দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস
অবয়ব
দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস একটি বই, যা হেনরি মিয়ার্স এলিয়টের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে মধ্যযুগীয় পারস্য ইতিহাসগ্রন্থগুলোর অনুবাদ সংকলন করা হয়েছে। এটি মূলত ১৮৬৭ থেকে ১৮৭৭ সালের মধ্যে লন্ডন থেকে মোট আটটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এলিয়ট নিজে এই অনুবাদের কাজগুলো আংশিকভাবে তদারকি করেছিলেন। পরে তার মৃত্যুর পর জন ডাওসন সেই কাজকে আরও প্রসারিত করেন এবং বইগুলো সম্পাদনা করেন।
উক্তি
[সম্পাদনা]প্রথম খণ্ড: ভূমিকা
[সম্পাদনা]- এই অনুবাদগুলো অনেকের হাত ঘুরে এসেছে। অল্প কিছু অংশ স্যার এইচ. এলিয়টের নিজের হাতের লেখায় পাওয়া যায়, আবার কিছু অংশ বিভিন্ন ইংরেজ অফিসার তৈরি করেছেন। তবে এর বেশিরভাগ কাজই মুন্সিদের বলে মনে হয়। স্যার এইচ. এলিয়ট নিজে যে অনুবাদগুলো করেছেন (যেগুলো যথাস্থানে উল্লেখ করা থাকবে), সেগুলো বাদে আমি বাকি প্রতিটি অনুবাদ মূল পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে দেখেছি। আমাকে অসংখ্য এবং বড় বড় সব ভুল সংশোধন করতে হয়েছে। তবে এত সতর্কতার পরেও ভয় হয় যে কিছু ভুল হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে। কারণ, একজন মূল অনুবাদক কোনো লেখাকে যে রূপ দান করেন, একজন সংশোধকের পক্ষে সেই প্রভাব থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।
- দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস - প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১-তে জন ডাওসনের নোট।
- সঞ্জয় গর্গ সম্পাদিত স্টাডিজ ইন ইন্দো-মুসলিম হিস্ট্রি বাই এস. এইচ. হোডিওয়ালা ভলিউম ১: আ ক্রিটিক্যাল কমেন্টারি অন এলিয়ট অ্যান্ড ডাওসন’স হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস (খন্ড ১-৪) অ্যান্ড ইউল অ্যান্ড বার্নেল’স হবসন-জবসন বইতে উদ্ধৃত; রাউটলেজ থেকে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ৭।
- যেখানে মুসলমানরা অল্প সময়ের জন্য হলেও ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিল, সেখানেই তাদের চিরচেনা গোঁড়ামি আর নিষ্ঠুরতা ফুটে উঠেছে। দেবলে মন্দিরগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে মসজিদ গড়ে তোলা হয়; টানা তিন দিন ধরে চলে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ; বহু মানুষকে বন্দি করা হয় এবং বিপুল ধনসম্পদ লুট করা হয়.... নাইরুন স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করা সত্ত্বেও সেখানকার মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং মসজিদ তৈরি করা হয়... মন্দিরগুলোর সঙ্গে 'খ্রিস্টানদের গির্জা অথবা ইহুদিদের সিনাগগের' মতো আচরণ করা হয়েছিল...।
- এলিয়ট এবং ডাওসন, দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস, প্রথম খণ্ড, ৪৬৮–৯ পৃষ্ঠা; এস. বালকৃষ্ণেরইনভেডারস অ্যান্ড ইনফিডেলস: ফ্রম সিন্ধ টু দিল্লি : দ্য ৫০০- ইয়ার জার্নি অফ ইসলামিক ইনভেশনস (নিউ দিল্লি : ব্লুমসবারি, ২০২১)।
এলিয়টের প্রস্তাবনা
[সম্পাদনা]- ডায়োনিসিয়াসের সেই কৃত্রিম সংজ্ঞা যদি সঠিক হয় যে, "ইতিহাস হলো উদাহরণের মাধ্যমে দর্শন শিক্ষা," তবে বলতে হয় কোনো নেটিভ বা ভারতীয় ঐতিহাসিক নেই; খুব অল্প সংখ্যকই এই উচ্চ মানের ধারেকাছে পৌঁছাতে পেরেছেন। আমাদের কাছে উদাহরণের ভাণ্ডার প্রচুর, কিন্তু তার বেশিরভাগই অতি নিম্নমানের। এমনকি সেই উদাহরণগুলোর মধ্যেও বর্ণনাকারীর বংশগত, দাপ্তরিক আর সাম্প্রদায়িক সংস্কারের কারণে প্রকৃত সত্য ঢাকা পড়ে গেছে। কিন্তু যে দর্শনের কাজ হলো অতীতের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের উপকারের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া, রাজনৈতিক লেনদেনের উৎস ও ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা এবং ভবিষ্যতের জন্য বিজ্ঞ পরামর্শ দেওয়া, সেই দর্শনের কোনো চিহ্ন খোঁজা এখানে বৃথা। আমাদের ভারতীয় ইতিহাস লেখকদের রচনায় ঘরোয়া বা সামাজিক ইতিহাসের ছিটেফোঁটাও নেই। ইবনে খালদুন ছাড়া প্রায় সব মুসলমান ঐতিহাসিকের ক্ষেত্রেই এই কথাটি খাটে। সমাজ তার প্রথাগত রীতি, স্বীকৃত অধিকার, গঠনগত উপাদান কিংবা পারস্পরিক সম্পর্কের নিরিখে তাদের কাছে কখনোই বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠেনি। এমনকি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক শ্রেণি, লোকজ প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত জীবন অথবা প্রাত্যহিক মেলামেশার বিষয়গুলোও তারা এড়িয়ে গেছেন। বাণিজ্য, কৃষি, অভ্যন্তরীণ পুলিশ ব্যবস্থা ও স্থানীয় বিচারব্যবস্থা সম্পর্কেও তাদের লেখায় তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের অবস্থা অথবা সমাজের উচ্চবিত্তদের নিচের স্তরের যেকোনো পর্যায়ের মানুষের কথা তুলে ধরে এমন কোনো তথ্য, গল্প, বক্তব্য কিংবা মন্তব্য তাদের কাছে অত্যন্ত নগণ্য মনে হয়েছে। তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে কেবল আমির-ওমরাহ, মন্ত্রী, সিংহাসন আর সাম্রাজ্যের ক্ষমতার লড়াইয়ের কাহিনী। ভারতীয় ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে এমন কিছু খুব কমই আছে যা আমাদের এই জমকালো আবরণের নিচে প্রবেশ করতে এবং একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ও কঠোর রক্তপিপাসু আইনের বাস্তব প্রয়োগ দেখতে সাহায্য করে। এছাড়া জাতির বৃহত্তর অংশের ওপর এই ক্ষতিকর প্রভাব ও সংস্থাগুলোর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা বোঝার উপায়ও নেই।
- দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস - প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯-২০।
- ভেঙ্কট ধুলিপালা রচিত দ্য পলিটিক্স অফ সেকুলারিজম: মিডিয়েভাল ইন্ডিয়ান হিস্টোরিওগ্রাফি অ্যান্ড দ্য সুফিস বইতে উদ্ধৃত; ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসন থেকে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ৪৫-৪৬।
- তবে আমরা যদি বর্তমান ভারতের মুসলমান রাজ্যগুলোর দিকে তাকাই এবং সেখানকার শাসকদের চরিত্র ও তাদের প্রজাদের অবস্থা পরীক্ষা করি, তবে সমরূপ পরিস্থিতিতে প্রাচীন ও আধুনিক সময়ের মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাব। আমরা দেখি যে রাজারা এমনকি আমাদের হাতে তৈরি রাজারাও অলসতা আর লম্পটতায় ডুবে আছেন। এই ধরনের শাসকদের অধীনে বিচারের উৎস যে কলুষিত হবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেখানে হিংসা আর অত্যাচার ছাড়া কখনোই সরকারি রাজস্ব আদায় হয় না; গ্রামগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অধিবাসীদের অঙ্গচ্ছেদ করা হয় অথবা ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পদস্থ কর্মচারীরা সুরক্ষা দেওয়ার বদলে নিজেরাই প্রধান ডাকাত আর দখলদার হয়ে ওঠে। চাটুকার আর নপুংসকরা লুণ্ঠিত প্রদেশগুলোর সম্পদ নিয়ে মত্ত থাকে। আর গরিব মানুষ অত্যাচারীর অন্যায় আর দর্পিত মানুষের অবজ্ঞার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার পায় না। আমাদের চোখের সামনে যখন আমরা এই দৃশ্যগুলো দেখি, যেখানে ব্রিটিশ সরকারের আধিপত্য, তাদের ভালো উদাহরণ এবং তাদের হস্তক্ষেপের ভয় এই অব্যবস্থাকে থামিয়ে দেবে বলে আশা করা যায়, তখন কি আমরা অবাক হতে পারি যে অতীতের রাজারা, যখন তারা এমন কোনো বাধানিষেধের অধীনে ছিলেন না, তখন তারা তাদের প্রজাদের সম্পদ, শান্তি আর সমৃদ্ধির কথা আরও কম ভাবতেন?
- দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস - প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০।
- ডেভিড জোনস এবং মিশেল মারিয়ন সম্পাদিত দ্য ডায়নামিক্স অফ কালচারাল কাউন্টারপয়েন্ট ইন এশিয়ান স্টাডিজ বইতে উদ্ধৃত; স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক প্রেস থেকে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ৯৩।
- এই একটি খণ্ডের ছোট উদ্ধৃতিগুলোর মধ্যেও আমরা যে সামান্য আভাস পাই, সেখানে মুসলমানদের সাথে তর্কের জন্য হিন্দুদের হত্যা করা, শোভাযাত্রা, উপাসনা আর স্নানের ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞা জারি এবং অন্যান্য অসহিষ্ণু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া মূর্তি ভাঙা, মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া, জোরপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন ও বিয়ে, নির্বাসন আর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং এসবের আদেশ দেওয়া অত্যাচারীদের ইন্দ্রিয়পরায়ণতা আর মদ্যপানের কাহিনী আমাদের দেখায় যে, এই চিত্রটি মোটেও অতিরঞ্জিত নয়। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে আমাদের এই বাস্তব চিত্রটি খুঁজে নিতে হচ্ছে সাধারণ ঘটনাবলির বিশাল স্তূপ থেকে, যা এমন লেখকদের দ্বারা লিপিবদ্ধ যারা কোনো মহৎ গুণের প্রতি সহানুভূতিশীল নন এবং কোনো অন্যায়ের প্রতি তাদের ঘৃণা নেই। অন্য জাতিগুলোও একই ধরনের নৃশংসতা প্রদর্শন করে, কিন্তু সেখানে অন্তত কেউ না কেউ ঘৃণা আর ক্ষোভের সাথে সেই ঘটনাগুলোর নিন্দা করে।
- দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস - প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১।
- এই অভাবগুলো আরও বেশি দুঃখজনক হয়ে ওঠে যখন লেখক একজন হিন্দু হন। তার কাছ থেকে আমরা হয়তো জানতে পারতাম যে শাসিত শ্রেণির অনুভূতি, আশা, বিশ্বাস, ভয় আর আকাঙ্ক্ষাগুলো আসলে কী ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনি সচরাচর আদেশ অথবা নির্দেশের বাইরে কিছু লেখেন না এবং তার প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত নিপুণ ও দাসসুলভভাবে সাজানো হয় একজন উদ্ধত মুসলমান পৃষ্ঠপোষকের অহমিকা তুষ্ট করার জন্য। তার ভাষা আর রচনার কৃত্রিমতা ও আড়ষ্টতা ছাড়া তার ধর্ম কিংবা জাতির পরিচয় পাওয়ার মতো তেমন কিছু থাকে না; যা আসলে দেখায় যে এই বিদেশি পোশাক তার ওপর কতটা বেমানান। তার কাছে একজন হিন্দু হলো "কাফের" বা অবিশ্বাসী এবং একজন মুসলমান হলো "সত্যবিশ্বাসী"। এমনকি পঞ্জিকার পবিত্র সন্তদের নিয়ে তিনি একজন গোঁড়া ধর্মপ্রাণ মানুষের মতোই আবেগ নিয়ে লেখেন। তার বর্ণনায় যখন হিন্দুরা মারা যায়, তখন তাদের "আত্মাকে নরকে পাঠানো হয়" এবং যখন কোনো মুসলমানের একই দশা হয়, তখন তিনি "শাহাদাতের সুধা পান করেন"। তিনি তার বিজেতাদের নির্দিষ্ট শব্দাবলি আর অতিরঞ্জিত ভাষার সাথে এতটাই মিশে গেছেন যে তিনি "ইসলামের আলোয় বিশ্ব আলোকিত হওয়া", "বরকতময় মহরম" কিংবা "পবিত্র গ্রন্থ"-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি সাধারণত "বিসমিল্লাহ" দিয়ে লেখা শুরু করেন এবং একত্ববাদের সাধারণ ঘোষণা দেন। এরপর পবিত্র নবী, তার শিষ্য ও বংশধরদের প্রশংসা করেন এবং মুসলমানদের মতো গভীর ভক্তি ও নিষ্ঠা প্রদর্শন করেন।
- দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস - প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১-২২।
- তারা আমাদের এদেশীয় প্রজাদের এই বিষয়ে আরও সচেতন করে তুলবে যে, আমাদের শাসনের উদারতা আর ন্যায়বিচারের ফলে তারা আসলে কতটা অসীম সুবিধা ভোগ করছে... আমাদের সরকারের অধীনে তারা সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং যেকোনো বিজিত জাতির চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। তা সত্ত্বেও যে বাগাড়ম্বরকারী বাবুরা দেশপ্রেম আর তাদের বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে চিৎকার করে, তাদের কথা আমাদের আর শুনতে হবে না। তারা যদি এই বইগুলোর যেকোনো একটির গভীরে প্রবেশ করে, তবে এই তরুণ ব্রুটাস আর ফোকিওনদের এটা শিখতে খুব কম সময় লাগবে যে অন্ধকারের সেই দিনগুলোতে (যে দিনগুলো ফিরে পাওয়ার জন্য তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে), তাদের এই হাস্যকর কল্পনাগুলো মুখে আনলে কেবল নীরবতা আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য জুটত না, বরং তার বদলে ফুটন্ত সিসা ঢালা অথবা শূলে চড়ানোর মতো কঠোর শাস্তি পেতে হতো।
- দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস - প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২-২৩।
- পার্থ চট্টোপাধ্যায় রচিত এম্পায়ার অ্যান্ড নেশন: সিলেক্টেড এসেস বইতে উদ্ধৃত; কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ৮২।
- এই ভাবনাগুলো এবং আরও অনেক বিষয় যা এই বইগুলো মন দিয়ে পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন, তা অতীত রাজবংশগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা জমকালো বিভ্রান্তিগুলো দূর করতে সাহায্য করবে। আমাদের শাসননীতি এবং প্রতিকূল আবহাওয়া আমাদের এই দেশকে স্থায়ী আবাসে পরিণত করতে কিংবা এর উন্নতি থেকে ব্যক্তিগত তৃপ্তি বা মুনাফা অর্জনে বাধা দেয়। এছাড়া একটি বিদেশি শাসনব্যবস্থার অনেক ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক, যেখানে ভাষা, গায়ের রং, ধর্ম, আচার-আচরণ আর আইন শাসক এবং প্রজার মধ্যে সব ধরনের সহজাত সহমর্মিতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও, আমাদের শাসনের এই মাত্র আধ-শতাব্দীর মধ্যেই আমরা সাধারণ মানুষের প্রকৃত মঙ্গলের জন্য যা করেছি, তা আমাদের পূর্বসূরিরা এই দেশকে নিজেদের দেশ হিসেবে গ্রহণ করার পরেও তার দশ গুণ বেশি সময়েও করে উঠতে পারেনি। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে পাঠক ভবিষ্যতের জন্য এই আশা খুঁজে পাবেন যে, এ পর্যন্ত আমাদের প্রচেষ্টায় যে সাফল্য এসেছে তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা ভারতের শাসক হিসেবে আমাদের মহান লক্ষ্য পূরণের জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাব।
- দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস - প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬-২৭।
- ক্যাথরিন স্মিথ ডিহল রচিত আর্লি ইন্ডিয়ান ইমপ্রিন্টস বইতে উদ্ধৃত; স্কেয়ারক্রো প্রেস থেকে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ৩৬৫।
সপ্তম খণ্ড: শাহজাহান থেকে মুহাম্মদ শাহের রাজত্বের শুরুর বছরগুলো পর্যন্ত
[সম্পাদনা]- হিন্দু লেখকদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কাফেরদের সব উপাসনালয় আর এই নিন্দিত লোকগুলোর বড় বড় মন্দিরগুলো এমনভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এত কঠিন একটি কাজ কত নিপুণভাবে শেষ হয়েছে তা দেখে অবাক হতে হয়। জাঁহাপনা নিজে অনেক কাফেরকে সফলভাবে পবিত্র কলমা শিক্ষা দেন। সাম্রাজ্যের সব মসজিদ সরকারি খরচে মেরামত করা হয়। সেগুলোর প্রতিটিতে ইমাম, আযান দেওয়ার জন্য মুয়াজ্জিন এবং খুতবা পাঠকদের নিয়োগ করা হয়েছে; ফলে এই খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
- বখতাওয়ার খানের মির-আত-ই আলম, মির-আত-ই জাহান-নুমা; এলিয়ট এবং ডাওসন, সপ্তম খণ্ড, ১৫৯ পৃষ্ঠা।
অষ্টম খণ্ড: ভারতে মুসলমান সাম্রাজ্যের শেষ পর্যন্ত
[সম্পাদনা]- আগ্রা শহরে একটি বিশাল মন্দির ছিল, যেখানে দামী রত্ন আর মূল্যবান মুক্তো দিয়ে সাজানো অসংখ্য মূর্তি ছিল। প্রতি বছর কয়েকবার দূর-দূরান্ত থেকে কাফেররা এই মন্দিরে মূর্তি পূজা করতে আসত। মন্দিরে প্রবেশের বিনিময়ে প্রত্যেকের জন্য সরকারকে একটি নির্দিষ্ট ফি দিতে হতো। যেহেতু তীর্থযাত্রীদের ভিড় ছিল প্রচুর, তাই তাদের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থ আদায় হতো এবং তা রাজকোষে জমা পড়ত। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বের শেষ পর্যন্ত এবং আওরঙ্গজেবের শাসনের শুরুতেও এই নিয়ম চালু ছিল; কিন্তু আওরঙ্গজেব যখন বিষয়টি জানতে পারলেন, তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন এবং এই প্রথা বন্ধ করে দিলেন। তার দরবারের প্রধান আমীর-ওমরাহরা তাকে জানিয়েছিলেন যে, এই খাত থেকে বিশাল অংকের টাকা আদায় হয় এবং এটি বন্ধ করলে রাষ্ট্রের আয় অনেক কমে যাবে। সম্রাট জবাবে বললেন, ‘তোমরা যা বলছ তা ঠিক, কিন্তু আমি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি। যদি তোমরা রাজস্ব বাড়াতে চাও, তবে জিজিয়া কর আদায় করাই হবে তার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায়। এর মাধ্যমে মূর্তিপূজা দমন করা যাবে, ইসলাম ধর্ম আর সত্য বিশ্বাসের সম্মান বাড়বে, আমাদের কর্তব্য পালন করা হবে, রাষ্ট্রের আয় বাড়বে এবং কাফেররা অপদস্থ হবে।’ আমীররা সবাই এই প্রস্তাবে পূর্ণ সমর্থন জানালেন। এরপর সম্রাটের আদেশে সোনা আর রুপার সব মূর্তি ভেঙে ফেলা হলো এবং মন্দিরটি ধ্বংস করে দেওয়া হলো।
- কানজুল-মাহফুজ (কানজু-ল মাহফুজ); এলিয়ট এবং ডাওসন, অষ্টম খণ্ড, ৩৮-৩৯ পৃষ্ঠা।
বইটির বিষয়ে বিভিন্ন উক্তি
[সম্পাদনা]- হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মন্দির ধ্বংসের সমসাময়িক প্রমাণের একটি বড় অংশ ব্রিটিশ শাসনামলে অনূদিত ও প্রকাশিত ফারসি উপকরণগুলোর মধ্যেই পাওয়া যায়। বিশেষ করে স্যার হেনরি এম. এলিয়ট সম্পাদিত আট খণ্ডের হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে। জন ডাওসনের সহায়তায় এলিয়ট নিজেই এই অনুবাদের বড় একটি অংশ তদারকি করেছিলেন। তবে এলিয়ট ব্রিটিশ শাসনের ন্যায়বিচার ও দক্ষতাকে তার আগের মুসলিম শাসকদের নিষ্ঠুরতা আর স্বৈরাচারের সাথে তুলনা করতে চেয়েছিলেন; তাই ভারতীয় ইতিহাসের “মুসলমান” শাসনকালের প্রতি তার বিন্দুমাত্র সহানুভূতি ছিল না।
- রিচার্ড এম. ইটন (ডিসেম্বর ২২, ২০০০)। "ট্যাম্পল ডেসিক্রেশন ইন প্রি-মডার্ন ইন্ডিয়া" (PDF)। ফ্রন্টলাইন।
- এলিয়টের মন্তব্যগুলো এতটাই অগভীর আর অসার যে আমাদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয় যে, তিনি যে ফারসি ঐতিহাসিকদের ঘৃণা করতেন, তাদের নিয়ে হয়তো তিনি মন দিয়ে পড়াশোনা করতে চাননি অথবা পারেননি।
- মোহাম্মদ হাবিব, পলিটিক্স অ্যান্ড সোসাইটি ডিউরিং দ্য আর্লি মিডিয়েভাল পিরিয়ড: কালেক্টেড ওয়ার্কস অফ প্রফেসর মোহাম্মদ হাবিব, ভলিউম ১, পৃষ্ঠা ৭।
- হিন্দুরা যাদের নিজের ধর্ম আর পূর্বপুরুষের শত্রু বলে মনে করতে শিখেছে, তাদের ঘৃণা করাকে নিজেদের কর্তব্য বলে মনে করে; অন্যদিকে মুসলমানরা একসময় শাসক জাতি ছিল—এই ভুল বিশ্বাসে প্রলুব্ধ হয়ে তারা এখন সংখ্যালঘু হয়ে পড়াকে অসহ্য অন্যায় বলে মনে করে। দুজনেই বোকা! আটশ বছর আগের মুসলমানরা যদি বর্ণনার মতো খারাপও হয়ে থাকে, তবে তাদের কাজের জন্য বর্তমান প্রজন্মকে দায়ী করার কি কোনো মানে হয়? বর্তমানের হিন্দুর সাথে হর্ষবর্ধন অথবা অশোকের, কিংবা আধুনিক মুসলমানের সাথে শিহাবুদ্দিন অথবা মাহমুদের সম্পর্কটা কেবল একটা কাল্পনিক বাঁধন ছাড়া আর কিছুই নয়।
- এলিয়ট ও ডাওসনের কাজের প্রভাব নিয়ে মোহাম্মদ হাবিবের মন্তব্য; পলিটিক্স অ্যান্ড সোসাইটি ডিউরিং দ্য আর্লি মিডিয়েভাল পিরিয়ড: কালেক্টেড ওয়ার্কস অফ প্রফেসর মোহাম্মদ হাবিব, ভলিউম ১, পৃষ্ঠা ১২।
- অমলেন্দু মিশ্র রচিত আইডেন্টিটি অ্যান্ড রিলিজিয়ন: ফাউন্ডেশনস অফ অ্যান্টি-ইসলামিজম ইন ইন্ডিয়া বইতে উদ্ধৃত; সেজ পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ২১০।
- মধ্যযুগীয় ভারতকে অনুধাবন করার জন্য স্যার এইচ. এম. এলিয়টের ভাবনায় শুরু করা এবং অধ্যাপক ডাওসনের অক্লান্ত পরিশ্রমে শেষ হওয়া অমূল্য দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস-এর আটটি খণ্ডে ডুব দেওয়ার চেয়ে ভালো আর কোনো উপায় নেই। ফারসি রাজদরবারের ইতিহাসবিদদের চোখে দেখা ভারতীয় জীবনের এক প্রতিচ্ছবি এটি। তবে এটি একটি খনির মতো যেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, এটি কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস নয়। কালানুক্রমের বড় বড় ফাঁক, একই কথার পুনরাবৃত্তি আর অনেক কিছু বাদ যাওয়ার কারণে সাধারণ পাঠকদের জন্য এটি সহজ কোনো নির্দেশিকা নয়।
- স্ট্যানলি লেন-পুল রচিত মিডিয়েভাল ইন্ডিয়া আন্ডার মুহাম্মাদান রুল (১৯০৩), পৃষ্ঠা ৫-৬।
- এ. ভি. উইলিয়ামস জ্যাকসন এবং ভিনসেন্ট আর্থার স্মিথ রচিত হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া: দ্য মোহামেডান পিরিয়ড অ্যাজ ডেসক্রাইবড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস বইতে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ৫-৬।
- কে. এস. লাল রচিত স্টাডিজ ইন মিডিয়েভাল ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি বইতে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ৮৪; এছাড়াও দ্য লেগেসি অফ মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া বইয়ের ৫৪ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত।
- আধুনিক ভারতের কিছু ঐতিহাসিকদের পক্ষ থেকে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় ওঠা সত্ত্বেও, এলিয়ট ও ডাওসনের এই মহান কাজ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উর্দু কিংবা হিন্দি অনুবাদের তুলনায় এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পণ্ডিতরা এখনও এলিয়টের এই গুরুত্বপূর্ণ খণ্ডগুলো থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন এবং এগুলো নিয়ে কাজ করছেন...
- লাল, কে. এস. (১৯৯২)। দ্য লেগেসি অফ মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া। নিউ দিল্লি: আদিত্য প্রকাশন। পৃষ্ঠা ৫৪।
- বলা যেতে পারে যে আধুনিক সময়ে মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসের চর্চা প্রায় এক শতাব্দী আগে শুরু হয়েছিল। ১৮৬০-এর দশকে যখন এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গলের পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগের ইন্দো-পারসিক ইতিহাসগ্রন্থগুলো বিবলিওথিকা ইন্ডিকা সিরিজে ছাপা শুরু হয় এবং ১৮৬৭-৭৭ সালে এলিয়ট ও ডাওসনের হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস প্রকাশিত হয়। এলিয়টের এই আটটি বড় খণ্ডে তৎকালীন পরিচিত ফারসি ইতিহাসগ্রন্থগুলোর অধিকাংশেরই অনুবাদ সংকলিত ছিল এবং শীঘ্রই এটি মধ্যযুগের ইতিহাস গবেষকদের কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মূল ফারসি গ্রন্থগুলোতে মুসলিম বিজেতা ও শাসকদের নিষ্ঠুরতাকে এতটাই গৌরবান্বিত করা হয়েছিল যে, পরিশ্রমী পণ্ডিত এলিয়ট আর তার অনুসারীরা মধ্যযুগের ভারতীয় শাসকদের সমালোচনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে এই ধারাটিই বজায় ছিল।
- লাল, কে. এস. (১৯৯২)। দ্য লেগেসি অফ মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া। নিউ দিল্লি: আদিত্য প্রকাশন।
- এলিয়ট এবং ডাওসন উল্লেখ করেছেন যে ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল ভারতের অতীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তারা স্বীকার করেছেন যে, ফারসি এবং আরবি উৎসগুলো থেকে এই অনুবাদগুলো উপস্থাপন করার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম রাজাদের অত্যাচারী শাসনকে তুলে ধরা। তারা বলেছেন যে মুসলমানদের অসহিষ্ণুতার কারণে মূর্তির অঙ্গহানি, মন্দির ধ্বংস, জোরপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, হত্যা আর গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে; এছাড়া অত্যাচারী শাসকদের ইন্দ্রিয়পরায়ণতা আর মদ্যপানের কথা তো আছেই। এই ধরনের বর্ণনার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু প্রজাদের এটা বোঝানো যে ব্রিটিশ শাসন অনেক বেশি উন্নত আর তাদের জন্য লাভজনক। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না এবং ভারতের ইতিহাসের ওপর লেখা অনেক ব্রিটিশ রচনায় এর প্রতিফলন দেখা যায়। উনবিংশ শতাব্দীতে অনূদিত হওয়া গ্রন্থগুলোতে প্রায়ই ধর্মীয় গোঁড়ামিকে টেনে আনা হয়েছে, যা তুর্কি-পারসিক গ্রন্থগুলোর পাঠকেও প্রভাবিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, উতবি যেখানে বলেছেন, ‘তিনি (মাহমুদ গজনী) প্রতি বছর হিন্দুস্তানে অভিযানে যাওয়ার বিষয়টিকে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করেছিলেন’, এলিয়ট ও ডাওসনের অনুবাদে সেই অংশটি দাঁড়িয়েছে—‘সুলতান প্রতি বছর হিন্দুস্তানের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ করার শপথ নিয়েছিলেন’।
- [রোমিলা থাপার, সোমনাথ: দ্য মেনি ভয়েসেস অফ আ হিস্ট্রি, পেঙ্গুইন গ্রুপ, ২০০৮, পৃষ্ঠা ২০৭-৮।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় দ্য হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।