বিক্রম সারাভাই

বিক্রম আম্বালাল সারাভাই ( গুজরাতি: વિક્રમ અંબાલાલ સારાભાઇ) (১২ আগস্ট, ১৯১৯ – ৩০ ডিসেম্বর, ১৯৭১) ছিলেন একজন ভারতীয় পদার্থবিদ। তিনি ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জনক হিসেবে পরিচিত। তাকে “রেনেসাঁস ম্যান” বলেও অভিহিত করা হয়। তিনি ১৯৪৭ সালে ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন। বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার (VSSC), যা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার উৎক্ষেপণযান উন্নয়ন কেন্দ্র, তার নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে। তিনি অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তাকে ১৯৬৬ সালে পদ্মভূষণ এবং ১৯৭২ সালে মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়। ভারতে প্রতি বছর তার জন্মদিন ১২ আগস্ট 'মহাকাশ বিজ্ঞান দিবস’ পালন করা হয়।
উক্তি
[সম্পাদনা]- আমাদের বিজ্ঞানীরা বাইরের পরামর্শমূলক কাজে যুক্ত হলে আমরা তাদের তুচ্ছজ্ঞান করি। আমরা পরোক্ষভাবে গজদন্তমিনার মানসিকতাকে উৎসাহিত করি।
- "৬০ জন শ্রেষ্ঠ ভারতীয়র উক্তি"। ধীরুভাই আম্বানি ইনস্টিটিউট অফ ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি। থেকে উদ্ধৃত
- এমন অনেকে আছেন যারা একটি উন্নয়নশীল দেশে মহাকাশ কার্যক্রমের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আমাদের উদ্দেশ্যের কোনো অস্পষ্টতা নেই। চাঁদ বা গ্রহ অন্বেষণ কিংবা মনুষ্যবাহী মহাকাশ যাত্রার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো অলীক কল্পনা আমাদের নেই। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, যদি আমরা জাতীয় পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক সমাজে একটি অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে চাই, তবে আমাদের দেশে বিদ্যমান মানুষ ও সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলোতে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই অদ্বিতীয় হতে হবে। এবং আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমাদের সমস্যাগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্লেষণ পদ্ধতির প্রয়োগকে এমন কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণের সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়, যার মূল প্রভাব কঠোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মাপকাঠিতে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতির চেয়ে লোকদেখানোই বেশি।
- "ডঃ বিক্রম এ. সারাভাই-এর গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা ও গবেষণাপত্রের তালিকা"-য় উদ্ধৃত।[১]
- একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য মহাকাশ কার্যক্রমের গুরুত্ব অনুধাবন করতে গেলে কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যাকে স্বীকার করে নেওয়া উচিত। এই সমস্যাগুলো মহাকাশ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত চাকচিক্য থেকে উদ্ভূত হয়। বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো মূলত এই চাকচিক্যের জন্যই মহাকাশ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে এবং আমাদের এখানে আলোচিত মূল্যবোধগুলোকে স্বীকৃতি না দিয়ে, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কৃত্রিম ভাবমূর্তি তৈরির আকাঙ্ক্ষা থেকে সম্পদ বিনিয়োগ করতে পারে। মহাকাশ কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এই পরিস্থিতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
- "দি পাওয়ার অফ দি স্পেস ক্লাব" এ উদ্ধৃত[২]
- জাতির উন্নয়ন জনগণের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপলব্ধি এবং প্রয়োগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
- "বিক্রম এ সারাভাই"এ উদ্ধৃত[৩]
- একটি জাতীয় কর্মসূচি, যার মাধ্যমে আগামী দশ বছরে ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ জনগণ দূরদর্শনের সুবিধা পাবে, তা জাতীয় সংহতি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ইলেকট্রনিক শিল্পের উদ্দীপনা ও প্রসারের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। এটি বিশেষত বিচ্ছিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
- "Communication and National Development" গ্রন্থে ১৯৭৪ সালে তার অগ্রাধিকারের উদ্ধৃতি।
- মৌলিক গবেষণার প্রধান কাজ হলো আবিষ্কার করা, গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ হলো বিষয়টিকে সর্বোত্তম পর্যায়ে উন্নীত করা এবং শিল্পের কাজ হলো উৎপাদন করা; আর উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনাগুলোর সংগঠনে যে প্রধান সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হতে হয়, তার অন্যতম হলো এই তিনটি সংস্কৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা—এবং এমন একটি ভিত্তি প্রস্তুত করা, যার মাধ্যমে জ্ঞান, জনশক্তি ও প্রযুক্তির হস্তান্তর এক স্তর থেকে অন্য স্তরে অবাধ পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারে এবং একে অপরের দ্বারা উপকৃত হতে পারে।
- সেখানে কোনো নেতা নেই, নেই কোনো অনুগামীও। যদি কাউকে নেতা হিসেবে চিহ্নিত করতেই হয়, তবে তিনি হবেন কৃষক, নির্মাতা নন। তাকে এমন মাটি, সামগ্রিক আবহাওয়া এবং পরিবেশের জোগান দিতে হবে, যার মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে। আমরা এমন উদারচেতা মানুষদের প্রত্যাশা করি, যাদের নিজেদের নেতা হিসেবে প্রমাণ করার জন্য অন্যদের নির্দেশ জারি করার কোনো তীব্র তাগিদ নেই; বরং তারা নিজেদের সৃজনশীলতা, প্রকৃতিপ্রেম এবং যাকে ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’ বলা যেতে পারে তার প্রতি নিষ্ঠার মাধ্যমেই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ঠিক এমন নেতারাই আমাদের প্রয়োজন।
- সায়েন্স পলিসি অ্যান্ড ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট, নিউ দিল্লি: ম্যাকমিলান, ১৯৭৪ [৫]
- নিছক অভিজ্ঞতাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
- "Vikram A. Sarabhai"। OutlookIndia। ১৯ আগস্ট ২০০২। সংগ্রহের তারিখ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩।
- যিনি কোলাহলের মাঝেও সঙ্গীত শুনতে পারেন, তিনি মহত্ত্ব অর্জন করতে পারেন।
- "Vikram Ambalal Sarabhai"। New Mexico Museum of Space History। সংগ্রহের তারিখ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩।
- আমাদের জাতীয় লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে এমন পরিবর্তন কয়েক দশকের মধ্যে অর্জন করা, যা অন্যান্য দেশ ও ভূখণ্ডে বাস্তবায়িত হতে কয়েক শতাব্দী সময় লেগেছে। এর জন্য সকল স্তরে উদ্ভাবন প্রয়োজন।
- নেহেরু-পরবর্তী যুগে “দূরদর্শন ও উন্নয়ন” বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি, Joshi, Puran Chandra (১ জানুয়ারি ২০০২)। Communication and National Development। Anamika Publishers & Distributors। পৃষ্ঠা xxv। আইএসবিএন 978-81-7975-013-1। থেকে উদ্ধৃত
ভারতীয় পারমাণবিক বোমার নির্মাণ: বিজ্ঞান, গোপনীয়তা এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র
[সম্পাদনা]Abraham, Itty (১৫ নভেম্বর ১৯৯৮)। The Making of the Indian Atomic Bomb: Science, Secrecy and the Postcolonial State। Zed Books। পৃষ্ঠা 143। আইএসবিএন 978-1-85649-630-8।
- আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, নিরাপত্তা শুধু বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেও বিপন্ন হতে পারে। যদি আপনারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রগতির হার বজায় না রাখেন, তবে আমি বলব যে আপনারা এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হবেন, যা আমাদের পরিচিত ভারতকে ধ্বংস করে দেবে।
- এমন এক সময়ে যখন ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সংকট চলছিল এবং যখন তাকে পারমাণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
- সুতরাং, এই পুরো বিষয়টির আসল সমস্যাটি হলো, যেকোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশ যে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বোঝা বহন করতে পারে, তার বিপরীতে উৎপাদনশীল ও সামাজিক কল্যাণের জন্য জাতীয় সম্পদের ব্যবহার।
- অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বনাম বাহ্যিক প্রতিরক্ষার অগ্রাধিকারের প্রশ্নে।
তার সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]প্রাইড অব দি নেশন: ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম
[সম্পাদনা]Mahesh Sharma; P.K. Das; P. Bhalla (২০০৪)। Pride Of The Nation : Dr. A.P.J. Abdul Kalam। Diamond Pocket Books (P) Ltd.। পৃষ্ঠা 45–49। আইএসবিএন 978-81-288-0806-7।
- বিক্রম সারাভাইয়ের মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন এখন আর নেই, কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আজও ইসরোর গবেষণার একটি প্রধান বিষয়।
- রকেট উৎক্ষেপণের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য নাসার কাছে প্রশিক্ষণার্থী প্রার্থী হিসেবে ডঃ কালামের নাম প্রস্তাব করেছিলেন অধ্যাপক সারাভাই।
- অধ্যাপক সারাভাই একজন প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানীর কাজের ক্ষমতা তার ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণ দিয়ে নয়, বরং তার আত্মবিশ্বাস দিয়ে মূল্যায়ন করতেন।
- অধ্যাপক সারাভাইয়ের তীব্র ইচ্ছা ছিল যে রকেট উৎপাদনে ভারতকে অবশ্যই স্বনির্ভর হতে হবে, তাই তিনি সর্বদা নতুন কিছু করার জন্য উৎসাহে পূর্ণ থাকতেন।
- তিনি সর্বদা প্রকৌশলীদের নতুন প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিতেন এবং সেই মুহূর্তে তার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠত।
- তিনি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কখনও বিচ্যুত হননি, বরং তিনি মেনে নিয়েছিলেন যে কিছু শেখার জন্য ভুল করা বা কিছু ভুলে যাওয়া কোনো অপরাধ নয়।
- তিনি বলেছিলেন যে আমরা যদি বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, তবে আমাদের আত্মনির্ভরশীল হতে হবে এবং নতুন ধারণা ও কৌশলের জন্য গবেষণা করতে হবে।
- তিনি তার দলের সবাইকে যেকোনো নতুন প্রকল্প সম্পর্কে জানাতেন এবং সবার সাথে আলোচনা করার পরেই কেবল সেটির উপর কাজ শুরু করতেন। তিনি বলতেন যে, কোনো প্রকল্পের সাথে কর্মীর শারীরিক সংযোগের পাশাপাশি মানসিক সংযোগও থাকা আবশ্যক; অন্যথায় এর প্রতি নিষ্ঠা ও ভক্তি অর্জন করা যায় না।
- কোনো প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানীর কাজে তিনি সন্তুষ্ট না হলে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে তার ভুল ধরিয়ে দিতেন। এমন মুহূর্তে তিনি খুবই ইতিবাচক থাকতেন।
- তিনি বলতেন যে, সাফল্যের তুলনায় ব্যর্থতাই আমাদের বেশি গড়ে তোলে।
- তিনি এতটাই প্রতিভাবান ছিলেন যে খুব দ্রুত যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে পারতেন। তরুণ প্রকৌশলীদের নতুন নতুন পরামর্শ দেওয়ার অভ্যাস তাঁর ছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও স্বাভাবিক থাকাটা ছিল তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্য।
- শুধুমাত্র অধ্যাপক বিক্রম সারাভাইয়ের অনুপ্রেরণার কারণেই ভারতে এসএলভি স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ সম্ভব হয়েছিল। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, অধ্যাপক সারাভাই হলেন ভারতীয় বিজ্ঞানের দিগন্তের সেই সূর্য, যিনি ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীদের পথ দেখিয়ে যাবেন।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "List Of Important Speeches And Papers By Dr. Vikram A. Sarabhai." (PDF)। PRL.res.in। পৃষ্ঠা 113। ২৭ জুন ২০১৯ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৭ জুন ২০১৯।
- ↑ Paikowsky, Deganit (২০১৭)। The Power of the Space Club (ইংরেজি ভাষায়)। Cambridge University Press। আইএসবিএন 9781107194496। সংগ্রহের তারিখ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
- ↑ ৩.০ ৩.১ "The Tenth Dr. Vikram A. Sarabhai Festival of Performing Arts" (PDF)। PRL.res.in। পৃষ্ঠা 28। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
- ↑ "Tata Institute of Fundamental Research Silver Jubilee celebration speech by Dr Vikram Sarabhai on Saturday, 10 April 1971" (PDF)। ১৮ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা।
- ↑ "Institution building : Lessons from Vikrarn Sarabhai's leadership" (PDF)। ১২ আগস্ট ২০২২ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা।