‘দেবী’, কখনও ‘প্রেয়সী’।
- জীবনদেবতা, রবীন্দ্রসাহিত্য-পরিচিতি - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- ৰোস মুখার্জ্জি এণ্ড কোং, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬৬
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে উক্তি
[সম্পাদনা]- চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলি ভিন্ন প্রকৃতির। তাহার চোরকাঁটা, যমুনা-পুলিনে ভিখারিনী, দোটানা প্রভৃতি উপন্যাসকে ঠিক মৌলিক বলা চলে না। তাহাদের উপর বৈদেশিক উপন্যাসের ছয়াপাত হইয়াছে। হেরফের উপন্যাসের গল্পাংশ রবীন্দ্রনাথের দান বলিয়া লেখক স্বীকার করিয়াছেন। তাহার অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে পঙ্কতিলক, নষ্টচন্দ্র, রূপের ফাঁদ, মন না মতি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। উপন্যাস ছাড়া ছোটগল্প রচনায়ও লেখক সিদ্ধহস্ততার পরিচয় দিয়াছেন। তাহার পুষ্পপাত্র, পঞ্চদশী, বরণডালা প্রভৃতি গল্পসংগ্রহে কয়েকটি গল্প উচ্চতর উৎকর্ষের দাবী করিতে পারে।
- শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ছেটিগল্প ও উপন্যাসের উত্তরপর্ব, বাংলা সাহত্যের বিকাশের ধারা - শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিতীয় খণ্ড: আধুনিক যুগ, প্রকাশক- ওরিয়েপ্ট বুক কোম্পানি, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ২২১