বিষয়বস্তুতে চলুন

পরিবেশ নারীবাদ

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

পরিবেশ নারীবাদ হল নারীবাদের একটি শাখা, যা পরিবেশ রক্ষা এবং নারী ও পৃথিবীর সম্পর্ককে এর বিশ্লেষণ ও চর্চার মূলভিত্তি হিসেবে দেখে। পরিবেশ নারীবাদী চিন্তাবিদরা প্রকৃতির ওপর নিপীড়ন এবং নারীদের ওপর নিপীড়নের মধ্যে যে মিল আছে, সেই বিষয়টি তুলে ধরেন।

ইতিহাসের ধারায় এমন এক সময় আসে, যখন মানবজাতিকে এক নতুন ধরনের সচেতনতার দিকে এগিয়ে যেতে হয়। এই সময় আমাদেরকে আরও উচ্চতর নৈতিক অবস্থানে পৌঁছাতে হয়। ভয় দূর করে একে অপরকে আশা দিতে হয়। সেই সময় এখনই। ~ ওয়াঙ্গেরি মাথেই

উক্তি

[সম্পাদনা]
পরিবেশ নারীবাদীদের মধ্যে একটি সাধারণ বিশ্বাস হল—সমাজে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা যেমন প্রকৃতিকে দমন করে, তেমনি নারীদেরও নিপীড়ন করে। প্রকৃতির প্রতি অন্যায় আচরণ এবং নারীদের অবমূল্যায়নের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সেটাই পরিবেশ নারীবাদের মূল বিষয়। ~ আবদেল মোহসেন ইব্রাহিম হাসিম

(সবচেয়ে সাম্প্রতিক প্রথমে)

  • পরিবেশ নারীবাদ একটি দার্শনিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত আন্দোলন, যা নারীবাদ এবং পরিবেশবাদ—এই দুই ধারার মিলনস্থল নিয়ে আলোচনা করে। এটি সমাজে নারীদের ওপর কাঠামোগত নিপীড়ন এবং প্রকৃতিকে ধ্বংস করার মধ্যে মিল খুঁজে বের করে। এই দুই রকম নিপীড়নের মূলেই রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য। পরিবেশ নারীবাদ একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র, যার মধ্যে একাধিক শাখা রয়েছে। এই শাখাগুলো বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে যে, কীভাবে নারীদের সমস্যা ও পরিবেশগত চিন্তা একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
  • অনেক পরিবেশ নারীবাদী মনে করেন, "মাংস খাওয়া এক ধরনের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের প্রকাশ।" এই ধারার অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, নারীদের নিপীড়নের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি নির্জীব নয়, এমন প্রাণীদের এবং প্রকৃতির ওপর নির্যাতনের সঙ্গেও একটি শক্তিশালী যোগসূত্র আছে। স্পিসিসিজম বা প্রজাতিবাদ —যেখানে মানুষ নিজেকে অন্য প্রাণীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বের অজুহাতে তাদের ওপর নিপীড়ন চালায়—এটিও একধরনের নিপীড়ন, যা পরিবেশ নারীবাদের কেন্দ্রে রয়েছে। যেমন সমাজে নারীদের বস্তুর মতো ব্যবহার করা হয়, তেমনি অ-মানব প্রাণীদেরও করা হয়। এই বস্তুকরণের ফলে ইঁদুর, গিনিপিগ, বানর, খরগোশ, শূকর ও অন্যান্য প্রাণীদের ওপর "বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা"র নাম করে বিভিন্ন শিল্পে সহিংসতা চালানো হয়। বিনোদন জগতে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য প্রাণীদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়, সেটাও একধরনের সহিংসতার উদাহরণ।
  • পরিবেশ নারীবাদ আমাদের শেখায় যে, আমরা সবাই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। মানুষ ও অ-মানব প্রাণী—এই বিভাজন কৃত্রিম এবং ভুল। যখন আমরা প্রাণীদের ক্ষতি করি, তখন নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হই। পরিবেশ নারীবাদ আহ্বান জানায়—সব ধরনের "ক্ষমতার আধিপত্য" দূর করতে হবে এবং সব জীবের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বাঁচতে হবে। যদি আমরা পৃথিবীকে বিষাক্ত করে তুলি, তাহলে নিজেদেরও সেই বিষের শিকার হব। অন্যদের ক্ষতি করলে, নিজেদেরও ক্ষতি করি। যদি আমরা পুরুষতান্ত্রিক দখল ও শোষণের বর্তমান ব্যবস্থায় বাঁচতে থাকি, তাহলে একসময় এই পথ আমাদের আত্মবিনাশ এবং প্রকৃতিবিনাশের দিকে নিয়ে যাবে।
      • হেইডি হাটনার, “আর্থ ডে, ইকোফেমিনিজম অ্যান্ড রেশিয়াল ইনজাস্টিস ইন দ্য ইয়ার অফ দ্য প্লেগ, কোভিড–১৯,” এমএস. (ম্যাগাজিন), (২২ এপ্রিল ২০২০)
পরিবেশ নারীবাদ একটি বিশ্লেষণধর্মী ও বিস্তৃত ধারার চিন্তাভাবনা, যা শত শত বছর ধরে নারীদের এবং পরিবেশের ওপর শোষণের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, সেই বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ~ লিয়ান্না ফার্স্ট-অরাই
  • আমার মনে হয়, যে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল—নারীত্ব ও পুরুষত্বের মধ্যে আরও ভারসাম্য আনা। আমাদের আরও আন্তঃসংযুক্ত, লালনকারী একটি দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। কিন্তু এর জন্য সময় প্রয়োজন। গাছ, প্রাণী, সূর্য—এইসব কিছুর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা দেখাতে হলে সময় দরকার। আর সেই সময় আমরা পাচ্ছি না, কারণ আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের ওপর যেভাবে গতির চাপ দিচ্ছে, তা আমাদের বিরতি নিতে দিচ্ছে না। আপনি নিজেকে একবার প্রশ্ন করুন:
    এই সময়ের চাপে—একজন ব্যক্তি হিসেবে, সমাজের একজন সদস্য হিসেবে—আমরা কী হয়ে যাচ্ছি?
    প্রথম ধাপ হল—মনোভাব ও চিন্তায় মিল আছে এমন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা। তারপর একসঙ্গে প্রচলিত ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করা শুরু করা। এর একটি অংশ হল—নিজের হৃদয় যা চায়, সেটি শোনা। আপনি কখন কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন—যখন আপনার মনে হয়েছিল আপনি সত্যিই শান্তি ও সুখে আছেন? সেই উত্তরের দিকে মন দিন। সেটাকেই পথনির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করুন।
  • (১৯৭০-এর দশকে [পরিবেশ নারীবাদ] আপনার কাছে কী ছিল, আর ২০২০ সালে এটি কী অর্থ বহন করে?) সেসিলিয়া: প্রথমেই বলি, ’৭০-এর দশকে আমি "পরিবেশ নারীবাদ" শব্দটাই শুনিনি। কেউই তখন এই শব্দটি ব্যবহার করত না। [হাসি] আমি জানি না, কেউ তাদের শিল্পকর্মকে এই নামে ডাকত কিনা। আমি তখন বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম—আসলে ’৬০-এর দশক থেকেই আমি এই কাজ করে যাচ্ছিলাম। চিলিতে থাকার সময়, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের কাছাকাছি থাকা অবস্থায় আমি যা দেখছিলাম ও অনুভব করছিলাম, তা প্রকাশ করছিলাম। আমি তখন যা করছিলাম, এখন সেটাকেই অনেকে "ল্যান্ড আর্ট" বলে—কিন্তু তখন তো এই ধরনের শব্দ বা ধারণা ছিল না। আমি একা ছিলাম না। আরও অনেকেই এই আন্দোলনের রূপ গড়ে তুলছিলেন—কোনো শব্দ বা নাম ব্যবহার না করেই।
  • পরিবেশ নারীবাদ হলো এমন এক বিশ্লেষণমূলক ও বিস্তৃত চিন্তার ধারা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারী এবং প্রকৃতির ওপর চলে আসা শোষণের যোগসূত্রকে সামনে আনে। এই শোষণ চলে আসছে এমন এক পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা শুধু সেইসব মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে, যারা বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির সুবিধাভোগী।
আমাদের ভবিষ্যৎ এমন হবে, যেখানে নারীসমাজ পৃথিবীকে শান্তির পথ দেখাবে—অথবা আমাদের কোনো ভবিষ্যৎই থাকবে না। ~ বন্দনা শিবা
  • স্পেনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের গবেষক মারিয়া পাজোস মোরান একটি বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণিকক্ষে বহু প্রজন্মের মানুষে ভরা ক্লাসে বলছিলেন... স্পেনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের গবেষক মারিয়া পাজোস মোরান জলবায়ু সংকটের “মূল কারণ” হিসেবে যেটিকে চিহ্নিত করেছেন, সেটি বিশ্লেষণ করছিলেন: একটি পুরুষপ্রধান অর্থনীতি, যা সমাজের কেবল অর্ধেক মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। “গাড়ি ও বিমান”, “মাংস” এবং “পরিচর্যা করা”—এই তিনটি বিষয় ছিল একটি গ্রিডের শিরোনাম, যা তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা সাদা বোর্ডে এঁকেছিলেন। তিনি বললেন, “এই তিনটি বড় ক্ষেত্র দূষণের বড় উৎস।” সবচেয়ে দূষণকারী এই তিনটির মধ্যে দুটি—ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবস্থার ব্যবহার ও মাংস খাওয়া—এই দুটি খাতে পুরুষেরাই সবচেয়ে বেশি কর্মরত এবং অংশগ্রহণকারী। পুরুষেরা যেহেতু এখনও সরকারে বেশি নেতৃত্বে আছেন, তাই তাঁরা এমন নীতির পক্ষপাতিত্ব করেন, যা এসব কাজকে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। যেমন, ভুট্টা ও সয়াবিন চাষে সরকারিভাবে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা, যাতে গরুর মাংসের দাম কৃত্রিমভাবে কম রাখা যায়; এবং গণপরিবহন প্রকল্পে অর্থায়নের অভাব—এই সবকিছু সেই নীতির অংশ।
  • নারীরা পুরুষদের তুলনায় দারিদ্র্যের শিকার হওয়ার সম্ভাবনায় বেশি এবং সমাজে তাদের আর্থসামাজিক ক্ষমতাও কম। এই কারণেই তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘুরে দাঁড়াতে তাদের বেশি সময় লাগে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে পরিবেশ নারীবাদ একটি আন্দোলন হিসেবে কাজ করছে। এই চিন্তাধারা মনে করে—সমাজ ও প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হবে সহাবস্থানের ভিত্তিতে, আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়। কারণ নারী ও প্রকৃতির ওপর শোষণ একই মূল থেকে জন্ম নেয়।
  • যারা ১৯৭০-এর দশকে "পরিবেশ নারীবাদ" শব্দটি তৈরি করেছিলেন, তারা যুক্তি দিয়েছিলেন—পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্রই হলো প্রকৃতি নিপীড়ন এবং নারীদের ওপর দমন-পীড়নের মূল কারণ। মারিয়া মিয়েস এবং বন্দনা শিবার লেখা ইকোফেমিনিজম বইয়ে বলা হয়েছে— নারীদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে পুরুষরা ধর্ষণ, সহিংসতা এবং নারী বিদ্বেষের মাধ্যমে তাদের দমন করে। অন্যদিকে, মুনাফার লোভে পুরুষেরা প্রকৃতিকে শোষণ করে এবং বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে।
  • ২০১৮ সালে রেকর্ড সংখ্যক নারী যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। অনেক পুরুষ এবং বহু সচেতন প্রতিষ্ঠান এখন লিঙ্গ সমতার পক্ষে কথা বলছে। ফলে আমাদের দেশে এমন একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যা লিঙ্গ সমতার ভিত্তিতে কাজ করে—এবং সেটি একটি সুস্থ পৃথিবীর আশ্বাস দেয়...
  • আমাদের ভবিষ্যৎ এমন হবে, যেখানে নারীসমাজ পৃথিবীকে শান্তির পথ দেখাবে—অথবা আমাদের কোনো ভবিষ্যৎই থাকবে না।
    • বন্দনা শিবা, উদ্ধৃত: আর. এস. বিনুরাজের ইমেন পাওয়ার টু দ্য ফর, দ্য হিন্দু (১ জুলাই ২০১৭)
  • পরিবেশ-নারীবাদ, যা নারীবাদী তত্ত্বের সাম্প্রতিক ধারাগুলোর একটি, মনে করে যে পুরুষতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সমাজ প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যে একটি ক্ষতিকর বিভাজন তৈরি করেছে। এই বিভাজন শুধুমাত্র নারীর লালন-পালনের প্রবৃত্তি এবং প্রকৃতির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সামগ্রিক জ্ঞানের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। পরিবেশ-নারীবাদের এই নতুন ধারণাগুলো কিছু মোবাইল নেটওয়ার্কের বিজ্ঞাপনে রূপকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নারীরা টিকে থাকার প্রবৃত্তি এবং যত্নশীল মনোভাব নিয়ে জন্মায়। একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, অবসরপ্রাপ্ত এক ব্যক্তিকে একটি চারা উপহার দেয় একটি মেয়ে। আরেক বিজ্ঞাপনে, প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী পণ্য তৈরি করে গ্রামের উন্নয়নের ভাবনা মেয়েটির কাছ থেকেই আসে এবং সেই পথেই সে তার গ্রামের পুরুষদের নেতৃত্ব দেয়। এসব বিজ্ঞাপনেই পরিবেশবান্ধব ধারণা যেমন কাগজের ব্যাগ ব্যবহার, গাছ লাগানো ও টেকসই উন্নয়নের বার্তা দেওয়া হয়।
    • আর. এস. বিনুরাজের ইমেন পাওয়ার টু দ্য ফর, দ্য হিন্দু (১ জুলাই ২০১৭)
  • প্রকৃতি মাতা-রূপটি পশ্চিমা জগতে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে ইন্দো-ইউরোপীয় যুগ পূর্ব পর্যন্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনো অনেক ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে এটি জীবন্ত। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে এই মাতৃ-রূপটি গত প্রায় ৫ হাজার বছর ধরে দমন করা হয়েছে। ইন্দো-ইউরোপীয় আগ্রাসনের সময় থেকে এই দমন শুরু হয়। পরে, ইহুদি-খ্রিস্টান ধর্মের নারীবিরোধী দেবী-বিরুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি, তৃতীয় শতাব্দীর ডাইনী শিকার এবং ভিক্টোরীয় যুগে এই দমন চূড়ান্ত রূপ নেয়। ভিক্টোরীয় যুগে—যা ছিল প্রকৃতি মাতার সবচেয়ে বেশি দমনের সময়—স্কটল্যান্ডের একজন স্কুল শিক্ষক অ্যাডাম স্মিথ তার চারপাশে লোভ ও অভাব দেখে মনে করেছিলেন এটাই সব "সভ্য" সমাজের স্বাভাবিক অবস্থা। তিনিই আধুনিক অর্থনীতির সূচনা করেন, যা মূলত ব্যক্তি-ভিত্তিক লোভের মাধ্যমে সীমিত সম্পদের বণ্টন পদ্ধতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়... যদি একটি সমাজ অভাবকে ভয় পায়, তাহলে সে-সমাজ এমন এক পরিবেশ গড়ে তোলে, যেখানে সেই ভয়টাই সত্যি হয়ে ওঠে। এটি এক প্রকার আত্ম-পরিপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী।
  • প্রকৃতি মাতা মূলত পৃথিবীর প্রতীক—উর্বরতা, প্রকৃতি ও জীবনের প্রাচুর্যের ধারা। যে ব্যক্তি এই প্রতীকের ভাবনা আত্মস্থ করে, সে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রাচুর্যে বিশ্বাস রাখে। যে ব্যক্তি বিশ্বাস রাখতে পারে না, সে-ই বড় ব্যাংক ব্যালান্স রাখতে চায়। প্রথম যে মানুষ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে অনেক কিছু জমিয়ে রাখল, তাকেই তার সেই সঞ্চয় অন্যের ঈর্ষা ও প্রয়োজন থেকে রক্ষা করতে লড়াই করতে হলো। যদি একটি সমাজ অভাবকে ভয় পায়, তাহলে তারা এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সেই অভাব বাস্তবে রূপ নেয়। এটি সত্যি সত্যিই এক আত্ম-নির্মিত ভবিষ্যদ্বাণী। আমরা বহুদিন ধরে এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছি যে, মূল্য তৈরি করতে হলে অভাব তৈরি করতে হবে। যদিও কিছু বস্তুগত ক্ষেত্রে তা সঠিক, কিন্তু আমরা এই ধারণাকে এমন ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করি যেখানে তা প্রযোজ্য নয়। যেমন, তথ্য বিনামূল্যে বিতরণে কোনো বাধা নেই। তথ্যের অতিরিক্ত খরচ প্রায় শূন্য। তবু আমরা কপিরাইট ও পেটেন্ট তৈরি করি, যাতে এগুলোকে কৃত্রিমভাবে দুষ্প্রাপ্য রাখা যায়। অভাবের ভয় থেকে জন্ম নেয় লোভ ও সঞ্চয় করার প্রবণতা। আর তা থেকেই জন্ম নেয় সেই অভাব, যাকে ভয় করা হচ্ছিল। যেখানে ‘প্রকৃতি মাতা’র প্রতীক হিসেবে বিবেচিত সংস্কৃতিগুলি প্রাচুর্য এবং উদারতার উপর ভিত্তি করে তৈরি।
  • ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এমন এক সময় আসে, যখন মানবজাতিকে একটি নতুন চেতনার স্তরে পৌঁছাতে হয়। একটি উচ্চতর নৈতিক অবস্থানে যেতে হয়। ভয় ত্যাগ করে একে অপরকে আশার বার্তা দেওয়ার সময় তখনই হয়। এখন সেই সময়টাই এখন।  
    • ওয়াংগারি মাথাই। উদ্ধৃত: আর. এস. বিনুরাজের উইমেন পাওয়ার টু দ্য ফর, দ্য হিন্দু (১ জুলাই ২০১৭)
  • পরিবেশ-নারীবাদ মূলত পৃথিবীর উপর যে ভয়াবহ পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে এবং নারীদের দমন—এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজে। তবে এই একটি সম্পর্ক বিভিন্ন রকম রূপ নিতে পারে, আপনি কোন ধরনের পরিবেশ-নারীবাদী তার উপর নির্ভর করে। এক ধরনের পরিবেশ-নারীবাদ এই সম্পর্ককে খুব সরলভাবে ব্যাখ্যা করে। তারা বলে, সমাজ যেভাবে প্রাকৃতিক সম্পদকে লুট করে, ঠিক তেমনি নারীকেও দেখে। নারীদের যেমন ব্যবহার করা হয়, তেমনি প্রকৃতিকেও ব্যবহার করা হয়... আপনার ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, পরিবেশ-নারীবাদ একটি বিশেষ নারীবাদী দৃষ্টিকোণ, যা লিঙ্গভিত্তিক অন্যায় ও পরিবেশগত ইস্যুগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খোঁজে। পরিবেশের ক্ষতি অবশ্যই একটি নারীবাদী বিষয়। এর মোকাবিলায় দরকার শিক্ষিত, সচেতন ও ক্ষমতাবান নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
  • মারিয়া মিয়েস এবং আমি যখন ‘ইকোফেমিনিজম’ বইটি লিখেছিলাম, তখন আমাদের সময়ের উদীয়মান সংকটগুলো নিয়ে কথা বলেছিলাম। আমরা যে সংকটগুলো উল্লেখ করেছিলাম, সেগুলো আরও গভীর হয়েছে। সেই সঙ্গে, পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্রের বিকল্প ধারণার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে—যদি আমাদের মানবজাতি এবং এই পৃথিবীর অন্যান্য জীববৈচিত্র্য টিকে থাকতে চায়। এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল আর্থ সামিটের এক বছর পর। তখন বিশ্বের সরকারগুলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল: জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ চুক্তি এবং জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন। তখনো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) তৈরি হয়নি। কিন্তু ‘ইকোফেমিনিজম’ প্রকাশের দুই বছর পরেই ডব্লিউটিও গঠিত হয়। এটি কর্পোরেট স্বার্থ, ব্যবসা ও লাভকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে পৃথিবীর অধিকার, নারীদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা বিশ্বায়নের ফলে প্রকৃতি ও নারীদের কী ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, তা নিয়েই লিখেছিলাম। আজ প্রতিটি সংকট আরও গভীর। সহিংসতার প্রতিটি প্রকাশ আরও নিষ্ঠুর এবং নির্মম।
  • যদি জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদন ও সংরক্ষণ এবং বাজারজাত পণ্যের উৎপাদনের মধ্যে যে বিভাজন আছে তা বিলুপ্ত হয়, যদি পুরুষরা লালন-পালনের ও যত্ন নেওয়ার মতো গুণাবলী অর্জন করে—যা এতদিন নারীদের গুণ বলে বিবেচিত হয়েছে—এবং যদি আত্মনির্ভরশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্ব-উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে একটি অর্থনীতি গড়ে ওঠে, তাহলে কেবল নারীরা নয়, পুরুষরাও জীবিকা উৎপাদনে জড়িত থাকবে। তখন তাদের কাছে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের খেলা চালিয়ে যাওয়ার সময় বা আগ্রহ কোনোটাই থাকবে না। জীবিকাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিই পুরুষ ও সমাজকে অসামরিকীকরণের পথে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারে। শুধুমাত্র এমন একটি সমাজ, যার ভিত্তি জীবিকার উপর, প্রকৃতির সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে, এবং জাতি, প্রজন্ম, নারী ও পুরুষদের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে পারে। কারণ, এই সমাজ তার “ভালো জীবনের” ধারণাটি অন্য মানুষ বা প্রকৃতিকে শোষণের উপর ভিত্তি স্থাপন করে না।
  • শেষ পর্যন্ত, এটা বলতেই হবে—আমরাই প্রথম নই যারা একটি জীবিকাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভালো সমাজের স্বপ্ন হিসেবে প্রকাশ করছি। যেখানেই নারী ও পুরুষ এমন একটি সমাজ কল্পনা করেছেন যেখানে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-তরুণ, সব জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে ভালো জীবন ভাগ করে নিতে পারে—যেখানে সামাজিক ন্যায়, সমতা, মানবিক মর্যাদা, সৌন্দর্য ও জীবনের আনন্দ কেবল একটি ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণির জন্য নয় বা মৃত্যুর পরে কোনো এক আশার নামে নয়, বরং এখানে-এখনই বাস্তবায়িত হতে পারে—সেখানেই আমরা এই জীবিকাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ছায়া দেখতে পাই।
  • কমলা বাসিন, একজন ভারতীয় নারীবাদী, বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ‘টেকসই উন্নয়ন’ বলতে সব নারীর জন্য কী বোঝানো উচিত। তিনি এমন কিছু নীতির কথা বলেছেন যা জীবিকা ও স্বনির্ভরতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেলে। তার মতো আরও অনেক নারী ও পুরুষ, যারা পৃথিবীর সীমিত সম্পদ সম্পর্কে সচেতন, তারা বিশ্বাস করেন—টেকসই জীবনব্যবস্থা বর্তমান মুনাফাভিত্তিক ও উন্নয়ন-আসক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে মেলেনা। অর্থনীতিকে শুধুই লাভ আর উৎপাদন বৃদ্ধির দিক থেকে দেখার এই ধারা পৃথিবীর সবাই অনুসরণ করতে পারে না। উত্তরের ধনী দেশগুলোর জীবনযাত্রার মান সবার জন্য সম্ভব নয়—এটা বহু আগেই মহাত্মা গান্ধী বুঝেছিলেন। একবার এক ব্রিটিশ সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেন, ভারত কি ব্রিটেনের মতো জীবনযাত্রা চায়? তিনি জবাব দেন, “একটা ছোট দেশ ব্রিটেন তার জীবনমান বজায় রাখতে গিয়ে পৃথিবীর অর্ধেককে শোষণ করেছে। তাহলে ভারত যদি ওই মান পেতে চায়, তাকে কয়টা পৃথিবী শোষণ করতে হবে?” পরিবেশবাদী ও নারীবাদী দৃষ্টিতে বিষয়টা আরও পরিষ্কার—যদি আরও পৃথিবী থাকত শোষণের জন্য, তাহলেও এই ধরনের উন্নয়ন মডেল আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ এই পথ দিয়ে না ধনী, না দরিদ্র—কেউই প্রকৃত সুখ, স্বাধীনতা, মর্যাদা বা শান্তি পায়নি।
  • কো-নারীবাদীদের মধ্যে সাধারণ এক বিশ্বাস হলো—পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা সমাজে যেমন প্রকৃতিকে শোষণ করে, তেমনি নারীকেও দমন করে। প্রকৃতি ও নারীর ওপর এই নির্যাতনের পারস্পরিক যোগসূত্রই পরিবেশ-নারীবাদের মূল ভাবনা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যেমন প্লান্ট (১৯৮৯) বলেছেন—“পৃথিবীর ধর্ষণ, যেকোনো রূপে, নারীর ধর্ষণের রূপক হয়ে ওঠে।” (p. 5). In ওমেন এন্ড নেচার: দ্য রোরিং ইনসাইড হার, (১৯৭৮) -এ তিনি নারীর সঙ্গে প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তুলে ধরেন। বইটিতে একজন নারীর কণ্ঠে গর্ব ভেসে ওঠে—নিজের অস্তিত্ব প্রকৃতির মধ্যেই অনুভব করেন তিনি।
    আমি জানি আমি এই মাটিরই তৈরি, যেমন আমার মায়ের হাতও এই মাটির তৈরি ছিল। তার স্বপ্নগুলো এসেছিল এই মাটি থেকেই। আমি যা কিছু জানি, সবই আমি জানি এই মাটির মধ্যে—পাখির দেহ, এই কলম, এই কাগজ, এই হাত, এই জিহ্বা যেটা কথা বলছে, সবকিছুই এই পৃথিবীর ভেতর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলে। আমি জানাতে চাই তোমাকে—তুমিও এই পৃথিবীরই অংশ—চলো, আমরা একে অপরকে বলি, আমরা কী জানি। আলো আমাদের মধ্যেই আছে। (পৃষ্ঠা ২২৭).
    ...যদি আমরা একে অপরের সঙ্গে সত্যিকারের সংযোগ স্থাপন করতে পারি, যদি আমরা বুঝতে পারি মানুষ ও অমানবিক প্রাণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব—তাহলে আমরা এই ধ্বংসাত্মক বিশ্বকে বদলেনতুন করে গড়তে পারি।
  • 'পরিবেশ-নারীবাদ' শব্দটি হয়তো আধুনিক, কিন্তু এর মূল সুর নারী সমাজের আত্মরক্ষা ও সমাজকে নিরাপদ রাখার সংগ্রামে বহুদিন ধরে সক্রিয়। উত্তর ভারতের চিপকো আন্দোলনের বনবাসী নারীরা প্রায় ৩০০ বছর আগে যেভাবে গাছ রক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন, কিংবা আজকের অ্যাপালাচিয়ার কয়লাখনি অঞ্চলের মায়েরা যেভাবে তাদের জীবনের জন্য লড়ছেন—এই সংগ্রাম একই স্রোতে গাঁথা। কর্পোরেট বিশ্বায়ন যত বাড়ছে, ততই এই সংগ্রাম আরও তীব্র হচ্ছে। এই আন্দোলনে মারিয়া মিয়েস ও বন্দনা শিবার অংশীদারিত্ব এক ধরনের বৈশ্বিক নারীবাদী ঐক্যের প্রতীক। পরিবেশ-নারীবাদীরা শুধু তাত্ত্বিক নন, তারা বাস্তব লড়াকুও।
  • পরিবেশ-নারীবাদ রাজনীতিকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। এর মূল বিশ্বাস হলো—পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী ও প্রকৃতির উপর নির্ভরশীলতা পরস্পর সম্পৃক্ত। পরিবেশ-নারীবাদীরা কখনও কখনও নারীবাদের অন্যান্য ধারার সহায়তা নিলেও, উদারপন্থী বা উত্তরাধুনিক মতাদর্শ বিশ্বজুড়ে শ্রমিক, কৃষক, আদিবাসী ও অন্যান্য শোষিতদের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের জন্য তেমন সহায়ক নয়। মিয়েস ও শিবা দেখিয়েছেন—বস্তুকেন্দ্রিক ভোগবাদ যেভাবে সমাজকে নিঃসত্ত করে দেয়, তার ঠিক বিপরীতে রয়েছে দক্ষতা, স্বনির্ভরতা ও আত্মনির্ভর অর্থনীতির প্রাণশক্তি—যাকে তাঁরা বলছেন ‘জীবিকা’ বা ‘subsistence’। এই জীবিকা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই পরিবেশ-নারীবাদের আসল ভিত্তি।
  • আজকের উন্নয়ন ব্যবস্থার ভিত্তি হলো—সীমিত সম্পদকে সীমাহীনভাবে ভোগ করা। এই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে শক্তিশালীরা দুর্বলদের সম্পদ কেড়ে নেয়। এই লুটপাট শুধু জমি বা জঙ্গল নয়, নারীর উপরও হয়। এটাই ধর্ষণ সংস্কৃতির মূল—পৃথিবীর, নারীর, ও স্থানীয় জীবিকা-ব্যবস্থার।
  • নারীদের কৃষিকাজ থেকে সরিয়ে দিলে শুধু নারীর ক্ষমতা কমে না, আমাদের খাদ্যনিরাপত্তাও কমে। নারীরা যখন কৃষিকাজ করতেন, তারা রাসায়নিক নয়, প্রকৃতির বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করতেন। ফলে কম খরচে একসঙ্গে অধিক স্বাদ ও গুণসম্পন্ন অনেক রকম পুষ্টিকর খাবার উৎপন্ন হতো। {{w|সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা|সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়} এই নারী-কেন্দ্রিক কৃষি পদ্ধতির কথা উঠে আসেনি। অথচ এই পদ্ধতি শুধু ৫০% নয়, ১০০% ক্ষুধা দূর করতে পারে। কারণ নারীরা শুধু বেশি উৎপাদন করতে জানেন না, তারা তা করেন কম সম্পদে, বেশি মানবিকতার সঙ্গে। আর নারীর মূল্যবোধে এটা অগ্রহণযোগ্য যে, আজকের পৃথিবীতে এখনও কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকবে।
  • পরিবেশ-নারীবাদ বইতে মারিয়া মিয়েস (একজন জার্মান সমাজবিজ্ঞানী) ও বন্দনা শিবা (একজন ভারতীয় পরিবেশকর্মী) বলেন—এই পৃথিবী, প্রকৃতি আর মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার জন্য আমাদের একেবারে নতুন ভাবনার দরকার। তাঁরা যেটাকে বলেন, "বেঁচে থাকার দৃষ্টিভঙ্গি" বা "জীবিকা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি"। তাদের মতে, ১৯৯২ সালের রিও সম্মেলন এটা স্পষ্ট করে দেয় যে—উন্নত বা অনুন্নত, কোনো দেশের ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে প্রকৃত সমাধান আসবে না। বরং, সাধারণ মানুষের লড়াই থেকেই এই পৃথিবীর জন্য একটা নতুন আশা তৈরি হতে পারে।
  • আমাদের লক্ষ্য হলো এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি—যেমন পুরুষতন্ত্র বা শ্রেণিভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব—এর বাইরে বের হওয়া। আমরা শুধু পুরুষশাসিত সমাজ বা শ্রেণি—ভিত্তিক বৈষম্য নিয়ে কথা বলছি না। আমরা বলতে চাই — বিশ্বের যে কাঠামো, তার ভেতরের গভীর বৈষম্যগুলো — যেভাবে ধনী দেশগুলো গরিব দেশকে শোষণ করে, পুরুষরা নারীদের দমিয়ে রাখে, আর মুনাফার লোভে প্রকৃতিকে নষ্ট করা হয়—এই পুরো ব্যবস্থাটাকেই পাল্টাতে হবে।
  • আজকের ভয়াবহতা, যুদ্ধ আর অপরাধ কি সম্ভব হতো যদি মানবসভ্যতার দুটি মূল ভিত্তি—নারী ও পুরুষ—একসাথে, সমানভাবে পৃথিবীর দায়িত্ব নিত? মানবজাতি ও এই পৃথিবীকে রক্ষা করার ক্ষমতা নারীর হাতেই নিহিত। নারীকে নিজ মহত্ত্ব ও গুরুত্ব বুঝতে হবে। তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে মানবজাতির ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য। জননী, যিনি প্রাণদাত্রী, সম্পূর্ণ অধিকার আছে নিজ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার। নারীর কণ্ঠস্বর—এই মা-র কণ্ঠস্বর—মানবতার নেতৃত্বে থাকা মানুষদের মধ্যে শোনা উচিত। একজন মা-ই তার সন্তানের মনে প্রথম সচেতন ভাবনার বীজ বপন করেন। তিনি তার স্বপ্ন, প্রতিভা, ও আকাঙ্ক্ষাগুলোকে একটি দিশা ও গুণগত রূপ দেন। কিন্তু যদি কোনো মায়ের মধ্যে সংস্কৃতির কোনো চেতনা না থাকে, তাহলে তিনি সন্তানের মধ্যে শুধুই মানুষের নিচু প্রবৃত্তিগুলো জাগিয়ে তুলতে পারেন। তাই শিক্ষা অর্জনের পথে নারীর মনে রাখা উচিত, শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল উচ্চতর জ্ঞান ও সংস্কৃতি অর্জনের একটি উপায়। সত্যিকারের জ্ঞানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে আত্মার ও হৃদয়ের সংস্কৃতি দিয়ে। এই দুইয়ের সংমিশ্রণ ছাড়া মানবজীবনের প্রকৃত মহিমা, বৈচিত্র্য আর গভীরতাকে বোঝা অসম্ভব। এইজন্য, জ্ঞান অর্জনের পথে নারী যেন সব সময় আলোর উৎস ও আত্মার পথপ্রদর্শকদের কথা মনে রাখেন—তাদের, যারা প্রকৃতপক্ষে মানবচেতনার ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। এই উৎস, এই ঐক্যের মূল নীতিকে ধারণ করেই মানবজাতি পৌঁছাতে পারবে সত্যিকার উন্নয়নের পথে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]