মাঠ
অবয়ব

দিল্-খোলা হই তাই রে।
—সুনির্মল বসু
মাঠ হলো কৃষিক্ষেত্রে বেড়া দেওয়া বা না দেওয়া এমন একখণ্ড জমি, যা ফসল চাষের মতো কৃষি কাজে অথবা গবাদি পশুর চারণভূমি বা ঘেরা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাঠ পতিত রাখা কোনো এলাকা বা আবাদি জমিও হতে পারে। সাহিত্যে রূপক হিসাবেও মাঠ শব্দটির ব্যবহার করা হয়েছে।
উক্তি
[সম্পাদনা]- মাঠের পরে মাঠ, মাঠের শেষে
সুদূর গ্রামখানি আকাশে মেশে।
এ ধারে পুরাতন শ্যামল তালবন
সঘন সারি দিয়ে দাঁড়ায় ঘেঁষে।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বধূ, সঞ্চয়িতা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭৬
- পাহাড় শিখায় তাহার সমান
হই যেন ভাই মৌন-মহান্,
খোলা মাঠের উপদেশে—
দিল্-খোলা হই তাই রে।- সুনির্মল বসু, সবার আমি ছাত্র, সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা- সুনির্মল বসু, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৩
- পথঘাটে তখনও কাদা, মাঠে মাঠে জল জমে আছে। বিকেলবেলা ফিঙে পাখী বসে আছে বাবলা গাছের ফুলে-ভর্তি ডালে।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইছামতী - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩
- আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি—বিকেলের এই রঙ—রঙের শূন্যতা
রোদের নরম রোম—ঢালু মাঠ—বিবর্ণ বাদামি পাখি—হলুদ বিচালি
পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে-ঘাসে—কুড়ুনির মুখে তাই নাই কোনো কথা।- জীবনানন্দ দাশ, জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ (প্রথম খণ্ড) - জীবনানন্দ দাশ, প্রকাশক- বেঙ্গল পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯১
- চারিদিকে কেবল মাঠ ধূ ধূ করচে—মাঠের শস্য কেটে নিয়ে গেছে, কেবল কাটা ধানের গোড়াগুলিতে সমস্ত মাঠ আচ্ছন্ন। সমস্ত দিনের পর সূর্য্যাস্তের সময় এই মাঠে কাল একবার বেড়াতে বেরিয়েছিলুম। সূর্য্য ক্রমেই রক্তবর্ণ হয়ে একেবারে পৃথিবীর শেষরেখার অন্তরালে অন্তর্হিত হয়ে গেল।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্র-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশস্থান- শিলাইদহ, প্রকাশসাল- ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩২
- তাদের আড্ডা ছিল, গ্রাম ছাড়িয়ে, মাঠ ছাড়িয়ে, বনের ধারে, ব্যাঙ-ছাতার ছায়ার তলায়। ছেলেবেলায় যখন তাদের দাঁত ওঠে নি, তখন থেকে তারা দেখে আসছে, সেই আদ্যিকালের ব্যাঙের ছাতা। সে যে কোথাকার কোন্ ব্যাঙের ছাতা, সে খবর কেউ জানে না, কিন্তু সবাই বলে, “ব্যাঙের ছাতা”।
- সুকুমার রায়, সুকুমার সমগ্র রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), নানা গল্প, ছাতার মালিক, পৃষ্ঠা ১৭৭
- কেউ সারাদিনে এক টুকরা রুটি খেয়েছে, আর কেউ অভুক্ত অবস্থায়ই পথের দিকে চেয়ে বসে আছে। আমেরিকার ব্যাংকে প্রচুর স্বর্ণ আছে, বাগানে ফল আছে, মাঠে প্রচুর গম আছে, নদীতে জল আছে, দোকানে কাপড় জুতা সবই আছে কিন্তু ঐ ভিখারীদের কিছুই নাই। পরনে ছেঁড়া ট্রাউজার, গায়ে ছেঁড়া কোট, কারও গায়ে শার্ট আছে, কারও গায়ে তাও নেই! নেকটাই কিন্তু তবুও ঝুলছে।
- রামনাথ বিশ্বাস, আজকের আমেরিকা ,১৯৪৫ (পৃ. ৬৫)
- হয়তো বা হাঁস হবো – কিশোরীর – ঘুঙুর রহিবে লাল পায়
সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলঙ্গীর ঢেউ এ ভেজা বাংলারি সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।- জীবনানন্দ দাশ, রূপসী বাংলা - জীবনানন্দ দাশ, প্রকাশক- সিগনেট প্রেস, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৪
- এখানে গরম নেই ব’ল্লেই হয়—আর চারিদিকের মাঠ একেবারে ঘন সবুজ হ’য়ে উঠেচে। বোলপুরকে এত সবুজ আমি আর কখনোই দেখিনি। গাছগুলো নিবিড় পাতার ভারে থাকে-থাকে ফুলে উঠেচে—ঠিক যেন সবুজ মেঘের ঘটার মতো।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভানুসিংহের পত্রাবলী - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৪
- মাঠের ছবি যথার্থ যদি দিতে হয় কি দেখতে হয় মাঠ কেমন করে চষা হয় এটা দেখানোর চেয়ে মাঠে কোথায় কি রং লেগেছে কি ফুল ফুটেছে ইত্যাদি নানা হিসেব না নিলে তো চলে না, সে হিসেবে ভাবুক দৃষ্টি ঠিক দেখার মতো দেখাই দেখলে বলতে হবে।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দৃষ্টি ও সৃষ্টি, বাগেশ্বরী শিল্প-প্রবন্ধাবলী- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪৫
- ঐ চলেছে গরুর গাড়ি মাঠের পাশে,
কাঠের চাকায় ক্যাঁচোর ক্যাঁচোর শব্দ আসে।
গাড়োয়ানটা পাগড়ি মাথায় পড়ছে ঢুলে,
আপন মনে চলছে গরু ল্যাজুড় তুলে।- সুনির্মল বসু, গরুর গাড়ির গান, সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা- সুনির্মল বসু, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৪
- মাঠে যে ধান কাটছে, রাস্তায় যে মোট বইছে, কারখানায় যে লোহা পিটছে, রাত জেগে যে লিখছে, চেয়ারে বসে যে শাসন করছে, নতুন পৃথিবীর নতুন মানুষের মহিমা তাদের প্রত্যেকের ওপরই নির্ভর করছে......
- নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, নতুন পৃথিবীর নতুন মানুষ - নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, প্রথম প্রকাশ- আষাঢ় ১৩৬৪, প্রকাশক-রাইটার্স সিণ্ডিকেট প্রাইভেট লিমিটেড, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬
- রাত্রি অনেক। চাঁদ মাথার উপর। পূর্ণচন্দ্র নহে, আলো তত প্রখর নহে। এক অতি বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপর সেই অন্ধকারের ছায়াবিশিষ্ট অস্পষ্ট আলো পড়িয়াছে। সে আলোতে মাঠের এপার ওপার দেখা যাইতেছে না। মাঠে কি আছে, কে আছে, দেখা যাইতেছে না। মাঠ যেন অনন্ত, জনশূন্য, ভয়ের আবাসস্থান বলিয়া বোধ হইতেছে। সেই মাঠ দিয়া মুরসিদাবাদ ও কলিকাতা যাইবার রাস্তা। রাস্তার ধারে একটি ক্ষুদ্র পাহাড়।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আনন্দমঠ, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশসাল- ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ (১২৯০ বঙ্গাব্দ),পৃষ্ঠা ১৭
- ফড়িং পাওয়া যায় না, এমন দেশ খুব কমই আছে। যেদেশে লতাপাতা আছে আর সবুজ মাঠ আছে, সেদেশেই ফড়িং পাওয়া যাবে। নানান দেশে নানানরকমের ফড়িং তাদের রঙ এবং চেহারাও নানানরকমের, কিন্তু একটি বিষয়ে সবারই মধ্যে খুব মিল দেখা যায়। সেটি হচ্ছে লাফ দিয়ে চলা। এই বিদ্যায় ফড়িঙের একটু বিশেষরকম বাহাদুরি দেখা যায়, কারণ অন্যান্য অনেক পোকার তুলনায় ফড়িঙের চেহারাটি বেশ বড়োই বলতে হবে।
- সুকুমার রায়, ফড়িং, সুকুমার রায় সমগ্র রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী ও কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩০২
- খানিক পরে অনেক গুলাে ভূতের মত লােক মশাল হাতে নিয়ে গাড়ীর কাছে এল; তখন মশালের আলােতে মুরলা দেখ্ল কি আশ্চর্য দেশ। লাল রংএর তামার রাস্তা, দুইধারে বন, সে বনের গাছপালা সব শাদা শীশার। বনের পরে প্রকাণ্ড মাঠ, তাতে রূপার ঘাস ঝক্ঝক্ কর্ছে; সেই মাঠের মাঝখানে সােণার রাজবাড়ী। সেই বাড়ীর দরজার কাছে এসে রাজা বল্লেন, “আমি এই দেশের রাজা; এই আমার বাড়ী। তুমি এখানকার রাণী হলে।”
- সুখলতা রাও, ঘুমের দেশ, গল্পের বই - সুখলতা রাও, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক-ইউ, রায় এণ্ড সন্স্, কলকাতা, মুদ্রক- ব্রাহ্মমিশন প্রেস, প্রকাশসাল= ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯০-৯১
- রাজা তখন হাসিয়া বলিলেন, “ইহা পলাণ্ডু নহে; ইহাকে পিঁয়াজ বলে। পলাণ্ডু অতি বিষাক্ত সামগ্রী, তাহা কেবল ঔষধে ব্যবহার হয়। সকল দেশে তাহা জন্মে না; যে মাঠে জন্মে, মাঠের বায়ু দূষিত হইয়া যায়, এই ভয়ে সে মাঠ দিয়া কেহ যাতায়াত করে না। সে মাঠে আর কোনো ফসল হয় না।”
- সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পালামৌ, তৃতীয় সংস্করণ, সম্পাদনা- ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস, প্রকাশক- বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭
- ভিজে মাঠ, ভিজে ঘাট, শিশির শীতল,
ভিজে ভিজে পথখানি হয়েছে পিছল।
করবীগাছের ডালে রোদ স’রে যায়
শালিকের ছোট ছানা পালখ শুকায়।- সুনির্মল বসু, শীতের সকাল - সুনির্মল বসু, সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা- সুনির্মল বসু, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭২
- এতক্ষণ বৃষ্টি ছিল রিমঝিমে, ছন্দমধুর। সহসা সে-বৃষ্টি ক্ষেপিয়া গেল। মার্ মার্ কাট্ কাট্ শব্দে বৃষ্টি আকাশ ফাঁড়িয়া পড়িতে লাগিল। সাঁ সাঁ ঝম্ ঝম্ সাঁ সাঁ ঝম্ ঝম্ শব্দে কানে বুঝি তালা লাগিয়া যায়। তীর-ভূমি, তীরের মাঠ-ময়দান, ‘গাঁ-গেরাম’ আর চোখে দেখা যায় না। ধোঁয়াটে শাদা আবছায়ায় চারিদিক ঝাপসা হইয়া গিয়াছে।
- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, তিতাস একটি নদীর নাম- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশক- পুথিঘর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৫ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২২৩
- যখন পুকুরে হাঁস সোঁদা জলে শিশিরের গন্ধ শুধু পায়,
শামুক গুগলিগুলো প’ড়ে আছে শ্যাওলার মলিন সবুজে,—
তখন আমারে যদি পাও নাকো লালশাক-ছাওয়া মাঠে খুঁজে,
ঠেস্ দিয়ে ব’সে আর থাকি নাকো যদি বুনো চাল্তার গায়,
তাহ’লে জানিও তুমি আসিয়াছে অন্ধকারে মৃত্যুর আহ্বান—- জীবনানন্দ দাশ, রূপসী বাংলা - জীবনানন্দ দাশ, প্রকাশক- সিগনেট প্রেস, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৫
- জলের জন্তুরা চোখ ফুটেই দেখে জল আকাশ, ডাঙ্গার জীব তারা দেখে বন-জঙ্গল মাঠ, আর পাহাড়ের ছেলেমেয়ে তারা দেখে আকাশের উপরে বরফে ঢাকা ওই হিমালয়ের চুড়ো ক’টা। হিম-আলয় সন্ধি করে হয়েছে হিমালয় অর্থাৎ কিনা হিমালয় মানে হিমের বাড়ি, পাহাড়ি ভাষায় বলে হিমাল, সমস্কৃতোতে বলবে হিমাচলম্, ইংরেজ তারা ভালো রকম উচ্চারণ করতেই পারে না, ‘র’ বলতে ‘ল’ বলে ফেলে—তারা হিমালয়কে বলে ইমালোইয়াস্! হিমালয়ের মতো উঁচু আর বড় পর্বত জগতে নেই।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুড়ো আংলা-অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- সিগনেট প্রেস, প্রকাশস্থান-কলকাতা, প্রকাশসাল-১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৮৫
- জড়সড় দেহ মোর,—বড় শীত ভাই,
রোদ-ছাওয়া দাওয়াটায় বসি এসে তাই;
দুরে দেখি ফাঁকা মাঠে আলো ঝলমল,
শালিখের ঝাঁক সেথা করে কোলাহল।- সুনির্মল বসু, শীতের সকাল, সুনির্মল বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা- সুনির্মল বসু, প্রকাশক- মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭১
- দার্জিলিং থেকে উত্তরদিকে তাকালে হিমালয় যে কি সুন্দর দেখা যায়, কি বলব। এত উঁচু পাহাড় পৃথিবীতে আর কোথাও নাই:এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সারবাঁধা এতগুলো বিশাল পর্বতও আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। নীচের দিকে তাকাও, রঙ্গিত নদী দেখতে পাবে, সে প্রায় বাংলার মাঠের সমানই নিচু। উপরের দিকে তাকাও, দেখবে হিমালয় চূড়াগুলি যেন আকাশের গায়ে ঠেকে আছে তার সকলের চেয়ে উচুটি পাঁচ মাইলেরও বেশি উঁচু। রঙ্গিতের ধারে প্রায় আমাদের এখানের মতনই গরম, আর হিমালয়ের উপরে ভয়ংকর ঠাণ্ডা।
- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বিবিধ প্রবন্ধ, উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র, প্রকাশক-বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, প্রকাশস্থান- কলকাতা, পৃষ্ঠা ১০১৩
- যদি কোনো দূরতর জন্মভূমি হতে
তরী বেয়ে ভেসে আসি তব খরস্রোতে—
কত গ্রাম, কত মাঠ, কত ঝাউঝাড়,
কত বালুচর, কত ভেঙে-পড়া পাড়
পার হয়ে এই ঠাঁই আসিব যখন
জেগে উঠিবে না কোনো গভীর চেতন?- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পদ্মা, চৈতালি-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫৬
- খোঁড়া হাঁসের সঙ্গে মানস-সরোবরে যাবার জন্যে রিদয় ঘর ছেড়ে মাঠে এসে দেখলে নীল আকাশ দিয়ে দলে-দলে বক, সারস, বুনোহাঁস, পাতিহাঁস, বালুহাঁস, রাজহাঁস সারি দিয়ে চলেছে। এই সব পাখির দল পুবে সন্দ্বীপ থেকে ছেড়ে আমতলির উপর দিয়ে দুভাগ হয়ে, এক ভাগ চলেছে—গঙ্গাসাগরের মোহানা ধরে গঙ্গা-যমুনার ধারে-ধারে হরিদ্বারের পথ দিয়ে হিমালয় পেরিয়ে মানস সরোবরে; আর-একদল চলেছে—মেঘনানদীর মোহানা হয়ে আমতলি, হরিংঘাটা, গঙ্গাসাগর বাঁয়ে ফেলে, আসামের জঙ্গল, গারো-পাহাড় খাসিয়া-পাহাড় ডাইনে রেখে, ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁকে-বাঁকে ঘুরতে-ঘুরতে হিমালয় পেরিয়ে তিব্বতের উপর দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা ধবলাগিরির উত্তর-গা ঘেঁষে সিধে পশ্চিম-মুখে মানস-সরোবরে।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চলন বিল, বুড়ো আংলা-অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- সিগনেট প্রেস, প্রকাশস্থান-কলকাতা, প্রকাশসাল-১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৫
- হেরে গো ওই আঁধার হল,
আকাশ ঢাকে মেঘে।
ও পার হতে দলে দলে
বকের শ্রেণী উড়ে চলে,
থেকে থেকে শূন্য মাঠে
বাতাস ওঠে জেগে।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ক্ষণিকা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ (১৪০০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৯২
- পুকুরের মধ্যে লাশ গুঁজিয়া রাখিয়া ঠ্যাঙাড়েরা পরবর্তী শিকারের উপর দিয়া এ বৃথা শ্রমটুকু পোষাইয়া লইবার আশায় নিরীহমুখে পুকুরপাড়ের গাছতলায় ফিরিয়া যাইত। গ্রামের উত্তরে এই বিশাল মাঠের মধ্যে সেই বটগাছ আজও আছে, সড়কের ধারের একটা অপেক্ষাকৃত নিম্নভূমিকে আজও ঠাকুরঝি পুকুর বলে। পুকুরের বিশেষ চিহ্ন নাই, চৌদ্দ আনা ভরাট্ হইয়া গিয়াছে— ধান আবাদ করিবার সময় চাষীদের লাঙলের ফালে সেই নাবাল জমিটুকু হইতে আজও মাঝে মাঝে নরমুণ্ড উঠিয়া থাকে।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, পথের পাঁচালী, চতুর্থ পরিচ্ছেদ, পথের পাঁচালী- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সপ্তম সংস্করণ, প্রকাশক- পি. মিত্র, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬
- মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান,
দেহের স্বাদের কথা কয়;
বিকালের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট ক’রে দেবে তার সাধের সময়।
- টালিগঞ্জের অমন খাসা বাসা কি ছাড়া যায়? কলকাতায় থেকেও সে কলকাতার বাইরে আছে! জনতার আর ট্রাম-বাস-টাক্সির হট্টগোল নেই, হাজার পাখীর ‘কোরাস’ শুনে তার ঘুন ভাঙে, চারিদিকে তাকিয়েই দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ ভ’রে সবুজ রঙের স্রোত বইছে এবং তার উপরে ঝ’রে পড়ছে নীলাকাশের আলোর ঝরণা! ও বাসা ছাড়া হবে না!
- হেমেন্দ্রকুমার রায়, মড়ার মৃত্যু, পঞ্চম পরিচ্ছেদ, মড়ার মৃত্যু - হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রকাশক- আরতি এজেন্সি, প্রকাশসাল- ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৫
- সমুদ্রের ধারের জমিতেই নারিকেলের সহজ আবাস। আমাদের আশ্রমের মাঠ সেই সমুদ্রকূল থেকে বহুদূরে। এখানে অনেক যত্নে একটি নারিকেলকে পালন করে তোলা হয়েছে- সে নিঃসঙ্গ, নিষ্ফল, নিস্তেজ। তাকে দেখে মনে হয়, সে যেন প্রাণপণে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে দিগন্ত অতিক্রম করে কোনো-এক আকাঙ্ক্ষার ধনকে দেখবার চেষ্টা করছে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,বনবাণী ,১৯৬৮ (পৃ. ৩৯)
- চুরি করিতে এ বাড়ীতে আসিয়াছিলাম, চুরি করিয়াই এ বাড়ী ছাড়িলাম। চোরকাঁটা কাপড়ে লাগিয়া মাঠ হইতে বাড়ীতে আসে, আবার তাকে কাপড় হইতে ছাড়াইয়া লোকে বাহিরেই ফেলে। অল্প দিনের জন্য যে আশ্রয়টকু পাইয়াছিলাম তাই আমার যথেষ্ট—কথায় বলে চোরের রাত্রিবাসই লাভ!
- চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, চোরকাঁটা - চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ১১ পরিচ্ছেদ, প্রকাশক- দীপনী, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯১
- মাঠ দিয়ে যখন চল, তখন আকাশের দিকে কি একবার চেয়ে দেখ—সেখানে বাজ-পাখি, চিল, কাক, শকুনি আছে কিনা? সেটা একবার-একবার দেখে চলা মন্দ নয়। ফস-করে ঝোপে-ঝাড়ে উঠতে যেয়ো না; গেরো-বাজগুলো অনেক সময় সেখানে শিকার ধরতে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যা হলে কান পেতে শুনবে, কোনো দিকে পেঁচা ডাকল কিনা। পেঁচারা এমন নিঃশব্দে উড়ে আসে যে টের পাবে না কখন ঘাড়ে পড়ল!
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হং পাল, বুড়ো আংলা-অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- সিগনেট প্রেস, প্রকাশস্থান-কলকাতা, প্রকাশসাল-১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬২-৬৩
- বিনয় তাহাকে আজ গড়ের মাঠে সার্কাস দেখাইতে লইয়া গিয়াছিল। যদিও অনেক রাত্রি হইয়াছিল তবু তাহার এই প্রথম সার্কাস দেখার উৎসাহ সে সম্বরণ করিতে পারিতেছিল না। সার্কাসের বর্ণনা করিয়া সে কহিল, “বিনয়বাবুকে আজ আমার বিছানায় ধরে আনছিলুম। তিনি বাড়িতে ঢুকেছিলেন, তার পরে আবার চলে গেলেন। বললেন কাল আসবেন। দিদি, আমি তাঁকে বলেছি তোমাদের একদিন সার্কাস দেখাতে নিয়ে যেতে।”
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গোরা, ১৮ পরিচ্ছেদ, গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৪৯
- বাসন-মাজার পরে ঘাটে যাওয়া, রান্না, খাওয়ানো দাওয়ানো, দুপুরে পান মুখে দিয়াই ছুটিতে হইবে ঘাটে, গরুকে জল খাওয়াইতে সে নদীর ধারের মাঠে, যেখানে গরুকে গোঁজ পুঁতিয়া রাখিয়া আসা হইয়াছে। সেই সময়টা যা একটু ভালো লাগে—নীল আকাশ, নদীর ধারে কাশ ফুল দোলে, মস্ত জিউলি গাছের গা বাহিয়া সাদা সাদা মোমবাতি-ঝরা মোমের মতো আটা ঝরিয়া পড়ে, হু হু খোলা হাওয়া বয় ওপারের দেয়াড়ের চর হইতে, পাট-বোঝাই গরুর গাড়ির দল ক্যাঁচ কোঁচ করিতে করিতে ঘাটের পথের রাস্তা দিয়া কোথায় যেন যায়।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডাকগাড়ি, জন্ম ও মৃত্যু - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক- ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬২ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১৮৭
- যদি, একটি ব্যক্তিগত নাগরিকের বিনয়ী স্টেশনে আমার অবসরে, আমি আমার সহ নাগরিকদের সম্মান এবং অনুমোদনের সাথে থাকি, রক্তমাখা ইস্পাত দ্বারা প্রাপ্ত ট্রফিগুলি, বা তাঁবুর মাঠের ছিন্ন পতাকাগুলি কখনই ঈর্ষান্বিত হবে না। মানুষের জীবন এবং সুখের যত্ন, এবং তাদের ধ্বংস নয়, ভাল সরকারের প্রথম এবং একমাত্র বৈধ উদ্দেশ্য।
- ক্যাম্পের বাহিরে কিন্তু দুর্গের সীমানার মধ্যেই উত্তর দিকে হাত ত্রিশেক নীচু জমিতে পাথর কাটিয়া খেলার মাঠ প্রস্তুত করা হইয়াছিল। সে মাঠে একপাশে মাটিও ছিল। মাঠটিতে সিপাহীরা ফুটবল ও হকি খেলিয়া থাকে, কারণ ব্যায়াম করিলে মনে সুখ ও শরীরে স্বাস্থ্য বৃদ্ধি পায় এবং সিপাহীদের এদুটি জিনিসের নাকি বেশী আবশ্যক, সামরিক কর্তৃপক্ষ বহু আগেই আবিষ্কার করিয়াছিলেন। খেলার মাঠে রিহার্সেল না দিয়া কোন সেনাপতিই লড়াইয়ের মাঠে সৈন্য-চালনা করিতে রাজী হয় না।
- অমলেন্দু দাশগুপ্ত, বক্সা ক্যাম্প- অমলেন্দু দাশগুপ্ত, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক- বেঙ্গল পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৯৩
- শিক্ষাগ্রন্থ বাগানের গাছ নয় যে, সৌখীন লোকে সখ করিয়া তার কেয়ারি করিবে, —কিম্বা সে আগাছাও নয় যে, মাঠে বাটে নিজের পুলকে নিজেই কণ্টকিত হইয়া উঠিবে!
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষার বাহন, পরিচয় - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশসাল- ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩২৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১২২
- মাঠ থেকে মাঠে-মাঠে—সমস্ত দুপুর ভ’রে এশিয়ার আকাশে-আকাশে
শকুনেরা চরিতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁটি বস্তি; নিস্তব্ধ প্রান্তর
শকুনের; যেখানে মাঠের দৃঢ় নীরবতা দাঁড়ায়েছে আকাশের পাশে
আরেক আকাশ যেন—- জীবনানন্দ দাশ, শকুন, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, প্রকাশক- নাভানা, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬১ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪৩
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় মাঠ (কৃষি) সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।
উইকিঅভিধানে মাঠ শব্দটি খুঁজুন।
উইকিমিডিয়া কমন্সে মাঠ সংক্রান্ত মিডিয়া রয়েছে।