বিষয়বস্তুতে চলুন

খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে

খোন্দকার আবু নাসর মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (১৯৫৮-২০১৬) ছিলেন একজন বাংলাদেশী ইসলামি ব্যক্তিত্ব, অধ্যাপক, গবেষক, লেখক, টিভি আলোচক ও অনুবাদক। তিনি ইসলামিক টিভি, এনটিভি, পিস টিভি, এটিএন বাংলা, চ্যানেল নাইন প্রভৃতি গণমাধ্যমে ইসলামের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন, এবং আইটিভি ইউএস (মার্কি‌ন ইসলামি টেলিভিশন চ্যানেল)-এর উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তার বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত: গুরুত্ব ও প্রয়োগ গ্রন্থটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সকল আলিয়া মাদ্রাসার সম্মান পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া বুহুসুন ফি উলূমিল হাদীস এবং হাদিসের নামে জালিয়াতি দুইটি বই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন তার অধীনে ১২ জন পিএইচডি এবং ৩০ জন এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

উক্তি

[সম্পাদনা]
  • আল্লাহর পথে ডাকতে গেলে বা সৎকার্যে আদেশ ও অসৎকার্যে নিষেধ করতে গেলে মানুষের বিরোধিতা, শত্রুতা ও নিন্দার কারণে কখনো ক্রোধে কখনো বেদনায় অন্তর সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। এ মনোকষ্ট দূর করার ও প্রকৃত ধৈর্য ও মানসিক স্থিতি অর্জন করার উপায় হলো বেশি বেশি আল্লাহর যিকর, তাসবীহ, তাহমীদ ও সালাত আদায় করা। সাজদায় যেয়ে আল্লাহর দরবারে ক্রন্দন ও প্রার্থনা করা। এভাবেই আমরা ‘মন্দকে উৎকৃষ্ট দিয়ে প্রতিহত’ করার প্রকৃত গুণ অর্জন করতে পারব। আমরা (Re-active) না হয়ে (Pro-active) হতে পারব। কারো আচরণের প্রতিক্রিয়া আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করবে না। আল্লাহর রেযামন্দীর দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা আচরণ করতে পারব। আমরা সত্যিকার অর্থে মহা-সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারব। আল্লাহ আমাদেরকে কবুল করুন।
  • সবাই মনে করে, মুসলমানেরা বর্বর, আমাদের ব্রেণ উর্বর। ওরা আমাদের ব্রেণে অনেক কিছু দিতে আসে, অসাম্প্রদায়িকতা, উদারতা শেখাতে আসে। কারা? যারা অন্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থে প্রসাব করে, যারা অন্য ধর্মের পয়গম্বরকে অবমাননা করাকে ক্রেডিট মনে করে। তারা আমাদেরকে উদারতা শেখাতে আসে অথচ মুসলমানদের মানসিকতাই এমন জীবনে কোন জায়গায় কোন কাঠমোল্লা, ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী,জঙ্গি, তালেবান - কখনো শুনবেন না কোন বিধর্মীকে ধর্মের জন্য মেরেছে অথবা কোন বিধর্মীর ধর্মগ্রন্থে পেসাব করেছে, এমন পেয়েছেন নাকি? মুসলমান খেপলে আমেরিকার ফ্লাগ পোড়ায় কিন্তু বাইবেল ছিঁড়ে পোড়াইছে? এমন কথা আছে নাকি? কারণ মুসলমান বিশ্বাস করে, বাইবেল হোক রামায়ণ হোক যে কোন ধর্মের ধর্মগ্রন্থ অবমাননা করা, এটা কোন ভালো কাজ না, এটা খারাপ কাজ। একারণে মুসলমান কোন ধর্মের কোন দেবতাকে নিয়ে, ভক্তি যাদেরকে করা হয় কার্টুন বানায় না, ব্যঙ্গ করে না, অবমাননা করে না। একজন মুসলমান ধর্ম পালন করে না তারপরেও তার মনে কখনোই জাগে না, অন্য ধর্মের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকার ধর্মগুরুরা ইন্টেনশনালি রাস্তায় রাস্তায় কোরআন পোড়ান, কোরআনে পেসাব করেন, করান। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়াটাকে তারা ধর্মীয়ভাবে খুব গৌরবের কাজ মনে করে!
  • জামায়াতে ইসলামী উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইসলামী রাজনৈতিক দল। দলটি বেশ কিছু ইতিবাচক কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: (i) তারা প্রমাণ করেছে যে ইসলাম একটি সম্পূর্ণ জীবন বিধান, এটি একটি ব্যবহারিক ব্যবস্থা, এবং এটি সর্বোত্তম জীবন ব্যবস্থা; (ii) তারা যুবক-যুবতীদের এবং শিক্ষিত জনগণকে ইসলাম সম্পর্কে এই সত্যগুলো বোঝাতে সক্ষম করেছে; (iii) তারা মূলত ইসলামিক অর্থনীতি, শিক্ষা ইত্যাদির জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে; (iv) তারা সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, যেমন ব্যক্তি, পীর, কবর পূজার বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে সফল হয়েছে। পাশাপাশি জাহাঙ্গীর বলেন, জামায়াত-ই-ইসলামীর রাজনীতিতে বেশ কিছু ত্রুটি দেখা যায়: (i) তারা রাজনীতিকে জিহাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি প্রথম করেছিলেন মাওলানা মওদুদী; (ii) তারা ইকামত-ই-দ্বীন (ধর্ম প্রতিষ্ঠা) ধারণার অর্থ হ্রাস করে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে বুঝিয়ে একটি গুরুতর ভুল করেছে; (iii) দলটি তার আদর্শের সাথে আপস করেছে এবং ক্ষমতা-রাজনীতিতে আরও মনোনিবেশ করেছে এবং ক্ষমতার জন্য ধর্মনিরপেক্ষ দল ও জনগণের সাথে জোট করেছে; এবং (iv) মুক্তিযুদ্ধের সময় জামাত এমন এক সরকারকে সমর্থন করেছিল এবং তাদের পক্ষে অস্ত্র গ্রহণ করেছিল, যাদেরকে এর পূর্বে তারা "অমুসলিম তাগুদী [অত্যাচারী] সরকার" বলে অভিহিত করেছিল। এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভুল।... হ্যাঁ, উলামারাও পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিলেন কারণ তারা পাকিস্তানকে ভালোবাসতেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির চেতনায় তারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। ১৯৭১ সালের এই গৌরবময় ঘটনাকে তারা এখনও স্মরণ করে। তবে, [মুক্তিযুদ্ধের সময়] তারা পাকিস্তানের পক্ষে জনগণকে সংগঠিত করেনি এবং দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সামরিক প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়নি। তারা শুধু নিষ্ক্রিয় সমর্থন দিয়েছিল.... জামায়াতের দ্বারা প্রদর্শিত ক্ষমতার লালসা প্রমাণ করে যে তারা তাদের মূল আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়েছে যে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ইসলাম প্রচার করবে না; পরিবর্তে, একদল অত্যন্ত ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের উচিত ইসলামের জন্য সঠিকভাবে সেবা করার ক্ষমতা অর্জন করা। কিন্তু দলটি সেক্যুলারদের মদদে ক্ষমতার অংশ হয়ে যায়। এটা তাদের আদর্শগত বিচ্যুতি। এই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। জামায়াত যা উন্নয়ন মনে করে; এটা আসলে অনুন্নয়ন। আমাদের সমাজে, মাত্র ১০-১৫% লোকই নামাজী-দ্বীনদার (মুসলিম অনুশীলনকারী)। কিন্তু, জামায়াত, বিএনপির সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে বিশ্বকে একটি বার্তা দেয় যে ইসলামপন্থীরা দখল করে নিয়েছে এবং বাংলাদেশ তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে। তাই যেকোনো মূল্যে জামায়াতকে চূর্ণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনার ১০ কেজি শক্তি আছে, আপনি ১০০ কেজি দেখিয়েছেন। আপনার প্রতিপক্ষ আপনাকে ৬০ কেজি দিয়ে আঘাত করেছে, কিন্তু আপনার আছে মাত্র ১০ কেজি। আপনি নিশ্চিতভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হবেন। এই কারণে, ইসলামপন্থীদের পক্ষে ক্ষমতায় থাকা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদেরকে প্রভাবিত করা এবং চাপ দেওয়া ভাল, যতক্ষণ না তারা একতরফাভাবে ক্ষমতায় না আসে। জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬) কথিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেনি, বরং নীরবে সমর্থন করেছে। এটা তাদের আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি। যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করে, তাদের ইসলামী আদর্শকে পূর্ণ বিবেচনায় নিতে হবে। ইসলামী রাজনীতি হচ্ছে আদর্শিক রাজনীতি। ইসলামী রাজনীতি শুধু ক্ষমতার পাসপোর্ট নয়।
  • সার্বভৌমত্ব মানে মালিকানা। এটা সহজ যে সার্বভৌম মানে মালিক। যেমন আমি এই জমির মালিক যা সত্য। আমি এখানে দালান তৈরি করতে পারি, ভেঙ্গে ফেলতে পারি, পার্টিশন করতে পারি, বিক্রি করতে পারি। এই মালিকানা আমার আছে। আবার এই জমি আল্লাহর। এটাও সত্য। আর আসল কথা হল, ইসলামের মতে এই জমি দিয়ে আমি অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু এখানে পতিতালয় বানাতে পারি না। মানুষের মালিকানা সীমিত; আল্লাহর মালিকানা অন্য সকল সার্বভৌমত্বের উপর সর্বোচ্চ। আমার মালিকানা পার্থিব, এবং যদি আমি তা আল্লাহর মালিকানার উপর রাখি তবে আমি আল্লাহর কাছে অপরাধী হব। একই সাথে, জনগণই দেশের মালিক, এটি একটি সহজ কথা। যারা বলেন, জনগণকে সার্বভৌম বলা ইসলাম বিরোধী এবং তারাই সকল ক্ষমতার উৎস, আমি তাদের সাথে একমত নই। এখানে ক্ষমতা বলতে ঝড়-বৃষ্টি বা রোগ-ব্যাধির ক্ষমতা বোঝায় না, এর মানে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। এই ক্ষমতা আসলে মানুষের। ইসলামে জনগণের সম্মতিতেই ক্ষমতা অর্জিত হবে। একটি সমাজে যদি জনগোষ্ঠীর প্রধানরা সম্মতি দেয় এবং জনগণ তাতে সম্মত হয়, এটা ঠিক আছে, এটাই গণতন্ত্র। গণতন্ত্র ইসলামে জনগণের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব বাধ্যতামূলক। তাই জনগণই রাষ্ট্রের মালিক এবং জনগণই ক্ষমতার উৎস ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তবে কেউ যদি মনে করে এই মালিকানা মানে যে কেউ যে কোন কিছু করতে পারে; হারামকে (নিষিদ্ধ) হালাল (বৈধ), এবং হালালকে হারাম, তাহলে স্পষ্টতই এটা ইসলাম বিরোধী।
    • (২ এপ্রিল ২০১৪)Islam, Md Nazrul; Islam, Md Saidul (২০ মার্চ ২০২০)। Islam and Democracy in South Asia: The Case of Bangladesh (ইংরেজি ভাষায়)। Springer Nature। পৃষ্ঠা 87। আইএসবিএন 978-3-030-42909-6। সংগ্রহের তারিখ ২৫ আগস্ট ২০২২ 
  • হাদীসের নামে মিথ্যা বলার একটি প্রকরণ হলো, অনুবাদের ক্ষেত্রে শাব্দিক অনুবাদ না করে অনুবাদের সাথে নিজের মনমত কিছু সংযোগ করা বা কিছু বাদ দিয়ে অনুবাদ করা। অথবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা বলেছেন তার ব্যাখ্যাকে হাদীসের অংশ বানিয়ে দেয়া। আমাদের সমাজে আমরা প্রায় সকলেই এ অপরাধে লিপ্ত রয়েছি। আত্মশুদ্ধি, পীর-মুরিদী, দাওয়াত-তাবলীগ, রাজনীতিসহ মতভেদীয় বিভিন্ন মাসআলা-মাসাইল-এর জন্য আমরা প্রত্যেক দলের ও মতের মানুষ কুরআন ও হাদীস থেকে দলীল প্রদান করি। এরূপ দলীল প্রদান খুবই স্বাভাবিক কর্ম ও ঈমানের দাবি। তবে সাধারণত আমরা আমাদের এ ব্যাখ্যাকেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামে চালাই। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, কিন্তু প্রচলিত অর্থে ‘দলীয় রাজনীতি’ করেন নি, অর্থাৎ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের মত কিছু করেন নি। বর্তমানে গণতান্ত্রিক ‘রাজনীতি’ করছেন অনেক আলিম। ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ বা ইকামতে দীনের একটি নতুন পদ্ধতি হিসেবে একে গ্রহণ করা হয়। তবে যদি আমরা বলি যে, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাজনীতি করেছেন’, তবে শ্রোতা বা পাঠক ‘রাজনীতি’র প্রচলিত অর্থ, অর্থাৎ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের কথাই বুঝবেন। আর এ রাজনীতি তিনি করেন নি। ফলে এভাবে তাঁর নামে মিথ্যা বলা হবে। এজন্য আমাদের উচিত তিনি কী করেছেন ও বলেছেন এবং আমরা কি ব্যাখ্যা করছি তা পৃথকভাবে বলা।
  • মূলত কোনো ধর্ম, মতবাদ বা আদর্শ সহিংসতা বা সন্ত্রাস শিক্ষা দেয় না। মানুষ মানবীয় লোভ, দুর্বলতা, অসহায়ত্ব, প্রতিশোধস্পৃহা ইত্যাদির কারণে সহিংসতা বা হিংস্রতায় লিপ্ত হয়। এরূপ সহিংসতায় লিপ্ত ব্যক্তি নিজের কর্মের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য, নিজের বিবেককে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করার জন্য, অন্যকে নিজের পক্ষে টানার জন্য এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে নিজের আদর্শকে ব্যবহার করে। হাজার হাজার বছর ধরে বসবাসকারী আরবদেরকে জেরুজালেম ও অন্যান্য ফিলিস্তিনী এলাকা থেকে সন্ত্রাস ও গণহত্যার মাধ্যমে বিতাড়ন করে অন্যান্য দেশে হাজার বছর ধরে বসবাসকারী ইহূদীদেরকে সেখানে নিয়ে এসে ইস্রায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার জন্য ইহূদী-খৃস্টানগণ পবিত্র বাইবেলের বাণীকে ব্যবহার করেছেন। অনুরূপভাবে আইরিশ ক্যাথলিক ব্রিটিশ প্রটেস্ট্যান্টের বিরুদ্ধে নিজের ধর্মমতকে ব্যবহার করেন, তিববতীয় বৌদ্ধ চীনের বিরুদ্ধে নিজের বৌদ্ধ ধর্মমতকে ব্যবহার করেন, নিম্নবর্ণের হিন্দু উচ্চবর্ণের হিন্দুর বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক বা ধর্মীয় মতামত ব্যবহার করেন, নিম্নরর্ণের হিন্দুদের বিরুদ্ধে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাতে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বর্ণপ্রথা বিষয়ে বেদ, গীতা ও হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের শিক্ষা ও বাণীগুলিকে ব্যবহার করেন, ফিলিস্তিনী যোদ্ধা ইহূদী দখলদারের বিরুদ্ধে নিজের ইসলাম বা খৃস্টান ধর্ম থেকে উদ্দীপনা বা প্রেরণা লাভের চেষ্টা করেন। আমাদের সমাজে ‘আওয়ামী লীগের’ কর্মী যদি কোনো কারণে উত্তেজিত হয়ে সহিংসতায় লিপ্ত হন তবে তিনি ‘স্বাধীনতা’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ইত্যাদি মহান বিষয়কে তার কর্মের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। অনুরূপভাবে ‘বিএনপি’র কর্মী এ ক্ষেত্রে ‘শহীদ জিয়া’, জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ইত্যাদি মহান বিষয়কে নিজের ‘এক্সকিউজ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। উভয় ক্ষেত্রেই দলের অন্যান্য বিচক্ষণ কর্মী জানেন যে, নিজের সহিংসতা বৈধ করার জন্যই এগুলি বলা হচ্ছে। সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষাকে দায়ী করে মাদ্রাসা শিক্ষা, মাদ্রাসা বা মাদ্রাসা শিক্ষিতদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিলে স্বভাবতই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে সহিংসতায় লিপ্ত হবেন এবং ‘ইসলাম’ ও ‘ইসলামী শিক্ষা’-র বিপন্নতাকে অজুহাত হিসেবে পেশ করবেন। এতে একমাত্র সন্ত্রাসীরাই লাভবান হবে এবং জাতি ভয়ঙ্কর সংঘাতের মধ্যে নিপতিত হবে।
    • ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, পৃষ্ঠা: ৩৯, ২য় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৯
  • বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধন ও মুসলিম দেশে ইসলাম-দমন কেন্দ্রিক উপরের ক্ষোভ সকল মুসলিম দেশে বিদ্যমান থাকলেও জঙ্গিবাদী কার্যক্রম সকল দেশে সমানভাবে বিস্তার লাভ করেনি। ইন্দোনেশিয়ায় যেরূপ সন্ত্রাসী কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়, মালয়েশিয়াতে তা পাওয়া যায় না, অথচ ইসলামী শিক্ষার বিস্তার, মাদ্রাসার সংখ্যাধিক্য এবং আমেরিকা ও পাশ্চাত্য বিরোধী মনোভাব মালয়েশিয়াতে বেশি। এর বড় কারণ সম্ভবত মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পাশ্চাত্য আগ্রাসন ও মিথ্যাচারের বিরুদ্বে রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দের সুস্পষ্ট মতামত। কর্মব্যস্ত ও পরিতৃপ্ত মানুষের মনে ক্ষোভ বা আবেগ বেশি স্থান পায় না। এছাড়া রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে তাদের মনের আবেগ প্রতিধ্বণিত হয়। ফলে তা প্রকাশের জন্য বিকৃত পথের সন্ধান করে না। পক্ষান্তরে বেকার, সামাজিক বৈষম্য বা প্রশাসনিক অনাচারের শিকার মানুষের মনের ক্ষোভ ও হতাশাকে এ সকল আবেগ আরো উস্কে দেয়। এছাড়া এইরূপ মানুষকে সহজেই বুঝানো যায় যে, এভাবে দুই-চারিটি বোমা মারলে বা মানুষ খুন করলেই তোমার মত অগণিত মানুষের বেকারত্ব বা অত্যাচার শেষ হয়ে শান্তির দিন এসে যাবে। আমাদের দেশে যারা সর্বহারার রাজত্ব বা ইসলামী রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সহিংসতা ও সন্ত্রাসের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন তাদের বিষয়ে যে কোনো মাঠ জরিপ এ বিষয়টি প্রমাণ করবে। এমনকি আঞ্চলিক বিভাজনও তা প্রমাণ করবে। বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম, পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে যেভাবে সমাজতন্ত্রী জঙ্গি বা ইসলামী জঙ্গির ‘‘রিক্রুটমেন্ট’’ সম্ভব, রাজধানী ও তার পূর্ব দিকে তা সম্ভব নয়। এসব এলাকার অর্থনৈতিক দৈন্য, বেকারত্ব ইত্যাদি এর অন্যতম কারণ।
    • ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, পৃষ্ঠা: ৬০-৬১, ২য় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]