মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯
মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ ভারতে মুসলিম নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্র ও পরিস্থিতিগুলো নিয়ে কাজ করে। এই আইনের শিরোনাম এবং বিষয়বস্তু ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন-এর সাথে সম্পর্কিত যা মুসলিমদের বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে আলোচনা করে। ১৯৩৯ সালের এই আইনটি (১৯৩৯ সালের ৮ নম্বর আইন) মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহিত নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা সংক্রান্ত বিধানগুলোকে একীভূত ও স্পষ্ট করার জন্য প্রণীত হয়েছিল। ১৯৩৯ সালের ১৭ মার্চ এই আইনটি গভর্নর জেনারেলের সম্মতি লাভ করে। মুসলিম আইনে একজন স্ত্রী বিচারবহির্ভূত বা বিচারিক উভয় পদ্ধতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ দাবি করতে পারেন। বিচারবহির্ভূত পদ্ধতিগুলো হল তালাক-ই-তাফভিজ এবং লিয়ান। অন্যদিকে বিচারিক পদ্ধতিটি এই ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই আইনটি বিবাহ বিচ্ছেদের ভিত্তি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতিগুলো সংজ্ঞায়িত করে।
উক্তি
[সম্পাদনা]- নিজেদের শক্তি সংরক্ষণের বিষয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের চিন্তা কতদূর যেতে পারে তার সর্বোত্তম উদাহরণ হতে পারে কেন্দ্রীয় পরিষদে ১৯৩৯ সালের ৮ নম্বর মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের ওপর হওয়া বিতর্কগুলো। ১৯৩৯ সালের আগে নিয়ম ছিল যে মুসলিম আইনে বিবাহিত কোনো নারী বা পুরুষের ধর্মত্যাগ (মুরতাদ হওয়া) স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিত। এর ফলে কোনো বিবাহিত মুসলিম নারী ধর্ম পরিবর্তন করলে তিনি তার নতুন ধর্মাবলম্বী কোনো ব্যক্তিকে বিবাহ করতে পারতেন। অন্তত গত ৬০ বছর ধরে ভারতের আদালতগুলোতে এই আইনি নিয়মটিই বলবৎ ছিল।
- বি আর আম্বেদকর; পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া (১৯৪৬)।
- আইনি যুক্তিগুলোর সাথে এই পরিবর্তনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের কোনো সম্পর্ক ছিল না। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ধর্মে নারীদের ধর্মান্তকরণ বন্ধ করা। কারণ দেখা যেত ধর্মান্তরিত হওয়ার পরেই সেই ধর্মের কাউকে তড়িঘড়ি বিয়ে করে ফেলার মাধ্যমে ওই নারীকে নতুন সম্প্রদায়ের সাথে আটকে ফেলা হতো এবং তার আদি সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাওয়া অসম্ভব করে তোলা হতো। সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে একজন মুসলিম নারীর হিন্দু ধর্মে বা একজন হিন্দু নারীর ইসলাম ধর্মে রূপান্তর অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ফলাফলের জন্ম দেয়। এর অর্থ হল দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার সংখ্যার ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটা। যেহেতু নারীদের অপহরণের মাধ্যমে এই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছিল তাই এটিকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। কারণ একজন নারী জাতীয়তাবাদের জন্য সেই উর্বর ক্ষেত্র যা একজন পুরুষ কখনোই হতে পারে না। নারীদের এই ধর্মান্তকরণ এবং পরবর্তী বিবাহগুলোকে হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষই নিজেদের আপেক্ষিক সংখ্যার শক্তি পরিবর্তনের লক্ষ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে পরিচালিত লুন্ঠন হিসেবেই গণ্য করত। নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার এই জঘন্য প্রথাটি গবাদি পশু চুরির মতোই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যের জন্য এটি স্পষ্টতই বিপজ্জনক হওয়ায় এটি বন্ধের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এভাবেই আইনের পরিবর্তনের মূলে কাজ করেছে সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার আকাঙ্ক্ষা এবং এই উদ্দেশ্যেই নারীদের অধিকার বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।
- বি আর আম্বেদকর; পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া (১৯৪৬)।
- অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলামেও ধর্মত্যাগকে একটি বড় অপরাধ এমনকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। ইসলাম ধর্মে এই বিধান থাকা কোনো নতুন বিষয় নয়। আমরা যদি যেকোনো জাতির পুরনো আইনগুলো দেখি তবে সেখানেও একই ধরনের বিধান দেখতে পাব। পুরুষের জন্য ছিল মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি আর নারীর জন্য ছিল কেবল কারাদণ্ড। এর মূল বিধানটি ছিল যেহেতু এটি একটি পাপ এবং অপরাধ তাই তাকে শাস্তি পেতে হবে এবং ওই নারী স্ত্রীর মর্যাদা হারাবেন। তিনি কেবল স্ত্রীর মর্যাদাই হারাতেন না বরং সমাজে তার সকল মর্যাদা এবং সেই সাথে সম্পত্তি ও নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতেন। তবে আমরা দেখি যে ১৮৫০ সালেই এখানে ১৮৫০ সালের ২১ নম্বর ‘কাস্ট ডিজঅ্যাবিলিটিজ রিমুভাল অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন পাস করা হয়েছিল।
- বিলটির উত্থাপক এবং এমএলএ কাজী কাজমি কর্তৃক প্রদত্ত যুক্তি; বি আর আম্বেদকর রচিত পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া (১৯৪৬) বইয়ে উদ্ধৃত।
- দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটিশ ভারতের আদালতগুলো কোনো শর্ত ছাড়াই এই মত পোষণ করে আসছিল যে সকল পরিস্থিতিতে ধর্মত্যাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম বা ডিক্রি ছাড়াই দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটায়। আদালত এই অবস্থানই নিয়ে আসছিল। এখন এই বিষয়ে হানাফি ফকিহদের তিনটি আলাদা মত রয়েছে। একটি মত বুখারা ফকিহদের, তাদের মতে ধর্মত্যাগের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আরও নির্ভুলভাবে বললে বুখারার মত অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ হয় না বরং তা স্থগিত থাকে। বিবাহ স্থগিত রাখা হয় এবং ওই নারীকে ততক্ষণ হেফাজতে বা বন্দি করে রাখা হয় যতক্ষণ না তিনি অনুতপ্ত হয়ে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাকে পুনরায় সেই স্বামীর সাথে বিয়ে করতে উৎসাহিত করা হয় যার সাথে বিবাহটি স্থগিত ছিল। দ্বিতীয় মতটি হল ধর্মত্যাগের ফলে একজন বিবাহিত মুসলিম নারী তার স্বামীর স্ত্রী হিসেবে মর্যাদা হারাবেন এবং তার বাঁদিতে পরিণত হবেন। এই মতের একটি সম্পূরক অংশ হল তিনি কেবল তার সাবেক স্বামীর বাঁদি নন বরং পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের বাঁদিতে পরিণত হবেন এবং যে কেউ তাকে কাজে লাগাতে পারবে। সমরকন্দ ও বলখের ওলামাদের তৃতীয় মতটি হল ধর্মত্যাগের ফলে বৈবাহিক বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না এবং ওই নারী পূর্বের মতোই তার স্বামীর স্ত্রী হিসেবে বহাল থাকেন। এই তিনটি মতই বিদ্যমান।
- সৈয়দ গোলাম ভিক নাইরান; বিলের সমর্থনে দেওয়া বক্তব্য; বি আর আম্বেদকর রচিত পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া (১৯৪৬) বইয়ে উদ্ধৃত।