ভালেন্তিনা তেরেসকোভা
অবয়ব
ভালেন্তিনা ভ্লাদিমিরোভনা তেরেসকোভা (জন্ম: ৬ মার্চ ১৯৩৭) একজন রুশ প্রকৌশলী, রাশিয়ার স্টেট ডুমার সদস্য এবং সাবেক সোভিয়েত মহাকাশচারী। তিনি মহাকাশে যাওয়া প্রথম নারী, যিনি ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন ভস্টক ৬ মহাকাশযানে একাকী মিশন সম্পন্ন করেন। তিনি পৃথিবীকে ৪৮ বার প্রদক্ষিণ করেন, প্রায় তিন দিন মহাকাশে কাটান, এবং একক মহাকাশ মিশনে অংশগ্রহণকারী একমাত্র নারী হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন। এছাড়া তিনি ভস্টক কর্মসূচির সর্বশেষ জীবিত মহাকাশচারী। তার মহাকাশযাত্রার সময় বয়স ছিল ২৬ বছর, যা আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী (১০০ কিলোমিটার উচ্চতা) মহাকাশে যাওয়া সর্বকনিষ্ঠ নারীর রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া তিনি পৃথিবীর কক্ষপথে ভ্রমণকারী সর্বকনিষ্ঠ নারীও বটে।



উক্তি
[সম্পাদনা]- "আমার যদি টাকা থাকত, মঙ্গল গ্রহে উড়ে বেড়াতে পারতাম... এটা ছিল প্রথম মহাকাশচারীদের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন সত্যি করতে পারলে ভালো হত! আমি ফিরে না এসে উড়ে যেতেও প্রস্তুত!"
- "নারীরা বিশ্ব সম্প্রদায়ে যে বিশাল ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমার মহাকাশযাত্রা ছিল নারীর এই অবদান চালিয়ে যাওয়ার আরও একটি প্রেরণা।"
- "আমরা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করতাম, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে... আমাদের মধ্যে এক অটুট বন্ধন, এক অম্লান অন্তরঙ্গতা ছিল—যা সময়ের স্রোতেও ম্লান হয়নি।" (১৯৬৩ সালের মহাকাশ মিশনে অংশ নেওয়া পাঁচ নারীর প্রসঙ্গে)... "আমেরিকান হোক কিংবা এশীয়, মহাকাশ থেকে পৃথিবীর যে কেউ এই নৈসর্গিক দৃশ্য দেখেছে, সবার কথাই এক: পৃথিবী কী অপরূপ! আর এই নীলাভ সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব। মানুষের কর্মকাণ্ড, অগ্নিকাণ্ড, যুদ্ধের দাবানলে জর্জরিত আমাদের গ্রহকে বাঁচাতেই হবে... মহাকাশে থাকাকালীন মনে হয়, পৃথিবী যেন শৈশবের সেই দোলনা—তারই জন্য মন কাঁদে। ফিরে এসে শুধুই ইচ্ছা জাগে মাটিতে নেমে এই গ্রহকে বুকে টেনে নেওয়ার... মানুষের উচিত নয় যুদ্ধে সম্পদ নষ্ট করা।"
- "মানুষের সাথে দেখা করা, সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মহাকাশ সম্পর্কে তাদের জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি... এটি আস্থা বাড়াতে পারে, যা আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন... নেতাদের উপরই অনেক কিছু নির্ভর করে... পুতিন এমন একটি দেশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন যা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কিনারায় ছিল; তিনি এটিকে পুনর্গঠিত করেছেন এবং আমাদের আবার আশা দিয়েছেন। মানুষ তাঁর উপর বিশ্বাস রাখে... তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করা হয়, মানুষ কীভাবে সাড়া দেয়, তা দেখলেই বোঝা যায়। তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।"
- "একটি পাখি শুধুমাত্র একটি ডানা নিয়ে উড়তে পারে না। নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মানবজাতির মহাকাশযাত্রাও আর অগ্রগতি লাভ করতে পারে না... রাশিয়ায় নারীরা রেলওয়ে শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে পারলে, মহাকাশে উড়তে পারবে না কেন?"
- "আমি প্রস্তাব করছি, হয় রাষ্ট্রপতির মেয়াদসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়া হোক, অথবা বিলের কোনো ধারায় এই বিধান যুক্ত করা হোক যে হালনাগাদ সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর বর্তমান রাষ্ট্রপতি, যেকোনো সাধারণ নাগরিকের মতোই, রাষ্ট্রপ্রধানের পদে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রাখবেন... কৃত্রিম কাঠামো গড়ে তোলা কেন? সবকিছুই হতে হবে সৎ ও স্বচ্ছভাবে... আমাদের হয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসংখ্যার সীমাবদ্ধতা অপসারণ করতে হবে, অথবা (পরিস্থিতির দাবি থাকলে, এবং সর্বোপরি জনগণ চাইলে) হালনাগাদ সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান রাষ্ট্রপতির পুনর্নির্বাচনের সুযোগ আইনে সন্নিবেশিত করতে হবে... আমাকে এই প্রস্তাব আনতে রাজনৈতিক মহল নয়, সাধারণ মানুষই অনুরোধ করেছেন।"
তার সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- "সোভিয়েত সমাজব্যবস্থার সাফল্যে এক কৃষককন্যার উত্থান তাকে সোভিয়েত নারীদের আদর্শে পরিণত করেছিল। মহাকাশস্যুটে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল প্রতিকৃতি এক জীবন্ত প্রতীকে রূপ নিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি পুতিন মস্কোর নিকটবর্তী তাঁর বাসভবনে তেরেসকোভাকে জন্মদিনে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, 'আজকের পুনরুজ্জীবিত রাশিয়ার জন্য আপনার সেই অভিযান এখনও অনুপ্রেরণার মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে।' তিনি যোগ করেন, 'এই মহাকাশযাত্রা কেবল অতীতেই নয়, ভবিষ্যতেও সোভিয়েত ও রুশ জনগণের গৌরবের প্রতীক হয়ে থাকবে'—এ কথা বলার সময় তেরেসকোভার কালো পোশাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নায়কের স্বর্ণালংকার ঝলসে উঠছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি প্রায় জনদৃশ্য থেকে মুছে গিয়েছিলেন। বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি স্বল্পপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ফোরাম পরিচালনার পাশাপাশি এতিমদের সহায়তায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিয়োজিত তিনি। তাঁর ভাষ্যে, 'জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশসেবায় নিবেদিত থাকব।'
- মহাকাশের প্রথম নারী: মঙ্গলগ্রহে উড়ানের স্বপ্ন, রয়টার্স (৬ মার্চ ২০০৭)
- "মহাকাশে থাকাকালীন তেরেসকোভা সরাসরি খ্রুশ্চেভের সাথে সংযোগ স্থাপন করে জানান, 'সমস্ত ব্যবস্থা নিখুঁতভাবে কাজ করছে' এবং তিনি 'চমৎকার' বোধ করছেন। খ্রুশ্চেভ উত্তরে বলেন, " ভালেন্তিনা, আমি গর্বিত যে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক কন্যা প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশে পৌঁছালেন এবং এমন অগ্রগামী প্রযুক্তি পরিচালনা করলেন।'
"১৯৬৩ সালের ১৬ জুন তেরেসকোভা প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশে পাড়ি দেন। তিনি প্রায় তিন দিনে পৃথিবীকে ৪৮ বার প্রদক্ষিণ করেন। তাঁর কল সিগন্যাল ছিল 'সিগাল'। ভস্টক-৬ উৎক্ষেপণের মুহূর্তে তিনি আনন্দে ডেকে উঠেছিলেন, 'ও আকাশ! টুপি খুলে নাও, আমি আসছি!' এই ঘটনা ঘটে মার্কিন-সোভিয়েত মহাকাশ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে।"
- "ভালেন্তিনা তেরেসকোভা মহাকাশে ৭০ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন, পৃথিবীকে ৪৮ বার ঘুরে দেখেছিলেন। সোভিয়েত ও ইউরোপীয় টেলিভিশনে তাঁর হাসিমাখা মুখ আর ভেসে বেড়ানো লগবুকের দৃশ্য সম্প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু কেউই জানত না, এই অভিযান প্রায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল—এ সত্য চাপা দেওয়া হয়েছিল প্রায় চার দশক ধরে... মহাকাশযানের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় একটি ভুলের কারণে যানটি ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। তেরেসকোভা এই অসঙ্গতি ধরতে পেরে বিজ্ঞানীদের সতর্ক করেন। তাঁরা জরুরি ভিত্তিতে নতুন একটি অবতরণ পদ্ধতি তৈরি করেন। অবশেষে তিনি নিরাপদে মাটি স্পর্শ করলেও মুখে একটি কালশিটে দাগ পড়ে যায়। তাঁর অবতরণস্থল ছিল আলতাই অঞ্চল, যেটি বর্তমান কাজাখস্তান-মঙ্গোলিয়া-চীন সীমান্তের কাছাকাছি। স্থানীয় গ্রামবাসীরা তাঁকে মহাকাশস্যুট থেকে মুক্ত করে আতিথেয়তার সাথে রাতের খাবারে ডাকেন। নিয়ম ভেঙে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করায় পরবর্তীতে তাঁকে শাসানও শুনতে হয়—কারণ চিকিৎসকীয় পরীক্ষা ছাড়াই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে এর পরেও তাঁর সম্মান কমেনি: সোভিয়েত ইউনিয়নের নায়ক খেতাব, অর্ডার অব লেনিন, এবং স্বর্ণ তারকা পদক পান তিনি। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেন এবং জাতিসংঘের কাছ থেকে শান্তি পদক অর্জন করেন।"
- ভালেন্তিনা তেরেসকোভা: মহাকাশজয়ী প্রথম নারী, টিম শার্প, স্পেস.কম (২২ জানুয়ারি ২০১৮)
- দলের অনেক নারীই ভালেন্তিনা তেরেসকোভাকে একজন আন্তরিক বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। *"তিনি সর্বদাই আমাদের স্বার্থ নিয়ে কর্তৃপক্ষের সামনে সোচ্চার হতেন। উদাহরণস্বরূপ, প্রশিক্ষণের শুরুতে আমরা যেন কাঁটাতারের বেড়ার ভেতর বন্দীর মতো থাকতাম। মস্কোর কাছেই থাকলেও শুধুমাত্র মস্কোবাসীদেরই পরিবারের সাথে দেখা করতে ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার অনুমতি ছিল," স্মৃতি তাড়িত হয়ে বললেন ঝান্না ইয়র্কিনা। "আমি আর ভালেন্তিনা একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে মস্কো যাওয়ার আবেদন করলাম। কর্তারা জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন? কী কিনতে চাও?' একদিন ভালেন্তিনা আত্মসংবরণ হারিয়ে বলে উঠলেন, 'অন্তর্বাস! সেটাই কিনতে চাই!' সেই ভুলভ্রান্তি থেকেই আমাদের অনুমতি মিলল।"
- "উৎক্ষেপণের দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, কিছু নারী অনুভব করতে শুরু করেছিলেন যে তাঁদের নির্বাচিত করা হবে না। ভালেন্তিনা তেরেসকোভা তখন সবার নজর কেড়েছিলেন, এবং শীঘ্রই সরকারি ঘোষণা আসে—মহাকাশযাত্রার দায়িত্ব পাবেন তিনিই... সোভিয়েত আদর্শের প্রতীক হিসেবে একজন শ্রমিক-পরিবারের মেয়েকে বেছে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করা হয়েছিল, কার্য্যালয়কর্মী পরিবারের কাউকে নয়। এছাড়া, অভিযান-পরবর্তী বৈশ্বিক গণমাধ্যমের সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন ছিল একজন মুখর ও আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব।"
- "১৯৬৩ সালের ১৬ জুন, সোভিয়েত মহাকাশচারী ভালেন্তিনা তেরেসকোভা সীমানা ভেঙে একাধিক রেকর্ড গড়েছিলেন—যা আজও অক্ষত... তাঁর জন্মের সময় বাবা-মা উভয়ই কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাবা ভ্লাদিমির তেরেসকোভ ছিলেন ট্র্যাক্টর চালক। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে নিহত হন, যখন ভালেন্তিনার বয়স তিন বছরও হয়নি... ভালেন্তিনা ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে একটি টায়ার কারখানায় প্রথম চাকরি শুরু করেন। কিছুদিন পরই বস্ত্রশিল্প কারখানায় কাজে যোগ দেন। এর মধ্যেও তিনি মস্কোর হালকা শিল্প প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের সাথে চিঠিপত্রের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং ১৯৬০ সালে স্নাতক হন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তাঁর প্রিয় শখ স্কাইডাইভিং চালিয়ে যান। এই বিষয়ে তাঁর নেশা এতটাই তীব্র ছিল যে, মাত্র ২২ বছর বয়সে প্রথম স্কাইডাইভিং করার পরই তিনি প্রতিযোগিতামূলক স্তরে পৌঁছে যান। প্রাথমিক দিনগুলোতে তিনি এই শখ পরিবারের কাছেও গোপন রাখতেন।"
- "ভালেন্তিনা তেরেসকোভা ছিলেন মহাকাশে পৌঁছানো প্রথম নারী। তাঁর প্রথম ও একমাত্র কক্ষীয় অভিযানে তিনি পৃথিবীকে ৪৮ বার প্রদক্ষিণ করেন, মহাকাশে কাটান ২ দিন ২২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট। তিনিই একমাত্র নারী যিনি একাকী বায়ুমণ্ডলের বাইরে পাড়ি দিয়েছেন, এবং মাত্র ২৬ বছর বয়সে মহাকাশে যাওয়া সর্বকনিষ্ঠ নারী হিসেবে তাঁর রেকর্ড আজও অক্ষত।"
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় ভালেন্তিনা তেরেসকোভা সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।
উইকিমিডিয়া কমন্সে ভালেন্তিনা তেরেসকোভা সংক্রান্ত মিডিয়া রয়েছে।
উইকিসংকলনে ভালেন্তিনা তেরেসকোভা সম্পর্কিত একটি মৌলিক রচনা রয়েছে।