বিষয়বস্তুতে চলুন

স্বামী সারদানন্দ

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

স্বামী সারদানন্দ (২৩ ডিসেম্বর ১৮৬৫ – ১৯ আগস্ট ১৯২৭) ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অন্যতম প্রধান শিষ্য। তার পূর্বাশ্রমের তথা পিতৃদত্ত নাম ছিল শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে বেলুড় মঠ ও শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন স্থাপন করেন এবং আমৃত্যু প্রথম সচিব ছিলেন। তিনি কলকাতার বাগবাজারে উদ্বোধন বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মূলত, তিনি সারদা দেবীর কলকাতায় থাকার জন্য নির্মাণ করেছিলেন। এখান থেকে তিনি বাংলা পত্রিকা উদ্বোধন প্রকাশ করতেন। এখানেই তিনি রামকৃষ্ণদেবের জীবনীর উপর বাংলায় রচিত গ্রন্থ- শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ রচনা করেন। ইংরাজীতে অনূদিত হয়েছিল— শ্রী রামকৃষ্ণ, দ্য গ্রেট মাস্টার নামে। পুনর্জন্মে সারদানন্দকে সেন্ট পিটার (যিশু খ্রিস্টের সরাসরি প্রেরিত) হিসাবে গণ্য করা হয়। কথিত আছে যখন তিনি সেন্ট পিটার চার্চে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি সমাধিস্থ হন এবং বলেন, 'আমি আমার অতীত মনে করতে পারছি' এবং তিনি তার দিনলিপিতে লেখেন— 'সেন্ট পিটার এগেইন।'

স্বামী সারদানন্দ

উক্তি

[সম্পাদনা]
  • সঙ্ঘকে পবিত্র রাখিও, প্রবল ত্যাগের ভাব ও আদর্শনিষ্ঠা অব্যাহত রাখিও, যশ অহঙ্কার আত্মগৌরব যেন তোমাদিগকে বিভ্রান্ত না করে। সঙ্ঘের উন্নতি ও কল্যাণের জন্য যে উদার ব্যাপক দৃষ্টির প্রয়োজন, তাহা ভুলিয়া যাইও না।
    • 'বিদায়ের কিছুকাল পূর্বে জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতা হইতে শ্রীরামকৃষ্ণ মিশনের কর্মীদিগকে' দেওয়া তার বক্তব্য। উৎস: পৃষ্ঠা ৩৯৫
  • শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহার তপস্যালব্ধ যে সকল ভাব জগৎকে দান করিয়াছেন, তাহা যদি আমরা জীবনে পরিণত করিতে পারি, তবে তো কথাই নাই, আমাদের জীবন ধন্য হইবে; যদি এই বিষয় আমরা চিন্তাও করিতে পারি, তবে দেশের মহাকল্যাণ সাধিত হইবে। তাঁহার ভাব গ্রহণ করিতে পারে নাই বলিয়াই আমাদের দেশের বর্তমান দুর্দশা!
    • 'বিদায়ের কিছুকাল পূর্বে জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতা হইতে শ্রীরামকৃষ্ণ মিশনের কর্মীদিগকে' দেওয়া তার বক্তব্য। উৎস: পৃষ্ঠা ৩৯৫
  • অস্বাভাবিক শিক্ষাসম্পন্ন হীনবুদ্ধি বর্বর! তোমার আধ্যাত্মিক দৃষ্টির কি অবনতিই হইয়াছে! একবার বৈদেশিক মোহের নিবিড়াঞ্জন নয়ন 'হইতে অপসৃত করিয়া ভূজগতে দৃষ্টিপাত কর-দেখিবে, জগতের আদর্শস্থানীয়া দিব্য নারীকুল একমাত্র ভারতেই হিমাচলস্তরের ন্যায় অনুল্লঙ্ঘনীয় শ্রেণিতে তোমার কুললক্ষ্মীর সহায়তা করিতে দণ্ডায়মানা। তাঁহাদের পদরজে কেবল ভারত নহে কিন্তু সান্ধিদ্বীপা সকাননা সমগ্র পৃথিবীই সর্বকালের জন্য ধন্যা ও সগৌরবা হইয়াছেন। ভারতের ধূলি... সীতা, দৌপ্রদী, বুদ্ধৈকপ্রাণা যশোধরা, চৈতন্যঘরনী বিষ্ণুপ্রিয়া, ধর্মপ্রাণা অহল্যাবাঈ বা চিতোরের বীররমণীকুলের দেবারাধ্য পদস্পর্শে পবিত্রিত! ভাবদেখি-ভারতের বায়ু যাহা প্রতি নিশ্বাসে তোমাদের ভিতরে প্রবেশ করিয়া শরীর পুষ্ট করিতেছে, তাহা ঐ সকল দেবীদিগের পবিত্র হৃদয়ে যুগে যুগে প্রবেশ লাভ ও ক্রীড়া করিয়া তাঁহাদের পবিত্রতায় ওতঃপ্রোতভাবে পূর্ণ হইয়া রহিয়াছে। দেখিবে-তোমার জগন্মাতা নারীকুলের উপর বিশেষত ভারতের রমণীকুলের উপর হৃদয়ের ভক্তি প্রেম উথলিত হইয়া তোমাকে আবার যথার্থ মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠিত করিবে এবং তোমার কুললক্ষ্মীকে সাক্ষাৎ দেবী-প্রতিমায় পরিণত করিবে।
    • 'সমাজে নারীর প্রতি প্রতিদিনের অবজ্ঞা' দেখে তার বক্তব্য। উৎস: পৃষ্ঠা ৩৯৭
  • Word হচ্ছে হিন্দুশাস্ত্রের পরা-শব্দ বা শব্দব্রহ্মা। এটি নিও-প্লেটনিকরা আলেকজেন্দ্রিয়াতে হিন্দুদের কাছ থেকে বোধ হয় প্রাপ্ত হয়। সেন্ট জন ঐ Neo-Platonic School-এর ছাত্র ছিলেন। Word হচ্ছে প্লেটনিকদের 'Logos' পরা-শব্দ, আদি স্পন্দকারিকা মহামায়া। খ্রিস্টান mysticদের কেউ একে মাদারহুড অব গড বলে স্বীকার করেন। ঠাকুর বলতেন, পিতা স্বীকার করলে মাতাও স্বীকার করতে হয়। কিন্তু নব্য-প্লেটনিক প্লটিনাস God the father মানে নির্গুণ ব্রহ্ম অর্থে গ্রহণ করেছেন। তারপর 'Nous' অথবা Logos হচ্ছেন সগুণ ঈশ্বর এবং Universal Spirit হচ্ছেন আমাদের হিরণ্যগর্ভ, খ্রিস্টানদের Holy Ghost. সেন্ট অগাস্টাইন ঐ কথাই স্বীকার করে গেছেন-Nous হচ্ছে Eternal Wisdom of God of Eternal Christ, কিন্তু পরবর্তী কালের খ্রিস্টান মিসটিকরা 'গড দি ফাদার'কে Absolute-ই বলেন, কিন্তু লোগস্ হচ্ছে God the Son, Eternal Christ, first begotten; অর্থাৎ আমাদের হিরণ্যগর্ভ। আমরা বলি 'সেতু' ওরা বলে 'bridge' between the Absolute and the creature, আর Holy Ghost হচ্ছে প্রেম বা ভক্তি বা আকর্ষণ। Historical Christ হচ্ছেন eternal wisdom 'in flesh,' অর্থাৎ আমরা যাঁকে অবতার বলি। তবে আমরা ঐতিহাসিক খ্রিস্ট মাত্র একজন বলে স্বীকার করি না, পরন্তু যুগে যুগে প্রয়োজন, ভাব ও অধিকারিভেদে অনেক স্বীকার করি। খ্রিস্টের দীক্ষার সময় এই Holy Spirit তাঁতে অবতীর্ণ হলেন-এই হলো জীবের new birth, নবজন্ম বা দ্বিজত্ব। জীব ঈশ্বরকে ছুঁতে পারে না, ঈশ্বরই কৃপাপরবশ হয়ে জীবে ঐ Holy Spirit বা পরানুরক্তিরূপে আবির্ভূত হন। প্লটিনাস ও সেন্ট অগাস্টাইন ক্রাইস্ট বা Nous-এর মধ্য দিয়ে Abso-lute উপাসনার পক্ষপাতী ছিলেন, কিন্তু পরবর্তী খ্রিস্টান ফাদাররা একমাত্র খ্রিস্টোপাসনাই প্রধান করে ফেললেন। তার হেতু সাধারণের কাছে personal God বেশ ধরা ছোঁয়ার মধ্যে আসে।
    • স্বামী বাসুদেবানন্দের "সেন্ট জন 'word' তত্ত্বটি কোথা থেকে পেলেন?" প্রশ্নে সারদানন্দের উত্তর। উৎস: পৃষ্ঠা ১২০-১২১

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ১ম খণ্ড

[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ১ম খণ্ড

  • ভারত ও তদিতর দেশসমূহের আধ্যাত্মিক ভাব ও বিশ্বাসসকল তুলনায় আলোচনা করিলে, উহাদিগের মধ্যে বিশেষ প্রভেদ উপলব্ধি হয়। দেখা যায়, ঈশ্বর, আত্মা, পরকাল প্রভৃতি ইন্দ্রিয়াতীত বস্তুসকলকে ধ্রুবসত্যজ্ঞানে প্রত্যক্ষ করিতে অতি প্রাচীনকাল হইতে ভারত নিজ সর্বস্ব নিয়োজিত করিয়াছে এবং ঐরূপ সাক্ষাৎকার বা উপলব্ধিকেই ব্যক্তিগত এবং জাতিগত স্বার্থের চরম সীমারূপে সিদ্ধান্ত করিয়াছে। উহার সমগ্র চেষ্টা এক অপূর্ব আধ্যাত্মিকতায় চিরকালের জন্য রঞ্জিত হইয়া রহিয়াছে।
    • প্রথম খণ্ড – অবতরণিকা,ধর্মই ভারতের সর্বস্ব
  • অতএব দেখা যাইতেছে, নবীন ধর্মের আবিষ্কর্তা জগদ্গুরু, সর্বজ্ঞ অবতারপুরুষ যুগ-প্রয়োজন সাধনের জন্যই আবির্ভূত হন। ধর্মক্ষেত্র ভারত নানা যুগে বহুবার তাঁহার পদাঙ্ক হৃদয়ে ধারণ করিয়া পবিত্রীকৃত হইয়াছিল। যুগ-প্রয়োজন উপস্থিত হইলে অমিতগুণসম্পন্ন অবতারপুরুষের শুভাবির্ভাব এখনও তাহাতে দৃষ্ট হইয়া থাকে। কিঞ্চিদূর্ধ্ব চারিশত বৎসরমাত্র পূর্বে ঐরূপে শ্রীভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ভারতীর অদৃষ্টপূর্ব মহিমায় শ্রীহরির নামসংকীর্তনে উন্মত্ত হইবার কথা লোকপ্রসিদ্ধ। আবার কি সেই কাল উপস্থিত হইয়াছে? আবার কি বিদেশীর ঘৃণাস্পদ, নষ্টগৌরব, দরিদ্র ভারতে যুগ-প্রয়োজন উপস্থিত হইয়া শ্রীভগবানের করুণায় বিষম উত্তেজনা আনয়নপূর্বক তাঁহাকে বর্তমানকালে শরীরপরিগ্রহ করাইয়াছে? হে পাঠক, অশেষকল্যাণগুণসম্পন্ন যে মহাপুরুষের কথা আমরা তোমাকে বলিতে বসিয়াছি, তাঁহার জীবনালোচনায় বুঝিতে পারা যাইবে, ঘটনা ঐরূপ হইয়াছে – শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণাদিরূপে পূর্ব পূর্ব যুগে যিনি আবির্ভূত হইয়া সনাতন ধর্ম সংস্থাপিত করিয়াছিলেন, বর্তমানকালের যুগ-প্রয়োজন সাধিত করিতে তাঁহার শুভাগমন প্রত্যক্ষ করিয়া ভারত পুনরায় ধন্য হইয়াছে।
    • বর্তমানকালে অবতারপুরুষের পুনরাগমন
  • পাশ্চাত্ত্য মানবকে অবলম্বন করিয়া পূর্বোক্ত জীবন-প্রসার বিশেষভাবে উদিত হইলেও ভারতপ্রমুখ প্রাচ্যদেশসকলেও উহার প্রভাব স্বল্প লক্ষিত হইতেছে না। বিজ্ঞানের অদম্য শক্তিতে প্রাচ্যপাশ্চাত্ত্য প্রদেশ প্রতিদিন যত নিকট সম্বন্ধে সম্বদ্ধ হইতেছে, প্রাচ্য মানবের প্রাচীন জীবনসংস্কারসমূহ ততই পরিবর্তিত হইয়া পাশ্চাত্ত্য মানবের ভাবে গঠিত হইয়া উঠিতেছে। পারস্য, চীন, জাপান, ভারত প্রভৃতি দেশসমূহের বর্তমান অবস্থার আলোচনায় ঐ কথা বুঝিতে পারা যায়। ফলাফল ভবিষ্যতে যেরূপই হউক না কেন, প্রাচ্যের উপর পাশ্চাত্ত্যের ঐরূপে ভাববিস্তার সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ থাকে না, এবং সমগ্র পৃথিবীর কালে পাশ্চাত্ত্যভাবে ভাবিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী বলিয়া বোধ হইয়া থাকে।
    • প্রথম খণ্ড – প্রথম অধ্যায়: যুগ-প্রয়োজন
  • ঈশ্বরাবতার বলিয়া যে-সকল মহাপুরুষ জগতে অদ্যাপি পূজিত হইতেছেন, শ্রীভগবান রামচন্দ্র ও শাক্যসিংহের কথা ছাড়িয়া দিলে, তাঁহাদিগের সকলেরই পার্থিব জীবন দুঃখ-দারিদ্র্য, সংসারের অসচ্ছলতা এবং এমনকি কঠোরতার ভিতর আরম্ভ হইয়াছে, দেখিতে পাওয়া যায়। যথা – ক্ষত্রিয়রাজকুল অলঙ্কৃত করিলেও শ্রীভগবান শ্রীকৃষ্ণের কারাগৃহে জন্ম ও আত্মীয়-স্বজন হইতে দূরে, নীচ গোপকুলমধ্যে বাল্যজীবন অতিবাহিত হইয়াছিল; শ্রীভগবান ঈশা পান্থশালায় পশুরক্ষাগৃহে দরিদ্র পিতামাতার ক্রোড় উজ্জ্বল করিয়াছিলেন; শ্রীভগবান শঙ্কর দরিদ্র বিধবার পুত্ররূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন; শ্রীভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নগণ্য সাধারণ ব্যক্তির গৃহে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছিলেন; ইস্লামধর্ম-প্রবর্তক শ্রীমৎ মহম্মদের জীবনেও ঐ কথার পরিচয় পাওয়া যায়। ঐরূপ হইলেও কিন্তু যে দুঃখ-দারিদ্র্যের ভিতর সন্তোষের সরসতা নাই, যে অসচ্ছল সংসারে নিঃস্বার্থতা ও প্রেম নাই, যে দরিদ্র পিতামাতার হৃদয়ে ত্যাগ, পবিত্রতা ও কঠোর মনুষ্যত্বের সহিত কোমল দয়াদাক্ষিণ্যাদি ভাবসমূহের মধুর সামঞ্জস্য নাই, সেস্থলে তাঁহারা কখনও জন্মগ্রহণ করেন নাই।
    • প্রথম খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: কামারপুকুর ও পিতৃপরিচয়
  • শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম বয়ঃপ্রাপ্তির সহিত অর্থকরী কোনরূপ বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন কি-না জানা যায় না। কিন্তু সত্যনিষ্ঠা, সন্তোষ, ক্ষমা, ত্যাগ প্রভৃতি যে গুণসমূহ সদ্ব্রাহ্মণের স্বভাবসিদ্ধ হওয়া কর্তব্য বলিয়া শাস্ত্রনির্দিষ্ট আছে, বিধাতা তাঁহাকে ঐ সকল গুণ প্রচুর পরিমাণে প্রদান করিয়াছিলেন। তিনি দীর্ঘ ও সবল ছিলেন, কিন্তু স্থূলকায় ছিলেন না; গৌরবর্ণ ও প্রিয়দর্শন ছিলেন। বংশানুগত শ্রীরামচন্দ্রে ভক্তি তাঁহাতে বিশেষ প্রকাশ ছিল এবং তিনি নিত্যকৃত্য সন্ধ্যাবন্দনাদি সমাপন করিয়া প্রতিদিন পুষ্পচয়নপূর্বক ৺রঘুবীরের পূজান্তে জলগ্রহণ করিতেন। শূদ্রের নিকট হইতে দানগ্রহণ দূরে থাকুক, শূদ্রযাজী ব্রাহ্মণের নিমন্ত্রণ তিনি কখনও গ্রহণ করেন নাই এবং যে-সকল ব্রাহ্মণ পণগ্রহণ করিয়া কন্যাসম্প্রদান করিত, তাহাদিগের হস্তে জলগ্রহণ পর্যন্ত করিতেন না। ঐরূপ নিষ্ঠা ও সদাচারের জন্য গ্রামবাসীরা তাঁহাকে বিশেষ ভক্তি ও সম্মানের চক্ষে দর্শন করিত।
    • প্রথম খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: কামারপুকুর ও পিতৃপরিচয়
  • শ্রীমতী চন্দ্রা প্রতিবেশী বালকবালিকাগণকে চিরকাল অপত্যনির্বিশেষে ভালবাসিতেন। ক্ষুদিরাম দেখিলেন, তাঁহার সেই অপত্যস্নেহ এখন যেন দেবতাসকলের উপরও প্রসারিত হইয়াছে। কুলদেবতা ৺রঘুবীরকে তিনি এখন আপন পুত্রগণের অন্যতমরূপে সত্য সত্যই দর্শন করিতেছেন এবং ৺শীতলাদেবীর ও ৺রামেশ্বর বাণলিঙ্গটিও যেন তাঁহার হৃদয়ে ঐরূপ স্থান অধিকার করিয়াছে। ঐসকল দেবতার সেবাপূজাকালে ইতিপূর্বে তাঁহার অন্তর শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয়ে সর্বদা পূর্ণ থাকিত; ভালবাসা আসিয়া সেই ভয়কে যেন এখন কোথায় অন্তর্হিত করিয়াছে। দেবতাগণের নিকটে তাঁহার এখন আর ভয় নাই, সঙ্কোচ নাই, লুকাইবার এবং চাহিবার যেন কিছুই নাই! আছে কেবল তৎস্থলে আপনার হইতে আপনার বলিয়া তাঁহাদিগকে জ্ঞান করা, তাঁহাদিগকে সুখী করিবার জন্য সর্বস্বপ্রদানের ইচ্ছা এবং তাঁহাদিগের সহিত চিরসম্বন্ধ হওয়ার অনন্ত উল্লাস।
    • প্রথম খণ্ড – চতুর্থ অধ্যায়: চন্দ্রাদেবীর বিচিত্র অনুভব
  • সে যাহা হউক, গদাধর নবম বর্ষ উত্তীর্ণ হইতে চলিয়াছে দেখিয়া শ্রীযুক্ত রামকুমার এখন তাহার উপনয়নের বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন। কামারকন্যা ধনী ইতিপূর্বে এক সময়ে বালকের নিকটে প্রার্থনা করিয়াছিল, সে যেন উপনয়নকালে তাহার নিকট হইতে প্রথম ভিক্ষা গ্রহণ করিয়া তাহাকে মাতৃসম্বোধনে কৃতার্থ করে। বালকও তাহাতে তাহার অকৃত্রিম স্নেহে মুগ্ধ হইয়া তাহার অভিলাষ পূর্ণ করিতে অঙ্গীকার করিয়াছিল। দরিদ্রা ধনী তাহাতে বালকের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিয়া তদবধি যথাসাধ্য অর্থাদি সংগ্রহ ও সঞ্চয় করিয়া সাগ্রহে ঐকালের প্রতীক্ষা করিতেছিল। সেই কাল উপস্থিত দেখিয়া গদাধর এখন নিজ অগ্রজকে ঐকথা নিবেদন করিল। কিন্তু বংশে কখনও ঐরূপ প্রথার অনুষ্ঠান না হওয়ায় শ্রীযুক্ত রামকুমার উহাতে আপত্তি করিয়া বসিলেন। বালকও নিজ অঙ্গীকার স্মরণ করিয়া ঐ বিষয়ে বিষম জেদ করিতে লাগিল। সে বলিল, ঐরূপ না করিলে তাহাকে সত্যভঙ্গের অপরাধে অপরাধী হইতে হইবে এবং মিথ্যাবাদী ব্যক্তি ব্রাহ্মণোচিত যজ্ঞসূত্রধারণে কখন অধিকারী হইতে পারে না। উপনয়নের কাল সন্নিকট দেখিয়া ইতিপূর্বেই সকল বিষয়ের আয়োজন করা হইয়াছিল, বালকের পূর্বোক্ত জেদে ঐ কর্ম পণ্ড হইবার উপক্রম হইল। ক্রমে ঐ কথা শ্রীযুক্ত ধর্মদাস লাহার কর্ণে প্রবেশ করিল। তখন উভয় পক্ষের বিবাদ মিটাইয়া দিতে যত্নপর হইয়া তিনি শ্রীযুক্ত রামকুমারকে বলিলেন, ঐরূপ অনুষ্ঠান তাঁহাদিগের বংশে ইতিপূর্বে না হইলেও উহা অন্যত্র বহু সদ্ব্রাহ্মণ-পরিবারে দেখা গিয়া থাকে। অতএব উহাতে তাঁহাদিগের যখন নিন্দাভাগী হইতে হইবে না, তখন বালকের সন্তোষ ও শান্তির জন্য ঐরূপ করিতে দোষ নাই। প্রবীণ পিতৃসুহৃৎ ধর্মদাসের কথায় তখন রামকুমার প্রভৃতি ঐ বিষয়ে আর আপত্তি করিলেন না এবং গদাধর হৃষ্টচিত্তে যথাবিধানে উপবীতধারণ করিয়া সন্ধ্যাপূজাদি ব্রাহ্মণোচিত কার্যে মনোনিবেশ করিল। কামারকন্যা ধনীও তখন বালকের সহিত ঐভাবে সম্বদ্ধা হইয়া আপনার জীবন ধন্য জ্ঞান করিতে লাগিল। উহার স্বল্পকাল পরেই বালক দশম বর্ষে পদার্পণ করিল।
    • প্রথম খণ্ড – সপ্তম অধ্যায়: গদাধরের কৈশোরকাল

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ২য় খণ্ড

[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ২য় খণ্ড

  • নরদেহ ধারণ করিয়া নরবৎ লীলায় অবতারপুরুষদিগকে আমাদিগের ন্যায় অনেকাংশে দৃষ্টিহীনতা, অল্পজ্ঞতা প্রভৃতি অনুভব করিতে হয়। আমাদিগেরই ন্যায় উদ্যম করিয়া তাঁহাদিগকে ঐ সকলের হস্ত হইতে মুক্ত হইবার পথ আবিষ্কার করিতে হয় এবং যতদিন না ঐ পথ আবিষ্কৃত হয়, ততদিন তাঁহাদিগের অন্তরে নিজ দেবস্বরূপের আভাস কখনও কখনও অল্পক্ষণের জন্য উদিত হইলেও উহা আবার প্রচ্ছন্ন হইয়া পড়ে। এইরূপে ‘বহুজনহিতায়’ মায়ার আবরণ স্বীকার করিয়া লইয়া তাঁহাদিগকে আমাদিগেরই ন্যায় আলোক-আঁধারের রাজ্যের ভিতর পথ হাতড়াইতে হয়। তবে স্বার্থসুখচেষ্টার লেশমাত্র তাঁহাদের ভিতরে না থাকায় তাঁহারা জীবনপথে আমাদিগের অপেক্ষা অধিক আলোক দেখিতে পান এবং অভ্যন্তরীণ সমগ্র শক্তিপুঞ্জ সহজেই একমুখী করিয়া অচিরেই জীবন-সমস্যার সমাধানকরতঃ লোককল্যাণসাধনে নিযুক্ত হয়েন।
    • মানবের অসম্পূর্ণতা স্বীকার করিয়া অবতারপুরুষের মুক্তির পথ আবিষ্কার করা
  • পূর্বোক্ত কথায় কেহ কেহ হয়তো স্থির করিবেন, অবতারপুরুষসকলকে আমাদিগের ন্যায় দুর্বার ইন্দ্রিয়সকলের সহিত কখনও সংগ্রাম করিতে হয় না; শিষ্ট শান্ত বালকের ন্যায় উহারা বুঝি আজন্ম তাঁহাদিগের বশে নিরন্তর উঠিতে বসিতে থাকে এবং সেইজন্য সংসারের রূপরসাদি হইতে মনকে ফিরাইয়া তাঁহারা সহজেই উচ্চ লক্ষ্যে চালিত করিতে পারেন। উত্তরে আমরা বলি – তাহা নহে, ঐ বিষয়েও নরবৎ নরলীলা হইয়া থাকে; এখানেও তাঁহাদিগকে সংগ্রামে জয়ী হইয়া গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতে হয়।
    • অবতারপুরুষদিগকে সাধারণ মানবের ন্যায় সংযম–অভ্যাস করিতে হয়,দ্বিতীয় খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: অবতারজীবনে সাধকভাব
  • শুনা যায়, রাণী রাসমণির জানবাজারের বাটীর নিকট পূর্বে ইংরাজ সৈনিকদিগের একটি ব্যারাক বা আড্ডা তখন প্রতিষ্ঠিত ছিল। মদ্যপানে উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকেরা একদিন রাণীর দ্বাররক্ষকদিগকে বলপ্রয়োগে বশীভূত করিয়া বাটীমধ্যে প্রবেশ ও লুটপাট করিতে আরম্ভ করে। রাণীর জামাতা মথুরবাবুপ্রমুখ পুরুষেরা তখন কার্যান্তরে বাহিরে গিয়াছিলেন। সৈনিকেরা বাধা না পাইয়া ক্রমে অন্দরে প্রবেশ করিতে উদ্যত দেখিয়া রাণী স্বয়ং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিতা হইয়া তাহাদিগকে বাধা দিবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলেন।
    • দ্বিতীয় খণ্ড – চতুর্থ অধ্যায়: দক্ষিণেশ্বর কালীবাটী
  • ধর্মপত্রের মীমাংসা দেখিয়া ঠাকুরের মন ঐ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হইলেও এখন অন্য এক চিন্তা তাঁহার হৃদয় অধিকার করিল। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, চতুষ্পাঠী তো এইবার উঠিয়া যাইল, তিনি এখন কি করিবেন! ঝামাপুকুরে ঐদিন আর না ফিরিয়া ঠাকুর ঐ বিষয়ক চিন্তাতেই মগ্ন রহিলেন এবং রামকুমার তাঁহাকে ঠাকুরবাড়ীতে প্রসাদ পাইতে বলিলেও তাহাতে সম্মত হইলেন না। রামকুমার নানাপ্রকারে বুঝাইলেন; বলিলেন – “দেবালয়, গঙ্গাজলে রান্না, তাহার উপর শ্রীশ্রীজগদম্বাকে নিবেদিত হইয়াছে, ইহা ভোজনে কোন দোষ হইবে না।” ঠাকুরের কিন্তু ঐ সকল কথা মনে লাগিল না। তখন রামকুমার বলিলেন, “তবে সিধা লইয়া পঞ্চবটীতলে গঙ্গাগর্ভে স্বহস্তে রন্ধন করিয়া ভোজন কর; গঙ্গাগর্ভে অবস্থিত সকল বস্তুই পবিত্র, একথা তো মান?” আহার-সম্বন্ধীয় ঠাকুরের মনের ঐকান্তিক নিষ্ঠা এইবার তাঁহার অন্তর্নিহিত গঙ্গাভক্তির নিকট পরাজিত হইল। শাস্ত্রজ্ঞ রামকুমার তাঁহাকে যুক্তিসহায়ে এত করিয়া বুঝাইয়া ইতিপূর্বে যাহা করাইতে পারেন নাই, বিশ্বাস ও ভক্তি তাহা সংসাধিত করিল। ঠাকুর ঐ কথায় সম্মত হইলেন এবং ঐপ্রকারে ভোজন করিয়া দক্ষিণেশ্বরে অবস্থান করিতে লাগিলেন।
    • দ্বিতীয় খণ্ড – চতুর্থ অধ্যায়: দক্ষিণেশ্বর কালীবাটী, ঠাকুরের আহার সম্বন্ধে নিষ্ঠা
  • সর্বদা অনলস হৃদয়ের অন্তরে ভাবুকতার বিন্দুবিসর্গ ছিল না। ঐজন্য সংসারী মানবের যেমন হইয়া থাকে, হৃদয়ের চিত্ত নিজ স্বার্থচেষ্টা হইতে কখনও সম্পূর্ণ বিযুক্ত হইতে পারিত না। ঠাকুরের সহিত হৃদয়ের এখন হইতে সম্বন্ধের কথার আমরা যতই আলোচনা করিব ততই দেখিতে পাইব, তাহার জীবনে ভবিষ্যতে যতটুকু ভাবুকতা ও নিঃস্বার্থ চেষ্টার পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা ভাবময় ঠাকুরের নিরন্তর সঙ্গগুণে এবং কখন কখন তাঁহার চেষ্টার অনুকরণে আসিয়া উপস্থিত হইত। ঠাকুরের ন্যায় আহার, বিহার প্রভৃতি সর্ববিধ শারীরচেষ্টায় উদাসীন, সর্বদা চিন্তাশীল, স্বার্থগন্ধশূন্য ভাবুকজীবনের গঠনকালে হৃদয়ের ন্যায় একজন শ্রদ্ধাসম্পন্ন সাহসী উদ্যমশীল কর্মীর সহায়তা নিতান্ত প্রয়োজন। শ্রীশ্রীজগদম্বা কি সেইজন্য ঠাকুরের সাধনকালে হৃদয়ের ন্যায় পুরুষকে তাঁহার সহিত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে সম্বদ্ধ করিয়াছিলেন? ঠাকুর একথা আমাদিগকে বারংবার বলিয়াছেন, হৃদয় না থাকিলে সাধনকালে তাঁহার শরীররক্ষা অসম্ভব হইত। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনের সহিত হৃদয়ের নাম তজ্জন্য নিত্যসংযুক্ত – এবং তজ্জন্যই সে আন্তরিক ভক্তিশ্রদ্ধার অধিকারী হইয়া চিরকালের নিমিত্ত আমাদিগের প্রণম্য হইয়া রহিয়াছে।
    • দ্বিতীয় খণ্ড – পঞ্চম অধ্যায়: পূজকের পদগ্রহণ,ঠাকুরের ভাগিনেয় হৃদয়রাম
  • ভগবদ্দর্শনের জন্য উদ্দাম ব্যাকুলতায় ঠাকুর যেদিন একেবারে অস্থির বা বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া না পড়িতেন, সেদিন পূর্বের ন্যায় পূজা করিতে অগ্রসর হইতেন। পূজা ও ধ্যানাদি করিবার কালে ঐ সময়ে তাঁহার যেরূপ চিন্তা ও অনুভব উপস্থিত হইত, তদ্বিষয়ে তিনি আমাদিগকে নিম্নলিখিতভাবে কখনো কখনো কিছু কিছু বলিয়াছিলেন। “মার নাট-মন্দিরের ছাদের আলিসায় যে ধ্যানস্থ ভৈরবমূর্তি আছে, ধ্যান করিতে যাইবার সময় তাঁহাকে দেখাইয়া মনকে বলিতাম, ‘ঐরূপ স্থির নিস্পন্দভাবে বসিয়া মার পাদপদ্ম চিন্তা করিতে হইবে।’ ধ্যান করিতে বসিবামাত্র শুনিতে পাইতাম, শরীর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গ্রন্থিসকলে, পায়ের দিক হইতে ঊর্ধ্বে খটখট করিয়া শব্দ হইতেছে এবং একটার পর একটা করিয়া গ্রন্থিগুলি আবদ্ধ হইয়া যাইতেছে – কে যেন ভিতরে ঐ সকল স্থান তালাবদ্ধ করিয়া দিতেছে। যতক্ষণ ধ্যান করিতাম ততক্ষণ শরীর যে একটুও নাড়িয়া চাড়িয়া আসন পরিবর্তন করিয়া লইব অথবা ইচ্ছামাত্রেই ধ্যান ছাড়িয়া অন্যত্র গমন করিব বা অন্য কর্মে নিযুক্ত হইব, তাহার সামর্থ্য থাকিত না! পূর্ববৎ খটখট শব্দ করিয়া – এবার উপরের দিক হইতে পা পর্যন্ত – ঐ সকল গ্রন্থি পুনরায় যতক্ষণ না খুলিয়া যাইত, ততক্ষণ কে যেন একভাবে জোর করিয়া বসাইয়া রাখিত! ধ্যান করিতে বসিয়া প্রথম প্রথম খদ্যোৎপুঞ্জের ন্যায় জ্যোতির্বিন্দুসমূহ দেখিতে পাইতাম; কখনো বা কুয়াসার ন্যায় পুঞ্জ পুঞ্জ জ্যোতিঃতে চতুর্দিক ব্যাপ্ত দেখিতাম; আবার কখনো বা গলিত রূপার ন্যায় উজ্জ্বল জ্যোতিঃ-তরঙ্গে সমুদয় পদার্থ পরিব্যাপ্ত দেখিতাম। চক্ষু মুদ্রিত করিয়া ঐরূপ দেখিতাম; আবার অনেক সময় চক্ষু চাহিয়াও ঐরূপ দেখিতে পাইতাম। কি দেখিতেছি তাহা বুঝিতাম না, ঐরূপ দর্শন হওয়া ভাল কি মন্দ তাহাও জানিতাম না; সুতরাং মার (৺জগন্মাতার) নিকট ব্যাকুল হৃদয়ে প্রার্থনা করিতাম – ‘মা, আমার কি হচ্চে, কিছুই বুঝি না; তোকে ডাকবার মন্ত্র তন্ত্র কিছুই জানি না; যাহা করলে তোকে পাওয়া যায়, তুই-ই তাহা আমাকে শিখিয়ে দে। তুই না শিখালে কে আর আমাকে শিখাবে, মা; তুই ছাড়া আমার গতি বা সহায় আর কেহই যে নাই!’ একমনে ঐরূপে প্রার্থনা করিতাম এবং প্রাণের ব্যাকুলতায় ক্রন্দন করিতাম!”
    • দ্বিতীয় খণ্ড – সপ্তম অধ্যায়: সাধনা ও দিব্যোন্মত্ততা
  • সাধনকালের প্রথম চারি বৎসরে ঠাকুর ৺জগদম্বার দর্শনমাত্র করিয়াই নিশ্চিন্ত ছিলেন না। ভাবমুখে শ্রীশ্রীজগন্মাতার দর্শনলাভের পর নিজ কুলদেবতা ৺রঘুবীরের দিকে তাঁহার চিত্ত আকৃষ্ট হইয়াছিল। হনুমানের ন্যায় অনন্যভক্তিতেই শ্রীরামচন্দ্রের দর্শনলাভ সম্ভবপর বুঝিয়া দাস্যভক্তিতে সিদ্ধ হইবার জন্য তিনি এখন আপনাতে মহাবীরের ভাবারোপ করিয়া কিছুদিনের জন্য সাধনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। নিরন্তর মহাবীরের চিন্তা করিতে করিতে এই সময়ে তিনি ঐ আদর্শে এতদূর তন্ময় হইয়াছিলেন যে, আপনার পৃথক অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বের কথা কিছুকালের জন্য একেবারে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। তিনি বলিতেন, “ঐ সময়ে আহারবিহারাদি সকল কার্য হনুমানের ন্যায় করিতে হইত – ইচ্ছা করিয়া যে করিতাম তাহা নহে, আপনা আপনি হইয়া পড়িত! পরিবার কাপড়খানাকে লেজের মতো করিয়া কোমরে জড়াইয়া বাঁধিতাম, উল্লম্ফনে চলিতাম, ফলমূলাদি ভিন্ন অপর কিছুই খাইতাম না – তাহাও আবার খোসা ফেলিয়া খাইতে প্রবৃত্তি হইত না, বৃক্ষের উপরই অনেক সময় অতিবাহিত করিতাম এবং নিরন্তর ‘রঘুবীর রঘুবীর’ বলিয়া গম্ভীরস্বরে চিৎকার করিতাম। চক্ষুদ্বয় তখন সর্বদা চঞ্চল ভাব ধারণ করিয়াছিল এবং আশ্চর্যের বিষয়, মেরুদণ্ডের শেষ ভাগটা ঐ সময়ে প্রায় এক ইঞ্চি বাড়িয়া গিয়াছিল।” শেষোক্ত কথাটি শুনিয়া আমরা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, “মহাশয়, আপনার শরীরের ঐ অংশ কি এখনো ঐরূপ আছে?” উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন, “না, মনের উপর হইতে ঐ ভাবের প্রভুত্ব চলিয়া যাইবার কালে উহা ধীরে ধীরে পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক আকার ধারণ করিয়াছে।”
    • দ্বিতীয় খণ্ড – অষ্টম অধ্যায়: প্রথম চারি বৎসরের শেষ কথা
  • গুরু-পরম্পরাগত শাস্ত্রনির্দিষ্ট সাধনপথ অবলম্বন না করিয়া কেবলমাত্র অনুরাগ-সহায়ে ঈশ্বরদর্শনে অগ্রসর হইয়াছেন বলিয়াই ঠাকুর নিজ উচ্চ অবস্থা সম্বন্ধে ধারণা করিতে পারিতেছেন না, প্রবীণা সাধিকা ব্রাহ্মণীর একথা বুঝিতে বিলম্ব হয় নাই। নিজ অপূর্ব প্রত্যক্ষসকলকে মস্তিষ্কবিকৃতির ফল বলিয়া এবং শারীরিক বিকারসমূহ ব্যাধির জন্য উপস্থিত হইতেছে বলিয়া যে সন্দেহ ঠাকুরকে মধ্যে মধ্যে মুহ্যমান করিতেছিল, তাহার হস্ত হইতে নির্মুক্ত করিবার জন্য ব্রাহ্মণী এখন তাঁহাকে তন্ত্রোক্ত সাধনমার্গ অবলম্বনে উৎসাহিত করিয়াছিলেন। কারণ সাধক যেরূপ ক্রিয়ার অনুষ্ঠানে যেরূপ ফল প্রাপ্ত হইবেন, তন্ত্রে তদ্বিষয় লিপিবদ্ধ দেখিতে পাইয়া এবং অনুষ্ঠানসহায়ে স্বয়ং ঐরূপ ফলসমূহ লাভ করিয়া তাঁহার মনে এ কথার দৃঢ় প্রতীতি হইবে যে, সাধনাসহায়ে মানব অন্তঃরাজ্যের উচ্চ উচ্চতর ভূমিসমূহে যত আরোহণ করিতে থাকে, ততই তাহার অনন্যসাধারণ শারীরিক ও মানসিক অবস্থাসমূহের উপলব্ধি হয়। ফলে ইহা দাঁড়াইবে যে, ঠাকুরের জীবনে ভবিষ্যতে যেরূপ অসাধারণ প্রত্যক্ষসকল উপস্থিত হউক না কেন, কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া তিনি ঐ সকলকে সত্য ও অবশ্যম্ভাবী জানিয়া নিশ্চিন্ত মনে গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতে পারিবেন। ব্রাহ্মণী জানিতেন, শাস্ত্র ঐজন্য সাধককে গুরুবাক্য ও শাস্ত্রবাক্যের সহিত নিজ জীবনের অনুভবসকলকে মিলাইয়া অনুরূপ হইল কিনা, দেখিতে বলিয়াছেন।
    • দ্বিতীয় খণ্ড – একাদশ অধ্যায়: ঠাকুরের তন্ত্রসাধন

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ৩য় খণ্ড

[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ৩য় খণ্ড

  • এই ঋষিত্ব ও বেদদ্রষ্টৃত্ব লাভ করাই যথার্থ ধর্মানুভূতি। সাধকের জীবনে যতদিন উহার উন্মেষ না হয়, ততদিন ‘ধর্ম’ কেবল ‘কথার কথা’ ও ধর্মরাজ্যের প্রথম সোপানেও তাহার পদস্থিতি হয় নাই, জানিতে হইবে।
    • তৃতীয় খণ্ড – হিন্দুধর্ম ও শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
  • তলাইয়া দেখিলে বাস্তবিকই ঠাকুরের অতি সামান্য-সামান্য দৈনিক ব্যবহার ও উপদেশের ভিতর ঐরূপ গভীর অর্থ দেখিতে পাইয়া আশ্চর্য হইতে হয়। অবতারপুরুষদিগের প্রত্যেকের সম্বন্ধেই কথাটি সত্য। তাঁহাদের জীবনালোচনায় ইহা স্পষ্ট দেখিতে পাওয়া যায়। আচার্য শঙ্কর প্রভৃতি যে দুই-একজন মহাপুরুষকে বিপক্ষদলের কুতর্কজাল ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া ধর্মসংস্থাপন করিতে হইয়াছিল, তাঁহাদের কথা ছাড়িয়া দিলে, অপর সকল মহাপুরুষদিগের জীবনেই দেখা যায়, তাঁহারা সাদা কথায়, মর্মস্পর্শী ছোট ছোট গল্প, উপমা বা রূপকের সহায়ে যাহা বলিবার বলিয়া ও বুঝাইয়া গিয়াছেন। লম্বা-চওড়া কথা, দীর্ঘ দীর্ঘ সমাস প্রভৃতির ধার দিয়াও যান নাই। কিন্তু সে সাদা কথার, সে ছোট উপমার ভিতর এত ভাব ও মানবসাধারণকে উচ্চ আদর্শে পৌঁছাইয়া দিবার এত শক্তি রহিয়াছে যে, আমরা হাজার হাজার বৎসর ধরিয়া চেষ্টা করিয়াও তাঁহাদের ভাবের অন্ত বা শক্তির সীমা এখনও করিতে পারিলাম না। যতই দেখি ততই উচ্চ উচ্চতর ভাব দেখিতে পাই, যতই নাড়াচাড়া তোলাপাড়া করি ততই মন ‘অনিত্য অশুভ’ সংসারের রাজত্ব ছাড়িয়া ঊর্ধ্বে ঊর্ধ্বতর দেশে উঠিতে থাকে, এবং ‘পরমপদপ্রাপ্তি’, ‘ব্রাহ্মীস্থিতি’, ‘মোক্ষ’ বা ‘ভগবদ্দর্শনে’র দিকে – কারণ এক বস্তুকেই নানাভাবে দেখিয়া মহাপুরুষেরা ঐসকল নানা নামে নির্দেশ করিয়াছেন – যতই কেহ অগ্রসর হইতে থাকে, ততই ঐসকল সাদা কথার গভীর ভাব প্রাণে প্রাণে বুঝিতে থাকে।
    • তৃতীয় খণ্ড – প্রথম অধ্যায়: শ্রীরামকৃষ্ণ – ভাবমুখে
  • বকলমার প্রসঙ্গে নানা কথা মনে উদয় হইতেছে। জগতের ইতিহাসে দেখিতে পাই ভগবান যীশু, চৈতন্য প্রভৃতি মহাপুরুষগণই কখনো কখনো কাহাকেও ঐরূপ অভয় দিয়াছেন। সাধারণ গুরুর ঐরূপ করিবার সামর্থ্য বা অধিকার নাই। সাধারণ গুরু বা সাধুরা মন্ত্র-তন্ত্র বা ক্রিয়াবিশেষ, যাহা দ্বারা তাঁহারা নিজে আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করিয়াছেন, তাহাই বড় জোর অপরকে বলিয়া দিতে পারেন। অথবা পবিত্রভাবে নিজ জীবন যাপন করিয়া লোককে পবিত্রতার দিকে আকৃষ্ট করিতে পারেন। কিন্তু নানা বন্ধনে জড়ীভূত হইয়া মানুষ যখন একেবারে অসহায় অবস্থায় উপস্থিত হয়, যখন ‘এইরূপ কর’ বলিলে সে হতাশ হইয়া বলিয়া উঠে, ‘করিব কিরূপে? করিবার শক্তি দাও তো করি’, তখন তাহাকে সাহায্য করা সাধারণ গুরুর সাধ্যাতীত। ‘তোমার দুষ্কৃতির সকল ভার লইলাম, আমিই তোমার হইয়া ঐ সকলের ফলভোগ করিব’ – একথা মানবকে মানবের বলা ও তদ্রূপ করা সাধ্যাতীত। মানবহৃদয়ে ধর্মের ঐরূপ গ্লানি উপস্থিত হইলেই কৃপায় শ্রীভগবান অবতীর্ণ হন এবং তাহার হইয়া ফলভোগ করিয়া তাহাকে সেই বন্ধনের আবর্ত হইতে উদ্ধার করেন। কিন্তু ঐরূপ করিলেও তিনি তাহাকে একেবারে রেহাই দেন না। শিক্ষার নিমিত্ত তাহাকে দিয়া কিছু-না-কিছু করাইয়া লন। ঠাকুর যেমন বলিতেন – “তাঁদের (অবতারপুরুষদিগের) কৃপায় মানবের দশ জন্মের ভোগটা এক জন্মে হয়ে যায়।” ব্যক্তির সম্বন্ধে যেরূপ, জাতির সম্বন্ধেও উহা সেইরূপ সত্য।
    • তৃতীয় খণ্ড – প্রথম অধ্যায়: শ্রীরামকৃষ্ণ – ভাবমুখে
  • সাধারণ মানবে যাহা উপলব্ধি করে না তাহাকেই আমরা সচরাচর ‘বিকার’ বলিয়া থাকি। ধর্মজগতের সূক্ষ্ম উপলব্ধিসমূহ কিন্তু কখনই সাধারণ মানবমনের অনুভবের বিষয় হইতে পারে না; উহাতে শিক্ষা, দীক্ষা ও নিরন্তর অভ্যাসাদির প্রয়োজন। ঐসকল অসাধারণ দর্শন ও অনুভবাদি সাধককে দিন দিন পবিত্র করে ও নিত্য নূতন বলে বলীয়ান এবং নব নব ভাবে পূর্ণ করিয়া ক্রমে চিরশান্তির অধিকারী করে। অতএব ঐসকল দর্শনাদিকে ‘বিকার’ বলা যুক্তিসঙ্গত কি? ‘বিকার’ মাত্রই যে মানবকে দুর্বল করে ও তাহার বুদ্ধি-শুদ্ধি হ্রাস করে, এ কথা সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে। ধর্মজগতের দর্শনানুভূতিসকলের ফল যখন উহার সম্পূর্ণ বিপরীত, তখন ঐসকলের কারণও সম্পূর্ণ বিপরীত বলিতে হইবে এবং তজ্জন্য ঐসকলকে মস্তিষ্ক-বিকার বা রোগ কখনো বলা চলে না।
    • তৃতীয় খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: ভাব, সমাধি ও দর্শন সম্বন্ধে কয়েকটি কথা
  • অদ্বৈতভাব-উপলব্ধির যেমন তারতম্য আছে, সেইরূপ নিম্নস্তরের শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্যাদি ভাবসমূহের অথবা যে ভাবসমূহ অদ্বৈতভাবে সাধককে উপনীত করে, সেসকলের উপলব্ধি করিবার মধ্যেও আবার তারতম্য আছে। কেহ বা উহার কোনটি সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করিয়া কৃতার্থ হন, আবার কেহ বা উহার আভাসমাত্রই পাইয়া থাকেন। এই নিম্নাঙ্গের ভাবসকলের মধ্যে কোন একটির সম্পূর্ণ উপলব্ধিই ‘সবিকল্প সমাধি’ নামে যোগশাস্ত্রে নির্দিষ্ট হইয়াছে।
    • তৃতীয় খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: ভাব, সমাধি ও দর্শন সম্বন্ধে কয়েকটি কথা
  • শাস্ত্র বিবাহের ঐরূপ উচ্চ উদ্দেশ্য উপদেশ করিলেও কয়টা লোকের মনে সে কথা আজকাল স্থান পায়? কয়জন বিবাহিত জীবনে যথাসাধ্য ব্রহ্মচর্য পালন করিয়া আপনাদিগকে এবং জনসমাজকে ধন্য করিয়া থাকেন? কয়জন স্ত্রী স্বামীর পার্শ্বে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে লোকহিতকর উচ্চব্রতে – ঈশ্বরলাভের কথা দূরে থাকুক – প্রেরণা দিয়া থাকেন? কয়জন পুরুষই বা ‘ত্যাগই জীবনের উদ্দেশ্য’ জানিয়া স্ত্রীকে তাহা শিক্ষা দিয়া থাকেন? হায় ভারত! পাশ্চাত্যের ভোগসর্বস্ব জড়বাদ ধীরে ধীরে তোমার অস্থি-মজ্জায় প্রবিষ্ট হইয়া তোমাকে কি মেরুদণ্ডহীন পশুবিশেষে পরিণত করিয়াছে তাহা একবার ভাবিয়া দেখ দেখি! সাধে কি আর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁহার সন্ন্যাসি-ভক্তদিগকে বর্তমান বিবাহিত জীবনে দোষ দেখাইয়া বলিতেন, “ওরে, (ভোগটাকে সর্বস্বজ্ঞান বা জীবনের উদ্দেশ্য করাই যদি দোষ হয়, তবে বিবাহের সময়) একটা ফুল ফেলে সেটা করলেই কি শুদ্ধ হয়ে গেল – তার দোষ কেটে গেল?” বাস্তবিক বিবাহিত জীবনে ইন্দ্রিয়পরতা আর কখনো ভারতে এত প্রবল হইয়াছিল কি না সন্দেহ। ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তি ভিন্ন বিবাহের যে অপর একটা মহাপবিত্র, মহোচ্চ উদ্দেশ্য আছে – একথা আমরা আজকাল একপ্রকার ভুলিয়াই গিয়াছি, আর দিন দিন ঐ কারণে পশুরও অধম হইতে বসিয়াছি! নব্য ভারত-ভারতীর ঐ পশুত্ব ঘুচাইবার জন্যই লোকগুরু ঠাকুরের বিবাহ। তাঁহার জীবনের সকল কার্যের ন্যায় বিবাহরূপ কার্যটাও লোককল্যাণের নিমিত্ত অনুষ্ঠিত।
    • তৃতীয় খণ্ড – চতুর্থ অধ্যায়: গুরুভাবের পূর্ববিকাশ
  • মথুরবাবুর সহিত ঠাকুরের সম্বন্ধ এক অদ্ভুত ব্যাপার! মথুর ধনী অথচ উচ্চপ্রকৃতিসম্পন্ন, বিষয়ী হইলেও ভক্ত, হঠকারী হইয়াও বুদ্ধিমান, ক্রোধপরায়ণ হইলেও ধৈর্যশীল এবং ধীরপ্রতিজ্ঞ ছিলেন। মথুর ইংরাজী-বিদ্যাভিজ্ঞ ও তার্কিক, কিন্তু কেহ কোন কথা বুঝাইয়া দিতে পারিলে উহা বুঝিয়াও বুঝিব না – এরূপ স্বভাবসম্পন্ন ছিলেন না; ঈশ্বরবিশ্বাসী ও ভক্ত, কিন্তু তাই বলিয়া ধর্মসম্বন্ধে যে যাহা বলিবে তাহাই যে চোখ-কান বুঁজিয়া অবিচারে গ্রহণ করিবেন, তাহা ছিল না, তা তিনি ঠাকুরই হউন বা গুরুই হউন বা অন্য যে কেহই হউন; উদার-প্রকৃতি ও সরল, কিন্তু তাই বলিয়া বিষয়কর্মে বা অন্য কোন বিষয়ে যে বোকার মতো ঠকিয়া আসিবেন, তাহা ছিলেন না, বরং বিষয়ী জমিদারগণ যে কূটবুদ্ধি এবং সময়ে সময়ে অসদুপায়-সহায়ে প্রতিনিয়ত বিষয়বৃদ্ধি করিয়া থাকেন, সে সকলেরও তাঁহাতে কখনো কখনো প্রকাশ দেখা গিয়াছে। বাস্তবিকই পুত্রহীনা রানী রাসমণির অন্যান্য জামাতা বর্তমান থাকিলেও বিষয়কর্মের তত্ত্বাবধান ও সুবন্দোবস্তে কনিষ্ঠ মথুরবাবুই তাঁহার দক্ষিণ-হস্তস্বরূপ ছিলেন; এবং শাশুড়ী ও জামাই উভয়ের বুদ্ধি একত্রিত হওয়াতেই রানী রাসমণির নামের তখন এতটা দপ্‌দপা হইয়া উঠিয়াছিল।
    • তৃতীয় খণ্ড – ষষ্ঠ অধ্যায়: গুরুভাব ও মথুরানাথ
  • ঠাকুরের মুখে যতদূর শুনিয়াছি, তাহাতে ভৈরবী ব্রাহ্মণী তন্ত্রোক্ত বীরভাবের উপাসিকা ছিলেন বলিয়াই মনে হয়। তন্ত্রে পশু, বীর ও দিব্য এই তিন ভাবে ঈশ্বরসাধনার পথ নির্দিষ্ট আছে। পশুভাবের সাধকে কাম-ক্রোধাদি পশুভাবের আধিক্য থাকে; সেজন্য তিনি সর্বপ্রকার প্রলোভনের বস্তু হইতে দূরে থাকিবেন এবং বাহ্যিক শৌচাচার প্রভৃতির প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়া ভগবানের নামজপ, পুরশ্চরণাদিতে প্রবৃত্ত থাকিবেন। বীরভাবের সাধকে কাম-ক্রোধাদি পশুভাবের অপেক্ষা ঈশ্বরানুরাগ প্রবল থাকে। কাম-কাঞ্চন, রূপ-রসাদির আকর্ষণ তাঁহার ভিতর ঈশ্বরানুরাগকেই প্রবলতর করিয়া দেয়। সেজন্য তিনি কামকাঞ্চনাদির প্রলোভনের ভিতর বাস করিয়া উহাদের ঘাত-প্রতিঘাতে অবিচলিত থাকিয়া ঈশ্বরে সমগ্র মন-প্রাণ অর্পণ করিতে চেষ্টা করিবেন। দিব্যভাবের সাধক কেবলমাত্র তিনিই হইতে পারেন, যাঁহাতে ঈশ্বরানুরাগের প্রবল প্রবাহে কাম-ক্রোধাদি একেবারে চিরকালের মতো ভাসিয়া গিয়াছে, এবং নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ন্যায় যাঁহাতে ক্ষমাৰ্জব-দয়া-তোষ-সত্যাদি সদ্গুণসমূহের অনুষ্ঠান স্বাভাবিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। মোটামুটি বলিতে গেলে ঐ তিন ভাব সম্বন্ধে ইহাই বলা যায়। বেদান্তোক্ত উত্তম অধিকারীই তন্ত্রোক্ত দিব্যভাবের ভাবুক, মধ্যম অধিকারীই বীরভাবের এবং অধমাধিকারীই পশুভাবের সাধক।
    • তৃতীয় খণ্ড – অষ্টম অধ্যায়: গুরুভাবে নিজগুরুগণের সহিত সম্বন্ধ
  • তোতাপুরী স্বামীজী ৺জগদম্বার আজন্ম কৃপাপাত্র। সৎসংস্কার, সরল মন, যোগী মহাপুরুষের সঙ্গ, বলিষ্ঠ দৃঢ় শরীর বাল্যাবধিই লাভ করিয়াছিলেন। ভাগবতী মায়া তো তাঁহাকে কখনো তাঁহার করাল, বিভীষিকাময়ী, মৃত্যুর ছায়ার ন্যায় সর্বগ্রাসী মূর্তি দেখান নাই – তাঁহার অবিদ্যারূপিণী মোহিনী মূর্তির ফাঁদে তো কখনো ফেলেন নাই – কাজেই গোসাঁইজীর নিকট পুরুষকার ও চেষ্টাসহায়ে অগ্রসর হইয়া নির্বিকল্প-সমাধিলাভ, ঈশ্বরদর্শন, আত্মজ্ঞান সব সোজা কথা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সে পথে অগ্রসর হইবার যত কিছু বিঘ্ন-বাধা, মা যে সে-সব নিজ হস্তে সরাইয়া তাঁহাকে পথ ছাড়িয়া দিয়াছিলেন – এ কথা তিনি বুঝিবেন কিরূপে? এতদিনে সে বিষয় পুরী স্বামীজীকে বুঝাইবার জগদম্বার ইচ্ছা হইল। এতদিনে তিনি মনের ঐ ভ্রম বুঝিবার অবসর পাইলেন।
    • তৃতীয় খণ্ড – অষ্টম অধ্যায়: গুরুভাবে নিজগুরুগণের সহিত সম্বন্ধ

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ৪র্থ খণ্ড

[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ৪র্থ খণ্ড

  • কলিকাতার জনসাধারণের ধারণা, ঠাকুর কলিকাতার কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ কতকগুলি ইংরেজীশিক্ষিত, পাশ্চাত্যভাবে ভাবিত নব্য হিন্দুদলের লোকের ভিতরেই ধর্মভাব সঞ্চারিত করিয়াছিলেন বা তাঁহাদের ভিতরেই পূর্ব হইতে প্রদীপ্ত ধর্মভাবকে অধিকতর উজ্জ্বল করিয়াছিলেন। কিন্তু কলিকাতার লোকেরা ঠাকুরের দক্ষিণেশ্বরে অবস্থানের কথা জানিতে পারিবার বহু পূর্ব হইতেই যে ঠাকুরের নিকটে বাঙলা এবং উত্তর ভারতবর্ষের প্রায় সকল প্রদেশ হইতে সকল সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট বিশিষ্ট সাধু, সাধক এবং শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতসকল আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন এবং ঠাকুরের জ্বলন্ত জীবন্ত ধর্মাদর্শ ও গুরুভাবসহায়ে আপন আপন নির্জীব ধর্মজীবনে প্রাণসঞ্চার লাভ করিয়া অন্যত্র অনেকানেক লোকের ভিতর সেই নব ভাব, নব শক্তি সঞ্চারিত করিতে গমন করিয়াছিলেন – এ কথা কলিকাতার ইতরসাধারণে অবগত নহেন।
    • চতুর্থ খণ্ড – প্রথম অধ্যায়: বৈষ্ণবচরণ ও গৌরীর কথা
  • ভৈরবী ব্রাহ্মণীর সহিত সম্মিলন ঠাকুরের জীবনে একটি বিশেষ ঘটনা। দেখিতে পাই, ঐ সময় হইতেই তিনি শাস্ত্রমর্যাদা রক্ষা করিয়া তৎপ্রদর্শিত সাধনমার্গে যেমন দৃঢ় ও দ্রুতপদে অগ্রসর, তেমনি আবার তাঁহাতে গুরুভাবের বিশেষ প্রকাশ হইতে আরম্ভ। কিন্তু ঐ কালের পূর্বে তাঁহাতে যে ঐ ভাব আদৌ ছিল না, তাহা বলিতে পারি না। কারণ পূর্ব পূর্ব প্রবন্ধে আমরা দেখিয়াছি যে, ঠাকুরের জীবনে গুরুভাবের বিকাশ বাল্যাবধি সকল সময়েই স্বল্পাধিক পরিমাণে বর্তমান এবং এমনকি, তাঁহার নিজ দীক্ষাগুরুগণও ঐ গুরুভাবের সহায়ে নিজ নিজ ধর্ম-জীবনের অভাব, ত্রুটি ও অবসাদ দূরীভূত করিয়া পূর্ণতাপ্রাপ্তির অবসর পাইয়াছিলেন।
    • চতুর্থ খণ্ড – প্রথম অধ্যায়: বৈষ্ণবচরণ ও গৌরীর কথা
  • ঈশ্বরাবতার মহাপুরুষেরা পূর্ব পূর্ব শাস্ত্রসকলের মর্যাদা সম্যক রক্ষা করিয়া তাঁহাদের প্রবর্তিত বিধানের অবিরোধী কোন নূতন পথের সংবাদই যে ধর্মজগতে আনিয়া দেন, এ কথা আর বলিয়া বুঝাইতে হইবে না। যে-কোন অবতার-পুরুষের জীবনালোচনা করিলেই উহা বুঝিতে পারা যায়। বর্তমান যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনেও যে ঐ বিষয়ের অক্ষুণ্ণ পরিচয় আমরা সর্বদা সকল বিষয়ে পাইয়াছি, এ কথাই আমরা পাঠককে ‘লীলাপ্রসঙ্গ’-এ বুঝাইতে প্রয়াসী। যদি না পারি, তবে পাঠক যেন বুঝেন উহা আমাদের একদেশী বুদ্ধির দোষেই হইতেছে – যে ঠাকুর ‘যত মত তত পথ’-রূপ অদৃষ্টপূর্ব সত্য আধ্যাত্মিক জগতে প্রথম প্রকাশ করিয়া জনসাধারণকে মুগ্ধ করিয়াছেন, তাঁহার ত্রুটি বা দোষে নহে। পাশ্চাত্য নীতি – যাহার প্রয়োগ সুচতুর দুনিয়াদার পাশ্চাত্য কেবল অপর ব্যক্তি ও জাতির কার্যাকার্য-বিচারণের সময়েই বিশেষভাবে করিয়া থাকেন, নিজের কার্যকলাপ বিচার করিতে যাইয়া প্রায়ই পাল্টাইয়া দেন, সেই পাশ্চাত্য নীতির অনুসরণ করিয়া আমরা যাহাকে ‘জঘন্য কর্তাভজাদি মত’ বলিয়া নাসিকা কুঞ্চিত করি, ঐ কর্তাভজাদি মত হইতে শুদ্ধাদ্বৈত বেদান্তমত পর্যন্ত সকল মতই এ দেবমানব ঠাকুরের নিকট সসম্মানে ঈশ্বরলাভের পথ বলিয়া স্থানপ্রাপ্ত হইত এবং অধিকারী-বিশেষে অনুষ্ঠেয় বলিয়া নির্দিষ্টও হইত।
    • চতুর্থ খণ্ড – প্রথম অধ্যায়: বৈষ্ণবচরণ ও গৌরীর কথা
  • ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধককুলের ঐ ভাবে ঐ ঐ সময়ে ঠাকুরের দেবসঙ্গ-লাভ করিবার যে একটা বিশেষ গূঢ় অর্থ আছে তাহা বালকেরও বুঝিতে দেরি লাগিবে না। যুগাবতারের শুভাগমনে জগতে সর্বকালেই এইরূপ হইয়া আসিয়াছে এবং পরেও হইবে। তাঁহারা আধ্যাত্মিক জগতের গূঢ় নিয়মানুসারে ধর্মের গ্লানি দূর করিবার জন্য বা নির্বাপিতপ্রায় ধর্মালোককে পুনরুজ্জীবিত করিবার জন্য সর্বকালে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন। তবে তাঁহাদের জীবনালোচনায় তাঁহাদের ভিতরে অল্পাধিক পরিমাণে শক্তিপ্রকাশের তারতম্য দেখিয়া ইহা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তাঁহাদের কেহ বা কোন প্রদেশ-বিশেষের বা দুই-চারিটি সম্প্রদায়-বিশেষের অভাবমোচনের জন্য আগমন করিয়াছেন; আবার কেহ বা সমগ্র পৃথিবীর ধর্মাভাব-মোচনের জন্য শুভাগমন করিয়াছেন। কিন্তু সর্বত্রই তাঁহারা তাঁহাদের পূর্ববর্তী ঋষি, আচার্য ও অবতারকুলের দ্বারা আবিষ্কৃত ও প্রচারিত আধ্যাত্মিক মত-সকলের মর্যাদা সম্যক্ রক্ষা করিয়া, সে সকলকে বজায় রাখিয়া, নিজ নিজ আবিষ্কৃত উপলব্ধি ও মতের প্রচার করিয়াছেন, দেখা গিয়া থাকে। কারণ তাঁহারা তাঁহাদের দিব্যযোগশক্তিবলে পূর্ব পূর্ব কালের আধ্যাত্মিক মতসকলের ভিতর একটা পারম্পর্য ও সম্বন্ধ দেখিতে পাইয়া থাকেন। আমাদের বিষয়-মলিন দৃষ্টির সম্মুখে ভাবরাজ্যের সে ইতিহাস, সে সম্বন্ধ সর্বদা অপ্রকাশিতই থাকে। তাঁহারা পূর্ব পূর্ব ধর্মমতসকলকে ‘সূত্রে মণিগণা ইব’ এক সূত্রে গাঁথা দেখিতে পান এবং নিজ ধর্মোপলব্ধি-সহায়ে সেই মালার অঙ্গই সম্পূর্ণ করিয়া যান।
    • চতুর্থ খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: গুরুভাব ও নানা সাধু সম্প্রদায়
  • তন্ত্র ও ন্যায়ের রঙ্গভূমি বঙ্গে ঠাকুরের আবির্ভাবের পূর্বে বেদান্তচর্চা ঐরূপে বিরল থাকিলেও, কেহ কেহ যে উহার উদার মীমাংসাসকলের অনুশীলনে আকৃষ্ট হইতেন না, তাহা নহে। পণ্ডিত পদ্মলোচন ঐ ব্যক্তিগণের মধ্যে অন্যতম। ন্যায়ে ব্যুৎপত্তিলাভ করিবার পর পণ্ডিতজীর বেদান্তদর্শন-পাঠে ইচ্ছা হয় এবং তজ্জন্য ৺কাশীধামে গমন করিয়া গুরুগৃহে বাসকরতঃ তিনি দীর্ঘকাল ঐ দর্শনের চর্চায় কালাতিপাত করেন। ফলে, কয়েক বৎসর পরেই তিনি বৈদান্তিক বলিয়া প্রসিদ্ধিলাভ করেন এবং দেশে আগমন করিবার পর বর্ধমানাধিপের দ্বারা আহূত হইয়া তদীয় সভাপণ্ডিতের পদ গ্রহণ করেন। পণ্ডিতজীর অদ্ভুত প্রতিভার পরিচয় পাইয়া বর্ধমানরাজ তাঁহাকে ক্রমে প্রধান সভাপণ্ডিতের পদে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাঁহার সুযশ বঙ্গের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হয়।
    • চতুর্থ খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: গুরুভাব ও নানা সাধু সম্প্রদায়
  • আমরা যতদূর দেখিয়াছি ঠাকুরের কোন কার্যটিই উদ্দেশ্যবিহীন বা নিরর্থক ছিল না। তাঁহার জীবনের অতি সামান্য সামান্য দৈনিক ব্যবহারগুলির পর্যালোচনা করিলেও গভীর ভাবপূর্ণ বলিয়া দেখিতে পাওয়া যায় – বিশেষ ঘটনাগুলির তো কথাই নাই। আবার এমন অঘটন-ঘটনাবলী-পরিপূর্ণ জীবন বর্তমান যুগে আধ্যাত্মিক জগতে আর একটিও দেখা যায় নাই। আজীবন তপস্যা ও চেষ্টার দ্বারা ঈশ্বরের অনন্তভাবের কোন একটির সম্যক উপলব্ধিই মানুষ করিয়া উঠিতে পারে না, তা নানাভাবে তাঁহার উপলব্ধি ও দর্শন করা – সকল প্রকার ধর্মমত সাধনসহায়ে সত্য বলিয়া প্রত্যক্ষ করা এবং সকল মতের সাধকদিগকেই নিজ নিজ গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতে সহায়তা করা! আধ্যাত্মিক জগতে এরূপ দৃষ্টান্ত দেখা দূরে থাকুক, কখনও কি আর শুনা গিয়াছে? প্রাচীন যুগের ঋষি আচার্য বা অবতার মহাপুরুষেরা এক একটি বিশেষ বিশেষ ভাবরূপ পথাবলম্বনে স্বয়ং ঈশ্বরোপলব্ধি করিয়া তত্তৎ ভাবকেই ঈশ্বরদর্শনের একমাত্র পথ বলিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন; অপরাপর নানা ভাবাবলম্বনেও যে ঈশ্বরের উপলব্ধি করা যাইতে পারে, এ কথা উপলব্ধি করিবার অবসর পান নাই। অথবা নিজেরা ঐ সত্যের অল্পবিস্তর প্রত্যক্ষ করিতে সমর্থ হইলেও তৎপ্রচারে জনসাধারণের ইষ্টনিষ্ঠার দৃঢ়তা কমিয়া যাইয়া তাহাদের ধর্মোপলব্ধির অনিষ্ট সাধিত হইবে – এই ভাবিয়া সর্বসমক্ষে ঐ বিষয়টির ঘোষণা করেন নাই। কিন্তু যাহা ভাবিয়াই তাঁহারা ঐরূপ করিয়া থাকুন, তাঁহারা যে তাঁহাদের গুরুভাব-সহায়ে একদেশী ধর্মমতসমূহই প্রচার করিয়াছিলেন এবং কালে উহাই যে মানবমনে ঈর্ষাদ্বেষাদির বিপুল প্রসার আনয়ন করিয়া অনন্ত বিবাদ এবং অনেক সময়ে রক্তপাতেরও হেতু হইয়াছিল, ইতিহাস এ বিষয়ে নিঃসংশয় সাক্ষ্য দিতেছে।
    • চতুর্থ খণ্ড – তৃতীয় অধ্যায়: গুরুভাবে তীর্থভ্রমণ ও সাধুসঙ্গ
  • ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ সত্যসঙ্কল্প হন, সিদ্ধসঙ্কল্প হন, শাস্ত্রীয় ঐ বচনেরও তখন একটা মোটামুটি অর্থ খুঁজিয়া পাইলাম। বুঝিতে পারিলাম যে, এক একটা বিষয়ে মনের সমগ্র চিন্তাশক্তি একত্রিত করিয়া অনুসন্ধানেই আমাদের তত্তদ্বিষয়ে জ্ঞান আসিয়া উপস্থিত হয়, ইহা নিত্য-প্রত্যক্ষ। তবে ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, যিনি আপন মনকে সম্পূর্ণরূপে বশীভূত এবং আয়ত্ত করিয়াছেন, তিনি যখনই যে কোন বিষয় জানিবার জন্য মনের সর্বশক্তি একত্রিত করিয়া অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবেন, তখনই অতি সহজে যে তিনি ঐ বিষয়ের জ্ঞানলাভ করিতে পারিবেন, এ কথা তো বিচিত্র নহে। তবে উহার ভিতর একটা কথা আছে – যিনি সমগ্র জগৎসংসারটাকে অনিত্য বলিয়া ধ্রুব ধারণা করিয়াছেন এবং সর্বশক্তির আকরস্বরূপ জগৎকারণ ঈশ্বরকে প্রেমে সাক্ষাৎসম্বন্ধেও ধরিতে পারিয়াছেন, তাঁহার রেলগাড়ি চালাইতে, মানুষমারা কলকারখানা নির্মাণ করিতে সঙ্কল্প বা প্রবৃত্তি হইবে কি না। যদি ঐরূপ সঙ্কল্প তাঁহাদের মনে উদিত হওয়া অসম্ভব হয়, তাহা হইলেই তো আর ঐরূপ কলকারখানা নির্মিত হইল না। ঠাকুরের দিব্যসঙ্গলাভে দেখিলাম, বাস্তবিকই ঐরূপ হয়। বাস্তবিকই তাঁহাদের ভিতর ঐরূপ প্রবৃত্তির উদয় হওয়া অসম্ভব হইয়া উঠে। ঠাকুর কাশীপুরে দারুণ ব্যাধিতে ভুগিতেছেন, এমন সময়ে স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ আমরা, আমাদের কল্যাণের নিমিত্ত মনঃশক্তি-প্রয়োগে রোগমুক্ত হইতে সজল-নয়নে তাঁহাকে অনুরোধ করিলেও তিনি ঐরূপ চেষ্টা বা সঙ্কল্প করিতে পারিলেন না! বলিলেন, ঐরূপ করিতে যাইয়া সঙ্কল্পের একটা দৃঢ়তা বা আঁট কিছুতেই মনে আনিতে পারিলেন না! বলিলেন, “এ হাড়-মাসের খাঁচাটার উপর মনকে সচ্চিদানন্দ হতে ফিরিয়ে কিছুতেই আনতে পারলুম না! সর্বদা শরীরটাকে তুচ্ছ হেয় জ্ঞান করে যে মনটা জগদম্বার পাদপদ্মে চিরকালের জন্য দিয়েছি, সেটাকে এখন তা থেকে ফিরিয়ে শরীরটাতে আনতে পারি কি রে?”
    • চতুর্থ খণ্ড – চতুর্থ অধ্যায়: গুরুভাব-সম্বন্ধে শেষ কথা
  • ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের দেবভাব সম্বন্ধে অনেকেই অনেক কথা বলিয়া থাকেন; এমনকি, অনেকের শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং নির্ভরের কারণ অনুসন্ধান করিলে তাঁহার অমানুষ যোগবিভূতিসকলই উহার মূলে দেখিতে পাওয়া যায়। কেন তুমি তাঁহাকে মান? – এ প্রশ্নের উত্তরে বক্তা প্রায়ই বলিয়া থাকেন যে, শ্রীরামকৃষ্ণদেব বহুদূরের ঘটনাবলী ভাগীরথীতীরে দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে বসিয়া দেখিতে পাইতেন, স্পর্শ করিয়া কঠিন কঠিন শারীরিক ব্যাধিসমূহ কখনও কখনও আরাম করিয়াছেন, দেবতাদের সহিতও তাঁহার সর্বদা বাক্যালাপ হইত এবং তাঁহার বাক্য এতদূর অমোঘ ছিল যে, মুখপদ্ম হইতে কোন অসম্ভব কথা বাহির হইলেও বহিঃপ্রকৃতির ঘটনাবলীও ঠিক সেইভাবে পরিবর্তিত এবং নিয়মিত হইত। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, রাজদ্বারে প্রাণদণ্ডের আজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তিও তাঁহার কৃপাকণা ও আশীর্বাদ-লাভে আসন্ন মৃত্যু হইতে রক্ষিত এবং বিশেষ সম্মানিত পর্যন্ত হইয়াছিল; অথবা কেবলমাত্র-রক্তকুসুমোৎপাদী বৃক্ষে শ্বেত কুসুমেরও আবির্ভাব হইয়াছিল, ইত্যাদি।
    • চতুর্থ খণ্ড – পরিশিষ্ট: ঠাকুরের মানুষভাব

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ৫ম খণ্ড

[সম্পাদনা]

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ – ৫ম খণ্ড

  • ঐরূপ করিবার যে বিশেষ প্রয়োজন উপস্থিত হইয়াছিল, এ কথা বলিতে হইবে না। ঈশ্বরকৃপায় ঠাকুরের অলৌকিক আধ্যাত্মিকশক্তিসম্পন্ন দিব্যভাবময় জীবন উহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান না হইলে ভারতের নিজ জাতীয়ত্বের এবং সনাতন ধর্মের এককালে লোপসাধন হইত বলিয়া হৃদয়ঙ্গম হয়। বাস্তবিক, ভাবিয়া দেখিলে এ কথা বেশ বুঝা যায় যে, ঠাকুর নিজ জীবনে যাবতীয় সম্প্রদায়ের ধর্মমত সাধনপূর্বক ‘যত মত তত পথ’-রূপ সত্যের আবিষ্কার করিয়া যেমন পৃথিবীস্থ সর্বদেশের সর্বজাতির কল্যাণসাধন করিয়া গিয়াছেন, তদ্রূপ পাশ্চাত্যভাবাপন্ন ব্যক্তিদিগের সম্মুখে দীর্ঘ দ্বাদশ বৎসর নিজ আদর্শজীবন অতিবাহিত করিয়া তাহাদিগের মধ্যে এই কালে ধর্মসংস্থাপনের যে চেষ্টা করিয়াছেন, তদ্দ্বারা পাশ্চাত্যভাবরূপ বন্যা প্রতিরুদ্ধ হওয়ায় বিষম সঙ্কটে ভারত উত্তীর্ণ হইতে সমর্থ হইয়াছে। অতএব সনাতন ধর্মের সহিত পূর্বপ্রচলিত সর্বপ্রকার ধর্মমতকে সংযুক্ত করিয়া অধিকারিভেদে তাহাদিগের সম-সমান প্রয়োজনীয়তা সপ্রমাণ করা যেমন তাঁহার জীবনের বিশেষ কার্য বলিয়া বুঝিতে পারা যায়, তদ্রূপ পাশ্চাত্য জড়বাদের প্রবল স্রোতে নিমজ্জনোন্মুখ ভারতের উদ্ধারসাধন তাঁহার জীবনের ঐরূপ দ্বিতীয় কার্য বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে। সন ১২৪২ সাল বা ১৮৩৬ খ্রীষ্টাব্দ হইতে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তিত হয় এবং ঐ বৎসরেই ঠাকুর জন্ম-পরিগ্রহ করেন। অতএব পাশ্চাত্য শিক্ষার দোষভাগ যে শক্তির দ্বারা প্রতিরুদ্ধ হইবে এবং যাহার সহায়ে ভারত নিজ বিশেষত্ব রক্ষা করিয়া পাশ্চাত্য শিক্ষার গুণভাগকে মাত্র নিজস্ব করিয়া লইবে, বিধাতার বিধানে তদুভয় শক্তির ভারতে যুগপৎ উদয় দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়।
    • পঞ্চম খণ্ড – পূর্বকথা
  • ঠাকুর বোধ হয় প্রথমে ভাবিয়াছিলেন, তাঁহার জীবন্ত ও সাক্ষাৎ-উপলব্ধ ধর্মভাবসকলের পরিচয় পাইয়া কেশবপ্রমুখ ব্রাহ্মগণ স্বল্পকালেই ঐসকল সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করিবেন। কিন্তু দিনের পর যতই দিন যাইতে লাগিল এবং তাঁহার সহিত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে সম্বদ্ধ হইয়াও যখন তাঁহারা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব ছাড়াইয়া তাঁহার আধ্যাত্মিক প্রত্যক্ষসকলে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী হইতে পারিলেন না, তখন তাঁহার হৃদয়ঙ্গম হইল, উক্ত প্রভাব তাঁহাদিগের মনে কতদূর বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। তখনই তিনি বুঝিতে পারিলেন, পাশ্চাত্যের চিন্তাশীল মনীষিগণ ইঁহাদের অন্তরে গুরুর স্থান চিরকালের নিমিত্ত অধিকার করিয়া বসিয়াছেন এবং তাঁহাদিগের ভাব ও কথার সহিত না মিলাইয়া ইঁহারা ভারতের আপ্তকাম ঋষিদিগের প্রত্যক্ষসকল কখনও গ্রহণ করিতে পারিবেন না। তজ্জন্যই ঠাকুর ইঁহাদিগকে উপদেশ দিবার পরেই বলিতেন, “আমি যাহা হয় বলিয়া যাইলাম, তোমরা উহার ল্যাজা-মুড়ো বাদ দিয়ে গ্রহণ কর।” ইঁহাদিগের ভাবের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান না হইয়া তিনি ইঁহাদিগকে ঐরূপে স্বাধীনতাপ্রদান করাতেই ইঁহারা তাঁহার ভাব ও প্রত্যক্ষসকল যথাসম্ভব গ্রহণ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন, এ কথা বলা বাহুল্য।
    • পঞ্চম খণ্ড – দ্বিতীয় অধ্যায়: পূর্ব-পরিদৃষ্ট ভক্তগণের ঠাকুরের নিকটে আগমনারম্ভ
  • বহু পাঠ ও গভীর চিন্তার ফলে শ্রীযুত নরেন্দ্র এই কালে বিষম তর্কপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি মিথ্যা তর্ক কখনও করিতেন না, মনে জ্ঞানে যাহা সত্য বলিয়া বুঝিতেন তর্কের দ্বারা সর্বত্র তাহারই সমর্থন করিতেন। কিন্তু তিনি যাহা সত্য বলিয়া বুঝিতেন তাহার বিপরীত কোন প্রকার ভাব বা মত কেহ তাঁহার সমক্ষে প্রকাশ করিলে তিনি চুপ করিয়া উহা কখনও শুনিয়া যাইতে পারিতেন না। কঠোর যুক্তি ও প্রমাণ-প্রয়োগের দ্বারা বিরুদ্ধ পক্ষের মত খণ্ডন করিয়া বাদীকে নিরস্ত করিতেন। বিরল ব্যক্তিই তাঁহার যুক্তিসকলের নিকট মস্তক অবনত করিত না! আবার তর্কে পরাজিত হইয়া অনেকে যে তাঁহাকে সুনয়নে দেখিত না, এ কথা বলা বাহুল্য। তর্ককালে বাদীর দুই-চারিটি কথা শুনিয়াই তিনি বুঝিতে পারিতেন, সে কিরূপ যুক্তিসহায়ে নিজ পক্ষ সমর্থন করিবে এবং উহার উত্তর তাঁহার মনে পূর্ব হইতেই যোগাইয়া থাকিত। তর্ককালে বাদীকে নিরস্ত করিতে ঐরূপ তীক্ষ্ণ যুক্তিপ্রয়োগ তাঁহার মনে কিরূপে উদিত হয় এই কথা জিজ্ঞাসিত হইলে তিনি একদিন বলিয়াছিলেন, “পৃথিবীতে কয়টা নূতন চিন্তাই বা আছে! সেই কয়টা জানা থাকিলে এবং তাহাদিগের সপক্ষে ও বিপক্ষে যে কয়টা যুক্তি এ পর্যন্ত প্রযুক্ত হইয়াছে, সেই কয়টা আয়ত্ত থাকিলে বাদীকে ভাবিয়া চিন্তিয়া উত্তর দিবার প্রয়োজন থাকে না। কারণ বাদী যে কথা যেভাবেই সমর্থন করুক না, উহা ঐসকলের মধ্যে পড়িবেই পড়িবে। জগৎকে কোন বিষয়ে নূতন ভাব ও চিন্তা প্রদান করিতে সমর্থ এমন ব্যক্তি বিরল জন্মগ্রহণ করেন।”
    • পঞ্চম খণ্ড – তৃতীয় অধ্যায়: নরেন্দ্রনাথের প্রথম আগমন ও পরিচয়
  • দীর্ঘ পাঁচ বৎসর কাল শ্রীযুত নরেন্দ্র ঠাকুরের পূত সহবাসলাভে ধন্য হইয়াছিলেন। পাঠক হয়তো ইহাতে বুঝিবেন যে, আমরা বলিতেছি তিনি ঐ কয় বর্ষ নিরন্তর দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের শ্রীপদপ্রান্তে অতিবাহিত করিয়াছিলেন। তাহা নহে। কলিকাতাবাসী অন্য সকল ভক্তগণের ন্যায় তিনিও ঐ কয় বৎসর বাটী হইতেই ঠাকুরের নিকটে গমনাগমন করিয়াছিলেন। তবে এ কথা নিশ্চয় যে, প্রথম হইতে ঠাকুরের অশেষ ভালবাসার অধিকারী হওয়ায় ঐ কয় বৎসর তিনি ঘন ঘন দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিয়াছিলেন। প্রতি সপ্তাহে এক বা দুই দিবস তথায় গমন এবং অবসর পাইলেই দুই-চারি দিন বা ততোধিক কাল তথায় অবস্থান করা নরেন্দ্রনাথের জীবনে ক্রমে একটা প্রধান কর্ম হইয়া উঠিয়াছিল। সময়ে সময়ে ঐ নিয়মের যে ব্যতিক্রম হয় নাই, তাহা নহে। কিন্তু ঠাকুর তাঁহার প্রতি প্রথম হইতে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হইয়া তাঁহাকে ঐ নিয়ম বড় একটা ভঙ্গ করিতে দেন নাই। কোন কারণে নরেন্দ্রনাথ এক সপ্তাহ দক্ষিণেশ্বরে না আসিতে পারিলে ঠাকুর তাঁহাকে দেখিবার জন্য এককালে অধীর হইয়া উঠিতেন এবং উপর্যুপরি সংবাদ পাঠাইয়া তাঁহাকে নিজ সকাশে আনয়ন করিতেন, অথবা স্বয়ং কলিকাতায় আগমনপূর্বক তাঁহার সহিত কয়েক ঘণ্টা কাল অতিবাহিত করিয়া আসিতেন। আমাদের যতদূর জানা আছে, ঠাকুরের সহিত পরিচিত হইবার পরে প্রথম দুই বৎসর ঐরূপে নরেন্দ্রের দক্ষিণেশ্বরে নিয়মিতভাবে গমনাগমনের বড় একটা ব্যতিক্রম হয় নাই। কিন্তু বি.এ. পরীক্ষা দিবার পরে ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের প্রথম ভাগে পিতার সহসা মৃত্যু হইয়া সংসারের সমস্ত ভার যখন তাঁহার স্কন্ধে নিপতিত হইল, তখন নানা কারণে কিছুদিনের জন্য তিনি পূর্বোক্ত নিয়ম ভঙ্গ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
    • পঞ্চম খণ্ড – ষষ্ঠ অধ্যায় – প্রথম পাদ: ঠাকুর ও নরেন্দ্রনাথের অলৌকিক সম্বন্ধ
  • পারিপার্শ্বিক অবস্থাসমূহ মানবজীবনে সর্বত্র সর্বকাল বিশেষ অধিকার বিস্তৃত করিয়া বসে। শুদ্ধ অধিকারবিস্তার কেন? – উহারাই উহাকে গন্তব্যপথে সর্বদা নিয়মিত করিয়া থাকে। অতএব নরেন্দ্রের জীবনে উহাদিগের প্রভাব ও প্রেরণা পরিলক্ষিত হইবে ইহাতে বিচিত্র কিছুই নাই। ঠাকুরের নিকটে যাইবার পূর্বেই নরেন্দ্র নিজ অসাধারণ ধীশক্তিপ্রভাবে ইংরাজী কাব্য, সাহিত্য, ইতিহাস ও ন্যায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া পাশ্চাত্য ভাবে বিশেষরূপে ভাবিত হইয়াছিলেন। স্বাধীন-চিন্তা-সহায়ে সকল বিষয় অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওয়া-রূপ পাশ্চাত্যের মূলমন্ত্র ঐ সময়েই তাঁহার মনে মজ্জাগত হইয়া গিয়াছিল। সুতরাং শাস্ত্রবাক্যসকলে তিনি যে ঐ সময়ে বিশেষ সন্দিহান হইবেন ও অনেক স্থলে মিথ্যা বোধ করিবেন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকভাবে ভিন্ন অপর কোন ভাবে মানববিশেষকে গুরু বলিয়া স্বীকার করিতে পরাঙ্মুখ হইবেন, ইহাই স্বাভাবিক।
    • পঞ্চম খণ্ড – অষ্টম অধ্যায় – প্রথম পাদ: সংসারে ও ঠাকুরের নিকটে নরেন্দ্রনাথের শিক্ষা
  • ইচ্ছা ও স্পর্শমাত্ৰে মহাপুরুষগণ অন্তরের আধ্যাত্মিক শক্তি অপরে সংক্রমণপূর্বক তাহার মনের গতি উচ্চপথে পরিচালিত করিয়া দিতে সমর্থ, এই কথা শাস্ত্রগ্রন্থসকলে লিপিবদ্ধ আছে। অন্তরঙ্গ শিষ্যবর্গের ত কথাই নাই–বেশ্যা লম্পটাদি দুষ্কৃতকারীদিগের জীবনও ঐরূপে মহাপুরুষদিগের শক্তিপ্রভাবে পরিবর্তিত হইয়াছে। শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, ঈশা, শ্রীচৈতন্য প্রভৃতি যে-সকল মহাপুরুষগণ ঈশ্বরাবতার বলিয়া সংসারে অদ্যাবধি পূজিত হইতেছেন, তাহাদিগের প্রত্যেকের জীবনেই ঐ শক্তির স্বল্পবিস্তর প্রকাশ দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু শাস্ত্রে ঐরূপ থাকিলে কি হইবে, ঐ শ্রেণীর পুরুষদিগের অলৌকিক কাৰ্য কলাপের সাক্ষাৎ পরিচয় বহুকাল পর্যন্ত হারাইয়া সংসার এখন ঐ বিষয়ে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসী হইয়া উঠিয়াছে। ঈশ্বরাবতারে বিশ্বাস করা ত দূরের কথা, ঈশ্বর-বিশ্বাসও এখন অনেক স্থলে কুসংস্কারপ্রসূত মানসিক দুর্বলতার পরিচায়ক বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। মানব সাধারণের চিত্ত হইতে ঐ অবিশ্বাস দূর করিয়া তাহাদিগকে আধ্যাত্মিকভাবসম্পন্ন করিতে ঠাকুরের ন্যায় অলৌকিক পুরুষের সংসারে জন্ম পরিগ্রহ করা বর্তমান যুগে একান্ত আবশ্যক হইয়াছিল। পূর্বোক্ত শক্তির প্রকাশ তাহাতে অবলোকন করিয়া আমরা এখন পূৰ্ব্ব পূর্ব যুগের মহাপুরুষদিগের সম্বন্ধেও ঐ বিষয়ে বিশ্বাসবান হইতেছি। ঈশ্বরাবতার বলিয়া ঠাকুরকে বিশ্বাস না করিলেও তিনি যে শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, ঈশা ও চৈতন্যপ্রমুখ মহাপুরুষসকলের সমশ্রেণীভুক্ত লোকোত্তর পুরুষ, এবিষয়ে উহা দেখিয়া কাহারও অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
    • পঞ্চম খণ্ড – নবম অধ্যায় – ঠাকুরের ভক্তসঙ্ঘ ও নরেন্দ্রনাথ
  • ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের শরীরে সেই দিন যে দিব্যোজ্জল সৌন্দর্য্য দর্শন করিয়াছি সেইরূপ আর কখনও নয়নগোচর হইয়াছে বলিয়া স্মরণ হয় না। দেব-দেহের সেই অপূর্ব শ্রী যথাযথ বর্ণনা করা মনুষ্যশক্তির পক্ষে অসম্ভব। ভাবাবেশে দেহের অতদুর পরিবর্তন নিমেষে উপস্থিত হইতে পারে এ কথা আমরা ইতিপূর্বে কখনও কল্পনা করি নাই। তাহার উন্নত বপু প্রতিদিন যেমন দেখিয়াছি তদপেক্ষা অনেক দীর্ঘ এবং স্বপ্নদৃষ্ট শরীরের ন্যায় লঘু বলিয়া প্রতীত হইতেছিল, শ্যামবর্ণ উজ্জ্বল হইয়া গৌরবর্ণে পরিণত হইয়াছিল; ভাবপ্রদীপ্ত মুখমণ্ডল অপূর্ব জ্যোতি বিকীর্ণ করিয়া চতুঃপার্শ্ব আলোকিত করিয়াছিল, এবং মহিমা করুণা শান্তি ও আনন্দপূর্ণ মুখের সেই অনুপম হাসি দৃষ্টিপথে পতিত হইবা মাত্র মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় জনসাধারণকে কিছুক্ষণের জন্য সকল কথা ভুলাইয়া তাঁহার পদানুসরণ করাইয়াছিল! উজ্জ্বল গৈরিক বর্ণের পরিধেয় গরদখানি ঐ অপূর্ব অঙ্গকান্তির সহিত পূর্ণ সামঞ্জস্যে মিলিত হইয়া তাহাকে অগ্নিশিখাপরিব্যাপ্ত বলিয়া ভ্রম জন্মাইতেছিল।
    • পঞ্চম খণ্ড – দশম অধ্যায় : পাণিহাটির মহোৎসব
  • ভাবুকতার উচ্ছ্বাসে অতিরঞ্জিত করিয়া আমরা উপরোক্ত কথাগুলি বলিতেছি, পাঠক যেন ইহা মনে না করেন। ঠাকুরের সঙ্গগুণে ভক্তগণকে ঐরূপ অনুভব ও আলোচনা করিতে নিত্য প্রত্যক্ষ করিয়াছি বলিয়াই আমাদিগকে ঐ সকল কথা লিপিবদ্ধ করিতে হইতেছে। দেখিয়াছি, অর্থাভাববশতঃ ঠাকুরের সেবার ত্রুটি হইবার আশঙ্কায় মন্ত্রণা করিতে উপস্থিত হইয়া তাহার পূর্বোক্ত ভাবের প্রেরণায় আশ্বস্ত ও নিশ্চিন্ত হইয়া ফিরিয়া গিয়াছেন। কেহ বা বলিয়াছেন, “ঠাকুর নিজের জোগাড় নিজেই করিয়া লইবেন, যদি করেন তাহাতেই বা ক্ষতি কি? (নিজ বাটী দেখাইয়া) যতক্ষণ ইটের উপরে ইট রহিয়াছে ততক্ষণ ভাবনা কি? বাটী বন্ধক দিয়া তাহার সেবা চালাইব।” কেহ বা বলিয়াছেন, “পুত্রকন্যার বিবাহ বা অসুস্থতা কালে যেরূপে চালাইয়া থাকি সেইরূপে চালাইব, ধীর গাত্রে দুই-চারি খান অলঙ্কার যতক্ষণ আছে ততক্ষণ ভাবনা কি?” আবার কেহ বা মুখে ঐরূপ প্রকাশ না করিলেও আপন সংসারের ব্যয় কমাইয়া অকাতরে ঠাকুরের সেবার ব্যয়ভার গ্রহণ করিয়া ঐ বিষয়ের পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। ঐরূপ ভাবের প্রেরণাতেই সুরেন্দ্রনাথ বাটীভাড়ার সমস্ত ব্যয় একাকী বহন করিয়াছিলেন এবং বলরাম, রাম, মহেন্দ্র, গিরিশচন্দ্র প্রভৃতি সকলে মিলিত হইয়া ঠাকুরের ও তাহার সেবকগণের নিমিত্ত এইকালে যাহা কিছু প্রয়োজন হইয়াছিল সেই সমস্ত যোগাইয়া আসিয়াছিলেন।
    • পঞ্চম খণ্ড – দ্বাদশ অধ্যায় – দ্বিতীয় পাদ: ঠাকুরের শ্যামপুকুরে অবস্থান
  • শ্যামপুকুরে অবস্থানকালে ঠাকুরের এক দিবস এক অদ্ভুত দর্শন উপস্থিত হইয়াছিল। তিনি দেখিয়াছিলেন, তাহার সূক্ষ্ণশরীর স্থূলদেহের অভ্যন্তর হইতে নির্গত হইয়া গৃহমধ্যে ইতস্ততঃ বিচরণ করিতেছে এবং তাহার গলার সংযোগস্থলে পৃষ্ঠদেশে কতকগুলি ক্ষত হইয়াছে। বিস্মিত হইয়া তিনি ঐরূপ ক্ষত হইবার কারণ কি ভাবিতেছেন, এমন সময়ে শ্রীশ্রীজগদম্বা তাহাকে বুঝাইয়া দিলেন, নানারূপ দুষ্কর্ম করিয়া আসিয়া লোকে তাঁহাকে স্পর্শপূর্বক পবিত্র হইয়াছে, তাহাদের পাপভার ঐরূপে তাহাতে সংক্রমিত হওয়ায় তাহার শরীরে ক্ষতরোগ হইয়াছে। জীবের কল্যাণসাধনে তিনি লক্ষ লক্ষ বার জন্ম পরিগ্রহ পূর্বক দুঃখভোগ করিতে কাতর নহেন, একথা আমরা দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরকে সময়ে সময়ে বলিতে শুনিয়াছিলাম, সুতরাং পূর্বোক্ত দর্শনে কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া আনন্দের সহিত তিনি যে এখন ঐ বিষয়ে আমাদিগকে বলিবেন, ইহা বিচিত্র বোধ হইল না এবং উহাতে তাঁহার অপার করুণার কথা স্মরণ ও আলোচনা করিয়া আমরা মুগ্ধ হইলাম। কিন্তু ঠাকুরের শরীর পূর্বের ন্যায় সুস্থ না হওয়া পৰ্যন্ত যাহাতে কোন নূতন লোক আসিয়া তাহার চরণ স্পর্শপূর্বক প্রণাম না করে, তদ্বিষয়ে ভক্তদিগের—বিশেষতঃ যুবক-ভক্তদিগের ঠাকুরের শ্যামপুকুরে অবস্থান মধ্যে উহাতে বিশেষ প্রয়াস উপস্থিত হইল এবং ভক্তগণের মধ্যে কেহ কেহ আবার পূর্বজীবনের উচ্ছলতার কথা স্বরণপূর্বক এখন হইতে ঠাকুরের পবিত্র দেহ আর স্পর্শ করিবেন না, এইরূপ সংকল্প করিয়া বসিলেন। আবার নরেন্দ্র প্রমুখ বিরল কোন কোন ব্যক্তি উক্ত দর্শনের কথা শুনিয়া অন্যকৃত কর্মের জন্য অন্যের স্বেচ্ছায় ফলভোগ করারূপ যে মতবাদ খৃষ্টান, বৈষ্ণব প্রভৃতি কোন কোন ধর্মের মূলভিত্তিস্বরূপ হইয়া রহিয়াছে, উহাতে তাহারই সত্যতার ইঙ্গিত প্রাপ্ত হইয়া, ঐ বিষয়ের চিন্তা ও গবেষণায় নিযুক্ত হইলেন।
    • পঞ্চম খণ্ড – দ্বাদশ অধ্যায় – তৃতীয় পাদ: ঠাকুরের শ্যামপুকুরে অবস্থান

তার সম্পর্কে উক্তি

[সম্পাদনা]

স্বামী সারদানন্দের স্মৃতিকথা

[সম্পাদনা]

স্বামী সারদানন্দের স্মৃতিকথা (পিডিএফ), উদ্বোধন কার্যালয়

  • হে স্বামিন, হে আচার্য, তোমার এই মহাবাণীই আমাদের যাত্রাপথের সম্বল, তোমার ত্যাগপূত গৈরিক-দীপ্তি নিত্যধাম হইতে তোমার দুঃস্থ স্বদেশবাসীকে পথপ্রদর্শন করুক। যে জাতির সমষ্টি-মুক্তির সাধনায় তুমি জীবন অতিবাহিত করিয়া গেলে, সেই জাতির কল্যাণ সাধনের ব্রত গ্রহণের যাহাতে আমরা যোগ্য হই, সেই আশীর্বাদ কর।
    • মাধুকরী, পৃষ্ঠা ৩৯৬। প্রথম প্রকাশ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ ভাদ্র, শনিবার, ১৩৩৪।
  • ব্যক্তিগতভাবে যেদিন সেই মহাপুরুষের সহিত আমার প্রথম পরিচয় হয়, সে বহুদিনের কথা। সেই অবধিই তিনি ভালবাসার চক্ষে আমাকে দেখিয়া আসিয়াছেন। সেই আকর্ষণে আমি প্রতিদিনই তাঁহার সহিত সদালাপে, অধ্যাত্মকথা-প্রসঙ্গে দুই-এক ঘণ্টাকাল অতিবাহিত করিতাম। মনে হইত, ভাগ্যক্রমে আমার এই দুর্লভ সাধুসঙ্গ ঘটিয়াছে। তিনি যখন ধ্যান-ধারণা পূজা-পাঠাদি সাঙ্গ করিয়া দিবসান্তে বাহিরের কক্ষ উজ্জ্বল করিয়া আসন গ্রহণ করিতেন, তখন তাঁহার শ্রীমুখের বাণী শুনিবার জন্য অপেক্ষায় বহুতর ভক্তমণ্ডলী উপস্থিত থাকিতেন। আমিও সেই সময় দিবসের কার্য শেষ করিয়া যাইতাম। একবার তাঁহার নয়নরশ্মির গোচর হইলেই সেই জনতা মধ্য হইতে দুই-একজনকে অন্য গৃহে যাইতে আদেশ দিয়া সেই গৃহমধ্যে আমার উপবেশনের স্থান নির্দেশ করিয়া দিতেন, তাহাতে আমি বিশেষ সঙ্কোচ অনুভব করিতাম। সঙ্কোচ প্রকাশ করিলে সুমধুর গম্ভীর বাক্যে উত্তর দিতেন, "আপনার কথা সাধারণের সহিত তুলনা হইতে পারে না।" ইহাতে আমি আপনাকে বিশেষ গৌরবান্বিত মনে করিতাম এবং মনে হইত-তিনি আমাকে শুধু ভালবাসিতেন এরূপ নহে, আমাকে একটু শ্রদ্ধার চক্ষুতেও দৃষ্টি করিতেন। দুই একদিন কার্যবশে দেখা না করিতে পারিলে আমার বাটিতে লোক পাঠাইয়া তথ্য লইতেন। এমন কি স্বতঃ পরতঃ আমার শুভসাধনে যত্নবান ছিলেন। বলিতে কি, সারাদিন এই মায়ামোহময় সুখদুঃখসমাকুল সংসারযাতনা ভোগ করিয়া যখনই তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইতাম তখনই চিত্তে বিশ্রান্তি বোধ হইত। তিনি আমাদিগের একজন পরমাত্মীয় উপদেষ্টা এবং হিতকারী বন্ধু ছিলেন। দেহত্যাগের কতিপয় দিন পূর্বে আমায় বলেছিলেন, "ক্ষীরোদ তো আমাদের ফাঁকি দিয়া পলাইয়া গেল, দেখিবেন, আপনিও যেন সেরূপ করিবেন না।" এখন দেখিতেছি, তিনিই আমাদিগকে ফাঁকি দিয়া আপনিই পলাইয়া গেলেন।
    • আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩৮৫, লীলা-সহচর। প্রথম প্রকাশ: উদ্বোধন, ২৯ বর্ষ, ১০ সংখ্যা।
  • আমি এইসব সামান্য ব্যক্তিগত কথা বলিলাম এইজন্য যে, এইসব ছোটখাট ব্যক্তিগত কথা, দৈনন্দিন তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়াই স্বামীজীর মহান চরিত্র আরও বেশি উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়া উঠিত। সকল শিষ্য, সেবক, অন্তরঙ্গ, পরিচিতের সঙ্গেই তিনি ঐরূপ করিতেন, সকলকেই প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন। বাহির হইতে দেখিলে তাঁহাকে জ্ঞানগম্ভীর প্রশান্ত সমুদ্রের মতো বোধ হইত। কিন্তু যে একবার তাঁহার কাছে যাইত, মিশিবার সুযোগ পাইত, সেই বুঝিত, সেই সমুদ্রে লোনাজল ছিল না, গঙ্গার পবিত্র বারিধারার মতই তাহা সুমিষ্ট, কত পাপীতাপী সংসারদাবদগ্ধ ব্যক্তি সেই বারি পান করিয়া শান্তিলাভ করিত। একদিকে তিনি যেমন কঠোর জ্ঞানতপস্বী সন্ন্যাসী কর্মযোগী ছিলেন, অন্য দিকে তেমনই তাঁহার প্রকৃতি শিশুর মতই সরল কোমল ছিল। ভবভূতি বলিয়াছেন, লোকোত্তর পুরুষদের চরিত্র বজ্রের চেয়েও কঠোর, আবার কুসুমের চেয়েও কোমল। স্বামী সারদানন্দজী মহারাজের চরিত্র দেখিয়া বুঝিয়াছি, ভবভূতির বর্ণনা কবি-কল্পনা নয়।
    • প্রফুল্ল কুমার সরকার, পৃষ্ঠা ৩৮২, দেব-মানব। প্রথম প্রকাশ: উদ্বোধন, ২৯ বর্ষ, ১০ সংখ্যা।
  • প্রাণ-নির্গমনের পর তাঁহার মুখমণ্ডলে যে সৌম্যশান্ত ভাবের প্রকাশ ভক্তগণ দেখিয়াছেন তাহা তাঁহারা এ জীবনে বিস্মৃত হইবেন না বলিয়াই আমাদের ধারণা। অন্তরের ভাবধারা গোপন করিয়া রাখা স্বামী সারদানন্দের আজীবন স্বভাব ছিল। পাছে চরমকালে তাঁহার সেই নীরবতা ভঙ্গ হইয়া যায় ভাবিয়াই বুঝি শ্রীভগবান তাঁহাকে বাকশক্তি-শূন্য করিয়া ত্রয়োদশ দিবস রোগশয্যায় রাখিয়াছিলেন। আর শ্রীরামকৃষ্ণের নামে উৎসৃষ্ট-প্রাণ সন্ন্যাসিগণ-আজীবন যাঁহাদের তাঁহার সেবা করিবার বাসনা ব্যর্থ হইয়াছে, জগদ্গুরু তাঁহাদের সেই ঐকান্তিক প্রার্থনা পূরণের জন্যই যেন সর্বপ্রকারে অন্তঃকালে তাঁহাকে তাঁহাদের সেবামাত্র-সম্বল করিয়াছিলেন। দেহত্যাগের পূর্বে তাঁহার শ্রীমুখ-নিঃসৃত বাণী শুনিবার জন্য বিশেষ আশা অনেক ভক্তের অন্তরে বিদ্যমান ছিল। স্বামী সারদানন্দ জীবনব্যাপী নীরবেই ভাবপ্রকাশ করিয়াছেন-পরিনির্বাণকালে আমরা তাহার ব্যত্যয় আকাঙ্ক্ষা করি কেন? তিনি নীরবে আব্রহ্মস্তম্ব প্রাণিজাতকে আশীর্বাদ করিয়া লীলাময় বিগ্রহ পরিত্যাগ-পূর্বক নিত্যধামে শ্রীগুরুর নিত্যসাহচর্য লাভ করিয়াছেন। দেশকাল-পাত্র-নির্বিশেষে সকলের প্রতি তাঁহার উচ্চারিত শুভাশীর্বাণী যে এখনও তাঁহার 'লীলাপ্রসঙ্গ' প্রভৃতি গ্রন্থের পত্রে পত্রে বিরাজ করিতেছে।
    • গোবিন্দ চন্দ্র দেব, পৃষ্ঠা ৩৭১, আচার্য।
  • কঠোর সন্ন্যাস-জীবনে সন্ন্যাসের ইতিহাসে ইহা এক অপূর্ব অধ্যায়। শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দের জীবন সেই অপূর্বতার পূর্ণ অভিব্যক্তি। অতি গভীর সমুদ্রের ন্যায় গম্ভীর স্থির আবার অতি স্নিগ্ধ স্নেহমধুর সেই যে হৃদয়, জগতের এক অতুলনীয় সম্পত্তি। একদিন-একদিন মাত্রও যে তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়াছে সে আর তাহা ভুলিতে পারিত না। সাধনার প্রথম অবস্থায় যে অতি তীব্র বৈরাগ্য তাঁহাকে কঠোর সাধন, প্রব্রজ্যা ও নির্জনবাসে নিয়োজিত করিয়াছিল তাহার তীব্র দহনে তাঁহার প্রকৃতির স্নিগ্ধতা বিন্দুমাত্র নষ্ট না হইয়া বরং আরও বাড়িয়া গিয়াছিল। সন্তান-কুশলাকাঙ্ক্ষিণী জননীর ন্যায় তিনি তাঁহার অগণিত স্নেহপাত্রের সুখ দুঃখ তাঁহাদের অনুভবের মধ্য দিয়া সম অনুভূতিতে অংশ লইয়াছেন; জননী বরং তাঁহার দু-চারটি সন্তানের উৎপাতও সহ্য করিতে পারেন না, কিন্তু তিনি কখনও বিরক্ত হন নাই। আবার আপনাকেও তিনি জননী মহামায়ার স্নেহ-ক্রোড়ে শিশুর মতো নির্ভয়েই একেবারে ছাড়িয়া দিয়াছেন। শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর অধিষ্ঠান-গৃহ উদ্বোধন মঠে তিনি যে থাকিতেন, সে সম্বন্ধে তিনি বলিতেন, "মায়ের দারোয়ান হয়ে আমি এখানে আছি।" আবার সেই মহাদেবী জননীর পীড়ার সময় ক্রোড়স্থ বালিকার ন্যায় তাঁহাকে যেন পিতৃস্নেহে শুশ্রূষা করিয়াছেন। তাঁহার নিয়ম ছিল, স্নানান্তে একবার আসিয়া মায়ের গৃহদ্বারে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করা-ইহাতেই তাঁহার অপরিসীম তৃপ্তি, ততোধিক আর কিছু প্রয়োজন ছিল না। তাঁহার শান্ত স্থৈর্যের মধ্য দিয়াও যেন ভালবাসা ক্ষরিয়া পড়িত।
    • সরলাবালা দাসী, পৃষ্ঠা ৩৫৭, সঙ্ঘ-নায়ক।
  • জীবনের সন্ধ্যায় আজ আসিয়া দাঁড়াইয়াছি। অতীতের দিকে যখন চাহিয়া দেখি শত দুঃখ ও সঙ্ঘাতের সমষ্টি আমার এই জীবনের কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথাই না তখন মনে ভাসিয়া আসে। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে ভাসিয়া আসে স্বামী সারদানন্দের পূত সাহচর্যে যেসব মধুময় মুহূর্তগুলি অতিবাহিত করিবার সুদুর্লভ সুযোগ আমার ব্যথিত জীবনে উপস্থিত হইয়াছিল তাহাদেরই আনন্দময় পুণ্যস্মৃতি। এই স্মৃতি একান্তই আমার নিজের অন্তরের সংগোপন ইতিহাস-বাহিরের উত্তপ্ত দিবালোক ইহা সহ্য করিতে পারিবে না।
    • সুশীলাবালা ঘোষ, পৃষ্ঠা ২৬৩, স্বামী সারদানন্দ স্মৃতি। প্রথম প্রকাশ: উদ্বোধন, ৩৮ বর্ষ, ৬ সংখ্যা।
  • একটি ধর্মবন্ধুর সঙ্গে একদিন সন্ধ্যায় উদ্বোধনে শরৎ মহারাজকে দর্শন করিতে গিয়াছি। বন্ধুটি মহারাজজীর মন্ত্রশিষ্য, দর্শনের ছাত্র এবং ধর্মালোচনায় পরম উৎসাহী। বৈঠকখানা ঘরে মহারাজজী বসিয়া আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গৃহী ভক্ত এবং শরৎ মহারাজজীর অন্তরঙ্গ বন্ধু বৈকুন্ঠ সান্যাল মহাশয়ও আছেন। আমরা উভয়কে প্রণাম করিয়া একপাশে বসিলাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকিবার পর বন্ধুটি মুখ খুলিয়া মহারাজজীকে যেই প্রশ্ন করিতে উদ্যত হইয়াছেন, মহারাজজী অমনি ধমক দিয়া তাঁহাকে বলিলেন, খবরদার, কোনও প্রশ্ন করতে পারবিনি। কেবল প্রশ্ন, কেবল প্রশ্ন। বন্ধুটি ঘাবড়াইয়া গেলেন। সান্যাল মহাশয় তাঁহাকে বলিলেন, তুমি তো মিশনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকো, সেখানে যেসব সাধু আছেন তাঁদের সঙ্গে ধর্মপ্রসঙ্গ কর না কেন? পূজ্যপাদ শরৎ মহারাজ বলিলেন, তাতে ওদের প্রাণ ভরে না। এখানে এসে আমাকে প্রশ্ন করা চাই। যা, ওই ঘরে ডাক্তার আছে (স্বামী পূর্ণানন্দজী), তার কাছে গিয়ে বস গে এবং যত পারিস তাকে প্রশ্ন কর। মহারাজজী একটু বিরক্ত হইয়াছেন দেখিয়া আমরা বৈঠকখানার সামনের ঘরে স্বামী পূর্ণানন্দজীর নিকট গেলাম। পূজ্যপাদ শরৎ মহারাজের আদেশ মান্য করিয়া বন্ধু তাঁহাকে কয়েকটি প্রশ্ন করিলেন। উদ্বোধন হইতে ফিরিবার পথে দেখিলাম বন্ধুটির প্রাণে দারুণ আঘাত লাগিয়াছে। তিনি কয়েক দিন পরে পূজ্যপাদ শরৎ মহারাজকে একটি চিঠিতে নিজের মনোবেদনার কথা জানাইলেন। উত্তরে মহারাজ খুব স্নেহপূর্ণ ভাষায় তাঁহাকে সান্ত্বনা ও উপদেশ দিয়া লিখিয়াছিলেন, মনে পড়ে।
    • স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, পৃষ্ঠা ২১৭, স্বামী সারদানন্দের পূণ্য স্মৃতি। প্রথম প্রকাশ: উদ্বোধন, ৬৮ বর্ষ, ১২ সংখ্যা
  • স্বামীজীর এই কর্মযোগীর আদর্শ আমরা শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দজীর জীবনে মূর্ত দেখিতে পাইয়াছিলাম। শত কাজ ও ঝঞ্ঝাটের মধ্যেও দেখিতাম তিনি ধীর, স্থির ও শান্ত, কর্মকোলাহলপূর্ণ কলকাতার পল্লিতে অবস্থান করিলেও মনে হইত সত্যই তিনি মরুভূমির নিস্তব্ধতা উপভোগ করিতেছেন এবং যখন কর্মবিরত অবস্থায় শান্তভাবে বসিয়া থাকিতেন তখনও মনে হইত শুধু মঠ-মিশন কেন, বহুজনের কল্যাণ চিন্তায় তিনি নিমগ্ন, তাঁহার বিশাল হৃদয়ে কত দীনদুঃখী যে স্থান পাইত তাহার ইয়ত্তা নাই।
    • স্বামী জ্ঞানাত্মানন্দ, পৃষ্ঠা ২০৫
  • শরৎ মহারাজের জন্মতিথি। আমাদের সকলের খুব ইচ্ছা আজকের দিনে তাঁকে সবাই ফুল দিয়ে পূজা করব। কিন্তু এমন গম্ভীর হয়ে বসে আছেন কার সাধ্য যে প্রথমে গিয়ে তাঁর সেই গাম্ভীর্য ভঙ্গ করে। আমাদের সবার ইচ্ছা, কিন্তু দূরে অপেক্ষা করছি কে আরম্ভ করবে, প্রথম ঝাপটাটা কে সইবে? এমন সময় ভক্তদের বাড়ি থেকে আগত একটি ছোট্ট মেয়েকে দেখা গেল। সাধুরা তাকে শিখিয়ে দিলেন, "যা, এই ফুলটা মহারাজের পায়ে দিয়ে প্রণাম করে আয়।” মেয়েটি গিয়ে দিব্যি ফুল দিয়ে প্রণাম করল। দেখা গেল তাঁর সেই গাম্ভীর্যটা কমে গিয়েছে। তখন আমরা সব সাহস করে এগোলাম। উনি বুঝতে পাবলেন যে, এটা কৌশল করে করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঐ গাম্ভীর্যের আবরণের ভিতরে কি অদ্ভুত কোমলতা, কি স্নেহপরায়ণতা, সকলের প্রতি কি সহানুভূতি ছিল। ঐ আবরণ ভেদ করে যারা তাঁর কাছে পৌঁছেছে তারাই এটি বুঝতে পেরেছে। এই স্নেহের ভাব একমাত্র মায়ের ভিতরে কতকটা পাওয়া যায় অন্যের কাছে নয়, তাও 'কতকটা' বলছি। একবার আমার নিজের জীবনেই হয়েছে। তাঁর কাছে গিয়েছি একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে, গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বলছেন, "সব কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, আমরা কি চিরকাল থাকব?" একটু পরেই আবার বুঝিয়ে বলছেন, "বাবা, সব প্রশ্নের উত্তর নিজের ভিতর থেকে পাওয়ার চেষ্টা করবে। জেনো, সর্বদা অপরের উপর নির্ভর করলে নিজের ভিতর থেকে উত্তর পাবে না। আর আমরা তো চিরকাল থাকব না।" যেন আমাদের প্রস্তুত করবার জন্য বলছেন, আমাদের সব সময় তাঁর দিকে চেয়ে থাকলে চলবে না। আমাদের আশ্রয়রূপে তাঁর দিকে চেয়ে থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি আমাদের আত্মনির্ভর করতে চাইছেন। বুঝলাম এইজন্য বিশেষ করে চাইছেন যে, তাঁদের লীলা সম্বরণ করার আর বেশিদিন বাকি নেই।
    • স্বামী ভূতেশানন্দ, পৃষ্ঠা ২০৪-২০৫
  • স্বামী সারদানন্দজী মহারাজ যখন দক্ষিণেশ্বরে ভগবান শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের নিকট যাতায়াত আরম্ভ করেন, তখন একদিন শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁকে বললেন, "কিরে, তুই যে কিছুই চাইলি না?” এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে কিছুমাত্র বিচলিত না হয়েই যুবক শরৎ (স্বামী সারদানন্দজীর পূর্বনাম ছিল শ্রীশরৎচন্দ্র চক্রবর্তী; এই সময় তিনি ছিলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র) জবাব দিলেন, "আমি যেন সর্বভূতে ব্রহ্মদর্শন করি, এই করে দিন।” উত্তর শুনে পরমহংসদেব বললেন, "ও, ওযে শেষের কথা রে!" প্রত্যুত্তরে সহজ ও সরল ভাবেই শরৎচন্দ্র বললেন, "তা আমি জানি না।" তখন ঠাকুর বললেন, "তা তোর হবে।” সর্বভূতে ব্রহ্মদৃষ্টির প্রার্থনা যেদিন তিনি করেন, সেদিন তিনি এই উক্তির পূর্ণ তাৎপর্য ঠিক বুঝেছিলেন কি না জানি না, তবে পরবর্তী জীবনে তিনি যে এই পরম দুর্লভ অবস্থায় সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন তা তাঁর নিজের একটি উক্তিতেই সুপ্রমাণিত হয়। তাঁর রচিত 'ভারতে শক্তিপূজা' নামক পুস্তিকার ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, "যাঁহাদের করুণাপাঙ্গে গ্রন্থকার জগতের যাবতীয় নারীমূর্তির ভিতর শ্রীশ্রীজগদম্বার বিশেষ শক্তিপ্রকাশ উপলব্ধি করিয়া ধন্য হইয়াছে, তাঁহাদেরই শ্রীপাদপদ্মে এই পুস্তিকাখানি ভক্তিপূর্ণ চিত্তে অর্পিত হইল।"
    • স্বামী সন্তোষানন্দ, পৃষ্ঠা ১২৪
  • ক্ষণিক উত্তেজনার মুখে দুর্বল ব্যক্তিও মহৎ কার্য করিতে পারে, কিন্তু দৈনন্দিন ছোটখাট কাজগুলিতে যিনি উদারতা, সহনশীলতা, পরমত-সহিষ্ণুতা, হৃদয়বত্তা ও পবিত্রতা দেখাইতে পারেন তিনিই প্রকৃত মহৎ-এ কথা যদি সত্য হয়, তবে স্বীকার করিতে হইবে স্বামী সারদানন্দ মহত্তম ছিলেন।
    • স্বামী ভূমানন্দ, পৃষ্ঠা ৮২, স্বামী সারদানন্দ (যেমন দেখিয়াছি)
  • স্বামী সারদানন্দের সংস্পর্শে আমি আসি তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে। কলকাতায় উদ্বোধন-এর বাড়িতে আমি তাঁকে প্রথম দেখি; তাঁর বাইরের কঠিন ভাব দেখে ভয়ই পেয়েছিলাম, তাঁর গাম্ভীর্য মনে বেশ ভয়ের সঞ্চার করেছিল। উদ্বোধনের বাড়ির প্রবেশদ্বারের পাশে যে ছোট ঘরটি, সেখানেই তিনি বসতেন, বাড়িতে যারা ঢুকতো তাদের সকলেরই ওপর নজর রাখতেন। আগে স্বামী সারদানন্দের নিকট না গিয়ে, তাঁর অনুমতি না নিয়ে কেউ-ই দোতলায় শ্রীশ্রীমাকে দর্শন করতে যেতে পারত না। নিজেকে তিনি মায়ের বাড়ির দারোয়ান বলতেন। আমি তখন ছাত্র ছিলাম। বাইরে থাকতাম। সঙ্ঘে যোগ দেবার পর এই মায়ের বাড়িতেই কর্মিরূপে আমাকে পাঠানো হলো। এখানে স্বামী সারদানন্দের সেবক হয়ে থাকার সময়ই ঘনিষ্ঠভাবে তাঁর সংস্পর্শে আসি, আর তখনই বুঝতে পারি, আগে তাঁর সম্বন্ধে কী ভুল ধারণাই না করেছিলাম! বাইরে থেকে দেখে তাঁকে কঠোর বলে মনে হলেও তাঁর হৃদয় ছিল অতি কোমল, সকলের জন্যই স্নেহধারা ঝরে পড়ত সেখান থেকে। তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সেক্রেটারি বলেই তাঁর অনুগত হই নাই, তাঁর অসীম ভালবাসাই আমাকে বশ করেছিল। একা আমি নই, রামকৃষ্ণ-সঙ্ঘের অন্যান্য যেসব সন্ন্যাসী তাঁর সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, তাঁরাও একবাক্যে স্বীকার করবেন যে তাঁর ভালবাসার দুর্বার শক্তিই তাঁদেরও হৃদয় অধিকার করে নিয়েছিল।
    • স্বামী অশেষানন্দ, পৃষ্ঠা ৫৬
  • এই মাতৃগতপ্রাণ, মার জন্য এতটুকু করিতে পারিলে নিজেকে যে কতটুকু কৃতার্থ জ্ঞান করিতেন বলিয়া বুঝাইবার নহে। জয়রামবাটিতে মার বাসের জন্য নূতন বাড়ি নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হইয়া যাইবার কিছুকাল পরে, যখন উহা মঠের নামে লেখাপড়া হইয়া রেজিস্ট্রি হইবে, কোয়ালপাড়া মঠে কোতলপুর হইতে পালকি করিয়া রেজিস্ট্রার আসিলেন। শরৎ মহারাজ স্বয়ং দণ্ডায়মান হইয়া নমস্কারকরত তাহাকে অভিনন্দিত এবং স্বহস্তে চা, পান, সিগারেট, বিস্কুট ইত্যাদি প্রদান করিয়া আপ্যায়িত করিয়াছিলেন। তথায় উপস্থিত অন্যান্য সাধুদের চক্ষে তাঁহার মতো লোকের ঐরূপ করা কতকটা বিসদৃশ বোধ হইলেও এবং তরুণ যুবক মুসলমান রেজিস্ট্রার ইহাতে অপ্রতিভ হইয়া পড়িলেও, শরৎ মহারাজ ঐ কার্য সুসম্পন্ন হইয়া যুবকটি বিদায় না হওয়া পর্যন্ত তাহাকে যথেষ্ট সমাদর করিতে বিরত হন নাই। হেতু-মায়ের কাজ বলিয়া। জয়রামবাটিতে মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে যাহারা তথায় যাইবার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছিল, তাহারা সকলেই তাঁহার এই আত্মহারা মূর্তি প্রত্যক্ষ করিয়া ধন্য হইয়াছে, কৃতার্থ হইয়াছে। আর এই মাতৃগতপ্রাণ শিশুর দেহমন আশ্রয় করিয়া শ্রীশ্রীজগন্মাতা ও অসংখ্য তাপিতের ত্রিতাপ জ্বালা অপসারিত করিয়া তাহাদিগকে জন্মমৃত্যুর ভয় হইতে চিরতরে অব্যাহতি দান করিয়াছেন।
    • ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য, পৃষ্ঠা ২৮,

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]