পরিমল গোস্বামী
পরিমল গোস্বামী (১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৭ - ২৭ জুন ১৯৭৬) রবীন্দ্রোত্তর যুগে যে সকল সাহিত্যিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের অন্যতম। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, রসরচনা ও ব্যঙ্গাত্মক রচনার জন্য সমধিক পরিচিত ছিলেন।
উক্তি
[সম্পাদনা]- সুতরাং আমি সম্পূর্ণ একা, তদুপরি বাইরে ঝড়-বৃষ্টি এবং কোনো দর্শন প্রার্থীর আসবার সম্ভাবনা নেই, এমনি অবস্থায় কাজে মনোযোগ বৃদ্ধি পাওয়া উচিত, কিন্তু রবীন্দ্রযুগে এমন বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় মনোযোগ বৃদ্ধি পায় না। মন উড়ুউড়ু করে, মনোযোগ উধাও হয়ে যায় বিষয়ান্তরে- ঝড়ের মধ্যে, বৃষ্টির মধ্যে, বিদ্যুতের মধ্যে, গুরু-গুরু ধ্বনির মধ্যে ; নানাখানা হয়ে মন হারিয়ে যায়। কিন্তু সেদিন আমি শুধু “বুদ্ধিতে যাঁর ব্যাখ্যা চলে না” পর্যায়ের কয়েকটা গল্প পড়ছিলাম একের পর এক । গত দু'সপ্তাহের মধ্যে পড়া হয় নি একটিও, ইতিমধ্যে টেবিলে প্রায় একশত জমেছে । এই পর্যায়ের কাহিনীগুলোর মধ্যে একটা অবাস্তবতা আছে, তাই হয় তে এমন ঘন-ঘোর বর্ষা-সন্ধ্যাতেও মন সম্পুর্ণ বিক্ষিপ্ত হতে পারে নি।
- অঘোর সরকার-১, উৎস: [১], পৃষ্ঠা ১৫৬
- কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ-বিস্ময় কোথায়? সবাই জানে এর ব্যাখা হয় না, তাই এ সম্পর্কে কেউ লেখে না। প্রেতমূতি সম্পর্কেও কি তাই হওয়া উচিত নয়? কারণ ওটাও অলৌকিক বা সুপার-ন্যাচুরাল কিছুই নয়। কোনো লোকের চোখে ছায়াছবি ফুটে ওঠে! তাতে বিস্ময় কোথায়; অলৌকিক কিছুই নেই জগতে। এ ছায়া মুর্তি যত অলৌকিক, আপনার আমার দেহ বা মন বা আত্মা যাই বলুন, তত অলৌকিক। অর্থাৎ অলৌকিক যদি কিছু থাকে জগতে, তা হলে তার মধ্যে আপনি আমিও আছি। কিন্তু সবাই তা বোঝে না। তাই, দেহ নিয়ে লিখলে তা সবাই পহন্দ করবে না, বলবে ও তো সবাই জানি যে ব্যাখ্যা হয় না।
- অঘোর সরকার-১, উৎস: [২], পৃষ্ঠা ১৫৯
পরিমল গোস্বামীর শ্রেষ্ঠ ব্যাঙ্গ গল্প
[সম্পাদনা]পরিমল গোস্বামীর শ্রেষ্ঠ ব্যাঙ্গ গল্প, বিহার সাহিত্য ভবন লিঃ
- কিন্তু কবি বলিয়াছেন, মানুষের চিরদিন সমান যান না। কবি একথা কেন বলিয়াছেন, তাহার কারণ অজ্ঞাত। মনে হয় না বলিলেই ভাল করিতেন। কিন্তু এখন আর উপায় নাই। বৈচিত্র্য এখন মানুষের জীবনে একরূপ জোর করিয়াই প্রবেশ করিতেছে।
- সাধু হীরালাল, পৃষ্ঠা ৫
- আসল ব্যাপার কি, তাহা কেহ জানে না। হীরালাল মরে নাই। সে কুমীর অবস্থায় প্রায় সাত দিন জলে থাকিয়া চিন্তা করিতে লাগিল, কি করিয়া পুলিসকে জব্দ করা যায়! একবার তাহার মনে হইল সন্ত্রাসবাদী হইয়া ক্রমাগত পুলিস ধরিয়া খাইবে। কিন্তু ইহা তাহার মনঃপুত হইল না। একবার ভাবিল কমুনিস্ট হইয়া কলওয়ালাদের ধরিয়া ধরিয়া খাইবে। ইহাতে পুলিস প্রকৃত অপরাধী ধরিতে না পাইয়া অপদস্থ হইবে। কিন্তু তখনই তাহার মনে হইল সে সাধু হইয়াছে, সুতরাং যদি প্রতিশোধ লইতে হয়, মহৎ প্রতিশোধ লওয়াই ভাল। তাহার মাথায় একটা বুদ্ধিও খেলিয়া গেল, এবং নিজের বুদ্ধিতে খুশী হইয়া কুমীর অবস্থাতেও হীরালাল খানিকটা হাসিয়া লইল। হা এইবার ঠিক হইয়াছে! এইবার হীরালালকে ভাড়া করা দুরে থাক্, পুলিস খাতির করিয়া অন্ত পাইবে না। শুধু পুলিস নহে, স্বয়ং ব্ড়লাট তাহাকে খাতির করিবেন। ইহাকেই বলে প্রতিশোধ।
হীরালাল জল হইতে এক লাফে স্টাড বুল হইয়া ডাঙ্গায় উঠিয়া আসিল।- সাধু হীরালাল, পৃষ্ঠা ৯
- নির্বিবাদে মাস্টারি করিতেছিলাম, কিন্তু ক্রমে উহা অসহ্য হইয়া উঠিতে লাগিল। বাল্য-জীবনের অন্তহীন উচ্চাশাকে খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া তাহারই কোনো একট বিকলাঙ্গ খণ্ড গলায় ঝুলাইযা দিনের পর দিন্ স্কুলে হাজিরা দেওয়া- ইহার চেয়ে বিড়ম্বনা আর কি আছে?
- প্ল্যান, পৃষ্ঠা ২৯
- আজ সাত দিন হইল মামা-বাড়িতে লুকাইয়া আছি এবং আরো কিছুদিন থাকিব বলিয়া মনে করিতেছি। চাকরিটি থাকিবে না এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। ব্যবসা করিয়াই খাইতে হইবে কিন্তু সে ব্যবসা অন্য কাহারো প্ল্যানে নহে।
সেরূপ অবস্থা হইলে মৃত্যুর প্ল্যান চিন্তা করিতে হইবে।- প্ল্যান, পৃষ্ঠা ৩৫
- পথে-ঘাটে দম আটকানো দুর্গন্ধ আর নোংরা জঞ্জাল। গাড়িতে বন্ধ হয়ে চলা ভিন্ন উপায় ছিল না। নাগরিকতাবোধের অভাবে শহরে লোকদের দু'চোক্ষে দেখতে পারতাম না। শহুরে শিক্ষা নেই অথচ শহরে থাকবে। বোধও নেই, লজ্জাও নেই। সমস্ত লজ্জা যেন আমার।
- বুমেরাং, পৃষ্ঠা ৫০
- আসলে মনের মধ্যে একটা পরাজয়ের গ্লানি তখনও বহন করছি, নিজের কাছে স্বীকার করি আর নাই করি। যেখানে ঝগড়া ক'রে জেতা যায় না, সেখানে ভাল লোক সেজেও জয়লাভ করতে ইচ্ছা হয়, নইলে সুখ পাওয়া ষায় না। মন থেকেই এটা চায়, এটা মনেরই ধর্ম।
- বুমেরাং, পৃষ্ঠা ৫৫
- তাকে প্রথমে মচকাব এবং পরে ভাঙব এই ছিল আশা।
হ'ল না।
আমিই প্রথম মচ্কেছি।
তারপর সম্পূর্ণ ভেঙেছি।- বুমেরাং, পৃষ্ঠা ৫৯
- শ্রদ্ধা হঠাৎ ঘা খেল। হয়তো সেই জন্যেই ভীষণ ঘৃণা হল শিবরামবাবুর উপর। একবার এমনও মনে হল--সত্যই কি প্রয়োজন ছিল তাঁকে শিড়ির গোঁড়া থেকে উপরে তোলার? তিনি তো মদ খাওয়ার “প্রয়োজন” সৃষ্টি ক'রে বিবেককে ভোলাচ্ছেন এই ভাবে, আমার বিবেককে ভোলাই কি দিয়ে?
- সত্যই কি প্রয়োজন, পৃষ্ঠা ৬৭
- একদিন ছিল, যখন গাঁয়ের কুকুর দেখলে শেয়াল পালিয়ে যেত। এখন তাদের আর সেদিন নেই। এখন কুকুরের চেয়ে শেয়ালের তেজ বেশি।
- ক্যা হুয়া, পৃষ্ঠা ৮৫
যখন সম্পাদক ছিলাম
[সম্পাদনা]যখন সম্পাদক ছিলাম, রূপা অ্যান্ড কোং
- সম্পাদনা কালের দীর্ঘ ৩২ বৎসরে যা দেখেছি যা জেনেছি, তারই বিচিত্র ছবি এতে আছে। মাঝে মাঝে কিছু চিন্তাও করতে হয়েছে, তা ছাড়া সমালোচনা (আত্মসমালোচনাও) তো স্বভাবতই আছে। আক্রমণও বেশ আছে, তবে তা ব্যক্তিগত নয় খুব।
- ভূমিকা
- ১৯৩১ সনে আমার পিতার মৃত্যু ঘটে। তার সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রবাসীতে ছাপার জন্য রবীন্দ্রনাথ মৈত্র আমাকে উৎসাহিত করেন। এবং আমি তার নির্দেশে একটি লেখা তৈরি করলে রবীন্দ্রনাথ মৈত্র আমাকে প্রবাসীতে তখনকার সহকারী সম্পাদক সজনীবাবুর কাছে নিয়ে যান। এই উপলক্ষে সজনীবাবুর সঙ্গে প্রথম পরিচয় এবং তা আধঘণ্টা কাল স্থায়ী। প্রবাসী ১৩৩৮ ভাদ্র সংখ্যায় আমার পিতা বিহারীলাল গোস্বামীর সংক্ষিপ্ত জীবনকথা ফোটোগ্রাফ সহ ছাপা হয়। তার প্রসিদ্ধ হাতের লেখার নমুনা ও রবীন্দ্রনাথ আমাকে যে চিঠি দিয়েছিলেন তাও এই সঙ্গে ছাপা হয়।
- পৃষ্ঠা ৪
- পৌষ সংখ্যায় নৌকাখণ্ড নামক একটি গল্প ও অনুবাদ সাহিত্যের কিছু অংশ লিখলাম। ক্রমে শনিবারের চিঠির ভঙ্গির সঙ্গে পরিচয় ঘটল। দেখলাম সজনীকান্ত কিংবা তার পূর্ববর্তীরা কেউ অন্নদাশঙ্করকে 'খোকা হাকিম' ও দিলীপকুমারকে 'পাগলা জগাই' নামে অভিহিত করতেন। গুরুসদয় দত্তের নাম হয়েছিল রায়বেঁশে দত্ত। পছন্দ না হলেও আমাকেও এই সব নাম মাঝেসাঝে বাবহার করতে হত শনিবারের চিঠির ধারা ও চরিত্র বজায় রাখার জন্য।
- পৃষ্ঠা ৬
- ঘেমন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চিত্রশিল্পে আনাটমি চেয়ে বসেছিলেন কিত্তু সে কথা ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টরা কখনো মেনেছেন? আবার শনিবারের চিঠি কথাসাহিত্যে আনাটমির আমদানি বন্ধ করতে চেয়েছিল, তাই বা কে মানল? তবে কৃত্রিম স্থায়ী হয় না কখনো।
- পৃষ্ঠা ২০
- রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কবিতাগুলির স্বরলিপি প্রস্তুত হইতেছে। শুন যাইতেছে গোরা ও ঘরে-বাইরের স্বরলিপি শীঘ্রই প্রস্তুত হইবে।
- অসম্ভব কথা, পৃষ্ঠা ২৬
- শ্রীযুক্ত শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যার মহাশয় বাঘের চামড়ার স্যুট অর্ডার দিয়াছেন। শ্রদ্ধেয় আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বেঙ্গল টাইগার নামে পরিচিত ছিলেন।
- অসম্ভব কথা, পৃষ্ঠা ২৬
- সজনীকান্তকে কেন্দ্র করে বড় একটা গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল, এবং সে গোষ্ঠীতে ছিলেন বিচিত্র বৃত্তির মানুষ, যদিও অধিকাংশই মাসিকপত্রের সঙ্গে অল্পবিস্তর সম্পর্কযুক্ত, বাকি সবাই সজনীকাস্তের বাক্তিগত বন্ধু।
- পৃষ্ঠা ৩৬
- সজনীকান্ত দাসও এর কিছু পরে এক কথায় বঙ্গশ্রীর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, সে কথা পরে বলব। সচ্চিদানন্দবাবু সৎলোক ছিলেন, কিন্তু অত্যন্ত খামখেয়ালি ছিলেন। এই প্রসঙ্গে এর পরের কিছু ঘটনা বলছি। বঙ্গশ্রীর প্রেস ও অফিস অতঃপর লোয়ার সাকুলার রোডে উঠে গিয়েছিল এবং বাংলা মাসিক বঙ্গশ্রী ছাড়াও ইংরেজী সাপ্তাহিক বঙ্গশ্রী বেরিয়েছিল। কিরণকুমার রায় ও সুধাংশুপ্রকাশ চৌধুরী দুখানা কাগজই সম্পাদনা করত, আর মানিক বন্দ্যোপাধাায়ও সহকারী নিযুক্ত হয়েছিল মাসিকের জন্য। কিন্তু কিরণ ও সুধাংশুর এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। তারা নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছা সম্পূর্ণ চেপে রেখে মালিকের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে যেতে পারত। কিন্তু মানিক ছিল ভীষণ স্বতন্ত্র, তার সঙ্গে সচ্চিদানন্দ ভট্টাচাধের বিরোধ বেধেছিল আর তার কলে মানিক শহরতলী নামক বড় এক উপন্যাস লিখে বসল। সেখানা আমি পড়িনি, তবে শুনেছি তা নিয়ে মামলার কথা উঠেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সচ্চিদানন্দের শাসন ছিল প্রবল, তার মতের বিরোধী কোনো প্রবন্ধ বা গল্প ছাপা নিষেধ ছিল বঙ্গশ্রীতে। এমন কি তিনি যখন নিজে বাংলা ও ইংরেজী প্রবন্ধ লিখতে লাগলেন বাংলা ও ইংরেজী বঙ্গশ্রী তে, তখন ভাষায় ভুল থাকলেও কিরণ বা সুধাংশুপ্রকাশ তা সংশোধন করতে সাহস পেত না।
- পৃষ্ঠা ৩৭-৩৮
- আমি তো জীবনের অনেক দুঃখ-বেদনাকেই হাসির সাহায্যে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছি, এবং বেদনাকে চেপে রাখার জন্যই অনেক সময় কৌতুকের আশ্রয় নিয়েছি, তখনও তাই করতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্ত শিল্পীর নিস্পৃহতা এ সময়ে খুব ছিল না। মৃতদেহের মুর্মুষুর ফোটোগ্রাফ তোলার প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু এর কল্পনাতেও মন বিরূপ হয়ে উঠত, তাই এতবড় ট্রাজিডিকে আমার কামেরার উপকরণ করতে মন চায় নি। একখানি ছবিও তুলিনি। তাই গল্প লিখতে গিয়েও ঠিক গল্প হল না। পরে লিখলাম। তা আমার ব্রাক মার্কেট নামক বইতে সঙ্চলিত হয়েছিল।
- পৃষ্ঠা ১২৭
- জগদীশচন্দ্র ও গাছের প্রাণ বিষয়ে প্রসঙ্গ কিছু কাল চুপচাপ থাকার পবে মাঝে মাঝেই নতুন করে আরম্ভ হয়েছে, এবং আবার এর বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে। কিন্তু অশিক্ষিত পাঠাপুস্তক লেখক ও উদাসীন শিক্ষা বিভাগের যোগাযোগে জগদীশচন্দ্র গাছের প্রাণ আবিষ্কার করেছিলেন এ জ্ঞান অদ্যাবধি সচল আছে। এমন কি জগদীশচন্দ্রের একান্ত স্নেহভাজন ও সহকর্মী বসু-বিজ্ঞান মন্দিরের গবেষক গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের একখানা চিঠি ছাপার পরেও পাঠাপুস্তক থেকে এ মিথ্যাটি দূর হয়নি। গোপালবাবু লিখেছিলেন, জগদীশচন্দ্রের গাছের প্রাণ আবিষ্কারের কথা তিনি জানেন না, কারণ কখনো শোনেননি। অথচ তিনি প্রায় ৫০ বছর সেখানে আছেন।
- পৃষ্ঠা ১৭২
- শ্রীমতী কনক মুখোপাধ্যায় পাত্রী নামে একটি গল্প লেখে সাময়িকী বিভাগে। বিবাহ ব্যঙ্গকারী সেই “পাত্রী" এমন বাস্তব হয়েছিল যে, কয়েকজন পাঠক লেখিকার নামে চিঠি দিয়ে জানান তারা এ পাত্রীকে বিবাহ করতে রাজি আছেন।
- পৃষ্ঠা ২৭৯
- যখন ইংরেজি পড়তাম তখন ছাত্রদের মধ্যে ইংরেজি বানান ও শব্দ বা ইডিয়মের ভুল ব্যাবহারে সবাই লজ্জিত হয়েছি এবং সঙ্গে সঙ্গে তা সংশোধন করার পর তবে উদ্বেগ দূর হয়েছে। সংস্কৃত ভাষার ক্ষেত্রেও তাই। বাংলা ভাষার স্থান তখন দ্বিতীয় হলেও তাঁর ভুল ব্যাবহার ঘটতে দেওয়া হত না। তখন কোনো জিনিস বাতিল করে নতুন করে আরম্ভ করাকে কথনো "ঢেলে সাজানো” লেখা হত না, "ঢেলে সাজ” লেখা হত। ঢেলে সাজানো আমরা কখনো শুনিনি। ওটা কল্কের নিঃশেষিত-রস তামাকটুকু ঢেলে নতুন করে তামাক সাজার ব্যাপার। সকল বাড়িতেই তাই হত। ওরে তামাক সাজ এই ছিল আদেশের ভাষা। কিংবা “তামাক সাজি, বাবু?" ভৃত্যের কথা। ভূত্যেরাও “তামাক সাজাই, বাবু" বলত না। এখন হঠাৎ দেখি "ঢেলে সাজানো” কথাটা চলতে আরম্ভ করেছে, এর পর “পান সাজাও" বা পান "সাজিয়ে দাও" এলো বলে। কেউ একবার লিখলেই হয়। "প্রশ্ন রাখ” বাংলা নয়। অথচ সবাই লিখছেন বা বলছেন "আমি একটি প্রশ্ন রাখছি" কিংবা “আমি একটি প্রস্তাব রাখছি"। এ ভাষা ব্যবহারকারীরা প্রশ্ন-রক্ষক বা প্রস্তাবরক্ষক হয়েছেন এখন। কিন্তু এতে ভাষাটাই শুধু রক্ষা করা যাচ্ছে না।
- পৃষ্ঠা ২৮২
- আকাশবাণীর বাংলা বিভাগ থেকে যে দুঃসাহসী বাক্তি প্রেরণা অর্থে অবদানের ব্যবহার, ফল অর্থে ফলশ্রুতির ব্যবহার এবং পারমাণবিক অর্থে আণবিক শব্দের ব্যবহার বন্ধ করতে পারবেন, তিনি জাতির নমস্য হবেন, ইতিহাসে তার নাম থাকবে, এ কথা আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি। এই শুভ কাজের আরম্ভ কে করবেন জানি ন।। তবে শুনেছি অপপ্রচারকারীদের 'একটা ভ্যানিটি', আছে তাই তারা অন্যের কথা শোনেন না। হতে পারে, কিন্তু ভ্যানিটিটা আমাদের টাকায় না প্রদর্শন করলেই আমরা বাঁচি।
- পৃষ্ঠা ২৮৩
- দুঃখটা অবশ্য অভ্যাসবশত। এবং তা এ যুগের বাঙালী হেসে উড়িয়ে দিতে পারবে। এমন আত্মধ্বংস এই ভারতবর্ষেরই অন্য রাজ্যে বিরল।
- পৃষ্ঠা ২৮৪
- ভূত অনেক সময় ছেড়ে আসা বাড়িতে হন্ট করে, মায়া ছাড়তে পারে না, আমি ভূত-পূর্ব অবস্থাতেই তাই করছি, পোস্ট-ভূত অবস্থায় কি করব জানি না। তবে অনেকের ঘাড় মটকাবার ইচ্ছা আছে, এইটুকু মাত্র পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।
- পৃষ্ঠা ২৮৭
সপ্তপঞ্চ
[সম্পাদনা]সপ্তপঞ্চ, মিত্র ও ঘোষ
- আমরা যে-কালের ভিতর দিয়ে চলি, তা অতান্ত কাছে থাকে ব'লে তাকে আমরা দেখি না। বোধ হয় অব্যবহিত বর্তমানকে সম্পূর্ণ ক'রে দেখতে পাওয়া মনের ধর্মই নয়। তার দুখানি মাত্র পা, অথচ কাল তিনটি, তাই তিনটি কালে সে সমান ভাবে পা ফেলতে পারে না। যদি কেউ পারে তবে জানা যাবে সে ব্যাকরণের পাতা খুলে ব্যাকরণের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালে আবদ্ধ হয়ে আছে। ব্যাকরণের বাইরে যে তিনটি কাল, তার উপরে মনের গতি পেন্ডুলামের গতি। পেন্ডুলাম তার গতিসীমার দুই প্রান্তে একবার থামে, মধ্যপথে কখনো থামে না।
- নানা রঙের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ১
- অতীত ও ভবিষ্যৎ কালেই যে মানুষ বেশি বাস করে তার আর একটি প্রমাণ দিয়ে থাকেন গণৎকার। কেউ হাত দেখে, কেউ কোষ্ঠী দেখে, মানুষের অতীত ও ভবিষ্যৎ ব'লে চলেছেন। বর্তমান তার কাছে তুচ্ছ, কারণ বর্তমানের জ্ঞানের উপর কারও দাবি নেই। গণৎকারও তাই সাধারণ মানুষের মতো দ্বিকালদর্শী। আমিও তাই। ত্রিকালদর্শী হ'লে তো খষি হতে পারতাম।
- নানা রঙের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ১-২
- সাড়ে তিন বছরের ঘটনা, যে কথাটি যখন মনে আসছে পর পর লিখে চলেছি। চলন্ত ছবি। এক-একটি ছবি ঘিরে কত রঙ, তা শুধু আমার মনের মধ্যেই উজ্জ্বল।
অসুখবিলাসী খুঁতখুঁত-ধর্মী প্রেমেন্দ্র মিত্র নিজের যে-কোনো তুচ্ছ অসুখের কথা নিয়ে কিরণের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক ধ'রে আলাপ চালাচ্ছে। বঙ্গীয় ব্যাধিসাহিত্য নামক কোনো সাহিত্য-শাখা থাকলে প্রেমেন সে শাখার স্থায়ী সভাপতি হত।
এক পাশে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীরদচন্দ্র চৌধুরী ইংলন্ডে একটি বিশেষ জাতীয় ফার্ম গাছ আছে কি না তা নিয়ে তুমুল তর্ক বাধিয়েছেন। সামনে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন একখণ্ড খোলা পড়ে আছে ।
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তার ক্রমশঃ-প্রকাশিত অভিশাপ উপন্যাসের কিস্তি অতি বিলম্বে এনেছেন। তা নিয়ে কিছু তিক্ত ভাব সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিশপ্তের মতো বসে আছেন নীরবে। পাশে তার অনুচর কবি সুবল মুখোপাধ্যায়, মুখে স্মিত হাসি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিতান্তই তরুণ যুবক, চেহারায় উদাসীন বাউলের ভাব। বেপরোয়া। লেখক। লিখছেন প্রচুর। হাতে রেস্বিজ্ঞান গবেষণার খাতা।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মধুর কণ্ঠে সরস গল্প জমিয়ে তুলেছেন। পরম উপভোগ্য মুহুর্তগুলি উড়ে চলেছে পাখা মেলে।
হ্রস্বদেহ বজ্রকণ্ঠ প্রমথনাথ বিশীর সঙ্গে শিল্পী অরবিন্দ দত্তের তুমুল তর্ক চলছে। এ তর্কের কোনো হেতু নেই। তর্কের জন্যই তর্ক। আর্ট পর আর্টস সেক।
মোহিতলাল মজুমদার রবীন্দ্রনাথের প্রতি বড়ই ক্ষুব্ধ। তার সমালোচনা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে খেয়াল নেই। বলছেন--খুব দম্ভের সঙ্গে-“রবীন্দ্রনাথ একটি লাইন ইংরেজী লিখতে জানেন না।” এবং আরো কত কি, লেখবার মতো নয়।
তাকে সামনে পেলে রক্তপান করেন এই রকম ভাব।
সদাশিব শিব গাঙ্গুলী ইংরেজী টোনে মাঝে মাঝে বক্র কটাক্ষে বলে উঠছেন--“হোয়াটস্ অল দিস ফাস্?”- নানা রঙের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ২-৩
- নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যার অশরীরী, একেবারে শেলীর স্কাইলাক, স্থুলত্ব কিছু নেই, সবখানি আবেগ আর উচ্ছাস। সব কাজ তার ইন্স্পায়ার্ড। সুন্দর কিছু পেলেই গদগদ তার। মধুর কণ্ঠ, গীতধর্মী সুর, সেই সুরের কাছে সত্য মিথ্যা সব একাকার। অবিন্যস্ত চুল। দেখলেই মনে হয় দুনিয়া চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে এই খবরটি তার মুখে এখুনি শুনতে পাব।
ঘোর গরম, পাখার হাওয়া তুচ্ছ মনে হচ্ছে। এমনি সময় পাখা বন্ধ ক'রে দিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি সিগারেট যোগাড় করেছেন, খেতে হবে আরাম ক'রে । পাখার হাওয়ায় অকারণ বেশি পুড়ে যায়। তীক্ষ তীব্র কণ্ঠ। অবিচলিত, 'আত্মস্থ, আপন বিষয়ে সচেতনতাহীন। গ্রাম্য বালক যেন। উত্তেজনাহীন, রাগদ্ধেষহীন।
বিভূতিবাবু বলছেন ব্যবসা করবেন। তার ফলে এক তুমুল কাও ঘটে গেল। দশ বারোজনে মিলে তাকে ব্যবসার প্ল্যান দিতে লাগলাম । প্রত্যেকটি প্ল্যান সর্বোৎকৃষ্ট। এই ঘটনাকে একটু প্রলম্বিত ক'রে প্ল্যান গল্পটি লিখেছিলাম। সেটি বঙ্গশ্রী' জ্যৈষ্ঠ (১৩৪০) সংখ্যায় ছেপেছিলেন সজনীকান্ত।- নানা রঙের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ৫
- শিল্পী যামিনী রায় এসে বসেছেন। ব্যাখ্যা করছেন ভার আপন শিল্পতঙ্গি। শিল্পী অতুল বসু, চৈতন্যদেব চট্টোপাধ্যায়, মনীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, হরিপদ রায় আসছেন নিয়মিত ।
বনফুল সিনেমা দেখে জ্যানেট গেনরকে উদ্দেশ ক'রে কবিতা লিখে টেলিফোনে শোনাচ্ছে কিরণকুমারকে।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছে মুঙ্গের থেকে। আলাপ হ'ল তার সঙ্গে। আবিষ্কার করলাম পনেরো বছর আগে আমরা একই কলেজে একই ক্লাসে এবং সেকশনে পড়েছি। কেউ কাউকে চিনতাম না, বঙ্গশ্রী অফিসে বসে পরিচয় হ'ল। কেউ কাউকে কখনো দেখেছি বলেও মনে হ'ল না।
ডাক্তার রামচন্দ্র অধিকারী আবৃত্তি শোনাচ্ছেন সবাইকে অবাক ক'রে। স্মৃতি এবং কণ্ঠ ছুইই চমকপ্রদ। অপরের ফুসফুস নিয়ে কারবার, কিন্ত তার নিজের অন্তরটা আর সবারই কাছে উন্মুক্ত থাকত।
ডাক্তার পশুপতি ভট্টাচার্য আসতেন কদাচিৎ। সব রকম বিষয়ে লেখায় ওস্তাদ। আর আসতেন বিজ্ঞানী গোপাল ভট্টাচার্য, উকিল জ্ঞান রায়, দেবীদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণ কবি জগদীশ ভট্টাচার্য, বাসবেন্দ্র ঠাকুর, ঝুনোকবি কৃষ্ণধন দে।
কবি হেমচন্দ্র বাগচী শান্ত মধুর ভাবে এসে বসতেন। প্রকাণ্ড ব্যাগে গান্ধীজি, উড়িষ্যার মন্দির এবং অসহযোগ আন্দোলনকে পুরে নির্মলকুমার বসু আসতেন প্রসন্ন হাসিমুখে।- নানা রঙের দিনগুলি, পৃষ্ঠা ৭
- হাস্য-কৌতুকের উপাদান প্রধানত মানুষের জীবন। জীবন অর্থে মানুষের চরিত্র ও তার ব্যাবহারিক জীবন। মানুষের জীবন হাস্যকর হল কেন, এ প্রশ্নের উত্তর বহুকাল থেকে খোঁজা হচ্ছে, কিন্ত জীবনকে যেমন ব্যাখ্যা করা যায় না, জীবন কেন হাস্যকর তারও তেমনি ব্যাখ্যা করা যায় না। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, জীবনটাই কি তবে একটি ব্যঙ্গ? একটি হাসির ব্যাপার?
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১০
- একটি মানুষের বহু পরিচয়। ব্যক্তিগত, পরিবারগত, সমাজগত এবং তা ছাড়াও বহু। স্বসীমার মধ্যে সব পরিচয়ই সত্য। কোনে একটি পরিচয় তার শেষ পরিচয় নয়।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১০
- ঘুষ নেওয়ার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে জনসাধারণকে ঘুষ নেওয়ার বিরূদ্ধে উত্তেজিত ক'রে তুলছে যে লোকটি, সেই লোকটি ঘুষ খেয়ে বক্তৃতা থামিয়ে দিতে পারে--এ দুর্বলতা মানুষের আছে, কিন্তু আমরা যখন তার বক্তৃতা শুনছি, তখন আমাদের মন আপনা থেকেই মেনে নিয়েছে যে, লোকটা নিজে খুব সৎ। এমন অবস্থায় তাকে ঘুষ নিতে দেখলে মন আছাড় খেয়ে পড়ে। অতি শ্রদ্ধেয় ধর্মগুরু- যদি রাত্রে সিঁদ কেটে বেড়ান তা হলে তা দেখেও মন ধাক্কা খায়।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১১
- অপ্রত্যাশিত বা অসম্ভবকে হঠাৎ দেখলে মনের চিন্তাধারা ডিগবাজি খায় আগেই বলেছি। মন যেন একটা আবর্তের মধ্যে পড়ে যায়। এবং এতে যদি তার নিজের স্বার্থ জড়িত না থাকে তবে সে হাসতে থাকে। নিজের স্বার্থ জড়িত থাকলেও আচমকা আঘাতে অনেক সময় লোকে হাসে। মার খেতে খেতেও, ভুল লোককে মারা হচ্ছে বলে যে লোকটি হাসতে পারে, তার কথা আমরা জানি।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১১
- স্থায়ী ট্র্যাজেডি বা ভাগ্যের পরিহাসের উপর ভিত্তি ক'রে যে সব হাস্যরসের সৃষ্টি, তা আমাদের মনে স্থায়ী আসন পাতে। সমস্ত মানবতার দুঃখ বেদনা, বঞ্চিতের হাহাকার যেন তার মধ্যে স্পষ্ট ফুটে ওঠে। অথচ না হেসে পারা যায় না।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১৩
- হাসির সঙ্গে অশ্রু ওতপ্রোত। চার্লি চ্যাপলিনের হাস্যরস এই জাতীয়। সেও বঞ্চিত মানবতার ছবি। তাই তিনি পৃথিবীর এক জন শ্রেষ্ঠ মানব। বঞ্চনা সকল মানুষেরই আছে কোনো না কোনো দিকে। চার্লি সকল বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি। তার ভিতর দিয়ে আমরা সংসারের ছবি দেখতে পাই। না হেসে পারি না, কিন্ত মনের চোখ জলে ভরে ওঠে। যে হতভাগ্য জীবনের নূন্যতম প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত, ছোট-খাটো আনন্দও তার জীবনে কি প্রতিক্রিয়া ঘটায়, তা আমার মতে চার্লির মতো আর কোলো শিল্পী দেখাতে পারেন নি। “গোল্ড রাশ' ছবিতে জর্জিয়া হেল-এর নিমন্ত্রণে আশাতীত আনন্দের প্রতিক্রিয়াম্বরূপ আশ্রয়দাতার ঘরের বালিশ ছেঁড়া, আসবাবপত্র ভাঙার কথা, অনেকের মনে আছে আশা করি।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১৩-১৪
- কৌতুক হাস্যের অনেকগুলি স্তর আছে। যে স্তর সবচেয়ে গভীর, যা হৃদয় স্পর্শ করে, যা মানুষের দুঃখবেদনাকেই কৌতুকের আবরণে ফুটিয়ে-তোলে; হাসি-কান্নার যৌগিক মিলন ঘটায়, তাই হচ্ছে উচ্চশ্রেণীর হাস্যরস। এর একটা স্থূল দিক আছে, তা অতি নিচু স্তরের। জামাই ঠকানো কৌতুক এই জাতীয়, এতে দৈহিক পীড়ন প্রধান অংশ নেয়। আধুনিক রুচিতে বীতৎস। কিছু দিন আগে এমনি কৌতুকের একটি খবর পড়েছি। শালীরা সদ্যবিবাহিত ভগিনী-পতিকে ঠকিয়ে মজা করতে চেয়েছিল। রসগোল্লার মধ্যে আলপিন পুরে দিয়েছিল এই মজা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। জামাই তাদের শেষ হাসি হাসিয়ে হাসপাতালে মারা গেছে। গোপাল ভাঁড়ের নামে এই জাতীয় কৌতুক চলে অনেকগুলো। আধুনিক “হরার কমিকস” এই শ্রেণীতে পড়ে--যদিও সেটি বিশুদ্ধ বীভৎস-রস।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১৪-১৫
- প্রমথ চৌধুরী ছিলেন উইটের বাদসা।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১৫
- রাজশেখর বসুর কমিক-চরিত্র সৃষ্টির ক্ষমতা বাংলাসাহিত্যে অতুলনীয়।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১৫
- সব দেশের লোকই কৌতুক ভালবাসে, আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়। প্রমাণ, বাংলার সাহিত্যে এবং জীবনে, সকল যুগেই হাস্যরসের জন্যে জায়গা ক'রে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গল কাব্যগুলোতে, বাংলার রামায়ণে, মহাভারতে, কবি গানে, গম্ভীরা গানে এবং গোপাল ভাঁড় থেকে ভারতচন্দ্রের পথে ঈশ্বর গুপ্ত পর্যন্ত যে প্রাচীন যুগ শেষ হয়েছে তার সর্বত্র খাঁটি বাংলা কৌতুক।
- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১৭
- সম্ভবত এই কারণেই সম্প্রতি এক প্রকাশ্য সভায় রাজ্যপালের উপস্থিতিতে একথা স্পষ্ট ঘোষণা হয়েছে যে, পরিহাস আমাদের জীবনে প্রয়োজন।
লক্ষণ শুভ স্বীকার করতেই হবে। সম্মেলনের নামই দেওয়া হয়েছিল পরিহাস-সম্মেলন। আশা করা যায় বাঙালী জাতি এ সম্মেলনের ইঙ্গিত যথাযথ গ্রহণ করবে এবং এতে সরকারী সম্পর্ক থাকার জন্যই একে সরকারী-পরিহাস বলে মনে করবে না।- হাস্যকৌতুক প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা ১৮
- রবীন্দ্রনাথের “জুতা আবিষ্কার" নিতান্তই তার নিজস্ব আবিষ্কার-হবু রাজার আদেশে এবং গোবুচন্দ্র মন্ত্রীর মধ্যস্থতায়। আর সেটি স্বভাবতই বিশুদ্ধ কৌতুকজুতো, ভেজিটেবল জুতোর সগোত্র। এর কারণ জুতোর দুটি ব্যাবহারিক দিকের একটিকে মাত্র 'জুতা আবিষ্কার'-এ স্বীকার করা হয়েছে, অন্যটিকে হয়নি। এই দুই দিকের একটি হচ্ছে পরার দিক, আর একটি হচ্ছে মারার দিক। 'জুতা আবিষ্কার'-এ পরার দিকটি মাত্র স্বীকৃত।
মারার দিকটি, বলা বাহুল্য, জুতোর হিংসাত্মক দিক। কিন্ত জুতো মারা হিংসাত্বক কাজ হলেও, এটি নৈতিক হিংসা, কারণ জুতো যার পিঠে মারা হয় তার চামড়ায় যত না আঘাত লাগে, মনে লাগে তার দশগুণ বেশি।- জুতো ও জুতোনো, পৃষ্ঠা ১৯
- জুতো আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে জুতো মারা আবিষ্কার হয়েছে কিনা বলা শক্ত, কিন্ত জুতো যে প্রাগৈতিহাসিক আবিষ্কার এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। আদি যুগের প্রথম মানুষ গায়ে চামড়া জড়াতে শিখেছে-সেই কত লাখ বছর আগে। চামড়া পায়ে জড়াতেও শিখেছে তখন থেকেই। তারপর মানুষ যখন নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন বিশেষ দেশের আবহাওয়া বুঝে আমিষ অথবা নিরামিষ জুতো তৈরি ক'রে নিয়েছে। ঈজিপ্টের প্রাচীন লোকেরা প্যাপিরাস্-এর শ্যাণ্ডাল তৈরি করেছে, ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে পাট এবং কাপাসের স্ব সুতোয় জুতো তৈরি করেছে। এ নিয়ে গবেষণার অনেক সুযোগ আছে অবশ্যই।
- জুতো ও জুতোনো, পৃষ্ঠা ১৯
- অথচ মজা এই যে, শিল্পী যখন রামের শুন্য সিংহাসনের ছবি আঁকেন, তখন তাতে ভরত স্থাপিত রামের পাদুকা-রুপ এক জোড়া খড়ম আঁকেন, চামড়ার জুতো আঁকেন না। রাম কি এমনই নির্বোধ ছিলেন যে তিনি বনবাসে যাচ্ছিলেন খড়ম পায়ে? যে রাম শত্রুর সঙ্গে পদে পদে লড়াই করতে হবে জেনে অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন, তিনি প্রতি পদে একখানা ক'রে খড়ম পরেছিলেন ভাবাই যায় না। তবে কি এক জোড়া একস্ট্রা খড়ম ব্যাগে পুরে নিয়েছিলেন ভরতকে দিতে হবে আন্দাজ ক'রে? রামায়ণে কিন্ত আছে, রাম ভরতকে যে পাদুকা দেন, তাতে সোনার কাজ করা ছিল। নাগরী বলেই মনে হয়। শিল্পীরা তবে খড়ম আকেন কেন?
- জুতো ও জুতোনো, পৃষ্ঠা ২০
- আর্যে অনার্যে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়, তাতে আর্যরা খড়ম পায়ে যুদ্ধ করেননি। মহাতারতে জ্ঞাতিগুষ্টিতে যে যুদ্ধ হয় তাতেও খড়মের উল্লেখ নেই। এমনকি ১৯১১ সালের মোহনবাগান খেলোয়াড়দের মতো খালি পায়েও তারা লড়াই করেননি, জুতো প'রেই করেছিলেন।
- জুতো ও জুতোনো, পৃষ্ঠা ২০
- কি বই পড়ব? এই প্রশ্নটি কবি কালিদাসকে জিজ্ঞাসা করলে তার পক্ষে এর উত্তর দেওয়া সম্ভবত অনেকটা সহজ ছিল। সে আজ দেড় হাজার বছর আগেকার কথা তো বটেই। অর্থাৎ এই দেড় হাজার বছর আগে কবি কালিদাসের লাইব্রেরিতে কি কি বই ছিল সে সম্পর্কে আংশিক অনুমান করা হয়তো চলে, সম্পূর্ণ চলে না। কারণ বই তখন ছাপা হত না, থাকত পাণ্ডুলিপিতে অথবা কণ্ঠে। ব্যাকরণ, অলঙ্কার শাস্ত্র, নাট্যশাস্ত্র এবং অন্যান্য নানাবিধ শাস্ত্র বা আইনের বই, রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, উপনিষদ, স্মৃতি, সংহিতা, কিছু পুরাণ, নাটক, জীবনী, পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ--এ সব তার লাইব্রেরিতে ছিল অনুমান করা যায়।
- কি বই পড়বো?, পৃষ্ঠা ২৪
- এই প্রসঙ্গে বলা দরকার যে আগের দিনের সাহিত্য সমালোচনা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত রুচির উপরেই নির্ভরশীল ছিল, এখন আর তা চলে না, গ্রাহ্য হয় না। এই রীতি সব দেশেই ছিল, হয়তো এখনও কিছু কিছু আছে। আগের দিনে বড় লেখক আর এক বড় লেখককে ভুল বুঝে কত উত্তেজনাই না সৃষ্টি করেছেন। আমাদের দেশের কোনো বড় লেখকই আঘাতের হাত থেকে বাঁচেননি। ইংরেজী সাহিত্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ হয়েছে আরও বেশি। এমন কি শেক্সপীয়ারও অসভ্য মাতাল বর্বর লেখক রূপে অভিহিত হয়েছেন। সাহিত্যিক গালাগালির সংকলনগ্রন্থ পাওয়া যায় ইংরেজী ভাষায়।
- কি বই পড়বো?, পৃষ্ঠা ৩০
- কিন্তু এমন লোক আছে যে কিছু জানাকে বড়ই ভয় করে। সে শুধু অতীতের বিশ্বাস এবং সংস্কারের মধ্যে ডুবে থাকে, তার সেই জ্ঞানসীমার বাইরে আর কোনো সত্য আছে এ কথা সে বিশ্বাস করে না। আধুনিক সংস্কার-মুক্ত বিজ্ঞানে তার বিশ্বাস নেই, আস্থা নেই। যেমন এক দল দার্শনিক আছেন যারা আধুনিক জ্ঞানের আলোয় বিশ্বের চরম সত্য কি সে সম্পর্কে পূর্ববর্তীদের মত পরিমার্জিত করতে করতে এগিয়ে চলেছেন, আর এক দল প্রাচীন কালের লব্ধ সত্যের বাইরে আর কোনো সত্য আছে বিশ্বাস করেন না। এমন কি থাকা উচিত নয় ব'লে বিশ্বাস করেন। আর এক দল আছেন ধারা জ্ঞানের পথে, বুদ্ধির পথে, চলতে ভয় পান। প্রাচীন জ্ঞান বা আধুনিক জ্ঞান, দুইয়েতেই তাদের সমান বিতৃষ্ণা। তারা কেবলমাত্র অন্ধ বিশ্বাসের আশ্রয়ে বাস করতে ভালবাসেন। আরও এক দল আছেন যারা নিজেদের ধ্যানলব্ধ অব্যবহিত সত্য ভিন্ন আর কিছু আছে বলে জানেন না। এই শেষোক্ত দল আপন মনের মধ্যে ডুব দিয়েই সব পেয়ে যান, তাদের আর কিছু পাবার দরকার নেই।
- কি বই পড়বো?, পৃষ্ঠা ৩১
- বাংলা ভাষায় বইয়ের প্রচুর অভাব। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য উচ্চ মানের বই অতি সামান্যই আছে। বহুমুখী জ্ঞানের পিপাসা তৃপ্ত করবার মতো অবস্থা আমাদের নেই। যে বই পড়ে আধুনিক সমাজে শিক্ষিত ব'লে পরিচয় দেওয়া যায় এ রকম বই দু একটি বিষয়ে মাত্র আছে, হাজার বিষয়ে নেই। ইচ্ছামতো যে-কোনো বিষয় বেছে নিয়ে সে বিষয়ে উচ্চ জ্ঞান লাভ করবার যোগ্য বই নেই। আমাদের নিজস্ব শিল্প, সংস্কতি, ভাষা, সাহিত্য, দর্শন এবং ইতিহাস বিষয়ে এবং বিজ্ঞানের কোনো একটি বা একাধিক বিষয়ে বই আছে, কিন্তু অন্য দেশের তুলনায় তা কিছুই নয়। অনুবাদসাহিত্যও সামান্য আছে, এবং ফরাসী বা রুশ সাহিত্যের যে অনুবাদ আছে, তা মূল থেকে নয়, তা অনুবাদের অনুবাদ, অতএব তার কোনো মর্যাদা নেই। মুল থেকে অনুবাদ ক'রে বাংলা সাহিত্যে গৌরব বৃদ্ধি করব, এমন সঙ্কল্প নিয়ে কেউ ফরাসী, রুশ বা জার্মান সাহিত্য পড়েছেন কি না জানি না। গ্রীক সম্পর্কেও ঐ একই কথা।
- কি বই পড়বো?, পৃষ্ঠা ৩২
- পৃথিবীর যুবশক্তির সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের কোন্ ছবিটি চোখে পড়ে? কেউ কল্পনা করতে পারেন ইংরেজ বা মার্কিন বা ফরাসী বা জার্মান যুবশক্তি সমস্ত অধ্যবসায় এবং অর্থ ব্যয় ক'রে বছরে গোটা দশেক দেবতা পুজোর, গোটা পঁচিশেক গুরুপুজোর আর নেতা-পুজোর শোভাযাত্রা বের ক'রে বছরের অপিকাংশ সময় নষ্ট করছে? এ কল্পনা করা যাবে না। আমরা কিন্তু তাই করছি। উপরন্তু বিয়ের শোভাযাত্রা আছে, রাজনৈতিক শোভাযাত্রা আছে।
- কি বই পড়বো?, পৃষ্ঠা ৩৪
- প্রতিক্রিয়া যদি অতি প্রবল না হয়, পাশ্চাত্য আদর্শে গড়া ভারতীয় ডেমোক্রেসির দেশ-গঠন আদর্শকে যদি প্রাচ্য ভক্তিরসের আতিশয্যে সাবোটাজ' না করি, যদি মহৎকে ঘরে বসে, বা পথে পখে, ঢাক পিটিয়ে পূজো করার পরিবর্তে কাজের মধ্যে দিয়ে নীরবে অনুসরণ করার প্রবৃত্তি আবার ফিরে পাই, ইংরেজ-চরিত্রের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তাকে আদর্শরূপে সম্মুখে ধরে রাখতে পারি, তবেই ভবিষ্যতে বাঙালী পাঠক হিসাবে “কি বই পড়ব” প্রশ্নের উত্তরে বাংলা বইয়েরই নাম করতে পারব, নইলে নয়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরের বাঙালী পাঠক এ প্রশ্নের উত্তর আর একবার দেবার চেষ্টা করবেন, ভবিষ্যৎ যুগ আনন্দের সঙ্গে সেই দিনের অপেক্ষা করবে।
- কি বই পড়বো?, পৃষ্ঠা ৩৫
- “তোমি কি চাউ?” এই অভূতপূর্ব প্রশ্নটি 'তুমি কি চাও'-এর বাচ্যান্তর, প্রবেশিকা পরীক্ষার্থীর লেখা। ইংরেজীতে এই জাতীয় মজার মজার ভুলকে বলে "স্কুলবয় হাউলার্স” বা শুধু হাউলার্স। ইংরেজদের দেশে পরীক্ষার্থীদের অদ্ভুত সব উত্তর সংগ্রহ ক'রে বই ছাপা হয়। স্কুলের ছেলেরা যে সব বিষয় অল্প জানে বা আদৌ জানে না, কিংবা মনে করে জানে, পরীক্ষার সময় সে সব বিষয়ে তাদের উত্তরগুলোতে এমন এক জাতীয় মৌলিকতা থাকে যা সর্বসাধারণের উপভোগ্য, এবং আমার মতে এই উপভোগ্য উত্তরগুলো জাতীয় সম্পত্তিবূপে গণ্য হওয়া উচিত।
- তোমি কি চাউ?, পৃষ্ঠা ৩৬
- দেবতারা ছিলেন অজ্ঞ। তাদের কমনসেন্সের অভাব ছিল। বিদ্যা বিশেষ কিছুই ছিল না। কিন্ত তবু এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, তারা নিজ নিজ বিভাগ পরিচালনায় সিন্সিয়ার ছিলেন। তারা মানুষের, বিশেষভাবে অনুগতদের, শুভার্থী ছিলেন। ভুল তাঁরা অনেক করেছেন, কিন্ত তাতে মানুষের কোনো গুরু অসুবিধে হয় নি।
দৈব শাসনে মানুষ এক রকম শান্তিতেই ছিল, এবং বহুদিনের অভ্যাসে একএকটি বিষয়ে তারা এক-একটি বিশেষ ধারণা গঠন ক'রে তাকেই প্রুফ মনে ক'রে মহানিশ্চিন্ত ছিল। কিন্ত আজ সে সব ধারণার মূলে আধুনিক “সাধারণ জ্ঞান'-এর এমন এক-একটি ধাক্কা এসে লাগছে যে আজ প্রাচীন মানুষ সেদিনকার প্রাচীন দেবতাদের অপেক্ষাও অধিকতর বিপন্ন বোধ করছে।- প্রাচীন মানুষের নূতন বিপদ, পৃষ্ঠা ৫৫
- বাংলাদেশে শিক্ষার মান মধ্যম ছিল বরাবরই। কিন্ত তাতে পূর্বযুগোচিত কিঞ্চিৎ আন্তরিকতা ছিল ব'লে তখন পাইকেরি হারে পাসের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আজকের তুলনায় শিক্ষিতের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি হ'ত। আজকের শিক্ষায় সাধারণ জ্ঞান নামক একটি বিতীবিকার আবির্ভাব ঘটাতে সে শিক্ষাটুকু চাপা প'ড়ে গেছে।
- প্রাচীন মানুষের নূতন বিপদ, পৃষ্ঠা ৫৭
- সাধারণ জ্ঞান দেশের এই ক্ষতি করেছে। সাহিত্যপ্রীতি ভাষাপ্রীতি ও আন্তরিকতা এ তিনের অভাব নিয়ে সাহিত্য পত্র প্রকাশ করার মূলে ঐ প্রথম চর্বি মাখা সাঁতারুর আদর্শ।
- প্রাচীন মানুষের নূতন বিপদ, পৃষ্ঠা ৬০
- রবীন্তনাথের ব্যঙ্গকৌতুকের কমলাসনা সরস্বতীকে আজ যদি প্রশ্ন করা যায়, “বিদ্দ্যার এই অধোগতির মূলে আপনার দায়িত্ব কতখানি আছে তা প্রকাশ করুন", তা হ'লে কি ঘটবে তা অনুমান করা কঠিন নয়। তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর পার্শ্বস্থ হাঁসটির দিকে অঞ্গুলী নির্দেশ ক'রে বলবেন, “ওকে জিজ্ঞাস কর।” কিন্ত এ কথা শোনামাত্র বিপন্ন হাঁসটি উড়ে পালিয়ে যাবে এবং দেবী সরস্বতী মাথাটি নিচু ক'রে পদ্মের পাপড়ি ছিঁড়তে থাকবেন।
তার পর প্রহরখানেক গত হ'লে কম্পিত কঠে বলবেন, "সাধারণ জ্ঞান এর ক্রিয়া।”- প্রাচীন মানুষের নূতন বিপদ, পৃষ্ঠা ৬১
- সাহিত্যে যেমন দুর্মুখ আছে, সাহিত্যিকদের মধ্যেও তেমনি দুর্মুখের অভাব নেই। এ'দেরও আমরা ভালবাসি । ভোলটেয়ার, ডক্টর জনসন, মার্ক টোয়েন বা বারনার্ড শ এরা সবাই আমাদের প্রিয় দুর্মুখ। এদের আক্রমণের লক্ষ্য ব্যাপক, কিন্ত মাঝে মাঝে ব্যক্তিবিশেষকেও আক্রমণ ক'রে থাকেন। এরা সত্যও বলেন অপ্রিয়ও বলেন, কিন্ত তবু সেই ভাষণে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থাকে না বলেই তা কাউকে আঘাত করে না। বরং তাতে ব্যক্তির বা সমাজের কল্যাণ হয়।
- অপ্রিয় সত্য, পৃষ্ঠা ৬৩
- আগে বলেছি অকারণ গায়ে পড়ে অন্যকে আঘাত দেবার জন্য যারা নিষ্ঠুর কথা বলে তারা অনেক সময় লাঞ্চনাও ভোগ করে। এই উদ্দেশ্যেই দুর্মুখজাতীয় লোককে উপদেশ দিয়ে এক রসিক ব্যক্তি বলেছেন--“কোনো পেশীবহুল জোয়ান জবরদস্ত মিথ্যাবাদীকে কখনো নিজে দুর্মুখের ভূমিকায় নেমে মিথ্যাবাদী বলো না; সে যে মিথ্যাবাদী এ বিষয়ে তোমার যদি সন্দেহ না থাকে, তা হ'লে অন্য কোনো লোককে ভাড়া ক'রে এনে, কথাটা তাকে নিয়ে বলিও।"
- অপ্রিয় সত্য, পৃষ্ঠা ৬৫
- ক্যানিং স্ট্রীট এলাকার এক অংশের নাম মুর্গীহাটা। ইউরোপীয়ানদের আদি ঘাঁটি ছিল এই এলাকায়-তাই এইখানেই ছিল তাদের মুর্গীর হাট। এখন আর এখানে মুর্গী নেই। কিন্তু মুর্গী না থাক, লেডিকেনি অবশ্যই আছে--এবং ওটাই এখন সান্তনা।
- ক্যানিং স্ট্রীট, পৃষ্ঠা ৬৮
- জীবনটাকে যত গুরুভাবেই গ্রহণ করি না কেন, তবু এরই মধ্যে কোন্ এক অদৃশ্য শক্তি মাঝে মাঝে এসে গুরুত্ব ভেঙে দিয়ে সব ভার লঘু করে দিয়ে যায়। জীবন সম্পর্কে আমাদের ভ্রান্ত ধারণাই সম্ভবত এর জন্য দায়ী। আমরা মনে করি যা আমরা চাই তা পাব, যে পথে চলেছি সে পথ আমাদের বাঞ্ছিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে, যা ঘটা আমাদের মতে সম্ভব তা৷ এ সংসারে নির্ঘাত ঘটবে।
- বিপিন চৌকিদার ও আমি, পৃষ্ঠা ৬৯
- ক্রন্দনের ইতিহাসে জগৎ পূর্ণ, জীবন পূর্ণ। আর তা প্রায় সবার জীবনে সমান। অথচ মজা এই যে মানুষের জীবনে কৌতুকের দেবতা সর্বদা ওরিজিন্যাল, তার পথ স্বতন্ত্র, মানুষের জীবন নিয়ে সব সময় নতুন কিছু করার দিকে তিনি অতিমাত্রায় সচেতন। তাই মানুষের দুঃখ সবার প্রায় এক, কিন্তু সেই দুঃখ যখন তার জীবনে কৌতুকরূপে দেখা দেয় তখন তার চেহারা মৌলিক।
- বিপিন চৌকিদার ও আমি, পৃষ্ঠা ৬৯
- অনেক বছর ধ'রে, বিভুতিবাবুকে নানাভাবে, বিভিন্ন পটভূমিতে, অন্তরঙ্গভাবে জানবার সুযোগ হয়েছিল আমার। অবশ্য এমন সুন্দর মানুষটিকে অন্তরঙ্গভাবে জানবার সুযোগ আমার একারই ঘটেনি, কেননা তিনি ছিলেন সবার কাছেই সুলভ। তার কোনো দাম্ভিকতা ছিল না, তিনি সব সময়েই তার চারপাশে এমন একটি শুচিশুভ্র মধুর আবহাওয়া বয়ে নিয়ে বেড়াতেন যার স্পর্শে এলে মন নন্দিত হ'ত। কারো প্রতি কোনো ঈর্ষা নেই, কারো বিরুদ্ধে একটি নিন্দাবাক্য নেই, পরম উৎসাহের সঙ্গে তার দেখা কোনো দেশের কাহিনী বলতে শুরু করতেন, অথবা এমন কোনো কথা যা কারো ব্যক্তিগত নয়, সবারই। তাই কোনো একা ব্যক্তি একান্তভাবে তাকে পায়নি, সবাই তাকে সমানভাবে পেয়েছে।
- বিভূতিভূষণ, পৃষ্ঠা ৭৪
- দ্রুত ব'লে যাওয়া কথা থেকে “প্রেস রাইটিং"-এর ভঙ্গিতে আমি যেটুকু লিখে রেখেছিলাম তারই উপর নির্ভর ক'রে জীবনী অংশটি লিখছি। একবার ইচ্ছে হয়েছিল জীবিত লেখকদের কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখব তাদের জীবিতকালেই। নানা কারণে তা আর ঘটে ওঠেনি, কিন্ত এর মধ্যে থেকে আমার পরম প্রীতি এবং শ্রদ্ধাভাজন বিভূতিভূষণের কাহিনীটি তার স্মৃতি-কথা রূপে তার মৃত্যুর পর লিখতে হবে এটি স্বভাবতই আমার কাছে মর্মান্তিক। বিভূতিবাবু ছিলেন নিজেই একটি চরিত্র। মধুর ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি বহুজনকেই আপনার ক'রে নিয়েছিলেন, তাই বহুজনের প্রীতির সঙ্গে আমার এই প্রীতি তার স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদন ক'রে তৃপ্তি লাভ করছি।
- বিভূতিভূষণ, পৃষ্ঠা ৮৫
- যে তরুণ যুবক আপন ক্ষমতা বিষয়ে যথেষ্ঠ সচেতন নয়, শিল্পসর্জন যার সহজাত ধর্ম, এবং সে বিষয়ে যার দাম্ভিকতার বা আত্মপ্রেমের অস্বস্তিকর প্রকাশ নেই, তাকে সাধারণের দলে ফেলা যায় না। তাই মানিক আমাদের ভাষায় উন্মাদ আখ্যা পেলেও একমাত্র সেই বৈশিষ্ট্যেই সে ছিল আমাদের প্রীতিভাজন।
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৮৭
- তার জয়ও এইখানে। তাকে শুন্য পকেটে ফিরে যাওয়ার হাত থেকে কারো বাঁচাবার উপায় ছিল না। তার জীবন নিয়ে যে ব্যঙ্গ নাট্য রচিত হয়েছিল, তার অনিবার্য পরিণতি এটাই। তার মধ্য দৃশ্যের উপর যবনিকা টেনে দেওয়া নাটকের দাবীতেই প্রয়োজন ছিল, আর সে কাজ সে নিজ হাতেই ক'রে গেছে।
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৯২
- ভূত যারা দেখে না, তারা প্রায় সবাই অবিশ্বাসী। ভূতে যাদের বিশ্বাস নেই, সাধারণের বিচারে তারা নাস্তিক। অর্থাৎ ভগবানকে মানতে হ'লে ভূতকেও মানতে হবে। আরো সহজ ভাষায় যারা ভূত মানে, ধ'রে নেওয়া যায় তারা ভগবানকেও মানে। তার কারণ একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে মানা চলে না। ভগবান ও ভূতের মধ্যেকার সাঁকোটি সামান্য দীর্ঘ। ওটিকে জোড়াসাঁকো বলাই ঠিক। ভুতের সীমা ও ভগবানের সীমা জুড়ে আছে ডবল লাইন। মাত্র দশ জন লোক চক্রান্ত করলেই ভগবান ভূত হয়ে যান। অর্থাৎ ভূতের দলে মিশে পড়েন। প্রাচীন প্রবাদ দশচক্রে ভগবান ভূত।
- ভূতের ভবিষ্যৎ, পৃষ্ঠা ৯৩
- কিন্ত আমি বুঝতে পারি না মানুষের দেহ ভূত হয় কি ক'রে। কারণ যে মানুষ মারা গেছে, ভূত তার পরিচিত দেহেই দেখা দেয়। এই দেহ সে পায় কোথায়? হয়তো আত্মা ভূত হলেও ভৌতিক বস্তুরও ভূত হওয়ার সম্ভাবনা একটা আছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ সাইকেলে-চলা মানুষ-ভূতের সাইকেলও ভূত এবং যে জামাকাপড় পরে মানুষ-ভূত দেখা দেয়, সে জামা-কাপড়ও ভূত মানুষের দেহের মতো সাইকেল, জামা, কাপড় প্রভৃতি ভৌতিক বস্তুরও ভূত হওয়ার কোনো সহজ উপায় অবশ্যই আছে, আমি ঠিক জানি না। হয়তো অপঘাত মৃত্যুতে সব বস্তুই ভূত হয়, অথবা, বিকল্পে, সব বস্তুরই আত্মা আছে। স্বদেশী আন্দোলনের সময় যে সব বিলিতি কাপড় পোড়ানো হয়েছিল, সে সব কাপড় অবশ্যই ভূত হয়েছে। (তবে তারা স্বাধীনতার পরেও এ-দেশে আছে কিনা জানি না।) যে সব সাইকেল বা রেলগাড়ি দুর্ঘটনায় নষ্ট হয়েছে, তারাও অবশ্যই ভূত হয়েছে। বিমান, জাহাজ, নৌকো সবারই ভূত আছে। তবে সুবিধে এই যে, এ-সব জড় ভূত মানবীয় আত্মিক ভূতের চালনা ভিন্ন চলতে পারে না। মানবীয় ভূতের পোষাক পরার দরকার হ'লে পোষাকের ভূত গায়ে জড়িয়ে নেয়, সাইকেলে চড়তে হ'লে সাইকেলের ভূতে চ'ড়ে বেড়ায়। আত্মিক ভূত ও জড় ভূতের এই আত্মীয়তা, আত্মা ও জড় দেহের আত্মীয়তার সঙ্গে তুলনীয়। বেশি ভাবতে গেলে ভয়ে জড়সড় হ'তে হয়।
- ভূতের ভবিষ্যৎ, পৃষ্ঠা ৯৪
- কিন্ত জড় ভূত কেন দেখা যায় না, মাঝে মাঝে এর সদুত্তর পেতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, ভূতকেই এ-কথা জিজ্ঞানা করি, কিন্ত কোথায় ভূত? আজ -পর্যন্ত কারো দেখা পেলাম না। অথচ এই বাংলাদেশেই যে কত ভূত আছে, তার হিসেব নিলে সেন্সাস কর্তাদের মাথা ঘুরে যাবে। যারা ভূত দেখেছে, তাদের নাম ছাপা হওয়ার যদি কোনো সুযোগ ক'রে দেওয়া যায়, তাহলে লক্ষ লক্ষ লোকের স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে এই বাংলাদেশেই। এই কনফেশনের 'জন্য পুলিসের চাপ দরকার হবে না, অপরাধীরা স্বয়ংপ্রবৃত্ত হয়ে নাম লিখিয়ে যাবে। আমার মতে অপরাধী ভিন্ন অন্য কাউকে ভূতেরা দর্শন দেয় না। (আত্মপ্রচারে উৎসুক ভূতেরা এইভাবেই কার্যসিদ্ধি ক'রে থাকে।) অন্য কথায় ভূত দেখাই একটি অপরাধ।
- ভূতের ভবিষ্যৎ, পৃষ্ঠা ৯৫
- ত্রৈলোক্যনাথ তলিয়ে দেখেন নি, কিন্ত সে কল সাহেবরা তৈরি করেছিলেন অনেক আগেই। এবং কলে ভূত তৈরি ক'রে বোতলে পুরে তা তারা পানও ক'রে আসছেন অনেক দিন ধ'রে। সাহেবদের ভাষায় প্রেতাত্মা ও সুরা দুটিকেই স্পিরিট বলা হয়। আমাদের দেশে যদিও চোলাইয়ের যন্তর প্রাচীন কাল থেকে আছে, কিন্ত তবু তা থেকে স্পিরিট তৈরি হয়নি কখনো, সুরা তৈরি হয়েছে। ম্পিরিটের মতো সুরা প্রেতার্থক নয়, যদিও প্রেতগ্রস্ত মানুষ অনেকটা নেশাগ্রস্তের মতোই ব্যবহার ক'রে থাকে।
- ভূতের ভবিষ্যৎ, পৃষ্ঠা ৯৬
- ভূতেরা সাধারণত পড়ো ভাঙা বাড়িতে কেন থাকতে ভালবাসে তা বোঝা যায় না। অনেক ভূত ভাকবাংলোতে থাকা পছন্দ করে শুনেছি। কোনো কোনো ভূত পথে, কোনো কোনো ভূত শ্মশানে, কেউ বা গাছে থাকে। শ্মশানে ভূতের কি ইন্টারেস্ট, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। কোনো শ্মশানেই এখন বেতাল দেখা যায় না, ভূতমাত্রেই এখন বেতালা।
- ভূতের ভবিষ্যৎ, পৃষ্ঠা ৯৭
- ইংরেজরা ভূতের এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করেছে নেশার সাহায্যে এবং ঠিক এই কারণেই মদ ও প্রেতদেহ দুইই তাদের ভাবনায় স্পিরিট। উন্মত্ততার জন্য, বুদ্ধিকে সাময়িকভাবে শিকেয় তুলে রাখার জন্য, তাদের দরকার এই স্পিরিট। কিন্ত তবু স্পিরিট কোনোদিনই জনসাধারণের পক্ষে সুলভ নয় বলে এবং ভূত অত্যন্ত শস্তা ব'লে, ভূতের উপরেই সাধারণ লোকের ভরসা বেশি। এ ভূতের ভবিষ্যৎ মন্দ এমন কথা অবশ্যই বলা চলে না।
- ভূতের ভবিষ্যৎ, পৃষ্ঠা ৯৯
- করা হয় কারণ মানুষ তার নিজের শ্রেষ্টত্ব সম্পর্কে এখনও নিঃসন্দেহ নয়। নিঃসন্দেহ নয় এই জন্য যে সে সত্যিই অন্যান্য প্রাণীদের চেয়ে সব দিক দিয়ে উচ্চস্তরের নয়। একমাত্র দুষ্টবুদ্ধিতে সে শ্রেষ্ঠ, সদবুদ্ধিতে নয়। এ দিক দিয়ে সে এখনও নিচের ধাপে পড়ে আছে। পশুপাখীদের চেয়ে অনেক নিচের ধাপে। তার কারণ সদ্বুদ্ধির যৎসামান্য যে পুঁজি তার আছে ব'লে তার বিশ্বাস, তা স্থিরবস্ত কিছু নয়। তা সব সময় চেষ্টার দ্বারা উদ্দীপ্ত ক'রে তুলতে হয়- ভিজে কাঠকয়লায় ফুঁ দিয়ে যেমন আগুন ধরাতে হয়, তেমনি। এই ফুঁ-এর অভাব ঘটলেই তা আর জলে না, নিবে যায়, এবং তখন সে যাবতীয় ইতর প্রাণী থেকে ইতর হয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত শক্তি ব্যয় ক'রে সদ্বুদ্ধির আলো জালিয়ে রাখতে পারে কজন মানুষ? সব উদ্যম যে উপার্জনের এবং বাজার খরচের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানেই ব্যয় হয়ে যায়-উদ্বৃত্ত কিছুই থাকে না।
- পশু, পশুপতি ও আমরা, পৃষ্ঠা ১০১
- যে-কোনো কুকুর এই মুহুর্তে প্রতিবাদ ক'রে জানাতে পারে প্রভূভক্তি নামক কোনো বৃত্তি তাদের মধ্যে নেই, যা আছে তা সাধারণ বন্ধুত্ববৃত্তি। প্রভুভৃত্যের সম্পর্ক স্থাপন ক'রে মানুষ যেমন মানুষকে; তেমনি পশুকে, নিচে নামিয়ে দিয়েছে জোর ক'রে। ও সম্পর্ক এ যুগে অচল। কুকুর ভৃত্যের কাজ করে না, যথার্থ বন্ধুর কাজ করে, এবং তার মধ্যে ফাঁকি নেই। কুকুর কখনো তার “প্রভূ"কে হত্যা ক'রে সব লুট ক'রে পালিয়ে যায় না। প্রভুভৃত্যের সম্পর্কের আজ এটিই যুক্তিসঙ্গত পরিণাম।
- পশু, পশুপতি ও আমরা, পৃষ্ঠা ১০১
- মানুষ কথায় কথায় বলে অমুকের পাশবিক ব্যবহার বা পাশবিক বৃত্তি। এ রকম বলা অন্যায়। কেননা মানবীয় বৃত্তি আরও ঘৃণ্য। মানুষকে পশু বললে পশুকে বেশি অপমান করা হয়। কারণ পশুবৃত্তি ইউনিফর্ম, অতএক অনিন্দ্য। মানুষ সব সময় নিজের স্বার্থ এবং শক্তি বুঝে নিয়ম বদলায়। কতকাল ধ'রে মানুষ মৃত্যুদণ্ড থাকা উচিত কিনা ভেবে পাচ্ছে না, আবার সেই মানুষই একই সঙ্গে এক একটা জাতিকে ধরাপৃষ্ঠ থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য অস্ত্র তৈরি করছে।
- পশু, পশুপতি ও আমরা, পৃষ্ঠা ১০২
দেবতাদের মধ্যে একমাত্র শিব সর্বদা পশুদের মধ্যে প্রায় পশুজীবন যাপন ক'রে পশুপতি নাম গ্রহণ করেছেন ব'লে তিনি 'এত হিউম্যান, তাকে আমরা তাই এত ভালবাসি। শিব আমাদের স্বগোত্র। পশুত্বের দিকে এমনি আমাদের টান। আমাদের এই স্ববিরোধিতার মূলে রয়েছে আমাদের চরিত্র। আমাদের এই চরিত্রের এক পা! পশুত্বের দিকে, আর এক পা দেবত্বের দিকে। তাই আমরা ও দুটোর কোনোটাই পুরোপুরি হতে পারিনি, হয়েছি মানুষ নামক এক সংজ্ঞানহীন খিচুড়ি।
দুই নৌকায় পা দিয়ে একা মানুষ কখনো জেতেনি, কিন্ত জাতি হিসেবে আমরা জিতেছি। আমরা বিশুদ্ধ দেবত্বের মরুভূমিতে পড়িনি, বিশুদ্ধ পশুত্বের বাধা পথেও ঘুরি না, তাই আমরা স্ববিরোধী মানুষ, তাই আমরা দেবতা ও পশু উভয়েরই সমান ঈর্ষার পাত্র।- পশু, পশুপতি ও আমরা, পৃষ্ঠা ১০৪
পাঠক বলবেন, ঘুম সম্পর্কে এই কি তোমার শেষ কথা?
আমি বলি তা হতেই পারে না। স্বপ্নহীন ঘুমই আমার ভাল লাগে, তা না হলে ছটফট করি, কখনো ঘুমের ওষুধ খাই। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যারা অন্তত বারো ঘণ্টা স্বপ্নহীন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন না থাকতে পারেন, আমার মতে তারা হতভাগ্য।
এটি অবশ্য আমার জাগ্রত অবস্থার সুচিন্তিত মত।
- স্বপ্ন, পৃষ্ঠা ১০৯
ইউরোপের জাতিসমূহ যখন প্রাণচাঞ্চল্যে পৃথিবীর সর্বত্র অভিযান চালাচ্ছে, যখন তারা সমুদ্রের নিচে নামছে, পর্বত চুড়ায় আরোহন করছে, আফ্রিকার ভয়াবহ অরণ্যে প্রবেশ করছে, মেরু প্রদেশে যাত্রা করছে, এবং পৃথিবীটাকে প্রায় উল্টে পাল্টে দেখে পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহে যাবার সম্ভাবনা কল্পনা করছে, তখন আমরা ঘরে ব'সে বসে শাস্ত্র মিলিয়ে দেখছি সমুদ্র যাত্রায় কতখানি পাপ হয় এবং তার প্রায়শ্চিত্ত কি। তারপর যখন তারা প্রবল ভাবে এসে পড়ল আমাদেরই মধ্যে এবং এসে লুটেপুটে খেতে লাগল আমাদেরই অন্ন, তখন আমরা সেটিকে পূর্বজন্মের কর্মফল ব'লে আত্মতৃপ্তিজনিত আরামে হাত গুটিয়ে বসে রইলাম ঘরের মধ্যে।
আমরা প্রায় ধ'রেই নিলাম, ওদের ধর্ম হচ্ছে চলা, আমাদের ধর্ম হচ্ছে ঘরে বসে থাকা। ওদের ধর্ম হচ্ছে নতুন ঐতিহ্য রচনা করা, আমাদের ধর্ম হচ্ছে প্রাচীনকে আঁকড়ে থাকা। ওদের ধর্ম হচ্ছে লৌহ-মুদ্গর, আমাদের ধর্ম হচ্ছে মোহ-মুদ্গর। ওদের ধর্ম হচ্ছে “কা তব কান্তা” অতএব ঘরের মায়া কাটাও, আমাদের ধর্ম হচ্ছে “কা তব কান্তা” অতএব জীবনের মায়া কাটাও।
- সিনেমার আদি অন্ত, পৃষ্ঠা ১১০
- যারা ছিল এতদিন বিশুদ্ধ দর্শক, তারা হ'ল এখন বিশুদ্ধ শ্রোতা!
- সিনেমার আদি অন্ত, পৃষ্ঠা ১১৩
- অতিরঞ্জন রাজনীতিতেও প্রয়োজন এ কথা না ব'লে, বোধ হয় বল। উচিত অতিরঞ্জন রাজনীতিতেই বেশি প্রয়োজন, এবং অনেক কষ্ট ক'রে এ বিদ্যা আয়ত্ত করতে হয়। কথাটায় হয়তো একটু অতিরঞ্জন হ'ল, কিন্ত তাতে বোঝবার পক্ষে সুবিধে হবে।
- অতিরঞ্জন রাজনীতিতেও প্রয়োজন, পৃষ্ঠা ১১৫
- ইলেকশনের ব্যাপারে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বলতে মুখে কিছু আটকায় না কারণ তার উদ্দেশ্য তড়িৎ গতিতে শ্রোতার মনে চমক জাগিয়ে তাকে নিজের দলে টানা। একবার এক মনোনয়নপ্রার্থীর বিরুদ্ধ পক্ষ রটনা করছিল উক্ত মনোনয়নপ্রার্থী অতি নিষ্ঠুর, কারণ তিনি তার স্ত্রীর রাজনৈতিক মতকে জোর ক'রে দাবিয়ে রেখেছেন। তিনি তখন এ কথার উত্তরে বললেন “দেখুন আমি সত্য বলছি, প্রথমতঃ আমি কখনো আমার স্ত্রীর মতকে নিজের মত দিয়ে প্রভাবান্বিত করতে চেষ্টা করিনি। দ্বিতীয়তঃ আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কখনো রাজনৈতিক আলোচনা করিনি। তৃতীয়তঃ, আমার স্ত্রী রাজনীতির কিছুই জানে না। চতুর্থতঃ, আমি বিয়েই করিনি।"
- অতিরঞ্জন রাজনীতিতেও প্রয়োজন, পৃষ্ঠা ১১৬-১১৭
- আসল কথা প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীর এবং শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার যে গুরুতর অসামঞ্জস্য তা দূর না হ'লে পরীক্ষা রীতির আকম্মিক পরিবর্তন সমাজজীবনে গুরুতর বিপর্যয় ঘটাবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যত ছাত্র পড়ে তাদের মধ্যে হাজারকরা দুতিনজন ছাত্র হয়তো সাধারণ উচ্চশিক্ষার উপযোগী। ম্যাটিক পাস করার পর থেকে যদি বাছাই ক'রে, উদ্দেশ্য বিচার ক'রে ছাত্র ভতি করার নিয়ম থাকত এবং যে সব ছাত্র সাহিত্য বা দর্শন বা বিজ্ঞান প্রেমিক নয় তাদের জন্য অন্যান্য বহু পথ উন্মুক্ত থাকত এবং সেই সব পথে গেলে তাদের জীবিকার স্থান হ'ত, তা হ'লে হাজার হাজার ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেপরোয়াভাবে স্থান ক'রে দেওয়া চলত না। কেউ হয় তো মোটর মেকানিক হবে, কেউ হয় তো দোকানের আাসিস্টাণ্ট হবে, কেউ হয় তো বা (বর্তমানে পথ উন্মুক্ত হওয়ায়) সেনা বিভাগে বা নৌবিভাগে যাবে, তাদের প্রত্যেকের পক্ষে লেডি ম্যাকবেথের চরিত্র বা আলফ্রেড দি গ্রেটের রাজত্বকালের জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক নয়।
- পরীক্ষা বিভ্রাট, পৃষ্ঠা ১৩২
- থেকেও নেই-মস্তবড় ভাবের কথা এটি, বিশেষ ক'রে আমাদের দেশে। আমরা যা কিছু নিজের ব'লে জানি- আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব, তাদের সম্পকে দার্শনিক বলেন কিছুই তোমার নয়, ওটা মোহ মাত্র, বিচিত্র সংসার, ক তব কান্তা কম্তে পুত্রঃ।
- থেকেও নেই, পৃষ্ঠা ১৪৬
- ধোপারাই আমাদের সংস্কতি ও সভ্যতা ভব্যতার মূলে। সভ্যতার জন্মক্ষণ থেকে ধোপার আবির্ভাব। হয় তো বা ধোপাই সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনকে ত্বরাম্বিত করেছে। সামাজিকতা রাখা সম্ভবই হ'ত না ধোপা না থাকলে। মানুষ কতখানি রুচিবান তার পরিচয় দামী পোশাকে নয়, পরিচ্ছন্ন পোষাকে। এই পরিচ্ছন্নতার মূলে আছে ওদের দান। ওরা মানুষের জাতি ভেদ জানে না, শ্রেণীতেদ জানে না, বর্ণভেদ জানে না। কেন না ওদের হাতে সমাজের সাতটি বর্ণ মিলে গিয়ে শাদায় রূপান্তরিত হয়৷ শুভ্রতার বিধানই ওদের ধর্ম। এই শুভ্রতা মানে অমলিনতা।
- থেকেও নেই, পৃষ্ঠা ১৪৭
তার সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- গোস্বামী পরিমল আঁখি দুটি ছলছল
বেদনার অভাবেই হয়ত।- অশোক চট্টোপাধ্যায়,উৎস: পৃষ্ঠা ৩১