বিষয়বস্তুতে চলুন

সঞ্চিতা (কাব্যগ্রন্থ)

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

সঞ্চিতা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য-সংকলন। এই গ্রন্থে আটাত্তরটি কবিতা ও সতেরোটি গান আছে। এর মধ্যে - ‘বিদ্রোহী’, ‘সর্বহারা’, ‘সাম্যবাদী’, ‘মানুষ’, ‘জীবন বন্দনা’, ‘খুকী ও কাঠবেড়ালী’, ‘চল্‌ চল্‌ চল্‌’ প্রভৃতি প্রধান।

গ্রন্থটির উৎসর্গ পত্রে লেখা আছে: “বিশ্বকবিসম্রাট শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু”।

উক্তি

[সম্পাদনা]
  • গাহি সাম্যের গান-
    মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
    নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
    সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
    'পূজারী, দুয়ার খোলো,
    ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ'ল!'
    স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
    দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ'য়ে যাবে নিশ্চয়!
    জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
    ডাকিল পান্থ, 'দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক' সাত দিন!'
    সহসা বন্ধ হ'ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
    তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
    ভুখারি ফুকারি' কয়,
    'ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!'
    মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
    বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
    এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্
    বলে 'বাবা, আমি ভুকা-ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!'
    তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা - 'ভ্যালা হ'ল দেখি লেঠা,
    ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?'
    ভুখারী কহিল, 'না বাবা!' মোল্লা হাঁকিল - 'তা হলে শালা
    সোজা পথ দেখ!' গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
    ভুখারি ফিরিয়া চলে,
    চলিতে চলিতে বলে-
    'আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
    আমার ক্ষুধার অন্ন তা'বলে বন্ধ করনি প্রভু
    তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
    মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!'
    কোথা চেঙ্গিস্‌, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
    ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
    খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
    সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
    হায় রে ভজনালয়,
    তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
    মানুষেরে ঘৃণা করি'
    ও' কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি' মরি'
    ও' মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক'রে কেড়ে,
    যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
    পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
    মানুষ এনেছে গ্রন্থ;-গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।
    আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
    কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
    আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
    তাঁদেরি রক্ত কম-বেশি ক'রে প্রতি ধমনীতে রাজে!
    আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
    কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।
    হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
    আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
    হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
    কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
    কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
    হয়ত উহারই বুকে ভগবান্‌ জাগিছেন দিবা-রাতি!
    অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্‌ উচ্চ নহে,
    আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
    তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়
    ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
    হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
    জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
    যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
    আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!
    ও কে? চন্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
    ওই হ'তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
    আজ চন্ডাল, কাল হ'তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
    তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
    রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
    হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
    চাষা ব'লে কর ঘৃণা!
    দে'খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
    যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
    তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র'বে চিরকাল।
    দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
    তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
    তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
    দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।
    সে মার রহিল জমা-
    কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!
    বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু'চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
    নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ'য়েছে কুলি।
    মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,
    তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
    তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
    তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্‌খানে!
    তোমারি কামনা-রাণী
    যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি'।
    • মানুষ কবিতা থেকে উদ্ধৃত
  • জাগো–
    জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত
    জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত!
    যত অত্যাচারে আজি বজ্র হানি’
    হাঁকে নিপীড়িত-জন-মন-মথিত বাণী,
    নব জনম লভি’ অভিনব ধরণী
    ওরে ওই আগত।।

    আদি শৃঙ্খলা সনাতন শাস্ত্র-আচার
    মূল সর্বনাশের, এরে ভাঙিব এবার!
    ভেদি’ দৈত্য-কারা!
    আয় সর্বহারা!
    কেহ রহিবে না আর পর-পদ-আনত।

    কোরাস্‌ :
    নব ভিত্তি ’পরে
    নব নবীন জগৎ হবে উত্থিত রে!
    শোন্‌ অত্যাচারী! শোন্‌ রে সঞ্চয়ী!
    ছিনু সর্বহারা, হব’ সর্বজয়ী।।
    ওরে সর্বশেষের এই সংগ্রাম-মাঝ,
    নিজ নিজ অধিকার জুড়ে দাঁড়া সবে আজ!
    এই ‘অন্তর-ন্যাশনাল-সংহতি’ রে
    হবে নিখিল-মানব-জাতি সমুদ্ধত।।
    • অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত থেকে উদ্ধৃত
  • গাহি সাম্যের গান-
    যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
    যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ক্রিশ্চান।
    গাহি সাম্যের গান।।
    কে তুমি?- পার্সি? জৈন? ইহুদি? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
    কনফুসিয়াস চার্বাক-চেলা? বলে যাও, বল আরও!
    বন্ধু, যা খুশি হও,
    পেটে-পিঠে, কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
    কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক—
    জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব পড়ে যাও যত স, -
    কিন্তু কেন এ পণ্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
    দোকানে কেন এ দর-কষাকষি? পথে ফোটে তাজা ফুল!
    তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান
    ,সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
    তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
    তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার।
    কেন খুঁজে ফের দেবতা-ঠাকুর মৃত-পুঁথি-কঙ্কালে?
    হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে।
    বন্ধু, বলিনি ঝুটি,
    এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট
    এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
    বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
    মসৃজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
    এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
    এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
    এই মাঠে হলো মেষের রাখাল নবিরা খোদার মিতা।
    এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
    ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি ।
    এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
    এইখানে বসি গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
    মিথ্যা শুনিনি ভাই,
    এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই ।
    • সাম্যবাদী কবিতা থেকে উদ্ধৃত

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]