বিষয়বস্তুতে চলুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতে অক্সব্রিজ শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণে এটি স্থাপিত হয়। এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই। সূচনালগ্নে বিভিন্ন প্রথিতযশা বৃত্তিধারী ও বিজ্ঞানীদের দ্বারা কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রিত হবার প্রেক্ষাপটে এটি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে স্বীকৃতি পায়। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নানা সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ভূমিদান এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের ভূমিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও বিতর্ক প্রচলিত আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা

[সম্পাদনা]
  • বিভিন্নজন ভিন্ন ভিন্ন কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। পশ্চিম বাংলা ও বিহার অঞ্চলের কিছু মুসলমানও বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল ভিন্নতর। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁদের বা তাঁদের সন্তানসন্ততিদের কোনো কাজে আসবে না। যদি কোনো উপকার হয়, সেটা হবে পূর্ব বাংলার মানুষেরই। যে মুসলিম জনগোষ্ঠী এ রকম চিন্তা করত, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মাওলানা আকরম খাঁ, ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, মৌলভি আবুল কাশেম, মৌলভি লিয়াকত হোসেন প্রমুখ। তদানীন্তন পূর্ব বাংলারও বেশ কিছু মুসলমানের মধ্যে এমন ধারণা ছিল যে পূর্ব বাংলায় যথেষ্ট পরিমাণ ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পাস ছাত্র নেই, যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করে ওই টাকা দিয়ে পূর্ব বাংলায় আরও কিছু স্কুল ও কলেজ স্থাপন করলে এই অঞ্চলের মুসলিম ছেলেমেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়ার সুযোগের পরিধিটা বাড়বে। তাঁরা আরও ভাবতেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কারণে মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার জন্য যে বাজেট সরকার থেকে আসে, তা অনেকাংশেই কমে যাবে।
    • প্রাবন্ধিক কুলদা রায় তাঁর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে। [১]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

[সম্পাদনা]
  • কেউ কেউ কোনো প্রমাণ উপস্থিত না করেই লিখিতভাবে জানাচ্ছেন যে, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা হয়। ও রকম একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি ছিল অসম্ভব, কেননা সেদিন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন না। ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ সিটি অব প্যারিস জাহাজযোগে রবীন্দ্রনাথের বিলাতযাত্রার কথা ছিল। তাঁর সফরসঙ্গী ডাক্তার দ্বিজেন্দ্রনাথ মিত্র জাহাজে উঠে পড়েছিলেন, কবির মালপত্রও তাতে তোলা হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু আকস্মিকভাবে ওইদিন সকালে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে মাদ্রাজ থেকে তাঁর মালপত্র ফিরিয়ে আনা হয়। কলকাতায় কয়েক দিন বিশ্রাম করে ২৪ মার্চ রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে চলে আসেন এবং ২৮ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে সেখানে বসে ১৮টি গান ও কবিতা রচনা করেন।
    • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ। [২]
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এ ধরনের একটি অভিযোগ প্রায়ই অনেকে করে থাকেন। তারা উল্লেখ করেন, ‘১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতা গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়।’ অনেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই জনসভার রেফারেন্স হিসেবে দিয়েছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরীর লেখা বই, আবার অনেকেই আবুল আসাদের ‘একশো বছরের রাজনীতি’ বইয়ের রেফারেন্সও দিয়েছেন। যদিও নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বইয়ে এমন কিছু উল্লেখ নেই, আবার আবুল আসাদ কোনো তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই এ অভিযোগটি করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা’ নামে একটি বইয়ে মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন, কপি পেস্টের মাধ্যমে একই কথা উল্লেখ করেন কোনো তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য এ জেড এম আবদুল আলী একটি পত্রিকায় অভিযোগটির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, যারা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এ অভিযোগটি করছেন, তারা তাদের রচনায় কোনো সূত্রের উল্লেখ করেননি।
  • রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক কোটি আলাপের বিকল্প বাদ দিয়ে যারা শুধু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন কিনা– এ বিষয়ে আলাপ তোলে, তারা এক অর্থে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। তাদের জন্য আমার আফসোস হয় এই ভেবে, তারা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার রস আস্বাদনে চিরবঞ্চিত। দুনিয়ায় এত এত রস থাকতে এখানে কেবল রবীন্দ্রনাথের কথাই বলতে হলো। কারণ, এরা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে লিপ্ত অথচ মজাটা লুটতে পারছে না। আমি মনে করি, যদি আবিষ্কৃত হয়– রবীন্দ্রনাথ কখনও সরাসরি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বলেছেন, তাতে রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠা বা সততা বা সম্মান একবিন্দুও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এমনকি সে রকম কিছু হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের আদর-আপ্যায়ন ও মর্যাদা প্রদান সম্পূর্ণ বৈধ থাকত। আজকের দিনের সংকীর্ণ রাজনীতির উত্তেজনায় কিংবা সংকীর্ণ রাজনীতির বিরোধিতার প্রয়োজনে যারা ঠাকুরকে সহজ শিকার হিসেবে নাকাল করতে চায়, তারা ঠিক আলাপযোগ্য নয়। পুরো ব্যাপারকে একশ বছর আগের বাস্তবতার এক বড় পটভূমিতে স্থাপন করে দেখা নিশ্চয় তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু সে ক্ষমতা এ জাতীয় ব্যক্তিদের থাকার কথা নয়।

জমিদান

[সম্পাদনা]
  • কোনও মুসলমান ধনীর কাছ থেকেই ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডাইরেক্টলি কোনও ফাইন্যান্সিয়াল কন্ট্রিবিউশন পায় নাই। সলিমুল্লাহ হল যে তৈরি হল তা পুরোই সরকারের টাকায়। নওয়াব পরিবারের টাকায় নয়; জায়গাতেও নয়। রমনায় যে জায়গায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি, তা পুরোটাই খাসমহল এবং সরকারের জমি, সেটেলমেন্ট রিপোর্টে তাই আছে।
    • আব্দুর রাজ্জাকঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ : ‘অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা ও অন্যান্য বইয়ে। [৫]
  • শতবর্ষের বইয়ের জন্য বিভিন্ন নথি ঘাঁটাঘাটি করেছি আমরা। ঢাকার নবাব ৬০০ একর জমি দিয়েছেন এমন কোনও তথ্য সরাসরি কোথাও উল্লেখ নেই।... তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় জমি পেল কোথা থেকে? তখন দেখতে পাই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন সময় জমি লিজ নিয়েছে। এই লিজের বিনিময়ে যে পয়সা-কড়ি দেবার কথা সেটাও দিয়েছে।...এটি কি মিথ নাকি রিয়েলিটি? এটা আমাদের তালাশ করতে হবে। তাই কোনও উৎস থেকে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে বলাটা ঠিক হবে না। যদি কোথাও না পাই তবে কীভাবে বলি নবাব সলিমুল্লাহ এই ৬০০ একর জমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছে?...বিষয়টি এমন হতে পারে ব্রিটিশ সরকার যখন ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গে রাজধানী করে তখন নবাবরা হয়তো সরকারকে কোনও অনুদান দিয়ে থাকতে পারেন।
    • “শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য” নামক বইয়ের সহযোগী সম্পাদক মি. বাছির বিবিসি বাংলাকে এই কথা বলেন। [৬]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]