বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ
অবয়ব
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হলো বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রচারিত একটি মতাদর্শ। ১৯৭০ এর দশকের শেষের দিকে এই মতাদর্শটি উত্থাপিত হয় এবং এই মতবাদটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী আন্দোলনের সময় হতেই এদেশে জাতীয়তাবাদের চর্চা পরিলক্ষিত হয়। এর পরে খুব শীঘ্রই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের একটি ধারণা উত্থান লাভ করে, যা পরবর্তীতে জাতিগত জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে জিয়াউর রহমানের মতো নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ মতাদর্শটির প্রচার শুরু করেন। যা মূলত বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের আত্মিক বন্ধনের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
উক্তি
[সম্পাদনা]- আমরা আগে বাঙালী, না মুসলমান, আমরা বাঙালী, না 'বাংলাদেশী প্রভৃতি প্রশ্ন ও সংশয় সৃষ্টি দ্বারা বাঙালীর জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও স্বাধিকারকেই বারম্বার ধ্বংস করার অপচেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এই অপচেষ্টারই সাম্প্রতিকতম অধ্যায়। পুরনো ও পরিত্যক্ত ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বেরই এটা ছদ্মাবরণ মাত্র।
- আবদুল গাফফার চৌধুরী, "আমরা বাংলাদেশী না বাঙালি?", প্রকাশক: অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩, পৃষ্ঠা: ১২-১৩
- বাংলাদেশী জাতীয়তা মৃত লাহোর প্রস্তাবের ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভৌতিক গর্ভে জন্ম নিলেও তার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রবক্তা ও পিতা কলকাতার অখণ্ড ভারতপন্থী একজন বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তার নাম শ্রী সন্তোষ কুমার ঘোষ।...এই সন্তোষ কুমার ঘোষ কয়েক দফা বাংলাদেশ ঘুরে গিয়ে 'আনন্দবাজারে' স্বনামে একটা উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখলেন। তাতে বললেন, এখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশের লোকেরা নিজেদের বাঙালী বলে পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু তারাই তো কেবল বাঙালী নয়। পশ্চিমবঙ্গের লোকেরাও বাঙালী। তারা পূর্ববঙ্গের লোকদেরই কেবল বাঙালী পরিচয়ের একচ্ছত্র অধিকার ছেড়ে দিতে পারে না। সুতরাং বাংলাদেশের লোকদের উচিৎ একটা স্বতন্ত্র পরিচয় খুঁজে নেওয়া।...সন্তোষ কুমার ঘোষ (আবদুল গাফফার চৌধুরীর উদ্দেশ্যে) বললেনঃ তোমরা যখন বাংলাদেশ নামটি গ্রহণ করেছো, তখন বাংলাদেশী নামে পরিচিত হতে পারো।...বললাম (আবদুল গাফফার চৌধুরী): আপনি সেই প্রস্তাবই 'আনন্দবাজারে' আপনার প্রবন্ধে দিয়েছেন। কিন্তু জাতিত্ব ও জাতি পরিচয় রাতারাতি তৈরি হয় না। বাঙালীর জাতি পরিচয় হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে বিস্তৃত। তার হাজার বছরের সাহিত্য সংস্কৃতিতে রয়েছে বাঙালী নাম ও পরিচয়ের ছড়াছড়ি। আজ কি কারণে তারা এই স্বাভাবিক ও স্বতোৎসারিত জাতি পরিচয় মুছে একটি ভুঁইফোড় নাম গ্রহণ করবে? বরং পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু বাংলাভাষাভাষী মানুষ নতুন পরিচয় গ্রহণ করতে পারেন। ভারতীয় জাতীয়তার ছাতার তলে ‘পশ্চিমবঙ্গবাসী' এই উপনামে তারা পরিচিত হতে পারেন। আপনারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে যারা ভারতীয় অখণ্ড জাতিসত্তার অংশ নয় এবং ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক স্বতন্ত্র জাতি পরিচয় বদলানোর প্রস্তাব জানাতে পারেন না।
- আবদুল গাফফার চৌধুরী, "আমরা বাংলাদেশী না বাঙালি?", প্রকাশক: অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩, পৃষ্ঠা: ১৭-২০
- সংবিধানে নিজের জনসাধারণকে 'বাঙালী' হিসেবে আখ্যা দিয়ে শেখ মুজিব ৭২ সালে দিল্লীর বিরক্তির কারণ হয়েছিলেন। ভারতীয়দের মনে হয়েছিলো, "বাঙালী জাতীয়তাবাদ” এর এই আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী ভবিষ্যতে কোনো এক সময় তাদের "পশ্চিমবঙ্গ” রাজ্য নিয়েও অযাচিত ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে। তাই জিয়া কর্তৃক 'বাংলাদেশী' নামকরণের ব্যাপারটি তাদের কাছে স্বাদরে গৃহীত হয়েছিলো এবং সংবিধানের ইসলামিকরণের প্রচেষ্টাকে এর ভারসাম্য হিসেবে তাদেরকে মেনে নিতে সাহায্য করেছিলো।
- এন্থনি মাস্কারেনহাস। Bangladesh: A legacy of blood, পৃষ্ঠা ১২৫
- আমাদের জাতীয়তাকে বাংলাদেশি জাতীয়তা বলাই অ্যাপ্রোপ্রিয়েট বা সঙ্গত। … এই জাতির রয়েছে গৌরবময় নাম-নিশানা, ওয়ারিসি-উত্তরাধিকার, ঐতিহ্য-ইতিহাস, ঈমান-আমান, যবান-লিসান, শিল্প-সাহিত্য-স্থাপত্য-সঙ্গীত সবকিছু।… এদের (বাংলাদেশের মানুষের) জীবনে ও মনোজগতে রয়েছে অসংখ্য বৈশিষ্ট্য যা সারা পৃথিবী থেকে এদের স্বাতন্ত্র্য দান করেছে- এমনকি অন্যান্য দেশের বা অঞ্চলের বাংলাভাষী এবং ইসলাম অনুসারীদের থেকেও। ওই বৈশিষ্টটুকুই বাংলাদেশি জাতীয়তার উপাদান। এগুলো বাকল নয়, আসল সারাংশ। আর এই সারাংশই বাংলাদেশি জাতীয়তার আসল শক্তি, ভিত্তি ও বুনিয়াদ।
- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল তাত্ত্বিক আবদুল হামিদ। [১]
- বিএনপি একটি রাজনীতি, একটি দর্শন দিয়েছিল, যেটা অতীতে কেউ দিতে পারেনি। সেটি হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বাঙালি, পাহাড়ি, এ দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সকলে এ জাতীয়তাবাদের মধ্যে আছেন। সকল ধর্মের মানুষ এখানে থাকতে পারবেন, তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারবেন। এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনীতি উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে থাকবে আমার সংস্কৃতি এবং যেখানে আমাদের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্য থেকে আমরা রাজনীতি পরিচালনা করতে পারব। এখন কেউ বলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, আর আমরা বলি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এখানেই আমাদের রাজনীতি সার্থক। বাংলাদেশের জনগণও বাংলায় কথা বলছে, আবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষও বাংলায় কথা বলে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং এ দেশের জাতি, ধর্ম, গোত্র—সকলকে সম্পৃক্ত করে একটা পূর্ণাঙ্গ রাজনীতি পাচ্ছি।
- খালেদা জিয়া। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম আলোতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। [২]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।