জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি ১৯০৫-১৯৪৭
জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি (১৯০৫-৪৭) হচ্ছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী রচিত ইতিহাসকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ বই। গ্রন্থটি প্রচলিত অর্থে ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং ঘটনার তাৎপর্য অনুসন্ধানে নিয়োজিত। ৮১৫ পৃষ্ঠার বইটি ২০১৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটিতে লেখক ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে ১৯৪৭-এর দেশভাগের মধ্যবর্তী বিয়াল্লিশ বছরের সময়প্রবাহে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ব্যক্তির ভূমিকাকে আলোচনায় এনেছেন, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অপরিসীম আত্মত্যাগের ইতিহাসকে বিবেচনায় রেখেছেন, তবে এসব অভিমুখের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও তাৎপর্যকে নতুনভাবে বর্তমান কালের নিরিখে যাচাই করেও দেখেছেন। লেখক ইতিহাসের আবরণে অতিকথন ও কিংবদন্তি নির্মাণের পথ প্রত্যাখ্যান করে উপনিবেশিত ভারতবর্ষের উত্তাল সময়ের রাজনৈতিক গতিবিধির প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় পর্ব ও নেপথ্য প্রভাবককে বিশ্লেষণ সাপেক্ষে যথাসম্ভব নিরাসক্তভাবে তুলে এনেছেন।
উক্তি
[সম্পাদনা]- সবমিলিয়ে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন বাংলার জন্য একটা উজ্জ্বল সময়। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার আড়ালে একটি অন্ধকারও তৎপর হয়ে উঠছিল। আন্দোলনে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছিল; পরবর্তীতে সেই ব্যবহারটা কমে নি, বরঞ্চ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মীয় বিভাজন ভাষার ভিত্তিতে গড়ে-ওঠা জাতীয়তার ইহজাগতিকবোধকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া শুরু করেছিল। ক্রমে সাম্প্রদায়িকতা চলে এলো। ব্রিটিশ শাসকেরা সাম্প্রদায়িকতার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু তাদের উৎসাহদান কাজে লাগতো না যদি আন্দোলনের ভেতরেই সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে বিকশিত হবার সুযোগ ও সম্ভাবনা বিদ্যমান না থাকতো। সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধির ইতিহাসটা মর্মান্তিক; এবং তার পরিণতি হচ্ছে সাতচল্লিশের অতিনির্মম বিভাজন। ওপরতলার মানুষেরা ১৯০৫কে নির্মূল করবার চেষ্টার মধ্য দিয়ে নিজেদের অজান্তেই ১৯৪৭কে অনিবার্য করে তুলেছে। স্বর্ণযুগ আগত মনে হয়েছিল, কিন্তু আসে নি। এলো না।
১৯০৫এ রাজনৈতিক পক্ষ ছিল দু'টি, ব্রিটিশ শাসক ও শাসিত জনগণ; ১৯০৬এ নিখিল-ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে ভিত্তি তৈরী হলো তিনটি পক্ষের—ব্রিটিশ শাসক, শাসিত হিন্দু এবং শাসিত মুসলমান।- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি ১৯০৫-১৯৪৭, প্রকাশক: সংহতি প্রকাশন, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা:২৫
- তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এটাও যে, আনন্দমঠ যখন বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হচ্ছিল তখন কেবল মুসলমান নয়, ইংরেজ এবং মুসলমান উভয়কেই শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল; কিন্তু পুস্তকাকারে প্রকাশের সময় (১৮৮২) ছবিটা বদলে যায়, শত্রু ইংরেজ নয়, শুধু মুসলমানই পরিণত হয় শত্রুতে, সেখানে 'মার মার মুসলমান মার' ধ্বনি শোনা যেতে থাকে। আনন্দমঠ-এর সর্বত্র প্রবল জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবাহিত। কিন্তু সে-জাতীয়তাবাদ হিন্দু জাতীয়তাবাদ বৈ নয়।
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি ১৯০৫-১৯৪৭, প্রকাশক: সংহতি প্রকাশন, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা: ২৮
- অবিভক্ত ভারতের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধানের যথার্থ উপায় ছিল ভারত- পাকিস্তান বিভাজন নয়, ভারতে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী স্বাধীন রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রতিষ্ঠা, যে-রাষ্ট্রগুলো স্বেচ্ছায়, এবং বিচ্ছিন্ন হবার অধিকার সংরক্ষিত রেখে, একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারতো, যেমনটি বর্তমানে ইউরোপের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো গড়বার চেষ্টা করছে।
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি ১৯০৫-১৯৪৭, প্রকাশক: সংহতি প্রকাশন, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা: ৩৮
- 'বন্দেমাতরম' রণধ্বনি তাঁরই (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের) রচনা। গানটিতে তিনি যে মাতৃভূমির বন্দনা করেছেন, সেটি মোটেই সারা ভারতের নয়, অতিঅবশ্যি বাংলাদেশের; আর যে সপ্তকোটী কণ্ঠ এবং দ্বিসপ্তকোটী বাহুর উল্লেখ করেছেন সেই সাত কোটি তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা বটে, যার মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা হিন্দুর কিছুটা হলেও বেশী।
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি ১৯০৫-১৯৪৭, প্রকাশক: সংহতি প্রকাশন, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা: ৪০