বর্ণবাদ
বর্ণবাদ বলতে বোঝায়—কাউকে তার জাতি বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার না দেওয়া, পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব পোষণ করা, কোনো একটি জাতিকে অন্য জাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা, ভিন্ন জাতি বা জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের প্রতি শত্রুতা বা বিরূপ মনোভাব দেখানো, এবং এই বিশ্বাস রাখা যে ভিন্ন জাতি বা জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের আলাদাভাবে আচরণ করা উচিত।
উক্তি
[সম্পাদনা]- একজন বর্ণবাদী দানব হওয়া মানসিক রোগ নয়। আসলে, কেউ এমন হতে পারে এবং একসঙ্গে খুব স্থির ও আত্মবিশ্বাসীও হতে পারে।
- Samantha Bee; Full Frontal with Samantha Bee, (August 7, 2019); as qtd. in Adrian Horton, “Samantha Bee: 'Being a racist monster isn't a mental illness'", The Guardian, (8 Aug 2019).
- বর্ণবাদ হলো অজ্ঞতার আশ্রয়। এটি মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে এবং সমাজকে ধ্বংস করতে চায়। বর্ণবাদ স্বাধীনতার শত্রু এবং একে সরাসরি মোকাবিলা করে নির্মূল করা উচিত।
- Attributed to Pierre Berton in Ross, Lawrence (২০০৪)। The Ways of Black Folks: A Year in the Life of a People। Kensington Publishing Corporation। পৃষ্ঠা 77। আইএসবিএন 978-0-7582-0634-3। And in Gaspirtz, Oliver (২০১৬)। Famous Quotes About Racism। Westhoff Publishing। পৃষ্ঠা 4।
- বর্ণবাদকে এমন রোগ হিসেবে ধরা হয় না, যেটি মানসিক চিকিৎসকরা চিকিৎসা করতে পারেন।
- Renee Binder, doctor and Chairwoman of the American Psychiatric Association's Council on Psychiatry and Law, as quoted in "They Hate. They Kill. Are They Insane?", Alvin F. Poussaint, The New York Times, (1999).
- যৌন বর্ণবাদ হলো এক ধরনের নির্দিষ্ট বর্ণভিত্তিক পক্ষপাত, যা যৌনতা বা প্রেমের ক্ষেত্রে দেখা যায়। অনলাইনে অনেকেই তাদের যৌন ও ডেটিং প্রোফাইলে এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যেমন “আমি এশীয়দের প্রতি আকৃষ্ট নই।” সমকামী ও উভকামী পুরুষদের মধ্যে যৌন বর্ণবাদ একটি খুব বিতর্কিত বিষয়। কেউ কেউ মনে করেন, যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্ণভিত্তিক পছন্দ বা অপছন্দও বর্ণবাদের একটি রূপ। ২০১১ সালের মে মাসে, অস্ট্রেলিয়ায় ২১৭৭ জন সমকামী ও উভকামী পুরুষ একটি অনলাইন জরিপে অংশগ্রহণ করেন। সেই জরিপে তারা জানিয়েছেন, অনলাইনে যৌন বর্ণবাদকে কতটা গ্রহণযোগ্য মনে করেন। পুরুষদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, তবে অনেকেই যৌন বর্ণবাদকে আশ্চর্যজনকভাবে সহনীয় বলে মনে করতেন। আমরা দুটি পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করি—একটি অনলাইনে যৌন বর্ণবাদের প্রতি পুরুষদের মনোভাব, আরেকটি সাধারণভাবে তাদের বর্ণবাদী মনোভাব নিয়ে। দেখা যায়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই যৌন বর্ণবাদের প্রতি মনোভাব ও সাধারণ বর্ণবাদের মনোভাবের মধ্যে মিল আছে। শুধু এশীয় বা ভারতীয় পুরুষদের মধ্যে কিছু পার্থক্য ছিল। এই কারণে বলা যায়, যৌন বর্ণবাদ সাধারণ বর্ণবাদী মনোভাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফলে, শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের কথা বলে একে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।
- Callander, D., Newman, C. E., & Holt, M. (2015). “Is sexual racism really racism? Distinguishing attitudes toward sexual racism and generic racism among gay and bisexual men.”, Archives of Sexual Behavior, 44(7), 1991-2000.
- প্রথমত, এই কমনওয়েলথে (রাজ্যে) একটি অন্যায় আইন রয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, ভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যে বিবাহ অবৈধ। আমি জানি, এই বিষয়ে কথা বললে আমাকে উপহাসের শিকার হতে হতে পারে। কিন্তু আমি অনেকদিন ধরে বেঁচে আছি, অনেক কিছু দেখেছি—তাই এসব কটুক্তিতে আমি বিচলিত হই না। সরকারের মানুষের ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পাওয়া উচিত নয়, যেমনটা তাদের বিবেক নিয়ন্ত্রণ করারও অধিকার নেই। একজন মানুষের যেমন নিজের ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকার আছে, তেমনি তার নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকারও আছে। তার পছন্দ আশপাশের মানুষের পছন্দ না-ও হতে পারে, কিন্তু সে যদি শালীনভাবে জীবনযাপন করে, তাহলে অন্যদের কোনো অধিকার নেই তার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার। আমি জানি না 'ক্যানটারবেরির ঘটনাটি' সবাই কীভাবে দেখছে। তবে আমি সব দল ও মতের মানুষের মুখে এটি নিয়ে কথা শুনেছি—কেউ হাসির সাথে, কেউ রাগে। আরও পঞ্চাশ বছর পর, কনেকটিকাটের এই 'কালো আইনগুলো' পুরাতত্ত্ববিদদের কাছে এমন এক হাস্যকর বিষয় হয়ে উঠবে, যেমন এখন তার বিখ্যাত 'নীল আইন'গুলো হাস্যকর।
- Lydia Maria Child, An Appeal on Behalf of That Class of Americans Called Africans (1833), Chapter VIII.
- বর্ণবাদ তখনই বেশি নজরে আসে, যখন তা খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় এবং খুব বেশি অপমানজনক হয়। কিন্তু সব ধরনের কূপমণ্ডূকতার মতো, বর্ণবাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ‘চিত্র উল্টে দেওয়া’—যেখানে বিদ্বেষী নিজেকে শিকার বলে তুলে ধরে। যেমন, সমকামীরা শুধু বিয়ে করতে চায় না, তারা নাকি আমাদের সন্তানদের পাপের পথে নিয়ে যেতে চায়। ইহুদিরা শুধু শান্তিতে থাকতে চায় না, তারা নাকি বিশ্ব দখলের ষড়যন্ত্র করছে। আর কৃষ্ণাঙ্গরা আসলে ক্ষমতার শিকার নয়, বরং তারা শ্বেতাঙ্গ পরিশ্রমী মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুবিধাভোগী। এ ধরনের বর্ণবাদকে অনেক সময় ‘ভদ্র’ বা ‘সুবিদধাভোগী’ বলে মনে করা হয়। এখানে কাউকে খারাপ নামে ডাকা হয় না, বরং বিষয়ের দিক ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং ভুল যুক্তি দিয়ে অন্যকে দোষী বানানো হয়। এইভাবে বলা হয়—জাতিভেদ প্রথা কৃষ্ণাঙ্গদের দমন করার জন্য নয়, বরং শ্বেতাঙ্গ নারীদের সম্মান রক্ষার জন্য দরকার ছিল।
- Ta-Nehisi Coates, "The NAACP is Right" (15 July 2010), The Atlantic.
- দক্ষিণের অর্থনীতিতে যখন উত্তরের পুঁজিপতিরা উপনিবেশ গড়ে তুলতে শুরু করল, তখনই কৃষ্ণাঙ্গদের গণপিটুনি ও হত্যা (লিঞ্চিং) সবচেয়ে তীব্র আকার নিয়েছিল। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের ওপর যদি ভয় ও সহিংসতার মাধ্যমে চরম শোষণ চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে পুঁজিপতিরা দ্বিগুণ সুবিধা পেত। একদিকে তারা কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের কাছ থেকে বেশি লাভ তুলতে পারত। অন্যদিকে, শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকদের মধ্যে তাদের নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ছিল, সেটাও চাপা পড়ে যেত। যেসব শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক এই গণহত্যায় সম্মতি দিত, তারা আসলে নিজেদের প্রকৃত শোষকদের (পুঁজিপতিদের) সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করত। এই সময়টিই ছিল বর্ণবাদী চিন্তাধারাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
- Angela Davis, Women, Race and Class (1983)
- পৃথিবীর সব যুগে, সব দেশে, পৃথিবীর সব অঞ্চলে—বিশেষ করে যারা নিজেদের সবচেয়ে বেশি সভ্য ও আলোকিত বলে দাবি করে—সেখানে কিছু শ্রেণির মানুষ সব সময় সমান রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বঞ্চনা শাসক শ্রেণির দিক থেকে নিষ্ঠুর ও অন্যায় ছিল, এটা অস্বীকার করা যায় না। এই মানুষদের তাদের শাসকদের চেয়ে নীচু মনে করা হয়েছে। তারা সব সময় সমাজের চাকর-বাকর, পরিচারক, ও শ্রমজীবী শ্রেণি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তারা সমাজে শুধু টিকে থেকেছে অন্যদের দয়ার ওপর নির্ভর করে। তাদের নিজস্ব কোনো অধিকার বা সুযোগ ছিল না, শুধু যা শাসকরা দয়া করে দিত, সেটুকুই পেত। এগুলো এমন ঐতিহাসিক সত্য, যেগুলো অস্বীকার করা যায় না।
- Martin Delany, The Condition, Elevation, Emigration, and Destiny of the Colored People of the United States (1852), Chapter 1
- যেখানে খুশিমতো শাসন চলে, সেখানে শাসক শ্রেণি নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে। এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবি মানেই অন্যদের সমতা অস্বীকার করা।
- Martin Delany, The Condition, Elevation, Emigration, and Destiny of the Colored People of the United States (1852), Chapter 1
- সাধারণ মানুষের ওপর শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিযোগিতা ও আন্তঃবিভাজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতদিন বৈষম্য থাকবে, আর জাতিগত বা বর্ণগত সংখ্যালঘুদের দমন করা হবে, ততদিন পুরো শ্রমজীবী শ্রেণিই শোষিত ও দুর্বল থাকবে। কারণ পুঁজিবাদী শ্রেণি বর্ণবাদের সুযোগ নিয়ে শ্রমজীবীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। তারা ভিন্ন জাতির শ্রমিকদের একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দিয়ে মজুরি কমিয়ে দেয়। এভাবে চাকরি আর সেবা পাওয়ার জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাধিয়ে দেয়। এই বিভাজনের ফলে সব শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান পড়ে যায়। এছাড়াও, শ্বেতাঙ্গদের কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য শোষিত জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের একত্রিত হতে বাধা দেয়। যতদিন শ্রমিকরা একে অপরের সঙ্গে লড়াই করবে, ততদিন পুঁজিপতিদের শাসন নিরাপদ থাকবে।
- যারা বর্ণবাদের শিকার, তারাই সবচেয়ে ভালো জানে কীভাবে এর বিরুদ্ধে লড়তে হয়।
- যদি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে ‘জাতি’ বা ‘রেস’ কোনো জিনগত বা জীববৈজ্ঞানিকভাবে অর্থবোধক ধারণা নয়, তাহলে ইতিহাসবিদদের প্রশ্ন হবে—তাহলে এই ধারণা এত শক্তিশালী ও হিংসাত্মক কেন হয়ে উঠল? এর এক সম্ভাব্য উত্তর পাওয়া যায় বিবর্তন জীববিজ্ঞানের কিছু রচনায়। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স যে ‘মিম’ ধারণার কথা বলেছেন, সেটি এখানে প্রযোজ্য। তার মতে, কিছু কিছু ভাবনা বা ধারণা মানুষের চিন্তার জগতে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেমন জিন প্রকৃতিতে ছড়ায়। ‘বৈজ্ঞানিকভাবে আলাদা জাতি আছে’—এই ধারণাটিও ঠিক তেমন। বিস্ময়কর হলো, যেসব জাতিকে আলাদা বলে এই ধারণা দাবি করে, তারা হয়তো টিকে নেই বা মিশে গেছে, কিন্তু এই ভুল ধারণা নিজেকে ঠিকই টিকিয়ে রেখেছে।
- Niall Ferguson, The War of the World: Twentieth-Century Conflict and the Descent of the West (2006), p. li
- তুমি যখন বর্ণবাদের কথা বলো, আমি বলি—‘জাতি’ বলে আসলে কিছু নেই। আসলে বর্ণবাদ হলো গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা আর অজ্ঞতার ফল। তবে এই সংকীর্ণতা ও অজ্ঞতা আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ এখন মানুষ যোগাযোগে বাড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে লেখাপড়ার প্রসার ঘটছে।
- Buckminster Fuller as quoted in "The View from the Year 2000" by Barry Farrell in LIFE magazine (26 February 1971)
- আবারও একবার ‘ঘৃণাভরা দৃষ্টি’ আমার মনোযোগ আকর্ষণ করল, যেন চুম্বকের মতো টেনে নিল। এটি আসছিল একজন মধ্যবয়সী, মোটাসোটা, ভালো পোশাক পরা শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির কাছ থেকে। তিনি আমার থেকে কয়েক গজ দূরে বসে ছিলেন এবং তার চোখ দুটো আমাকে একদৃষ্টে লক্ষ্য করছিল। এই অভিজ্ঞতার বিভীষিকাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তেমনটা নয় যে সে আমাকে সরাসরি আঘাত করতে যাচ্ছিল, বরং তার দৃষ্টিতে ছিল এমন এক খোলা ঘৃণা, যা মানুষকে অমানবিক করে তোলে। এই ঘৃণা দেখে আপনি মনে করবেন—এ যেন উন্মাদনা, এমন কিছু অশ্লীল যা শুধু তার ভয়ংকর অশ্লীলতার কারণেই আতঙ্কজনক। এটা এত অচেনা ও নতুন ছিল যে আমি চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছিলাম না। মন থেকে বলতে ইচ্ছে করছিল—“ভগবানের নামে, আপনি নিজেকে কী করছেন!”
- John Howard Griffin, Black Like Me (1961)
- শব্দ উঠছিল জোরে, যেন জ্যাজ সুরে বাঁধা এক ফিউগ। তা যত জোরে হচ্ছিল, ততই ঢেকে ফেলছিল মানুষের মনের ভেতরের আসল কণ্ঠস্বর—“তুমি কৃষ্ণাঙ্গ, তুমি অভিশপ্ত।” শ্বেতাঙ্গরা এই চিৎকারকেই ভেবে নিত ‘আনন্দময় জীবন’। তারা এটাকেই বলত “উল্লাস করে বাঁচা”। এইভাবেই তারা বলতে পারত, “ওরা তো কুকুরের মতো বাঁচে।” তারা কখনও বোঝে না কেন কৃষ্ণাঙ্গরা নিজেরা বাঁচার জন্য এইসব করে—চিৎকার করে, মাতাল হয়, কোমর দুলায়, পেট পুরে আনন্দ খোঁজে। না হলে তাদের সেই গান-সুর-আনন্দ সব ভেঙে পড়বে—বদলে যাবে কান্নায়।
- John Howard Griffin, Black Like Me (1961)
- আমি সমাজবিদ্যার যে বইগুলো পড়েছি, সেখানে কোথাও বলা হয়নি যে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ মানুষের প্রকৃতিতে কোনো মৌলিক পার্থক্য আছে। তারা কেবল পরিবেশ কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে, সেটাই বিশ্লেষণ করেছে। যদি কোনো শ্বেতাঙ্গকে একই অবস্থায় রাখা হয়, তার শিক্ষার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়, তাকে নিজের আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে বাধ্য করা হয়, আর ব্যক্তিগত জীবনের কোনো অবকাশ না দেওয়া হয়—তাহলে কিছুদিন পর তিনিও ঠিক সেই আচরণ করবেন, যেটা সাধারণত ‘কৃষ্ণাঙ্গ স্বভাব’ বলে মনে করা হয়। এই স্বভাব আসলে গায়ের রঙ থেকে নয়, আসে মানুষ কেমন পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠে, সেটা থেকে।
- John Howard Griffin, Black Like Me (1961)
- এই সমাজে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ সফল হতে গেলে, তাকে আসলে একজন নকল শ্বেতাঙ্গ হয়ে উঠতে হতো। তার বেশভূষা, ভাষা, ভাবনা—সব কিছু শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির মতো হতে হতো (বিশেষ করে যখন সে শ্বেতাঙ্গদের মাঝে থাকত)। এর মানে নিজের আসল পরিচয়, নিজের সংস্কৃতি, নিজের কৃষ্ণাঙ্গত্বকে লুকিয়ে রাখা বা অস্বীকার করা—যেন তা লজ্জাজনক কিছু। সে যদি সফল হতও, তখন সে এক বিচ্ছিন্ন মানুষে পরিণত হতো—নিজের সংস্কৃতি আর নিজের মানুষদের থেকে কেটে পড়া। আর যেহেতু তার গায়ের রঙ ছিল, তাই সে কখনোই পুরোপুরি শ্বেতাঙ্গের মতো হতে পারত না। শ্বেতাঙ্গরা তাকে সবসময় ‘ভিন্ন’ হিসেবেই দেখত।
- John Howard Griffin, Black Like Me (1961)
- আমি বহু বছর ধরে যে মানসিক বোঝা বয়ে বেড়িয়েছি—যেমন পূর্বাগ্রহ, অস্বীকার, লজ্জা, অপরাধবোধ—সেগুলো সব মিলিয়ে এক আবর্জনার মতো ছিল। এই বোঝা তখনই দূর হলো, যখন বুঝতে পারলাম—‘অন্য’ বলে যাদের ধরা হয়, তারা আদৌ ভিন্ন কিছু নয়।
- John Howard Griffin, Black Like Me (1961)
- এই পরিস্থিতিতে যদি আমরা শুধু ‘শান্ত থাকার’ ভান করি, তাহলে তা আসলে সব শান্তির ধ্বংসে সম্মতি দেওয়ার মতো হবে। কারণ আমরা যদি একটি ক্ষুদ্র কিন্তু ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর অন্যায় মেনে নিই, তাহলে তা সমাজের পুরো স্থিতিশীলতা এবং প্রকৃত শান্তি ধ্বংস করার সমান।
- John Howard Griffin, Black Like Me (1961)
- সে আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল না, সে কথা বলছিল আমাদের একটি কল্পিত রূপের সঙ্গে—যা সে নিজের মনে বানিয়ে নিয়েছিল।
- John Howard Griffin, Black Like Me (1961)
- জর্জ ফ্লয়েড–কে ঘিরে যে প্রতিবাদ এবং গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল, তাতে শ্বেতাঙ্গরা আবার বুঝতে পারছে যে, কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামী মানুষেরা পুলিশি সন্ত্রাস নিয়ে এতদিন যা বলছিল, তা সত্যি। এখন পুলিশ শ্বেতাঙ্গদের ওপরও নির্যাতন করছে… মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস জুড়ে রঙিন মানুষেরাই সবসময় প্রথমে কষ্ট পায়। তারা সবার আগে ভোগে, এবং অতিরিক্তভাবে ভোগে। কিন্তু এখন শিল্প-কারখানার পতনের প্রভাব এসে পড়েছে শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী শ্রেণির ওপর। যেসব নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার এতদিন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছিল, সেগুলো এখন শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হচ্ছে। আমি আসলে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের অতটা দোষ দিই না। তারা যেমন ছিল, তেমনই আছে। আমি বেশি দোষ দিই শ্বেতাঙ্গ উদারপন্থীদের—যারা শহরের দরিদ্র রঙিন মানুষের সঙ্গে কী ঘটছিল, সেটা নিয়ে কখনও মনোযোগ দেয়নি…
J
[সম্পাদনা]- বর্ণবাদ একটি পাপ। ঈশ্বরের মতে এটি গুরুতর অপরাধ।
- Pope John Paul II, Nigdywiecej.org March 13, 2020
K
[সম্পাদনা]- বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী সমাজ ধারণাটি সম্ভবত সবচেয়ে কৌশলী ও মারাত্মক বর্ণবাদী চিন্তা ছিল। কারণ, পূুূর্ববর্তী বর্ণবাদী ধারণাগুলো আমাদের নির্দিষ্ট করে বলত, কোন নির্দিষ্ট রঙিন মানুষদের নিয়ে আমাদের কী ভাবা উচিত, বা কোন জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে কেমন ধারণা রাখা উচিত। কিন্তু এই নতুন ‘বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী’ ধারণা বলল—বর্ণবাদ নেই, বর্ণবাদী নীতি নেই—যদিও সমাজে স্পষ্ট বৈষম্য রয়ে গেছে। এই ধারণা আমাদের বিশ্বাস করাতে চাইল যে, যেমন ধরে নিই কৃষ্ণাঙ্গদের বেকারত্ব–এর হার শ্বেতাঙ্গ মানুষদের তুলনায় দ্বিগুণ—এই বৈষম্যের পেছনে জাতিগত বৈষম্য বা বর্ণবাদ নেই। বরং কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের মধ্যেই নিশ্চয় কিছু সমস্যা আছে—এটাই বিশ্বাস করানো হল।
- Ibram X. Kendi, as interviewed by Rachel Martin in “How Racism Has Evolved Over The Last 2 U.S. Presidencies”, NPR Morning Edition, (August 14, 2019).
- আর যদি আমরা এই দেশে সব জাতি ও ধর্মের মানুষের জন্য চাকরির সুযোগ উন্মুক্ত করতে চাই, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে সবার আগে উদাহরণ স্থাপন করতে হবে…রাষ্ট্রপতিই হতে হবে সেই প্রধান উদাহরণ। আমি কোনো জাতি বা জাতিগোষ্ঠীর জন্য মন্ত্রিসভা বা অন্য কোনো পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। কারণ, তাহলে সেটাই হবে বিপরীত বর্ণবাদ–এর সবচেয়ে খারাপ রূপ। তাই, যদি আমি নির্বাচনে জয়ী হই, তবে আমি আমার নিয়োগে কোনো জাতি বা ধর্মের কথা বিবেচনা করব—এ রকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। আমি শুধু এটুকু বলছি—জাতি বা ধর্মকে আমি একেবারেই বিবেচনায় নেব না।
- John F. Kennedy, campaign speech, Wittenberg College, Springfield, Ohio (October 17, 1960); Freedom of Communications, final report of the Committee on Commerce, United States Senate, part 1 (1961), p. 635. Senate Rept. 87–994.
- যখন আপনি একজন মানুষকে শেখান, তার ভাইকে ঘৃণা করতে ও ভয় পেতে, যখন শেখান—তার গায়ের রঙ, বিশ্বাস, বা অনুসরণ করা নীতির কারণে সে একজন অধম মানুষ, যখন শেখান—যে কেউ আপনার থেকে ভিন্ন, সে আপনার স্বাধীনতা, চাকরি বা পরিবারের জন্য হুমকি, তখন আপনি একিসাথে এটাও শেখেন—এইসব মানুষদের আর সহনাগরিক হিসেবে নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখতে। সহযোগিতার বদলে দেখা হয় দমন করার চোখে। তাদের ওপর আধিপত্য স্থাপন করতে হবে, নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের ভাইদের বহিরাগত হিসেবে দেখি। যাদের সঙ্গে আমরা একই শহরে থাকি, কিন্তু একসাথে মিলে একটা সমাজ গড়ি না। তারা আমাদের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকে, কিন্তু একসাথে কোনো প্রয়াসে অংশ নেয় না। আমরা শিখি পিছিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় রাখা, এবং যেকোনো মতবিরোধকে শক্তি দিয়ে দমন করার প্রবণতা পোষণ করা।
- Robert F. Kennedy, speech given the day after the Martin Luther King, Jr. assassination. Delivered at the City Club of Cleveland, Cleveland, Ohio, 5 April 1968.
- নিজ জাতির চেয়ে ভালো মিত্র আর কেউ নয়।
- Kim Young-sam, as quoted in "What the West gets wrong about North Korea’s motives, and why some South Koreans admire the North" (8 September 2017), The Conversation
- রেসিজম বা বর্ণবাদ ধারণাটির একটি সাধারণ সংজ্ঞা দিয়ে শুরু করা যাক: বর্ণবাদ হলো এই বিশ্বাস যে, মানুষের গায়ের রঙ অনুযায়ী তাদের ক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। কখনো কখনো এই ধারণা ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য হিসেবেও প্রকাশ পায়।
- মিশরে যেমন আমরা বলি "ব্রুনেট/brunette" বা ত্বক অপেক্ষাকৃত কালো, সেই রকম কোনো মেয়েকে আরব বিশ্বের বর্ণবাদ প্রসঙ্গে বলতে গেলে— এটা দুঃখজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়, যখন এমন মেয়েরা মিশরীয় পুরুষদের কাছ থেকে বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য শুনে— যারা নিজেরাও কালো ত্বকের অধিকারী।
- গ্রহণযোগ্য নৃতাত্ত্বিক-বিশ্বসৃষ্টির ধারণা—
তা ধর্মীয় হোক বা বৈজ্ঞানিক— একটিও জাতিগত বা মানবজাতি বিষয়ক সমস্যার সমাধানে সহায়তা করে না। বরং এসব ধারণা আপনার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যখন আপনি পৃথিবীর জাতিগুলোর সমস্যা বুঝতে চান। আপনি যদি বলতে থাকেন, "এই গ্রহ ও মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে", তাহলে আপনি বাস্তব তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবেন, অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সময় নষ্ট করবেন, এবং পুরো বিষয়টি বুঝতেই পারবেন না।
- Koot Hoomi, in The Mahatma Letters to A. P. Sinnett, p. 75-76 (1923)
- বর্ণবাদ: এই বিশ্বাস যে একটি জাতি অন্য সব জাতির তুলনায় স্বভাবগতভাবে শ্রেষ্ঠ,
এবং সে কারণে তাদের উপর আধিপত্যের অধিকার রাখে।
- Audre Lorde, Sister Outsider: Essays and Speeches। Crossing Press। ১৯৮৪। পৃষ্ঠা 45। আইএসবিএন 978-0-89594-142-8।
- রাগ একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বর্ণবাদী মনোভাবের ক্ষেত্রে।
আর সেই মনোভাব থেকে উদ্ভূত কাজকর্মে কোনো পরিবর্তন না এলে, তখন ক্ষোভ বা ক্রোধও যথার্থ প্রতিক্রিয়া।
- Audre Lorde, The Uses of Anger: Women Responding to Racism, Sister Outsider: Essays and Speeches। Crossing Press। ১৯৮৪। আইএসবিএন 978-0-89594-142-8।