পেঁচা
অবয়ব
—রামকুমার মুখোপাধ্যায়
পেঁচা, প্যাঁচা বা পেচক এক ধরনের নিশাচর শিকারী পাখি। এই পাখিটির প্রায় ২০০টি প্রজাতি রয়েছে। পেঁচা উপর থেকে ছোঁ মেরে শিকার ধরতে অভ্যস্ত। শিকার করা ও শিকার ধরে রাখতে এরা বাঁকানো ঠোঁট বা চঞ্চু এবং নখ ব্যবহার করে। কুমেরু, গ্রীনল্যান্ড এবং কিছু নিঃসঙ্গ দ্বীপ ছাড়া পৃথিবীর সব স্থানেই পেঁচা দেখা যায়। এরা গাছের কোটর, পাহাড়, পাথরের গর্ত বা পুরনো দালানে থাকতে ভালবাসে। পেঁচার জীবাষ্ম গবেষণা করে গবেষকরা অনুমান করেন আজ থেকে প্রায় ছয় কোটি বছর আগে পেঁচার জন্ম হয়েছে। পেঁচার অদ্ভুত রকমের ডাক এবং নিশাচর স্বভাব একে নানা কুসংস্কার এবং অলৌকিক চিন্তার জন্ম দিয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাসবোধে পেঁচাকে মন্দ ভাগ্য, শারীরিক অসুস্থতা অথবা মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই এই বিশ্বাস এখনও অনেক মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।
উক্তি
[সম্পাদনা]- সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে হুতুম পেঁচার চোখ টপটপ করে জ্বলছে, আর কিছু দেখাও যাচ্ছে না, শোনাও যাচ্ছে না, অথচ অনেক পাখিই আজ সেখানে জুটেছে ঘোঁট করতে। পেঁচার সর্দার হুতুম একে একে নাম ধরে ডাকতে লাগলেন, আর চারি দিকে একটার পর একটা লাল, নীল, হলদে, সবুজ চোখ জ্বালিয়ে দেখা দিতে থাকল একে একে ধুঁধুল পেঁচা, কাল্ পেঁচা, কুটুরে পেঁচা, গুড়গুড়ে পেঁচা, দেউলে পেঁচা, দালানে পেঁচা, গেছো পেঁচা, জংলা পেঁচা, পাহাড়ী পেঁচা। হুথুমথুমে ডেকে চলেছে, “ভূতো পেঁচা, খুদে পেঁচা, চিলে পেঁচা, গো-পেঁচা, গোয়ালে পেঁচা, লক্ষ্মী পেঁচা,” লক্ষ্মী পেঁচার দেখা নেই, চোখও জ্বলছে না।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আলোর ফুলকি, প্রকাশক- বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ (১৩৮৬ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৪
- প্যাঁচা কয় প্যাঁচানি,
খাসা তোর চ্যাঁচানি!
শুনে শুনে আন্মন
নাচে মোর প্রাণমন!- সুকুমার রায়, প্যাঁচা আর প্যাঁচানি, সুকুমার সমগ্র রচনাবলী- প্রথম খণ্ড, সম্পাদনা- পুণ্যলতা চক্রবর্তী, কল্যাণী কার্লেকর, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ২৫
- আবার হঠাৎ বস্তুটি সরিয়া গেল। স্পষ্ট বুঝা গেল উহা গতিশীল। সে ভাবিল, ব্যাপারখানা কি? প্রথমে মনে হইল, পেঁচা কিংবা ওই জাতীয় নিশাচর পাখী হইবে; অন্ধকার এবং দূর বলিয়া শাখার উপর নিদ্রিত প্রাণীটিকে দেখা যাইতেছে না। ছায়াটি আবার দেখা গেল। মাধব এবার বিশেষভাবে লক্ষ্য করিয়াও বাদুড় অথবা অন্য কোনও পাখীর আকৃতির সহিত ছায়াটির সাদৃশ্য খুঁজিয়া পাইল না।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজমোহনের স্ত্রী- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ষোড়শ পরিচ্ছেদ, অনুবাদক- সজনীকান্ত দাস, প্রকাশক- ঈষ্টার্ণ পাবলিশার্স সিণ্ডিকেট লিঃ, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫১ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ১০৫-১০৬
- তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে ব’সে এসে
চোখ পাল্টায়ে কয়: ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে?
চমৎকার!
ধরা যাক্ দু-একটা ইঁদুর এবার—’- জীবনানন্দ দাশ, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, প্রকাশক- নাভানা, প্রকাশস্থান- কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬১ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭৭
- বাড়ির শরীরে ক্ষয় ধরলে পেঁচা আসে। ইমারতের দেহে বটবৃক্ষ জাগলে পেঁচা সেখানে বাসস্থান খোঁজে। লালবাড়ির গায়ে শ্যাওলার সবুজ স্তর জমলে পেঁচা উঁকি দেয় চিলেকোঠায়। আঁধার রাতে অশরীরী আত্মার পিছু নেয় পেঁচা, সহাবস্থানের ইচ্ছেয়। পার্ক স্ট্রীটের কত ফিরিঙ্গি বাড়িতেই ঘর বেঁধেছিল রাতের এই কারিগর।
- রামকুমার মুখোপাধ্যায়, পেঁচা গল্প, গল্পসমগ্র, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ২০১৩ খৃস্টাব্দ, পৃষ্ঠা ৩৯২
- লক্ষ্মী পেঁচা তাতে সন্দেহ নেই, কারণ মুখটি সাদা, পিঠে সাদার উপর ঘোর খয়েরী রঙের ছিট। কাল পেঁচা নয়, কুটুরে পেঁচা নয়, হুতুমও নয়, যদিও আওয়াজ কতকটা সেই রকম। পেঁচার ডাক সম্বন্ধে পণ্ডিতগণের মতভেদ আছে। সংস্কৃতে বলে ঘুৎকার, ইংরেজীতে বলে হূট। শেকস্পীয়ার লিখেছেন, টু টুইট টু হু। মদনমোহন তর্কালংকার তাঁর শিশুশিক্ষায় লিখেছেন, ছোট ছেলের কান্নার মতন। যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি মহাশয়ের মতে কাল পেঁচা কুক-কুক-কুক অথবা করুণ শব্দ করে, কুটুরে পেঁচা কেচা-কেচা-কেচা রব করে, হুতুম পেঁচা হুউম হুউম করে। লক্ষ্মী পেঁচার বুলি তিনি লেখেন নি। মুচুকুন্দর গৃহাগত পেঁচাটির ডাক শুনে মনে হয় যেন দেওয়ালের ফুটো দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বইছে।
- রাজশেখর বসু, লক্ষ্মীর বাহন, ধুস্তুরী মায়া ইত্যাদি গল্প - পরশুরাম, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশক- এম. সি. সরকার এন্ড সন্স লিমিটেড, কলকাতা, প্রকাশসাল- ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ (১৩৫৯ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৭৪
- মাঠ দিয়ে যখন চল, তখন আকাশের দিকে কি একবার চেয়ে দেখ—সেখানে বাজ-পাখি, চিল, কাক, শকুনি আছে কিনা? সেটা একবার-একবার দেখে চলা মন্দ নয়। ফস-করে ঝোপে-ঝাড়ে উঠতে যেয়ো না; গেরো-বাজগুলো অনেক সময় সেখানে শিকার ধরতে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যা হলে কান পেতে শুনবে, কোনো দিকে পেঁচা ডাকল কিনা। পেঁচারা এমন নিঃশব্দে উড়ে আসে যে টের পাবে না কখন ঘাড়ে পড়ল!
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হং পাল, বুড়ো আংলা-অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক- সিগনেট প্রেস, প্রকাশস্থান-কলকাতা, প্রকাশসাল-১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ (১৩৬০ বঙ্গাব্দ), পৃষ্ঠা ৬২-৬৩
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]উইকিপিডিয়ায় পেঁচা সম্পর্কিত একটি নিবন্ধ রয়েছে।
উইকিঅভিধানে পেঁচা শব্দটি খুঁজুন।
উইকিমিডিয়া কমন্সে পেঁচা সংক্রান্ত মিডিয়া রয়েছে।