বিষয়বস্তুতে চলুন

শিশিরকুমার বসু

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

শিশিরকুমার বসু (২ ফেব্রুয়ারি ১৯২০ – ৩০ সেপ্টেম্বর ২০০০) ছিলেন একজন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং বিধায়ক। তিনি ছিলেন শরৎচন্দ্র বসুর পুত্র, সুভাষচন্দ্র বসুর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং প্রাক্তন সাংসদ কৃষ্ণা বসুর (১৯৩০–২০২০) স্বামী।

উক্তি

[সম্পাদনা]

মহানিষ্ক্রমণ

[সম্পাদনা]

মহানিষ্ক্রমণ, প্রথম সংস্করণ: মার্চ ১৯৭৫, প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

  • রাঙাকাকাবাবুর সম্বন্ধে আমার যে প্রথম স্মৃতি, তার সঙ্গে ১৯৪০-৪১ সালের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের ঐতিহাসিক দিনগুলির এক আশ্চর্য সাদৃশ্য আছে। সেটা ছিল বহু দিন আগে ১৯২৭ সালের কথা, উনি বর্মার বন্দিদশা থেকে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে ফিরে এসেছেন। আমি তখন নেহাতই বালক, তাঁর বিছানার পাশে বসে আমি অবাক বিস্ময়ে ওঁর দিকে, ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, আমার মনে হত যেন এক যোগী পুরুষ আমাদের পরিবারের মাঝে আবির্ভূত হয়েছেন। ১৯৪০ সালে আবার ওঁর অসুস্থ শয্যাপার্শ্বে বসে রাতের পর রাত ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হত, কী যেন এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। এ যেন জীবন্ত বিপ্লবের ছবি, আদর্শের বেদীমূলে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের এক অতুলনীয় মূর্তি।
    • ১
  • অক্টোবর মাসে সহবন্দীদের নিয়ে নেতাজী জেলের মধ্যে দুর্গাপূজার আয়োজন করলেন। তাতে আমাদের খুব উৎসাহ। বিসর্জনের দিন জেল-গেটের কাছে প্রতিমা নেবার জন্য যে দলটি গেল আমি তাদের সঙ্গে জুটে পড়লাম।
    • ২
  • বাবার সম্বন্ধে বলতে গিয়ে রাঙাকাকাবাবু বললেন যে, তাঁর ‘মেজদা’ জীবনে কোনদিন তাঁর কোন কাজে বাধা দেননি। বরঞ্চ যে-কোন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেবার মুহূর্তে মেজদার কাছ থেকে উনি পেয়েছেন উৎসাহ ও সমর্থন। আজ যদি মেজদা তাঁর নিজের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার জন্য ওর ছোট ভাইয়ের এই বিপদের পথে পাড়ি দেওয়া সমর্থন না করেন, তবে উনি কঠিন সমস্যায় পড়ে যাবেন। আমার মনে আছে, বাবা জানুয়ারির গোড়ায় কলকাতায় ফেরার আগে রাঙাকাকাবাবু দুই-তিনবার লেট-ফি দিয়ে কালিম্পং-এর ঠিকানায় শেয়ালদায় দার্জিলিং মেল ট্রেনে বাবাকে লেখা চিঠি পোস্ট করেছেন। পোস্ট অফিসের মারফত চিঠি না পাঠালে হয়ত সেন্সর এড়িয়ে যাওয়া যাবে এই মনে করেই সম্ভবত তিনি এরূপ করতেন।
    • ৫
  • আমরা এক দিকে রাতের পর রাত ধরে বিভিন্ন পরামর্শ ও পরিকল্পনা করতে লাগলাম, অন্য দিকে রাঙাকাকাবাবু যাত্রার পথে যে সব বিভিন্ন ধরনের বাধা উপস্থিত হতে পারে তার মোকাবিলা করা ও লোকের মনে যাতে কোন সন্দেহের উদ্রেক হতে না পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বনে উদ্যোগী হলেন। যেমন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায়, এমনকি চিঠিপত্রে উনি বারবার বলতে লাগলেন যে, ওঁকে তো শীগগিরই আবার জেলে ফিরে যেতে হবে। আত্মীয়-বন্ধু-সহকর্মী সকলের কাছে উনি আরো বারবার বলতে লাগলেন, যুদ্ধ শেষ না হলে তো ওঁকে ছাড়বে না, তাই ওঁর ব্যক্তিগত এবং জাতীয় যে সব কাজকর্ম আছে সব গুছিয়ে রেখে যেতে হবে। যেমন—ওঁর অনুপস্থিতিতে মহাজাতি সদন পরিকল্পনার কি হবে উনি আলোচনা করেছিলেন। কলকাতা কর্পোরেশন মহাজাতি সদনের জন্য জমি ব্যক্তিগতভাবে ওঁর নামে লিখে দিয়েছিল। রাঙাকাকাবাবুর চিন্তা হল যে, ওঁর অন্তর্ধানের পরে ওঁর এই মানসগৃহ আইনের হাত থেকে অব্যাহতি পাবে না। একবার ভেবেছিলেন, ওঁর অ্যাটর্নীকে বলে এই সম্পত্তি একটা ট্রাষ্টি বোর্ডের কাছে হস্তান্তরিত করে যাবেন। কিন্তু বন্ধুমহলে অকারণে এতে সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে ভেবে এই চিন্তা ছেড়ে দিলেন।
    • ৭
  • যখন আমাদের কথাবার্তা ও ব্যবস্থাদি বেশ খানিকটা এগিয়েছে, তখন আমি এই অন্তর্ধান-পর্বের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজের ভার পেলাম। যেমন রোজ সন্ধ্যাবেলা যাই তেমনি সেদিনও রাঙাকাকা-বাবুর কাছে গিয়েছি। গিয়ে দেখলাম ঘর-ভরতি অনেক লোক। আমি তাই বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু উনি আমাকে ভেতরে ডেকে পাঠালেন এবং একজন সুদর্শন পাঠানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। উনি হলেন মিয়া আকবর শাহ। রাঙাকাকাবাবু বললেন যে, সেদিন রাত্রেই মিয়াসাহেব দেশে ফিরে যাচ্ছেন, রাঙাকাকাবাবু তাঁর সেক্রেটারিকে আগেই হাওড়া স্টেশনে পাঠিয়ে দিচ্ছেন মিয়া-সাহেবের রেল টিকেট ও রিজার্ভেশনের ব্যবস্থা করতে। আমাকে ভার দিলেন প্রথমে মিয়াসাহেবকে আমার গাড়িতে করে একটু কেনাকাটার জন্য বাজারে নিয়ে যেতে হবে, তারপর তাঁর হোটেল থেকে মালপত্র তুলে নিয়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিতে হবে। রাঙাকাকাবাবু আমাকে বিশেষ করে বলে দিলেন স্টেশনের ভিতরে যেন আমি না যাই। ওঁর সেক্রেটারি স্টেশনের সামনেই থাকবেন, এবং মিয়াসাহেবকে রওনা করে দেবেন। আমি যেন মিয়াসাহেবকে স্টেশনের গাড়ি-বারান্দায় ছেড়ে দিয়েই চলে আসি।
    সেদিন আমার গাড়ির ড্রাইভার ছিল, আমি মিয়াসাহেবের সঙ্গে পিছনের সীটে বসে ইংরেজীতে আলাপ করতে লাগলাম। উনি আমাকে বললেন, রাঙাকাকাবাবু ওঁকে বলেছেন যে, তাঁর ওপর যেমন অপর প্রান্তের ও সীমান্তের ওপারের ব্যবস্থাপনার ভার ন্যস্ত হয়েছে, তেমনি এ প্রান্তে ওঁর সাহায্যকারী হিসাবে উনি আমাকে বেছে নিয়েছেন। মিয়াসাহেব আমাকে বললেন, ওঁকে ধর্মতলার ওয়াছেল মোল্লার দোকানে নিয়ে যেতে। উনি একটা টুপি ও পাজামা নেতাজীর ছদ্মবেশের জন্য কিনবেন। উনি যখন হাওড়া স্টেশনে নেমে যাবেন তখন ইচ্ছাকৃতভাবে প্যাকেটটা ভুলে ফেলে যাবেন, আর আমি প্যাকেটটির ভার গ্রহণ করব। আমি আগেই লক্ষ্য করেছিলাম যে, রাঙাকাকাবাবুর ঘরে একটা দরজীর জামা-কাপড় মাপার ফিতে পড়ে আছে।
    • ৮
  • রাঙাকাকাবাবু তাঁর এই ব্রত পালনের সংকল্পের কথা পরিবারের সকলের কাছে বেশ বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছিলেন। তবে এই স্বেচ্ছাকৃত নির্জনবাসের সময়, কিভাবে কি করতে হবে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ঠাকুরকে কিভাবে পর্দার ওপার থেকে খাবার দিতে হবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিজের হাতে কিছু রেডিমেড জবাব লেখা চিরকুট তৈরি করে রেখে গিয়েছিলেন। যে-সব লোকজন দেখা করতে আসবে, তারা কি কাজে এসেছে আন্দাজ করে সেগুলো বিলি করতে হবে, এইসব চিরকুটের কোনটিতে লেখা—‘এ ব্যাপারে কংগ্রেস অফিসে খোঁজ করুন’; অথবা ‘এ সম্বন্ধে কর্পোরেশনে খোঁজ করবেন’। নয়তো ‘শরীর অসুস্থ, পরে এ বিষয়ে আলোচনা হবে’; অথবা ‘অমুকের সঙ্গে এ সম্বন্ধে কথা বলুন’ ইত্যাদি। এ ছাড়া জেলে যে-সব সহকর্মী ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশে উনি কয়েকটা চিঠি লিখে রেখে যান। উনি চলে যাবার পরবর্তী কোন কোন দিবসের তারিখ দিয়ে সেগুলো যেন ডাকে ফেলা হয়। এইসব চিঠিরই অন্যতম হল শ্রীহরিবিষ্ণু কামাথকে লেখা ১৮ই জানুয়ারী তারিখে দেওয়া চিঠি।
    • ১৩
  • ততক্ষণে মেল ট্রেনের গুম্‌গুম্ ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আমরা গাড়ি নিয়ে একটু দূরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। হুস্‌ হুস্‌ শব্দে ট্রেন এসে থামল ও আবার ছেড়ে দিল। আমরা কান পেতে ট্রেনের আওয়াজ শুনতে লাগলাম। তারপর ট্রেনের চাকার ছন্দোময় ঝঙ্কারের সঙ্গে অন্ধকারের বুকে একটা আলোর মালা দুলে দুলে দূরে চলে গেল দেখতে পেলাম।
    • ১৬
  • বাবার গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিবারের ঘোর দুঃসময় শুরু হল। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের শ্যেনদৃষ্টি তো আছেই—জনকয়েক ছাড়া আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব আমাদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ রাখাও বিপজ্জনক মনে করে আমাদের যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে লাগলেন। আমার মা তাঁর জীবনের কঠিনতম পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন। সংসার তো চালানোই দায়, তার উপর আবার সরকারী জুলুম এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের শীতল আচরণ। বাবা বন্দী হবার পর নিজে ধরা পড়া পর্যন্ত সত্যরঞ্জন বক্সী মহাশয় মাঝে মাঝে এসে মাকে রাঙাকাকাবাবুর খবরাখবর জানিয়ে যেতেন। আমি আড়াল থেকে কিছু কিছু শুনে ফেলতাম। রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে কাবুল মারফত যোগাযোগ রাখবার জন্য সীমান্ত প্রদেশ, পাঞ্জাব ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক গোপন বিপ্লবী কেন্দ্র গঠন করা হয়েছিল—তার বাঙালী প্রতিনিধি মারফত সত্যবাবু রাঙাকাকাবাবুর খবর পেতেন।
    • ১৯
  • ৪২-এর আন্দোলনের সময় আমি প্রথম ধৃত হই। ৮ই আগষ্ট বোম্বাই-এ কংগ্রেসের সভায় কুইট ইন্ডিয়া প্রস্তাব পাশ হয়েছে খবর পেয়েই সেইদিন রাতে রাঙাকাকাবাবু আজাদ হিন্দ্‌ রেডিও থেকে এক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় দেশপ্রেমিক সব ভারতবাসীকে ঐ শেষ সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে আহ্বান করেন।
    • ২০
  • আমারও কেমন মনে হল, লাহোর ফোর্টে নিগৃহীত হবার গৌরব লাভ করে আমি ধন্য। বহু যুগ আগে এক রাত্রে রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করে গিয়েছিলেন সিদ্ধিলাভের আশায়। তিনি ইতিহাসের পাতায় ফিরে এলেন গৌতম বুদ্ধ রূপে। আধুনিক কালে আর এক রাত্রে অন্য এক সিদ্ধিলাভের জন্য গৃহত্যাগ করলেন সুভাষচন্দ্র। ইতিহাসের পাতায় তিনি প্রত্যাগত নেতাজী রূপে। তাঁর সেই ঐতিহাসিক গৃহত্যাগে আমার যে অতি সামান্য ভূমিকা তা আমার জীবনকে ধন্য করেছে।
    • ২১

বসু-বাড়ি

[সম্পাদনা]

বসু-বাড়ি, পূর্ণ প্রকাশন

  • একটা তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলে আজকের মতো শেষ করি। ছেলেবেলা থেকে রাঙাকাকাবাবু সুভাষচন্দ্র তো তাঁর মা-বাবার অনেক চিন্তার কারণ হয়েছেন, তাঁর অনেক পাগলামি তাঁদের সহ্য করতে হয়েছে। ১৯২১ সাল। ছেলে তো ঠিক করে বসে আছেন যে, আই সি এস ছেড়ে দেবেন। দেশের কাজে ঝাঁপ দেবেন। বাবা জানকীনাথ বোঝাবার চেষ্টা করছেন, দেশে ফিরে ভেবেচিন্তে ঠিক করলেই তো হয়। মা প্রভাবতী মন্তব্য করলেন, তিনি মহাত্মা গান্ধীর ত্যাগের মন্ত্রে বিশ্বাস করেন। তোমরা বোধ করি জানো, মহাত্মা গান্ধী তখন সবেমাত্র দেশকে অসহযোগের পথে ডাক দিয়েছেন।
    • পৃষ্ঠা ১৫
  • আমার অন্নপ্রাশন হয়নি, শরীর খারাপ ছিল বলে। মা পরে আমাকে একথা জানিয়ে বলেছিলেন, পুরুত মশাই বিধান দিয়ে দিলেন, ঠিক আছে, অন্নপ্রাশন বিয়ের সময় হবে। পদে-পদে পুরুতমশাইদের বিধান মেনে আমাদের চলতে হত।
    • পৃষ্ঠা ১৫
  • সেকালে, বিশেষ করে আমাদের আগের জেনারেশনে, ছেলেমেয়েদের নাম মিলিয়ে রাখার একটা রেওয়াজ ছিল। দাদাভাই মাজননী সেই ধারা অনুসরণ করে তাঁদের আট ছেলের নাম ‘শ’ বা ‘স’ দিয়ে রেখেছিলেন এবং সকলেরই নামের শেষ ‘চন্দ্ৰ’। নামগুলো বলি—সতীশচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, সুরেশচন্দ্র, সুধীরচন্দ্র, সুনীলচন্দ্র, সুভাষচন্দ্র, শৈলেশচন্দ্র ও সন্তোষচন্দ্র। ফলে সকলেই ইংরেজিতে এস্ সি বোস। বুঝতেই পারছ, এত বড় পরিবার, সব ছেলের নাম যদি এক ধরনের হয় গোলমালের সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। ধরো, এস্ সি বোসের নামে চিঠি এল। পাবে কে? একান্নবর্তী পরিবার, শ’য়ে শ’য়ে কাপড়জামা, চাদর, ওয়াড় ইত্যাদি ধোপার বাড়ি যায়, কী করে সামলানো যায়! প্রত্যেকটি কাপড়-জামায় সুন্দর করে সেলাই করে নম্বর দেওয়া থাকত। যেমন, আমরা মেজ ছেলের পরিবার। আমাদের ছিল দু’নম্বর। দু’নম্বর মার্কা কাপড় মেজ ছেলের ঘরে যেত।
    • পৃষ্ঠা ১৬
  • আমার তখন বছর চারেক বয়স, রাঙাকাকাবাবু, বাবা, মা ও আমরা পাঁচ ভাইবোন (বসুবাড়ির দু’নম্বর ও ছ’নম্বর) সাবেক বাড়ি ৩৮/২ এলগিন রোড থেকে পাশের বাড়ি ৩৮/১ এলগিন রোডে উঠে গেলাম। এর দুটো ফল হল। এক, বাবা-মা সাংসারিক দিক থেকে খানিকটা স্বাধীন হলেন; দুই, রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে আমাদের একটা বিশেষ সম্পর্কের শুরু হল।
    • পৃষ্ঠা ১৬
  • ১৯২৪ সালের শেষের দিকে রাঙাকাকাবাবু গ্রেফতার হন। আমরা তখন বাবা-মা’র সঙ্গে কাশ্মীর থেকে ফিরছি। কিছুদিন পরেই ইংরেজ সরকার রাঙাকাকাবাবুকে বর্মায় পাঠিয়ে দেয়। বর্মায় নির্বাসিত হবার আগে রাঙাকাকাবাবুর কথা আমার বিশেষ মনে নেই; কারণ তখন আমি নেহাতই ছোট। কিন্তু ১৯২৪ সালে রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে বাড়ি-বদলের সময় থেকে আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত বাবা-মা ও আমাদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্কে কোনোদিন কোনো ছেদ পড়েনি। তিনি জেলেই থাকুন বা দূর বিদেশেই থাকুন, রাঙাকাকাবাবু কোনো-না-কোনোভাবে যেন সব সময়েই আমাদের মধ্যে উপস্থিত। অবশ্য এর মূলে ছিল আমার বাবা-মা’র সঙ্গে তাঁর এক আশ্চর্য ও বিশেষ সম্পর্ক।
    • পৃষ্ঠা ১৭-১৮
  • মা বিভাবতী ছিলেন উত্তর কলকাতার এক বনেদি পরিবার পটলডাঙার দে-বিশ্বাস বাড়ির মেয়ে। এক বোন, এক ভাই। শুনেছি ছেলেবেলায় বোনের দাপটই ছিল বেশি, আর ভালমানুষ দাদা (আমাদের মামাবাবু) বোনের সব আবদার ও হুকুম মেনে চলতেন। পরিবারটি ছিল বসু-বাড়ির মতো আর একটি বিরাট একান্নবর্তী সংস্থা। কলেজ স্কোয়ারে সংস্কৃত কলেজের উল্টো,দিকে প্রকাণ্ড চকমেলানো বাড়িতে অসংখ্য লোক বাস করতেন। বইয়ের দোকানের দৌলতে তোমরা নিশ্চয়ই শ্যামাচরণ দে স্ট্রীটের নাম শুনেছ। শ্যামাচরণ ছিলেন আমার দাদামণি অক্ষয়কুমারের জ্যাঠামশাই। কলেজ স্কোয়ারে আমাদের মামার বাড়ির বাইরের ঘরটিতে এক বিরাট ফরাস পাতা থাকত ও বড়-বড় তাকিয়া সেখানে গড়াগড়ি দিত। শ্যামাচরণের সময় ঐ বাইরের ঘরে সেইসময়কার অনেক জ্ঞানীগুণী লোক নিয়মিত জমায়েত হতেন এবং আড্ডা দিতেন। তার মধ্যে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি। পরের জেনারেশনে পটলডাঙ্গার দে-বিশ্বাসরা বেশ কয়টি নামকরা জামাই পেয়েছেন, যেমন শরৎচন্দ্র বসু, রাজশেখর বসু (পরশুরাম) ও নরেন্দ্রকুমার বসু।
    • পৃষ্ঠা ১৮
  • আমি যে যুগে জন্মেছি সেটা ছিল অসহযোগের যুগ। গান্ধীজী তাঁর অহিংসা অসহযোগের মন্ত্র দিয়ে সারা দেশকে মাতিয়ে তুলেছেন। বিদেশী সরকারের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখা চলবে না, সব ‘বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হতে হবে। তাঁর প্রভাব থেকে ছেলে-বুড়ো কেউ বাদ পড়েনি। প্রাথমিক স্কুল থেকে আরম্ভ করে ম্যাট্রিক পর্যন্ত আমি ও আমার সমবয়সীরা সেই খাঁটি স্বদেশিয়ানার মধ্যে বড় হয়েছি। আমার মনে হয় বসুবাড়ির যাঁরা কলকাতায় থাকতেন, তাঁদের উপর স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল বেশি। এর কতকগুলি কারণ ছিল। প্রথমত রাঙাকাকাবাবু সুভাষচন্দ্র তো দেশের ডাকে আই সি এস ত্যাগ করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের দলে যোগ দিয়েছেন। বাবার সঙ্গে ছিল রাঙাকাকাবাবুর বিশেষ সম্পর্ক। বাবাও অল্পদিনের মধ্যে দেশবন্ধুর এক প্রধান সহযোগী হয়ে উঠলেন। আর বাবা ও রাঙাকাকাবাবু যাই করুন না কেন, তাতেই আমার মায়ের সায় ছিল। সুতরাং বুঝতেই পারছ আমাদের শিশুজীবন ও কৈশোর সব দিক দিয়ে স্বদেশী-প্রভাবিত ছিল। অবশ্য আমি এটা বলছি না যে বসু-বাড়িতে এর ব্যতিক্রম ছিল না।
    • পৃষ্ঠা ২০
  • যদিও তখনও গাড়ি চালাবার বয়স আমার হয়নি, বাবার প্রথম জেলবাসের সময় আমেদ আমাকে লুকিয়ে গাড়ি চালাতে শিখিয়েছিল। অনেক পরে ১৯৪১ সালে রাঙাকাকাবাবুকে কলকাতা থেকে গোপনে গোমো পৌঁছে দেবার সময় আমি আমেদের শিক্ষার সুফল পেয়েছিলাম। বাবাও আমার গাড়ি চালানো পছন্দ করতেন, কারণ আমি আমেদের কায়দায় গাড়ি চালাতাম।
    • পৃষ্ঠা ২৪
  • ঠিক মনে আছে তো, না অনুমান করছি! সেই ১৯২৫ সালের শিশুবয়সের ঘটনা। আমার মনের কোণে একটা ছবি আছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ দীর্ঘকায় এক মানুষ আমাদের কার্শিয়ঙের বাড়ির সামনে ধীরে-ধীরে পায়চারি করছেন। পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটে দেখছি আমার স্মৃতিভ্রম হয়নি। মান্দালয়ে বন্দী রাঙাকাকাবাবুকে বাবা লিখছেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে সঙ্গে নিয়ে, দার্জিলিঙে তাঁর মৃত্যুর দিন পনরো আগে, আমাদের কার্শিয়ঙের বাড়িতে একটা দিন কাটিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা আরও লিখেছেন বড়ই দুঃখের কথা যে, কার্শিয়ঙে আমাদের বাড়িতে দেশবন্ধুর একটা ছবি তুলে রাখা হয়নি। যাই হোক, দেশবন্ধুর শেষ বাইরে যাওয়া ও থাকা হল আমাদের গিধাপাহাড়ের বাড়িতে। শরৎচন্দ্র বসুর পরিবারের সঙ্গে।
    • পৃষ্ঠা ২৫
  • রাঙাকাকাবাবু যে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করেন সেটা সকলেই জানত। পুলিসও জানত। ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর গোপন গৃহত্যাগের রাত্রে আমরা ব্যাপারটিকে কাজে লাগিয়েছিলাম পুলিসকে ধোঁকা দেবার জন্য। রাঙাকাকাবাবু আমাদের বোন ইলাকে বলে গিয়েছিলেন যে, আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পর্যন্ত যেন তাঁর ঘরের আলো জ্বলে। তাহলে যদি পুলিসের চরেরা তাঁর ঘর নজর করে, তারা মনে করবে যে, সুভাষবাবু তাঁর নিয়মমতো বেশি রাত পর্যন্ত কাজ করছেন।
    • পৃষ্ঠা ৩৩
  • আমি জীবনে কখনও বাবার কাছে বকুনি খাইনি। ছেলেমেয়েদের শাসনের ভারটা ছিল মা’র উপর এবং শাসনও ছিল বেশ কড়া। এর মানে এই নয় যে, বাবা আমাদের উপর নজর রাখতেন না। তাঁর কর্তৃত্বের ধরনটা ছিল আলাদা। কিছুই তাঁর চোখ এড়াত না। কোর্ট থেকে ফিরে স্নান সেরে দোতলার দক্ষিণের বারান্দায় বাবা খানিকটা বিশ্রাম নিতেন। কাজে নীচে নেমে যাবার আগে প্রায়ই আমাদের পড়ার ঘরের দরজাটা একটু ঠেলে মুচকি হেসে ছেলেমেয়েদের উপর চোখ বুলিয়ে নিতেন। এটাই ছিল যথেষ্ট। দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিন্তু মা’র হুকুমই ছিল শেষ কথা। দশ-বারো বছর বয়স পর্যন্ত মাকে বেশ ভয় করতাম, তার পর সম্পর্কটা বদলে গেল। তিরিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় বাবা জেলে যাওয়াতে আমরা যেন একটু তাড়াতাড়িই সাবালক হয়ে উঠলাম, কম বয়সেই বাড়ির নানা রকম দায়িত্ব আমাদের উপর এসে পড়ল। মাও সেটা স্বচ্ছন্দে মেনে নিলেন।
    • পৃষ্ঠা ৩৬
  • স্বরাজ সম্বন্ধে রাঙাদাদাবাবুর নিজস্ব একটা ধারণা ছিল এবং আমাদের জন্য একটা বাণী ছিল। তিনি আমাদের প্রায়ই বলতেন, “দেখ, তোদের ঐ স্বরাজ হবার দু-একদিন আগে আমাকে খবর দিস যাতে আমি ঠিক সময়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশত্যাগ করতে পারি।”
    • পৃষ্ঠা ৩৮
  • ১৯৩০ সাল থেকেই বাবা স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ছিলেন। রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে আলোচনার পর বাবা ১৯৩০-এর মাঝামাঝি দাদাভাইকে একটা চিঠি লিখে জানান যে, তিনি কংগ্রেসের কাজে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করবার জন্য কিছুদিনের জন্য আইনব্যবসা বন্ধ রাখছেন। ঐতিহাসিক ঐ চিঠিটি সম্প্রতি নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো প্রকাশ করেছে। সেই যে বাবা এক বন্ধুর পথে পা বাড়ালেন, তারপর আর ফিরে তাকাননি, রাঙাকাকাবাবুর সংগ্রামের সাথী হয়ে সব বিপদ-আপদ অগ্রাহ্য করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কেবল এগিয়েই গিয়েছেন।
    • পৃষ্ঠা ৪৭
  • রাঙাকাকাবাবু আবার আমাদের মতো ‘অতিথি'দের জন্য নানারকম জলখাবারের আয়োজন করতেন। জেল-কর্তৃপক্ষের কাছে এর জন্য অতিরিক্ত রেশন দাবি করতেন। তাঁদের সঙ্গে যে-সব সাধারণ কয়েদি থাকত, তাদের মধ্যে দু-একজনের উপর রান্নার ভার দেওয়া হত এবং তারা রাঙাকাকাবাবুর নির্দেশমতো নানারকম খাদ্যদ্রব্য তৈরি করত। তবে আর যাই হোক, আমার মনে হয়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু রান্নার ব্যাপারে বিশেষ পটু ছিলেন না। চপের মাংস প্রায়ই আধসিদ্ধ থেকে যেত, সন্দেশ বলে যা আমাদের পরিবেশন করতেন তা প্রায় হত পাথরের মতো শক্ত।
    • পৃষ্ঠা ৫০
  • এলগিন রোডের বাড়ির গাড়িবারান্দায় বাবার সঙ্গে রাঙাকাকাবাবুর আবেগরুদ্ধ পুনর্মিলনের দৃশ্য আমার বেশ মনে আছে।
    • পৃষ্ঠা ৫৮
  • দাদাভাইয়ের তিন ভাইয়ের মধ্যে আমরা কেবল আর-একজনকেই দেখেছিলাম। দাদাভাই ছিলেন সবচেয়ে ছোট, তাঁর উপরেই ছিলেন সেজ-দাদাভাই দেবেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন পণ্ডিত লোক। সারা জীবন শিক্ষকতা করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। অবসর নেওয়ার পর উত্তর কলকাতার বাদুড়বাগানে থাকতেন। মা’র সঙ্গে অনেকবার তাঁর বাড়ি গিয়েছি। তিনি দাদাভাইয়ের মতোই অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন এবং তাঁকে দেখলেই শ্রদ্ধার ভাব জাগত। শিক্ষক হিসাবে তাঁর নিজের পরিবারেও তিনি বেশ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। নিজের স্ত্রী ও কন্যাকে একেবারে প্রথম পাঠ থেকে শুরু করে ইংরেজি সাহিত্যের উঁচু স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মা’র কাছে শুনেছি, আমাদের সেজ-দিদিমণি মাত্র অক্ষর-পরিচয় নিয়ে বাড়ির বউ হয়ে এসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে শেকসপীয়র মিলটন আলোচনা করতেন। দেবেন্দ্রনাথ দাদাভাইয়ের মৃত্যুর বছর চারেক আগেই মারা যান।
    • পৃষ্ঠা ৫৮
  • আমরা যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, আচার-ব্যবহারে, অভ্যাসে ও রুচিতে, ইংরেজদের অন্ধ অনুসরণ করি, সেটা রাঙাকাকাবাবু সুস্থ ও মুক্ত মনোভাবের পরিচায়ক বলে মনে করতেন না। অনেক দিনের দাসত্বের ফলে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের সব ক্ষেত্রে আমরা এই ধরনের মনোভাবের পরিচয় দিই। ছোটখাটো দৃষ্টান্ত দিয়ে রাঙাকাকাবাবু আমাদের বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন যে, সব বিষয়ে ইংরেজদের অনুকরণের স্পৃহা থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত ইউরোপে থাকার ফলে রাঙাকাকাবাবু মধ্য ইউরোপের, বিশেষ করে জার্মানদের, কৃষ্টি, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ধরন ইত্যাদির দ্বারা বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। তা ছাড়া মধ্য ইউরোপের ভারতপ্রেমী বিদগ্ধ মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করে তিনি বুঝেছিলেন যে, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সমানে-সমানে হতে পারে। কারণ সেখানে প্রভু-প্রজার সম্পর্কের লেশমাত্র নেই। জার্মান পণ্ডিত ও ভারততত্ত্ববিদরা বহুদিন আগে থেকেই আমাদের দেশের প্রাচীন সভ্যতা, ধর্ম, দর্শন ও কৃষ্টির দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অপর পক্ষে ইংরেজরা আমাদের দেশে এসেছিলেন মূলত ব্যবসা করতে এবং শেষ পর্যন্ত রাজা হয়ে বসেছিলেন। দুটোর মধ্যে অনেক ফারাক।
    • পৃষ্ঠা ৬৬
  • গান্ধীজি ১৯৩৭ ও ১৯৩৮ সালে বেশ কিছুদিন ছিলেন। সেই সময় কত রকম লোক যে উডবার্ন পার্কে দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। অন্য কংগ্রেস-নেতাদের মধ্যে জওহরলাল ছাড়া রাজেন্দ্র প্রসাদ, বল্লভভাই প্যাটেল, সরোজিনী নাইডু ও মৌলানা আজাদকে বেশ মনে আছে। রাজেন্দ্র প্রসাদ সম্বন্ধে আমার ধারণা হয়েছিল যে, তিনি একজন অতি বিনয়ী ভদ্রলোক এবং গান্ধীজির একান্ত অনুগত। ক্রমাগতই হাঁপানিতে ভুগতেন, সেজন্য তিনতলায় ওঠানামা করতে তাঁর বেশ কষ্ট হত। বল্লভভাইয়ের এমন গম্ভীর মেজাজ যে, আমরা কাছে ঘেঁষতে চাইতাম না। তবে তাঁর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে কোনো কথা ছিল না। সন্ধ্যায় বেড়াবার সময় গান্ধীজির সঙ্গে প্রায়ই মৌলানা আজাদ থাকতেন। তাঁর চেহারা বেশ আকর্ষণীয় ছিল। সরোজিনী নাইডু খুব কথা বলতেন, ইংরেজি তো নয়, যেন সংগীতের মূর্ছনা। সকলের সঙ্গেই তিনি অন্তরঙ্গ। খেতে খুব ভালবাসতেন এবং খেতেনও, যদিও প্রায়ই বলতেন ডাক্তার রায়ের বারণ আছে।
    • পৃষ্ঠা ৭৩
  • ১ নং উডবার্ন পার্কে আমাদের বাড়িতে দুই মহামানবের মিলন হয়েছিল দু’বার। গান্ধীজি ও রবীন্দ্রনাথ। একবার আমি তো সাক্ষীই ছিলাম, অন্যবার একটা বিপদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে দেখতে ছুটে এসেছিলেন। একদিন সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ খবর এল, রবীন্দ্রনাথ আমাদের বাড়িতে গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়লেন। রবীন্দ্রনাথ উপরে উঠতে পারবেন না। গান্ধীজি তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। একতলায় যে-ঘরটা পণ্ডিতজির ঘর বলে চিহ্নিত ছিল, সেই ঘরে দুজনের দেখা হল। যাবার সময় হলে গান্ধীজি নিজের হাতে করে রবীন্দ্রনাথের চটিজোড়া এগিয়ে দিলেন। রবীন্দ্রনাথ চলে যাবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে সাংবাদিকরা এসে পড়লেন, কিন্তু একটু দেরি হয়ে গেল।
    অন্যবার যখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, তখন গান্ধীজি খুবই অসুস্থ, রক্তের চাপ অসম্ভব রকম বেড়ে গিয়েছিল। সারা বাড়ি থমথম করছে। বাবা, রাঙাকাকাবাবু, জওহরলাল চিন্তায় আকুল। ডাক্তার রায় ও নতুনকাকাবাবু অস্থির হয়ে যা করতে পারেন করছেন। গান্ধীজি তখন দোতালায় বাবার ঘরে রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে দেখতে আসতে চাইলেন। এবার তাঁকে চেয়ারে করে উপরে তুলতে হল। চেয়ার বহন করলেন সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু, শরৎচন্দ্র বসু ও মহাদেব দেশাই।
    • পৃষ্ঠা ৭৭-৭৮
  • ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত যদি রাঙাকাকাবাবু ইউরোপে নির্বাসনে না থাকতেন, তাহলে ‘দি ইণ্ডিয়ান স্ট্রাগল’ লেখা হত কিনা সন্দেহ।
    • পৃষ্ঠা ৭৮-৭৯
  • বলাই বাহুল্য, রাঙাকাকাবাবু কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার ফলে সামগ্রিকভাবে বসুবাড়ির ছোটবড় সকলেরই মর্যাদা বেড়ে গেল এবং সকলেই বেশ গৌরব বোধ করলেন। তবে আমার মনে হয় রাঙাকাকাবাবু ‘রাষ্ট্রপতি’ হবার আগে পর্যন্ত বসুবাড়ির মধ্যমণি ছিলেন না। অনেকেই তাঁকে দূর থেকে দেখতেন বা দূরত্ব রেখে চলতেন, এমনও কেউ কেউ ছিলেন যাঁরা ফিরেও তাকাতেন না। এখন থেকে কিন্তু রাঙাকাকাবাবুকে ঘিরেই বসুবাড়ি চলতে লাগল। সবাই তাঁকে ঘিরে দাঁড়ালেন। মাজননীর ইচ্ছায় তিনি অনেকদিন পরে এলগিন রোডের সাবেক বাড়িতে বসবাস আরম্ভ করলেন। দাদাভাইয়ের শোবার ঘরটি তাঁর জন্য বরাদ্দ হল। বাড়ির অনেক ব্যবস্থা পালটাতে হল। কারণ সভাপতির তো একটা ভাল অফিস চাই। তাছাড়া রোজ় কত লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবে, বসবার জায়গা চাই। বাড়ির পেছনের দিকের একটা বড় ঘর খাওয়াদাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হত, সেটা আসবাবপত্র গুছিয়ে রাঙাকাকাবাবুর অফিস হল। আজও নেতাজী ভবনে ঘরটি একইভাবে সাজানো আছে। অতিথিদের বসবার জন্য নীচের তলায় একটা ও উপর তলায় একটা ঘর রাখা হল।
    • পৃষ্ঠা ৮০-৮১
  • ১৯৩৯-এর মে মাসে দেশের জাতীয় নেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত হল। গান্ধীজি কংগ্রেসের নেতৃত্ব ফিরে পেলেন। রাঙাকাকাবাবু একলা নিজের পথে চলতে আরম্ভ করলেন।
    • পৃষ্ঠা ৯০
  • ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের সভাপতি হবার পর একদিন রাঙাকাকাবাবু আমাকে ডেকে বললেন, আমি যেন নিয়মিত মস্কো রেডিও থেকে প্রচারিত খবরাখবর শুনি। যদি কখনও আমাদের দেশের রাজনীতি সম্বন্ধে, বিশেষ করে তাঁর নিজের কার্যকলাপ সম্বন্ধে, তারা কিছু বলে তাহলে আমি যেন নোট করে রাখি। উডবার্ন পার্কে একটা ভাল রেডিও ছিল, তাতে দূরদেশের প্রোগ্রাম ভাল শোনা যেত। আমি তো রাত জেগে ক্রমাগতই শুনতে লাগলাম। বেশি রাতে বাবা যখন কাজ সেরে উপরে উঠতেন, প্রায়ই দেখতেন যে রেডিও বেজে চলেছে আর আমি হয়তো রেডিওতে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে আছি। আমাকে তুলে দিয়ে হেসে বলতেন, এই রে, সুভাষের পাল্লায় পড়েছে! অনেক শুনেও আমি রাঙাকাকাবাবুকে বিশেষ কোনো খবর দিতে পারিনি। কারণ মস্কো রেডিও প্রধানত তাদের নিজেদের খবরই প্রচার করত, আর ক্রমাগতই স্টালিনের মহিমাকীর্তন শুনতে হত। রাঙাকাকাবাবু কেন আমাকে এ-কাজটি দিয়েছিলেন আমি জানি না। তবে আমার দিক থেকে একটা বড় লাভ হল যে নানা দেশের খবরাখবরে আমার বেশ একটা উৎসাহের ভাব জাগল ও বিদেশী রেডিও শোনার অভ্যাসটা স্থায়ী হয়ে দাঁড়াল।
    • পৃষ্ঠা ৯৪
  • ১৯৪০ সালটা ছিল নানা দিক দিয়ে বেশ গোলমেলে বছর। বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর রাজনৈতিক জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটল যে, বসুবাড়ির সকলের উপরেই কোনো-না-কোনো ভাবে তার প্রভাব পড়ল। আগের বছরে কংগ্রেসের নেতারা ‘শৃঙ্খলা’ ভাঙবার দায়ে রাঙাকাকাবাবুকে দল থেকে প্রায় বের করে দিয়েছিলেন। তখন বাবা বাংলার বিধানসভায় বিরোধী কংগ্রেস দলের নেতা। ক্রমে ক্রমে বাবার সঙ্গেও কংগ্রেসের উপরতলার নেতাদের মতভেদ ও তিক্ততা বাড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত ১৯৪০-এর শেষের দিকে বাবাকেও কংগ্রেস হাইকম্যাণ্ড ‘শৃঙ্খলা’ ভাঙার অভিযোগে দলনেতার পদ থেকে সরিয়ে দিলেন। কিন্তু দিলে হবে কী,দলের অধিকাংশ সদস্যই বাবার নেতৃত্ব মেনে নিয়ে কংগ্রেস দল হিসাবেই কাজ চালিয়ে গেলেন। যেমন বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য রাঙাকাকাবাবুর নেতৃত্বে প্রদেশ কংগ্রেস চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যাই হোক, ভাগাভাগির ফলে বাইরে যেমন, বিধানসভাতেও তেমন দুটি কংগ্রেস দল হয়ে গেল। অন্যটির নেতা হলেন কিরণশঙ্কর রায়।
    • পৃষ্ঠা ৯৫
  • কিছু তথ্য আছে যার থেকে মনে হয় যে, ১৯৪০-এর প্রথম দিকে রাঙাকাকাবাবু দেশ ত্যাগ করার উপায় ও সম্ভাবনা সম্বন্ধে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। উত্তর-পশ্চিম ভারতে সেই সময় কীর্‌তি-কিষান পার্টি বলে একটি দল ছিল। সেই দল সম্ভবত সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে একটা যোগাযোগ গড়ে তুলতে চাইছিল। তাছাড়া, ঐ অঞ্চলে রাঙাকাকাবাবুর নিজের দলের বিশ্বস্ত অনুগামীও বেশ কয়েকজন ছিলেন। এঁদের মধ্যে বেছে-বেছে কয়েকজনকে রাঙাকাকাবাবু তাঁর গোপন বিদেশ-যাত্রার আয়োজনে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফল দেখে বোঝাই যায় যে, ঐ প্রাথমিক চেষ্টা বিশেষ কার্যকরী হয়নি। সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে যে কোনো ব্যবস্থাই করা যায়নি সেটা পরের অভিজ্ঞতা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়।
    • পৃষ্ঠা ৯৮
  • বাবার শেষ কয়েকখানা চিঠি ওলটাতে ওলটাতে কিন্তু মনে হল আমার চিন্তা ভুল। শরৎচন্দ্র ও সুভাষচন্দ্র বসুবাড়ির সন্তান কেবল আক্ষরিক অর্থে। আসলে তাঁরা ভারত-সন্তান। কেবল আমরা নই, ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি নর-নারী তাঁদের পরমাত্মীয়। ভারতবাসীর দুঃখকে আপন দুঃখ করে নিয়ে তাঁদের কল্যাণে তাঁরা জীবনদান করে গেলেন। বসুবাড়ির বন্ধন, বসুবাড়ির অভিমান, বসুবাড়ির গণ্ডি অতিক্রম করে তাঁরা চলে গেছেন অমরত্বের সন্ধানে। শরৎ-সুভাষকে ভারতের ভাগ্যনিয়ন্তার হাতে সমর্পণ করেই বসুবাড়ির প্রকৃত ও চরম সার্থকতা।
    • পৃষ্ঠা ২৩১
  • তখনও জেট এরোপ্লেন চালু হয়নি। সেজন্য বিমানে যাত্রার সময় প্রায় ডবল লাগত। কলকাতা থেকে বোম্বাই হয়ে কায়রোয় কিছুক্ষণ থেমে আমরা রাতের অন্ধকারে রোমে পৌঁছলাম। এরোপ্লেন থেকে নামতেই দেখা গেল সাংবাদিক ও ফোটোগ্রাফারদের বেশ ভিড়। যুদ্ধের পরে রাঙাকাকাবাবু ইউরোপে এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর দাদা—আর এক রাজনীতিবিদ চন্দ্র বোস—ইউরোপ সফরে এসেছেন এটা বেশ বড় খবর। তাছাড়া যুদ্ধের পরে ইউরোপের রাজনীতি কোন্ দিকে যাচ্ছে বাবাও সে-বিষয়ে খুবই কৌতূহলী, সাংবাদিকদের সঙ্গে এই যোগাযোগ তাঁর কাম্য। দেশের রাজনীতি সম্বন্ধে তাঁর নিজের মতামতও খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করার সুযোগ তিনি কেনই বা নেবেন না? বাবা প্লেন থেকে নামামাত্র ছবি তোলা শুরু হল এবং পরে বাবা যেখানেই যান সাংবাদিকরা ও ফোটোগ্রাফাররা তাঁকে ধাওয়া করেন।
    • পৃষ্ঠা ২১১
  • ১৯৪৬-এর মাঝামাঝি বাবা বর্মায় জেনারেল আউঙ সাং-এর সঙ্গে কথাবার্তা বলে অনেক আশা নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। ১৯৪৫-এর শেষ থেকে ১৯৪৬-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল এক অতি উদ্দীপনাময় সময়। আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক প্রবল জোয়ার এসেছিল। সেনাবাহিনীও আর ইংরেজদের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে রাজি ছিল না। জনগণের প্রতিনিধিদের পক্ষে ক্ষমতা দখলের এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে? ওদিকে আউঙ সাং-এর মতো পূর্ব-এশিয়ার নেতাদের কথাবার্তায় বোঝা গেল যে, এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলিও আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়বে। ইতিমধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই নেতা সুকর্ন ও হাতার সঙ্গে আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের যোগাযোগ হয়েছিল। ভিয়েতনামের জনগণ ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম চালাচ্ছিলেন, ভারতের মুক্তিকামী সব মানুষই তার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন। সুতরাং দেশের ভিতরের ও বাইরের পরিস্থিতি আমাদের অনুকূল ছিল।
    • পৃষ্ঠা ২০২-২০৩
  • আর একটি মজার চরিত্রের কথা মনে আছে। সে নাকি লাহোর ফোর্টের কেটারিংয়ের তদারকি করত, নাম ফকরুদ্দিন। একদিন হঠাৎ এসে বলল: খাবার বড়ই খারাপ হচ্ছিল শুনে খবর নিতে এলাম, এখন ঠিক আছে তো? আমি হেসে বললাম: তোমাদের কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক বুঝি না। তারপর সে দার্শনিকের মতো বলল: আমিও তো বুঝি না যৌবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলি তোমরা এইভাবে জেলখানায় হেলায় কাটিয়ে দিচ্ছ কেন! জীবনে তাহলে আর কী রইল।
    • পৃষ্ঠা ১৭৯
  • এদিকে বাড়ি থেকে নানাভাবে আমার খবর নেবার চেষ্টা হচ্ছিল। নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র মহাশয় ও আমাদের মামাবাবু —অজিতকুমার দে ভারত সরকারের ভূতপূর্ব আইনমন্ত্রী স্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকারকে ধরলেন তিনি যেন ভাইসরয় লর্ড ওয়েভেলকে আমার কেসটা দেখতে বলেন। লর্ড ওয়েভেল সরকারসাহেবকে লিখলেন যে, তিনি সাধারণত এই সব ব্যাপারে হোম ডিপার্টমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করেন না, কিন্তু সরকারসাহেবের কথা রাখবার জন্য তিনি তা করবেন। দিনকতক পরে বড়লাট সরকারসাহেবকে জানালেন যে, তিনি আমার ফাইলটা দেখেছেন কিন্তু আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি এতই গুরুতর যে, তাঁর কিছু করবার নেই। সেই সময়কার কেন্দ্রীয় আইনসভার এক সদস্যার মাধ্যমেও আমার সম্বন্ধে খবর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি খবর দেন সরকার আমাকে এক ষড়যন্ত্রের মামলায় ফাঁসাবার চেষ্টা চালাচ্ছে।
    • পৃষ্ঠা ১৮১
  • সুধীর বক্‌সী মহাশয়কে লাহোর ফোর্টে এনেছে আমি অনুমান করেছিলাম। দলের অন্য কার-কার এই দুর্ভাগ্য হয়েছিল, তখন জানতে পারিনি। পরে জেনেছিলাম। আমি যখন সেখানে ছিলাম, জয়প্রকাশ নারায়ণও লাহোর ফোর্টে বন্দী ছিলেন। অত্যাচারের ফলে একদিন কোনো এক বন্দীর মৃত্যু হল—এরকম আভাসও আমি পেয়েছিলাম।
    • পৃষ্ঠা ১৮২
  • তারপর হঠাৎ একদিন নাগাসাকি ও হিরোসিমার উপর অ্যাটম বোমা ফেলার খবর এল। মানবজাতির ইতিহাসে এত বড় নিষ্ঠুর ও ধ্বংসের খেলা যে আর হয়নি—সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ রইল না। দিন-কতকের মধ্যেই এল জাপানের আত্মসমর্পণের খবর। এর আগেই রাশিয়া জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
    • পৃষ্ঠা ১৯৪-১৯৫
  • শুক্রবার ২৪ আগস্ট দুপুরে আমি স্নান করে এসে শুনলাম যে, সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব খবরের কাগজ হাতে করে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আমাকে না পেয়ে ফিরে গেছেন, কিছুক্ষণ পরে আবার আসবেন বলে গেছেন। অরুণবাবু আমার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন, কিছু বললেন না। একটু পরেই বড়সাহেব আবার হাজির হলেন। বললেন, সকালের কাগজে একটা খবর পড়ে কাগজটা তোমাকে আর পাঠাইনি। ভাবলাম নিজেই তোমার কাছে আসব ও আমার কর্তব্য করব। আই অ্যাম রিয়ালি ভেরি ভেরি সরি, তোমার কাকার সম্বন্ধে খুব খারাপ খবর আছে, এই দেখ কী লিখেছে। এই চরম দুঃখের দিনে আমরা সকলে তোমাকে সমবেদনা জানাচ্ছি।
    ছবিসুদ্ধ খবর—ফরমোসোয় সুভাষচন্দ্র বসু এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
    • পৃষ্ঠা ১৯৫
  • লায়ালপুর জেলের গেট পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এক বিরাট উদ্বেলিত জনতা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ফুলে ফুলে ছড়াছড়ি, ক্রমাগতই জয়ধ্বনি। ফুল দিয়ে সাজানো এক টাঙ্গায় আমাকে তোলা হল। টাঙ্গা এগিয়ে চলেছে, সঙ্গে সঙ্গে কয়েকশো মানুষ দৌড়চ্ছে। পাগলের মতো হয়ে জনতা সমস্বরে ধ্বনি দিচ্ছে—'সুভাষচন্দর বোস জিন্দাবাদ’। ‘বোস খানদান জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি। জীবনে এত অপ্রস্তুত ও বিব্রত কখনও হইনি। লায়ালপুরের বিশিষ্ট এক নাগরিকের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানেও কেবল লোক আর লোক। ছোটরা এসে আমার অটোগ্রাফ চায়, আমি যত না-না করি, কেউ শুনতে চায় না। আমি উর্দুতে লিখতে পারি দেখে তাদের উৎসাহ আরও বেড়ে গেল।
    • পৃষ্ঠা ১৯৭
  • ১৯৪৫-এর নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লায় যখন আজাদ হিন্দ ফৌজের তিন অফিসারের বিচার শুরু হল, সারা দেশ যেন ঝলসে উঠল। জীবনে কয়েকটি বড় গণ-আন্দোলন দেখেছি, কিন্তু সর্বস্তরের সব মানুষ—বৃদ্ধ, প্রৌঢ়, যুবা, ছাত্র, শিশু, পুরুষ, মহিলা—সকলের মধ্যে এক কথায় সমগ্র জাতির হৃদয়ে এমন আলোড়ন আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। রাঙাকাকাবাবু বিদেশে একটা কথা জোর দিয়ে বলতেন। বলতেন, তিনি যা কিছু করছেন তাঁর দেশবাসীর তাতে পূর্ণ সমর্থন আছে। আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবিতে যে গণ-আন্দোলন হল, তার দ্বারা রাঙাকাকাবাবুর দাবির সত্যতা সম্পূর্ণ ভাবে প্রমাণিত হল। এমনকী, দেশের যে-সব মানুষ সংগ্রামের সময় দেশদ্রোহিতা করেছিলেন, ইংরেজের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন বা যাঁরা চিরকালই ইংরাজের দোসর ছিলেন, তাঁরাও সুবিধা বুঝে কৌশলে এই নতুন আন্দোলনে ভিড়ে গেলেন। দেশের মরা গাঙে আবার বান এল, ভারতবাসী আবার তাঁদের মনোবল ফিরে পেলেন।
    • পৃষ্ঠা ১৯৯
  • আমাদের দুর্ভাগ্য, ১৯৪৭ সালের প্রথমে নতুন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হল। সাম্প্রদায়িকতার বিষ আরও ছড়িয়ে পড়ল। দ্বিতীয়বার ধাক্কা দিয়ে মুসলিম লিগের আর একটা জয় হল। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ধর্মের ভিত্তিতে পাঞ্জাবকে দুই ভাগ করার প্রস্তাব মেনে নিলেন। বাবা এই সিদ্ধান্তে খুবই বিচলিত হলেন। তাঁর মতে ঐ সিদ্ধান্ত ছিল মারাত্মক এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল আদর্শ ও লক্ষ্যের পরিপন্থী। তিনি লেখা ও বক্তৃতার মাধ্যমে দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে লাগলেন। কিন্তু দেশের আবহাওয়া তখন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক দল ও গোষ্ঠীগুলি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কংগ্রেসি ও জাতীয়তাবাদীদের মধ্যেও অনেকে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। পাকিস্তানিদের দাবির পালটা দাবি হিসাবে তাঁরা বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব তুললেন। বাবা কিন্তু হাল ছাড়বার পাত্র নন। বাংলাকে এক রেখে বিকল্প কোনো রাজনৈতিক সমাধানের সূত্র বের করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করলেন।
    • পৃষ্ঠা ২০৫
  • লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭-এর ৪ জুন আমাদের দেশ খণ্ডিত করে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান এই দুই রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশ করলেন। বাবার প্রতিক্রিয়া খুবই খারাপ হল। তার মতে ঐ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদেরই জয় সূচিত হয়েছিল। তিনি বললেন যে, আমরা আমাদের আদর্শ ও নীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছি। তিনি আরও বললেন যে, এমন দিন আসবে যখন কংগ্রেস ঐ সিদ্ধান্তের জন্য অনুতাপ করবে। যাই হোক, ১৫ আগস্ট এগিয়ে এল। ইংরেজের তদারকিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত হলেন। বাবার পক্ষে তখন কংগ্রেস থেকে সরে আসা ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। নিজের অনুগামীদের নিয়ে নতুন এক দল গঠনের কাজে তিনি মন দিলেন।
    ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭, বাবার কাছে ছিল যেন শোকের দিন। এত বিষণ্ণ তাঁকে আমি কমই দেখেছি। ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় দেখলাম আমাদের বাড়ির নীচের তলার দক্ষিণের বাবান্দায় একলা স্থির হয়ে বসে আছেন। কিছুক্ষণ সত্যরঞ্জন বক্সী মহাশয় ছিলেন। তিনিও বাড়ি গেলেন। বাইরে থেকে নানারকম আওয়াজ আসছিল। প্রতিবেশীদের রেডিওতে উৎসবের গানবাজনা ও বক্তৃতাদি চলছে। রাস্তায় অনেক সাধারণ মানুষ খুব শোরগোল করছে। বাবার মনের অবস্থা দেখে আমি রেডিও খুলিনি। ভাবলাম রাস্তায় একটু ঘুরে আসি। বেরিয়ে দেখলাম একটার পর একটা লরি ভর্তি করে দলে দলে মানুষ হিন্দু-মুসলিম এক হো, হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে জাতীয় পতাকা দুলিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করছে। বেশি দূর যেতে মন চাইল না। বাড়ি ফিরে দেখি বাবা আগের মতোই স্থির হয়ে বসে আছেন। শুনেছিলাম আর একজনও বাবারই মতো স্বাধীনতার উৎসব থেকে দূরে ছিলেন—মহাত্মা গান্ধী।
    • পৃষ্ঠা ২০৮
  • ভিয়েনার অ্যাসটোরিয়া হোটেলে আমার মা এমিলি-কাকিমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বসুবাড়ির বধূরূপে বরণ করে নিলেন। বাবার সঙ্গে আলোচনা করেই ব্যাপারটা হয়েছিল। নিজের একটি ভাল বেনারসি শাড়ি তাঁকে উপহার দিলেন এবং নিজের হাত থেকে কয়েক গাছা সোনার চুড়ি খুলে ওঁর হাতে পরিয়ে দিলেন।
    • পৃষ্ঠা ২১৮

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]