বাঙালি জাতীয়তাবাদ
অবয়ব

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা বাঙালিয়ানা হলো এক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি বা জাতীয়তাবাদ যার মাধ্যমে প্রাচীন কাল থেকে দক্ষিণ এশিয়াতে বসবাসরত বাঙালি জাতি, তথা বাংলা ভাষাগত অঞ্চলের অধিবাসীদের বুঝানো হয়ে থাকে। বাঙালিরা মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বসবাস করে। বাংলাদেশের সংবিধানের আসল সংস্করণের চারটি মূল স্তম্ভের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্যতম যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে প্রধান অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করছে।
উক্তি
[সম্পাদনা]- বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে দিল্লীর শিরঃপীড়ার কারণ আমি আগেই উল্লেখ করেছি। তারা ভয় করেছিলেন সেক্যুলার ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা রাজ্যসহ সকল বাংলা ভাষাভাষী এলাকায় এই জাতীয়তাবাদের ঢেউ গিয়ে পৌঁছাবে এবং অবশিষ্ট অখণ্ড ভারতের ঐক্যেও চিড় ধরাবে।...তারা চাচ্ছিলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলে একটি দুর্বল মুসলিম স্টেট প্রতিবেশী হিসেবে থাকুক, যে রাষ্ট্রের প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার অমুসলিম বাঙালিরা কোনো অনুরাগ বা আনুগত্য পোষণ করবে না; বরং মুসলিম জাতীয়তা ও মুসলিম গরিষ্ঠতার সঙ্গে যুক্ত হতে তারা ভয় পাবে; পাকিস্তানী শাসনামলের কথা স্মরণ করবে।
- আবদুল গাফফার চৌধুরী। "আমরা বাংলাদেশী না বাঙালি?", প্রকাশক: অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনী, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩, পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৫
- সংবিধানে নিজের জনসাধারণকে 'বাঙালী' হিসেবে আখ্যা দিয়ে শেখ মুজিব ৭২ সালে দিল্লীর বিরক্তির কারণ হয়েছিলেন। ভারতীয়দের মনে হয়েছিলো, "বাঙালী জাতীয়তাবাদ” এর এই আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী ভবিষ্যতে কোনো এক সময় তাদের "পশ্চিমবঙ্গ” রাজ্য নিয়েও অযাচিত ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে। তাই জিয়া কর্তৃক 'বাংলাদেশী' নামকরণের ব্যাপারটি তাদের কাছে স্বাদরে গৃহীত হয়েছিলো এবং সংবিধানের ইসলামিকরণের প্রচেষ্টাকে এর ভারসাম্য হিসেবে তাদেরকে মেনে নিতে সাহায্য করেছিলো।
- এন্থনি মাস্কারেনহাস। Bangladesh: A legacy of blood, পৃষ্ঠা ১২৫
- ওটা নিয়ে ভারতে বেশ উদ্বেগ ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেওয়ায় ভারতে অনেকেই ইন্দিরা গান্ধীর সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের মতে, বাঙালি পরিচয়টি খুব বেশি শক্তিশালী হলে পশ্চিমবঙ্গও এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চিন্তা করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটেই পরিচয়ের প্রশ্নটি তখন সামনে চলে এসেছিল।
- ভেদ মারওয়া, ভারতীয় কূটনীতিক। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ প্রসঙ্গে; ২০০৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।
- বাঙলা আজো অনেকের অস্বস্তি। কোনদিন আবারো যেন বাঙালি জেগে না ওঠে। পাকিস্তানের চাইতে বাঙলা ভারতের কাছে বেশী অসস্তির। কারণ বাঙলা তাঁদের জন্য ইডিওলজিক্যাল থ্র্যাট। বাংলাদেশ সম্পদে, মর্যাদায়, উন্নয়নে, গনতান্ত্রিক চেতনায়, বিজ্ঞানে, শিল্পে, খেলায় যদি তাক লাগিয়ে দিতে পারে তবে সেটা বহু ভাষাভাষী, বহু জাতির এই ফেডারেশনের জন্য অশনি সংকেত। বাঙালি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম নৃভাষিক জাতি এবং নিঃসন্দেহে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ জাতি। ইতিহাসের কোন মহা লগ্নে যদি বাঙালী তার স্টেইক ও স্টেইটাস দাবী করে বসে তাহলে কার বিপদ? আপনারাই ভেবে দেখুন। এই বিপদ যেন না ঘটে তাই এতো অসংখ্য বিভক্তিকে উস্কে দিয়ে জিয়িয়ে রেখে বাংলাকে দুর্বল করা হয়েছে এবং হচ্ছে। বাঙালি যেদিন বুঝতে পারবে সে কেন বিভক্ত, সেটাই ইতিহাসের সেই মহালগ্ন।
- পিনাকী ভট্টাচার্য, ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক লেখায়। [১]
- খণ্ডিত বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে হলে দুই বাংলায় মিলন ঘটাতে হবে এবং খণ্ডিত বাঙালি সংস্কৃতিকেও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
- বাঙালি জাতীয়তাবাদ না থাকলে আমাদের স্বাধীনতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।
- জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অসম মরণ সংগ্রামে। জাতীয়তাবাদ না হলে কোন জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে আমরা এগিয়ে গিয়েছি। ... এই যে জাতীয়তাবাদ, সে সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে চাই। ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন আর কৃষ্টিই বলুন, সকলের সাথে একটা জিনিস রয়েছে, সেটা হলো অনুভূতি। ... অনেক দেশ আছে একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে, তারা একটি জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির ওপর। আজ বাঙ্গালি জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এই সংগ্রাম হয়েছিল যার ওপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
- গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বরের ভাষণ।
- পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মি. জিন্না যেদিন ঘোষণা করলেন, উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা— আমার মতে, ঠিক সে দিনই বাঙালি হৃদয়ে অংকুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। জন্ম হয়েছিল বাঙালি জাতির। পাকিস্তানের স্রষ্টা নিজেই ঠিক সেদিনই অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের ধ্বংসের বীজটাও বপন করে গিয়েছিলেন— এই ঢাকার ময়দানেই। এই ঐতিহসিক নগরী ঢাকাতেই মি. জিন্না অত্যন্ত নগ্নভবে পদদলিত করেছিলেন আমাদের জনগণের জন্মগত অধিকার। আর এই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতেই চূড়ান্তভাবে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেলো তার সাধের পাকিস্তান।
- জিয়াউর রহমান। "একটি জাতির জন্ম", জিয়া স্টাডি সেল কর্তৃক প্রকাশিত, প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০০২, পৃষ্ঠা: ৩
- বাঙালির জীবন-বিকাশের ইতিহাস দীর্ঘকালের। সুলতানী আমলে বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটে। এই সুলতানী আমলেই 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ'-এর 'অঙ্কুর' রোপিত হয়। এ সময়েই বাংলা 'রাজকীয় ভাষা' হিসেবে ব্যবহৃত হতে আমরা দেখি।
- সিরাজুল আলম খান। "বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র", প্রকাশক: ইন্টারন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল নেটওয়ার্ক (আইএইচএন), প্রথম প্রকাশ: জুলাই ২০১৪, পৃষ্ঠা: ৫
- ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু আদিবাসীদের যে অর্থে বাঙালি হয়ে যেতে আহ্বান জানিয়েছিলেন সেটারও ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এখানে মনে রাখতে হবে ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সাংসদদের গণশপথ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু একই আহ্বান জানিয়েছিলেন এই দেশে বসবাসরত বিহারী ও অবাঙালিদের প্রতিও। তাদের বলেছিলেন- "আপনারা বাঙালি হয়ে যান, নিজেদের পাকিস্তানিদের মতো না ভেবে মিশে যান এ দেশের মানুষের সঙ্গে। এই মাটিকে আপন ভাবতে শিখুন, এই দেশের মানুষকে আপন ভাবতে শিখুন। তারাও আপনাদের আপন করে নেবে।"...মোদ্দাকথা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর যে আহ্বান বাঙালি হওয়ার, সেখানে উপজাতিদের রাজনৈতিক বাঙালি হতে বলা হয়েছে। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি না।...পৃথক জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চেয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই সংবিধানে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার পর তার সেই ভুল ভাঙ্গে। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের আওতায় তাদের নৃগোষ্ঠির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বিপন্ন হবে না। সেসময় জাতীয় প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ বেতারে চাকমা ও মারমা ভাষায় খবর পাঠ ও প্রতিবেদন প্রচার শুরু হয়েছিল। লারমা বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন চাকমাদের ওপর যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিপীড়ণ, বৈষম্য দূর করার জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করার শপথ নিয়ে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে পাহাড়ে কি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে সমর্থন দিয়েছিল চাকমারা? সেবার বিজয়ী উপেন্দ্রলাল চাকমা এবং অংশু প্রু চৌধুরীর বিপরীতে সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল এই জাতীয়তাবাদের প্রার্থী। তারপরই শুরু পাহাড়ে বাঙালি সেটলারদের আগ্রাসন। জিয়ার জানা হয়ে গিয়েছিল পাহাড়ের জনমত। বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তিই যেখানে অসাম্প্রদায়িকতা সেখানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক একটি উপাখ্যান মাত্র। ধর্ম নিরেপক্ষতা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে সকল অমুসলিম নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণির বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- অমি রহমান পিয়াল। প্রসঙ্গ বাঙালি জাতীয়তাবাদ , বিডিনিউজ ২৪ ডটকম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১১।
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।