বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)
অবয়ব
বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে ১ম বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। বাংলা বিভক্ত করে ফেলার ধারনাটি অবশ্য কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই বিহার ও ওড়িশা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে সরকারী প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত এখান থেকেই।
উক্তি
[সম্পাদনা]- বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল-
পূণ্য হউক, পূণ্য হউক, পূণ্য হউক হে ভগবান।।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ-
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা-
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।।
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন-
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।- ১৯০৫ সালের ১৭ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিখিত "বাংলার মাটি বাংলা জল" গানটির অংশ।
- ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে বিভক্ত করেন এবং স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে বাংলার হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গ রদ করণের জন্য তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর আন্দোলন উপমহাদেশের সকল অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল এবং সে আন্দোলন খুব শক্তিশালী হয়ে উঠল। হিন্দুরা উচ্চ প্রশংসা করে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীকে বলতেন, 'Mr Surrender not'। আবদুর রসুল এবং আমার পিতা বর্ধমানের মৌলবী আবুল কাসেমের মতো স্থির মস্তিষ্ক সম্পন্ন ব্যক্তিরা স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীকে সমর্থন করেন এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ মুসলমানরা ঢাকার নওবাব স্যার সেলিমুল্লাহর নেতৃত্বে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেন। ১৯১১ সালে বৃটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল এবং ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে সরিয়ে নিল।
- আবুল হাশিম। "আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি", প্রকাশক:চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮, পৃষ্ঠা: ১২১-১২২
- ১৯০৫ সালে বাংলা একবার বিভক্ত হয়েছিল। প্রদেশ হিসাবে বাংলা তখন অনেক বড়; বিহার, উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর তার সঙ্গে যুক্ত। সেই প্রদেশকে ভেঙ্গে দু' টুকরো করা হলো; পূর্ববঙ্গকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে গঠিত হলো নতুন এক প্রদেশ। সেই বিভাজন অবশ্য টেকে নি। প্রবল আন্দোলনের মুখে পাঁচ বছর পরে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার হাতগুটিয়ে নিয়ে বঙ্গভঙ্গ রদ করেছিল। তবে আগের বাংলা প্রদেশ আর ফিরে আসে নি। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে চলে গেলো দিল্লীতে, অর্থাৎ কলকাতা তার গুরুত্ব হারালো; এ যেন অনেকটা প্রতিশোধ গ্রহণ। বিহার, উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর আলাদা হয়ে গেল বাংলা থেকে, আসাম রইলো আগের মতোই স্বতন্ত্র। আয়তনে ও গুরুত্বে বঙ্গ প্রদেশ অনেকটা খাটো হয়ে গেল।
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি ১৯০৫-১৯৪৭, প্রকাশক: সংহতি প্রকাশন, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা:১৩
- সবমিলিয়ে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন বাংলার জন্য একটা উজ্জ্বল সময়। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার আড়ালে একটি অন্ধকারও তৎপর হয়ে উঠছিল। আন্দোলনে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছিল; পরবর্তীতে সেই ব্যবহারটা কমে নি, বরঞ্চ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মীয় বিভাজন ভাষার ভিত্তিতে গড়ে-ওঠা জাতীয়তার ইহজাগতিকবোধকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া শুরু করেছিল। ক্রমে সাম্প্রদায়িকতা চলে এলো। ব্রিটিশ শাসকেরা সাম্প্রদায়িকতার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু তাদের উৎসাহদান কাজে লাগতো না যদি আন্দোলনের ভেতরেই সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে বিকশিত হবার সুযোগ ও সম্ভাবনা বিদ্যমান না থাকতো। সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধির ইতিহাসটা মর্মান্তিক; এবং তার পরিণতি হচ্ছে সাতচল্লিশের অতিনির্মম বিভাজন। ওপরতলার মানুষেরা ১৯০৫কে নির্মূল করবার চেষ্টার মধ্য দিয়ে নিজেদের অজান্তেই ১৯৪৭কে অনিবার্য করে তুলেছে। স্বর্ণযুগ আগত মনে হয়েছিল, কিন্তু আসে নি। এলো না।
১৯০৫এ রাজনৈতিক পক্ষ ছিল দু'টি, ব্রিটিশ শাসক ও শাসিত জনগণ; ১৯০৬এ নিখিল-ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে ভিত্তি তৈরী হলো তিনটি পক্ষের—ব্রিটিশ শাসক, শাসিত হিন্দু এবং শাসিত মুসলমান।- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি ১৯০৫-১৯৪৭, প্রকাশক: সংহতি প্রকাশন, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা:২৫
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।