বিষয়বস্তুতে চলুন

জলধর সেন

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে
আমি হিন্দুর ছেলে, আর আলি মুসলমানের ছেলে; কিন্তু আমরা একদিনও এ প্রভেদের কথা ভাবি নাই, মাষ্টার মহাশয় আমাদের দুইজনকে একসূত্রে বাঁধিয়া দিয়াছিলেন, আমাদের ধর্ম্ম পৃথক ছিল বটে, কিন্তু আমাদের হৃদয এক ছিল।
জলধর সেন

জলধর সেন (১৩ মার্চ ১৮৬০ – ১৫ মার্চ ১৯৩৯) ছিলেন একজন বাঙালি লেখক, কবি, সম্পাদক এবং একজন জনহিতৈষী, পর্যটক, সমাজকর্মী, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। তিনি গ্রামবার্তা, সাপ্তাহিক বসুমতী, হিতবাদী, সুলভ সমাচার প্রভৃতি সাময়িক পত্রিকাতে সম্পাদক বা সহ-সম্পাদক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। পরে ১৩২০ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছর তিনি ভারতবর্ষ মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, সামাজিক বার্তা, শিশুদের জন্য বই এবং জীবনী সহ প্রায় ৪২টি বই লিখেছেন। গল্পের বইয়ের মধ্যে রয়েছে নৈবেদ্য, কাঙ্গালের ঠাকুর, বড় মানুষ ইত্যাদি। তার রচিত উপন্যাসগুলি হলো দুঃখিনী, অভাগী, উৎস, বড়বাড়ী, হরিশ ভাণ্ডারী প্রভৃতি। ভ্রমণকাহিনীর মধ্যে রয়েছে প্রবাস-চিত্র এবং হিমালয় ; কাঙ্গাল হরিনাথ তার জীবনীমূলক লেখা। তার সাহিত্যকর্মের জন্য ব্রিটিশ সরকার 'রায় বাহাদুর' উপাধি দেয়।

উক্তি

[সম্পাদনা]
  • আমি হিন্দুর ছেলে, আর আলি মুসলমানের ছেলে; কিন্তু আমরা একদিনও এ প্রভেদের কথা ভাবি নাই, মাষ্টার মহাশয় আমাদের দুইজনকে একসূত্রে বাঁধিয়া দিয়াছিলেন, আমাদের ধর্ম্ম পৃথক ছিল বটে, কিন্তু আমাদের হৃদয এক ছিল। মাষ্টার মহাশয় বাল্যকাল হইতেই আমাদিগকে শিক্ষা দিয়াছিলেন “খোদা ও ঈশ্বরে প্রভেদ নাই। যার যে নামে রুচি, সেই নামে ডাকিলেই তিনি সাড়া দেন।” আমরা তাঁহার এই উপদেশ গুরুমন্ত্ররূপে গ্ৰহণ করিয়াছিলাম।
    • উৎসর্গ, মায়ের নাম - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ (১৩২৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩২-৩৩
  • মেজের এক কোণ হইতে কেবল একটা কাতরোক্তি শুনিতে পাওয়া যাইতেছিল। একজনের হাতে একটা দিয়াশলাই ছিল; সে একটা কাঠি জ্বালিতেই ঘরের মধ্যের অন্ধকার দূর হইল। সকলে সভয়ে দেখিল, মানদা ঘরের মেজের উপর পড়িয়া আছেন। তাঁহারই কণ্ঠ হইতে অব্যক্ত কাতরোক্তি বাহির হইতেছে। ঘরের চারিদিকে দেখিবার পূর্ব্বেই দিয়াশলাই নিবিয়া গেল। চণ্ডী বাবু বলিলেন “খবরদার, তোমরা দোর আগ্‌লে, দাঁড়াও, পাজিটা যেন পালাতে না পারে। আর একটা দিয়াশলাই জ্বাল।”
    • ষোল আনি- জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ (১৩২৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৩
  • প্রথম-শিক্ষার্থীরা তালপত্রে লিখিত। পাঠশালার ছুটী হইলে তালপাতার গড়া আসনে মুড়িয়া ছাত্রেরা বাড়ীতে লইয়া যাইত এবং পাঠশালায় আসিবার সময় বগলে করিয়া লইয়া আসিত। তালপাতা লেখা শেষ হইলে অপেক্ষাকৃত বড় ছেলেরা কলার পাতে লিখিত। কলার পাতা শেষ হইলে বয়স্ক ও শ্রেষ্ঠ ছাত্রেরা কাগজে লিখিত। ইহাদের কাগজ-কলম একটা মোটা পুরাণ কাপড়ের খণ্ডে মুড়িয়া বাঁধা হইত। ইহার ডাক-নাম ছিল বস্তানি বা দপ্তর। বড় ছাত্রদের এই দপ্তরে দুই একখানি মুদ্রিত পুস্তকও দৃষ্ট না হইত এমন নহে।
    • পাঠশালার ছাত্র ও তাহাদের শিক্ষা-প্রণালী , সেকালের কথা - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১০১
  • মানুষ পৃথিবীতে নিজের তৃপ্তির জন্যই ব্যাকুল; অন্যে যখন ঘুরিতে ঘুরিতে তাহার পথে আসিয়া পড়ে, তখন সে তাহাকে সঙ্গিরূপে গ্রহণ করিয়া ঈপ্সিত পথে অগ্রসর হয়। কিন্তু যে কুহকমন্ত্র সে অপরের হৃদয়াকর্ষণের জন্য প্রয়োগ করে, কখন কখন তাহা ছিন্নতার বীণার তানলয়হীন ধ্বনির ন্যায় শ্রুতিকঠোর হয়। যে বীণার সহায়তায় আমার আকাঙ্ক্ষাপীড়িত হৃদয়ের হাহাকার সঙ্গীতরূপে উচ্ছ্বসিত করিয়া তুলিয়াছিলাম, সে বীণা আমার ভাঙ্গিয়া গিয়াছে; সে আগ্রহ, সে আন্তরিকতা আমার নাই; কেবল দগ্ধস্মৃতির অন্তর্জ্বালা সেই বহুদূরান্তর-ন্যস্ত হিমাচলের বৃক্ষলতাবর্জ্জিত, ধূসর, অপরিবর্ত্তনীয়, চির-উদাসীন প্রস্তরস্তূপের ন্যায় বক্ষের মধ্যে নিরস্তর বিদ্যমান রহিয়াছে; তাহাতে অশ্রু শুকাইয়া যায়।
    • হিমালয়ের স্মৃতি, পুরাতন পঞ্জিকা - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮০
  • ছেলে-বেলায় পাঠশালে যে শুভঙ্করের সাক্ষাৎ পাওয়া গিয়েছিল, তা পাটীগণিতের লঘুকরণ, লঘিষ্ট সাধারণ, ত্রৈরাশিক প্রভৃতি অপেক্ষা অধিক কাজের; আর সে সব শিখতে সেই ছেলেবেলায় মোটেই আয়াস স্বীকার করতে হয় নাই। অতি সহজ উপায়ে সেগুলি এমন নিজস্ব হয়ে গিয়েছিল যে, জীবনের শেষদিন পর্যন্তও সে হিসাবের ভুল হয় না। সেই যে ‘মনকে আড়াই সের আনার হিসাব’ এ একেবারে ত্রৈরাশিক, বহুরাশিককে অতিক্রম করে’ গৃহস্থের দৈনন্দিন হিসাবকে ঠিক রেখেছে। এরই জন্যই পাঠশালার প্রথম শিক্ষাকে আমি এমন শ্রেষ্ঠ আসন দিতে সঙ্কোচ বোধ করি না।
    • সেকালের পাঠশালা, সেকালের কথা - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯৩
  • কষ্টে পড়িলে মনুষ্যের আমাদের মত দুর্ব্বল, অক্ষম, অধম মনুষ্যের সঙ্কল্প ভাঙ্গিয়া যায়; —মর্ম্মাহত আত্মসম্মান ও পৌরুষ-গর্ব্ব একদিন নিতান্ত তুচ্ছ ভাবিয়া যাহার উপর সবেগে পদাঘাত করে, অবশেষে নিরুপায় হইয়া তাহাই আবার আর একদিন অবলম্বন-দণ্ডের ন্যায় গ্রহণ করিবার জন্য অধীর হইয়া উঠে।
    • ডিপুটী বাবু, ছোট কাকী ও অন্যান্য গল্প - জলধর সেন, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩২২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫
  • ‘দুঃখিনী’ প্রকাশ হ’ল– তুমি নাই কাছে,
    তব স্নেহ ছায়া সম ফিরে তার পাছে।
    ভুলিনি অস্তিম সাধ— "দাদা! দুঃখিনীরে
    মেজে ঘসে রং দিয়ে এনো না বাহিরে।”
    অনাঘ্রাত কুসুমের আদিম সজ্জায়,
    সে লুকাবে তোরি বুকে সোহাগে লজ্জায়।
    • ‘দুঃখিনী’ উপন্যাসের উৎসর্গ পত্রে অকাল প্রয়াত অনুজ শশধর সেনের উদ্দেশ্যে লিখিত কবিতার অংশ, দুঃখিনী - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ)
  • সেকালে কলিকাতা সহরে মোটরের নামও কেউ জানতো না; ঘোড়া গাড়ীর প্রচলনও খুব কমই ছিল। তখন বড়মানুষেরা পালকি চড়ে যাতায়াত করতেন। আর সে সব পাল‍্কির বাহারও খুব ছিল; বড়মানুষদের বড় বড় পাল‍্কি, রূপো বাঁধানো ডাণ্ডা, মকর-হাঙ্গর-মুখো সাজ। আট জন বারো জন, ষোল জন বেহারা না হ’লে পালকী বইবার যো ছিল না!
    • যমজয়ী চূড়ামণি দত্ত, সেকালের কথা - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫-৬
  • আমি পথিক। পৃথিবীতে কে পথিক নহে? আমি পথিক, তুমি পথিক, রাজা পথিক, ভিখারী পথিক; সমস্ত সংসারটাই যে পথিক। যে চলে সেই পথিক। কোথাও ত কেহ বসিয়া নাই; উর্দ্ধে চাহিয়া দেখি, অসীম আকাশে অনন্ত নক্ষত্রমালা স্ব স্ব গন্তব্য-পথে ধাবিত হইয়াছে; চন্দ্র সূর্য্য মহাবেগে ছুটিয়া চলিয়াছে। পদতলে বিশাল বসুন্ধরা, স্থাবর জঙ্গম নদ-নদী নগর ভূধর সাগর উপসাগর বক্ষে বাঁধিয়া ক্রমাগত ছুটিতেছে; শ্রান্তি নাই, বিরাম নাই, নিদ্রা নাই, আলোক ও অন্ধকারের ভিতর দিয়া দিবারাত্রি ছুটিয়া চলিয়াছে;—আর আমি সেই জননী বসুন্ধরার ক্ষুদ্রতম, হীনতম, দীনতম সস্তান, মুখশান্তি হারাইয়া, বুঝি ভগবানে বিশ্বাস পর্যস্ত হারাইয়া, অন্তহীন অন্ধকারের ভিতর দিয়া ছুটিয়া চলিয়াছি—আমি পথিক।
    • তিহরী, পথিক - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১
  • কমলা আর কথা বলিবার অবকাশ পাইলেন না। হরিনাথ তখন অতি ধীরস্বরে বলিল, “সর্দারের পো, ভাই অমন ক’রে কি কথা বলতে আছে? যে মুখে হরিনাম করতে হবে, আল্লার নাম করতে হবে ব’লে এত দুর্লভ মানবজন্ম পেয়েছি, সে মুখ দিয়ে কি কুচ্ছ কথা বার করতে হয় ভাই! তুমি মুসলমান হলেও আমার দয়াল হরির দাস; আমিও তাঁরই দাস বলেই ত মনে ভাবি। তুমি যে আমার হরির সম্পর্কে ভাই হও। ভাই হয়ে কি বোনের কথা অমন করে বল্তে হয়? আর অমন কথা বলে হরিমন্দির অপবিত্র করো না। এস তোমাকে ভাই বলে, হরিদাস বলে বুক নিই।” এই বলিয়া হরিনাথ ছলিম সর্দারকে আলিঙ্গন করিয়া উচ্চৈঃম্বরে বলিতে লাগিল,“হরি হরিবোল” হরি হরিবোল।”
    • বিচার, জলধর সেনের নির্বাচিত গল্প, সংকলন ও সম্পাদনা- ড. সুবিমল মিশ্র, প্রকাশক- বাণী প্রকাশন, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- জানুয়ারি ২০০২, পৃষ্ঠা ১৫৪
  • তাহার পর আর কি! এই চরের হাঙ্গামা ও খুন লইয়া তুমুল ব্যাপার আরম্ভ হইল। মনোহরপুরে সংবাদ পৌঁছিল। তারক দাঙ্গা ও খুনের সংবাদ পাইলেন, কিন্তু কার্ত্তিকের কোন সংবাদ পাইলেন না। নায়েবের পত্রে কার্ত্তিকের কোন প্রসঙ্গই নাই। যে সকল পত্র আসিতে লাগিল, তাহা সকলই কার্ত্তিকের নামে। তারক বুঝিতে পারিলেন যে, কার্ত্তিক ব্যাপার গুরুতর দেখিয়া গা-ঢাকা দিয়াছেন।
    • বড়বাড়ী, বড়বাড়ী - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪৮-৪৯
  • এতদিন পরেও আজ আপনাদের কাছে সেই ভাতার-মারীর মাঠের করুণ কাহিনী বলবার সময় সেই দৃশ্যই আমার চোখের সুমুখে ভেসে উঠছে— সেই মহেশের প্রাণপণ আর্ত্তনাদ— জল! জল! একটু জল! অনেক কাল আগে কারবালার প্রান্তরে একদিন এমনই ভাবে জল, জল, একবিন্দু জল ব’লে হৃদয়ভেদী আর্তনাদ উঠেছিল;—আর এই নির্জ্জন প্রান্তরের মধ্যে এই ভাতার-মারীর মাঠেও একদিন সেই কাতর ধ্বনি ‘জল, জল একবিন্দু জল’ মহেশের মুখ থেকে শেষ উচ্চারিত হয়েছিল। কারবালা জগতের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে, আর এই ভাতার-মারীর মাঠে মহেশের প্রাণ-দানের কথা— সতী-সাধ্বী হরিমতির স্বামীর বুকের উপর প্রাণ-ত্যাগের কাহিনী সেই ভাতারমারীর মাঠের মধ্যে হায় হায় ক’রে প্রতিধ্বনিত হচ্চে।
    • ভাতার-মারীর মাঠ, সেকালের কথা - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮০
  • একবার অমর চমকাইয়া উঠিল; পরক্ষণেই বলিল, “কাকীমা! আর আমি বিছানা খারাপ করব না।” তাহার পরেই সব নীরব হইল। রামদয়াল অমরকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া তাহার দীপ্তিহীন নির্নিমেষ নেত্রের দিকে ব্যাকুলদৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন, “বাপ্‌ধন অমর রে! তুইও আমাকে ফাঁকি দিয়ে গেলি, আমি আর কি নিয়ে সংসারে থাক‍্বো?” অমরের ছোটকাকী বাতায়ন-অন্তৱাল হইতে বিরক্তিভরে বলিলেন, “কোথাকার আপদ কোথায় এসে ঘরে, তার ঠিক নেই; এ পাপ বিদেয় হবে কখন!”
    • ছোট কাকী, ছোট কাকী ও অন্যান্য গল্প - জলধর সেন, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩২২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১১
  • দ্বাদশবর্ষীয়া বালিকা এই বয়সেই বুঝিয়াছিল যে, সংসারে মা না থাকিলে কত কষ্ট পাইতে হয়। রসিক অনেক সময়ে মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করিত, কিন্তু দুঃখিনী সে কথার বড় একটা জবাব দিত না। রসিক নিতান্ত আদার করিলে বলিত, “সকলেরই কি মা থাকে, কাহারও বা মা থাকে, কাহারও বা বাবা থাকে, কাহারও বা দিদি থাকে। দেখ্ দেখি! ও বাড়ীর শ্যামের মা আছে, তার দিদি নাই। তোর দিদি আছে, কাজেই তোর মা নাই। তা তুই দিদি চাস্, না মা চাস্।” রসিক অমনি কাতর হইয়া বলিত, “না না, আমি মা চাই না, দিদি চাই।”
  • দুঃখিনী, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, দুঃখিনী - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮
  • দুনিয়ার যিনি মালিক, সকল সৎকর্ম্মের যিনি সহায়, তাঁহারই দোয়া প্রার্থনা করিও। মানুষের অনুগ্রহ চাহিও না।
    • উৎসর্গ, মায়ের নাম - জলধর সেন, প্রকাশক- গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ (১৩২৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪২

জলধর সেনকে নিয়ে উক্তি

[সম্পাদনা]
  • জলধরবাবুর লেখনী ছিল বড় মিষ্ট, বড় দরদী; তাই অতি অনায়াসেই পাঠকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্বন্ধ স্থাপন করতে পারত। স্বচ্ছ, সরল, সরস ভাষা—যেন সোজা তাঁর প্রাণের ভিতর থেকেই বেরিয়ে এসে ঝ’রে পড়ত লেখনীমুখ দিয়ে, কোনরকম কৃত্রিমতার ধার না ধেরেই।
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়, জলধর সেন, যাঁদের দেখেছি - হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক— নিউ এজ পাবলিশার্স লিমিটেড, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৫৯
  • জলধরের রচনায় বিশেষ গুণ সারল্য ও স্বচ্ছতা। পল্লীগ্রামের দরিদ্র ভদ্রজীবনের আর্থিক ও সামাজিক দুঃখ বেদনা ইহার গল্প-উপন্যাসের বিশেষ বস্তু।
    • সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস - শ্রীসুকুমার সেন, পঞ্চম খণ্ড, ষষ্ঠ মুদ্রণ, প্রকাশক- আনন্দ পাবলিশার্স, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ২০১০, পৃষ্ঠা ৪৫
  • বাঙালীর প্রীতি অর্ঘ্যে তব দীর্ঘ জীবনের তরী
    স্নিগ্ধ শ্রদ্ধাসুধারস নিঃশেষে লয়েছে পূর্ণ করি।
    • জলধর সেনের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শোকবার্তা, জলধর সেনের নির্বাচিত গল্প বইয়ের মুখবন্ধে, সংকলন ও সম্পাদনা- ড. সুবিমল মিশ্র, প্রকাশক- বাণী প্রকাশন, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- জানুয়ারি ২০০২, পৃষ্ঠা ছয়
  • জলধরবাবুর প্রসাদগুণে পরিপূর্ণ দরদী ভাষায় হিমালয়ের ভ্রমণকাহিনীগুলি যখন মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হ’তে লাগল, পাঠকসমাজ তা গ্রহণ করলে সাগ্রহ আনন্দে। তার আগে আর কোন ভ্রমণকাহিনী এত আদর পায় নি, এত লোকপ্রিয় হয় নি। সেই সময়েই তিনি সাহিত্যক্ষেত্রে লাভ করেন নিজের ন্যায্য আসন। কিন্তু কেবল ভ্রমণকাহিনী নয়, ছোটগল্প রচনাতেও প্রকাশ পেত তাঁর যথেষ্ট মুনশীয়ানা। এক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতাপূর্ণ ভাষা পাঠকদের আকৃষ্ট করত তো বটেই, তার উপরে বোঝা যেত, ছোটগল্পের আর্টও তাঁর ভালোরকমই জানা আছে।
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়, জলধর সেন, যাঁদের দেখেছি - হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক— নিউ এজ পাবলিশার্স লিমিটেড, কলিকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৫৯-১৬০

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]