মাতৃভাষা
অবয়ব

মাতৃভাষা হলো সেই ভাষা যে ভাষায় একজন ব্যক্তি জন্ম থেকে কথা বলে বড় হয়েছেন। মাতৃভাষাকে প্রাথমিক ভাষা বা নিজস্ব ভাষাও বলা হয়। তবে পরিভাষাটির সংজ্ঞা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। মাতৃভাষা মানে মায়ের ভাষা অর্থাৎ এমন কোন ভাষা যা শিশুর বিকাশের জন্য মায়ের মতই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যে ভাষায় কথা বলতে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী, যে ভাষাটি সে তার পিতামাতা বা অভিভাবকের কাছ থেকে ছোটবেলায় শেখে। একটি শিশুর মাতৃভাষা তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। মাতৃভাষা সফলভাবে কাজ ও কথা বলার সামাজিক ধরনকে প্রতিফলন ঘটাতে সাহায্য করে।
উক্তি
[সম্পাদনা]- মাতৃভাষা নামটা আজকাল আমরা ব্যবহার করে থাকি, এ নামও পেয়েছি আমাদের নতুন শিক্ষা থাকে। ইংরেজিতে আপন ভাষাকে বলে মাদার টাঙ্গ্, মাতৃভাষা তারই তর্জমা। এমন দিন ছিল যখন বাঙালি বিদেশে গিয়ে আপন ভাষাকে অনায়াসেই পুরোনো কাপড়ের মতো ছেড়ে ফেলতে পারত; বিলেতে গিয়ে ভাষাকে সে দিয়ে আসত সমুদ্রে জলাঞ্জলি, ইংরেজভাষিণী অনুচরীদের সঙ্গে রেখে ছেলেমেয়েদের মুখে বাংলা চাপা দিয়ে তার উপরে ইংরেজির জয়পতাকা দিত সগর্বে উড়িয়ে। আজ আমাদের ভাষা এই অপমান থেকে উদ্ধার পেয়েছে, তার গৌরব আজ সমস্ত বাংলাভাষীকে মাহাত্ম্য দিয়েছে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলাভাষা পরিচয়-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭
- বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা জন্মভূমি।
গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে ব'য়ে,
যাহার চরণ চুমি।- কায়কোবাদ, বঙ্গভূমি ও বঙ্গভাষা
- কবির মাতৃভাষা যদি বাঙ্গলা হয় তবে বাঙ্গলা খুব ভাল ক’রে না শিখলে ইংরেজ সেটি বোঝে না; তেমনি ছবির ভাষা অভিনয়ের ভাষা এসবেও দ্রষ্টার চোখ দোরস্ত না হলে মুস্কিল।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাগেশ্বরী শিল্প-প্রবন্ধাবলী- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৫৪
- জন্মস্থান এবং মাতৃভাষা লইয়া বিচার করিতে হইলে বঙ্গদেশপ্রসূত বঙ্গভাষাভাষী ব্যক্তিমাত্রকেই এখন বাঙ্গালী বলিয়া অভিহিত করিতে হইবে। কাহার পূর্বপুরুষ কোন অজ্ঞাত পুরাকালে বঙ্গদেশে প্রথম পদার্পণ করিয়াছিলেন, সে কথা এখন বিচার করিবার প্রয়োজন নাই।
- অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রচনা সংগ্রহ -এর বঙ্গভূমী ও বাঙ্গালি পরিচ্ছেদ -এর অন্তর্গত বাঙ্গালী উপপরিচ্ছেদ থেকে সংগৃহীত। প্রবাসী পত্রিকায় ১৩০৮ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ্য সংখ্যায় রচনাটি প্রকাশিত হয়।
- আমাদের যাহা কিছু উত্তম, যাহা কিছু সৎ, উদার, অপূর্ব্ব ও অনুপম, তাহা বঙ্গভাষাতে লিপিবদ্ধ করিব, বাঙ্গালার সম্পত্তি বাঙ্গালার মাতৃভাষার ভাণ্ডারেই সঞ্চিত রাখিব, স্বহস্তে দেশকে বঞ্চিত করিয়া দেশের ধন বিদেশে বিলাইয়া দিব না, এমন করিয়া ধনের উপচয় করিব—বৃদ্ধি করিব, যাহাতে জলধির জলের ন্যায় আমার মাতৃভাষার ভাণ্ডারের সঞ্চিত ধনরাশি, যে যত পারে গ্রহণ করিলেও, কদাচ ক্ষয়প্রাপ্ত হইবে না। ঊষার অরুণচ্ছটায় যেমন দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়, তেমনই আমার মাতৃভাষার আলোকচ্ছটায় পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত আলোকিত হইবে—ভাস্বর হইবে।
- আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, জাতীয় সাহিত্য - আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১২৮
- যত দিন বঙ্গসন্তান মাতৃভাষা উপেক্ষা করিয়া পর ভাষার পক্ষপাতী থাকিবেন, যতদিন মাতৃভাষা ঘৃণা করিয়া বৈদেশিক ভাষানুশীলনে সময় ক্ষেপণ করিবেন, ততদিন বঙ্গের উন্নতির আশা আমরা করি না, ততদিন জাতীয় উন্নতির কোন সম্ভাবনা দেখি না। যাহাতে দেশে মাতৃভাষার চর্চা দিন দিন বৃদ্ধি পায়, যাহাতে মাতৃভাষা আদরের সামগ্রী, যত্নের ধন বলিয়া লোকের প্রতীতি জন্মে, যাহাতে সকলে বদ্ধপরিকর হইয়া মাতৃভাষার দীনবেশ ঘুচাইতে সমর্থ হয়েন, বিবিধ রত্নে মাতৃভাষাকে অলঙ্কৃতা করিতে কৃতসংকল্প হয়েন, সে বিষয়ে চেষ্টা করা প্রত্যেক বঙ্গসন্তানের অবশ্য কর্তব্য কর্ম। ইংরাজী ভাষায় প্রবন্ধ লিখিলেই যে বড় লোক হয়, সে সংস্কার আমার নাই। আমার বোধ হয়, মাতৃভাষা উপেক্ষা করিয়া কেবল ইংরাজী ভাষার আলোচনায় সমূহ ক্ষতি হইতেছে।
- হরিনাথ মজুমদার, "গল্প আরম্ভ", গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা, আষাঢ় ১২৮৭ থেকে প্রকাশিত। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার: নির্বাচিত রচনা, আবুল আহসান চৌধুরী সংকলিত ও সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, মার্চ ১৯৯৮ থেকে উদ্ধৃত।
- মাতৃভাষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি করা সম্ভব নয়।
- যদ্যপি আমার গুরু (১৯৯৮), আহমদ ছফা
- মাতৃভাষা বাংলা বলিয়াই কি বাঙালীকে দণ্ড দিতেই হইবে? এই অজ্ঞানকৃত অপরাধের জন্য সে চিরকাল অজ্ঞান হইয়াই থাক্— সমস্ত বাঙালীর প্রতি কয়জন শিক্ষিত বাঙালীর এই রায়ই কি বহাল রহিল? যে বেচারা বাংলা বলে সেই কি আধুনিক মনুসংহিতার শূদ্র? তার কানে উচ্চশিক্ষার মন্ত্র চলিবে না? মাতৃভাষা হইতে ইংরেজি ভাষার মধ্যে জন্ম লইয়া তবেই আমরা দ্বিজ হই?
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষার বাহন, পরিচয় - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশসাল- ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩২৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১১৭
- যাহারা বাংলা দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে অনেক বাঙ্গালী বলিয়া পরিচিত হইতে লজ্জাবোধ করে; তাহারা বলে বাংলা দেশে জন্মগ্রহণ করিলেই বাঙ্গালী হয় না। যাহাদের মাতৃভাষা বাঙ্গালা, তাহাদের মধ্যেও কেহ কেহ বাঙ্গালী বলিয়া পরিচিত হইতে ইতস্ততঃ করিয়া থাকে; তাহারা বলে বাংলা ভাষায় কথাবার্তা কহিলেই বাঙ্গালী হয় না। তবে কাহাকে বাঙ্গালী বলিব?
- অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রচনা সংগ্রহ -এর বঙ্গভূমী ও বাঙ্গালি পরিচ্ছেদ -এর অন্তর্গত বাঙ্গালী উপপরিচ্ছেদ থেকে সংগৃহীত। প্রবাসী পত্রিকায় ১৩০৮ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ্য সংখ্যায় রচনাটি প্রকাশিত হয়।
- একটা ধারণা আমার দৃঢ় ছিল যে, যে জাতির মাতৃভাষা যত সম্পন্ন, সে জাতি তত উন্নত ও অক্ষয়। আমার মাতৃসমা মাতৃভাষাকে যদি কোনমতে সম্পত্তিশালিনী করিতে পারি, আমার জীবন ধন্য হইবে! কিন্তু অপলাপে লাভ কি? যে সম্পদ্ থাকিলে, যে শক্তি থাকিলে, মাতৃভাষার মুখ উজ্জ্বল করা যায়, দুর্ভাগ্য আমি, আমার সে সম্পদ্ বা শক্তি নাই। আমি মধ্যে মধ্যে ভাবিতাম, কবে এমন দিন আসিবে, যখন আমার শিক্ষিত দেশবাসিগণ আচারে ব্যবহারে, কথায় বার্ত্তায়, চালচলনে প্রকৃত বাঙ্গালীর মতন হইবে!
- আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, জাতীয় সাহিত্য - আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১১৭
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় মাতৃভাষা সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।
উইকিঅভিধানে মাতৃভাষা শব্দটি খুঁজুন।