বিষয়বস্তুতে চলুন

ছাতা

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে
ছাতা বলে, ‘ধিক ধিক, মাথা মহাশয়,
এ অন্যায় অবিচার আমারে না সয়।
তুমি যাবে হাটে বাটে দিব্য অকাতরে,
রৌদ্র বৃষ্টি যত কিছু সব আমা-’পরে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছাতা, ছত্র, ছত্রী, বা ছাতি হলো বৃষ্টি বা সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি একটি আচ্ছাদন। প্রাচীনকাল থেকেই ছাতা ব্যবহার হয়ে আসছে। পরে রংবেরঙের ছাতা কখনো ফ্যাশন, কখনো মর্যাদার প্রতীক হিসাবেও বহুভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ছাতা শব্দটি রূপক হিসাবেও নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।

উক্তি

[সম্পাদনা]
  • ছাতা বলে, ‘ধিক ধিক, মাথা মহাশয়,
    এ অন্যায় অবিচার আমারে না সয়।
    তুমি যাবে হাটে বাটে দিব্য অকাতরে,
    রৌদ্র বৃষ্টি যত কিছু সব আমা-’পরে।
    তুমি যদি ছাতা হতে কী করিতে, দাদা।’
    মাথা কয়, ‘বুঝিতাম মাথার মর্যাদা।
    বুঝিতাম, তার গুণে পরিপূর্ণ ধরা,
    মোর একমাত্র গুণ তারে রক্ষা করা।’
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যথাকর্তব্য, কণিকা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮
  • হাতিরা তাকে মাথায় করে নদীতে নিয়ে যেত, শুঁড়ে করে জল ছিটিয়ে গা ধুইয়ে দিত, তারপর তাকে সেই সাপের পিঠে বসিয়ে দিত—এই তার রাজসিংহাসন। দুদিকে দুই হাতি পদ্মফুলের চামর ঢোলাত, অজগর ফণা মেলে মাথায় ছাতা ধরত।
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজপুরে, শকুন্তলা- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- সিগনেট প্রেস, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫০-৫২
  • ‘নই ঘোড়া, নই হাতি, নই সাপ বিচ্ছু,
    মৌমাছি প্রজাপতি নই আমি কিচ্ছু।
    মাছ ব্যাঙ গাছপাতা জলমাটি ঢেউ নই,
    নই জুতা নই ছাতা, আমি তবে কেউ নই!’
    • সুকুমার রায়, কিম্ভূত, সুকুমার সমগ্র রচনাবলী- প্রথম খণ্ড, সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী, কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৮
  • লোকে বলে যে, যখন সাপ নানককে ছাতা ধরিয়াছিল তখন রাজা তাহা দেখিয়াছিলেন, এই জন্যই নানকের উপর তাহার এত ভক্তি হইয়াছিল। কিন্তু সে সাপের ছাতা-ধরা সমস্তই গুজব; আসল কথা, নানকের সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া রাজা বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে নানক একজন মস্তলোক।
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজের লােক কে, ইতিহাস - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, প্রকাশসাল- ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮৫
  • তাদের আড্ডা ছিল, গ্রাম ছাড়িয়ে, মাঠ ছাড়িয়ে, বনের ধারে, ব্যাঙ-ছাতার ছায়ার তলায়। ছেলেবেলায় যখন তাদের দাঁত ওঠে নি, তখন থেকে তারা দেখে আসছে, সেই আদ্যিকালের ব্যাঙের ছাতা। সে যে কোথাকার কোন্‌ ব্যাঙের ছাতা, সে খবর কেউ জানে না, কিন্তু সবাই বলে, “ব্যাঙের ছাতা”।
    • সুকুমার রায়, নানা গল্প, ছাতার মালিক, সুকুমার সমগ্র রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী, কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৭৭
  • সোদপুর স্টেশনে যখন গাড়ি থামল দেখি, একটি সাহেবি-কাপড়-পরা বাঙালি নিজে মাথায় দিব্যি ছাতা দিয়ে তার স্ত্রীকে গাড়ি থেকে নাবালে। স্ত্রীর কোলে একটি শিশু ছেলে; গায়ের মোটা চাদরটা দিয়ে সেই ছেলেটিকে কোনোমতে ঢেকে খোলা স্টেশনের এক ধারে দাঁড়িয়ে সে বেচারি শীতে ও লজ্জায় জড়সড় হয়ে ভিজতে লাগল— তার স্বামী জিনিসপত্র নিয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁকডাক বাধিয়ে দিলে। আমার এক মুহূর্তে মনে পড়ে গেল, সমস্ত বাংলাদেশে কি রৌদ্রে কি বৃষ্টিতে কি ভদ্র কি অভদ্র কোনো স্ত্রীলোকের মাথায় ছাতা নেই।
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গোরা, গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২১৩
  • আলিপনার মাঝখানে বাসন্তী ছাতা মাথায় দিয়া একখানি চৌকিতে বসিল। ছাতাখানা সে আস্তে আস্তে ঘুরাইতে লাগিল এবং তার মা ছাতার উপর খই আর নাড়ু ঢালিয়া দিতে লাগিল; হরির লুটের মত ছেলেরা কাড়াকাড়ি করিয়া সে-নাড়ু ধরিতে লাগিল। সবচেয়ে বেশি ধরিল কিশোর আর সুবল।
    • অদ্বৈত মল্লবর্মণ, প্রবাস খণ্ড, তিতাস একটি নদীর নাম- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- পুথিঘর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৯
  • বাইরের দিকে তাকিয়ে বললুম, বৃষ্টি পড়ছে দেখছি। ও বললে, তাতে হয়েছে কী। আমার ছাতা নেই, কিন্তু তোমার সঙ্গে এক ছাতাতেই যেতে পারব। আর কেউ হলে জোর করেই বলত, সে হবে না। কিন্তু, আমার উপায় নেই। তা, ভালোমানুষ হলেও বিপদে পড়লে আমার মাথাতেও বুদ্ধি জোগায়। আমি বললুম, অত অসুবিধা করবার দরকার কী। তার চেয়ে বরঞ্চ ছাতাটা তুমি নিয়ে যাও, যখনি সুযোগ হবে ফিরিয়ে দিলেই হবে।
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভালোমানুষ, গল্পসল্প - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৮৫ বঙ্গাব্দ)পৃষ্ঠা ৯২
  • আহাম্মক রামপদটা একেবারে সব মাটি করিয়া দিল। সে বোকারাম ছাতা হাতে হাঁ করিয়া তামাশা দেখিতেছিল। এমন সময় পাঠশালার একটা ছোকরা এক থাবড়া মারিয়া তাহার ছাতাটা কাড়িয়া লইল। আমরা ততক্ষণে গোরাচাঁদকে প্রায় চিৎপাত করিয়া আনিয়াছি, এমন সময় হঠাৎ আমাদের ঘাড়ে পিঠে ডাইনে বাঁয়ে ধপাধপ ছাতার বৃষ্টি শুরু হইল। আমরা মুহুর্তের মধ্যে একেবারে ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িলাম, আর সেই ফাঁকে গোব্‌রাও একলাফে গা ঝাড়া দিয়া উঠিল।
    • সুকুমার রায়, পালোয়ান, ইস্কুলের গল্প, সুকুমার রায় সমগ্র রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী ও কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১১৭
  • আমি আন্তরিক প্রীত হইলাম এবং ক্রমাগত হাটখোলার দিকে যাইতে লাগিলাম। কোচমান উপর হইতে বলিল, “বাবু, বড় দুর্য্যোগ-আপনাদের ছাতাটা এক বার দিন। ঝড় উঠিয়াছে, এখনই বৃষ্টি আসিবে।” উভয়েরই নিকট ছাতা ছিল—আমি আমার ছাতাটা কোচমানকে দিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে একবার আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করিলাম। দেখিলাম, একখানি ভয়ানক কৃষ্ণবর্ণ মেঘ সমস্ত আকাশ ছাইয়া ফেলিয়াছে।
    • প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, তৃতীয় পরিচ্ছেদ, জোড়া পাপী - প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, প্রকাশক- দারোগার দপ্তর কার্য্যালয়, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৮
  • বড়ো-বড়ো বেলুন যখন আকাশে ওঠে তখন অনেক সময় তার গায়ে গোটানো ছাতার মতো একটা প্রকাণ্ড জিনিস ঝোলানো থাকে সেটাকে বলে প্যারাসুট। হঠাৎ বিপদে পড়লে, বা চট করে নামবার দরকার হলে বেলুনবাজ তার কোমরে প্যারাসুটের দড়ি জড়িয়ে বেলুন থেকে লাফ দিয়ে পড়বে। অমনি ছাতাটা খুলে গিয়ে প্রকাণ্ড গোল হয়ে ফুলে উঠবে, আর তাতেই পড়বার চোট সামলিয়ে যাবে। কিন্তু এরোপ্লেন থেকে সেরকম ছাতা ঝুলানো সম্ভব নয়। তাতে চলবার বাধা হয় আর ছাতার দড়িদড় কোথাও কলকব্‌জায় অটকে গেলে সেও এক সাংঘাতিক বিপদ।
    • সুকুমার রায়, আকাশের বিপদ, সুকুমার রায় সমগ্র রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী ও কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৫৭
  • আর সে তিলমাত্র দেরি করল না। বললে, প্ল্যানটা শোনাচ্ছে ভালো।
    ছাতাটা বগলে করে চট্‌পট্‌ সরে পড়ল। ভয় ছিল, ফাউণ্টেন-পেনের খোঁজ উঠে পড়ে। ছাতা ফেরাবার সুযোগ কোনোদিনই হবে না। হায় রে, আমার পনেরো টাকা দামের সিল্কের ছাতাটা! ছাতা ফিরবে না, ফাউণ্টেন-পেনও ফিরবে না, কিন্তু সব চেয়ে আরামের কথা হচ্ছে— সেও ফিরবে না।
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভালোমানুষ, গল্পসল্প - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৮৫ বঙ্গাব্দ)পৃষ্ঠা ৯২-৯৩
  • গাঁয়ের রাস্তা ধরে একটি প্রবীণ গোছের ভদ্রলোক চলেছেন; হাতে ছোট্ট একটি চামড়ার ব্যাগ, পরণে থানের ধুতি, গায়ে ফর্সা পাঞ্জাবী, কাঁধের উপর মট্‌কার চাদর একখানা ভাঁজ করে ফেলা, পায়ে সাধারণ দিশি জুতো, মাথায় একটা অল্প দামের ছাতা। ভদ্রলোক ছাতাটি মাথায় দিয়ে ডান হাতে ছাতার বাঁটটি ধরে বাঁ হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে যাচ্ছেন। দেখ‍্লেই মানুষটির উপর শ্রদ্ধা জন্মায়, দিব্যি সুন্দর, শান্ত, সৌম্য চেহারা, বয়স আন্দাজ ষাট বাষট্টি।
    • হেমলতা দেবী, দুনিয়ার দেনা, দুনিয়ার দেনা - হেমলতা দেবী, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ (১৩২৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১২৪
  • যত সব দুষ্টু ছেলে রাত্রে যারা ঘমোতে চায় না, মায়ের মুখে ব্যাঙের ছাতার গান শুনে শুনে তাদেরও চোখ বাজে আসে।—
    গাল ফোলা কোলাব্যাঙ পাল তোলা রাঙা ছাতা
    মেঠোব্যাঙ, গেছোব্যাঙ, ছেঁড়া ছাতা, ভাঙা ছাতা।
    সবুজ রঙ জবড়জঙ জরির ছাতা সোনা ব্যাঙ
    টোক্কা-আঁটা ফোক্‌লা ছাতা কোঁকড়া মাথা কোনা ব্যাঙ॥
    • সুকুমার রায়, নানা গল্প, ছাতার মালিক, সুকুমার সমগ্র রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী, কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৭৭
  • সৌন্দর্য্যের চর্চ্চা ও সুবিধার চর্চ্চা এর মধ্যে কোন্‌টাকে প্রাধান্য দিতে হবে তর্কটা যদি এই হয় তবে ছাতা মাথায় দিয়ে ঘোড়ায় চড়ার দৃষ্টান্তটা সে তর্কের মধ্যে ঠিক পড়ে না। কেননা ঘোড়ায় চড়ে ছাতা মাথায় দিলে সেটা যে অসুন্দর হতেই হবে তা নয়, ওদিকে তাতে ঘোড়া চালাবার অসুবিধাও ঘটতে পারে।
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্র-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশস্থান- শিলাইদহ, প্রকাশসাল- ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২২০

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]