ভারতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
অবয়ব
ভারতের সংবিধানের ১৯, ২০, ২১ ও ২২ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে স্বাধীনতার অধিকার প্রদান করে। সংবিধান প্রণেতারা এই অধিকারগুলিকে ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। অনুচ্ছেদ ১৯-এ উল্লিখিত স্বাধীনতার অধিকার ছয়টি স্বাধীনতার মধ্যে বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
উক্তি
[সম্পাদনা]- যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং বিদ্বেষপূর্ণ উদ্দেশ্যে ভারতের কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগরিকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে — কথার মাধ্যমে, তা বলা হোক বা লেখা, কিংবা ইশারা, দৃশ্যমান উপস্থাপনা বা অন্য কোনো উপায়ে — ওই শ্রেণির ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করে বা অপমান করার চেষ্টা করে, তাকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।
- ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারা, উদ্ধৃত হয়েছে নির্মলা সীতারামন (২০২৩) "বেলজিয়ান ডিকলোনাইজার অফ দ্য হিন্দু মাইন্ড: কোনরাড এলস্ট, আনঅ্যাফিলিয়েটেড ওরিয়েন্টালিস্ট", ইন: ব্লাইথ, সি. (সম্পা.) 'অদার' ভয়েসেস ইন এডুকেশন—(রি)স্টোর(ই)য়িং স্টোরিজ, স্প্রিংগারব্রিফস ইন এডুকেশন, স্প্রিংগার, সিঙ্গাপুর থেকে।https://doi.org/10.1007/978-981-99-5495-7_5
- ৫ আগস্ট তারিখটি সেই দিনের এক বছর পূর্তি চিহ্নিত করে যেদিন নয়াদিল্লি ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে এবং রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে — জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। [...] তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলিকে প্রায়ই পুলিশের হয়রানির মুখে পড়তে হয়, আর আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের পক্ষে অঞ্চলটিতে প্রবেশ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৫ আগস্টের পর প্রশাসন কয়েক মাস ধরে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। মার্চ মাসে ইন্টারনেট ফের চালু হলেও তা ছিল খুবই ধীরগতির। এখন জম্মু ও কাশ্মীর সরকার আবারও কয়েক সপ্তাহের জন্য দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিষিদ্ধ করেছে — বাহ্যত বিক্ষোভ ও এই অঞ্চল নিয়ে প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে। কাশ্মীরি কলেজ শিক্ষার্থীদের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভারতের সেনা পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে। কাশ্মীরি নেতারা যারা এই বিশেষ মর্যাদা বাতিলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তারা এখনো গৃহবন্দি রয়েছেন, যার মধ্যে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও আছেন।
- ভারতের বহু খ্যাতনামা হিন্দু, যারা লেখালেখির মাধ্যমে কিংবা শুদ্ধি আন্দোলনে অংশ নিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন, তাঁদের অনেককেই কিছু উগ্রপন্থী মুসলমান হত্যা করেছিলেন—এই বিষয়টি সুপরিচিত। এই ধারাবাহিকতায় দিল্লির বিশিষ্ট আর্য সমাজের লালা নানকচাঁদের হত্যা ঘটে। ‘রঙ্গিলা রসুল’ নামক বইয়ের লেখক রাজপাল ১৯২৯ সালের ৬ই এপ্রিল, তাঁর দোকানে বসে থাকার সময়, ইলামদিন নামে একজন ব্যক্তি তাঁকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এরপর ১৯৩৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, নাথুরাম শর্মা নামে একজনকে আবদুল কায়ুম হত্যা করে। এটি ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ। কারণ শর্মাকে খুন করা হয়েছিল সিন্ধের বিচার কমিশনারের আদালতের মধ্যেই। তিনি তখন আদালতে বসে ছিলেন। এর কারণ হল ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ১৯৫ অনুযায়ী ইসলামের ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি পুস্তিকা প্রকাশের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির অপেক্ষায় ছিলেন। এই ঘটনা তালিকা খুবই সংক্ষিপ্ত। চাইলে সহজেই আরও বড় করা যায়। তবে কতজন খ্যাতনামা হিন্দুকে উগ্র মুসলমানেরা হত্যা করেছে—এই সংখ্যাটা বেশি না কম, সেটি আসল কথা নয়। আসল বিষয় হলো, সমাজে যাদের কথা গুরুত্ব পায়, তারা এই খুনিদের প্রতি কেমন মনোভাব সোষণ করেন। যেসব জায়গায় আইন কার্যকর হয়েছে, সেখানে এই খুনিরা আইনি শাস্তি পেয়েছে। কিন্তু সমাজের শীর্ষস্থানীয় মুসলমানেরা কখনোই এই অপরাধীদের নিন্দা করেননি। বরং তাদের ধর্মীয় শহিদ বলে প্রশংসা করা হয়েছে। এমনকি তাঁদের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবিতেও আন্দোলন হয়েছে। এই মানসিকতার একটি উদাহরণ হলেন লাহোরের ব্যারিস্টার মি. বারকত আলি। তিনি আবদুল কায়ুমের আপিল মামলায় সওয়াল করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে, কায়ুম নাথুরামালকে খুন করেননি। কারণ কোরআনের আইনের ভিত্তিতে তার কাজটি ন্যায়সঙ্গত ছিল। এই মানসিকতা মুসলমানদের দিক থেকে কিছুটা বোঝা যায়। কিন্তু যা বোঝা যায় না, তা হলো মি. গান্ধীর মনোভাব। (পৃষ্ঠা ১৫৭)
- ভীমরাও রামজি আম্বেদকর, পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া (১৯৪৬)
- ১৯২৩-২৪ সালের পুরো সময়জুড়ে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক খুবই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। কিন্তু ভারতের আর কোনও জায়গায় এই উত্তেজনার ফল এত ভয়ঙ্কর হয়নি, যতটা হয়েছিল কোহাট শহরে। এই সংঘর্ষের তাত্ক্ষণিক কারণ ছিল একটি পুস্তিকা প্রকাশ ও তার প্রচার। সেই পুস্তিকায় ইসলাম-বিরোধী একটি তীব্র আক্রমণাত্মক কবিতা ছাপা হয়েছিল। এর ফলে ১৯২৪ সালের ৯ ও ১০ই সেপ্টেম্বর ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়। এই দাঙ্গায় মোট প্রায় ১৫৫ জন হতাহত হন। এই সন্ত্রাসের ফলে কোহাট শহরের সমস্ত হিন্দু জনসংখ্যা শহর ছেড়ে চলে যায়। সেই বছরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার আরেকটি ভয়াবহ দিক ছিল—এক সম্প্রদায়ের কিছু সদস্যের হাতে অন্য সম্প্রদায়ের নির্দোষ মানুষের ওপর চালানো খুন ও হামলা। এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর কিছু ঘটনা ঘটেছিল ‘রঙ্গিলা রসুল’ ও ‘রিসালা বর্তমান’ নামের দুটি প্রকাশনা ঘিরে হওয়া আন্দোলনের সময়। এই দুটি প্রকাশনায় ইসলাম ধর্মের নবী সম্পর্কে অশালীন ও কটূ মন্তব্য করা হয়েছিল। সেই কারণে বেশ কিছু নির্দোষ মানুষ প্রাণ হারান। অনেক সময় সেই খুনের ঘটনা ছিল খুবই নির্মম। ১৯২৯ সালের এপ্রিল মাসে ঘটে যাওয়া একটি বড় ঘটনা ছিল লাহোরে রাজপালের হত্যা। তার পুস্তিকা ‘রঙ্গিলা রসুলে’ ইসলাম ধর্মের নবীর বিরুদ্ধে লেখা কটূ বক্তব্যে ভরা ছিল। এই লেখা আগের বহু সাম্প্রদায়িক সমস্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একইসঙ্গে তা নানা ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতাও তৈরি করেছিল। মাদ্রাজে ৩রা সেপ্টেম্বর একটি দাঙ্গা হয়। এই দাঙ্গায় একজন মারা যান এবং ১৩ জন আহত হন। একটি বইকে ঘিরে এই দাঙ্গা শুরু হয়। বইটি হিন্দুরা প্রকাশ করেছিল এবং তাতে ইসলাম ধর্মের নবী সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ১৯৩৫ সালের ১৯শে মার্চ করাচিতে একটি গুরুতর ঘটনা ঘটে। এর আগেই নাথুরামাল নামে এক হিন্দুকে খুন করার দায়ে অভিযুক্ত আবদুল কায়ুমকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। এই আবদুল কায়ুম সেই পুস্তিকার লেখককে হত্যা করেছিল যেটিতে ইসলাম ধর্মের নবী সম্পর্কে কটূ মন্তব্য করা হয়েছিল। আবদুল কায়ুমের মৃতদেহ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের একটি দল মৃতের পরিবারের কাছে কবর দেওয়ার জন্য শহরের বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কবরের জায়গায় প্রায় ২৫,০০০ লোকের এক বিশাল দল জড়ো হয়। আবদুল কায়ুমের আত্মীয়েরা চেয়েছিলেন তাকে কবরস্থানে চুপচাপ কবর দিতে। কিন্তু জনতার একদল সহিংস সদস্য জোর করে তাঁর মৃতদেহ মিছিল করে শহরের মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে চায়। এই বিশৃঙ্খলার সময় পুলিশ ৪৭ রাউন্ড গুলি চালায়। এতে ৪৭ জন মারা যান এবং ১৩৪ জন আহত হন। (অধ্যায় ৭)
- ভীমরাও রামজি আম্বেদকর, পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া (১৯৪৬)
- আর্য সমাজের ইসলাম-বিরোধী স্পষ্ট অবস্থানের ফলে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসতে থাকে। স্থানীয় সনাতন ধর্ম সভার একটি পুস্তিকায় ইসলাম-বিরোধী একটি কবিতা ছাপা হয়। মুসলমানদের প্রথম প্রতিবাদে ভীত হয়ে হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একটি সভা ডাকে। সেখানে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়—তারা "নিজেদের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এবং ক্ষমা চায়"। মুসলমান প্রতিবাদকারীদের শান্ত করতে সরকার জীবন দাসকে গ্রেপ্তার করে। তবুও, ১৯২৪ সালের ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর মুসলমানদের একদল জনতা হিন্দু মহল্লায় আক্রমণ চালায়। এতে বহু হিন্দু প্রাণ হারান। বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী আর্য সমাজী, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, আবদুল রশিদ নামের এক ব্যক্তি দ্বারা খুন হন। পরে আবদুল রশিদকে ফাঁসি দেওয়া হলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম ধর্মীয় নেতারা তার জন্য প্রার্থনা সভার আয়োজন করেন। ড. আম্বেদকর লিখেছেন: "শীর্ষস্থানীয় মুসলমানরা কখনও এসব অপরাধীদের নিন্দা করেননি। বরং, তাদের ধর্মীয় শহিদ হিসেবে সম্মান জানিয়েছে।" ১৯৩৩ সালে আরেক আর্য সমাজী, নাথুরামাল শর্মা, লেখ রামের মতোই একটি পুস্তিকা প্রকাশ করার জন্য আদালতে তোলা হয়। সেই আদালতের মধ্যেই তাকে খুন করে আবদুল কায়ুম।
- ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর উদ্ধৃত করেছেন কোনরাড এলস্ট, ডিকলোনাইজিং দ্য হিন্দু মাইন্ড: আইডিওলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অফ হিন্দু রিভাইভালিজম (২০০১), নয়া দিল্লি: রূপা, পৃষ্ঠা ১১২–১৩
- এই সময় মুসলিম নেতারা এবং স্তালিনপন্থী ইতিহাসবিদেরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই, ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রধান সম্পাদক অরুণ শৌরির নজরে আসে যে, প্রখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ আলি মিয়াঁর পিতা বহু আগে উর্দুতে লেখা একটি বইতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইংরেজি অনুবাদে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে তিনি ১৯৮৯ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ একটি প্রবন্ধ লেখেনহাইডঅ্যাওয়ে কমুনালিজম, । তাতে তিনি দেখান, দিল্লি, জনপুর, কানৌজ, ইটাওয়া, অযোধ্যা, বারাণসী ও মথুরায় হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে তাদের জায়গায় মসজিদ নির্মাণের উল্লেখ ছিল মূল উর্দু গ্রন্থে। কিন্তু আলি মিয়াঁ নিজেই যে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন, সেখান থেকে সেই অংশ বাদ দেওয়া হয়। এটি ছিল ভারতের প্রধান গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পদক্ষেপ। এতদিন পর্যন্ত ইসলামের সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু ছাপা একপ্রকার নিষিদ্ধ ছিল। তাই অরুণ শৌরিকে আমি ভারতের গর্বাচেভ বলেও উল্লেখ করি। যে ঘরটি ছিল পুরনো স্লোগানের পচা গন্ধে ভরা সেখানে তিনি যেন একটি বন্ধ ঘরের জানালা খুলে তাজা বাতাস ঢুকিয়েছিলেন।
- সীতা রাম গোয়েল, হাও আই বিকেম এ হিন্দু (১৯৯৩, সংশোধিত সংস্করণ)
- বাবরি স্থাপনা ভেঙে পড়ার পরে, দিল্লির এক সম্মেলনে শ্রী এন. রাম গর্জে উঠে বলেছিলেন—প্রিন্ট মিডিয়ার উচিত নিজেদের স্বার্থে এবং দেশের স্বার্থে ‘হিন্দুত্ববাদের দল’ সম্পর্কিত সব বিবৃতি ও কার্যকলাপ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া।
- হেমন্ত হেম্মাডি: ইনটলারেন্স অফ দ্য চ্যাম্পিয়নস অফ ফ্রিডম অফ স্পিচ (১৯৯৭), উদ্ধৃত করেছেন কোনরাড এলস্ট, ডিকলোনাইজিং দ্য হিন্দু মাইন্ড: আইডিওলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অফ হিন্দু রিভাইভালিজম (২০০১), নয়া দিল্লি: রূপা, পৃষ্ঠা ৭৯
- ঘৃণাবাচক বক্তব্যের সংজ্ঞা আজকাল নির্ভর করছে একদল বিশেষ মানুষের পছন্দ-অপছন্দের উপর—যেটাকে অনেকে বলেন ‘খান মার্কেট গ্যাং’। যাদের তারা পছন্দ করে, তারা যা-ই বলুক না কেন, সেটা বাহবা পায়। কিন্তু কেউ যদি তাদের অপছন্দের মানুষ হন, তাহলে সে যা বলুক, সেটাই ঘৃণাবাচক ধরা হয়। আজ কেউ যদি নির্যাতনের কথা বলে, বা শুধু বলে “আমি সন্ত্রাসবাদী নই”, সেটাও ঘৃণাবাচক ভাষা বলা হচ্ছে। অথচ কেউ যদি হিন্দুদের সন্ত্রাসবাদী বলে, সেটা কেউ ঘৃণাবাচক বলে না। একজন নারী কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, কীভাবে তাকে (উলঙ্গ করে) নির্যাতন করা হয়েছে—তাকে ঘৃণাবাচক বলা হয়। আর একটা গোটা সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসবাদী বলা হলে, সেটা ঘৃণাবাচক নয়? আমার প্রশ্ন হলো—এই নিরপেক্ষতার মাপকাঠি কেন এত আলাদা?
- নরেন্দ্র মোদী। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী: ‘খান মার্কেট গ্যাং হ্যাজ়ন’ট ক্রিয়েটেড মাই ইমেজ, ৪৫ ইয়ার্স অফ তপস্যা হ্যাজ়… ইউ কানট ডিসম্যান্টল ইট’, ১২ মে ২০১৯ [১]
- সাধারণভাবে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে, যদি এমন একজন বিচারকের মৃত্যু হয় যিনি দেশের দ্বিতীয় সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি মামলার বিচার করছিলেন—আর যিনি আবার প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ—তাহলে সেই ঘটনা মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়ে উঠত। ঠিক তেমনভাবেই, ঐ ব্যক্তির পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে বড় গুরুত্ব পেত। কিন্তু ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি একেবারে ভিন্ন বাস্তবতা দেখাচ্ছে। তবে আরও বিপজ্জনক যেটি হয়েছে, তা হলো—সরকারি চাপের মুখে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা। যেমন বিচারকের মৃত্যুর খবর নিয়ে চুপ করে থাকা হয়েছিল, তেমনি দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও একইভাবে নীরবতা পালন করা হয়েছে। কখনো যদি কিছু বলা হয়েছে, সেটাও হয়েছে মানহানির মামলার প্রসঙ্গে—অভিযোগের সারবত্তা নিয়ে নয়। যে কয়েকটি টিভি চ্যানেল মাঝে মাঝে মোদি সরকার নিয়ে সমালোচনা করে এবং তার ফলও ভোগ করেছে, তারাও শেষপর্যন্ত নতিস্বীকার করে ঐ দুর্নীতির প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলেছে। এটি সংবাদমাধ্যমের এক ভয়াবহ আত্মসমর্পণের নমুনা। এই বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক যখন আমরা লক্ষ করি বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ভারতের ভয়াবহ অবস্থান। গত বছর ভারতের অবস্থান ছিল ১৩৩। এবার তা আরও নেমে এসেছে ১৩৬-এ। সম্প্রতি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে তথাকথিত স্ল্যাপ মামলা (স্ট্র্যাটেজিক লস্যূটস এগেন্সট পাবলিক পার্টিসিপেশন)। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী রিপোর্ট বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। সাংবাদিকরা আজ শারীরিক সহিংসতা থেকে শুরু করে প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে সরকারকে নিয়ে যে "সম্মতি তৈরির প্রক্রিয়া" বা ‘ম্যানুফ্যাকচার অফ কনসেন্ট’ শুরু হয়েছে, তা কেবল সংবাদমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নয়, বরং সাংবাদিকদের উপর চরম হুমকির ফলেও ঘটছে।
- ব্রিজগোপাল হরকিশান লোয়ার মৃত্যুতে নিসিম মান্নাথুকারেন, মোদী গভর্নমেন্ট অ্যান্ড দ্য মজলিং অফ দ্য ইন্ডিয়ান মিডিয়া, ৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ওপেনডেমোক্রেসি
- নরেন্দ্র মোদি-কে নিয়ে রসিকতা, সাধারণ নাগরিকদের ফেসবুক পোস্ট, কিংবা তার সরকারের সমালোচনা করে নির্মিত চলচ্চিত্র—সবই এখন পুলিশের অভিযোগ, আইনি মামলা আর শাসকদল ও তাদের বৃহত্তর মতাদর্শগত থেকে আসা পৃষ্ঠপোষকদের হুমকির সম্মূখীন হয়। এমনকি ভারতীয় জনতা পার্টি-শাসিত রাজ্য সরকারগুলো বাক্স্বাধীনতা খর্ব করতে কঠোর আইনও প্রণয়ন করেছে। ভারতের গণতন্ত্র এখন এক সংকটজনক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৫ সালে কংগ্রেস সরকারের ঘোষিত জরুরি অবস্থার পর, যখন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছিল, তার পরে আর কখনও বাক্স্বাধীনতার এত বড় অবনমন দেখা যায়নি। (বিচারকের মৃত্যুর ঘটনায়, যেটি নিয়ে গোটা দেশে আলোড়ন হওয়া উচিত ছিল, সেখানেও বিচারব্যবস্থা—যারা সাধারণত সক্রিয়— চুপচাপ থেকেছে)। তাই এখনকার পরিস্থিতিকে স্বাধীন মত প্রকাশের দিক থেকে এক গুরুতর অধঃপতনের দৃষ্টান্ত বলা ভুল হবে না।
- ব্রিজগোপাল হরকিশান লোয়ার মৃত্যুতে নিসিম মান্নাথুকারেন, মোদী গভর্নমেন্ট অ্যান্ড দ্য মজলিং অফ দ্য ইন্ডিয়ান মিডিয়া, ৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ওপেনডেমোক্রেসি
- সব সরকারই কোন না কোনভাবে বাক্স্বাধীনতা দমন করতে চায় বা সাংবাদিকদের ভয় দেখায়। কিন্তু মোদি সরকারের অধীনে যা ঘটছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন: এখানে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের আগুনে ঘি ঢালছে রাষ্ট্র-ক্ষমতা। এর ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নজিরবিহীন হামলা হয়েছে, যেমন—গো মাংস খাওয়া বা রাখা নিয়ে অভিযোগ তুলে নির্যাতন, অথবা সরকারের সমালোচকদের হত্যা। ভিন্নমত বা সরকারের সমালোচনাকেও ‘দেশদ্রোহিতা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে—এটা ২০১৬ সালের ৪০টি দেশদ্রোহিতার মামলার মাধ্যমেই স্পষ্ট।
- ব্রিজগোপাল হরকিশান লোয়ার মৃত্যুতে নিসিম মান্নাথুকারেন, মোদী গভর্নমেন্ট অ্যান্ড দ্য মজলিং অফ দ্য ইন্ডিয়ান মিডিয়া, ৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ওপেনডেমোক্রেসি
- কোনো শিল্পকর্ম কারও পছন্দ না-হলে তা নিয়ে প্রতিবাদের অন্য পথও আছে। আমি কখনোই শিল্পের স্বাধীনতার উপর সহিংস আক্রমণকে সমর্থন করি না। ফতোয়া জারির প্রবণতাও আমি সমর্থন করি না। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্ব আছে, যারা ধর্মের ভিত্তিতে সমর্থন বা প্রতিবাদ করেন। তাহলে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নিয়ম পাল্টে দেওয়া হচ্ছে কেন? কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আমাকে পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে দেয়নি? আমার বই প্রকাশ করতে দেয়নি? মত প্রকাশের স্বাধীনতা—যা গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক—তা বারবার রাজনীতির স্বার্থে আক্রমণের শিকার হচ্ছে। কেউই এখন নিরপেক্ষভাবে কিছু সমালোচনা করে না।
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে তসলিমা নাসরিন, ইকোনমিক টাইমস
- প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা, প্রতিটি সেন্সরশিপ যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু নির্বাসন সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। নির্বাসন আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছে। এখন আমার সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার, সেটা হল একটা দৃঢ় জমি—যেখান থেকে দাঁড়িয়ে আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে পারি। আমি নির্বাসিত হয়েছি পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গ—উভয় জায়গা থেকেই।
- ফার্স্টপোস্টের সাথে সাক্ষাৎকারে তসলিমা নাসরিন [২] (২০১৬)
- এখানে জোর দেওয়া হয়েছে দুটি বিষয়ে: রাষ্ট্র জানে সবকিছু, রাষ্ট্রই সঠিক, রাষ্ট্রের অবস্থানই প্রাধান্য পাবে—এবং নাগরিকদের যে কোনো কর্মই সন্দেহজনক, বিশৃঙ্খলাকারী হিসেবে ধরা হবে, এবং তার জন্য শাস্তিও হতে পারে। এই নীরব অধিকারচর্চা ও জনগণের বৈধ দাবিকে বাতিল করে দেওয়ার প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠেছে এমন এক সময়, যেখানে সমালোচনা করলেই তা দেশদ্রোহ বলে চিহ্নিত হয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার চাইলেই তা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ বলে গণ্য হয়, আর সামাজিক অবিচারের শিকারদের প্রতি সহানুভূতি দেখালেও তা বিদ্রূপের বা নিষিদ্ধের মুখে পড়ে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী গণতান্ত্রিকতার অংশ রাষ্ট্রচর্চাকে এক ভয়ঙ্কর শিল্পে রূপান্তরিত করেছে।
- ভারতের পরিস্থিতি অনেক দেশের চেয়ে খারাপ। ফরাসি মার্কসবাদী পণ্ডিত ম্যাক্সিম রদাঁসঁ -এর নবী মহম্মদের জীবনী বিদেশে অনায়াসেই পাওয়া যায়; ইংরেজি সংস্করণ পেঙ্গুইন প্রকাশ করেছে। বইটিতে দেখা যায়, ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক ওহির পেছনে নবীর সেই মুহূর্তে যেসব ব্যক্তিগত সংকট ছিল, তার ছাপ কীভাবে রয়েছে। একজন ভারতীয় পণ্ডিত এ ধরনের কোনো বিশ্লেষণ করলে, সেটা নিয়ে হইচই পড়ে যেত, বইটি নিষিদ্ধ হয়ে যেত। আলি দাস্তির, টুয়েন্টি থ্রি ইয়ার্স (Twenty Three Years) বইতেও বিশদভাবে দেখানো হয়েছে, কীভাবে মদীনায় শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার পরে নবীর দৃষ্টিভঙ্গি—ক্ষমতা, ইহুদি সম্প্রদায়, বিরোধিতা করা মানুষদের প্রতি, নারীদের প্রতি—ধাপে ধাপে বদলেছে... এমন কোনো বই যদি কোনো ভারতীয় লেখক লিখতেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার দাবিতে প্রতিবাদ হত, আর নিঃসন্দেহে সেই দাবিগুলো কার্যকর হত।
- আর ভারতে পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে আরও খারাপ হয়েছে। ভাবুন তো, আমাদের মধ্যেই কেউ—যিনি হিন্দু—আজকের দিনে এমন কিছু লিখছেন [...] সঙ্গে সঙ্গে শোরগোল পড়ে যাবে—"ফ্যাসিবাদ", "সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা"—আর দাবি উঠবে বইটি যেন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ এই কথাগুলি স্বামী বিবেকানন্দেরই লেখা—আর তিনি এই কথাগুলি বারবার বলেছিলেন।
- ভাবুন, কোনও গবেষক যদি আজ বলেন যে কোরআনে কিছু “স্পষ্ট ত্রুটি” আছে, কিছু “অপরিণত বক্তব্য” আছে… এমন কিছু বললেই লেখককে হেনস্তা হতে হবে, বই ছিঁড়ে ফেলা হবে, তার কুশপুতুল পোড়ানো হবে। অথচ এইসব কথাও লেখা আছে এম এন রায়ের দ্য হিস্টোরিক্যাল রোল অফ ইসলাম বইতে—যেটা ইসলামের পক্ষে লেখা হলেও খুবই ভাসা-ভাসা। সংক্ষেপে বললে, এখনকার দিনে কেউ এইটুকুও লিখতে পারবে না। শুধু সৌভাগ্য এই যে, মানুষ পুরোনো বই পড়ে না বলেই সেগুলো এখনও টিকে আছে।
- খোমেইনীর ফতোয়ার আসল ব্যাপার হল—এটি সফল হয়েছে। এটি গোটা দুনিয়ার লেখক আর গবেষকদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে। আর হাসানের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ উঠেছিল, সেটাও সফল হবে। একজন মুসলিম গবেষক ওইটুকু কথা বলতেই তিন বছর লেগে গেছে। এখন আর একজন ওই কথার অর্ধেক বলতে গেলেও তার দ্বিগুণ সময় লাগবে।
- আর এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী তথাকথিত ‘উদারপন্থী’ আর ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ লোকজন। একজন বিশিষ্ট ভাষ্যকার পর্যন্ত লিখেছেন—“আমরা তখন রুশদির বই নিষিদ্ধ করার পক্ষেই ছিলাম, কারণ জানতাম এতে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে।”
এই "সতর্কতা"ই কি মৌলবাদীদের আরও উৎসাহ দেয় না? তারা তো এখন এটাই করে—প্রতিবারই হুমকি দিয়ে তাদের দাবি আদায় করে নিচ্ছে।- অরুণ শৌরী: দ্য পয়েন্ট উই অলওয়েজ ইভেড (১৮ মার্চ ১৯৯২, দ্য অবজারভার অফ বিজনেস অ্যান্ড পলিটিক্স), উদ্ধৃত করেছেন সীতা রাম গোয়েল (সম্পাদক), ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন: সেক্যুলার থিওক্রেসি ভার্সেস লিবারাল ডেমোক্রেসি (১৯৯৮)[৩]
- উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের কথা বলা যায়। ১৯৯১ সালের ৩১ অক্টোবর, পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ইসলামিক আদালতের পাঁচজন বিচারকই রায় দেন যে, রসূলকে অপমানের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, জেল নয়—যেমনটা প্রচলিত দণ্ডবিধিতে বলা ছিল। কিন্তু ভারতে, যেখানে শরিয়ত আইন কার্যকর নয়, কিন্তু মুসলিম মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে ইসলাম বা নবী সম্পর্কে যেকোনও সমালোচনামূলক আলোচনা 'ভদ্রতাহীন' বলে ধরা হয়। এটা 'অধর্মনিরপেক্ষ', আদর্শিক শালীনতা থেকে বিরাট বিচ্যুতি। এই ধরনের সমালোচনামূলক লেখা সাধারণত বাদ দেওয়া হয়, প্রয়োজনে নিষিদ্ধও করা হয়।
- রাম স্বরূপ, সোর্ডস টু সেল এ গড (১৬ জুন ১৯৯২, দ্য টেলিগ্রাফ), উদ্ধৃত করেছেন সীতা রাম গোয়েল (সম্পাদক), ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন: সেক্যুলার থিওক্রেসি ভার্সেস লিবারাল ডেমোক্রেসি (১৯৯৮)[৪]
- মুসলিমদের দাবির কি কোনও সীমা নেই? ধর্মের নামে তারা যা খুশি দাবি করবে আর তা মেনে নিতে হবে? কেন রাজনীতিকদের সবসময় অল্প শিক্ষিত কিছু মৌলবির চিৎকারে মাথা নিচু করে ফেলতে হবে? সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের শিবসেনা সরকার মুসলিম চাপের কাছে মাথা নত করে মণি রত্নমের বম্বে চলচ্চিত্রর মুক্তি স্থগিত করল। চলচ্চিত্রটি এক হিন্দু-মুসলিম বিবাহ আর সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিরুদ্ধে শান্তির জয়গাথা। কিন্তু চলচ্চিত্র দেখার পর তারা এমন কিছু আপত্তির তালিকা দিল যেগুলো একেবারেই হাস্যকর, অন্তত আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ দেশে তো তাই হবার কথা। শোনা যাচ্ছে তারা আপত্তি করেছে, শেষ দৃশ্য নিয়ে—যেখানে মুসলিম মেয়ে তার হিন্দু স্বামীর সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছে হাতে কোরআন নিয়ে। তাদের মতে এটা খারাপ, কারণ এতে বোঝানো হয়েছে এই বিয়েটা ইসলাম সমর্থন করে। আবার প্রথম দৃশ্যেও আপত্তি—এক নারী তার বোরখা মুখ থেকে সরাচ্ছেন।... এমনকি আপত্তি উঠেছে এই দেখানো নিয়ে যে এক হিন্দু পরিবারকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। অথচ একই চলচ্চিত্রয় এক মুসলিম পরিবারকেও একইভাবে হত্যা করতে দেখা যায়—যেমনটা ১৯৯২ সালের ভয়াবহ দাঙ্গায় সত্যিই ঘটেছিল। কিন্তু আমাদের মুসলিম আপত্তিকারীরা সেই অংশটা এড়িয়ে যাচ্ছেন।
- তাভলীন সিং: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, নয়াদিল্লি, ১৬ এপ্রিল ১৯৯৫, প্যাম্পারিং দ্য মাইনরিটি ইগো, উদ্ধৃত করেছেন টাইম ফর স্টক টেকিং, হুইদার সংঘ পরিবার? (১৯৯৭), সীতা রাম গোয়েল সম্পাদিত।
- রাম স্বরূপ, যিনি এখন সত্তরের কোঠায়, প্রথম সারির একজন পণ্ডিত।… তার দেওয়া তথ্যে কেউ কখনও যুক্তিসঙ্গত ভুল ধরতে পারেনি, কিন্তু অনেকেই তার ব্যক্তিত্ব ও লেখাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছেন। ফলে তার গবেষণা এখন আর শুধু গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়, তা পরিণত হয়েছে একপ্রকার সতর্কবার্তায়।… এই ধরনের দমনই আমাদের এমন জায়গায় এনে ফেলেছে, যেখানে বৌদ্ধিক অনুসন্ধান স্তব্ধ, আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য বিশ্লেষণ বা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ নেই, আর যার ফলে কোনো সংলাপও গড়ে ওঠে না।… এই ধরনের দমনই প্রতিক্রিয়া জন্ম দেয়। (…) “অভিব্যক্তির স্বাধীনতা যা বৈধ এবং সংবিধানে সুরক্ষিত,” গত বছর সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছিল, “তা কোনো অসহিষ্ণু গোষ্ঠী বা ব্যক্তির দ্বারা জিম্মি হয়ে পড়তে পারে না।” বলেছিল আদালত মিছিল, প্রতিবাদ বা সহিংসতার হুমকির মুখে এই স্বাধীনতা খর্ব করা “আইনের শাসনের একেবারে অস্বীকার এবং ব্ল্যাকমেইল ও ভীতিপ্রদর্শনের কাছে আত্মসমর্পণ”।
- রাম স্বরূপের একটি বই নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে অরুণ শৌরী: ফোমেন্টিং রিঅ্যাকশন (৮ নভেম্বর ১৯৯০), উদ্ধৃত: ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন – সেক্যুলার থিওক্রেসি ভার্সেস লিবারাল ডেমোক্রেসি (১৯৯৮, সম্পাদনায় সীতা রাম গোয়েল) [৫], যেখানে ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
- আমরা কি অনুধাবন করতে পারি, সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস বইটি নিয়ে তাড়াহুড়ো করে জারি করা নিষেধাজ্ঞা কত বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছিল?… যখন সরকার এই উন্মাদনার কাছে এত সহজে নতি স্বীকার করল, তখন হিন্দুদের মধ্যে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হল—ধর্মনিরপেক্ষতা মানে আসলে মুসলিম তোষণের আরেক নাম।
- বীর সাংভি: লিবারাল ফার্স্ট, সেক্যুলার সেকেন্ড, রবিবার, ২৭.২.১৯৯৪, উদ্ধৃত করেছেন কোনরাড এলস্ট, ডিকলোনাইজিং দ্য হিন্দু মাইন্ড: আইডিয়োলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অফ হিন্দু রিভাইভালিজম (২০০১), নয়াদিল্লি: রূপা, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩
- ভারতের সংবিধান ‘অভিব্যক্তির স্বাধীনতা’র সাথে একটি সীমাবদ্ধতার তালিকা সরাসরি যুক্ত করে। এই তালিকায় এমন অভিব্যক্তিও রয়েছে, যা ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতায় হস্তক্ষেপ করে…
- রবার্ট ট্র্যাগার, ডোনা লি ডিকারসন, ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন ইন দ্য ২১স্ট সেঞ্চুরি
মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করা আইন সম্পর্কে
[সম্পাদনা]- ১৯১৫ সালের দিকে পরিস্থিতির বদল ঘটতে শুরু করে। আর্য সমাজের প্রচারক ধর্মবীরের বিরুদ্ধে একটি মামলার রায় তার বড় উদাহরণ। তাঁকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়—ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিম শ্রোতাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য। পাশাপাশি, ১৫৩ ধারায়ও দোষী সাব্যস্ত করা হয়—যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অভিযোগে প্রযোজ্য। ধর্মবীর এক প্রকাশ্য বক্তৃতায় ইসলাম ধর্মের সমালোচনা করেছিলেন, যার পরে কিছু মুসলিম একাধিক আর্য সমাজ বক্তাকে মারধর করে। এই ঘটনায় দশজন মুসলিম দাঙ্গার অভিযোগে সাজা পেলেও, প্রশাসনের মনে হয়েছিল ধর্মবীরকেও শাস্তি দেওয়া দরকার। ফলে আর্য সমাজের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং এমন একজন বিচারক নিযুক্ত হন যিনি দোষী সাব্যস্ত হওয়া নিশ্চিত করতে পারেন। এই মামলায় ধর্মবীরকে দোষী প্রমাণ করতে হলে ধর্মীয় বিতর্ককে ঘিরে এক নতুন আইনি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হয়। বিচারক বলেন, "যুক্তি দিয়ে কেউ ধর্ম বদলায় না"; ধর্মবীর বুঝতে পারেননি যে "যুক্তি দিয়ে কারও আত্মার মুক্তি হয় না, কারণ ধর্ম গড়ে ওঠে আবেগ-অনুভূতির ওপর।" এই যুক্তিতে বিচারক সিদ্ধান্ত দেন—ধর্ম যখন আবেগের বিষয়, তখন তা নিয়ে বিতর্ক মানেই উত্তেজনা তৈরি হবে, আর তা থেকে দাঙ্গা বাধবেই। তাই ধর্ম নিয়ে যুক্তি-তর্কের কোনো মূল্য নেই, বরং তা বিপজ্জনক। এর মানে দাঁড়ায়, ধর্ম নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক করা মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং তা ইচ্ছাকৃত উসকানি এবং ঘৃণা ছড়ানোর কাজ, যেটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না।
- ধর্মীয় অনুভূতি আর সহিংসতার মধ্যে যে যোগসূত্র তৈরি হয়েছে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারায়, তা শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার চিন্তা থেকেই আসেনি; বরং এর পেছনে ছিল ধর্মান্তরের সমালোচনার প্রতি এক সন্দেহভাজন দৃষ্টিভঙ্গিও। এই ধারাটি তৈরি করা হয়েছিল যাতে আর্য সমাজের মতো ধর্মান্তরের সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় সমালোচনাকে আইনি পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
- ১৯২৭ সালে ২৯৫ক ধারা চালু করা হয় যাতে কথা বা লেখার মাধ্যমে "ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত" দেওয়ার অভিযোগে আরও সহজে মামলা করা যায়। এই ধারার উদ্দেশ্য ছিল উস্কানিমূলক ভাষণ নিয়ন্ত্রণ করে ধর্মীয় হিংসা ঠেকানো। কিন্তু বাস্তবে এই আইন এক ভিন্ন কৌশলগত পরিবেশ তৈরি করল—এখন কেউ যদি দেখাতে পারে যে তার ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং এর ফলে শান্তি বিপন্ন হচ্ছে, তবে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। ফলে এই ধারা ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করল। আবারও বলা যায়, ২৯৫এ ধারায় অনুভূতি ও সহিংসতার যে সম্পর্ক গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তা শুধু শৃঙ্খলা-ভঙ্গের ভয় থেকেই আসেনি; বরং এটি ছিল ধর্মান্তরের প্রচারের বিরোধিতারই এক রূপ। এই ধারাটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যাতে আর্য সমাজের মতো সংস্থার ধর্মীয় সমালোচনা আইনি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা যায়।
- বিচারক মনে করেছিলেন, যেহেতু ধর্ম "আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত", তাই ধর্ম নিয়ে যুক্তি-তর্ক করলেই দাঙ্গা বাধতে পারে—এবং সেটাই ধর্মীয় বিতর্কের একমাত্র পরিণতি। তিনি বলেন, ধর্ম নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন এবং অযৌক্তিক। যুক্তিবাদী বিতর্কের অধিকার ধর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ধর্ম নিয়ে বিতর্কে নামা মানে ইচ্ছাকৃত উসকানি এবং ঘৃণা ছড়ানো—এবং তাই এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
- ভারতে ধর্ম নিয়ে সহনশীলতা মানে ধর্মের সমালোচনা না করা—এই ধারণাটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে খুবই প্রচলিত। কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই জুড়ে আছে একটি অনুমান—যে পক্ষ সমালোচনার শিকার হবে, তারা সহিংস প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে পারবে না। এর ফলে সহিংসতাকে একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে মূল্য দেওয়া হয়েছে—প্রমাণ করার জন্য যে তাদের অনুভূতি সত্যিই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
- ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত পেয়েছে এই দাবিতে যদি পরিকল্পিত সহিংসতাকে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে যে আইন এই ধরনের সহিংসতা আটকাতে বানানো হয়েছিল, তা বরং উল্টো ফল দিয়েছে বলা যায়।
- ধর্মীয় বিতর্ক নিষিদ্ধকারী আইন সম্পর্কে ক্যাসি অ্যাডকক। ভায়োলেন্স, প্যাশন, অ্যান্ড দ্য ল’ : এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ সেকশন ২৯৫এ অ্যান্ড ইটস অ্যান্টিসিডেন্টস (২০১৬), জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ রিলিজিয়ন, পৃষ্ঠা ১–১৫ (উদ্ধৃত কোনরাড এলস্ট, হিন্দু ধর্মা অ্যান্ড দ্য কালচার ওয়ার্স, ২০১৯, নয়াদিল্লি : রূপা, অধ্যায়: ইন ফেভার অফ ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন)
- এই আইন আসলে তৈরি হয়েছিল মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয় এমন বই নিষিদ্ধ করার জন্য। হিন্দুদের কণ্ঠ রোধ করতেই এটি আনা হয়। ২৯৫এ ধারা হিন্দুরা তৈরি করেনি, এটি হিন্দুদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশরা—ইসলামকে সমালোচনার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। যেমন বলা হয়েছে: "১৯২৭ সালে, মুসলিম সমাজের চাপেই ব্রিটিশ রাজ ঘৃণাত্মক বক্তব্য আইন ২৯৫ (ক) চালু করে।”... এই আইন চালুর পেছনে কারণ ছিল—আর্য সমাজের নেতাদের ধারাবাহিক হত্যা। তারা ইসলাম নিয়ে তীব্র সমালোচনা করতেন। শুরু হয় ১৮৯৭ সালে, পণ্ডিত লেখরামকে এক মুসলমান হত্যা করেন, কারণ তিনি ইসলাম নিয়ে সমালোচনামূলক বই লিখেছিলেন। এরপর ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরে খুন হন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ—তিনি ছিলেন হিন্দু সংস্থান, সেভিয়ার অফ দি ডাইং রেস্ (১৯২৬)–এর লেখক, যা সাভারকরের হিন্দুত্ব (১৯২৪)–এর সঙ্গে মিলে হিন্দু জাগরণের অন্যতম ভিত্তি ছিল। তবে এই হত্যার কারণ ছিল—তিনি এক মুসলিম পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন যারা ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু হয়েছিল। এই সময়ে আরেকটি বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে—মহম্মদের যৌন জীবন নিয়ে লেখাবইরঙ্গিলা রসুল–এ, যার অর্থ প্রায় "প্লেবয় মহম্মদ"। এটি ছিল একটি মুসলিম পুস্তিকার প্রতিক্রিয়া, যেখানে সীতাকে পতিতা বলা হয়েছিল। এই বইয়ের জন্য রাজপালকে ১৯২৯ সালে হত্যা করা হয়।
- বর্তমান সময়ে ২৯৫ক ধারার প্রভাব দেখে যেকোনো বিবেকবান গবেষক অনায়াসেই এই নিঃসন্দেহে স্বৈরাচারী ও অধর্মনিরপেক্ষ আইনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবেদন করতে পারেন।
- স্বামী শ্রদ্ধানন্দের হত্যাকাণ্ডের পরেই ব্রিটিশ শাসকেরা তাদের দীর্ঘদিনের মনোভাবকে আইনে রূপ দেন: “১৯২৭ সালে, ২৯৫এ ধারা প্রণীত হয়, যাতে মৌখিক বক্তব্যে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার ঘটনাগুলো সহজেই শাস্তিযোগ্য হয়।” শুধু হত্যাকারীকেই শাস্তি দেওয়া হয়নি, শ্রদ্ধানন্দকেও যেন একপ্রকার শাস্তি দেওয়া হয়—মরণোত্তর, অতীতকে লক্ষ্য করে।
- ওয়েন্ডি ডোনিগার এবং যারা অ্যামেরিকান অ্যাকাডেমি অব রিলিজিয়নের জার্নালে ২৯৫ক ধারার উৎস ও তাৎপর্য নিয়ে লিখেছেন, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। লেখকদের কেউই জানাননি যে এই আইনের জন্ম হয়েছিল একতরফা ধারাবাহিক সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে—অর্থাৎ মুসলমানদের হাতে আর্য সমাজের নেতারা খুন হচ্ছিলেন। কেউই এটিকে মুসলমান সমাজকে তুষ্ট করার পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেননি। অনন্তানন্দ রামবচন বরং উল্টো দাবি করেন, “আক্রমণকারী পক্ষ ছিল আর্য সমাজ”... যেক্ষেত্রে হিন্দুরা ভুক্তভোগী হন সেখানে ওয়েন্ডি ডোনিগার-সহ বহু মার্কিন ভারতবিদগণ সবসময় ধর্মীয় বৈষম্যকে মেনে নিয়েছেন। তারা তখনই আপত্তি জানান, যখন হিন্দুরা নিজেরাই কিছু বলার বা করার চেষ্টা করে।
- ধারা ২৯৫ক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে, উদ্ধৃত: কোনরাড এলস্ট, হিন্দু ধর্মা অ্যান্ড দ্য কালচার ওয়ার্স (২০১৯), নয়াদিল্লি : রূপা, অধ্যায়: ইন ফেভার অফ ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন (অ্যাডকককে উদ্ধৃত করে)
- ২৯৫এ ধারা হিন্দু সমাজের সৃষ্টি ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া আইন, যার লক্ষ্য ছিল ইসলামকে সমালোচনা থেকে রক্ষা করা। এই ধারার পেছনে কারণ ছিল ১৮৯৭ সালে পণ্ডিত লেখরামের হত্যা—একজন মুসলিম তাঁকে খুন করেন, কারণ লেখরাম ইসলাম-বিরোধী একটি বই লিখেছিলেন। যদিও ব্রিটিশরা খুনিকে শাস্তি দিয়েছিল, একই সঙ্গে তারা লেখরামকেও মরণোত্তরভাবে শাস্তি দেয়—তাঁর লেখা ও বক্তব্যের মাধ্যমে। [...] এই কারণেই দাবি ওঠে বই নিষিদ্ধ করার এই ধরনের আইন—যেমন ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫এ এবং দণ্ডপ্রক্রিয়া বিধির ১৫৩এ—বাতিল করার। এই আইনগুলো হিন্দুরা করেনি, হিন্দু স্বার্থে করা হয়নি। বরং এই ধারাগুলোর মাধ্যমে হিন্দুদের মুখ বন্ধ রাখতে চাওয়া হয়েছে, যাতে তারা খ্রিস্টধর্ম কিংবা ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে।
- কোনরাড এলস্ট, অন মোদি টাইম: মেরিটস অ্যান্ড ফ্লজ অফ হিন্দু অ্যাক্টিভিজম ইন ইটস ডে অফ ইনকামবেন্সি – ২০১৫ (অধ্যায় ১১, ১২)
- পশ্চিমে ধর্মনিরপেক্ষতা যখন আইন হয়ে উঠছিল, তখন সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জুড়ে ছিল ধর্মের তীব্র সমালোচনার অধিকার। ধর্মকে পথে নামিয়ে আনা হয়, একে দেখা হয় একটি সাধারণ মানবিক সৃষ্টি হিসেবে—যা ভুল হতে পারে এবং সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু ভারতে ঠিক উল্টো চিত্র। এখানকার তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষরা ২৯৫ক ধারার প্রয়োগ নিয়ে খুশি, কারণ এটি ধর্মীয় সমালোচনাকে নিষিদ্ধ করে—তবে ব্যতিক্রম তখনই, যখন হিন্দুধর্ম নিয়ে কেউ সমালোচনা করে। এই কারণেই অ্যামেরিকান অ্যাকাডেমি অব রিলিজিয়নের (এএআর) পণ্ডিতরা, ভারতের সেকুলার বন্ধুদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে, কখনও সংখ্যালঘু-চালিত সেন্সরশিপ নিয়ে মুখ খোলেন না; কিন্তু ডোনিগারের ঘটনাকে বড় করে দেখান।
- কোনরাড এলস্ট, হিন্দু ধর্মা অ্যান্ড দ্য কালচার ওয়ার্স (২০১৯), নয়াদিল্লি : রূপা
- ভারতে মুসলিম সমাজ বহুবার ১৫৩ক ও ২৯৫ক ধারার আশ্রয় নিয়েছে, যাতে কেউ তাদের ধর্মবিশ্বাস বা বিশেষ করে নবীকে নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে না পারে। অনেক প্রকাশনা, যেখানে ইসলামের নবী বা অন্যান্য পূজিত ব্যক্তিদের কথা ও কাজ নিয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ছিল, তা ৯৫ ধারায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে—প্রচণ্ড চাপ ও অনেক সময় হিংসাত্মক প্রতিবাদের কারণে। অথচ তখন কেউ ভাবেননি, যে একই আইন একদিন তাঁদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন নিষিদ্ধ করার জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে।
- সীতা রাম গোয়েল, দ্য ক্যালকাটা কোরআন পিটিশন (১৯৮৬)
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় ভারতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।