শক্তিপদ রাজগুরু
অবয়ব
শক্তিপদ রাজগুরু (১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২২ - ১২ জুন ২০১৪) একজন ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। মেঘে ঢাকা তারা তার জনপ্রিয়তম ও বিখ্যাত উপন্যাস। দীর্ঘজীবী এই সাহিত্যিক তিন শতাধিক গ্রন্থের লেখক।

উক্তি
[সম্পাদনা]- জীবনের পথ চলাই যেন এক পরিক্রমা—ওই প্রবহমান জীবনধারা মানুষকে অনেক পরিপূর্ণ—সম্পূর্ণ করে তোলে। জীবনই তো সেই মহিমময় কোনো মহাদেবতার প্রসাদে রূপময়—বর্ণময়—অপরূপ। আজ সেই মহাজীবনকে তারা স্পর্শ করেছে ওই নরহরি-কুন্তী-যুধিষ্ঠির-মোনা মিত্তির—সেই শান্তি ভরা মন নিয়ে ওরা ঘরে ফিরছে।
- বাতাসে জলকল্লোলের শব্দ ওঠে। ওটা এখানকার আকাশ-বাতাসে মিশিয়ে আছে। কখনও কমে, কখনও বা ওই নদীর জোয়ারের সময় মুখোট হাওয়ার সাপ্টে ওঠে। সেই গর্জন যেন হাজারো সাপের ক্রুদ্ধ ছোবলের শব্দ নিয়ে ওঠে আকাশে বাতাসে। মাটির রং কেমন সাদাটে, একেবারে নোনতা; ঊষরতা ওর মরেনি।
- মধুর কোথায় যেন সব হারিয়ে গেছে। তবু মনে হয় অনেক পেয়েছে সে। এ পাওয়ার পরিমাণ সে জানে না, নিজেকে ফিরে পেয়েছে সে।
- একটা অযত্নে গড়ে ওঠা ছাতিম গাছ তার মতই বিবর্ণ ধূলিধূসর। পাতাগুলোয় চেকনাই নেই। ওর মধ্যেই আবার দু-তিনটে কাকদম্পতি বাসা বেঁধেছে। তাদের বাসা থেকে খড় কুটো শুকনো বিষ্ঠাও পড়ে হরিধনের আদুড় খড়িওঠা পিঠে। হরিধনের এ-সব নিয়ে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।
- শিল্পী, সাহিত্যের সেরা গল্প
মেঘে ঢাকা তারা
[সম্পাদনা]মেঘে ঢাকা তারা, অমৃতধারা
- সেদিন ছিল নিজের দেশ, নিজের কিছু জমিজিরেত, একটু আশ্রয় ছিল। সাতপুরুষের গ্রামে একটু মান-সম্মান পরিচিতিও না থাকা ছিল না। আজ সব কোন দিকে হারিয়ে বানেভাসা খড়কুটোর মতো ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকেছে এই অচেনা অজানা ঠাঁই-এ, সামান্য ওই স্কুলমাস্টারির চাকরিতে ভরসা করে, তা ওই আপনভোলা লোকটিকে বোঝাতে পারে না কাদম্বিনী। একার রোজগার আর ওই এতগুলি পোষ্য। অভাব আর অনটনের নগ্নছায়া এ সংসারের সর্বত্র।
- পৃষ্ঠা ৯
- কিছুদিন আগেও ফাঁকা মাঠ জলা পড়ে ছিল এখানে। বাঁশবন জলকচুর ঝোপের নীচে দিয়ে খালটা বয়ে গেছে। জনহীন সেই উপকণ্ঠের মাঠে আজ শত শত গৃহহারা পরিবার বাসা বেঁধেছে পাকিস্তান থেকে সব হারিয়ে এসে। লাইনের ধারে আমবাগানের গাছের পাতায় আবছা আলো, শিরশিরিয়ে ওঠে নারকেলপাতায় চাঁদের আলোমাখা বাতাস। দূরে দূরে দু-একটা আলো জ্বলছে। ভেসে আসে কীর্তনের সমবেত তান। কলোনির মাঝে কীর্তন-খোলা গড়ে তুলেছে তারা।
- পৃষ্ঠা ১৩-১৪
- ....অন্য জগতের লোক ওরা; ঘড়ির কাঁটাকে ধরবার জন্য ছোটে।
ছোটার বিরাম নেই। ছুটতে ছুটতে একদিন হুমড়ি খেয়ে পড়ে—ছোট্ট জগতের সীমা সীমিত হয়ে যায়। আর ওঠে না। জীবন-যন্ত্রণার শেষ হয়ে যায়।- পৃষ্ঠা ১৬
- জীবনের স্রোত বয়ে চলেছে। মানুষের ভিড়।
হাজারো মানুষের মনে হাজারো চিন্তার জট; মহাসমুদ্রে সবাই যেন একটি স্বতন্ত্র দ্বীপ। নিজের চারিপাশে স্তব্ধ নির্জন ঢেউভাঙা সমুদ্র। কোথাও প্রবালের রঙ, কোথাও মেঘঢাকা বৃষ্টিভরা আকাশ কোথাও সিন্ধুপারের উর্মি, তার ঢেউভাঙা গুঞ্জরণ।
হাজারো মানুষ চলেছে তবু তারা স্বতন্ত্র, সবাকার অস্তিত্ব মিলে একটি স্রোতমুখর মহাজীবনধারা।- পৃষ্ঠা ১৯
- মনের সব শ্রী আজ কুশ্রী হয়ে উঠেছে। জীবনের সব আনন্দের ভোজ থেকে সে বাতিল একটি প্রাণী, সংসার আর অপরের জন্যই তার এই উদয়াস্ত পরিশ্রম। জীবনের কোনো সৌন্দর্য, কোনো ভবিষ্যৎ স্বপ্নে তার অধিকার নেই। মা যেন বিকটাকার দানবের মতো তার চাওয়া-পাওয়ার সব পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। নইলে তাকে প্রশ্ন না করেই সনৎকে নিয়ে গীতার জন্য ভাবতে পারত না। মা হয়তো সব কিছু জেনেশুনেই এড়িয়ে গেছে—নীতাকে তাদের প্রয়োজন বলেই ছাড়তে নারাজ।
- পৃষ্ঠা ৩৭
- ওরা জীবনকে দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচাই করে নিতে চায় না। নিশ্চিন্ত আরামে বাঁচবার জন্য কাঙাল। তাই দুঃখ ওদের পরাজিত বিপর্যস্ত করেছে পদে পদে।
- পৃষ্ঠা ৪২
- সবকিছু বদলাচ্ছে। মানুষের মনও। নইলে কাঞ্চন ফেলে কাঁচ কুড়োবার এত ধুমধাম চলবে কেন চারিদিকে!
- পৃষ্ঠা ৪৫
- পারের দুঃখে যারা কষ্ট পায় তাদের দুঃখ কোনদিনই ঘোচে না—ঘুচতে পারে না।
- পৃষ্ঠা ৪৭
- ক্রমশঃ সব পরিষ্কার হয়ে আসছে। অন্য কোন পথ তার নেই, একটা নিবিড় আধার যেন ঘিরে রয়েছে তার চারি পাশে; নিবিড় মেঘে ঢেকে আছে তারার সন্ধান, সেই মেঘমুক্তি তার চাই--এই হোক তার সাধনা।
- পৃষ্ঠা ৫১
- তবু মনে হয় বেঁচে থাকার একটা আনন্দ আছে। সংসার একেবারে নিষ্করুণ নয়। চারিদিকে থেকে আঁধার ঘনিয়ে আসে না একসঙ্গে। কালোমেঘের পাশেই রুপোলি আলোর নিশানা জাগে। আঁধারের মাঝে জেগে আকাশভরা তারা—আর চাঁদ। দিনের সবহারানো আলোয় তারা হারিয়ে যায়, আবার অন্ধকারে অতলে ক্ষীণ ম্লান দীপ্তিতে জেগে ওঠে তারকার দল—আশার আলোয় মন ভরে তোলে।
- পৃষ্ঠা ৫৯
- এর মধ্যে মানুষের ধর্ম তবুও টিকে আছে। চারিদিকের তমসার মাঝে তবু জ্বলে আলোকশিখা; নইলে সবই অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যেত, ভালমন্দে কোনো পার্থক্য থাকত না। অবলুপ্তি ঘটত সব কিছুর।
- পৃষ্ঠা ৭০
- শুধু বেঁচে থাকার আনন্দে ওরা সব ভুলতে চায়। বাঁচাটাই যেন পরম সত্য।
- পৃষ্ঠা ৯৫
- এর নাম দেবতার কল্যাণ ভিক্ষা! কথাটা আজ বিশ্বাস করে না নীতা। কি দিয়েছে তাকে জীবন? কি তারা পেয়েছে জীবন দেবতার কাছে? কোনো কৃতজ্ঞতা সেখানে তাদের নেই।
- পৃষ্ঠা ১০৯
- ফুল ফোটে—ঝরে। বৃন্তে রেখে যায় ফলের সঙ্কেত। কিন্তু তার জীবন বৃত্তে কীটদষ্ট ফুলের ব্যর্থ পরিণতি। নিঃশেষিত সৌরভ, লুপ্ত হয়ে গেছে তার সব বর্ণ আর গৌরব, এখন শুধু পথপানে তাকিয়ে থাকা, আর ঝরে যাবার জন্যই এই নীরব প্রতীক্ষা করা।
- পৃষ্ঠা ১২১
- একটি জীবনের ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া—কলরব; বেঁচে থাকার জন্য আশার আলোর সংগ্রাম, সব অতল স্তব্ধতায় ডুবে গেল।
পাহাড় ছেয়ে আসে অতর্কিত মেঘে, দিনের খেয়ালি আলো কোনো অতলে হারিয়ে গেছে, পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ নামে পাহাড়ের বুকে—সাদা হালকা জলকণার ঘন যবনিকার আড়ালে পাইন গাছের গুড়িগুলো কালের প্রহরীর মতো জেগে থাকে।
শনশন শব্দে নামে বৃষ্টিধারা। একটি সত্তার নিঃশেষ অবলুপ্তি ঘটে অসীম পাহাড়ঘেরা মেঘলোকে।
বৃষ্টি নেমেছে। অঝোর বৃষ্টি!- পৃষ্ঠা ১২৭
- তবে ওদের শ্রেণীরই ও অন্যজন। পথে-ঘাটে-আপিসে স্কুলে ওদের দেখা মেলে।
জীবনে ওরা স্নেহ-প্রেম-প্রীতি কিছুই পায়নি—সবাই ঠকিয়েছে ওদের এতটুকু ভালোবাসা থেকেও পৃথিবী ওদের বঞ্চিত করেছে। বুক-ভরা প্রেম ব্যর্থ জ্বালায় জ্বালিয়ে খাক করে দেয় ওদের।- পৃষ্ঠা ১২৮
জীবন কাহিনি
[সম্পাদনা]- এরই মাঝে আবার সে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে, একজনকে কেন্দ্র করে। এ বাঁচায় তৃপ্তি আছে, আনন্দ আছে।
মনে মনে তাই সুর জাগে। ঘন মেঘের ফাঁকে সূর্যের অরুণিমা ফুটে উঠেছে, তির্যক আলো-মাখা একটি বলিষ্ঠ রেখায়।
তার সম্পর্কে উক্তি
[সম্পাদনা]- অন্য দিকে, তিনি দেখেছিলেন স্বাধীনতার পরেই কেমন করে কাতারে কাতারে মানুষ ও পার বাংলা থেকে শিকড় ছিন্ন করে বাধ্য হয়ে এ পারে চলে আসছেন। এক দিকে, তাঁদের পুরুষানুক্রমিক বসবাসের স্মৃতিমেদুর স্বভূমি ত্যাগের হাহাকার আর অন্য দিকে, এ দেশে এসে সহায়-সম্বলহীন হয়ে তীব্র দারিদ্রের মুখোমুখি হওয়া— এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন শক্তিপদ।
- আজ তাঁর মৃত্যুদিনে (১২ জুন) দাঁড়িয়ে মনে হয়, প্রশ্নটাই অবান্তর ছিল। সাহিত্যের আমদরবারে যে ভালবাসা পেয়েছেন বাঁকুড়ার এই জাতক, তাতে খাসমহলকে হয়তো থোড়াই কেয়ার করতেন তিনি!
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় শক্তিপদ রাজগুরু সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।