শহিদ (ইসলাম)
অবয়ব
শহিদ (আরবি: شهيد šahīd, বহুবচনে: شُهَدَاء শুহাদাʾ ; স্ত্রীবাচক: শাহিদা) শব্দটি হলো পবিত্র কুরআনের তথা আরবি শব্দ। যার অর্থ হলো সাক্ষী। এছাড়াও এর অন্য অর্থ হলো আত্ম-উৎসর্গ করা। ইসলামি বিশ্বাসের সাক্ষ্যদানে যে সচেতনভাবে গ্রহণযোগ্য মৃত্যু কামনা করে এবং আত্ম-উৎসর্গ করে তার উপাধি স্বরূপ শহিদ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
উক্তি
[সম্পাদনা]- আল্লাহ্র পথে যারা জীবন দিয়েছে, তাদেরকে মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত, তোমার সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে রিজিক দেন। আল্লাহ্ তাদেরকে যে অনুগ্রহ করেছেন তাতে তারা খুশি। তোমাদের পরবর্তীদের থেকে যারা তাদের সাথে এখনো মিলিত হয়নি তাদের ব্যাপারে তারা অনেক উৎফুল্ল। আর তাদের কোন ভয় নেই এবং কোন দুঃখ নেই।
- নিশয়ই আল্লাহ্ মুমিনদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করেছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে তাদের প্রতি পাকা ও সত্য ওয়াদা। আর নিজ ওয়াদা পূরণে আল্লাহ্র চেয়ে অধিক কে হতে পারে। সুতরাং আল্লাহ্র সাথে যে সওদা বা কেনা-বেচা করছো তা নিয়ে আনন্দ করো। এটাই তোমাদের মহাসাফল্য।
- আর যারা আল্লাহ্র পথে হিজরত করে এবং নিহত হয় বা মারা যায়, তাদেরকে অবশ্যই উত্তম জীবিকা দান করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা অনেক ভালো রিজিকদাতা। তিনি তাদেরকে এমন এক স্থানে প্রবেশ করাবেন, সেখনে যা তাদেরকে খুশি করে দিবে, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই মহাজ্ঞানী ও পরম সহনশীল।
হাদিস
[সম্পাদনা]- আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শহীদ ব্যক্তি মৃত্যুর কষ্ট ততটুকু অনুভর করে, তোমাদের কাউকে একবার চিমটি কাটলে! সে যতটুকু কষ্ট অনুভব করে।
- তিরমিযী ১৬৬৮, ইবনু মা-জাহ (২৮০২), হাসান সহীহ
১৫ জন সুসংবাদপ্রাপ্ত শহীদ সাহাবী
[সম্পাদনা]আশারা মুবাশশারা=
[সম্পাদনা]বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, নবীজী (সা.) এক মজলিসে ১০ জন সাহাবীর নাম ধরে জান্নাতের ঘোষণা দেন।
- হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আবু বকর জান্নাতি, ওমর জান্নাতি, উসমান জান্নাতি, আলী জান্নাতি, তালহা জান্নাতি, জুবায়ের জান্নাতি, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতি, সা’দ (ইবনে আবি ওয়াক্কাস) জান্নাতি, সাঈদ (ইবনে যায়েদ) জান্নাতি এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ জান্নাতি।"
- (সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৭৪৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৬৪৯)
তাঁদের মধ্যে ৫ জন শহীদ হন:
- ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.): ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। ফজরের নামাজ পড়ানোর সময় আবু লুলু নামক এক ব্যক্তির হাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
- উসমান ইবনে আফফান (রা.): ইসলামের তৃতীয় খলিফা। নিজ ঘরে কুরআন তেলাওয়াতরত অবস্থায় বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হন।
- আলী ইবনে আবি তালিব (রা.): ইসলামের চতুর্থ খলিফা। কুফার মসজিদে ইবনে মুলজিম নামক এক খারেজীর বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
- তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.): ওহুদ যুদ্ধে নবীজীকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। নবীজী তাঁকে "জীবন্ত শহীদ" বলতেন। তিনি জঙ্গে জামাল (উটের যুদ্ধ) এর সময় শহীদ হন।
- জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.): তিনি ছিলেন নবীজীর ফুপাতো ভাই এবং তাঁর বিশেষ সাহায্যকারী (হাওয়ারী)। তিনিও জঙ্গে জামালের পর ফেরার পথে শহীদ হন। জান্নাতের সুসংবাদ: নবীজী ﷺ বলেছেন: "আবু বকর জান্নাতি, ওমর জান্নাতি... এবং জুবায়ের জান্নাতি।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৭৪৭)। নবীজীর হাওয়ারী (সাহায্যকারী): খন্দকের যুদ্ধের সময় নবীজী ﷺ বলেন: "প্রত্যেক নবীর একজন 'হাওয়ারী' (একনিষ্ঠ সাহায্যকারী) থাকে, আর আমার হাওয়ারী হলো জুবায়ের।" (সহীহ বুখারী: ২৮৪৬, সহীহ মুসলিম: ২৪১৫)। পাহাড়ের কম্পন ও শাহাদাতের ইঙ্গিত: একবার নবীজী ﷺ হেরা (বা উহুদ) পাহাড়ে ছিলেন, সাথে ছিলেন আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী, তালহা ও জুবায়ের (রা.)। তখন পাহাড়টি কাঁপতে শুরু করলে নবীজী ﷺ বলেন: "হে হেরা! শান্ত হও। কারণ তোমার উপরে একজন নবী, একজন সিদ্দিক এবং শহীদ ছাড়া আর কেউ নেই।" (সহীহ মুসলিম: ২৪১৭)।
অন্যান্য
[সম্পাদনা]- হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.): নবীজীর চাচা। ওহুদ যুদ্ধে তিনি অত্যন্ত নৃশংসভাবে শহীদ হন। নবীজী (সা.) তাঁকে "সাইয়্যিদুশ শুহাদা" বা "শহীদদের সর্দার" উপাধি দেন।
- জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.): মুতা’র যুদ্ধে তাঁর দুই হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নবীজী (সা.) বলেছিলেন, "আমি জাফরকে জান্নাতে দুই ডানা দিয়ে ফেরেশতাদের সাথে উড়তে দেখেছি।" এজন্য তাঁকে "জাফর আত-তায়্যার" (উড়ন্ত জাফর) বলা হয়।
- হাসান ও হুসাইন (রা.): নবীজী (সা.) তাঁদের সম্পর্কে বলেছেন, "হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের সর্দার।" (তিরমিযী)। হুসাইন (রা.) কারবালার ময়দানে শহীদ হন।
- সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত (রা.) ও ইয়াসির (রা.): সুমাইয়া (রা.)-এর স্বামী। নির্যাতনের সময় নবীজী (সা.) তাঁদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলতেন: "হে ইয়াসির পরিবার, ধৈর্য ধরো! তোমাদের ঠিকানা হলো জান্নাত।"
- আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.): সিফফিনের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। নবীজী (সা.) তাঁর সম্পর্কে আগে থেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, একটি বিদ্রোহী দল তাঁকে হত্যা করবে।
- সা’দ ইবনে মুয়ায (রা.): খন্দকের যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি মারা যান। নবীজী (সা.) বলেছিলেন, "সা’দ ইবনে মুয়াযের মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল।" (সহীহ বুখারী)।
- হারিসা ইবনে সুরাকা (রা.): বদর যুদ্ধে একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট তীরের আঘাতে তিনি শহীদ হন। তাঁর মা চিন্তিত হয়ে নবীজীর কাছে এলে তিনি বলেন: "জান্নাতে অনেকগুলো স্তর আছে, আর তোমার ছেলে সর্বোচ্চ স্তর 'জান্নাতুল ফিরদাউস' লাভ করেছে।"
- মুসআব ইবনে উমাইর: সহীহ বুখারীর হাদিস (হাদিস নং: ৩৮৯৭ ও ১২৭৬): হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.) বর্ণনা করেন, "আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নবী (সা.)-এর সাথে হিজরত করেছিলাম, তাই আমাদের প্রতিদান আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়ে গেছে। আমাদের মধ্যে এমন অনেকে চলে গেছেন যারা দুনিয়াতে তাঁদের পুরস্কারের (ভোগ-বিলাসের) কিছুই দেখে যাননি। মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁকে দাফন করার জন্য একটি মাত্র চাদর ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। সেই চাদরটি দিয়ে তাঁর মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যেত। তখন নবী (সা.) আমাদের নির্দেশ দিলেন: 'চাদরটি দিয়ে তাঁর মাথা ঢেকে দাও এবং পা দুটি 'ইযখির' (এক প্রকার সুগন্ধি ঘাস) দিয়ে ঢেকে দাও'।" ওহুদ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নবীজী (সা.) যখন মুসআব (রা.) এবং অন্যান্য শহীদদের লাশের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দাঁড়িয়ে সূরা আল-আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত পাঠ করেন: “মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে...” এরপর নবীজী (সা.) বলেন: “হে লোকসকল! তোমরা এঁদের কাছে আসো এবং এঁদের সালাম দাও। যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ করে বলছি, কিয়ামত পর্যন্ত যে কেউ এঁদের সালাম দেবে, তাঁরা সেই সালামের উত্তর দেবেন।”
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় শহিদ সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।