মনোজ মিত্র
অবয়ব
মনোজ মিত্র (২২ ডিসেম্বর ১৯৩৮ — ১২ নভেম্বর ২০২৪) ছিলেন একজন বাঙালি থিয়েটার, চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন অভিনেতা এবং নাট্যকার।
উক্তি
[সম্পাদনা]পূর্ণাঙ্গ নাটক
[সম্পাদনা]সাজানো বাগান
[সম্পাদনা]- নাতি! নাতি না তুমি কাঁঠালের ভূঁতি। তালের আঁটি! তুমি পোজাপতি হয়েছো!
- বাঞ্চারাম কাপালি, পৃষ্ঠা ৭
- বাঁচবো... আমি বাঁচবো?
- বাঞ্চা, পৃষ্ঠা ১১
- পেয়ে গেছি! বাগান পেয়ে গেছি! নকড়ো... আমার সুপুত্তুর, বাপের মুখ রেখেছে! হাঃ হাঃ হাঃ! চুক্তি হয়ে গেছে। আমি যা পারি নি, তুই তা পারলি। ধন্যি! ধন্যি নকড়ো! হাঃ হাঃ হাঃ! কী টোপটা ছাড়লো। মাস-মাস দুশো! ক'মাস নেবে? বড় জোর দু'মাস। এ ঘাটের মড়া শ্মশান কাঠ... তার মধ্যেই লোপাট! হাঃ হাঃ হাঃ! (বাঞ্ছারামের উদ্দেশে) শাল গায়ে দিবি? গঁড়গড়ায় তাঁমুক খাবি? (গান ধরে) চাষার মনে কত আশা চিলেকোঠায় বাঁধবে বাসা! বোঝে না বোঝে না বোকা চাষা- সবটাই গুলেভরা গুলে ঠাসা! (গান থামিয়ে) গুখেগোর ব্যাটা চাষার আশা দ্যাখো! যা, শকুনের পেটে যা... শেয়ালের পেটে যা ব্যাটা! হাঃ হাঃ হাঃ!
- প্রেতাত্মা ৺ছকড়ি দত্ত, পৃষ্ঠা ১২
- হ্যাঁ, ছেলেবেলায় দুধ তো অনেক খেয়েছে, এখন এই পঁচানব্বুই বছরে চোলাই-টোলাই ধরো।
- নকড়ি দত্ত, পৃষ্ঠা ১৫
- [উত্তেজনায় নিজের বুক ডলতে ডলতে) আমার রগে! শালা নাড়ি খুঁজছে না কৈমাছ ধরছে? আর এই হয়েছে আজকালকার ডান্তার কোবরেজ! মানুষ বাঁচবে কিনা তাও বলতে পারে না, মানুষ মরবে কিনা তারও গ্যারাণ্টি দেয় না!
- নকড়ি, পৃষ্ঠা ১৭
- বাপের মাল মা'র সামনে বসে খেয়ে গেল। দেশের কী শিক্ষাব্যবস্থা!
- নকড়ি, পৃষ্ঠা ২৬
শোভাযাত্রা
[সম্পাদনা]- চমকে উঠলে কেন! কী ভাবছ, জমিদারবাডির মানুষ বলে খাতির করবে! সে সব গল্প পালটে গেছে ভাই। আগে প্রজারা বাড়ি বয়ে ধান চাল দিয়ে যেত--এখন বর্গাদারের বাড়ি গিয়ে হাত পেতে দাঁড়াতে হয়। তারা দয়া করে কিছু দিল দিল, না হয় গালমন্দ করে ভাগিয়ে দিল। ঘেন্নায় বাবা আর এখন চাইতেও যান না। কারো সঙ্গে বেশি কথাও বলেন না। বহু পুরুষের পাপ-শাপ এই ভাবেই সব উল্টে দেয়।
- অতসী, পৃষ্ঠা ১০
- হয়...হয় যে তুমিও জানো, আমিও জানি। তবু ভাবি, হয় কেন? কেন হয়?
- অতসী, পৃষ্ঠা ১০
- না, জোড়হাত করবে না। নো, নেভার! কারো কাছে না। তুমি কিছু করোনি শঙ্খবাবু।
- মুকুল, পৃষ্ঠা ১১
- তুমি যখন এটা দুপুরবেলা বাজাবে...কতদূরে তোমার সুর ছুটে যাবে...আর যখন বিকেলবেলা লাল টুকটুকে রোদ্দুর আমাদের বাগানের মাথায় খেলা করবে...তখন যদি বাজাও...আরো দূরে ছুটবে তোমার সুর। আচ্ছা দাদা, কেউ যদি তোমায় বলে তুমি কার কাছে থাকবে, আমাদের কাছে, না দূরে চলে যাবে-তুমি কী বলবে? বলো, কী বলবে?
- ধনগোপাল, পৃষ্ঠা ১৫
- না, না-ধর্মের বাজারে কোন মন্দা নেই।
- কাকা, পৃষ্ঠা ১৭
- মগজ নেই। রথ নাড়ানোতেই আনন্দ। কে নাড়াচ্ছে, কেন নাড়াচ্ছে, কোন প্রশ্ন নেই।
- মন্মথ, পৃষ্ঠা ১৮
- মাঝে মাঝে বড় অসহায় বোধ করি উদয়।
- ধনগোপাল, পৃষ্ঠা ২৪
- পাপ! পাপ আবাব কী ! আমার পূর্বপুরুষ এতো পুণ্য করে গেছে, আমি দু'দন্ড বিশ্রাম নিতেও পারি। (রথটা দেখিযে) আমার কাছে এ কাঠেব খাঁচাটা পাপেরও না পুণ্যেরও না। কেন ওটা বছর বছর রাস্তায় বের করে টেনে বেড়াই জানো? অন্ততঃ কিছুদিন লোকে বলে, না হে, রায়েরা একেবারে মন্দ নয়। দু'চারটে ভালো কাজও করেছে। কিছুদিনেব জন্যে আমায় নিন্দেমন্দ গঞ্জনা শুনতে না হয়। আমার বাড়ি বাগান খেত খামারে ধ্বংসলীলা বন্ধ থাকে। যেন কেউ আমাকে শাসায় না,অত্যাচারী শাসক শোষক বলে না।
- ধনগোপাল, পৃষ্ঠা ৩৪
- জমিদারের বাচ্চা! জমিদার তো না! আমার বাপ চোদ্দপুরুষ কী অন্যায় করে গেছে, তার জন্যে আমি নাকে খৎ দিয়ে লোকের দোরে যাবো কেন? কই, তোমরাও তো আমায় তোমাদের একজন ভাবো না ! তোমরাও তো ধরে বসে আছো, আমি সামন্ততন্ত্রের প্রতিভূ! তাহলে বলো, এই সমাজে আমার কোনো জায়গা নেই! আমি একটা জঞ্জাল! একটা চন্ডাল! সময় যখন আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে মারে, তখন কারুর দিশে থাকে না। হাতের কাছে যা পায়...যাকে পায়...তাকেই আঁকড়ে ধরে। আঁকড়ে ধরে দাঁড়াতে চায়। আমি নদুকে পেয়েছি, নদুকেই ধরেছি...
- ধনগোপাল, পৃষ্ঠা ৪১
- সব নিভিয়ে দেব...(ছুটে গিয়ে রথের প্রদীপগুলো ফুঁ দিয়ে দিয়ে নেভায়)...এই বাড়িটা দেখলে আমার সব কেড়ে নিতে ইচ্ছে করে!...জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে ইচ্ছে করে! এদের এতো ছিল কেন, কেন ছিল এতো?
- নদু, পৃষ্ঠা ৪৪
- না না, আর রাখতে পারব না। আমার সঙ্গে জডিয়ে থাকলে ও বাড়তে পারবে না। কী করে বইব ওকে? আমি নিজে কোথায় আছি? বাড়িটার ভিত কাঁপছে, ছাত কাঁপছে। আমার সঙ্গে থাকলে এই ভাঙা বাডির নিচে ইঁদুরচাপা হয়ে মারা পড়বে!
- অতসী, পৃষ্ঠা ৪৯
- তাছাড়া দ্যাখো, আমার ঘরে কতো দীনতার মধ্যে ছিল জগন্নাথ ! আজ অনেক মানুষেব মধ্যে সে কেমন বোধ করছে,..এতো আলো...এতো বাদ্যি...এতো ফুলমালায় তাকে কেমন মানালো...সবাই তাকে মেনে নিতে পারল কিনা...দেখব না, একবার চোখে দেখব না!
- ধনগোপাল, পৃষ্ঠা ৫১
নরক গুলজার
[সম্পাদনা]- ...ধরেন নিজের দ্রব্য ছাড়া আমি তো বড় একটা চুরি করিনে ঘোড়ুইমশাই।
- মানিক, পৃষ্ঠা ৫৯
- আরে ও যমরাজ, ল্যাংচাচ্ছো নাকি?
- নারদ, পৃষ্ঠা ৬২
- নরকপুরীতে সবচেয়ে ডেঞ্জারাস এই ওয়েস্টবেঙ্গল সেল!
- চিত্রগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৬৪
- ভীতু লোকের অত ঠোঁটকাটা হতে নেই।
- ব্রহ্মা, পৃষ্ঠা ৭১
- যখন করেকম্মে খেয়েছি তখন মাইরি ছেড়ে দিয়েছ...আজ মরার পরে তেড়ে ধরেছ! তুমি মাইরি দেয়ালা জানো গুরু।
- নেংটি, পৃষ্ঠা ৭২
- (চিত্রগুপ্তকে চড় মেরে) পৃথিবী আমার চোখের বাইরে শালা! সেখানে যা হোক আমার দেখার দরকার নেই। মোটকথা আমার গায়ে ছ্যাকাটি না পড়লেই হ'লো।
- ব্রহ্মা, পৃষ্ঠা ৭৩
- (সোল্লাসে) দেশনেতা ঢুকছে, দেশনেতা ঢুকছে! জাগো...জাগো নেতা...জাগো দেশনেতা।
- চিত্রগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৭৫
- লে কি করব? কারে বলব? নইলে ঘোড়ুই আমার জমি ভোগ করে, আর আমারে বলে চোর! তার জাল কেটে বেরিয়ে আসি তো আরেকখানা জাল। শালা বাঁটুল! আমার ঠেলার দাম তোলে আমারই মুজুরি কেটে! ওদিকে গাঁয়ের ঠ্যালা...ইদিকে শওরের।
- মানিক, পৃষ্ঠা ৭৮
- অতো যার লাখ লাখ টাকার ইন্সিওরেন্স--তাকে মারা আমার কম্মো নয়!
- যম, পৃষ্ঠা ৮০
- কী করব চিতু...কী করব ! আমিই ওকে জামাজুতো পরিয়ে বাঁটুল সাজালাম...এখন আমার বাঁট আমাকে ইঁট মাবছে, ইঁট মেরে আমার ফুল্কো নুচি চুপসে দিচ্ছে! কে বুঝবে...আমার দুঃখু কে বুঝবে....(একটা রসগোল্লা খেয়ে) নিজের ঢোঁক আমি নিজে গিলতে পারছি না গো...নিজে গিলতে পারছি না...
- ব্রহ্মা, পৃষ্ঠা ৮৫
- হ্যাঁ হ্যাঁ জনমত! পথিবীর থ্রি-ফোর্থ লোক চায় ওর স্বর্গলাভ হোক। মেজরিটি যা চায় আমি তা করতে বাধ্য...ওর নাকের সিকনি খেতে বাধ্য! (যমের গালে ঠাসঠাস চড় কষিয়ে) কোনমতে তাপ্পিতুপ্পি দিয়ে, এর ধামার কাঁঠাল ওর ধামায় রেখে চালাচ্ছি...মাথামোটা হামদো গোঁয়ার...মরছি পেটের কামড়ে...বউটা কার গেছেরে ছাগল...তব না মম..তব না মম...
- ব্রহ্মা, পৃষ্ঠা ৮৮
- যদি ওজনে কম হয় আরো দশটা বিশটা গরিব এনে দেব ভগবান...বড়লোক ধরা গেল না ভগবান!
- যমদূত, পৃষ্ঠা ৮৯
- কলা নিজেরই হোক তোমারই হোক...চুরি ইজ চুরি! দুর্লভ মানব জীবনে...
- ব্রহ্মা, পৃষ্ঠা ৮৯
- না! না! আর যাবো না...আর যাবো না...আমি মরে বেঁচেছি গো!
- মানিক, পৃষ্ঠা ৮৯
- বানচাল করছে...ডিভিশন ক্রিয়েট করে মুভমেন্ট খতম করছে! ইভিয়ট! মাথায় এটা নেই, একা কি দোকা গিয়ে আমরা কেউ করে খেতে পারব না! ইউ ইউ! (পান্নার চুলের মুঠি ধরে) কী ভাবছিস! একাই ব্যবসা করবি! সবটা মধু একাই খাবি! দ্যাট ইজ নট পসিবল! নো...নেভার। এ ব্ল্যাকমার্কেটিয়ার উইদাউট এ খচো ব্যাকিং হিম, ইজ ওনলি এ ফেকলু!
- নারদ, পৃষ্ঠা ৯২
- ইয়েস! নইলে কেউ না। আমাদের একজনের প্রতিষ্ঠা নির্ভর করছে আর একজনের প্রতিষ্ঠার ওপর। এ চেন...এ লং চেন!...লিডার-জোতদার-মজুতদার-মস্তান-খচো- এ চেন...এ লং-চেন! ভাইয়ে ভাইয়ে লড়ছিস!...নে, শপথ নে। আয় এগিয়ে যাই। জয় সুনিশ্চিত, বন্ধুগণ, জয় উঁকি দিচ্ছে। আর মাত্র দু একটা দিন চালাতে পারলে বুড়ো ব্রহ্মার রাজত্ব মড়মড় করে ভেঙে পডবে। দে, দে, হাতে হাত দে ভাইসব, হাতে হাত-
- নারদ, পৃষ্ঠা ৯৩
- (গান) যে বাঁশি ভেঙে গেছে তারে কেন গাইতে বলো...
- যম, পৃষ্ঠা ৯৮
- আমায় আর কিছু বলিস না.....আমি রেজিগনেশন দিয়ে চলে যাচ্ছি..... ধর, লেটার ধর্। (পদত্যাগপত্র দিয়ে) আমার তো গদির মোহ কোনদিনই নেই।
- ব্রহ্মা, পৃষ্ঠা ৯৯
- গদির মোহ নেই! বুড়ো ভাম! গদি-গদি করে তুমি দাড়ি পাকিয়ে ফেল্লে!
- যম, পৃষ্ঠা ৯৯
- হাঃ হাঃ! যাবে তো একেবাবে যাবে.....আর ঢুকতে পাবে না। বিটলে ঘুঘু, একটা মরা আধমরা গরিব লোককে পাঠিয়েছ কাজ হাসিল করতে! জানতে না ওখানে ঘোড়ুই আছে, বাঁটুল আছে....ওখানে লক্ষ লক্ষ নেকড়ে থাবা পেতে আছে!.....এ রোগা লোকটা ওদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে!....জেনেশুনে.... স্রেফ জেনেশুনে নেকড়ের জঙ্গলে মেষশাবকটাকে পাঠালো!.....আঃ! লোকটার জন্যে আমার কষ্ট হচ্ছে!....ওহো হো, কেন এ বুকে মায়া জাগে, বেদনা হয়....কেন! কেন!
- যম, পৃষ্ঠা ৯৯
- লেখ, লেখ। জ্যান্ত শয়তানের থাবা থেকে ছেলেডারে বাঁচাতে হবে....পিথিবীরে বাঁচাতে হবে। জ্যান্ত নেকড়ের দাঁত ভাঙতে হবে।
- মানিক, পৃষ্ঠা ১০৫
- (গোরুর মুখোশটা একটু সরিয়ে, মুখ বার্ করে) ভগবান না.....বলো ভগবতী!....নারদ! তোর মনে এই ছিল! নচ্ছার পাজী.....বর্ণচোরা.... ফ্লাঙ্কেনস্টাইন! লিখলি কিনা স্বর্গ নরকে সবারই গো-জন্ম! আর কাকেই বা দোষ দেব চিতু? আমারই সই.....আমারই ব্যাঙ্ক-সই যে আমারই মুখের জিওগ্রাফি এমনি পান্টে দেবে কে জানতো!...-ক্ষুর ঘষিসনে যম...ক্ষুর ঘষিসনে.....কাঁদিস নে.....আমার সাথে অনেক করলি....এবার চল্, ঘাস খেতে চল্! ইথে ভগবানের মান যায় না রে! বিষ্ণু শুয়োর-অবতার হযে জন্মেছিল! (নরকের গোরুদের দিকে চেয়ে) এসো বৎসগণ, চলো, বাপ বেটায় সব এক মাঠে চরিগে। মোনিককে) প্রভূ, একটা রিকোয়েস্ট। গোরুর মধ্যেও আমাদের একটু স্পেশাল ট্রিটমেন্ট করো। কেননা বয়ম্ খলু অবতার গোরুম্!....ভগবান এবার গো-অবতারে মর্ত্যে যাচ্ছেন!....পথ দেখাও মা....পথ দেখাও....
- ব্রহ্মা, পৃষ্ঠা ১০৬
গল্প হেকিমসাহেব
[সম্পাদনা]- আপনের বস্তা যত বড়, মাল কিন্তু তেমন না হেকিমসাহেব।
- গঙ্গামনী, পৃষ্ঠা ১১২
- ভিতরে চল, বাইরে অচল! ....এমন জিলাবির প্যাঁচ দাওয়াই আমাদের জানা নাই মিঁয়া। পাখিটিরে তুমি মুক্তি দাও।
- হেকিমসাহেব, পৃষ্ঠা ১১৪
- জী মানুষ আসলে বোকাই। ভাব দেখায় কতো না চালাক।
- হেকিমসাহেব, পৃষ্ঠা ১৩৩
- হুজুর, রক্তগুলাব দেওয়াটা কি ঠিক হবে? মানুষের চিকিৎসায় গুলাব মিলছে না। একটি বিল্লির কবরে গুলাব ছড়ালে লোকে বলবে কী?
- মৌলবী, পৃষ্ঠা ১৩৭
- (মৌলবীকে) দেখে নিব। মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে এই তোমার চরিত্র হয়েছে। তোমার পড়ুয়া দিয়ে তোমারে ঠ্যাঙাবো-
- বক্কর, পৃষ্ঠা ১৩৮
- যে লোকটা না ডাকতেই গরিবের দোরে দোরে দাওয়াই পৌঁছে দেয়, রোগে শোকে মানুষের পাশে ছুটে যায়, সেইতো পীর পয়গম্বর যাই বলেন।
- মৌলবী, পৃষ্ঠা ১৪২
- কী করে বুঝবো রে বকরা, আমার তো শাসনও নাই শৃঙ্খলাও নাই। আমি যে ভিখারী!
- ছায়েম, পৃষ্ঠা ১৪৪
- আমি জানি তুমি আমারে ঠকাও নাই।
- হেকিমসাহেব, পৃষ্ঠা ১৪৭
- তালুকদার সাহেব আজ আবিষ্কারটি বড় নিজের বলে দাবী করেন! এ আবিষ্কারটির জন্য আমি তালুকে তালুকে আপনাদের পায়ে মাথা কুটেছি! একটি রক্তগুলাবের জন্য আমি শত শত চাবুক খেয়েছি! তখন আবিষ্কারটির কথা কারো মনে পডে নাই! আজ নিজের গায়ে ঘা ফুটতে আমি হলাম বেইমান! যান, ভাগেন, দাওয়াই নাই...
- হেকিমসাহেব, পৃষ্ঠা ১৬১
- আমি দিব না হতে বৃথা। চলেন পাত্রে জোছনা ধরব আমরা, ধরে রাখব! আকাশ দিগন্তে বিদ্যুতের ঝলকানি উঠলে, সেই ঝলকানিটিও ধরে রাখব।
- গঙ্গামনী, পৃষ্ঠা ১৬৩
দম্পতি
[সম্পাদনা]- যাবে না...যদ্দিন আমি বেঁচে আছি...কিছুতে কিছু যাবে না। সব চালাকি...সব আমার পেছনে লাগা!
- গিন্নি, পৃষ্ঠা ১৭০
- কাঠি দেবেন কেন, লাঠি ঘোরাতেন। চালিয়াত...দেশ-বিখ্যাত চালিয়াত! (দুধআলাকে) বুঝলি রামদেও, এ মেয়েকে দেখতে আসতেন...আর শেতলপারি দুধের বাটি কিনে কিনে দিয়ে যেতেন। টাকার টেম্পারেচার দেখিয়ে যেতেন। ব্যাকা একখানা লাঠি ছিলো...সেখানো আমার বাবার নাকের ডগায় এমনি এমনি ঘোরাতেন...
- কর্তা, পৃষ্ঠা ১৭২
- ও-হো-হো, আমি কুপথে যেতুম...উনি আমাকে সাত পাকে উদ্ধার করেছেন ! কতো বড় রাজপুতুরের হাতে বাবা আমায় তুলে দিয়েছিলো র্যা...
- গিন্নি, পৃষ্ঠা ১৭২
- (পাগলের মতো বিড়বিড় করে) জিতুবাবু! জিতেন থেকে জিতু!...লিখছি, এক্ষুনি বড়খোকাকে চিঠি লিখছি! বার করছি তোমার জিতু বলা! আহা জিতু-উ-উ-উ!
- কর্তা, পৃষ্ঠা ১৯১
- কাইট ফ্লাইং! মানে বৌ নিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো...ইউ মীন ঘুড়ি নিয়ে বৌ ওড়াবেন!
- ম্যানেজার, পৃষ্ঠা ১৯৪
- (হাসি) ভাবছে আমি কালা ? আরে ওই ঘটনার পর আমি যে কালা সেজে থাকি! কালা ভেবে লোকে প্রাণ খুলে তাদের গুপ্ত কথা আমার সামনে বলে যায়...আর যার যতো সিক্রেট ম্যাটার সব আমার র্যাডারে ধরা পড়ে! হ্যা হ্যা...
- ম্যানেজার, পৃষ্ঠা ১৯৪
- নিচেও যা, ওপরেও তাই। একতলায় বাবুঘাট, দোতলায় বকখালি! সাতাশ তারিখ জোড়ে-জোড়ে বকখালি গিয়েছিলো।...তার জের চলছে আজ পনেরোদিন।... এ বাড়িতে খুনোখুনি হচ্ছেই! তুমিও খুন হয়ে যেতে পারো পেল্লাদ!
- কানাই, পৃষ্ঠা ২০০
- (চিৎকার করে) ইয়েস মরো। তোমার মতো মেয়ের বাঁচার কোনো অধিকার নেই। সিন ক্রিয়েট করা হচ্ছে!...বদমাইসি করে এখন থিয়েটার হচ্ছে।
- শ্যামল, পৃষ্ঠা ২০৪
- (এতক্ষণ হাঁ হয়ে শুনছিলো, হঠাৎ ডুকরে ওঠে) আর আমার কা হবে? ও ছোড়দা, ও বড়দা, তোমরা তো মা বাবা দু'ভাগ করে ফেল্লে। আমি কোন্ ভাগে যাবো ? কত্তাবাবা গিন্নিমার কাছে থাকি সেই এতোটুকু বয়েস থেকে! আজ আমি বুড়ো হযে গেছি! তা ওরা দুজনে চললো দু'মুলুকে...কানাই, কানাই যে কোনো ভাগে নাই! ও বাবা...ও মা...
- কানাই, পৃষ্ঠা ২১৪
- সে তো হতেই পারে । লাউ, কাঁঠাল, কুমড়ো ভাগ হয়...জমিজমা ভাগ হয়...দেশ ভাগ হয়...দেশে দেশে গঙ্গার জল ভাগ হয়...মা বাপ ভাগ হবে, এতে আর কি আছে রে?
- জিতেন, পৃষ্ঠা ২১৬
- হ্যাঁ, মৃত্যু মানুষকে আলাদা করে...সে একরকম। কিন্তু এ যে জীবন-মৃত্যু! কোথায় নিউবঙ্গাইগাঁও-- কোথায় দিল্লি! যাওয়া আসার উপায় নেই! যাতায়াতের গাড়িভাড়া কি আর ওরা মঞ্জুর করবে? এর থেকে আমার মৃত্যুই ভালো ছিল।
- কর্তা, পৃষ্ঠা ২২০
কিনু কাহারের থেটার
[সম্পাদনা]- উলু দেওয়াটা যার চাকুরি, সে ঘরে দোরে হাটে মাঠে পুকুর ঘাটে উলু দেবেই!
- ঘণ্টা, পৃষ্ঠা ২৩৯
- হায় হায় হায়! তা মুখপুড়ি উদাসিনী অবিশ্যি এমন কম্মো ঢের করেছে! তার কারসাজিতে এমন চিত্রকলা অনেক ব্যাটাছেলের পিঠেই আঁকা হয়েছে! কিন্তু তোমারে সে তো চিনতে পারছে না!
- উদাসিনী, পৃষ্ঠা ২৪২
- থেটার একটা পুণ্যির জায়গা! লোকশিক্ষে হয়। বাঁদরের আড্ডাখানা নয়। বদ্যিনাথ আসরের মর্যাদা নষ্ট করেছে মাস্টার!
- বুড়ো বাজনদার, পৃষ্ঠা ২৪৪
- ইংরাজ বাহাডুর হামাকে টোমার রাজসভায় বসিয়েছে কেন? পুটনা ডেশে আইনশৃঙ্খলা টুমি বজায় রাখিটে পারিটেছ কিনা তাহার উপরে দৃষ্টি রাখিটে। টুমি যডি আইন রাখিতে ফেল করো, টোমার সিংহাসন আমি ফেলিয়া ডিবো! ফেলিযা ডিয়া হামি বসিব।
- লাটসাহেব, পৃষ্ঠা ২৪৫
- বাবা গো...মৌনীবাবা...ছাগলটা আমারে দান করো বাবা । এমন হষ্টপুষ্ট ছাগলের কালিয়া রোস্টো ভর জীবনে খাইনি গো...বাবাগো...
- ভাঁড়, পৃষ্ঠা ২৬৩
- তবে? মৌনব্রতও নেব, আবার বাক্যিও বলবো...দু'রকম তো চলে না!
- মৌনি, পৃষ্ঠা ২৬৩
- যাওয়ার পথ আমার এখনো খোলাই আছে... যতোক্ষণ ঘণ্টাকর্ণ আছে! আমার তো মনে হচ্ছে গুরুদেব এর মধ্যে জড়িত নেই। তাই নারে ঘণ্টাকর্ণ!
- রাজা, পৃষ্ঠা ২৬৬
- আইন যদি সবার জন্যে সমান হয়, বেআইনও তাই হবে লাটসাহে ! আমি রাজা বলে সম-সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবো, মামদোবাজি নাকি?
- রাজা, পৃষ্ঠা ২৬৮
- হো হো হো...কী মজা...কী মজা...কী মজা...লোকটাব মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওযা হচ্ছে! তাব মানে। মানে মরতে তাকে হবেই, রাজার হাতে না হোক, লাটসাহেবেব হাতে! হে হে, মৃত্যু দিযে মৃত্যু বদ করা! ধাঁধা এও আর এক ধাঁধা! সেই সাপের ব্যাঙ ধরার মতো। না পারে গিলতে, না পারে ওগরাতে! সাপের কষ্ট, না ব্যাঙের কষ্ট! কে কইতে পারো? দেখি কার মাথায় ঘিলু আছে? (হাতুড়ি বার করে) দেখি, ঠুকে দেখি...
- ভাঁড়, পৃষ্ঠা ২৬৯-২৭০
- (দু'হাতে মাথা চেপে) আব বুঝতে পারিনে৷ ওগো তুমি মোরে একটা সিদ্ধান্ত দাও!...একবাব ফাঁসিকাঠে চড়ে মরো, একবার নেমে বাঁচো...বাঁচা মরার মধ্যে আমি যে আর বাঁদরের মতো ওঠানামা করতে পারিনে গো! কোনটা করবো বলো...একটা বলো...
- ঘণ্টা, পৃষ্ঠা ২৭১
- তাই...তাই রে উদাসিনী দেহটা মোর ভারি ভারি ঠেকে। হাজার পাপ...হাজার জোঁকের মতো কামড়ে ধরে গায়ে ঝুলছে। মন্দিরের এ ডালিম গাছটা দেখেছিস...মানুষ তার গায়ে কতো না মানত করে ইট পাথর ঝুলিয়ে রেখেছে...আমি গাছটার মতো...মানুষের পাপের মানত ঝুলছে আমার সর্বাঙ্গে।...উদাসিনীরে, আমি নড়তে পারিনে, চলতে পারিনে...আমার কী হবে! বলে দে রে উদাসিনী...বলে দে...
- ঘণ্টা, পৃষ্ঠা ২৭২
- ওরে আমি কি কেবল একাই ঘেন্নার কাজ করি! পুতনা দেশে আর কেউ করে না...তুই করিস না! আমি পরের পাপ নিজের অঙ্গে ধারণ করি, তুই করিস না রে উদাসিনী!...আমার বুদ্ধি নাই...ভালমন্দ বুঝি না...দেহ বেচে খাই! তোর তো বুদ্ধি আছে, তবে তুই দেহ বেচে খাস কেন?
- ঘণ্টা, পৃষ্ঠা ২৭৩
- এমনি করেই কিনু কাহারের ঘণ্টাকর্ণ নাটক থেমে যেত অকস্মাৎ। কিনু কাহারের রং তামাশা ব্যঙ্গ বিদ্রপের খোঁচা সইতে পারত না অনেকেই। কখনো রাজরোষ...কখনো গাঁয়ের জমিদারের শাসন...কখনো ভদ্রপাড়ার বাবু থিয়েটার...কখনো বা ধর্মগুরুর রক্তচক্ষু...ভাবিত অভাবিত কোন না কোন আক্রমণে প্রতিরাত্রেই ছত্রখান হযে গেছে ঘণ্টাকর্ণর আসর। (থেমে) একদিন ভেঙেছিলো ছাগল চুরির দায়ে। অভিশপ্ত নাটকখানির সেদিনের সেই মধ্যপথে আক্রান্ত অসম্পূর্ণ চেহারাটাই আপনাদের সামনে তুলে ধরা হ'লো। এই যে নির্জন শূন্য প্রান্তরে ভেঙেচুরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আসরটি...বিধবস্ত নৌকার ছেঁড়া পালের মতো চাঁদের আলোয় যেমন ভেসে যাচ্ছে ছেঁড়া পর্দাটা...সেদিনও ঠিক এমনি গিয়েছিলো। ছড়িযে ছিটিয়ে পড়েছিলো ওদের রং তামাশার খেলনাপাতিগুলো...
- ভদ্রলোকের কন্ঠ, পৃষ্ঠা ২৭৫
আত্মগোপন
[সম্পাদনা]- দেখছো, টাকা চাই। সব তো নিংড়ে নিয়েছো চাঁদ। মেয়েটার বাপের তো কম ছিল না। কিছু অবশিষ্ট থাকতে তো ছাড়োনি বাছা! ভেবেছিল তুমি শেষ হযে যাবে। যেই দেখেছে ভালো চাকরি করছ, নতুন ফ্ল্যাট কিনেছ, অমনি হাত বাড়াচ্ছে। এই সিনেমা লাইনে ওঁচা মানুষগুলোর স্বভাবটাই এ রকম...টাকার গন্ধ পেলে ওদের লাজলজ্জা ঘেন্নাপিত্তি সব চলে যায়...
- যমুনা, পৃষ্ঠা ২৮৩
- না চেঁচাচ্ছি না। এটা যে চেঁচাবার জায়গা নয়, সে বোধ আমার আছে। কিন্তু তুমি কি বড়বৌদি কিছুতে বুঝবে না, এরা সত্যি কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না আমাদের সঙ্গে । [থেমে] তবে কিবা করার আছে অপার? বড়লোক বৌ পেয়ে মনের সুখে ফুটবল লাথি মেরে বেড়াচ্ছে।
- ফটিক, পৃষ্ঠা ২৮৬
- আরে ফাটছে বোমা, বলছে বোমাবাজি নয়।
- লাড্ডু, পৃষ্ঠা ২৮৯
- কেন অপা ? আজ যে সামান্য পঁচিশ হাজারে নিজেকে বিক্রি করলে তার চেয়েও আমার টাকা খারাপ? আমি তো বড়লোক বাবার থেকে দিচ্ছি না, এ আমার নিজের আয়। তবু খারাপ! কৃষ্ণ মল্লিক যে হাত ধরে হিড়হিড় করে নিচে টেনে নিয়ে গেল...নিচে গিয়ে দাঙ্গাবাজদের কী বললে হাতজোড় করে? আমার অপরাধ হয়েছে, মাপ করো, কান মুলছি, আর ঘুষ খেয়ে তোমাদের ডোবাবো না- [থেমে] অপা, এর চেয়েও আমার টাকা খারাপ ?
- পাঞ্চালি, পৃষ্ঠা ৩০২
- পাঞ্চালী, আমি কী করব? কৃষ্ণ মল্লিক কথা আদায় করে নিয়েছে- কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি ও আমাকে এবার এক লাখ দেবে না, খেলাবেও না...আবার তুষার সেনকেও তুমি ইনসাল্ট করেছ...[পাঞ্চালি ভেতরে চলে যায়] কী করব, কোন্ দলে খেলব ? আমি কিছু ভাবতে পারছি না...আমার দিকে জুতো ছুঁড়েছে, বসিয়ে দিয়েছে, আমার দাদা আমার জন্যে কাঁদছে... গুণ্ডাদের কাছে হাতজোড় করতে হল! তুমি রাজুর সঙ্গে লুকিয়ে কথা বলো...আমার খুব কষ্ট হয়...আজ আমি কতো চান্স পেয়েছিলাম--পা ছোঁয়ালে গোল! আমি কিচ্ছু করিনি, ইচ্ছে করে করিনি।...ফুটবল মানুষ কদিন খেলে ? পাঁচ বছর...দশ বছর...পনেরো বছর। কত ছোট্ট সময়। তার মধ্যে একটা দিন নষ্ট হযে গেল! আমার পা দুটো কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছেরে পঞ্চি...
- অর্পণ, পৃষ্ঠা ৩০৩
- বাড়ির সবাই, এমনকি আমার সহধর্মিনী পর্যন্ত তাড়া করে ফিরছে আমায় বেচো বেচো! আশু লাভ, অল্প লাভটাই ওরা বোঝে। [থেমে] ওদের তাড়না থেকে বাঁচতে অসুখের অজুহাতে নার্সিংহোমে ইনটেনসিভ কেয়ারে ঢুকেছিলাম-সেখানেও ধাওয়া করেছে। বেচো, বেচো। না পেরে চলে এলাম টুনিমাসির গণিকালয়ে! দেখি কী হয়, দামটা বাড়ে না কমে-! আমার কথা থাক। তোমাদের ব্যাপারটা শুনি-
- বিভূতি, পৃষ্ঠা ৩১৬
- ট্যালেন্ট-প্রতিভা-জিনিসটা কি সৃষ্টিছাড়া কিছু? তার কোনো সামাজিক দায় কিংবা বন্ধন থাকবে না? সবকিছুকে অস্বীকার করে কেবল প্রতিভা পূজোর ফল কিন্তু এই হয় পাঞ্চালী। প্রতিভাবানরা তখন নিজেদের ভাবে অলৌকিক! দুনিয়ার সবকিছুর ওপরে তারা। শেষ পর্যন্ত নিজেদের পাওনা ছাড়া আর কিছু মাথায় থাকে না। কেবল পেতেই চায়, কেবল নিজের বিক্রয়যোগ্যতা দেখে বেড়ায়! কোন্ দেশে জন্ম তার-তার পাশের মানুষটা কী কাজ করে কতো পাচ্ছে, কী খাচ্ছে-কিচ্ছু তার মাথায় থাকে না! পাঞ্চালী তুমি গড়বে বাঘ, চাইবে তারা রক্ত না খাক-এ কখনো হয়!
- ফটিক, পৃষ্ঠা ৩২৫
- আরে ধ্যুৎ! ও যা হবার হয়ে গেছে! কী করা যাবে! দ্যাখো বাপু, আমি কারো জন্যে কাঁদি না, কেউ আমার জন্যে কাঁদুক, তাও চাই না।
- বিভূতি, পৃষ্ঠা ৩২৬
- দ্যাখো বাপু, পুঁটিমাছের হৃৎপিণ্ড সমুদ্রে অচল। শেয়ার মার্কেট সমুদ্রের মতো। ডুবে যেতে পারি, হারিয়ে যেতে পারি জেনেই তো ঝাঁপ দিয়েছি। ক্যালকুলেশান! সময় মতো ছাড়তে পারলেই তুমি শাহানশা, সময় চিনতে ভুল করলেই তুমি ঝুললে! আমার ভুল হয়েছে! হতেই পারে!
- বিভূতি, পৃষ্ঠা ৩২৬
- [বাঁকা হাসিতে] আমার অবস্থা সেই ছাগলের মতো- বুঝলে, বনের মধ্যে বাঘের সঙ্গে দেখা। বলে, তোর যে একপাল বাচ্চা হবার কথা ছিল, তারা কই? ছাগল বলে, বাঘদাদা এ বিয়েন শেয়ালে খেয়েছে। ধর্যি ধরো। পরের বারে তুমি খেয়ো। সবাইকে বলব বাপু ধর্যি ধরো। পরের বারে আর ক্যালকুলেশানে ভুল করব না।
- বিভূতি, পৃষ্ঠা ৩২৭
- আমি মরে গেছি। খানিক আগে ছাত থেকে পড়ে আমি মারা গেছি!
- অর্পণ, পৃষ্ঠা ৩৩২
- না, কিছু হয়নি তোমার। তুমি আবার খেলবে। আমরা তো আছি। আমি, মেজদা, তোমার দাদা। সবাই মিলে তোমায দাঁড় করাব। যা চাও তুমি সব হবে অপা। গোধূলি বেলায় যে ছেলেটাকে জলকাদার মাঠে দাপিয়ে বেড়াতে দেখেছিলাম, তাকে আমি হারিয়ে যেতে দেব না। কিছুতেই না।
- পাঞ্চালী, পৃষ্ঠা ৩৩৩
দেবী সর্পমস্তা
[সম্পাদনা]- হুঁ, কাজই বটে...! এত পুরুষের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর কণ্ঠহার হরণ...কাজ নয়? মস্ত কাজ! গোপনে চোবেব মত অপেক্ষা করছি মন্দির দুয়ারে! আরতি শেষ হবে, হারটা ছিনিয়ে নেব! অভিশপ্ত, কী অভিশপ্ত রাজা তুমি লোকেন্দ্রপ্রতাপ...
- লোকেন্দ্রপ্রতাপ, পৃষ্ঠা ৩৪১
- [সহসা ধৈর্য হারিয়ে] তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে লোকেন্দ্রপ্রতাপ! নাকি দেউলে হযে গেছ! দেবীর গহনা বেচে খাবে, ফুর্তি করবে, নাকি বৃটিশের খাজনা মেটাবে?
- প্রভাকর, পৃষ্ঠা ৩৪৩
- হুঁ, আপনিও মশাই কম ঘুঘু না! ভাবছিলাম নীতির কারণে লড়ছেন, দেখছি সবাই আমরা এক গর্তেব শেয়াল! তা কোথায় বেচবেন ওটা, কার কাছে?
- রঙ্গলাল, পৃষ্ঠা ৩৪৫
- হুঁ। মোদের দেবী, নিষাদের দেবী, পাহাড় বনবনানীর দেবী! কতেক দিবস খুঁজিনু দেবীরে...পাহাড জঙ্গল টুড়ি...দেবীরে না হেরি...মোরা দেবীহারা আছি কতো কাল! মোরা ছন্নছাড়া ব্যাধ!
- ডাহুক, পৃষ্ঠা ৩৫০
- [ক্ষেপে] অরে বুড়া ছন্নছাড়া বান্দর! মোয় তোর বেদনা! [গৌরীকে] হে মা, এ বুড়া কবে মোরে মুকতি দিবে!
- কুন্তলা, পৃষ্ঠা ৩৫৩
- আমার সিংহগড় ছিনিয়ে নেবে বলে ওরা আইন বাঁধছে, বুঝতে পারছেন না আপনারা...লক্ষ্য আমার সিংহগড়! আমি অপুত্রক নিঃসন্তান! সুযোগটা ধরবে বলেই...
- লোকেন্দ্রপ্রতাপ, পৃষ্ঠা ৩৫৮
- স্মৃতি আমারও খুব স্পষ্ট নয় মহারাজ! বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে বনে ঢুকেছিলাম। আতঙ্কে চোখ খুলতে পারিনি কতদিন! হঠাৎ একসময় দেখলাম, সিংহগড় আমার চোখ থেকে মুছে গেছে! চার দিকে বন আর পাহাড়। আর আমি এদের দেবী!
- গৌরী, পৃষ্ঠা ৩৬৪
- খর্বদার মহারাজ! আমার একটি মানুষেব গায়ে যদি হাত পড়ে, আপনার হাতি ঘোড়া মাহৃত সৈনিকের একটিও ফিরবে না![লোকেন্দ্র হাত তুলে সৈনিকদের নিরস্ত করে। গৌরী ডাহুকের গায়ে হাত রাখে।] আমার বাবা নেই। ডাহুক আমার বাবা। ওই কুন্ডলা আমার মা৷ এ আমার সাম্রাজ্য৷ এখানে আপনার শাসন অচল। ফিরে যান। হার নেবার চেষ্টা করবেন না।
- গৌরী, পৃষ্ঠা ৩৬৪
- তোমরা গায়ের জোরে সিংহগড়ের মেয়েকে আটকাবে, এ আমি সহ্য করব না। পাথরের ঘর ভেঙে তাকে নিয়ে যাবো।
- লোকেন্দ্রপ্রতাপ, পৃষ্ঠা ৩৬৮
- মহারাজ এই বনচারী মানুষদের কোনওদিনই কি আপনি প্রজা বলে পালন করেছেন? রাজ্যের কোনও সুফল কি ভোগ করে এরা? গৌরীকে পেলে আপনার মঙ্গল...সিংহগড়ের মঙ্গল! তাতে এদের কি এসে যায়? বনের পশুপাখি যদি আপনার প্রজা না হয়, এরাও নয়! এদের ওপর অভিমান বা ক্রোধ প্রকাশের অধিকার আছে কি আপনার, কিংবা বল প্রয়োগের?
- দেওয়ান, পৃষ্ঠা ৩৬৮
- লখ লখ হে ব্যাধেরা, রাজা দুখলি চিতে মিনতি করে! তবহি উরে ফিরানো শূন্য হস্তে! তেই কি কভু হয়! হেরে পাষণ্ড, ব্যাধের ধরম নাই? শুনলি না তোহরা, বাবাঠাকুরের পুরাণ কথা! রামরাঘব যবে এল বনধাসে, কাহারা দিল রে ঠাঁই? মোদের পূর্বপুরুষ! রাজ্যহারা পাণ্ডব আসে বনবাসে, মোদের পূর্বপুরুষ পরাণ দিল জতুঘরে পুড়ি! হরিশ্চন্দ্র রাজায় ঠাঁই দিল চণ্ডালে। আর সিংহগড়ের রাজার বেলা হবে ধরম নাশ! কভূ না। উঠ রাজা। দিব কন্যা! [পাথরের ঘরের দিকে চেয়ে] হ্যারে ইচ্ছা, লয়ে আয় মোদের রুপের আগরি...কুলবতী কন্যে সঁপে দিই সুপাত্তরে!
- ডাহুক, পৃষ্ঠা ৩৬৯
- [গৌরীকে] নিতি ফুল ঢেলেছি ওই পায়ে! ওই পায়ে! রাক্ষসী! মর্! মর্! [গাছটিকে দেখিয়ে] তোহর ভাতারের ডালে পাতা গজাল! যা, গলায় রশি দিয়া ওই ডালে ঝোল..ঝুলি মর! মর্! মর!
- ইচ্ছা, পৃষ্ঠা ৩৭২
- ডাহুকের কথাগুলো মনে পড়ছে আপনার? সনাতন ভারতের এক আশ্চর্য সত্য কথা শুনিয়ে দিল ওই অসভ্য ব্যাধ। রাজারা যখনই রাজ্য হারিয়েছেন, ছুটে এসেছেন এইখানে...বনে জঙ্গলে অন্তজ সমাজের দ্বারে। আমাদের ইতিহাস পুরাণ পরম্পরা তাই বলছে, সঙ্কটাপন্ন নগরসভ্যতাকে রক্ষা করে আসছে বনপাহাড়! এটাই এদেশের শক্তি... শক্তির ভাণ্ডার!
- দেওয়ান, পৃষ্ঠা ৩৭৮
একাঙ্ক নাটক
[সম্পাদনা]সন্ধ্যাতারা
[সম্পাদনা]- দুবার কিস্তিমাৎ হ'লো। চটে গেল৷ চেঁচাল। ছেলেমানুষেব মতো কাজিয়া বাধাল। চোট্টামি করে জেতো তুমি৷ (বিষণ্ণ হাসিতে) বললাম, বেশ সুরেন, তুমিও না হয় একবার চোট্টামি করে জেতো দেখি। (থেমে) দেখিয়ে গেল। মাত্তর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দেখিয়ে গেল।
- কুমুদশংকর, পৃষ্ঠা ৩২৩
- রিভল্যুশনারি চিন্তাভাবনা। ছোটো ছেলের আশা আর করো না। মাঝে মধ্যে কাগজপত্রে তার যেসব লেখা পড়ি-তাতে মনে হয়, তোমার আমার কথা ভাবার অবসর নেই তার, ইচ্ছেও নেই। মস্তবড় ইন্টেলেকচুয়াল!
- কুমুদশংকর, পৃষ্ঠা ৩২৫
- (হঠাৎ রেলিং-এর ওপর চাপড় মেরে) ভাঙো--ভেঙেচুরে বেরিয়ে পড়ো! রট সিসটেম...মান্ধাতার আমলের রীতিনীতি-সিলি মিডলক্লাস সেন্টিমেন্টস! ভালোবাসা মায়া মমতা-স্যাঁৎসেঁতে থলথলে কাদা--সাফা করো--পচা নর্দমা সাফা করো--নইলে এদেশে বিপ্লব হবে না--নো নেভার--
- ছোট্টু, পৃষ্ঠা ৩৩৫
- পৃথিবীর বুকে টিউবারকিউলোসিস...কে ভাল থাকতে পারে ? পাবলো নেরুদা কি পারলেন...
- ছোট্টু, পৃষ্ঠা ৩৩৬
- ওদের কথা ভেবো না। ওরা যে যার চলে যাক। (থেমে) মানুষ মরে গেলে যেমন আকাশের তারা হয়ে ফুটে ওঠে, হারিয়ে গেলেও তেমন তারা হয়ে যায়। রোজ সন্ধ্যেবেলায় এ দিকে চেয়ে আমরা অচেনা তারাগুলো দেখব--আর আমাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের খুঁজবো...
- কুমুদশংকর, পৃষ্ঠা ৩৪৭
টাপুর টুপুর
[সম্পাদনা]- হ্যাঁ। বের রাতে বলেছিলে না, সংসারে তুমি আমার মান বজায় রাখবে, আমি তোমার মান বজায় রাখবো। মাত্তর সোমে-সোমে একুশদিনে সব ভুলে যাবো! না গো, না...না...
- মরালী, পৃষ্ঠা ৩৬৬
চোখে আঙুল দাদা
[সম্পাদনা]- একটা দুঃসংবাদ আছে। আজ সন্ধ্যে ছ'টা নাগাদ...যে নাটকটা হবার কথা, তারই নায়ক...শ্রীচোখে-আঙুল দাদা...হঠাৎ বিনবিন রোগে আক্রাস্ত হয়ে প্রচণ্ডভাবে ঝিনঝিন করতে করতে (উর্ধ্বে তাকিয়ে) আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। (রুমালে চোখ মুছে, বার কয়েক নাক টেনে) আপনাদের একটু উঠে দাঁড়াতে হবে...এই মিনিট খানেকের মতো নীরবতা পালন...একটু কষ্ট করে যদি...(চারপাশ দেখে নিয়ে) আচ্ছা, আধ মিনিট পারবেন ?... চারপাশ দেখে নিয়ে) পনেরো সেকেন্ড ? বুঝতে পেরেছি, দাঁড়াবার ইচ্ছেই কারুর নেই। আচ্ছা থাকগে, দাড়ানোর ভেতর গিয়ে কাজ নেই। বরং যে যেখানে বসে আছেন, ওই ভাবে বসেই শ্রীচোখে-আঙুল দাদাকে একটু স্মরণ করে নিন। (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কয়েক সেকেন্ড পার করে) টাইম আপ। (থেমে) কিন্তু তা বলে নাটক আমরা বন্ধ করছি না৷ চোখেআঙুল দাদাকে এমন আকস্মিকভাবে সবকিছু বানচাল করে দিয়ে যেতে দেবো না! তাঁর জগৎতলীলা যখন দেখাতে পারছি না, তাঁর স্বর্গলীলা দেখাবো। আপনারা বসুন! তাই তো, দাঁড়ালেনই বা কখন?
- ঘোষক, পৃষ্ঠা ৩৬৯
- বিধাতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নাক ডাকছে।
- পৃষ্ঠা ৩৭০
- (আরক্ত চোখে) কাতলা মাছের মতো হাপসি কাটছ কেন? হ'লোটা কী?
- বিধাতা, পৃষ্ঠা ৩৭০
- চিত্র ॥ প্রায় কেঁদে) প্রভো...
বিধাতা ॥(ভেংচি কেটে) প্রভো ! প্রভো !...যেই একটু বিশ্রাম নেবো...অমনি কানের গোড়ায় প্রভো! প্রভো! (থেমে) সামান্য একটা রেকর্ড তাও রাখতে পারো না!
চিত্র ॥(তিক্ত স্বরে) কী করে পারব! সোজাসুজি নাম হলে সব রাখা যায়! মাথার ঠিক থাকে, কেউ যদি এসে বলে আমার নাম শ্রীচোখে-আঙুল দাদা!
বিধাতা ॥(চমকে) কী নাম?
চিত্র ॥ (তিক্ততম স্বরে) চোখে-আঙুল দাদা! বাপের কালে শুনেছেন...
বিধাতা ॥চোখে-আঙুল দাদা ! বলো কী হে চিত্রগুপ্ত, মা বাপের দেওয়া...?
চিত্র ॥বাপ মা কি আর সন্তানকে দাদা ডাকবে! পিতৃদত্ত হলে আমার ক্যাটালগে নিশ্চয়ই উঠতো! দিয়েছে ওর দেশবাসী...ধরুন পশ্চিমবঙ্গ এস্টেটের জনসাধারণ! (থেমে) বোধহয় টাইটেল!- পৃষ্ঠা ৩৭০
- আজ্ঞে হ্যাঁ, মর্ত্যে নাকি আজকাল এদের খুব দেখা যাচ্ছে। ধরুন পরনে ঢোলা প্যান্টালুন আর রঙচঙা ঢোলা পাঞ্জাবি...কাঁধে ঝুলি... মাথায় বটের ঝুরির মতো চুল...ছাগুলে দাড়ি...রুটি-সেঁকা চাটুর মতো দু চোখে দুখানা বেগনি রঙের কাঁচ বসানো চশমা, আর ধরুন সর্বদাই দাঁতে চুরোট কামড়ে আছে! খালি প্যাঁড়দারি করে ঘুরে বেড়ায়।
- চিত্রগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৩৭১
- ধরেছেন ঠিক প্রভো...যাদের ইনটেলেক্ট মানে বুদ্ধি...ধরুন চোয়ালে এসে বাসা বেঁধেছে, তারই ইনটেলেকচুয়াল।
- চিত্রগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৩৭১
- অসভ্য! পাজী! আমায় বসিয়ে রেখে গুলতানি করছে! নন্সেন্স, আমার স্বর্গের দরজা খুলে দেবে কে!
- চোখে-আঙুল দাদা, পৃষ্ঠা ৩৭১
- এঃ। স্বগ্গো! স্বগ্গো তোমার ভারতবর্ষের রেলের কামরা! টিকিট থাক্ না থাক্ লাফিয়ে চড়ে বসলাম! স্বগ্গো তোমার জাতীয় সম্পত্তি! ব্যাটা ডব্লু-টি! ভগবান বিধাতাকে পেন্নাম করবে কে?
- চিত্রগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৩৭২
- কী পড়বো! এ পর্যন্ত জগতে যা লেখা হয়েছে তাকে তোমরা পাঠযোগ্য বলো! বই বলো!
- চোখে-আঙুল দাদা, পৃষ্ঠা ৩৭৫
- আম্পর্ধা! ভগবানেরও খুঁত ধরতে আসে!
- চিত্রগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৩৭৭
- ওঃ ভগবান... অনন্ত শক্তির আধার! ব্যাটা চোখে-আঙুল তাকেও টলিয়ে দিলে--
- চিত্রগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৩৭৮
- মূর্খ ! এই মূর্খটি তার দুর্লভ মানবজনম কেবল অপরের ছিদ্রান্বেষণ করে কাটিয়েছে! নির্বোধটি করতো না কিছু-বলতো সব! তৃণটিও স্পর্শ করেনি--কাদা ছুঁড়েছে সবার গায়ে! দুরারোগ্য ব্যাধি! বুঝতে পারছি, এর এই খর জিহ্বার তাড়নায় জগতের মানুষ অস্থির হয়েছিল। আশ্চর্য এই সব চোখে-আঙুল দাদারা! যে পৃথিবী ওদের লালনপালন করে-অকৃতজ্ঞেরা তার একটিও গুণ দেখতে পায় না, শাস্তি! হ্যাঁ, শাস্তি ওকে পেতেই হবে!
- বিধাতা, পৃষ্ঠা ৩৭৮
- শাস্তি তো বিধাতা কাউকে দেয় না চিত্রগুপ্ত। যে যার নিজের অপকর্মে শাস্তি পায়। ও-ও তাই পাবে।
- বিধাতা, পৃষ্ঠা ৩৮০
- দেখতে পাচ্ছ বৎস চোখে-আঙুল দাদা, দাদার মতো লোকের ভুল ধরা কতো সোজা, আর নিজে কিছু করার কতো জ্বালা--
- বিধাতা, পৃষ্ঠা ৩৮২
কালবিহঙ্গ
[সম্পাদনা]- সর্বদা দেখি, একগাদা লোক পথের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এক এক সেকেন্ডে এক একটা লোকের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাচ্ছে। দিব্যি কারবার...না মূলধন...না পরিশ্রম...কতো সোজা... যেন এই মাথার ঘাম পায়ে ফেলা...এই লড়াই...সবটা বোকামি! জীবনটা মাত্র একটা টিয়েপাখির মামলা...
- সূর্য, পৃষ্ঠা ৩৯০
- থামুন মশাই! যাতে খাটে তার জন্য কি করেছি জানেন, এততোটুকু বয়সে ঢুকেছি ওই কারখানায়...ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেটেছি- শুধু মালিকদের খুশি করার জন্যে। লোকে যে কাজ ছ-ঘণ্টায় করে...আমি তাই করেছি দুঘণ্টায়.. খিদে বুঝিনি.. ,তেষ্টা বুঝিনি..আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো খেটেছি...কিস্তু তবু মাসের মধ্যে সাতদিন লে-অফ, দিনান্তে ছাটাইএর হৃমকি...আর মাঝে মাঝে বুকের এখানটায় একটানা যন্ত্রণা! ভক্তরামের দিকে তাকিয়ে) দেখোনি কাটা পায়রার মতো ছটফট করেছি...(ছুটে ভক্তরামের সামনে এসে) আজ আমি তোমায় হাতেনাতে ধরবো । কই, আনো তোমার পণ্ডিতকে...আমার সামনে করো তুমি আমার ভাগ্যপরীক্ষা। তোমার চালাকি আজ ধরে ফেলবো...আসল কাগজখানা ঠোঁটে গুঁজে দাও কোন্ ফাঁকে, তাই দেখবো! যাও, আনো...
- খোকা, পৃষ্ঠা ৩৯৯
- আমার বাবা চোর--লোক ঠকায়--আমার বাবার কথা মনে পড়লে শুধু হাসি পায়, না? শালা জানোয়ার! ঠেকা, যাচ্ছি আমি কাজে--ঠেকা!
- খোকা, পৃষ্ঠা ৪০৫
- একটা অন্ধের পক্ষে চোখে দেখার অভিনয় করা যে কত বড় পরিহাস তুমি তা বুঝবে না!
- উপেন, পৃষ্ঠা ৪০৬
- লোকটা তার সন্তানের ভাগ্য নিয়েও কি করে হাত-সাফাই করে? মানুষ পারে কি করে? ছেলেকে ঠকাতে ভয় করে না?
- উপেন, পৃষ্ঠা ৪০৬
- (ভক্তরামকে) আপনাকে একটা কথা বলে যাই। মানুষের ভাগ্য চিরকাল লড়াই করে ফেরাতে হয়েছে, চিরকাল তা হবে। পাখির ঠোঁটে চাকা ঘোরে না।
- সূর্য, পৃষ্ঠা ৪১০
টু ইন ওয়ান
[সম্পাদনা]- তুলনা নাই মালেক, তুলনা নাই! সেই ইস্তক খাইলাম কিলচড় নাকছ্যাচা, যারে কয় পাতিলেবু শুকতা শাকভাজা...শ্যাষপাতে মেঠাই পাইলাম! জী এ তো চুমা নয়, জলভরা তালশাঁস!
- ফৈজী, পৃষ্ঠা ৪১৫
- ক্যান হইব না মামু? ক্যালা যদ জোড়া হইতে পারে, পোলা হইব না ক্যান? মালেক, জোড়া ক্যালার মতো জোড়া পোলা হইছে আপনের।
- ফৈজী, পৃষ্ঠা ৪১৭
- থাক! দ্যাশ এক লগে ডাবল শাসক পাইব...যারে কয় দুইমুখো শাসক
- ফৈজী, পৃষ্ঠা ৪১৯
- মাইনা...? কে নিবি মাইনা? মাইনার কথা কে বল্লি বাপ? তিন মাসের মাইনা পাই না! তোরা একটু সুলতানেরে বলবি, বিনা দানাপানি ছাগলও পোষা যায় না। মাস্টার কি ছাগলও নয়? কে আছিস বাপ, সাড়া দে।
- মৌলভী, পৃষ্ঠা ৪২৬
- নারীপুরুষের বয়েস, দুটো ঘোড়ার রেস। একবার এ এগোয়, একবার ও পেছোয়...
- ঝুল, পৃষ্ঠা ৪৩৩
- না, আর খাবো না। বুকের মধ্যে এক দরিয়া পানি ছলাৎ ছলাৎ করে...আমার ঘুম পাচ্ছে...ঘুম...
- ঝুল, পৃষ্ঠা ৪৩৪
- হ। মুখে বলতাছেন, দেওয়ার তো নামও করেন না! ক্ষ্যামতা কুক্ষিগত কইব্যা রাখার বাদশাহী হ্যাংলামি আপনের মজুত আছে হুজুর! আর তাই পোলারা চক্রান্ত কইরা আপনেরে খতম করবার চায়!
- ফৈজী, পৃষ্ঠা ৪৩৬
আমি মদন বলছি
[সম্পাদনা]- তাই তো! ভোটে হারলিই তবে বাবুরা খারাপ হয়ে যায়, ভোটে জিতলি কেমন সোন্দর হয়ে যায়।
- পৃষ্ঠা ৪৫৩
- কলকেতা...আমার স্বপনের কলকেতা...এমুখে ভোঁ বাজায়ে ওমুখে সাঁড়াশি বাগায়ে ধরেছে...আমারে খোজা করবে বলে। সারাটা রাত্তির ছুটে ছুটে সব পথ হারায়ে আপনাদের কাছে এয়েছি বাবু...কুথায় হাসানাবাদ লাইন..কুথায় জোড়া-খেজুরগাছ...তেঁতুলেবিষ্টুপুর...আমারে এক্টা পথের উপায় করেন...আমি মদন..ঈশ্বর ঘোতন মণ্ডলের সেজোছেলে মদন...সোন্দরের পূজারী মদন...ওরফে গেঁড়ে মদন...আমি কি খোজা হয়ে এই শহরে চিরতরে বন্দী হয়ে থাকবো ? ও-ও-ও বাবুমশায়রা...
- পৃষ্ঠা ৪৫৬
প্রভাত ফিরে এসো
[সম্পাদনা]- প্রভাত ছাড়া...কুয়েত-ফেরত ঐ টাকার হাঁড়ি ছাড়া আর কেউ নেই! প্রভাত ছাড়া...প্রভাতের সরল বিশ্বাস...সরল ভালবাসা ছাড়া তোমার আর কোনো পুঁজি নেই!
- সৌম্য, পৃষ্ঠা ৪৭৮
- কুয়েত...তেলের খনি...লাখ লাখ টাকা...সব গপ্পোকথা! আমি এখন নিঃস্ব ফকির! বাবার কোল্ড স্টোরেজ ঘরবাড়ি সব ফুঁকে গেছে। দুনিয়ার লোক ঠকিয়ে ঠকিয়ে আমায় ভূত করে দিয়েছে। এখন এই করে খাই। ছেন্তাই রাহাজানি দিনদুপুরে চুরিচামারি। এখন এটাই আমার প্রফেশন! কেউ আমাকে দেখে বুঝতে পারে না। ভাবে সেই আগের প্রভাত। সেই শালা হাঁদাকেষ্ট প্রভাতটাকে সামনে রেখে আমি চেনা আধচেনা সদ্যচেনা লোকের ঘরে ঢুকে এই করি...এই যা যা করছি...
[পেতলের ফুলদানি আর ট্র্যানজিস্টার দু পকেটে ঢোকায়।]
আমাদের সঙ্গে পড়তো রীণা...গেল মাসে কার্শিয়াং-এ ওর বাড়িতেও এই কাণ্ড করেছি। ভেবেছিলাম, রীণা বুঝি পুলিসে আমার নামে ডায়েরি করবে! পরদিন শিলিগুড়ি-সংবাদে দেখলুম...ও হরি, বীণা বলেছে অজ্ঞাত পরিচয় ডাকাতের কীর্তি! এখানেও শালা, সেই আগের প্রভাতী কলকাঠি নাড়ছে! হ্যা হ্যা! জানি তুমিও আমার নাম করবে না! নাম করেই বা কী করবে! আমার তো ঠিকানাই নেই!
[প্রভাত পালাবার জন্যে প্রস্তুত হয়]
তুমি কিন্তু ভুলেও ভেবো না--আমাকে সত্যি সত্যি ভালো না বাসার জন্যে আমি তোমার ওপর প্রতিশোধ নিলুম ! উহু বললাম যে, এটাই আমার প্রফেশান... জীবিকা!
[সৌম্য পাশের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।]
চলি, সব মিলিয়ে বাণিজ্য খারাপ হ'লো না। মাসখানেক চলে যাবে! তারপর আবার কোথাও..যতদিন না ধরা পড়ি...- প্রভাত, পৃষ্ঠা ৪৭৯-৪৮০
বৃষ্টির ছায়াছবি
[সম্পাদনা]- সব ঠিক। জগতের সব গপ্পোই হয়ত ঠিক। সব গপ্পোই অদ্ভুতভাবে ঘুরে ফিরে একরকম।
- চন্দনা, পৃষ্ঠা ৪১০
তক্ষক
[সম্পাদনা]- পাতায় পাতায় মেঘ ছেয়ে আছে...ছায়াঘেরা শীতল বনতল...একটি পাখিও ডাকে না...একটি ভ্রমরও গুঞ্জন করে না...শাস্ত নিস্তব্ধ সমাধিস্থ!
- পরীক্ষিৎ, পৃষ্ঠা ৪১৯
- প্রজার সেবা যদি নাই করতে পারে, তবে সে কিসের রাজা--কার রাজা...কেনই বা রাজা!
- পরীক্ষিৎ, পৃষ্ঠা ৪২০
- পুণ্যার্জনই সব নয় শৃঙ্গী, পুণ্য রক্ষা করতে শেখো!
- ঋষি, পৃষ্ঠা ৪২৫
- এতো সরোবর নয় মন্ত্রীমশাই, সবুজ লতাপাতার ঘোমটায় যেন এক শান্ত কোমল কিশোরী আমারই জন্যে অপেক্ষা করছে...বহু যুগ যুগান্ত ধরে...তার শ্যামল সঘন আঁখিপল্লব আমারই মুখের পানে আকুল হয়ে চেয়ে আছে।
- পরীক্ষিৎ, পৃষ্ঠা ৪২৮
- দেখছি, চরাচরে মৃত্যু বিনা আর কিছু দেখছি না। হিংস্র কুটিল হিস্হিস্ গর্জন ছাডা আর কিছু শুনতে পাই না- মৃত্যু...মৃত্যু...বিশাল কালো ছত্র ছডিয়ে মৃত্যু আমার আকাশ আলো গ্রাস করছে...আমারই শির লক্ষ্য করে মৃত্যু তার জিহবা বাড়িয়েছে....মৃত্যু...মৃত্যু..
- পরীক্ষিৎ, পৃষ্ঠা ৪৩৪
- মৃত্যু...সে তো জীবনের পরিণতি! সেই তো মূর্খ, যে সেই পরিণতিকে মানে না-আবার সেই তো কাপুরুষ যে তার ভয়ে ভীত হয়!
- তন্ত্রিপাল, পৃষ্ঠা ৪৩৫
- মরতে আমার ভয় নেই ঋষি, লজ্জাও নেই! হ্যাঁ, সপ্তম দিনে আমি মরব। সপ্তম দিন! সপ্ত সমুদ্র দূরে! তার পূর্বে ছয় দিন আমি বাঁচব, বিরাট হয়ে বাঁচব!
- পরীক্ষিৎ, পৃষ্ঠা ৪৩৮
তেঁতুলগাছ
[সম্পাদনা]- চল্ আগে ফিরে যাই। শালা তোকে উপুড় করে ফেলে সোফা-কাম-বেড বানাবো। আমাকে বাঘের পেটে রেখে যাবে বলে এনেছে। কাল সন্ধ্যেবেলা থেকে এ পর্যস্ত পেটে পড়েছে খানকতো আলুর চপ। অনন্ত পথ! কোথায় যাচ্ছি! মাইরি তেতুলগাছটা সত্যি তো!
- ক্ষীরোদ, পৃষ্ঠা ৪৫০
- দেবে না--সাতখানা গাঁ জেগেছে! তোমায় লাভ করতে দেবে না! দেবে না গাঁ মুড়িযে শহর সাজাতে! পালাও-শিগগির পালাও-ওরা ছুটে আসছে।
- ভবতোষ, পৃষ্ঠা ৪৫৪
মনোজ মিত্র সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- মোপাসাঁ বাঁচতে দেন নি তাঁর ঘোড়াকে। মনোজ মিত্র কিন্তু বাঁচিয়ে রাখেন বাঞ্ছারামকে।
- বিষ্ণু বসু, মনোজ মিত্রের বিশ্বাসের জগত। উৎস: [১]
- মনোজ মিত্রের কমেডির ধাত যে ধাঁচটা পেয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটা ঘর বাঁধার প্রাণান্ত চেষ্টা। কমেডির চরিত্রের মধ্যে যে দোটানা নিহিত আছে তাতেই কমেডি কখনও মুক্ত উল্লাসে মাতে, কখনও ব্যঙ্গের বাঁকা টিপ্পনিতে খোঁটা দেয়। কমেডির সহজাত জীবনদর্শনেই ওই বোধটা গ্রোথিত রয়েছে, ওই আরো বড় দোটানার ভয়াল ছায়া-বাইরের বৃহত্তর জটিলতর জীবনের অতিকায় চাপ থেকে কোনক্রমে বাঁচিয়ে-ঝুঁচিয়ে স্বামী-স্ত্রী-সম্তানসন্ততির ছোট্ট সংসারটাকে ন্যুনতম সুখেসাচ্ছন্দে টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় মানুষ কোথাও যেন জীবনটাকেই বা অস্বীকার করে, যেন বলতে চায়, ওসব কিছু নয়, ওসবে কিছু আসে যায় না, আবার আরেকটা কোথাও জীবনটাকেই বড় ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরে। বড় জীবন আর ছোট জীবন-কোনটা আসলে বড়, আর কোনটা ছোট, তাই বা কে বলবে!...
- শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ মিত্রের কমেডির ভাষা-ভাষ্য
- বৃদ্ধ চরিত্র নির্মাণে তিনি অদ্বিতীয়। তাঁদের রাগ, প্রত্যাশা, অসহায়তা—নানা শেডে ধরেছেন নাটকে। বলেছেন তাঁদের অভিমান, অসহায়তার গল্প। 'মৃত্যুর চোখে জল'-এর বঙ্কিম, 'পরবাস' নাটকের গজমাধব, 'সাজানো বাগান' নাটকের বাঞ্ছারাম—সকলেই বেঁচে থাকার জন্য, একটু ভাল থাকার জন্য কত ফন্দিফিকির করে। 'চাক ভাঙা মধু'র জটাও বাঁচতে চায়। সেজন্য অঘোর ঘোষের মৃত্যু হলেও ক্ষতি নেই। আসল হল বেঁচে থাকা। তাঁর নাটক বেঁচে থাকার কথা বলে। মানুষের বাঁচা, প্রকৃতির বাঁচা, সভ্যতার বাঁচা।
- জয়ন্ত সিনহা মহাপাত্র,মনোজ মিত্র ও তাঁর নাটক: মঞ্চের মানুষটিকে যেমন দেখেছি বাস্তবে
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় মনোজ মিত্র সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।