বিষয়বস্তুতে চলুন

ডেভিড হিউম

উইকিউক্তি, মুক্ত উক্তি-উদ্ধৃতির সংকলন থেকে
মানুষ যেখানে সবচেয়ে বেশি সুনিশ্চিত আর অহঙ্কারী, সাধারণত সেখানেই সে মস্ত বড় ভুলটি করে বসে। কারণ, সে তখন যুক্তির লাগাম ছেড়ে দিয়ে আবেগে পড়ে আর ভুলে যায় সেই গভীর চিন্তামগ্নতা ও দ্বিধাবোধ, যা তাকে অজ্ঞতা থেকে বাঁচাত।
~ অ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং দ্য প্রিন্সিপালস অব মোরালস (নৈতিকতার মূলনীতি নিয়ে একটি গবেষণা); অনুচ্ছেদ ৯.১৩: উপসংহার, ১ম খণ্ড (১৭৫১)
একজন প্রাজ্ঞ মানুষের আসল জগৎ হলো তাঁর নিজের মন। আর তিনি যদি কখনো বাইরের স্বীকৃতির প্রয়োজন বোধ করেন। তবে তিনি কেবল সেই সামান্য কয়েকজন নিরপেক্ষ ও যোগ্য মানুষের বিচারকেই গুরুত্ব দেবেন, যাঁরা সংকীর্ণতামুক্ত হয়ে তাঁর কাজকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।

ডেভিড হিউম (৭ মে ১৭১১ – ২৫ আগস্ট ১৭৭৬) ছিলেন আঠারো শতকের একজন প্রখ্যাত স্কটিশ দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং প্রাবন্ধিক। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে তাকে অন্যতম প্রভাবশালী অভিজ্ঞতাবাদী ও সংশয়বাদী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিউম মনে করতেন যে, মানুষের সমস্ত জ্ঞান ও ধারণার মূল ভিত্তি হলো তার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ইন্দ্রিয় থেকে পাওয়া অনুভূতি। মূলত কার্যকারণ-তত্ত্ব এবং নৈতিক দর্শনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের জন্যই তিনি বিশ্বজুড়ে আজও সমাদৃত।


উক্তি

[সম্পাদনা]
  • এখান থেকেই বোঝা যায় সেই ধারণাটি কতটা ভ্রান্তিপূর্ণ, যেখানে মনে করা হয় কোনো রাষ্ট্রের উর্বর জমি, বিশাল জনসংখ্যা আর উন্নত কৃষি থাকা সত্ত্বেও সে কেবল টাকার অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সত্যি বলতে, এই অর্থের অভাব কোনো রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। কারণ একটি জাতির আসল শক্তি হলো তার জনগণ ও সম্পদ। বরং মানুষের অতি সাধারণ আর মিতব্যয়ী জীবনযাপনই মাঝেমধ্যে জনস্বার্থের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি সোনা-রূপাকে কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে আটকে রাখে এবং অর্থের স্বাভাবিক সঞ্চালনকে বন্ধ করে দেয়। এর বিপরীতে, শিল্পায়ন আর মানুষের আধুনিক রুচিবোধ সেই অর্থকে পুরো রাষ্ট্রের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেয়, তার পরিমাণ যত সামান্যই হোক না কেন। এটি তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ধমনীতে রক্ত সঞ্চালনের মতো মিশে যায় এবং প্রতিটি ব্যবসায়িক লেনদেনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে।
    • 'অফ মানি' (১৭৫২); ইউজিন রোটউইন সম্পাদিত ডেভিড হিউম: রাইটিংস অন ইকোনমিকসে উদ্ধৃত (১৯৫৫, ১৯৭০), পৃষ্ঠা ৪৫।
  • একজন প্রাজ্ঞ মানুষের আসল সাম্রাজ্য হলো তার নিজের অন্তরাত্মা। যদি কখনো তার বাইরের স্বীকৃতির প্রয়োজনও হয়, তবে তিনি কেবল সেই সামান্য কয়েকজন নিরপেক্ষ ও গুণী মানুষের বিচারকেই গুরুত্ব দেবেন যারা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর কাজকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা রাখেন। প্রকৃতপক্ষে, সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত প্রশংসা কোনো তথ্যের ভুল হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হতে পারে। আপনি তো জানেনই, ফোকিয়ন যখনই জনসভার করতালি শুনতেন, তখনই শঙ্কিত হয়ে ভাবতেন- নিশ্চয়ই তিনি কোনো বড় ভুল করে ফেলেছেন!
    • "দ্য থিওরি অফ মোরাল সেন্টিমেন্টসের" ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে অ্যাডাম স্মিথকে লেখা একটি পরিহাসপূর্ণ বিদ্রূপাত্মক চিঠি।
  • একজন কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কি কখনো ভূত-প্রেত কিংবা রূপকথার সেইসব আজগুবি গল্পের পেছনে হন্যে হয়ে ছোটে? অথবা তিনি কি খুব গুরুত্বের সাথে সেই সব আষাঢ়ে গল্পের সত্যতা যাচাই করতে বসেন? আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমি আজ অবধি এমন কাউকেই দেখিনি, যিনি আজেবাজে কিংবা পুরোপুরি অর্থহীন কোনো বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বিচার-বিশ্লেষণ করার পর, তদন্তের শেষ প্রান্তে এসে নিজেই সেই প্রলাপে বিশ্বাস স্থাপন করেননি। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ যখন কোনো অযৌক্তিক বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত ঘাঁটাঘাঁটি করে, তখন তার অবচেতন মন অজান্তেই সেই মিথ্যার জালে জড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সে নিজেকেই বিশ্বাস করাতে শুরু করে যে এই প্রলাপই হয়তো সত্য!
    • লেটারস
  • মহাবিশ্বের কাছে একজন মানুষের জীবনের গুরুত্ব একটি নগণ্য ঝিনুকের চেয়ে বেশি কিছু নয়।
    • অন সুইসাইড
  • সেই সব নির্বোধদের প্রশংসা কিংবা লোকদেখানো সম্মানের প্রতি আমার এক তীব্র ঘৃণা ও অবজ্ঞা রয়েছে, যারা বুক ফুলিয়ে নিজেদের জনসাধারণ বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। আসলে এরা এমন এক জনসমষ্টি, যাদের নিজস্ব কোনো চিন্তাশক্তি নেই। তাদেরকে একজন বই বিক্রেতা তার বাণিজ্যের প্রয়োজনে, কোনো লর্ড তার আভিজাত্যের দম্ভে, কোনো পুরোহিত ধর্মের ভয় দেখিয়ে কিংবা কোনো ধূর্ত রাজনৈতিক দল তাদের হীন স্বার্থে নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারে। এই শ্রেণির মানুষ নিজেদের বুদ্ধিকে অন্যের হাতে বন্ধক দিয়ে রাখে এবং স্বার্থান্বেষী মহলের নাচের-পুতুল হিসেবে নাচতে পছন্দ করে। এদের অন্ধ সমর্থন পাওয়া মানেই হলো নিজের আদর্শ ও সত্যকে বিসর্জন দেওয়া।
    • গিলবার্ট এলিয়ট অফ মিন্টোকে লেখা পত্র ১৩৮; ৯ আগস্ট, ১৭৫৭।
  • স্বর্গ আর নরকের ধারণা মানুষকে যেন ভালো আর মন্দ—এই দুই চরম শ্রেণিতে ভাগ করে ফেলে। অথচ মানবজাতির সিংহভাগ মানুষই আসলে পুণ্য আর পাপের মাঝখানে কোনো এক অনিশ্চিত জায়গায় অবস্থান করছে। কেউ যদি ভালো মানুষকে একবেলা তৃপ্তি করে খাওয়ানো আর পাপাচারীকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার সংকল্প নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণে বের হয়, তবে সে নিজের পছন্দ নিয়ে বারবার বিপদে পড়বে। কারণ অধিকাংশ নর-নারীর গুণ বা দোষের পাল্লা এতটাই হালকা যে, তারা এই দুই চরম পুরস্কার বা দণ্ডের কোনোটিরই পুরোপুরি যোগ্য নয়।
    • এসে অন দ্য ইমর্টালিটি অফ দ্য সোল (আত্মার অমরত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ)।
  • 'অফ দ্য প্রোটেস্ট্যান্ট সাকসেশন' প্রবন্ধের উপসংহার আমাকে একজন 'হুইগ' হিসেবে প্রকাশ করে, তবে আমি একজন চরম সংশয়বাদী হুইগ।
    • হেনরি হোমকে লেখা চিঠি (৯ ফেব্রুয়ারি ১৭৪৮), জে. ওয়াই. টি. গ্রেইগ সম্পাদিত, দ্য লেটারস অব ডেভিড হিউম: খণ্ড ১ (অক্সফোর্ড: ক্ল্যারেন্ডন প্রেস, ১৯৩২), পৃষ্ঠা ১১১-এ উদ্ধৃত।
  • রাজনীতি এবং রাজপুত্র বা মহৎ ব্যক্তিদের চরিত্রের বিশ্লেষণে আমি নিজেকে অত্যন্ত পরিমিত বা ভারসাম্যপূর্ণ বলে মনে করি। জাগতিক বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিভঙ্গি 'হুইগ' আদর্শের অনুসারী; কিন্তু কোনো ব্যক্তির বর্ণনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমি 'টোরি' ঘরানার পক্ষপাতকে ধারণ করি। সাধারণ মানুষ যে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়, তার বড় প্রমাণ হলো আমাকে সাধারণত টোরিদের দলেই গণ্য করা হয়।
    • ই. সি. মসনার, লাইফ অফ ডেভিড হিউম (ক্ল্যারেন্ডন প্রেস, ২০০১), পৃষ্ঠা ৩১১।
  • আমি ভেবেছিলাম আমিই একমাত্র ইতিহাসবিদ যে সমসাময়িক ক্ষমতা, স্বার্থ, কর্তৃত্ব এবং গণমানুষের কুসংস্কারের তোয়াক্কা না করে ইতিহাস লিখেছি। তাই যেহেতু বিষয়টি সবার বোধগম্য ছিল, আমি সেই অনুপাতে প্রশংসাও আশা করেছিলাম। কিন্তু আমার সেই আশা চরম হতাশায় পর্যবসিত হলো। আমি চারপাশ থেকে কেবল তিরস্কার, অসম্মতি এবং ঘৃণার শিকার হলাম। ইংরেজ, স্কটিশ, আইরিশ হুইগ থেকে টোরি, গির্জার যাজক থেকে শুরু করে মুক্তচিন্তক আর ধর্মতাত্ত্বিক, দেশপ্রেমিক থেকে রাজদরবারের পারিষদ সবাই সেই লোকটির ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়ল, যে প্রথমবার প্রথম চার্লস এবং আর্ল অফ স্ট্র্যাফোর্ডের পরিণতির জন্য এক ফোঁটা সহানুভূতি প্রকাশের সাহস দেখিয়েছিল।
    • 'মাই ঔন লাইফ' (১৭৭৬); ইউজিন মিলার সম্পাদিত ডেভিড হিউমের এসেস: মোরাল, পলিটিক্যাল, অ্যান্ড লিটারারি (১৭৪১–১৭৭৭) (১৯৮৫), পৃষ্ঠা ৩৭।
  • আমি এমন একজন মানুষ যে শত্রুতা উসকে দেওয়ার মতো সব ধরণের বিষয়ে লিখেছি! তা সে নৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় যাই হোক না কেন। তবুও আমার কোনো শত্রু নেই। অবশ্য সমস্ত হুইগ, টোরি (তৎকালীন ব্রিটেনের প্রধান দুটি রাজনৈতিক আদর্শ বা দল) এবং সমস্ত খ্রিষ্টান ছাড়া
    • মৃত্যুর কিছুকাল আগে জনৈক বন্ধুর প্রতি দেওয়া এক বক্তব্য, যা লর্ড হেনরি ব্রোঘামের মেন অব লেটারসে বর্ণিত হয়েছে।
  • আল-কুরআনের অনুরাগী এবং অনুসারীরা এই অদ্ভুত আর অসংলগ্ন রচনার মধ্যে থাকা চমৎকার সব নৈতিক উপদেশের ওপর জোর দেন। কিন্তু এটি ধরে নেওয়া যায় যে, আরবি শব্দগুলো যেগুলো ইংরেজি সাম্য, ন্যায়বিচার, পরিমিতিবোধ, নম্রতা আর দানের সমার্থক সেগুলো সেই ভাষার দীর্ঘদিনের ব্যবহারের ফলেই সবসময় ইতিবাচক অর্থে গৃহীত হয়ে থাকে; আর সেগুলোকে প্রশংসা ছাড়া অন্য কোনো বিশেষণে উল্লেখ করাটা নৈতিকতার নয় বরং ভাষার অজ্ঞতারই প্রমাণ দিত। কিন্তু আমরা যদি জানতে চাই যে সেই কথিত নবী কি আসলেই নৈতিকতার কোনো সঠিক বোধ অর্জন করতে পেরেছিলেন কি না, তবে আমাদের তার বর্ণনার দিকে লক্ষ্য করতে হবে; এবং আমরা শীঘ্রই দেখতে পাব যে তিনি এমন সব বিশ্বাসঘাতকতা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, প্রতিশোধ আর ধর্মান্ধতার প্রশংসা করেছেন যা একটি সভ্য সমাজের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত। সেখানে সঠিক বা ন্যায়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানা হয়নি; বরং প্রতিটি কাজকে তখনই কেবল প্রশংসা বা নিন্দা করা হয়েছে যখন তা প্রকৃত বিশ্বাসীদের জন্য উপকারী বা ক্ষতিকর মনে হয়েছে।
    • ডেভিড হিউম, অফ দ্য স্ট্যান্ডার্ড অফ টেস্ট (১৭৬০)।

এ ট্রিয়েটাইজ অব হিউম্যান নেচার (১৭৩৯-৪০)

[সম্পাদনা]
  • যারা দর্শন বা বিজ্ঞানের জগতে নতুন কোনো আবিষ্কারের দাবি করেন, তারা সাধারণত নিজেদের পূর্বসূরিদের মতবাদকে সমালোচনা করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করতে পছন্দ করেন। সত্যি বলতে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে আমাদের যে চরম অজ্ঞতা রয়েছে, সেই সীমাবদ্ধতা নিয়ে যদি তারা কেবল আক্ষেপ করতেন, তবে বিজ্ঞানমনস্ক খুব কম মানুষই তাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করতেন। একজন প্রাজ্ঞ ও শিক্ষিত মানুষের পক্ষে সেই সব ব্যবস্থার নড়বড়ে ভিত্তিগুলো খুঁজে বের করা খুবই সহজ, যেগুলো একসময় অত্যন্ত নির্ভুল এবং গভীর যুক্তি হিসেবে সমাদৃত ছিল। বিনা বিচারে মেনে নেওয়া মূলনীতি, সেখান থেকে টেনে আনা দুর্বল সিদ্ধান্ত, তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য আর প্রমাণের অভাব। বিখ্যাত সব দার্শনিকদের তত্ত্বে এগুলো প্রায়ই চোখে পড়ে। এই দুর্বলতাগুলোই যেন খোদ দর্শন শাস্ত্রকে আজ কলঙ্কিত করে তুলেছে।
    • ভূমিকা
  • সুতরাং, আমাদের এই বিজ্ঞানের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও তথ্যগুলো সংগ্রহ করতে হবে মানবজীবনের সতর্ক পর্যবেক্ষণ থেকে। জগত যেভাবে স্বাভাবিক নিয়মে চলে—মানুষের আচরণ, তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম আর বিনোদনের ভেতরেই আমাদের সেই সত্যগুলো খুঁজে নিতে হবে। যখন এই ধরণের পর্যবেক্ষণগুলো বিচারবুদ্ধি দিয়ে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ ও তুলনা করা হবে, তখন আমরা এমন একটি শক্তিশালী বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ার আশা করতে পারি যা হবে অকাট্য এবং মানুষের কল্যাণের দিক থেকে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
    • ভূমিকা

১ম খণ্ড: অফ দ্য আন্ডারস্ট্যান্ডিং (বোধশক্তি প্রসঙ্গে)

[সম্পাদনা]
  • যেহেতু আমরা সেই সব বিষয়কেই 'অভ্যাস' বলি যা কোনো নতুন যুক্তি বা বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই অতীতের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি থেকে জন্ম নেয়। তাই আমরা একে একটি ধ্রুব সত্য হিসেবে মেনে নিতে পারি যে—বর্তমানে আমাদের মনের প্রতিটি বিশ্বাসই আসলে সেই উৎস (অভ্যাস) থেকে তৈরি হওয়া এক একটি প্রতিচ্ছবি।
    • ৩য় অংশ, ৮ম পরিচ্ছেদ।
  • কোনো বস্তুর নিজের ভেতরে আসলে এমন কিছুই নেই যা আমাদের সেই বস্তুর সীমানা ছাড়িয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে। এমনকি আমরা যখন দুটি বস্তুর মধ্যে বারবার বা ক্রমাগত সংযোগ লক্ষ্য করি, তখনও সেই অভিজ্ঞতার বাইরের কোনো বিষয় নিয়ে অনুমান করার মতো যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আমাদের কাছে থাকে না।
    • ৩য় অংশ, ১২শ পরিচ্ছেদ।
  • একটি স্পষ্ট সত্যকে অস্বীকার করা যেমন হাস্যকর , তেমনি হাস্যকর হলো তাকে রক্ষা করার জন্য মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করা। আর আমার কাছে এর চেয়ে স্পষ্ট সত্য আর কিছু নেই যে মানুষের মতো পশুরাও চিন্তা ও যুক্তিবোধের অধিকারী। এই ক্ষেত্রে যুক্তিগুলো এতটাই প্রতীয়মান যে তা অত্যন্ত স্থূল এবং অজ্ঞ মানুষের নজরও এড়ায় না।
    • ৩য় অংশ, ১৬শ পরিচ্ছেদ।
  • পশুপাখির বাহ্যিক আচরণের সাথে আমাদের নিজেদের আচরণের যে সাদৃশ্য রয়েছে, তা থেকেই আমরা বিচার করি যে তাদের অভ্যন্তরীণ জগতও আমাদের মতোই; এবং যুক্তির এই একই নীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাব যে—যেহেতু আমাদের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াগুলো পরস্পর সদৃশ, তাই সেগুলো যে উৎস থেকে এসেছে, সেই কারণগুলোও অবশ্যই সদৃশ হবে।
    • ৩য় অংশ, ১৬শ পরিচ্ছেদ।
  • মানুষ তাদের নিজেদের যুক্তির ক্রিয়া দেখে বিস্মিত হয় না, অথচ পশুপাখির সহজাত প্রবৃত্তি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে এবং এটি ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খায়। কেবল এই কারণে যে একে সেই একই মূলনীতিতে ফেলা যায় না। প্রকৃতপক্ষে যুক্তি আমাদের আত্মার ভেতরে এক বিস্ময়কর এবং অবোধ্য সহজাত প্রবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
    • ৩য় অংশ, ১৬শ পরিচ্ছেদ।
  • অভ্যাস থেকে যা কিছু সৃষ্টি হতে পারে, প্রকৃতি অবশ্যই তা উৎপাদন করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, অভ্যাস প্রকৃতিরই অন্যতম মূলনীতি এবং এটি তার সমস্ত শক্তি সেই উৎস থেকেই লাভ করে।
    • ৩য় অংশ, ১৬শ পরিচ্ছেদ।
  • এভাবে সমস্ত জ্ঞান শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্যতাতে পর্যবসিত হয়; এবং এই সম্ভাব্যতা আমাদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কম বা বেশি হতে পারে।
    • ৪র্থ অংশ, ১ম পরিচ্ছেদ।
  • বর্তমানে দার্শনিকদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ বলে মনে হচ্ছে, সিজিফাস এবং ট্যান্টালাস এর শাস্তির বর্ণনায় কবিরা আমাদের যে ধারণা দিয়েছেন, তা বাস্তব যন্ত্রণার তুলনায় সামান্য। কারণ এর চেয়ে যন্ত্রণাদায়ক আর কী হতে পারে যে—ব্যকুল হয়ে এমন কিছুকে খোঁজা যা চিরকাল আমাদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায় এবং এমন এক জায়গায় তাকে খোঁজা যেখানে তার অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব?
    • ৪র্থ অংশ, ৩য় পরিচ্ছেদ।
  • আমি যখন খুব নিবিড়ভাবে নিজের ভেতরে 'আমি' নামক সত্তাকে খুঁজি, তখন আমি সবসময়ই তাপ বা শৈত্য, আলো বা ছায়া, প্রেম বা ঘৃণা, দুঃখ বা সুখের মতো কোনো না কোনো অনুভূতির ওপর আছড়ে পড়ি। কোনো উপলব্ধি ছাড়া আমি কখনোই 'নিজেকে' খুঁজে পাই না এবং এই সব বিচিত্র অনুভূতি ছাড়া আর কিছুই পর্যবেক্ষণ করতে পারি না। যখন কিছু সময়ের জন্য আমার উপলব্ধিগুলো থেমে যায় (যেমন গভীর ঘুমে), ততক্ষণ আমি নিজের সম্পর্কে অচেতন থাকি এবং সত্যি বলতে তখন আমার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। আর যদি মৃত্যুর মাধ্যমে আমার সব অনুভূতি চিরতরে মুছে যায়, তবে আমি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাব। যদি কেউ নিরপেক্ষ চিন্তার পর মনে করেন যে তার 'নিজের' সম্পর্কে ভিন্ন কোনো ধারণা আছে, তবে আমি স্বীকার করছি যে তার সাথে তর্কে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই। তিনি হয়তো নিজের ভেতর সরল এবং অখণ্ড কিছু অনুভব করেন যাকে তিনি 'নিজে' বা 'আত্মা' বলেন; কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আমার ভেতর এমন কোনো সত্তা নেই। তবে এই ধরণের মুষ্টিমেয় কিছু তাত্ত্বিক ব্যক্তিদের বাদ দিলে, আমি বাকি মানবজাতি সম্পর্কে জোর দিয়ে বলতে পারি যে মানুষ অসংখ্য উপলব্ধির এক সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়, যা অচিন্তনীয় দ্রুততায় একে অপরকে অনুসরণ করে এবং এক নিরন্তর প্রবাহ ও গতির মধ্যে থাকে।
    • ৪র্থ অংশ, ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
  • আমার নিজেকে এমন একজন মানুষের মতো মনে হয়, যে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবং এক ছোট প্রণালী পার হতে গিয়ে অল্পের জন্য জাহাজডুবি থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবুও তার ধৃষ্টতা এতটাই যে সে সেই একই জীর্ণ, লোনা ধরা জাহাজে করে সমুদ্রে পাড়ি দিতে চায় এবং এমনকি এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিশ্ব ভ্রমণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।
    • ৪র্থ অংশ, ৭ম পরিচ্ছেদ।
  • আমার দর্শনে আমি নিজেকে যে জনশূন্য একাকীত্বের মধ্যে আবিষ্কার করি, তা দেখে আমি প্রথমে আতঙ্কিত এবং বিভ্রান্ত হই। নিজেকে এক অদ্ভুত বিদঘুটে দানব মনে হয়, যে সমাজে মিশতে অক্ষম হয়ে মানুষের সান্নিধ্য থেকে বিতাড়িত এবং পরিত্যক্ত ও শোচনীয় অবস্থায় পড়ে আছে। ইচ্ছে হয় আশ্রয় আর উষ্ণতার জন্য ভিড়ের মধ্যে ছুটে যাই। কিন্তু সেই কদর্যতার সাথে নিজেকে মেশাতে পারি না। আমি অন্যদের ডাকি আমার সাথে যোগ দিতে যাতে আমরা আলাদা একটি সঙ্গ গড়ে তুলতে পারি। কিন্তু কেউ আমার কথা শোনে না। সবাই দূরে থাকে এবং সেই ঝড়কে ভয় পায় যা আমার ওপর চারপাশ থেকে আঘাত হানছে। আমি সমস্ত অধিবিদ্যক, যুক্তিবিদ, গণিতবিদ এমনকি ধর্মতাত্ত্বিকদের শত্রুতার মুখে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। তবে আমার ওপর যে অপমান নেমে আসবে তাতে কি আমি অবাক হতে পারি?আমি তাদের ব্যবস্থার প্রতি আমার অসম্মতি প্রকাশ করেছি; তবে তারা যদি আমার এবং আমার মতবাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে তবে কি আমি বিস্মিত হতে পারি? আমি যখন বাইরের দিকে তাকাই, আমি সবদিকে কেবল বিতর্ক, বিরোধিতা, ক্রোধ আর কুৎসা দেখি। যখন আমি নিজের ভেতরে তাকাই, আমি কেবল সন্দেহ আর অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাই না। সারা বিশ্ব আমার বিরোধিতা করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। যদিও আমার দুর্বলতা এমনই যে অপরের সমর্থন ছাড়া আমার নিজের মতামতগুলোই আলগা হয়ে ঝরে পড়ে। আমার নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ দ্বিধাগ্রস্ত, আর প্রতিটি নতুন চিন্তা আমাকে ভুলের আশঙ্কায় ভীত করে তোলে।
    • ৪র্থ অংশ, ৭ম পরিচ্ছেদ।
  • এত সাহস নিয়ে আমি কীভাবে এগোব, যখন নিজের অসংখ্য দুর্বলতা ছাড়াও আমি মানুষের সহজাত সাধারণ দুর্বলতাগুলোও নিজের ভেতর খুঁজে পাই? আমি কি নিশ্চিত হতে পারি যে প্রতিষ্ঠিত সমস্ত মতামত ত্যাগ করে আমি সত্যকেই অনুসরণ করছি? আর কিসের ভিত্তিতেই বা আমি সত্যকে চিনব, যদি ভাগ্য শেষ পর্যন্ত আমাকে তাঁর পায়ের ছাপে পৌঁছেও দেয়?
    আমার সবচেয়ে নির্ভুল যুক্তির পরেও আমি কেন তা মেনে নেব; তার কোনো কারণ খুঁজে পাই না। আমি কেবল সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি এক তীব্র টান অনুভব করি যার অধীনে বস্তুগুলো আমার কাছে প্রকাশিত হয়। স্মৃতি, ইন্দ্রিয় এবং বোধশক্তি—এই সবকিছুই তাই শেষ পর্যন্ত কল্পনা বা আমাদের ধারণার প্রাণবন্ততার ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে।
    • ৪র্থ অংশ, ৭ম পরিচ্ছেদ।
সাধারণত, ধর্মের ভুলগুলো বিপজ্জনক আর দর্শনের ভুলগুলো কেবল হাস্যকর!
  • কার্যকারণের সাধারণ সম্পর্কের অন্তরালে যে মূলনীতিটি সবকিছুকে বেঁধে রেখেছে, সে সম্পর্কে আমরা সাধারণ ঘটনায় যতটা অজ্ঞ, অসাধারণ কোনো ঘটনায় ঠিক ততটাই অন্ধকারেই থাকি। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে আমরা এই ঘাটতিটুকু বুঝতে পারি না। এটি আসলে কল্পনার একটি বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। কল্পনার এই অহেতুক উড্ডয়ন দর্শনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দার্শনিকদের অধিকাংশ ভুলের মূল কারণ। উজ্জ্বল কল্পনাশক্তির অধিকারীদের সেই দেবদূতদের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যারা নিজেদের ডানা দিয়ে নিজেদেরই চোখ ঢেকে রাখে।
    • ১ম খণ্ড: বোধশক্তি প্রসঙ্গে, ৪র্থ অংশ, ৭ম পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ২৬৭-২৬৮, লিবার্টি ফান্ড)।
  • সাধারণত, ধর্মের ভুলগুলো বিপজ্জনক, আর দর্শনের ভুলগুলো কেবল হাস্যকর।
    • ১ম খণ্ড: বোধশক্তি প্রসঙ্গে, ৪র্থ অংশ, ৭ম পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ২৭২, লিবার্টি ফান্ড)।


২য় খণ্ড: অফ দ্য প্যাশনস (আবেগ বা প্রবৃত্তি প্রসঙ্গে)

[সম্পাদনা]
  • দুঃখ আর হতাশা থেকে জন্ম নেয় ক্রোধ, ক্রোধ থেকে ঈর্ষা, ঈর্ষা থেকে বিদ্বেষ, আর সেই বিদ্বেষ থেকে পুনরায় দুঃখ—এভাবেই চক্রটি পূর্ণতা পায়।
    • ১ম অংশ, ৪র্থ পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ২৮৩, লিবার্টি ফান্ড)।
  • মানবপ্রকৃতির কোনো গুণই সহমর্মিতার মতো এত বেশি লক্ষণীয় নয়। যার মাধ্যমে আমরা অন্যের রুচি আর অনুভূতি খুব সহজে গ্রহণ করি, এমনকি সেগুলো আমাদের নিজস্ব মতের বিরোধী হলেও। আমরা লক্ষ্য করি যে, একই জাতির মানুষের চিন্তা আর মেজাজের মধ্যে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য থাকে। এবং এই সাদৃশ্য কেবল মাটি বা জলবায়ুর কারণে নয়, বরং সহমর্মিতার কারণেই বেশি ঘটে। একজন অমায়িক মানুষ মুহূর্তের মধ্যেই তার সঙ্গীদের মেজাজের সাথে মিশে যান। এমনকি সবচেয়ে অহংকারী ব্যক্তিও তার পরিচিতদের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন।
    • ১ম অংশ, ১১শ পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৩১৬-৩১৭, লিবার্টি ফান্ড)।
  • হাঁস, টার্কি মুরগি কিংবা ময়ূরের চলন-বলন দেখলেই বোঝা যায় তারা নিজেদের সম্পর্কে কত উঁচু ধারণা পোষণ করে এবং অন্যদের কতটা অবজ্ঞা করে। যেমন পুরুষ নাইটিঙ্গেল পাখির গান গাওয়ার প্রতিযোগিতা আর এই ধরণের আরও অনেক প্রমাণ থেকে এটি স্পষ্ট যে অহংকার আর বিনয় কেবল মানুষের আবেগ নয়, বরং তা সমগ্র প্রাণীজগতে বিস্তৃত।
    • ১ম অংশ, ১২শ পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৩২৬, লিবার্টি ফান্ড)।
  • পশুদের ক্ষেত্রেও সহমর্মিতা বা আবেগের আদান-প্রদান মানুষের মতোই ঘটে। ভয়, ক্রোধ, সাহস—সবই এক পশু থেকে অন্য পশুতে সঞ্চারিত হয়। লক্ষ্যণীয় যে, সিংহ, বাঘ বা বিড়াল খেলার ছলে যখন আক্রমণ করে, তখন তারা নখর বা দাঁত ব্যবহার করলেও সঙ্গীকে আঘাত করা থেকে সতর্কভাবে বিরত থাকে, যা প্রমাণ করে যে ইতর প্রাণীদেরও একে অপরের ব্যথা আর আনন্দের বোধ রয়েছে।
    • ২য় অংশ, ১২শ পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৩৯৭-৩৯৮, লিবার্টি ফান্ড)।
  • দার্শনিক বিতর্কে কোনো মতবাদকে কেবল ধর্ম বা নৈতিকতার জন্য 'বিপজ্জনক' বলে প্রমাণ করার মাধ্যমে বাতিল করে দেওয়া। সবচেয়ে প্রচলিত অথচ সবচেয়ে নিন্দনীয় একটি পদ্ধতি। কোনো মতবাদ যদি যুক্তিহীনতার দিকে নিয়ে যায়, তবেই কেবল তা মিথ্যে হতে পারে। কিন্তু তার ফলাফল বিপজ্জনক বা অপ্রীতিকর বলেই যে তা মিথ্যে হবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই।
    • ৩য় অংশ, ২য় পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৪০৯, লিবার্টি ফান্ড)।
যুক্তি হলো আবেগের দাস এবং এর কাজ হলো আবেগের খেদমত ও হুকুম পালন করা।
  • যখন আমরা আবেগ আর যুক্তির লড়াই নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা দার্শনিক এবং পারিভাষিক দিক থেকে সঠিক কথা বলি না। যুক্তি হলো আবেগের দাস এবং এর কাজ হলো আবেগের খেদমত ও হুকুম পালন করা
    • ৩য় অংশ, ৩য় পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৪১৫, লিবার্টি ফান্ড)।
  • আমার নখের সামান্য একটি আঁচড় আটকানোর চেয়ে পুরো পৃথিবীর ধ্বংসকে বেছে নেওয়া যুক্তিবিরোধী কিছু নয়। নিজের সামান্যতম অস্বস্তি এড়াতে একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ কিংবা কোনো দূর দেশের বাসিন্দার চূড়ান্ত সর্বনাশ বেছে নেওয়াও যুক্তির চোখে ভুল নয়। এমনকি নিজের বড় কোনো কল্যাণের চেয়ে সামান্য কোনো প্রাপ্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াও অযৌক্তিক নয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, একটি আবেগ বা প্রবৃত্তিকে কেবল তখনই অযৌক্তিক বলা যেতে পারে, যখন তা কোনো ভুল বিচারবুদ্ধি কিংবা মিথ্যে ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
    • ৩য় অংশ, ৩য় পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৪১৬, লিবার্টি ফান্ড)।


৩য় খণ্ড: অফ মরালস' (নৈতিকতা প্রসঙ্গে)

[সম্পাদনা]
  • সূক্ষ্ম এবং জটিল যুক্তির একটি অসুবিধা হলো—এটি প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করতে পারে কিন্তু সব সময় আশ্বস্ত করতে পারে না। পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে যখন আমরা দৈনন্দিন জীবনের কাজে যুক্ত হই, তখন সেই সূক্ষ্ম যুক্তিগুলো রাতের অন্ধকারের সাথে মিলিয়ে যায় এবং আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো অনেক কষ্টে অর্জন করেছিলাম, সেগুলো ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
    • ১ম অংশ, ১ম পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৪৫৫, লিবার্টি ফান্ড)।
  • নৈতিকতা এমন একটি বিষয় যা অন্য সবকিছুর চেয়ে আমাদের বেশি আলোড়িত করে। আমরা বিশ্বাস করি সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি এর প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করে। এই গুরুত্বই আমাদের অনুসন্ধানকে অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব ও জোরালো করে তোলে। এই বিশেষ সুবিধাটুকু না থাকলে আমি কখনোই এই ধরণের দুর্ভেদ্য দর্শনের তৃতীয় খণ্ডটি লেখার দুঃসাহস দেখাতাম না। বিশেষ করে এমন এক যুগে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ পড়াকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং যা কিছু বোঝার জন্য গভীর মনোযোগ প্রয়োজন, তাকেই অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করতে শিখেছে।
    • ১ম অংশ, ১ম পরিচ্ছেদ।
  • নীতিবোধ মূলত আমাদের আবেগ ও অনুভূতিকে নাড়া দেয় এবং কোনো কাজ করতে কিংবা তা থেকে দূরে থাকতে প্রেরণা জোগায়। বিচারবুদ্ধি বা যুক্তি এই বিশেষ ক্ষেত্রে একেবারেই শক্তিহীন। তাই এ কথা বলা যায় যে নৈতিকতার নিয়মগুলো আমাদের নিছক যুক্তিনির্ভর কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
    • ১ম অংশ, ১ম পরিচ্ছেদ।
  • কোনো কাজ প্রশংসনীয় বা নিন্দনীয় হতে পারে; কিন্তু তা 'যুক্তিসঙ্গত' বা 'অযৌক্তিক' হতে পারে না। প্রশংসা আর নিন্দা যুক্তির সীমানার বাইরের বিষয়। যুক্তি অলস ও নিষ্ক্রিয়, এটি কখনোই বিবেকের মতো সক্রিয় নীতির উৎস হতে পারে না।
    • ১ম অংশ, ১ম পরিচ্ছেদ।
  • যেকোনো জঘন্য অপরাধকে লক্ষ্য করুন—ধরুন একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। একে সব দিক থেকে পরীক্ষা করে দেখুন, সেখানে কি বাস্তব কোনো অস্তিত্ব বা তথ্য পাবেন যাকে আপনি 'পাপ' বলতে পারেন? সেখানে আপনি কেবল কিছু আবেগ, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা আর চিন্তাই খুঁজে পাবেন। পাপ বিষয়টি বস্তু বা ঘটনার মধ্যে থাকে না। যতক্ষণ আপনি বাইরের ঘটনার দিকে তাকাবেন, পাপ আপনার নাগালের বাইরেই থাকবে। একে কেবল তখনই খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যখন আপনি আপনার দৃষ্টি নিজের অন্তরের দিকে ফেরাবেন এবং সেই কাজের প্রতি নিজের ভেতর একটি ঘৃণার অনুভূতি লক্ষ্য করবেন। সুতরাং, গুণ এবং পাপ অনেকটা শব্দ, বর্ণ, তাপ বা ঠান্ডার মতো, যা বস্তুর নিজস্ব কোনো বৈশিষ্ট্য নয়, বরং আমাদের মনের ভেতরের এক একটি অনুভূতি বা উপলব্ধি মাত্র।
    • ১ম অংশ, ১ম পরিচ্ছেদ।
  • আমি একটি বিষয় উল্লেখ্য না করে পারছি না, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি এ পর্যন্ত নৈতিকতা নিয়ে যত আলোচনা দেখেছি, সেখানে লেখক প্রথমে সাধারণ যুক্তি দিয়ে শুরু করেনঃ হয়তো ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা মানুষের স্বভাব নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু হঠাৎ আমি অবাক হয়ে দেখি, সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি বর্ণনা করার পরিবর্তে (অর্থাৎ কোনো কিছু কেমন 'হয়' বা 'নয়' বলার বদলে), লেখক সরাসরি আদেশ দিতে শুরু করেন যে আমাদের কী করা 'উচিত' বা 'উচিত নয়'! এই পরিবর্তনটি অলক্ষ্যেই ঘটে যায়, কিন্তু এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী। কেননা এই 'উচিত' বা 'উচিত নয়' একটি নতুন সম্পর্ক প্রকাশ করে, যা আগের বর্ণনামূলক তথ্য থেকে কীভাবে বিবর্তিত হলো—তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। লেখকের এই অসাবধানতা পাঠককে খেয়াল করার অনুরোধ জানাব। কারণ এই সামান্য সতর্কতাটুকু প্রচলিত সমস্ত নৈতিক ব্যবস্থাকে ধূলিসাৎ করে দিতে যথেষ্ট।
    • ১ম অংশ, ১ম পরিচ্ছেদ।
  • ন্যায় এবং অন্যায় বোধ প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত হয়নি, বরং কৃত্রিমভাবে শিক্ষা এবং মানবিক প্রথা থেকে তৈরি হয়েছে।
    • ২য় অংশ, ১.১৭।
  • মানুষের স্বার্থপরতা, তাদের সীমাবদ্ধ উদারতা এবং চাহিদার তুলনায় প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণেই মূলত 'ন্যায়বিচার' বা আইনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
    • ৩য় খণ্ড, ২য় অংশ, ২য় পরিচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ৪৯৪-৪৯৫, লিবার্টি ফান্ড)।
  • নিজের এবং নিকটজনদের জন্য সম্পদ ও প্রতিপত্তি অর্জনের এই যে লালসা—এটি অতৃপ্ত, চিরন্তন, সর্বজনীন এবং সরাসরি সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক।
    • ২য় অংশ, ২য় পরিচ্ছেদ।


এ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং (১৭৪৮)

[সম্পাদনা]
দার্শনিক হও; কিন্তু তোমার সমস্ত দর্শনের মাঝেও, অন্তত একজন মানুষ হয়ে থেকো।
১৭৪৮ সালে প্রথম 'ফিলোসফিক্যাল এসেস কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং' নামে প্রকাশিত হয়; এরপর বেশ কয়েকবার পরিমার্জিত হওয়ার পর ১৭৫৮ সালে বর্তমান শিরোনামে পুনর্নামকরণ করা হয়।
বাস্তব ঘটনা ভিত্তিক যুক্তির ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়ার নানা স্তর রয়েছে। তাইতো একজন জ্ঞানী ব্যক্তি সবসময় প্রমাণের মাপকাঠিতেই তার বিশ্বাসের পাল্লা নির্ধারণ করে থাকেন।


  • প্রথাই হলো মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ চালিকাশক্তি। কেবল এই একটি নীতির কারণেই আমাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগে এবং আমরা আশা করতে পারি যে, ভবিষ্যতে ঠিক তেমন কিছুই ঘটবে যা অতীতে ঘটেছিল। এই প্রথার প্রভাব না থাকলে আমাদের স্মৃতি আর ইন্দ্রিয়ের সামনে যা সরাসরি বর্তমান, তার বাইরের কোনো কিছু সম্পর্কেই আমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান থাকত না। কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী উপায় অবলম্বন করতে হয়, কিংবা কোনো কাজ সফল করতে নিজেদের শক্তি কীভাবে কাজে লাগাতে হয়। সেটা আমরা কখনোই বুঝতে পারতাম না। এতে করে আমাদের সকল কাজকর্ম তো বটেই, এমনকি চিন্তাভাবনারও প্রধান পথটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত।
    • পাঠান্তর (সম্ভবত এই অনুচ্ছেদের একটি সারসংক্ষেপ): ইট ইজ নট রিজন হুইচ ইজ দ্য গাইড অব লাইফ, বাট কাস্টম (যুক্তি জীবনের পথপ্রদর্শক নয়, বরং প্রথাই হলো জীবন চালিকাশক্তি)।
  • প্রকৃতি মানুষকে এক ধরনের মিশ্র জীবনযাপনের ইঙ্গিত দেয়, যা মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উপযোগী। সে আমাদের গোপনে সাবধান করে দিয়েছে যেন আমরা কোনো একটি ঝোঁকের বশবর্তী হয়ে অন্য সব কাজ বা আনন্দকে বিসর্জন না দিই। প্রকৃতি যেন আমাদের বলছে - বিজ্ঞানের প্রতি তোমার আগ্রহকে প্রশ্রয় দাও, কিন্তু তোমার সেই বিজ্ঞান যেন হয় মানবিক এবং সমাজ ও মানুষের কর্মজীবনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। জটিল চিন্তা আর অতি গভীর গবেষণাকে আমি নিষেধ করছি; কারণ এগুলো তোমাকে বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দেবে, অনিশ্চয়তার গোলকধাঁধায় আটকে রাখবে এবং যখন তুমি তোমার তথাকথিত আবিষ্কারগুলো মানুষের সামনে আনবে, তখন লোকে তা অবজ্ঞার সাথে ফিরিয়ে দিয়ে তোমাকে শাস্তি দেবে। তাই বলছি, দার্শনিক হও; কিন্তু তোমার সমস্ত দর্শনের মাঝেও একজন মানুষ হয়ে থেকো।
    • ১ম পরিচ্ছেদ: অফ দ্য ডিফারেন্ট স্পিসিস অব ফিলোসফি
  • দার্শনিক বিতর্কে কোনো মতবাদকে কেবল ধর্ম বা নৈতিকতার জন্য 'বিপজ্জনক' তকমা দিয়ে নাকচ করে দেওয়ার চেষ্টার চেয়ে নিন্দনীয় পদ্ধতি আর নেই। এটি সত্য আবিষ্কারে কোনো সাহায্য করে না, কেবল প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করতে শেখায়।
  • প্রাকৃতিক জগতের সবচেয়ে নিখুঁত দর্শনও আমাদের অজ্ঞানতাকে বড়জোর আর কিছুটা সময় আড়াল করে রাখতে পারে। অন্যদিকে, জীবন ও জগতের গূঢ় রহস্য নিয়ে আমাদের গভীর দর্শন হয়তো সেই অজ্ঞানতার বিশাল দিকগুলোকেই আরও নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। দিনশেষে, মানুষের সীমাবদ্ধতা আর অন্ধত্বকে স্পষ্ট করে তোলাই হলো সমস্ত দর্শনের চূড়ান্ত পরিণতি। আমরা একে এড়িয়ে যাওয়ার যতই চেষ্টা করি না কেন, জীবনের প্রতিটি বাঁকেই এটি আমাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।
    • চতুর্থ পরিচ্ছেদ: 'বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়াকলাপ প্রসঙ্গে সংশয়বাদী সন্দেহ'।
  • 'আগামীকাল সূর্য উঠবে না'—এই ধারণাটি 'আগামীকাল সূর্য উঠবে'—এই বিশ্বাসের মতোই সমানভাবে অর্থবহ এবং এতে যুক্তিগত কোনো অসংগতি নেই।
    • § ৪.৮
  • আমি বলি যে, বিশ্বাস আর কিছুই নয়—কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি প্রাণবন্ত, জীবন্ত, জোরালো, দৃঢ় আর স্থায়ী একটি ধারণা।
    • § ৪.৯
  • তাই পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতার সাহায্য ছাড়া নিছক যুক্তি দিয়ে কোনো ঘটনার গতিপ্রকৃতি বিচার করা, কিংবা কোনো কারণ থেকে এর ফলাফল অনুমান করার চেষ্টা করাটা একেবারেই নিরর্থক।
    • § ৪.১১
  • ইতিহাসের আজ কী-ই বা মূল্য থাকত, যদি মানুষের সাধারণ আচরণের নিরিখে আমরা ইতিহাসবিদের সত্যবাদিতার ওপর নূন্যতম আস্থাও রাখতে না পারতাম?
    • § ৮.১৮
  • স্বাধীনতা বলতে আমরা কেবল নিজের ইচ্ছাশক্তি অনুযায়ী কাজ করা বা না করার ক্ষমতাকেই বুঝি।
    • § ৮.২৩
  • এই নামমাত্র স্বাধীনতা আসলে সেই প্রত্যেকটি মানুষেরই আছে, যে কোনো কারাগারে কয়েদি হয়ে নেই কিংবা শিকলে বন্দি হয়ে পড়ে নেই।
    • § ৮.২৩
  • অনিবার্যতার সংজ্ঞা দেওয়া যায় দুইভাবে। এটি হয় একই ধরণের ঘটনার মাঝে এক অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে, নয়তো এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে আমাদের মনের এক স্বাভাবিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
    • § ৮.২৩
  • বাস্তব জগত নিয়ে যুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাই আমাদের একমাত্র ভরসা হলেও, এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে এই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান সবসময় ত্রুটিমুক্ত নয়। বরং অনেক সময় এটি আমাদের ভুল পথেও চালিত করতে পারে।
    • ১০ম পরিচ্ছেদ: অফ মিরাকলস, ১ম অংশ।
  • বাস্তব জগতের যুক্তি-তর্কের ক্ষেত্রে নিশ্চয়তার বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। যা নিখুঁত প্রমাণ থেকে শুরু করে কেবল সাধারণ সম্ভাবনা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তাই একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সবসময় প্রমাণের গুরুত্ব বিচার করেই তার বিশ্বাসের মাত্রা নির্ধারণ করেন।
    • ১০ম পরিচ্ছেদ: অফ মিরাকলস, ১ম অংশ|৮৭
  • ...কোনো অলৌকিক ঘটনাকে ধ্রুব সত্য হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য কেবল লোকমুখের সাক্ষ্যই যথেষ্ট নয়। সেই সাক্ষ্যকে হতে হবে এতটাই জোরালো যে তার মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনাটি খোদ ওই অলৌকিক ঘটনার চেয়েও বেশি অবিশ্বাস্য বা বিস্ময়কর মনে হবে।** ১০ম পরিচ্ছেদ: অফ মিরাকলস, ১ম অংশ।
  • যখন কেউ আমাকে বলে যে সে একজন মৃত মানুষকে জীবিত হতে দেখেছে, আমি সাথে সাথেই মনে মনে বিচার করি—এই লোকটির আমাকে ধোঁকা দেওয়া বা তার নিজের ধোঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, নাকি সে যা বলছে সেই ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা বেশি? আমি এক অলৌকিকতার পাল্লায় অন্য অলৌকিকতাকে ওজন করি এবং যেখানে গুরুত্ব বেশি পাই, সেখানেই সিদ্ধান্ত নিই। আমি সবসময় বড় অলৌকিকতাকে বর্জন করি। যদি তার সাক্ষ্যের মিথ্যা হওয়াটা ওই ঘটনার চেয়েও বেশি অলৌকিক হয়, কেবল তখনই সে আমার বিশ্বাস বা মত আশা করতে পারে।
    • ১০ম পরিচ্ছেদ: অফ মিরাকলস, ১ম অংশ।
  • কথার জাদু বা বাকপটুতা যখন চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছায়, তখন তা যুক্তি বা চিন্তার জন্য খুব সামান্যই অবকাশ রাখে। এটি সরাসরি মানুষের কল্পনা আর আবেগকে নাড়া দেয় এবং শ্রোতাদের বিচারবুদ্ধিকে একরকম আচ্ছন্ন করে ফেলে।
    • ১০ম পরিচ্ছেদ: অফ মিরাকলস, ২য় অংশ (পৃষ্ঠা ১১৮, লিবার্টি ফান্ড)।
  • খ্রিষ্টধর্ম কেবল তার সূচনাপর্বেই অলৌকিকতার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং আজও কোনো যুক্তিবাদী মানুষ অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির স্পর্শ ছাড়া এতে আস্থা রাখতে পারে না। শুধু শুষ্ক যুক্তি এর সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। যে ব্যক্তি বিশ্বাসের টানে এতে সায় দেন, তিনি নিজের ভেতরেই এক নিরন্তর বিস্ময় বা অলৌকিকত্ব অনুভব করেন। যা তাঁর বিচারবুদ্ধির সমস্ত চিরাচরিত নিয়মকে ওলটপালট করে দেয় এবং তাঁকে এমন কিছু বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যা মানুষের চিরচেনা অভিজ্ঞতা ও অভ্যাসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
    • এ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং (১৭৪৮), ১০ম পরিচ্ছেদ: অফ মিরাকলস, ২য় অংশ (পৃষ্ঠা ১২০, লিবার্টি ফান্ড)।
  • এই মূলনীতিগুলো মাথায় রেখে আমরা যদি কোনো গ্রন্থাগারের তাকে হাত দিই, তবে আমাদের সামনে এক বিশাল ত্যাগ-তিতিক্ষার দৃশ্য ফুটে উঠবে। আমাদের হাতে যদি কোনো গতানুগতিক ধর্মতত্ত্ব কিংবা নিছক তাত্ত্বিক পরাবিদ্যার বই আসে, তবে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত, 'এতে কি পরিমাণ বিমূর্ত যুক্তি আছে?' - না। 'এতে কি বাস্তব তথ্য কিংবা অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনো পরীক্ষামূলক যুক্তি আছে?' - না। তবে একে নির্দ্বিধায় আগুনে পুড়িয়ে ফেলো। কারণ এতে বিভ্রান্তিকর অপযুক্তি আর মায়া ছাড়া আর কিছুই নেই।
    • এ্যান এনকোয়ারি, ১২শ পরিচ্ছেদ: অফ দ্য অ্যাকাডেমিক্যাল অর স্কেপটিক্যাল ফিলোসফি, ৩য় অংশ (পৃষ্ঠা ১৬৫, অক্সফোর্ড)।


এ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং দ্য প্রিন্সিপলস অফ মোরালস (১৭৫১)

[সম্পাদনা]
  • নৈতিকতার প্রতিটি সিদ্ধান্তে 'জনকল্যাণ'-ই প্রধানত বিবেচনায় থাকে। যেখানেই দর্শনে বা সাধারণ জীবনে কর্তব্যের সীমা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়, সেখানে মানবজাতির প্রকৃত স্বার্থের বিচার ছাড়া আর কোনোভাবেই অধিকতর নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
    • ২য় পরিচ্ছেদ: অফ বেনোভোলেন্স, ২য় অংশ (পৃষ্ঠা ১৮০, অক্সফোর্ড)।
  • সেই ব্যক্তি সুখী, যার পরিস্থিতি তার স্বভাবের সাথে খাপ খায়। কিন্তু সেই ব্যক্তি অধিকতর শ্রেষ্ঠ, যে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের স্বভাবকে মানিয়ে নিতে পারে।
    • ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ: অফ কোয়ালিটিজ ইউজফুল টু আওয়ারসেলভস, ১ম অংশ (পৃষ্ঠা ২৪৩, অক্সফোর্ড)।
  • যেখানে মানুষ সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত এবং অহংকারী, তারা সাধারণত সেখানেই মস্ত বড় ভুলটি করে থাকে। কারণ তখন তারা সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই আবেগের হাতে লাগাম ছেড়ে দেয়!
    • ৯ম পরিচ্ছেদ: কনক্লুশন (উপসংহার), ১ম অংশ (পৃষ্ঠা ২৮১, অক্সফোর্ড)।


দ্য ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ রিলিজিয়ন (১৭৫৭)

[সম্পাদনা]
এই গ্রন্থটি সর্বপ্রথম 'ফোর ডিসার্টেশনস' (১৭৫৭) নামক প্রবন্ধ সংকলনে প্রকাশিত হয়। হিউমের জীবদ্দশায় সামান্য কিছু পরিবর্তনসহ এটি বেশ কয়েকবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল।


  • ধর্ম সম্পর্কিত প্রতিটি অনুসন্ধানই যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই বিশেষভাবে দুটি প্রশ্ন আমাদের মনোযোগ কাড়বে। প্রথমটি হলো যে যুক্তির ওপর ধর্মের ভিত্তি কতটুকু, আর দ্বিতীয়টি হলো—মানুষের স্বভাব বা মনস্তত্ত্বের ঠিক কোথায় ধর্মের উৎপত্তি। ভাগ্যক্রমে, প্রথম প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এর সমাধান বেশ স্পষ্ট। প্রকৃতির এই বিশাল কাঠামোই বলে দেয় যে এর পেছনে একজন বুদ্ধিমান স্রষ্টা রয়েছেন। তাই যেকোনো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ গভীরভাবে চিন্তা করলে প্রকৃত ঈশ্বরবাদ ও ধর্মের প্রাথমিক নীতিগুলোর ওপর বিশ্বাস হারাবে না। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নটি অর্থাৎ মানুষের স্বভাবের মধ্যে ধর্মের উৎস কোথায়, তা নিয়ে বেশ জটিলতা রয়েছে। অদৃশ্য ও বুদ্ধিমান কোনো শক্তির ওপর বিশ্বাস হয়তো সব যুগে এবং সব স্থানে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এটি সম্ভবত এমন কোনো সার্বজনীন বিষয় নয় যার কোনো ব্যতিক্রম নেই, এমনকি এটি মানুষের মনে সব সময় একই ধরনের ধারণাও তৈরি করতে পারেনি। যদি ভ্রমণকারী এবং ঐতিহাসিকদের কথা বিশ্বাস করা হয়, তবে এমন কিছু জাতির সন্ধান পাওয়া গেছে যাদের মধ্যে ধর্মের কোনো অনুভূতিই ছিল না। তাছাড়া এমন কোনো দুটি জাতি বা দুজন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা ধর্মের বিষয়ে হুবহু একই মত পোষণ করে।
    • ভূমিকা।
    • ম্যাগিয়ানরা বলে, সেই আদিম বুদ্ধিমান সত্তা; যিনি সবকিছুর মূল উৎস—নিজেকে কেবল মন এবং বিচারবুদ্ধির মাধ্যমেই প্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বে সূর্যকে নিজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে স্থাপন করেছেন। আর যখন সেই উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলে তার রশ্মি ছড়িয়ে দেয়, তখন তা আসলে উচ্চতর স্বর্গের সেই মহিমারই একটি ক্ষীণ অনুলিপি মাত্র। যদি তুমি এই ডিভাইন বিয়িং বা ঐশ্বরিক সত্তার অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচতে চাও, তবে সাবধান! কখনো মাটিতে খালি পা রেখো না, আগুনে থুতু ফেলো না, এমনকি আগুন যদি আস্ত একটা শহরকেও গ্রাস করে ফেলে, তবুও তাতে জল ঢেলো না। অন্যদিকে মুসলমানরা বলে, সর্বশক্তিমানের পূর্ণতা কে বর্ণনা করতে পারে? তাঁর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কাজগুলোও যদি তাঁর সাথে তুলনা করা হয়, তবে তা ধুলোবালি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাহলে মানুষের সীমিত চিন্তাভাবনা তাঁর অসীম পূর্ণতার তুলনায় কতটা নগণ্য হতে পারে? তাঁর সন্তুষ্টি মানুষকে চিরসুখী করে। আর সন্তানদের জন্য সেই কৃপা লাভের সেরা উপায় হলোঃ তারা যখন শিশু থাকে, তখনই তাদের শরীরের চামড়ার একটি ছোট অংশ কেটে ফেলা। আবার রোমান ক্যাথলিকরা বলে, দুই টুকরো কাপড় নাও (প্রায় এক বা দেড় ইঞ্চি বর্গাকার), সেগুলোকে দুই কোণ দিয়ে সুতো বা ফিতে দিয়ে এমনভাবে জোড় দাও যেন তা লম্বায় প্রায় ষোলো ইঞ্চি হয়। এরপর সেটা মাথার ওপর দিয়ে এমনভাবে গলিয়ে দাও যাতে কাপড়ের এক টুকরো তোমার বুকে আর অন্য টুকরো পিঠে থাকে। অনন্তকাল ধরে অস্তিত্বমান সেই অসীম সত্তার প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় কোনো গোপন রহস্য আর নেই।
    • ৭ম অংশঃ এই মতবাদের নিশ্চিতকরণ।
  • মূর্তিপূজা আর একেশ্বরবাদের তুলনা করলে সেই ধ্রুব সত্যটিই চোখের সামনে ফুটে ওঠে যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জিনিসের বিকৃতি থেকেই সবচেয়ে জঘন্য বা কদর্য জিনিসের জন্ম হয়।
    • ১০ম অংশঃ সাহসিকতা বা হীনম্মন্যতা প্রসঙ্গে।
  • প্যাগানিজম বা পৌত্তলিক ধর্মের বীরেরা ঠিক তেমনই, যেমনটা পোপতন্ত্রের সন্ত বা ইসলাম ধর্মের পবিত্র দরবেশরা। হারকিউলিস, থেসেউস, হেক্টর কিংবা রোমুলাসের জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে ডমিনিক, ফ্রান্সিস, অ্যান্টনি এবং বেনেডিক্টরা। দানব বিনাশ, স্বৈরাচার দমন কিংবা মাতৃভূমি রক্ষার বদলে এখন চাবুকের আঘাত সহ্য করা, উপবাস থাকা, ভীরুতা, বিনয় এবং দাসসুলভ আনুগত্যই হয়ে উঠেছে মানবজাতির কাছে স্বর্গীয় সম্মান লাভের উপায়।
    • ১০ম অংশঃ সাহসিকতা বা হীনম্মন্যতা প্রসঙ্গে।
  • ধর্মীয় গোঁড়ামির এই প্রবল স্রোতকে সাধারণ কিছু যুক্তি দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করা। যেমন, একই বস্তু একই সাথে থাকা এবং না থাকা অসম্ভব, অংশ থেকে পূর্ণ সবসময় বড়, কিংবা দুই আর তিনে পাঁচ হয়; তা অনেকটা খড়কুটো দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ থামানোর চেষ্টার মতো। আপনি কি পবিত্র রহস্যের বিরুদ্ধে সাধারণ যুক্তিকে দাঁড় করাবেন? আপনার এই অধার্মিকতার জন্য কোনো শাস্তিই যথেষ্ট নয়। আর যে আগুন ধর্মদ্রোহীদের পোড়ানোর জন্য জ্বালানো হয়েছিল, সেই একই আগুন দার্শনিকদের বিনাশের কাজেও ব্যবহার করা হবে।
    • ১১তম অংশঃ যুক্তি বা অযৌক্তিকতা প্রসঙ্গে
  • আমরা কল্পনা করতে পারি, সোরবোনের একজন ধর্মতাত্ত্বিক সাইসের এক পুরোহিতকে বলছেন, "তোমরা কীভাবে পেঁয়াজ আর রসুনের পূজা করো?" পুরোহিত উত্তর দিচ্ছেন, "আমরা অন্তত সেগুলোর পূজা করি, তোমাদের মতো একই সাথে সেগুলোকে খেয়ে ফেলি না।" তখন সেই পণ্ডিত ডাক্তার আবার প্রশ্ন করছেন, "কিন্তু বিড়াল আর বাঁদর কি কোনো উপাসনার বস্তু হতে পারে?" তার সেই পণ্ডিত প্রতিপক্ষ উত্তর দিচ্ছেন, "এগুলো অন্তত তোমাদের সেই তথাকথিত মহাপুরুষদের দেহাবশেষ কিংবা পচা হাড়গোড়ের চেয়ে অনেক ভালো।" ক্যাথলিক পণ্ডিত আবারও জেদ ধরে বলছেন, "একটা বাঁধাকপি কিংবা শসা—এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে একে অপরের গলা কাটা কি পাগলামি নয়?" তখন সেই পৌত্তলিক উত্তর দিচ্ছেন, "হ্যাঁ, আমি তা মেনে নিচ্ছি। তবে আপনাকেও স্বীকার করতে হবে যে সেই মানুষগুলো আরও বড় পাগল, যারা স্রেফ কিছু অর্থহীন কুতর্কভরা বইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে লড়াই করে। যার দশ হাজার কপিও একটি শসা কিংবা বাঁধাকপির সমান মূল্যবান নয়।
    • ১২তম অংশঃ সংশয় বা দৃঢ় বিশ্বাস প্রসঙ্গে।
  • আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে, সব কুসংস্কারের ধরন অত্যন্ত একগুঁয়ে এবং দাপুটে হওয়া সত্ত্বেও, সব যুগের ধর্মবিশ্বাসীদের এই দৃঢ়তা আসলে যতটা না খাঁটি, তার চেয়ে বেশি লোক দেখানো। এটি কখনোই সেই নিরেট বিশ্বাসের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারে না, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজগুলোকে পরিচালনা করে। মানুষ এমনকি নিজের মনের কাছেও সেই সন্দেহগুলো স্বীকার করতে ভয় পায়, যা এই বিষয়গুলো নিয়ে তাদের মনে দানা বাঁধে। তারা অন্ধ বিশ্বাসকে এক বড় গুণ মনে করে। আর খুব শক্ত গলায় কথা বলে বা চরম গোঁড়ামি দেখিয়ে নিজেদের আসল অবিশ্বাসকে নিজেদের কাছেই লুকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু মানুষের সহজাত প্রকৃতি তাদের সব চেষ্টার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। মনের এই আবছায়া জগতের মিটমিটে আলো কখনোই সাধারণ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার তৈরি করা গভীর ছাপের সমান হতে পারে না। মানুষের দৈনন্দিন আচরণই তাদের মুখের কথাকে মিথ্যে প্রমাণ করে দেয়। আর এটাই দেখায় যে, এই সব বিষয়ে তাদের সম্মতি আসলে মনের এক অবর্ণনীয় অবস্থা। যা অবিশ্বাস আর বিশ্বাসের মাঝামাঝি কোথাও ঝুলে থাকে, তবে তা বিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাসেরই বেশি কাছাকাছি।
    • ১২তম অংশঃ সংশয় বা দৃঢ় বিশ্বাস প্রসঙ্গে।
  • মানুষের কাছে যখন এমন কোনো আচারের কথা বলা হয় যা জীবনের কোনো কাজেই আসে না, কিংবা যা তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির একদম বিরোধী। তখন সেই মানুষটি সেই কাজটিকে আরও বেশি উৎসাহের সাথে গ্রহণ করে। ঠিক যে কারণে তার এই আচারটি বর্জন করার কথা ছিল, সেই কারণেই সে এটিকে আঁকড়ে ধরে। তার কাছে মনে হয়, এটিই বোধহয় খাঁটি ধর্ম। কারণ এর পেছনে পার্থিব কোনো স্বার্থ বা উদ্দেশ্য নেই। আর যদি এই আচারের জন্য সে তার শান্তি ও আরাম বিসর্জন দিতে পারে, তবে তার মনে হয় স্রষ্টার কাছে তার মর্যাদা আরও বেড়ে গেছে—যত বেশি কষ্ট, তত বেশি ভক্তি! কারো ধার করা টাকা ফেরত দেওয়া কিংবা ঋণ শোধ করার মাধ্যমে সে মনে করে না যে স্রষ্টার প্রতি কোনো বিশেষ আনুগত্য দেখানো হয়েছে; কারণ এই ন্যায়বিচারগুলো তাকে এমনিতেও করতে হতো। এমনকি পৃথিবীতে যদি কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব নাও থাকত, তবুও অনেক মানুষ এগুলো করত। কিন্তু সে যদি একদিন উপবাস থাকে কিংবা নিজের শরীরে চাবুকের আঘাত সয়, তবে তার মতে এই কাজটির সাথে সরাসরি ঈশ্বরের সেবার সম্পর্ক আছে। কারণ এই কঠোরতা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য তাকে এমন কাজ করতে বাধ্য করত না। ভক্তির এই বিশেষ চিহ্নগুলোর মাধ্যমেই সে মনে করে যে সে এখন ঐশ্বরিক কৃপা লাভ করেছে; আর এর বিনিময়ে সে এই দুনিয়ায় নিরাপত্তা এবং পরকালে চিরস্থায়ী সুখের আশা করে।
    • ১৪তম অংশঃ নৈতিকতার ওপর প্রচলিত ধর্মের নেতিবাচক প্রভাব।
  • মনের এমন শান্ত ও নির্মল মূহূর্তগুলোতে, মিথ্যা উপাসনার এই ছায়াগুলো আর কখনো দেখা দেয় না।
    • ১৮তম অংশঃ নৈতিকতার ওপর প্রচলিত ধর্মের নেতিবাচক প্রভাব।
  • কোনো ভালো জিনিসের খুব সামান্য নমুনা যখন আমাদের সামনে আসে, তা যত বেশি চমৎকার হয়—তার সাথে মিশে থাকা মন্দটি ততটাই তীব্র হয়ে দেখা দেয়। প্রকৃতির এই অভিন্ন নিয়মের খুব কমই ব্যতিক্রম পাওয়া যায়। সবচেয়ে প্রখর বুদ্ধি যেমন পাগলামির সীমানা ঘেঁষে চলে; পরম আনন্দের বিচ্ছুরণ যেমন গভীর বিষণ্ণতা তৈরি করে; সবচেয়ে তীব্র আনন্দ যেমন নিষ্ঠুর অবসাদ আর বিতৃষ্ণাকে সাথে নিয়ে আসে; ঠিক তেমনি সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক স্বপ্নগুলোই চরম হতাশার পথ তৈরি করে দেয়। সাধারণভাবে বলতে গেলে, জীবনের কোনো পথই ততটা নিরাপদ নয় (কারণ সুখের কথা তো স্বপ্নেও ভাবা যায় না) যতটা না হলো পরিমিত ও মধ্যমপন্থা। যা প্রতিটি বিষয়ে যতটা সম্ভব ভারসাম্য এবং এক ধরনের নির্বিকার ভাব বজায় রাখে। যেহেতু ভালো, মহান, মহিমান্বিত এবং চমৎকার বিষয়গুলো প্রকৃত ঈশ্বরবাদের মূলনীতির মধ্যে চমৎকারভাবে পাওয়া যায়। তাই প্রকৃতির সাথে তুলনা করলে এটা বলাই যায় যে ভিত্তিহীন, অদ্ভুত, তুচ্ছ আর ভয়াবহ বিষয়গুলোও সমানভাবে ধর্মীয় কল্পকাহিনী এবং অলীক কল্পনার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে।
    • ১৫তম অংশঃ জেনারেল করোলারি (সাধারণ অনুসিদ্ধান্ত)।
  • মানুষের বিচারবুদ্ধির কী এক মহান ক্ষমতা! যে সে প্রকৃতির দৃশ্যমান কাজগুলো দেখেই পরম সত্তার জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুমান করতে পারে! কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটাও একবার দেখুন। ইতিহাসের সব যুগ আর সব জাতির দিকে তাকিয়ে দেখুন; পৃথিবীতে বাস্তবে টিকে থাকা ধর্মীয় নিয়মগুলো একবার পরখ করুন। আপনার মনেই হবে না যে এগুলো সুস্থ কোনো মানুষের চিন্তা, বরং মনে হবে এগুলো সব অসুস্থ মানুষের স্বপ্ন। অথবা এগুলোকে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো সত্তার গম্ভীর আর সুদৃঢ় দাবি মনে না হয়ে বরং মানুষের রূপ ধরা কোনো বাঁদরের খামখেয়ালি খেলা বলে মনে হবে।
    • ১৫তম অংশঃ সাধারণ অনুসিদ্ধান্ত।
  • সকল মানুষের মুখের কথা শুনুন। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো নিশ্চিত আর কিছুই নাকি নেই। কিন্তু তাদের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখুন। আপনার মনেই হবে না যে তারা সেই বিশ্বাসের ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা রাখে। চরম ভক্তিও মানুষকে ভণ্ডামি থেকে বাঁচাতে পারে না। আবার প্রকাশ্যে ধর্মকে অস্বীকার করার ভেতরেও অনেক সময় এক গোপন ভয় বা অনুশোচনা কাজ করে। এমন কোনো অদ্ভুত ধর্মীয় অযৌক্তিকতা নেই যা বড় বড় বিদ্বান ব্যক্তিরা কোনো না কোনো সময় বিশ্বাস করেননি। আবার এমন কোনো কঠিন ধর্মীয় বিধিনিষেধ নেই যা চূড়ান্ত ভোগবিলাসী আর বখে যাওয়া মানুষগুলোও নিজের স্বার্থে গ্রহণ করেনি।
    • ১৫তম অংশঃ সাধারণ অনুসিদ্ধান্ত।
  • অজ্ঞতাই হলো ভক্তির জননী—এই প্রবাদটি সাধারণ অভিজ্ঞতা দ্বারা বারবার প্রমাণিত। এমন কোনো জাতিকে খুঁজে দেখুন যাদের কোনো ধর্ম নেই, যদি পানও তবে নিশ্চিত থাকবেন যে তারা পশুদের থেকে খুব সামান্যই আলাদা।
    • ১৫তম অংশঃ জেনারেল করোলারি।
  • গোটা ব্যাপারটাই যেন এক প্রকার কুহেলিকা, এক পরম রহস্য আর এক ব্যাখ্যাতীত জট!
    সন্দেহ, অনিশ্চয়তা আর বিচারের দোদুল্যমানতা—এটাই আমাদের অনুসন্ধানের একমাত্র প্রাপ্তি। তবে মানুষের যুক্তিবোধের সীমাবদ্ধতা এমন যে এই সংশয় ধরে রাখা কঠিন। তাই আমরা এক ধরণের কুসংস্কারের বিপরীতে অন্যটিকে লেলিয়ে দিয়ে তাদের বিবাদ দেখতে দেখতে নিজেরা দর্শনের শান্ত ও নির্জন আশ্রয়ে পালিয়ে যাই।
    • ১৫তম অংশ: জেনারেল করোলারি।


এসেস, মোরাল, পলিটিক্যাল, অ্যান্ড লিটারারি (১৭৪১-২;১৭৪৮)

[সম্পাদনা]
  • স্বাধীনতা-প্রেমীদের জন্য এটি একটি স্বস্তিদায়ক চিন্তা যে—ব্রিটেনের এই বিশেষ সুবিধা (সংবাদপত্রের স্বাধীনতা) ততদিনই অক্ষুণ্ণ থাকবে, যতদিন আমাদের সরকার স্বাধীন থাকবে। যেকোনো ধরণের স্বাধীনতা খুব কম ক্ষেত্রেই একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। যারা স্বাধীনতায় অভ্যস্ত, তাদের কাছে দাসত্বের চেহারা এতটাই বীভৎস যে এটি অত্যন্ত ধীরে এবং হাজারো ছদ্মবেশে জনমানসে সংক্রামিত হয়। কিন্তু যদি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কখনো লুপ্ত হয়, তবে তা একসাথেই চিরতরে হারিয়ে যাবে।
    • ১ম খণ্ড, ২য় প্রবন্ধ: অফ দ্য লিবার্টি অফ দ্য প্রেস ।
  • যারা দার্শনিক দৃষ্টিতে জাগতিক বিষয়াবলি পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের কাছে এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কিছু নেই যে—কত সহজে সংখ্যাগুরু সাধারণ মানুষ মুষ্টিমেয় কয়েকজনের দ্বারা শাসিত হয় এবং মানুষ কত অবলীলায় নিজের আবেগ আর অধিকার শাসকদের হাতে সঁপে দেয়। যখন আমরা এই বিস্ময়ের কারণ খুঁজি, তখন দেখি যে শক্তি সব সময় শাসিতদের পক্ষেই থাকে। তাই শাসকদের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন হলো জনমত। সুতরাং, কেবল জনমতের ওপর ভিত্তি করেই শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং এই নীতিটি যেমন স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি চরম স্বৈরাচারী ও সামরিক শাসনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
    • ১ম খণ্ড, ৪র্থ প্রবন্ধ: অফ দ্য ফার্স্ট প্রিন্সিপলস অফ গভর্নমেন্ট ।
  • এটি এক ধরনের সঠিক রাজনৈতিক নীতি যে—প্রতিটি মানুষকে 'প্রতারক' হিসেবে ধরে নিতে হবে। যদিও শুনতে অদ্ভুত লাগে যে, একটি নীতি রাজনীতিতে সত্য হলেও ব্যক্তিগত জীবনে হয়তো মিথ্যে। মানুষ সাধারণত তার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে জনসমক্ষে বা দলীয় পরিচয়ে বেশি অসৎ হয়ে থাকে এবং নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ রক্ষায় তারা অনেক বেশি দূর পর্যন্ত যেতে পারে। লোকলজ্জা বা সম্মানবোধ মানুষের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধক। কিন্তু যখন একদল মানুষ সমষ্টিগতভাবে কাজ করে, তখন এই বাধাটি অনেকাংশেই ঘুচে যায়। কারণ একজন মানুষ যখন দলের স্বার্থে কাজ করে, তখন সে জানে যে তার নিজের দল তাকে সমর্থন করবেই এবং খুব দ্রুতই সে প্রতিপক্ষের সমালোচনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে শেখে।
    • ১ম খণ্ড, ৬ষ্ঠ প্রবন্ধ: অফ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্সি অফ পার্লামেন্ট; প্রথম বাক্যটি প্রায়ই এভাবে বলা হয়: " এটি একটি সঠিক রাজনৈতিক নীতি যে, প্রতিটি মানুষকে একজন ধূর্ত বা প্রবঞ্চক হিসেবেই ধরে নিতে হবে।"
  • মানুষের মনের প্রকৃতিই এমন যে, এটি তার সংস্পর্শে আসা অন্য সব মনকে আঁকড়ে ধরতে চায়। এবং যেমন মতের মিল বা ঐক্য একে ভীষণভাবে শক্তিশালী করে, তেমনি মতের অমিল বা বৈপরীত্য একে সমানভাবে বিচলিত ও বিমর্ষ করে তোলে। এ কারণেই তর্কের সময় অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এক ধরণের ব্যকুলতা দেখা যায় এবং অতি সাধারণ বা তুচ্ছ বিষয়েও তারা বিরুদ্ধ মতকে সহ্য করতে পারে না।
    • ১ম খণ্ড, ৮ম প্রবন্ধ: অফ পার্টিজ ইন জেনারেল (পৃষ্ঠা ৫৪, লিবার্টি ফান্ড)।
  • জনপ্রিয়তা আর দেশপ্রেমের চূড়ান্ত শিখর আজও ক্ষমতা আর স্বৈরাচারের দিকে যাওয়ার চেনা রাস্তা। তোষামোদ যেমন বিশ্বাসঘাতকতার পথ দেখায়, স্থায়ী সেনাবাহিনী যেমন স্বৈরাচারী শাসনের পথ প্রশস্ত করে, ঠিক তেমনি ঈশ্বরের মহিমা প্রচার অনেক সময় যাজকশ্রেণীর বৈষয়িক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
    • ১ম খণ্ড, ৮ম প্রবন্ধ: অফ পাবলিক ক্রেডিট (পৃষ্ঠা ৩৬১, লিবার্টি ফান্ড)।
  • সকল যুগে এবং পৃথিবীর সব প্রান্তেই যাজকশ্রেণী স্বাধীনতার ঘোর শত্রু ছিল এবং এটি নিশ্চিত যে, তাদের এই অবিচল আচরণ মূলত তাদের বৈষয়িক স্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা যাজকীয় ক্ষমতা এবং সেই সব 'পবিত্র প্রতারণার' জন্য সব সময় কাল হয়ে দাঁড়ায়, যার ওপর ভর করে তাদের কর্তৃত্ব টিকে থাকে।
    • ১ম খণ্ড, ৯শ প্রবন্ধ: অফ দ্য পার্টিজ অফ গ্রেট ব্রিটেন (পৃষ্ঠা ৬৫, লিবার্টি ফান্ড)।
  • কর্মজীবী দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি নেই। ভদ্রলোকদের সময় এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সঠিক নীতিতে থিতু করা সম্ভব। আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের নীতি গঠনের মতো কৌতূহল ও জ্ঞান থাকলেও, তা সঠিক জীবনদর্শনের জন্য কিংবা নিজেদের সংস্কারগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়।
    • ১ম খণ্ড, ৯শ প্রবন্ধ: অফ দ্য পার্টিজ অফ গ্রেট ব্রিটেন (১৭৪১ ও ১৭৪২ সংস্করণ)।
  • শিল্পের মূল চালিকাশক্তিই হলো লোভ!—এমনই এক দুর্জয় নেশা যা বাস্তব বিপদ আর হাজারো প্রতিকূলতা মাড়িয়ে নিজের পথ করে নেয়!
    তাই নিছক কাল্পনিক ভয়ের কাছে এর থমকে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং, আমার মতে—স্বৈরাচারী শাসনে বাণিজ্য যে ধ্বংস হয়ে যায়, তা নিরাপত্তার অভাবে নয়। বরং সেখানে বণিকবৃত্তিকে মর্যাদাহীন মনে করা হয় বলে।
    • ১ম খণ্ড, ১২শ প্রবন্ধ: অফ সিভিল লিবার্টি (পৃষ্ঠা ৯৩, লিবার্টি ফান্ড)।
মানব-প্রাণীর অহংকারের জন্য এটি একটি বড় চপেটাঘাত এই যে, সে তার সর্বোচ্চ শৈলী আর চেষ্টা দিয়েও প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম সৃষ্টির সৌন্দর্য কিংবা তার সমমূল্যও হতে পারবে না।
  • মানুষের অহংকারের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কিছু হতে পারে না যে—তার সর্বোচ্চ শিল্প ও শ্রম দিয়েও সে প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম সৃষ্টিগুলোর সৌন্দর্য বা মূল্যের সমান হতে পারে না। শিল্প কেবল একজন সহকারী কারিগরের মতো, যে মূল মাস্টারের (প্রকৃতি) কাজগুলোতে সামান্য কিছু অলঙ্করণ যোগ করে মাত্র।
    • ১ম খণ্ড, ১৫শ প্রবন্ধ: দ্য এপিকিউরিয়ান (পৃষ্ঠা ১৩৯, লিবার্টি ফান্ড)।
  • শিল্প বা কারিগরি দক্ষতা বড়জোর এক জোড়া পোশাক তৈরি করতে পারে। কিন্তু একজন প্রকৃত মানুষকে সৃষ্টি করা কেবল প্রকৃতির পক্ষেই সম্ভব।
    • ১ম খণ্ড, ১৫শ প্রবন্ধ: দ্য এপিকিউরিয়ান (পৃষ্ঠা ১৪০, লিবার্টি ফান্ড)।
  • প্রকৃতির দান যেখানে সীমিত, সেখানে ঘাটতি মেটাতে মানুষের সৃজনশীলতা ও শ্রমের প্রয়োজন পড়ে সবচেয়ে বেশি। অথচ প্রকৃতি যখন অকৃপণ ও মুক্তহস্ত হয়, তখন সে আমাদের কাছ থেকে আরও কঠোর পরিশ্রম আর নিবিষ্ট মনোযোগ দাবি করে। সবচেয়ে উর্বর মস্তিষ্কের মেধাও যদি নিয়মিত চর্চা করা না হয়, তবে তা উর্বর জমির মতোই আগাছায় ভরে যায় আর মানুষের আনন্দ ও ব্যবহারের উপযোগী দ্রাক্ষা বা জলপাইয়ের বদলে তা অলস মালিকের জন্য কেবল বিষাক্ত জঞ্জালের জন্ম দেয়।
    • ১ম খণ্ড, ১৬শ প্রবন্ধ: দ্য স্টোইক (পৃষ্ঠা ১৪৬, লিবার্টি ফান্ড)।
  • মানুষের যাবতীয় শ্রম ও নিরন্তর প্রচেষ্টার চূড়ান্ত সার্থকতা নিহিত রয়েছে সুখ অন্বেষণে। আর এই পরম সুখ লাভের উদ্দেশ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে সুকুমার শিল্প, প্রসার ঘটানো হয়েছে বিজ্ঞানের এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কঠোর আইন ও সমাজব্যবস্থা।
    • ১ম খণ্ড, ১৬শ প্রবন্ধ: দ্য স্টোইক (পৃষ্ঠা ১৪৮, লিবার্টি ফান্ড)।
  • আশাবাদ আর প্রফুল্ল থাকার সহজাত প্রবৃত্তিই হলো মানুষের প্রকৃত ঐশ্বর্য। আর ভয় ও বিষণ্ণতার কাছে আত্মসমর্পণ করাই হলো চরম দারিদ্র্য।
    • ১ম খণ্ড, ১৮শ প্রবন্ধ: দ্য স্কেপটিক (পৃষ্ঠা ১৬৭, লিবার্টি ফান্ড)।
  • যারা প্রথম 'চ্যারিটি ' (দানশীলতা) শব্দটি উদ্ভাবন করেছেন এবং একে একটি মহৎ গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তারা কোনো স্বঘোষিত আইনপ্রণেতা বা নবীর চেয়েও অনেক বেশিসার্থকভাবে মানুষের মনে অন্যের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতার বীজ বুনে দিয়েছেন। তারা সরাসরি কোনো আদেশ ছাড়াই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কার্যকরী উপায়ে মানুষের মনে এই মহৎ শিক্ষাটি স্থায়ীভাবে গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
    • ১ম অংশ, ২২তম প্রবন্ধ: রুচির মানদণ্ড প্রসঙ্গে
সৌন্দর্য বস্তুর নিজের কোনো গুণ নয়। এটি কেবল সেই মনের ভেতরেই থাকে যা বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রতিটি হৃদয় আলাদা আলাদা সৌন্দর্য অনুভব করে।
  • মানুষের হৃদয়ের প্রতিটি পরম অনুভূতিই তার কাছে এক অম্লান সত্য!
    কারণ অনুভূতির জন্ম ও অস্তিত্ব কেবল মানুষের একান্ত গভীরে, আর যখনই কেউ কিছু অনুভব করে—তা তার কাছে ধ্রুব বাস্তব হয়েই ধরা দেয়। কিন্তু আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তগুলো সবসময় সঠিক হয় না। কারণ সেগুলোর ভিত্তি থাকে বাইরের জগতের কঠিন বাস্তবতার ওপর, যা মানুষের হৃদয়ের সবটুকু অনুভব বা মানদণ্ডের সাথে সবসময় মেলে না।
    • ১ম অংশ, ২৩তম প্রবন্ধ: রুচির মানদণ্ড প্রসঙ্গে
  • সৌন্দর্য বস্তুর নিজস্ব কোনো গুণ নয়। এটি কেবল সেই মনের গহীনে বিরাজ করে যা বস্তুটিকে প্রত্যক্ষ করছে। আর প্রতিটি মনই তার নিজস্ব আয়নায় সৌন্দর্যকে ভিন্নভাবে খুঁজে পায়। একজন মানুষ যেখানে সৌন্দর্যের ছোঁয়া দেখেন, অন্যজন সেখানে কদর্যতা খুঁজে পেতে পারেন। তাই অন্যের বোধকে শাসন করার চেষ্টা না করে প্রতিটি মানুষের উচিত নিজের অনুভূতিতেই সন্তুষ্ট থাকা।
    • ১ম অংশ, ২৩তম প্রবন্ধ: রুচির মানদণ্ড প্রসঙ্গে
  • এই দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুই আদতে শ্রম দিয়েই ক্রয় করা হয়।
    • ২য় অংশ, ১ম প্রবন্ধ: বাণিজ্য প্রসঙ্গে
  • এক কথায়, মানবজীবন যুক্তির চেয়ে ভাগ্যের দ্বারাই বেশি শাসিত হয়। একে কোনো সিরিয়াস পেশার চেয়ে বরং একটি নিরন্তর ও একঘেয়ে বিনোদন হিসেবে দেখাই শ্রেয়। এটি জগতের ধরাবাঁধা নিয়মের চেয়ে মানুষের ক্ষণস্থায়ী মেজাজ বা সহজাত স্বভাবের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। আমরা কি তবে আবেগ আর দুশ্চিন্তা নিয়ে এতে লিপ্ত হয়ে যাব? এটি এত চিন্তার যোগ্য নয়। কিন্তু আমরা কি যা ঘটে তা নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকব? আমাদের এই নির্লিপ্ততা আর অসতর্কতার কারণে আমরা জীবনের খেলার সমস্ত আনন্দই হারিয়ে ফেলব। আমরা যখন জীবন নিয়ে অন্তহীন যুক্তি করছি, তখনই জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে; আর মৃত্যু হয়তো মূর্খ এবং দার্শনিককে আলাদাভাবে গ্রহণ করে, কিন্তু দুজনের সাথেই আচরণ করে একই রকম।
    • ১ম অংশ, ১৮তম প্রবন্ধ: সংশয়ী


দ্য হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড (১৭৫৪-৬২)

[সম্পাদনা]
যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা এতটাই সৌভাগ্যবান হয় যে সে নিজের উদ্দেশ্যগুলোকে; এমনকি নিজের কাছেও—আদর্শের আবরণে ঢেকে রাখতে পারে, তখন সেটি হয়ে ওঠে মানুষের সমস্ত আবেগের মধ্যে সবচেয়ে নিরাময় অযোগ্য এবং অনমনীয়।


  • সেই শাসনামলে এক অমোঘ বিধান কার্যকর ছিল যে, এই দ্বীপের কোনো ভূমিপুত্রকেই রাজকীয় বা ধর্মীয় কোনো উচ্চাসনে বসতে দেওয়া হবে না। তাই স্টিগ্যান্ডের পতনের পর, রাজা ল্যানফ্রাঙ্ক নামক এক প্রাজ্ঞ মিলানিজ সন্ন্যাসীকে সেই শূন্য পদে অভিষিক্ত করেন, যা ছিল স্থানীয়দের জন্য এক অলঙ্ঘনীয় দুর্গের মতো!
    এই ধর্মযাজক নিজের পদের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষায় ছিলেন বজ্রকঠিন। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে তিনি পোপের দরবার থেকে ইয়র্কের ধর্মযাজক থমাসকে নিজের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন এতই সৌভাগ্যবান হয় যে সে নিজের স্বার্থকে—এমনকি নিজের কাছেও—আদর্শের এক পবিত্র আবরণে ঢেকে রাখতে পারে, তখন সেটি হয়ে ওঠে মানুষের আদিমতম আবেগের মধ্যে সবচেয়ে অনমনীয় ও নিরাময় অযোগ্য এক নেশা। ল্যানফ্রাঙ্ক পোপের স্বার্থ রক্ষায় যে অবিরাম উদ্যম দেখিয়েছিলেন, তা আসলে ছিল নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের এক নিপুণ কৌশল। তার সেই কৌশলী আনুগত্যের ফলে ইংল্যান্ডের মাটিতে রোমের প্রভাব ফরাসি বা ইতালীয় আভিজাত্যের সমপর্যায়ে উন্নীত হয়। পরবর্তীতে এই ধর্মীয় আধিপত্য আরও বহুদূর বিস্তৃত হয়েছিল; কারণ যে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা একসময় রোমের পথে বাধা ছিল, সেই নির্জনতাই পরে সহায়ক হয়ে ওঠে। জ্ঞানের মশাল আর উদার শিক্ষার অভাব এই দ্বীপের আকাশকে এমন এক অন্ধকারে আচ্ছন্ন রেখেছিল, যেখানে এই আধিপত্যকে রুখে দেওয়ার মতো কোনো সাহসী কণ্ঠস্বর অবশিষ্ট ছিল না।
    • ১ম খণ্ড, ৪র্থ অংশ : উইলিয়াম দ্য কনকারার
  • অলিভার ক্রমওয়েলের চরিত্রটি আমাদের কাছে যতটা না বিস্ময়কর মনে হয় তার চরম মূর্খতা আর তীক্ষ্ণ মেধার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের কারণে, তার চেয়েও বেশি রহস্যময় ঠেকে তার সেই উগ্র উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অন্ধ ধর্মান্ধতাকে ন্যায়বিচার ও মানবতার আদর্শের সাথে একীভূত করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার জন্য। তিনি একইসাথে ছিলেন এক ক্ষমতালোভী অধিনায়ক এবং ন্যায়ের কঠিন অনুসারী—এই দুই বিপরীতমুখী সত্তাকে তিনি যেভাবে নিজের আত্মায় ধারণ করেছিলেন, সেটিই তাকে ইতিহাসের এক অমীমাংসিত ধাঁধায় পরিণত করেছে।
    • ৩য় খণ্ড, ৬১তম অধ্যায়; অলিভার ক্রমওয়েল প্রসঙ্গে
  • তৎকালে বিশ্বের কোনো দেশেই এমন সরকার ছিল না। এমনকি ইতিহাসের ধূলিমাখা পাতাতেও তার নজির মেলা ভার! যা কোনো শাসক বা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ন্যস্ত স্বৈরাচারী ক্ষমতার স্পর্শ ছাড়া টিকে থাকতে পেরেছে। তাই মানব সমাজ আদৌ কোনোদিন এমন পূর্ণতার স্তরে পৌঁছাতে পারবে কি না, যেখানে ব্যক্তিগত শাসন নয় বরং কেবল আইন ও ন্যায়বিচারের শাসন চলবে—তা নিয়ে সন্দেহ থাকাটাই ছিল যৌক্তিক।
    কিন্তু তৎকালীন পার্লামেন্ট বিচক্ষণতার সাথেই ভেবেছিল যে, রাজার হাতে এমন কোনো অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া যায় না যা তিনি সহজেই জনগণের স্বাধীনতা হরণ করতে ব্যবহার করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে যে, অক্ষরে অক্ষরে আইন মেনে চলার পথে কিছু সাময়িক বাধা থাকলেও এর সুদূরপ্রসারী সুফল সেসব অসুবিধার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। আর এই মহৎ নীতিটি প্রতিষ্ঠার জন্য ইংরেজ জাতির উচিত তাদের সেই পূর্বপুরুষদের প্রতি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকা, যারা বারবার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বিনিময়ে আইনের এই শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
    • ৫ম খণ্ড, ৫৪তম অধ্যায়; স্টার চেম্বার বিলুপ্তি প্রসঙ্গে

ফোর ডিসার্টেশনস (১৭৫৭)

[সম্পাদনা]

রুচির মানদণ্ড প্রসঙ্গে

  • সৌন্দর্য আর কদর্যতার বিচারে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভবে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকে, এমনকি যখন তাদের বাহ্যিক রুচি বা আলোচনাগুলো একই মনে হয়। অথচ দর্শন আর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক উল্টো। সেখানে মানুষ বিশেষ তথ্যের চেয়ে মূল নীতিগুলো নিয়েই বেশি দ্বন্দ্বে জড়ায় এবং বাস্তবে যতটা না মতভেদ থাকে, তর্কের খাতিরে বাইরে থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হয়।
  • রুচির একটি 'সার্বজনীন মানদণ্ড' খোঁজা আমাদের সহজাত প্রবৃত্ত। এমন একটি ধ্রুব নিয়ম, যা মানুষের বিচিত্র অনুভূতির মধ্যে সামঞ্জস্য আনবে অথবা অন্তত এমন এক অকাট্য রায় দেবে যা একটি রুচিকে স্বীকৃতি দেবে এবং অন্যটিকে প্রত্যাখ্যান করবে।
  • শিল্পের যাবতীয় সাধারণ নিয়ম যদিও কেবল অভিজ্ঞতা এবং মানব প্রকৃতির সহজাত প্রবৃত্তি পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, তবুও ভাবা ভুল হবে যে প্রতিটি বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের চঞ্চল অনুভূতিগুলো সর্বদা এই নিয়মগুলোর সাথে মিলে যা।
  • রুচির সূক্ষ্মতার ক্ষেত্রে জন্মগতভাবে মানুষে মানুষে বিশাল ব্যবধান থাকলেও, কোনো বিশেষ শিল্পকলায় নিরন্তর অনুশীলন এবং সৌন্দর্যের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ছাড়া এই প্রতিভাকে শাণিত ও উন্নত করার দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
  • সাধারণ জীবনের তুচ্ছ ঘটনায় মানুষ যে কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করে, ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। কারণ সুকৌশলে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে—ধর্মীয় বিষয়গুলো মানবিক যুক্তির সীমানার সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে।


১৭৫৭ থেকে ১৭৭৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে লেখা এবং হিউমের মৃত্যুর পর মরণোত্তর প্রকাশিত।


  • দর্শনের এমন যেকোনো গূঢ় প্রশ্ন—যা এতটাই 'অস্পষ্ট' ও 'অনিশ্চিত' যে মানুষের যুক্তি সেখানে কোনো অকাট্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়—যদি সেই বিষয়ে আলোচনা করতেই হয়, তবে সংলাপ ও কথোপকথনের শৈলীই আমাদের জন্য সবচেয়ে স্বাভাবিক ও সার্থক পথ। এর ফলে তর্কের প্রতিটি দিক উন্মোচিত হয় এবং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সহজতর হয়।
    • প্যামফিলাস থেকে হারমিপ্পাস, প্রস্তাবনা
  • খ্রিস্টধর্মের সূচনালগ্নে যখন দর্শনের গূঢ় তত্ত্বের সাথে লোকজ আচারের এক কৃত্রিম মেলবন্ধন ঘটল, তখন থেকেই ধর্মীয় যাজক ও তাত্ত্বিকদের মধ্যে এক আগ্রাসী প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে। তারা মানুষের শাশ্বত যুক্তিবাদ আর ইন্দ্রিয়লব্ধ বাস্তব জ্ঞানের বিরুদ্ধে একপ্রকার প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেন। মূলত আধ্যাত্মিক একাধিপত্য রক্ষার তাগিদে তারা মানুষের ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে তুচ্ছজ্ঞান করার এক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মানুষের নিজস্ব অনুসন্ধান থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিটি বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক সত্যকে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে ধর্মের পরিপন্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন, যাতে সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধি সবসময় তাদের শৃঙ্খলে বন্দী থাকে।
    • ক্লিয়ানথেস থেকে ডেমিয়া, ১ম খণ্ড
  • বিশ্বের দিকে তাকান, এর প্রতিটি অংশ পর্যবেক্ষণ করুন। আপনি দেখতে পাবেন এটি একটি বিশাল যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়, যা অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যন্ত্রে বিভক্ত এবং সেগুলো আবার এমন স্তরে বিভক্ত যা মানুষের ইন্দ্রিয় এবং ক্ষমতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এই সমস্ত বিভিন্ন যন্ত্র এবং তাদের অতি ক্ষুদ্র অংশগুলো একে অপরের সাথে এমন সূক্ষ্মতায় সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা দেখে যে কেউ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়বে। সমস্ত প্রকৃতিজুড়ে উপায়ের সাথে উদ্দেশ্যের এই অদ্ভুত সমন্বয় মানুষের পরিকল্পনা, চিন্তা, প্রজ্ঞা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে হুবহু মিলে যায়, যদিও এটি মানুষের সৃষ্টির চেয়ে অনেক বেশি উন্নত।
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ২য় খণ্ড
  • মস্তিষ্কের এই ক্ষুদ্র আলোড়ন যাকে আমরা 'চিন্তা' বলি, তার এমন কী বিশেষ বিশেষাধিকার আছে যে আমাদের একেই পুরো মহাবিশ্বের মডেল বানাতে হবে? নিজেদের প্রতি আমাদের পক্ষপাতিত্ব প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটিকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু সঠিক দর্শনের উচিত এই ধরণের প্রাকৃতিক বিভ্রান্তি থেকে সতর্ক থাকা।
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ২য় খণ্ড
  • যদি আমাদের 'বিমূর্ত যুক্তি' কারণ ও ফলাফলের এই অন্তহীন প্রশ্নে নীরব না থাকে, তবে তার অমোঘ রায় হবে এই যে—একটি ভাবজগত বা ভাবনার মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্যও ঠিক ততটাই জোরালো 'কারণ' প্রয়োজন, যতটা একটি বস্তুগত মহাবিশ্বের জন্য প্রয়োজন। যদি উভয় জগতের গঠনপ্রকৃতি একই হয়, তবে তাদের উৎসের কারণও অভিন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ এই দুইয়ের মাঝে এমন কী পার্থক্য আছে যা ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্তে আমাদের উপনীত করবে? বিমূর্ত দৃষ্টিতে তারা সম্পূর্ণ সমান্তরাল এবং বস্তুগত জগতের ব্যাখ্যায় যে দুর্ভেদ্য সমস্যা বিদ্যমান, ভাবজগতের ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে সত্য।
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ৪র্থ খণ্ড
  • যদি এই বস্তুগত মহাবিশ্বকে একটি অনুরূপ ভাবজগতের ছাঁচে ব্যাখ্যা করতে হয়, তবে সেই ভাবজগতকেও অন্য কোনো আধারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আর এভাবেই এক অন্তহীন ও নিরর্থক অনুধাবন চলতেই থাকবে যার কোনো পরিসমাপ্তি নেই। তাই অকারণে জাগতিক সীমানার বাইরে না তাকিয়ে, এই বিশ্বপ্রকৃতিকেই নিজের ভেতরে শৃঙ্খলার নীতি ধারণকারী এক 'দিব্য সত্তা' হিসেবে কল্পনা করা শ্রেয়। আপনি যখনই এই দৃশ্যমান জগতের বাইরে এক কদম পা দেবেন, তখনই আপনি এমন এক অতৃপ্ত কৌতূহলকে জাগিয়ে তুলবেন যাকে শান্ত করা মানুষের যুক্তির পক্ষে কখনও সম্ভব নয়।
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ৪র্থ খণ্ড
  • কিন্তু এই জগত যদি কোনো নিখুঁত সৃষ্টিও হয়ে থাকে, তবুও কি এর সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব সরাসরি সেই মহান কারিগরের ওপরই আরোপ করা যায়? যদি আমরা একটি বিশাল জাহাজের দিকে তাকাই, তবে তার কারিগরের মেধা সম্পর্কে আমাদের ধারণা কতই না উচ্চ হবে!
    কিন্তু আমরা কতই না বিস্মিত হব যখন দেখব যে সেই কারিগর আসলে একজন সাধারণ মেকানিক, যে কেবল পূর্বসূরিদের অনুকরণ করেছে এবং এমন এক শিল্পকে নকল করেছে যা দীর্ঘ কাল ধরে অসংখ্য পরীক্ষা, ভুল, সংশোধন আর তর্কের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উৎকর্ষ লাভ করেছে? বর্তমান এই বিশ্ব-ব্যবস্থাটি স্থিতিশীল হওয়ার আগে অনন্তকাল ধরে হয়তো অনেক জগত আনাড়িপনা আর অদক্ষতার সাথে তৈরি করা হয়েছিল, অনেক শ্রম বৃথা গিয়েছিল। অনেক ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল এবং মহাবিশ্ব নির্মাণের শিল্পে অসীমকাল ধরে এক ধীর কিন্তু নিরন্তর বিবর্তন চলেছিল। এমন গূঢ় বিষয়ে কে নির্ধারণ করতে পারে সত্যের সীমানা। এমনকি অসংখ্য অনুমানের ভিড়ে কেই-বা আন্দাজ করতে পারে যে প্রকৃত সম্ভাবনা কোথায় লুকিয়ে আছে?
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ৫ম খণ্ড
  • এক কথায়, ক্লিয়ানথেস, আপনার এই পথ অনুসরণকারী ব্যক্তি বড়জোর এটুকু দাবি করতে পারে যে—এই মহাবিশ্ব কোনো এক কালে কোনো পরিকল্পনা বা নকশা থেকে জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু এর বাইরে সে একটি বিন্দুও নিশ্চিত করতে পারবে না এবং শেষ পর্যন্ত তাকে তার গোটা ধর্মতত্ত্বই কল্পনা আর অনুমানের বালির ওপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ করতে হবে।
    সে যতটুকু জানে, তাতে এই বিশ্ব কোনো এক উন্নত মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ আর অপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এটি হয়তো কোনো এক শিশু দেবতার প্রথম আনাড়ি প্রচেষ্টা ছিল, যে তার এই পঙ্গু সৃষ্টি দেখে লজ্জিত হয়ে পরে একে পরিত্যাগ করেছে। এটি হয়তো কোনো এক নিম্নমানের দেবতার কাজ এবং তার ঊর্ধ্বতনদের কাছে এটি স্রেফ এক উপহাসের বস্তু মাত্র। হয়তো কোনো এক অতিবৃদ্ধ দেবতার জরাগ্রস্ত বয়সের অন্তিম সৃষ্টি এবং তার মৃত্যুর পর থেকেই এটি সেই প্রথম দিককার ধাক্কা আর যান্ত্রিক শক্তির ওপর ভর করে লক্ষ্যহীনভাবে চলছে। ডেমিয়া, আপনি এই অদ্ভুত অনুমানে আতঙ্কিত হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এগুলো তো ক্লিয়ানথেসেরই দর্শনের অনিবার্য পরিণতি, আমার নয়। যখনই দেবতার গুণাবলীকে মানুষের মতো সীমাবদ্ধ ধরে নেওয়া হয়, তখনই এই বিচিত্র সব ভাবনার জন্ম হয়। আর আমার বিচারে, এমন এক উদ্দাম ও অস্থির ধর্মতত্ত্ব কোনো ধর্মতত্ত্ব না থাকার চেয়ে কোনো অংশে ভালো নয়।
    • ফিলো থেকে ডেমিয়া, ৫ম খণ্ড
  • ফিলো উত্তর দিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আপনাকে শুধু চারদিকে তাকাতে হবে। একটি গাছ তার থেকে জন্মানো অন্য গাছের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সংগঠন বজায় রাখে কোনো সচেতন পরিকল্পনা ছাড়াই। একটি প্রাণী একইভাবে তার সন্তানের মধ্যে। একটি পাখি তার বাসার মধ্যে এবং বিশ্বে এমন ধরণের শৃঙ্খলার উদাহরণ যুক্তি বা পরিকল্পনা থেকে আসা শৃঙ্খলার চেয়ে অনেক বেশি দেখা যায়।
    প্রাণীদের এবং উদ্ভিদের এই সমস্ত শৃঙ্খলা শেষ পর্যন্ত কোনো নকশা বা পরিকল্পনা থেকেই আসে; একথা বলা মানেই মূল প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া। আর এই বিষয়টি তখনই নিশ্চিত হওয়া যাবে যদি অভিজ্ঞতাপূর্বভাবে প্রমাণ করা যায় যে—শৃঙ্খলা তার প্রকৃতির কারণেই চিন্তার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, এবং এটি কখনই নিজের থেকে বা কোনো অজ্ঞাত আদি নীতি থেকে বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
    • ফিলো থেকে ডেমিয়া, ৭ম খণ্ড
  • বস্তুর এমন একটি শৃঙ্খল বা ধারায় প্রতিটি অংশ তার আগেরটি দ্বারা ঘটে এবং তার পরেরটির কারণ হয়। তবে সমস্যা কোথায়? আপনি বলছেন, পুরো ব্যবস্থার একটি কারণ চাই। আমি উত্তরে বলব যে, এই অংশগুলোকে একটি পূর্ণতায় একত্রিত করা তা কেবল মনের একটি স্বেচ্ছাচারী কাজ মাত্র, এবং বস্তুর প্রকৃতির ওপর এর কোনো প্রভাব নেই। আমি যদি আপনাকে কুড়িটি বস্তুকণার একটি সংগ্রহের প্রতিটি কণার আলাদা আলাদা কারণ দেখিয়ে দিই, তবে আপনি যদি পরে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে পুরো কুড়িটির কারণ কী—তবে তা অত্যন্ত অযৌক্তিক হবে। প্রতিটি অংশের কারণ ব্যাখ্যা করার মাধ্যমেই পুরোটির কারণ যথেষ্ট পরিমাণে ব্যাখ্যা করা হয়ে যায়।
    • ক্লিয়ানথেস থেকে ডেমিয়া, ৯ম খণ্ড
  • তিনি আরও যোগ করলেন, মানুষই বা কেন অন্য সমস্ত প্রাণীর ভাগ্য থেকে মুক্তি পাওয়ার দাবি করবে? বিশ্বাস করো ফিলো, পুরো পৃথিবী অভিশপ্ত আর দূষিত। সমস্ত জীবন্ত প্রাণীর মধ্যে এক অবিরাম যুদ্ধ চলছে। অনিবার্যতা, ক্ষুধা আর অভাব শক্তিশালী ও সাহসীদের উত্তেজিত করে। ভয়, উদ্বেগ আর আতঙ্ক দুর্বল ও অসুস্থদের অস্থির করে তোলে। জীবনের প্রথম প্রবেশই নবজাতক শিশু এবং তার দুর্ভাগা পিতামাতাকে যন্ত্রণায় বিদ্ধ করে। দুর্বলতা, অক্ষমতা আর দুর্দশা সেই জীবনের প্রতিটি স্তরে সঙ্গী হয় এবং শেষ পর্যন্ত যন্ত্রণা আর ভয়াবহতার মধ্য দিয়েই এর সমাপ্তি ঘটে।
    • ডেমিয়া থেকে ফিলো, ১০ম খণ্ড
  • যদি কোনো আগন্তুক হঠাৎ এই পৃথিবীতে এসে পড়ে, তবে আমি তাকে এই জগতের মন্দের নমুনা হিসেবে দেখাব—ব্যাধিতে জীর্ণ কোনো হাসপাতাল, অপরাধী আর ঋণগ্রস্তদের ভিড়ে দমবন্ধ কোনো কারাগার, লাশে ঢাকা রণক্ষেত্র, সাগরে ডুবতে থাকা নৌবহর কিংবা অত্যাচার আর মহামারীতে জর্জরিত কোনো জনপদ। জীবনের আনন্দময় দিকটি চেনানোর জন্য আমি তাকে কোথায় নিয়ে যাব? কোনো নাচের আসরে, অপেরায় নাকি রাজদরবারে? সে হয়তো গভীর বিস্ময়ে ভাববে যে, আমি তাকে আনন্দের ছলে আসলে দুঃখ আর যন্ত্রণারই বিচিত্র সব রূপ দেখাচ্ছি।
    • ডেমিয়া থেকে ফিলো, ১০ম খণ্ড
  • ফিলো বললেন, ক্লিয়ানথেস, এই সমস্ত চিন্তার পরেও কি এটা সম্ভব যে আপনি আপনার সেই মানবকেন্দ্রিক ধারণায় অটল থাকবেন এবং দাবি করবেন যে ঈশ্বরের নৈতিক গুণাবলী যেমন তার ন্যায়বিচার, পরোপকারিতা আর ক্ষমা মানুষের গুণের মতোই? আমরা স্বীকার করি তার শক্তি অসীম, তিনি যা ইচ্ছা করেন জগতে ঠিক তাই ঘটে। কিন্তু লক্ষ্য করুন, মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীই এই জগতে প্রকৃত সুখী নয়। অতএব এটি স্পষ্ট যে তিনি তাদের সুখ ইচ্ছা করেন না। তার প্রজ্ঞা অসীম হতে পারে, কিন্তু সেই প্রজ্ঞার উদ্দেশ্য মানুষের ক্ষুদ্র বিচারবুদ্ধি দিয়ে মাপা অসম্ভব। কোনো উদ্দেশ্য হাসিলে সঠিক উপায় বেছে নিতে তিনি কখনোই ভুল করেন না। কিন্তু প্রকৃতির গতিধারা মানুষ বা প্রাণীর সুখের দিকে ধাবিত হয় না। অতএব প্রকৃতি সেই উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি। মানুষের সমস্ত জ্ঞানের গণ্ডিতে এর চেয়ে নিশ্চিত আর অভ্রান্ত সিদ্ধান্ত আর হতে পারে না। তবে কোন দিক থেকে তার পরোপকার আর ক্ষমা মানুষের গুণের সাথে মেলে? এপিকিউরাসের সেই পুরনো প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও মেলেনি। তিনি কি মন্দকে প্রতিরোধ করতে চান, কিন্তু পারছেন না? তবে তিনি অক্ষম। তিনি কি সমর্থ, কিন্তু করতে চান না? তবে তিনি বিদ্বেষপরায়ণ। তিনি কি সমর্থ এবং ইচ্ছুক—উভয়ই? তবে মন্দের উৎস কোথায়?
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ১০ম খণ্ড
  • কত বিশাল প্রাণের সমারোহ, কত সুসংগঠিত, সচেতন আর সক্রিয় সব সত্তা! আপনি হয়তো এই বিস্ময়কর বৈচিত্র্য আর প্রাচুর্যের প্রশংসা করবেন। কিন্তু এই জীবন্ত অস্তিত্বগুলোকে, যারা আসলে মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য একমাত্র সত্তা, একটু কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করুন। তারা একে অপরের প্রতি কতটা বৈরী আর ধ্বংসাত্মক! তারা প্রত্যেকেই নিজের সুখের জন্য কতটা অপ্রতুল! একজন দর্শকের কাছে তারা কতটা তুচ্ছ আর ঘৃণ্য! পুরো বিষয়টি একটি 'অন্ধ প্রকৃতি'র ধারণা ছাড়া আর কিছুই তুলে ধরে না, যা এক মহান প্রাণদায়ী শক্তির প্রভাবে গর্ভবতী হয়ে নিজের কোল থেকে কোনো বিচারবুদ্ধি বা মাতৃত্বসুলভ যত্ন ছাড়াই তার পঙ্গু আর অপরিণত সন্তানদের উগরে দিচ্ছে!
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ১১তম খণ্ড
  • যদি পুরো প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব—যেমনটা কিছু লোক দাবি করতে চায় যে একটি সহজ অথচ কিছুটা অস্পষ্ট এবং অন্তত অনির্ধারিত প্রস্তাবে এসে শেষ হয় যে, 'মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার কারণ বা কারণগুলোর সাথে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির হয়তো কোনো দূরবর্তী সাদৃশ্য রয়েছে'। যদি এই প্রস্তাবটি কোনো বিস্তার, পরিবর্তন বা আরও বিশেষ ব্যাখ্যার যোগ্য না হয়, যদি এটি এমন কোনো সিদ্ধান্ত দিতে না পারে যা মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে অথবা কোনো কাজ বা সংযমের উৎস হতে পারে এবং যদি এই সাদৃশ্যটি—যতটা অসম্পূর্ণই হোক না কেন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির বাইরে মনের অন্য কোনো গুণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব না হয়। যদি সত্যিই বিষয়টি এমন হয়, তবে একজন অতি উৎসুক, চিন্তাশীল এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ এই প্রস্তাবে কেবল একটি সাধারণ দার্শনিক সম্মতি দেওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারে? এবং সে কেবল এটুকুই বিশ্বাস করতে পারে যে, যে যুক্তির ওপর এটি প্রতিষ্ঠিত তা এর বিরুদ্ধে থাকা আপত্তিগুলোর চেয়ে কিছুটা বেশি শক্তিশালী।
    • ফিলো থেকে ক্লিয়ানথেস, ১২তম খণ্ড

ভুলভাবে আরোপিত

[সম্পাদনা]
  • "Character is the result of a system of stereotyped principles" অর্থাৎ 'চরিত্র হলো বদ্ধমূল কিছু নীতির সমষ্টি'।
    • হিউম কখনো Stereotype শব্দটি ব্যবহার করেননি। কারণ ১৭৯৮ সালের আগে এই শব্দের উদ্ভাবনই হয়নি!
  • "তর্কের মাধ্যমেই সত্যের জন্ম হয়।"
  • "যুক্তির ভূমিকা আমাদের জ্ঞানী করা নয়, বরং আমাদের অজ্ঞতাকে প্রকাশ করা।"
    • এগুলো হিউমের নামে প্রচলিত হলেও তাঁর কোনো লেখায় এর ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
  • "যিনি আবেগ দিয়ে চালিত হন তিনি দাস, আর যিনি যুক্তি দিয়ে চলেন তিনি স্বাধীন।"
    • এটি আসলে স্পিনোজার উক্তি, যা প্রায়ই হিউমের নামে চালানো হয়। এথিক্স (চতুর্থ অংশ)

ডেভিড হিউম সম্পর্কে বিশিষ্টজনদের উক্তি

[সম্পাদনা]
  • হিউম নৈতিকতা আর ন্যায়বিচারের মাপকাঠিকে দেখেছেন মানুষের নিপুণ হাতে গড়া এক ‘আর্টিফ্যাক্ট’ বা কৃত্রিম সৃষ্টি হিসেবে। তাঁর মতে, এগুলো আকাশ থেকে পড়া কোনো ঈশ্বরপ্রদত্ত আদেশ নয়, কিংবা নিছক যুক্তির মারপ্যাঁচে তৈরি কোনো তত্ত্বও নয়; বরং এগুলো হলো মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার নির্যাস। নীতিশাস্ত্রের আঙিনায় হিউমকে বলা যেতে পারে ডারউইনের এক অগ্রজ পথিকৃৎ। তিনি মূলত প্রথাগুলোর ভেতরে ‘যোগ্যতমের টিকে থাকার’( সুরটিই খুঁজে পেয়েছিলেন—যেখানে কোনো প্রথা কতটুকু টিকে থাকবে, তা নির্ধারিত হতো সমাজের জন্য তার প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা দিয়ে।
  • অ্যানেট বেয়ার, "প্রাণীজগতে আমাদের স্থান অনুধাবন", হারলান বি. মিলার এবং উইলিয়াম এইচ. উইলিয়ামস সম্পাদিত নীতিশাস্ত্র এবং প্রাণীজগত (ক্লিফটন, নিউ জার্সি: হিউম্যানা প্রেস, ১৯৮৩; আইএসবিএন 978-0-89603-053-4), পৃষ্ঠা ৬৮।
  • আপনি যদি ডেভিড হিউমের সেই গভীর দর্শনের মুখোমুখি হন, যিনি আমাদের বিশ্বাসের সূক্ষ্মতম তন্তুগুলো ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তবে দেখবেন—কাল সকালে সূর্য উঠবেই, এমন কোনো ধ্রুব বা অকাট্য নিশ্চয়তা আদতে নেই। এটি নিছক আমাদের দীর্ঘদিনের এক অভ্যাস; আমরা কেবল বিশ্বাস করতে ভালোবাসি যে জগতের সবকিছুই বুঝি তার চেনা ছন্দে আবর্তিত হবে। হিউমের এই পর্যবেক্ষণ যেমন অমোঘ সত্যবাহী, তেমনই নিখুঁত!
  • বার্কলে, হিউম, কান্ট, হেগেল—তাঁরা সবাই একটি মহৎ প্রচেষ্টায় ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। আর তা হলো এই বিশাল মহাবিশ্বে মানুষকে তার শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে দেওয়া এবং তার আধ্যাত্মিক সত্তাকে এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসানো।
  • বার্কের কাছে ‘প্রেসক্রিপশন’ বা প্রথাগত অধিকার হলো সেই অটল পাহাড়, যার সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর আমাদের সমস্ত জাগতিক অধিকার দাঁড়িয়ে থাকে। হিউম এই একই তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁর নিজস্ব ঢঙে। তিনি লিখেছিলেন—‘সময় এবং প্রথাই হলো সেই জাদুকরী শক্তি, যা যে কোনো সরকার বা রাজবংশকে বৈধতার চাদরে মুড়িয়ে দেয়। যে ক্ষমতার জন্ম হয়েছিল নিছক অন্যায় আর সহিংসতার গর্ভে, সময়ের পরিক্রমায় সেই ক্ষমতাই একসময় আইনসম্মত এবং অনিবার্য হয়ে ওঠে।’ বার্কও হিউমের সুরে সুর মিলিয়ে বিশ্বাস করতেন যে, সম্পত্তি কিংবা শাসনব্যবস্থা; রাষ্ট্রের যা কিছু শক্তিশালী ভিত্তি, তার মূলে রয়েছে এই প্রথাগত অধিকার।
    • আলফ্রেড কোবান, এডমন্ড বার্ক অ্যান্ড দ্য রিভল্ট এগেইনস্ট দ্য এইটিনথ সেঞ্চুরি (১৯২৯)।
  • হিউম সম্ভবত আইনি এবং রাজনৈতিক দর্শনের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দিয়েছিলেন যা পরবর্তীকালে 'লিবারেলিজম' (উদারতাবাদ) হিসেবে পরিচিতি পায়। হিউমের জনপ্রিয় গ্রন্থ হিস্ট্রি(দ্য হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড) ১৮শ শতাব্দীতে ইউরোপজুড়ে 'উইগ লিবারেলিজম' ছড়িয়ে দিতে ঠিক তেমনই ভূমিকা রেখেছিল, যেমনটি ১৯শ শতাব্দীতে মেকলের হিস্ট্রি রেখেছিল।
  • আধুনিক সমাজের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আমরা আজ মূল্যবান মনে করি, যেগুলো এমন সব পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল যা আগে থেকে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য তৈরি করা হয়নি। হিউম দেখিয়েছেন যে, একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কেবল তখনই গড়ে উঠতে পারে যখন মানুষ নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলতে শেখে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো জনসাধারণের জন্য সুবিধাজনক হলেও—উদ্ভাবকরা ঠিক সেই উদ্দেশ্যে এগুলো তৈরি করেননি।
    • ফ্রিডরিখ হায়েক, দ্য লিগ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ফিলোসফি অফ ডেভিড হিউম (১৯৬৩)।
  • মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি আর অর্জিত জ্ঞানের যে এক বড়ো সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সে বিষয়ে এই মহান সংশয়বাদীর ছিল এক অটল বিশ্বাস। তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন যে শান্তি, স্বাধীনতা বা ন্যায়বিচারের মতো মহত্তম রাজনৈতিক প্রাপ্তিগুলো আদতে আকাশ থেকে পড়া কোনো ঐশ্বরিক আশীর্বাদ নয়। বরং এগুলো হলো এক প্রকার ‘নেতিবাচক’ সুরক্ষা, অর্থাৎ আমাদের জানমাল আর অধিকারকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার এক মজবুত বর্ম মাত্র। হিউম কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মহত্ত্ব বা সততার চেয়ে সেই সব সুদৃঢ় ‘প্রতিষ্ঠান’ বা শাসন কাঠামোর ওপর বেশি ভরসা করতেন, যা তাঁর ভাষায়, ‘এমনকি একজন ঘোরতর অসৎ মানুষকেও বৃহত্তর জনকল্যাণে নিয়োজিত হতে বাধ্য করে’। এই ঘোর বাস্তববাদী দার্শনিকের মতে, একটি টেকসই রাষ্ট্র গড়ার মূলমন্ত্র হলো, ‘রাজনীতির ময়দানে প্রতিটি মানুষকে একজন সম্ভাব্য প্রতারক হিসেবে ধরে নিতে হবে’। আর এভাবেই আইন ও কাঠামোর নিগড়ে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব।
    • ফ্রিডরিখ হায়েক, দ্য লিগ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ফিলোসফি অফ ডেভিড হিউম (১৯৬৩)।
  • হিউম তাঁর দার্শনিক কাজের মাধ্যমে লিবারেল আইনি তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করার পাশাপাশি তাঁর হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড (১৭৫৪-৬২)-এ ইংরেজ ইতিহাসকে 'আইনের শাসন' এর ক্রমবিকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
    • ফ্রিডরিখ হায়েক, লিবারেলিজম (১৯৭৩)।
  • যুক্তিবাদ বা র‍্যাশনালিজমের সমালোচনায় হিউম অন্য যেকোনো লেখকের চেয়ে অনেক বেশি গভীরে যেতে পেরেছেন। আমি বারবার হিউমের লেখায় এমন সব ধারণার সন্ধান পেয়েছি যা আমি নিজে স্বাধীনভাবে চিন্তা করেছিলাম। বিশেষ করে সব ধরণের সামাজিক প্রতিষ্ঠানের গঠন সম্পর্কে হিউমের ব্যাখ্যা অনেক বেশি আমাকে প্রভাবিত করেছিল।
    • ফ্রিডরিখ হায়েক, ইকোনমিক্স, পলিটিক্স অ্যান্ড ফ্রিডম (১৯৭৫)।


  • হিউম স্পষ্টভাবে স্বাধীনতা এবং এই নীতিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে, সবার সর্বোচ্চ স্বাধীনতার জন্য প্রত্যেকের স্বাধীনতার ওপর সমান সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন।একে তিনি প্রকৃতির তিনটি 'মৌলিক আইন' বলেছেন:
    ১. অধিকারে স্থায়িত্ব,
    ২. সম্মতির মাধ্যমে হস্তান্তর এবং
    ৩. প্রতিশ্রুতি রক্ষা ।
    হিউম সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সাধারণ স্বাধীনতা কেবল তখনই সম্ভব হয় যখন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলো 'ন্যায়বিচার' অনুযায়ী পরবর্তী কোনো বিচারবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তিনি সেই ভুলটি করেননি যা পরবর্তীতে অনেকেই করেছেন—ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন স্বাধীনতা এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে সৃষ্ট স্বাধীনতার মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা।
    • ফ্রিডরিখ হায়েক, দ্য ফ্যাটাল কনসিট (১৯৮৮), ২য় অধ্যায়: দ্য অরিজিনস অফ লিবার্টি, প্রপার্টি অ্যান্ড জাস্টিস
  • হিউম বিবর্তনবাদের এক মহাজাগতিক সত্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন!
    তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, ‘কোনো প্রাণের অস্তিত্বই টিকে থাকা সম্ভব নয়, যদি না তার ভেতরে নিজেকে রক্ষা করার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি বা সামর্থ্য থাকে। প্রকৃতি যতক্ষণ না একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই ব্যবস্থা খুঁজে পায়, ততক্ষণ সে নিরন্তর নতুন নতুন কৌশল বা জীবন-পদ্ধতির পরীক্ষা চালিয়ে যায়।’ তাঁর মতে, মানুষ নিজেকে অন্য সব প্রাণীর ভাগ্যের অতীত বা অলৌকিক কিছু ভেবে ভুল করতে পারে না। কারণ জগতের প্রতিটি প্রাণীর ভেতরেই সেই ‘নিরন্তর যুদ্ধ’ অবিরত চলতে থাকে। হিউম মূলত এটিই স্বীকার করেছিলেন যে, আমাদের চেনা প্রাকৃতিক আর মানুষের গড়া কৃত্রিম—এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি তৃতীয় জগৎ রয়েছে, যার ভেতরে এই উভয় জগতের বৈশিষ্ট্যই মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
    • ফ্রিডরিখ হায়েক, দ্য ফ্যাটাল কনসিট (১৯৮৮), পরিশিষ্ট: 'ন্যাচারাল' ভার্সেস 'আর্টিফিশিয়াল'।
  • হিউমের সংশয়বাদকে প্রাচীন ‘গ্রিক সংশয়বাদ’-এর সাথে গুলিয়ে ফেলাটা হবে এক বিরাট ভুল!
    কারণ এই দুইয়ের পথ সম্পূর্ণ আলাদা। হিউম আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা, হৃদয়ের গভীর অনুভূতি আর অন্তর্দৃষ্টির সত্যতাকে অস্বীকার করেন না, বরং এগুলোকেই তিনি তাঁর দর্শনের শক্ত খুঁটি হিসেবে বেছে নেন। সেই মাটির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি তথাকথিত ‘ধ্রুব সত্য’ বা ধরাবাঁধা নিয়মগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেন। কারণ সেসব নিয়মের সপক্ষে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কোনো প্রমাণ নেই। ঠিক উল্টো দিকে, প্রাচীন গ্রিক সংশয়বাদীরা ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির ওপর সত্যের ভিত্তি স্থাপন করা তো দূরের কথা, তারা শুরুতেই মানুষের ইন্দ্রিয়গুলোর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করত।
    • জি. ডব্লিউ. এফ. হেগেল, এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলোসফি (১৮২৭), ডব্লিউ. কফম্যানের হেগেল (১৯৬৬) গ্রন্থে উদ্ধৃত (পৃষ্ঠা ৬৯-৭০)।
  • হিউমের ইতিহাসের সেই মোহনীয় বিষয়বস্তু আর চমৎকার বর্ণনাশৈলী বইটিকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য যেন এক অনিবার্য পাঠ্যপুস্তকে পরিণত করেছিল। আমার আজও মনে পড়ে, ঠিক কতটা উদ্দীপনা নিয়ে তরুণ বয়সে আমি ডুবে থাকতাম এই বইয়ের পাতায়। কিন্তু হায়! সেই বইয়ের প্রতিটি ছত্রে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত প্রভাব থেকে নিজের মনকে মুক্ত করতে আমাকে এরপর কত দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে! কত গভীর গবেষণা আর চিন্তার লড়াই লড়তে হয়েছে। তা আজ কেবল এক দুঃসহ স্মৃতির মতোই মনে পড়ে। এটি দুর্ভাগ্যজনক যে তিনি প্রথমে স্টুয়ার্ট রাজবংশের ইতিহাস লিখেছিলেন এবং তাদের অত্যাচারের পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। এটিই সেই বই যা ইংরেজ সরকারের মুক্ত নীতিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং পাঠকদের বিশ্বাস করিয়েছে যে রাজতন্ত্রের অধিকারই আসল। এটি সারা দেশে 'টোরিজম' (একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ) ছড়িয়ে দিয়েছে।
    • টমাস জেফারসন থেকে উইলিয়াম ডুয়েন (১২ আগস্ট ১৮১০), টমাস জেফারসনের রাইটিংস (১৯৮৪) গ্রন্থে উদ্ধৃত (পৃষ্ঠা ১২২৮-১২২৯)।
  • আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে যে, ব্রিটেনের 'হুইগস' এবং 'টরি'দের (তখনকার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল) মধ্যে পার্থক্য হলো—হুইগসরা তাদের অধিকারের উৎস খোঁজে অ্যাংলো-স্যাক্সন উৎস থেকে, আর টরিরা খোঁজে নরম্যান উৎস থেকে। হিউম ছিলেন সেই টরিবাদের মহান প্রচারক। তিনি দাবি করেছিলেন যে স্টুয়ার্টদের রাজত্বকালে জনগণই রাজাকে আক্রমণ করেছিল, রাজা জনগণকে নয়। তিনি আরও বলেছিলেন, 'জনগণই সকল ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতার উৎস'। এই মহান নীতিটি ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতা দ্বারা সমর্থিত নয়। বিজ্ঞানের এই বিপথগামী সন্তান, তার সহমানুষদের সাথে বিশ্বাসঘতকতা করে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে ক্ষমতার উৎস খুঁজে না পান, তবে কি তিনি তা সংখ্যালঘুর মধ্যে খুঁজবেন?
    • টমাস জেফারসন থেকে জন কার্টরাইট (৫ জুন ১৮২৪), টমাস জেফারসনের রাইটিংস (১৯৮৪) গ্রন্থে উদ্ধৃত (পৃষ্ঠা ১৪৯১)।
  • হিউম দৈবক্রমে একজন টরি (তৎকালীন সময়ের একটি রাজনৈতিক আদর্শ), কারণ তিনি স্কটিশ ছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো আদর্শের কারণে টরি ছিলেন না, কারণ তাঁর কোনো আদর্শই ছিল না। যদি তিনি কিছু হয়ে থাকেন, তবে তিনি ছিলেন একজন 'হবিস্ট' (টমাস হবসের অনুসারী)।
    • স্যামুয়েল জনসন, লেটারস অফ ডেভিড হিউম টু উইলিয়াম স্ট্রাহান (১৮৮৮) গ্রন্থে উদ্ধৃত।
  • আমি অকপটে স্বীকার করি যে, আজ থেকে বহু বছর আগে সেই ডেভিড হিউমের স্মৃতিই প্রথম আমার 'ডগম্যাটিক স্লাম্বার' (মতান্ধতার ঘোর বা বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রচলিত বিশ্বাসকে অন্ধভাবে সত্য মনে করা) ভাঙিয়ে দিয়েছিল। তাঁর সেই সংশয়বাদী চিন্তাই অনুমানমূলক দর্শনের জগতে আমার গবেষণাকে এক সম্পূর্ণ নতুন আর ভিন্ন পথের দিশা দেখিয়েছিল।
  • হিউম ধর্মকে এতটাই ঘৃণা করতেন যে তিনি স্বাধীনতাকেও ঘৃণা করতেন। কারণ স্বাধীনতা ধর্মের সাথে যুক্ত ছিল। তিনি একজন নিরপেক্ষ বিচারকের ভান করে একজন কুশলী উকিলের মতো স্বৈরাচারের পক্ষে ওকালতি করেছেন।
  • হিউমের দর্শন সত্য হোক অথবা মিথ্যা, তবে এটি ১৮শ শতাব্দীর যুক্তিবাদ বা কাণ্ডজ্ঞানের দেউলিয়া দশা প্রকাশ করে। তিনি জন লকের মতো অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু করেছিলেন, কিন্তু প্রখর বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি এই ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মতো আসলে কিছুই নেই। কোনো কাজই অন্য কাজের চেয়ে বেশি যৌক্তিক হতে পারে না, কারণ সবই অযৌক্তিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে চলে। রুশো ছিলেন উন্মাদ কিন্তু প্রভাবশালী। হিউম ছিলেন সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ কিন্তু তাঁর কোনো অনুসারী ছিল না।
  • হিউমের সংশয়বাদের কোনো উত্তর আছে কি না তা খুঁজে বের করা জরুরি। যদি না থাকে, তবে একজন সুস্থ মানুষ আর একজন উন্মাদের মধ্যে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্য থাকে না। যে উন্মাদ নিজেকে একটি 'সেদ্ধ ডিম' মনে করে, তাকে কেবল এই যুক্তিতেই বাতিল করা হবে যে সে সংখ্যায় সংখ্যালঘু অথবা সরকার তার সাথে একমত নয়। এটি একটি ভয়াবহ এবং হতাশাজনক দৃষ্টিভঙ্গি।
  • হিউমের ন্যায়ের ধারণা মূলত নৈতিক ও রাজনৈতিক গুণাবলির একটি বৃহত্তর ব্যাখ্যার অংশ। হিউম একজন 'দার্শনিক নৃবিজ্ঞানী' হিসেবে লিখেছেন, কোনো সংস্কারক হিসেবে নয়। তিনি বেনথাম বা মিলের মতো আমাদের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সংস্কার করতে চাননি, বরং কেবল তা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন।
  • হেগেল, হার্বার্ট এবং শ্লেয়ারমাচারের সমগ্র দার্শনিক কাজের চেয়ে ডেভিড হিউমের প্রতিটি পৃষ্ঠা থেকে অনেক বেশি কিছু শেখার আছে।
  • সব মিলিয়ে, তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর—আমি সব সময় তাঁকে একজন আদর্শ জ্ঞানী ও সচ্চরিত্র নিকটতম মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছি, মানুষের সীমাবদ্ধতা যতদূর পর্যন্ত অনুমতি দেয়।
    • অ্যাডাম স্মিথ (হিউমের মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু অ্যাডাম স্মিথের করা বিখ্যাত মন্তব্য)।
  • আজ আমেরিকার কোনো প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে কান্ট (যিনি ঈশ্বর, স্বাধীনতা ও অমরত্ব নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন) কিংবা হিউমের মতো কেউ গ্র্যাজুয়েট স্কুলে এক বছরও টিকতে পারতেন না! ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তো দূরের কথা।
    • টম উলফ, ইন দ্য ল্যান্ড অফ দ্য রোকোকো মার্কসিস্টস, হার্পার্স (জুন ২০০০)।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]
সামাজিক ও রাজনৈতিক দার্শনিকরা
প্রাচীন দর্শন এরিস্টটলমার্কাস অরেলিয়াসচাণক্যসিসেরোকনফিউসিয়াসমোজিলাওজিমেনসিয়াসমোজিপ্লেটোপ্লুটার্কপলিবিয়াসসেনেকাসক্রেটিসসান জুথুসিডিডিসজেনোফনশুন জি
রক্ষণশীল আলাঁ দ্য বেনোইস্তবোলিংব্রুকদ্য বোনাল্ডবার্কবার্নহ্যামকার্লাইলকোলরিজকন্তকোর্তেসদুর্খেইমডাভিলাএভোলাফিখটেফিল্মারগ্যালটনজেনটিলেহেগেলহাইডেগারহার্ডারহোবসহপেহিউমদ্য জুভেনেলইয়ুংগারকার্ককুনেল্ট-লেডিনল্যান্ডদ্য মেস্ট্রম্যান্সফিল্ডমস্কাওকশটওর্তেগাপারেতোপিটারসনসান্টায়ানাশমিটস্ক্রুটনসোয়েলস্পেংলারস্ট্রাউসতাইনতোকভিলভিকোফয়েগেলিনউইভারইয়ারভিন
উদারতাবাদী আরেন্ডটঅ্যারনবাস্তিয়াবেক্কারিয়াবেন্থামবার্লিনদ্য লা বোএতিকামুকন্দোরসেকনস্টান্টডোয়ারকিনএমারসনএরাসমাসফ্র্যাঙ্কলিনফুকুয়ামাহায়েকজেফারসনকান্তলকম্যাকিয়াভেলিম্যাডিসনমেইনমিলমিলটনমেনকেনমিজেসমন্তেনমঁতেস্কিয়েনীট্‌শেনোজিকওর্তেগাপপারর‍্যান্ডরল্‌সরথবার্ডদ্য সাদশিলারজিমেলস্মিথস্পেনসারস্পিনোজাদ্য স্তালস্টার্নারথোরোতোকভিলটাকারভলতেয়ারভেবারউলস্টোনক্রাফ্‌ট
ধর্মীয় আল-গাজ্জালিআম্বেদকরঅগাস্টিনঅ্যাকুইনাসঅরবিন্দক্যালভিনচেস্টারটনদান্তেদয়ানন্দদস্তয়েভস্কিএলিয়াদগান্ধীজিরার্ডগ্রেগরিগেনোঁযীশুজন অফ স্যালিসবারিযুংকিয়েরকেগোরকোলাকোস্কিলুইসলুথারমাইমোনিদেসমালেব্রঁশম্যারিটাঁমোরমুহাম্মদমিনৎসারনাইবুহরঅক্কামওরিজেনফিলোক্রিস্টিন দ্য পিজানসাইয়্যেদ কুতবরাধাকৃষ্ণণশারিয়াতিসোলঝেনিৎসিনটেলরতেয়ার দ্য শার্দাঁটার্টুলিয়ানটলস্টয়স্বামী বিবেকানন্দভেইল
সমাজতান্ত্রিক আডোর্নোআফলাকআগামবেনবাদিউবাকুনিনবোদ্রিয়ারবাউমানবার্নস্টাইনবাটলারচমস্কিদ্য বোভোয়ারদ্যবোর্ডদেল্যুজডিউয়িডু বোইসএঙ্গেলসফ্যাননফুকোফুরিয়েফ্রমগডউইনগোল্ডম্যানগ্রামসিহাবারমাসক্রপটকিনলেনিনলন্ডনলুক্সেমবার্গমাওমারকুজমার্ক্সমাজ্জিনিনেগ্রিওয়েনপেইনরর্টিরুসোরাসেলসাঁ-সিমোসার্ত্রস্কিনারসোরেলট্রটস্কিওয়ালজারদেংঝিজেক