বাঁশ
অবয়ব

মেঘের ছায়া ঘনিয়ে যেন ধরে।
—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাঁশ হলো সপুষ্পক বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ উদ্ভিদের একটি গোত্র। বাঁশ বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল উদ্ভিদগুলোর মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ায় বাঁশের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি নির্মাণ সামগ্রী, খাদ্যের উৎস এবং একটি বহুমুখী কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উক্তি
[সম্পাদনা]- বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই
মাগো, আমার শোলোক-বলা কাজ্লা দিদি কই?
পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে’ রই;
মাগো, আমার কোলের কাছে কাজ্লা দিদি কই?- যতীন্দ্রমোহন বাগচী, কাজ্লাদিদি, কাব্যমালঞ্চ - যতীন্দ্রমোহন বাগচী, প্রকাশক- পপুলার এজেন্সী, প্রকাশসাল- ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ), প্রকাশস্থান- কলকাতা, পৃষ্ঠা ১১৪
- দুপুরে আহার করিয়া বুড়ী খিড়কির পিছনে বাঁশবনের উপর বসিয়া কঞ্চি কাটে। সেদিকে আর নদীর ধার পর্যন্ত লোকজনের বাস নাই, নদী অবশ্য খুব নিকটে নয়, প্রায় একপোয়া পথ এই সমস্তটা শুধু বড় বড় আমবাগান ও ঝুপসি বাঁশবন ও অন্যান্য জঙ্গল। কঞ্চি কাটার সময় দুর্গা আসিয়া কাছে বসে, আবোল-তাবোল বকে। ছোট এক বোঝা কাটা কঞ্চি জড়ো হইলে দুর্গা সেগুলি বহিয়া বাড়ীর মধ্যে রাখিয়া আসে। কঞ্চি কাটিতে কাটিতে মধ্যাহ্নের অলস আমেজে শীতল বাঁশবনের ছায়ায় বুড়ীর নানা কথা মনে আসে।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পথের পাঁচালী, তৃতীয় পরিচ্ছেদ, পথের পাঁচালী- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সপ্তম সংস্করণ, প্রকাশক- পি. মিত্র, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১০
- রমু আবার বলিল: ওই বাঁশের পুল পার হইয়া যে-বাড়ি, সে-বাড়িতে থাকে গফুর, আমার চাচাত ভাই। সে খুব ফড়িং ধরে আর আড়কাঠি বিঁধাইয়া ছাড়িয়া দেয়, তারা ছটফট করিয়া মরিয়া যায়। দেখিয়া আমার মনে বড় কষ্ট লাগে। তুমি ফড়িং ধরনা, তুমি কত ভাল।
- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, দুরঙা প্রজাপতি, তিতাস একটি নদীর নাম- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- পুথিঘর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৮৪
- ঘুড়ির হাতে বাঁশের লাটাই,
উড়তে থাকে ছেলে;
বঁড়শি দিয়ে মানুষ গাঁথে,
মাছেরা ছিপ ফেলে!- যোগীন্দ্রনাথ সরকার, মজার মুল্লুক, হাসি রাশি - যোগীন্দ্রনাথ সরকার, প্রকাশক- সিটি বুক সোসাইটি, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩০৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪৪
- সবুজ ঘাসে হরিণ ছানা চরে বেড়াত; গাছের উপর টিয়ে-পাখী উড়ে বসত; পাহাড়ের গায়ে ফুলের গোছা ফুটে থাকত; তাদের কি সুন্দর রং, কি সুন্দর খেলা! বাপ্পা সজল নয়নে মেঘের দিকে চেয়ে চেয়ে বাঁশের বাঁশীতে ভীলের গান বাজাতে লাগলেন; বাঁশীর করুণ সুর কেঁদে কেঁদে, কেঁপে কেঁপে বন থেকে বনে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। সেই বনের একধারে আজ ঝুলন-পূর্ণিমায়, আনন্দের দিনে, শোলাঙ্কি-বংশের রাজায় মেয়ে সখীদের নিয়ে খেলে বেড়াচ্ছিলেন। রাজকুমারী বল্লেন, “শুনেছিস ভাই, বনের ভিতর রাখাল-রাজা বাঁশী বাজাচ্ছে!”
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাপ্পাদিত্য, রাজকাহিনী - অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তৃতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩২১ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫১-৫২
- পৃথিবীকে কেবলমাত্র উপরের তলাতেই দেখিতেছি, তাহার ভিতরের তলাটা দেখিতে পাইতেছি না, ইহাতে কতদিন যে মনকে ধাক্কা দিয়াছে তাহা বলিতে পারি না। কী করিলে পৃথিবীর উপরকার এই মেটে রঙের মলাটটাকে খুলিয়া ফেলা যাইতে পারে তাহার কতই প্ল্যান ঠাওরাইয়াছি। মনে ভাবিতাম, একটার পর আর-একটা বাঁশ যদি ঠুকিয়া ঠুকিয়া পোঁতা যায়; এমনি করিয়া অনেক বাঁশ পোঁতা হইয়া গেলে পৃথিবীর খুব গভীরতম তলাটাকে হয়তো একরকম করিয়া নাগাল পাওয়া যাইতে পারে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঘর ও বাহির, জীবন-স্মৃতি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৪
- বাঁশের ঝোপে জাগছে সাড়া,
কোল্-কুঁজো বাঁশ হচ্ছে খাড়া,
জাগ্ছে হাওয়া জলের ধারে,
চাঁদ ওঠেনি আজ আঁধারে!- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, দূরের পাল্লা, বিদায়-আরতি- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চতুর্থ সংস্করণ, প্রকাশস্থান-কলকাতা, পৃষ্ঠা ১০৪
- বাঙ্গালা দেশে এক সময়ে এই বাঁশের বাঁশী মানুষের মনে সমস্ত সংগীতের সার সংগীত শুনাইয়াছিল। বাঙ্গলার রাখালেরা বিনা কড়িতে এই সুরের যন্ত্রটি পাইত, এখানে ঘাটে পথে বাঁশের ঝাড়, একটা মোটা কঞ্চি বা বাঁশের ডগা কাটিয়া বাঁশী তৈরী করিতে জানিত না, এরূপ রাখাল বাঙ্গলা দেশে ছিল না।
- দীনেশচন্দ্র সেন, বাঁশীর সুর, পদাবলী-মাধুর্য্য - দীনেশচন্দ্র সেন, প্রকাশক- প্রবর্ত্তক পাবলিশিং হাউস, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৩
- আজ সকালে
গানের তালে
উঠলো জেগে সাড়া রে,
উঠলো জেগে সাড়া;
সদলবলে
বাজিয়ে চলে
বাঁশের বাঁশি তারা রে,
বাঁশের বাঁশি তারা॥- সুনির্মল বসু, বাঁশের বাঁশি, সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩১
- দুটি গােরু ও বাছুরের জন্য তিনটি সুপারিগাছের মধ্যে মােটা বাঁশের ত্রিকোণ মাচা বাঁধা হইয়াছে, বাড়ির পােষা কুকুরটিও স্থান পাইয়াছে সেখানে। মালার বুড়া বাপ বৈকুণ্ঠ মাচায় বসিয়া ভীত গােরু দুটিকে খড় দিতেছিল, ঘরের চালে বসিয়া বঁড়শি দিয়া মাছ ধরিতেছিল মালার বড়াে ভাই অধর, আর ঘরের ভিতরকার মাচায় উঠিবার মই হইতে এদিকে রান্নাঘরের চাল পর্যন্ত পাশাপাশি দুটি বাঁশ বাঁধিয়া ইহারা যে সাঁকো তৈয়ারি করিয়াছে তার উপরে পা ঝুলাইয়া বসিয়াছিল কয়েকটি উলঙ্গ ছেলেমেয়ে।
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পদ্মানদীর মাঝি - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সংস্করণ- ৩৫, প্রকাশক- বেঙ্গল পাবলিশার্স , প্রকাশস্থান- কলকাতা, পৃষ্ঠা ৪১
- চারধারে ঘন বাঁশের জঙ্গল। বুনো হাতীর দল মড়্ মড়্ করে বাঁশ ভাঙচে। সে আর একজন কে তার সঙ্গে,দুজনে একটা প্রকাণ্ড পর্ব্বতে উঠেচে; চারি ধারের দৃশ্য ঠিক হাউপ্টমানের লেখা মাউন্টেন্ অফ্ দি মুনের দৃশ্যের মতো। সেই ঘন বাঁশ বন, সেই পরগাছা ঝোলানো বড় বড় গাছ, নীচে পচাপাতার রাশ, মাঝে মাঝে পাহাড়ের খালি গা, আর দূরে গাছপালার ফাঁকে জ্যোৎস্নায় ধোয়া সাদা ধবধবে চিরতুষারে ঢাকা পর্বতশিখরটী—এক এক বার দেখা যাচ্ছে, এক একবার বনের আড়ালে চাপা পড়চে।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ, চাঁদের পাহাড় - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- এম. সি. সরকার এন্ড সন্স লিমিটেড, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪-৫
- ছায়ায় চরছে গােরু,
মাঝ দিয়ে তার পথ গিয়েছে সরু,
ছেয়ে আছে শুক্নো বাঁশের পাতায়,
হাট করতে চলে মেয়ে ঘাসের আঁঠি মাথায়,
তখন মনে হঠাৎ এসে এই বেদনাই বাজে—
ঠাঁই রবে না কোনােকালেই ঐ যা-কিছুর মাঝে।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিছু-ডাকা, ছড়ার ছবি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৯৩
- ধনুর বাঁশ যোগাড় করা বড়ই কঠিন। সাধারণ বাঁশ দিয়ে ধনু তৈরী হয় না। কয়েক দিন কেটে গেল শুধু বাঁশ খুঁজতে। আমাদের দেশের জংগলে বাঁশ খুজে পাওয়া বড়ই কষ্টকর ব্যাপার। শুনতে পাই, ইণ্ডিয়ার মধ্যপ্রদেশে আমাদের দেশেব মত কণ্টকিত বাঁশ পাওয়া যায়, সেই বাঁশই ধনুর পক্ষে উপযোগী; সহজে ভাংগে না। একদিন বাঁশের খোঁজে যেয়ে ত মহাবিপদে পড়তে হয়েছিল। একটা চিতাবাঘ আমার মাথা লক্ষ্য করে লাফ দেয়। বাঘটা ছিল কাঁটা-বিহীন একটি গাছের উপর, আর আমি ছিলাম কাঁটাপূর্ণ বাঁশবনে। একটু শব্দ হতেই আমি বাঁশের ঝাড়ের মধ্যে প্রবেশ করি। চিতাবাঘটার বোধ হয় বেশি ক্ষুধা হয়েছিল, সেজন্য তার বুদ্ধির বিপর্যয় ঘটে। বাঁশবনের নীচে পড়ামাত্র বড় বড় কাঁটা তার থাবার মধ্যে ঢুকে যায়। চলবাব ক্ষমতা ছিল না।
- রামনাথ বিশ্বাস, মাউ মাউএর দেশে - রামনাথ বিশ্বাস, প্রথম পরিচ্ছেদ, প্রকাশক- অশোক পুস্তকালয়, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১২-১৩
- খালের ধারে বাঁশের ঝাড়ে গান কে জুড়েছে।
শিরীষ গাছের শুকনো পাতা হাওয়ায় উড়েছে।- সুনির্মল বসু, জলের পথে, সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১১
- তাই যদি হয়, তবে স্বামীর মৃত্যুর পরই তাহার বিধবাকে একবাটি সিদ্ধি ও ধুতুরা পান করাইয়া মাতাল করিয়া দেওয়া হইত কেন? শ্মশানের পথে কখন বা সে হাসিত, কখন কাঁদিত, কখন বা পথের মধ্যেই ঢুলিয়া ঘুমাইয়া পড়িতে চাহিত। এই তার হাসি, এই তার সহমৃতা হইতে যাওয়া! তার পর চিতায় বসাইয়া কাঁচা বাঁশের মাচা বুনিয়া চাপিয়া ধরা হইত, পাছে সতীদাহ-যন্ত্রণা আর সহ্য করিতে না পারে। এত ধূনা ও ঘি ছড়াইয়া অন্ধকার ধুঁয়া করা হইত যে, কেহ তাহার যন্ত্রণা দেখিয়া যেন ভয় না পায়।
- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নারীর মূল্য-শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশক- বাক্-সাহিত্য, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১১
- আকাশে উড়ে বেড়ায় শঙ্খ চিল,
-বড়ো বড়ো বাঁশ পুঁতে জাল পেতেচে জেলে,
বাঁশের ডগায় বসে আছে মাছরাঙা,
পাতিহাঁস ডুবে ডুবে গুগলি তোলে।
বেলা দুপুর।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছেলেটা, পুনশ্চ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪১
- শুক্নো কাঠ বা বাঁশ মাটিতে পোঁতা থাকিলে, সেগুলির ভিতরে উইয়ে বাসা করে। যদি একখানা উই-ধরা বাঁশ পরীক্ষা করিবার সুবিধা পাও, তবে দেখিবে, বাঁশের ভিতরে উইরা মাটি দিয়া সরু পথ ও সুড়ঙ্গ তৈয়ার করিয়াছে। যেখানে বাঁশ বা কাঠ নাই, সেখানে উই পোকারা মাটির তলায় ঘর প্রস্তুত করে।
- জগদানন্দ রায়, উই, পোকা-মাকড়- জগদানন্দ রায়, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড, এলাহাবাদ, প্রকাশসাল- ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩১ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৪১
- সকালে উঠে আবার ওপরে ওঠা সুরু। উঠ্চে, উঠ্চে মাইলের পর মাইল বন্য বাঁশের অরণ্য, তার তলায় বুনো আদা। ওদের পথের একশো হাতের মধ্যে বাঁদিকের বাঁশবনের তলা দিয়ে একটা প্রকাণ্ড হস্তীযূথ কচি বাঁশের কোঁড় মড়্মড়্ করে ভাঙতে ভাঙতে চলে গেল।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ, চাঁদের পাহাড় - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- এম. সি. সরকার এন্ড সন্স লিমিটেড, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮৯
- মাঝখানে নৌকার পাটাতনে হাত দুই ফাঁক রাখা হইয়াছে। এই ফাঁক দিয়া নৌকার খােলের মধ্যে মাছ ধরিয়া জমা করা হয়। জাল ফেলিবার ব্যবস্থা পাশের দিকে। ত্রিকোণ বাঁশের ফ্রেমে বিপুল পাখার মতাে জালটি নৌকার পাশে লাগানাে আছে। জালের শেষ সীমার বাঁশটি নৌকার পার্শ্বদেশের সঙ্গে সমান্তরাল। তার দুই প্রান্ত হইতে লম্বা দুটি বাঁশ নৌকার ধারে আসিয়া মিশিয়া পরস্পরকে অতিক্রম করিয়া নৌকার ভিতরে হাত দুই আগাইয়া আসিয়াছে। জালের এ দুটি হাতল। এই হাতল ধরিয়া জাল উঠানাে এবং নামানাে হয়।
গভীর জলে বিরাট ঠোঁটের মতাে দুটি বাঁশে বাঁধা জাল লাগে। দড়ি ধরিয়া বাঁশের ঠোঁট হাঁ-করা জাল নামাইয়া দেওয়া হয়। মাছ পড়িলে খবর আসে জেলের হাতের দড়ি বাহিয়া, দড়ির দ্বারাই জলের নীচে জালের মুখ বন্ধ করা হয়।- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পদ্মানদীর মাঝি - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সংস্করণ- ৩৫, প্রকাশক- বেঙ্গল পাবলিশার্স , প্রকাশস্থান- কলকাতা, পৃষ্ঠা ৭
- খেলার ছলে ষষ্ঠিচরণ হাতি লোফেন যখন তখন,
দেহের ওজন উনিশটি মণ, শক্ত যেন লোহার গঠন।
একদিন এক গুণ্ডা তাকে বাঁশ বাগিয়ে মার্ল বেগে—
ভাঙল সে-বাঁশ শোলার মতো মট্ ক’রে তার কনুই লেগে।- সুকুমার রায়, পালোয়ান, সুকুমার সমগ্র রচনাবলী- প্রথম খণ্ড, সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী, কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬৪
- প্রত্যেক ঘরের সামনে সমান লম্বা একটা বারান্দা ছিল, আর ঘরের চারিদিকটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। সেই বেড়ার বাঁশ কিছুদিন ভিজিয়ে রেখে, লম্বাদিকে চিরে দুখানা করে সেই এক এক ভাগকে দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে সরু জালির মত করা হত। সেই জালি বাঁশের বেড়ার ভিতর দিয়ে আলো হাওয়া যথেষ্ট প্রবেশ করতে পারত, আবশ্যকমত জানালা দরজাও রাখা হত। কাঠের কপাটের উপর নানারকম ফুল পাতার তোলা কাজ নিজের নিজের রুচি অনুসারে করা হত।
- জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, ছেলেবেলার কথা, স্মৃতিকথা– জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, প্রকাশক– রূপা পাবলিকেশন্স, প্রকাশস্থান– কলকাতা, প্রয়াগরাজ, মুম্বই, প্রকাশসাল– ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৫
- শুষ্কজলা দিঘির পাড়ে জোনাক ফিরে ঝোপে-ঝাড়ে,
ভাঙা পথে বাঁশের শাখা ফেলে ভয়ের ছায়া।
আমার দিনের যাত্রাশেষে কার অতিথি হলেম এসে!
হায় রে বিজন দীর্ঘ রাজি, হায় রে ক্লান্ত কায়া।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দিনশেষ, সঞ্চয়িতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪৯৬
- নারাণ মাস্টার বলচেন- ওই বাঁশঝাড়ের মাথার ওপরে, ঐ দেখো।
বেশ বড় নক্ষত্র
ওটিকে নক্ষত্র বলো না। ওটি গ্রহ। সৌর জগতের একটা গ্রহ। অন্য অন্য গ্রহগুলির নাম করো তো? তোরা দেখেচিস্ শুক্র গ্রহ?
ঐ বাঁশ ঝাড়ের মাথায়?- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুসন্ধান - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- বিভূতি প্রকাশন, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬-৭
- রানী নাইতে গেলেন। বানর একমুঠো মোহর নিয়ে বাজারে গেল। ষোলো থান মোহরে যোলো জন ঘরামি নিলে, ষোলো গাড়ি খড় নিলে, ষোলোশো বাঁশ নিলে। সেই ষোলোশো বাঁশ দিয়ে, যোলো গাড়ি খড় দিয়ে, ষোলোজন ঘরামি খাটিয়ে, চক্ষের নিমেষে দুওরানীর বানর ভাঙাঘর নতুন করলে। শোবার ঘরে নতুন কাঁথা পাতলে, খাবার ঘরে নতুন পিঁড়ি পাতলে, রাজবাড়ির ষোলো বামুনে রানীর ভাত নিয়ে এল; ষোলো মোহর বিদায় পেলে।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ক্ষীরের পুতুল, অবনীন্দ্র রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রকাশক- প্রকাশ ভবন, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬১ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৬-৭৭
- শুন বাপু চাষার বেটা।
বাঁশের ঝাড়ে দিও
ধানের চিটা॥
চিটা দিলে বাঁশের গোড়ে।
দুই কুড়া ভূঁই বেড়বে ঝাড়ে॥- খনা, খনার বচন, বঙ্গ সাহিত্য পরিচয় - দীনেশচন্দ্র সেন, প্রকাশক- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩২১ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৪
- অনেক নদী আছে বর্ষার অকুণ্ঠ প্লাবনে ডুবিয়া তারা নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। পারের কোন হদিস থাকে না, সবদিক একাকার। কেউ তখন বলিতে পারে না এখানে একটা নদী ছিল। সুদিনে আবার তাদের উপর বাঁশের সাঁকোর বাঁধ পড়ে। ছেলেমেয়ে বুড়োবুড়িরা পর্যন্ত একখানা বাঁশে হাত রাখিয়া আর একখানা বাঁশে পা টিপিয়া টিপিয়া পার হইয়া যায়। ছেলে-কোলে নারীরাও যাইতে পারে। নৌকাগুলি অচল হয়। মাঝিরা কোমরে দড়ি বাঁধিয়া সেগুলিকে টানিয়া নেয়।
- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, তিতাস একটি নদীর নাম- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- পুথিঘর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩
- মেঘের ছায়া কুঁড়ে ঘরের পরে,
ভাঙাচোরা পথের ধারে,
ঘন বাঁশের বনের ধারে,
মেঘের ছায়া ঘনিয়ে যেন ধরে।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাদল, ছবি ও গান-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩১
- সেনাপতির হুকুমের মত সকলে যেন এই নির্দেশের অপেক্ষাতেই ছিল, সকলের উদ্ভ্রান্ত ব্যস্ততার মধ্যে এবার একটা শৃঙ্খলা দেখা দেয়। যাদববাবুর ঘরের পিছনে গাদা করা বাঁশ ছিল। একটা করে বাঁশ এনে সবাই মিলে একপাশ থেকে গোয়ালের চালাটা ফেলে দেবার জন্য ঠেলতে থাকে। আমচুরির ব্যাপারটার সময় প্রতিবেশী যত লোক এসেছিল, এবার তার চেয়ে অনেক বেশী লোক এসে এই চেষ্টায় যোগ দেওয়ায় একটু পরেই খড় বাঁশের পুরানো চালাটি হুড়মুড় করে নীচে পড়ে যায়।
তারপর হাঁড়ি কলসী ঘটি বাটি আর বালতিতে করে কাছের ডোবা থেকে জল এনে আর বাঁশ দিয়ে ঠেঙ্গিয়ে আগুনটা সকলে নিভিয়ে ফেলে।- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মাঝির ছেলে - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, নবম পরিচ্ছেদ, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৬
- কিশোরের মনের গোপনতায় যে সূক্ষ্ম শিল্পবোধ সব সময় প্রচ্ছন্ন থাকে, তারই ইঙ্গিত এবার তাকে চটিতে দিল না। সে আগেই তীরে নামিয়াছিল। তিলকের ছুঁড়িয়া-ফেলা বাঁশের আগাটা ক্ষিপ্রগতিতে ধরিয়া তার গতিরোধ করিল এবং তার উদ্যত আঘাত হইতে অবোলা ধানগাছগুলিকে বাঁচাইল। জাল লাগানো শেষ হইলে কিশোর নৌকায় উঠিয়া বাঁশের গোড়ায় পা দিল। সুবল পাছার কোরায় হাত দিলে গলুইয়ে গিয়া তিলক লগি ঠেলিয়া নৌকা ভাসাইল।
- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, প্রবাস খণ্ড, তিতাস একটি নদীর নাম- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- পুথিঘর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬১
- সন্ধ্যাবেলায় বাজনা বাজাইয়া বর আসিল। সেইদিন রাত্রে রসিক স্বপ্ন দেখিল, তাহার মাথায় টোপর, গায়ে লাল চেলি; কিন্তু সে গ্রামের বাঁশঝাড়ের আড়ালে দাঁড়াইয়া আছে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ‘তোর বর আসিয়াছে’ বলিয়া সৌরভীকে খেপাইতেছে, সৌরভী বিরক্ত হইয়া কাঁদিয়া ফেলিয়াছে—রসিক তাহাদিগকে শাসন করিতে ছুটিয়া আসিতে চায়, কিন্তু কেমন করিয়া কেবলই বাঁশের কঞ্চিতে তাহার কাপড় জড়াইয়া যায়, ডালে তাহার টোপর আটকায়, কোনোমতেই পথ করিয়া বাহির হইতে পারে না।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পণরক্ষা, গল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড)- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬২৫
- আমার কপালটা কিছুক্ষণ ছুঁয়ে থেকে গুরুদেব বললেন, “দেখতে পাচ্ছি তুই গিয়েছিলি একটা গ্রাম-গ্রাম জায়গায়। জায়গাটা মধ্যমগ্রাম। বাড়িটাও দেখতে পাচ্ছি। ঠাণ্ডা, শান্ত, বড় সুন্দর পরিবেশ।”
বললাম, “সত্যিই সুন্দর। মুলিবাঁশের দেওয়াল, মাটির মেঝে, টালির চাল, অদ্ভুত এক ঠাণ্ডা আর শান্ত পরিবেশ।”
গুরুদেব বললেন, “হ্যাঁ, তাই দেখতে পাচ্ছি। একটা লাউ না কুমড়ো গাছ যেন ওদের বাঁশের দেওয়াল বেয়ে উঠেছে।”- প্রবীর ঘোষ, অলৌকিক নয় লৌকিক (প্রথম খণ্ড) - প্রবীর ঘোষ, প্রকাশক- দে’জ পাবলিশিং, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- প্রকাশসাল ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ (১৪১৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬০
- পিনাঙ এর বাঁশগাছগুলিও দেখিতে অতি সুন্দর। ইহাদ্বারা চেয়ার কৌচ আদি অনেক দ্রব্য প্রস্তুত হয়; সে দ্রব্যগুলি অতি সুচারু ও দামেও অতি সস্তা।
- ইন্দুমাধব মল্লিক, পিনাঙ, চীন ভ্রমণ - ইন্দুমাধব মল্লিক, প্রকাশসাল- ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪০
- বটের শাখে, অশথ গাছে,
বাঁশের ঝাড়ে নদীর কাছে—
আসর জমায় পাখীর দলে কূজন তুলে তুলে।- সুনির্মল বসু, সোনার ছবি, সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯০-৯১
- ভূতের প্রকৃত ব্যাপারটা কি তাহা জানিবার নিমিত্ত তিনি সেই গ্রামের ও নিকটবর্ত্তী স্থানের অনেক লোককে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহার কথার উত্তরে অনেকেই ভূতের অত্যাচারের কথা বলিল। কেহ বলিল, সে একদিন বাঁশ-বাগানের ভিতর একঝাড় বাঁশের গোড়ায় ভূতকে বসিয়া থাকিতে দেখিয়াছে। কেহ বলিল, একদিন সন্ধ্যার পর রাস্তা দিয়া গমন করিবার কালীন দেখিতে পায় যে, ভূতটী একটী গাছের উপর পা ঝুলাইয়া বসিয়া আছে।
- প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, ভূতের বিচার, পঞ্চম পরিচ্ছেদ, ভূতের বিচার - প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, প্রকাশসাল- ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ),পৃষ্ঠা ১৪
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় বাঁশ সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।
উইকিঅভিধানে বাঁশ শব্দটি খুঁজুন।
উইকিমিডিয়া কমন্সে বাঁশ সংক্রান্ত মিডিয়া রয়েছে।